কাজলা মেয়েটি
--শাহীনুর
ইসলাম
আজকে মার্চের শেষ দিনটায় ঝলমল করছে রোদ। সূর্য কয়েক
সপ্তাহ প্রাণান্তকর চেষ্টা করার পর তার খানিকটা তেজ নিয়ে হাজির হয়েছে। সেই তেজ
দিয়ে সর্বান্তকরণে এখন চেষ্টা করছে এই শীতে জমাট কঠিন প্রকৃতির ঠোঁটে অনবরত চুমু
খাওয়ার। চুমুতে চুমুতে ভরিয়ে দিয়ে উষ্ণতা ছড়িয়ে দেয়ার। সে উষ্ণতায় পিচ ঢালা কালচে রাস্তাগুলোর
দুপাশে পুঞ্জীভূত বরফ কিছুটা গলতে গলতে রাস্তা ভিজিয়ে দিচ্ছে। মনে হচ্ছে যেন দীর্ঘ
প্রতীক্ষিত প্রেমিকের স্পর্শে কোনো সাদা রমণীর কাজল পরা চোখে আনন্দাশ্রু।
এমন তুলনাই আসে সাজিকের মনে যখন সে বাসে জানালার পাশে
বসে বাইরের দৃশ্যটি দেখে, আর তার ফাঁকে ফাঁকে তাকায় বাসের ভীড়ের মধ্যে একটা পাঁচ
ফুট মতো বায়বীয় সুড়ঙ্গের দিকে। যে সুড়ঙ্গ তৈরি হয়ে পৌঁছে গেছে ধবধবে শুভ্র এক
মেয়ের মুখাবয়বে। সেই সুড়ঙ্গ বেয়ে দৃষ্টি ফেলে মেয়েটির দিকে। মেয়েটি মাঝারি গড়নের
হওয়ায় এবং তুলনামূলক উঁচু স্থানে থাকায় দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে হাতল ধরে থাকা লম্বা
মানুষগুলোর বগলে তৈরী বায়বীয় সুড়ঙ্গ দিয়ে তাকে দেখতে পায় সে। মুখটি ঠিক শুভ্র,
সুডৌল। মাথার চুল, ভ্রু ও চোখের পাতার লোম কালো। ভ্রু ও চোখের পাতার লোমগুলো এমন
কালো যে সাজিকের মনে হয় মেয়েটি চোখে কাজল পরেছে। তবে মুখখানি মলিন হয়ে আছে। ঠোঁট
দুটো শুকনো যেন কতদিন ভেজেনি। আড়চোখেও দৃষ্টি নিক্ষেপ করছে না মেয়েটি সাজিকের
দিকে। সাজিক অবশ্য এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকার সাহস পাচ্ছে না। তাই একবার বাসের
বাইরে একবার মেয়েটির দিকে নজর ভাগাভাগি করে ফেলছে।
যখন বাইরে তাকাচ্ছে সাজিক, তখন দেখছে ধূলোকেলি শেষে মুরগী
কিংবা জলকেলি শেষে পাখি যেমন গা ঝাড়া দেয়, তেমনই মেপল গাছসহ অন্যান্য গাছগুলিও গা
ঝাড়া দিয়ে বরফ ফেলে দিয়েছে। যদিও ফুল ফোটায়নি, পাতা গজায়নি, তবুও এ যেন বসন্ত বরণেরই
প্রস্তুতি। ঠিক যেন দিয়াশলাইয়ের কাঠির ডগার মতো প্রস্তুত—একটু ঘষা লাগলেই
স্ফুলিঙ্গ আকারে বের হয়ে সবাইকে তাক লাগিয়ে দেবে। বাহির থেকে টের না পাওয়া গেলেও
এরা তো জানে এদের ভেতরে কী রকম প্রস্তুতি চলছে। আর বুনোহাঁসের দল যেন দলে দলে ফিরে
আসছে কলকাকলিতে মুখর করার জন্য।
বেশ কয়েকটা বাসস্টপ পার হয়ে যায় তারা। কিন্তু ভুল করেও মেয়েটি
দৃষ্টি ফেলছে না সুড়ঙ্গ পথে। এক মনে বাইরে তাকিয়ে আছে সে। সাজিক যথারীতি একবার
বাইরে একবার সুড়ঙ্গ হয়ে তার দিকে আশার দৃষ্টি নিক্ষেপ করছে। ভীড়ও যথারীতি একই আছে।
কেউ উঠছে, কেউ-বা নামছে। কিন্তু ভীড় কমছে না। অথচ এই সুড়ঙ্গটি টিকে থাকার কথা নয়
এত লোকজনের উঠানামায়। কিন্তু প্রতিবারেই সুড়ঙ্গটি ঠিকই থাকে। যেন সবাই চাইছে একটা
যোগাযোগ ঘটুক। কিন্তু না এবার সুড়ঙ্গের নিজেরও আর ধৈর্যে সইছে না। ওয়েস্টবরো
স্টেশন আসার সাথে সাথে সুড়ঙ্গটি ভেঙ্গে যায়। ভীড়ের মধ্যে মেয়েটি অদৃশ্য হয়ে যায়।
সাজিকের মন আকুলি-বিকুলি করছে। মেয়েটির নীরবতা তার মনে মুখর হয়ে বাজছে। যে গান
এতদিন তার হৃদয়ে গোপনে, নিভৃতে বেজেই গেছে, তা যেন প্রকাশ হয়েও হচ্ছে না, বেজেও
বাজছে না। যে গল্প শোনাতে চায় সে গল্প যেন বলি বলি করেও বলা হয় না। মনে মনে খুবই
কামনা করছে ভীড় কমে না কেন? মেয়েটা নেমে গেলো না তো? সে ভাবছে এক মুহূর্তের দেখায়
কেউ এভাবে মন কেড়ে নিতে পারে? মনে হয় কত দিন চেনে তাকে! অথচ অনেক দিনের চেনা
মানুষগুলোও তো এভাবে কাছের মনে হয় না তার কাছে। মানুষের ভাল লাগা কি এতই বিচিত্র?
যাকে ব্যাখ্যা করা যায় না কখনো কখনো। নাকি সে তার মনেই ছিলো অনেক দিন ধরে। এত দিনে
তার প্রকাশ এই অগম্য পরিবেশে। এত দিনের চাপা ভাল লাগার যদি মূর্ত প্রকাশ আজ দেখতে
পায় সে, তবে তাকে জানানোটা কি বিমূর্তই রয়ে যাবে? বেশ বিষন্ন লাগছে তাকে।
বাস আরো দুটি স্টপ পার হয়ে কুইন্সওয়ে স্টেশনে পৌঁছালে
ভীড় কিছুটা কমে যায়। সাজিক এবার বড় আশায় মেয়েটি যেখানে দাঁড়িয়ে ছিলো সেখানে তাকায়।
কিন্তু কোথায় সে? সে তো এখানেই ছিলো। তবে কি নেমে গেছে সে? হায়রে বিমূর্ত ভাবনার
ক্ষণিকের মূর্ত প্রকাশ! কিন্তু সাজিকের এত খারাপ লাগছে কেন? মেয়েটা তো নামতেই
পারে। নামার সব ধরনের অধিকার আছে তার। সেটাই কি স্বাভাবিক নয়? কিন্তু সাজিকের তাতে
কী? কোথাকার কে এসে অল্প সময়ে তার মনকে অধিকার করে বসে? কোত্থেকে উড়ে এসে তার
সমস্ত মন জুড়ে বসে। নাকি তার সমস্ত মন জুড়ে ছিলো এতদিন নিভৃতে আঁকা বিহঙ্গী হয়ে;
আজ উড়ে যেতে চায়? ভাল লাগা তাহলে এমন অযৌক্তিকও হতে পারে। যাকে আগে কখনো দেখেনি,
যার সম্পর্কে কিছু্ জানে না তাকে এভাবে ভাল লাগে কী করে? সে উত্তর খুঁজে পায় না।
তাহলে তার মনের গহীন কোণে এই ভাল লাগাটা ভালবাসার দোহাই দিয়ে যুক্তিহীনতার সাথে
এতদিন বসবাস করেছে?
সাজিক বোধ হয় বুদ্ধি-জ্ঞান শূন্য হয়ে পড়েছিলো। তাই সে
এদিক সেদিক আর তাকায়নি। বাসের ভেতর মেয়েটার দাঁড়ানোর জায়গাটাকে সে তার দৃষ্টির
নিবাস হিসেবে ভেবে নিয়েছিলো। কিন্তু লক্ষবস্তু কি সব সময় একই জায়গায় থাকে? বরং
হরহামেশায় তা স্থান বদল করে—কখনো মানসিকভাবে কখনো শারীরিকভাবে। হয়তো জ্ঞান-বুদ্ধি
লোপ পেলেই এমন দৃষ্টিবদ্ধ অনুভূতি কাজ করে। হ্যাঁ, ঐ তো দেখা যাচ্ছে সেই চুল,
ভ্রু, সাদা মুখখানি। তাহলে সে নেমে যায়নি? না, সেই একই রকম সব কিছু। শুধু এবার
দাঁড়িয়ে নেই মেয়েটি। বসে পড়েছে সেই দাঁড়িয়ে থাকার পাশের সিটটায়। আবার আশা জাগে
সাজিকের মনে ক্ষুধায় মুষড়ে পড়ে দূর থেকে হরিণীর গন্ধ পাওয়া বাঘের মতো। কিন্তু মেয়েটি
কি তাহলে মনের সাথে বুদ্ধি ও যুক্তিবোধও নিয়ে গেছে সাজিকের? হয়তো ভালবাসার সাথে
বুদ্ধি ও যুক্তির শত্রুতা আছে। এরা একে অপরের সাথে সহাবস্থান করতে জানে না।
ভালবাসার ধর্মই হচ্ছে অন্য সব কিছুর উপর আধিপত্য বিস্তার করে রাজত্ব করা। তাতে
রাজ্য ধ্বংস হয় হোক। যতক্ষণ যেখানে থাকে সে রাজত্ব করতেই চায়, নইলে সুনামি তুলে সব
উলট-পালট করে যায়।
সাজিক এবার বাইরে যতটা তাকায় তার চেয়ে মেয়েটির দিকে বেশি
তাকায়। তবুও মেয়েটির সাথে তার একবারও চোখাচোখি হয় না। এত কাছে তবু এত ব্যবধান! আকাশ
ও মাটি তো কত দূরে অবস্থান করে! তবু তাদের যোগাযোগ হয়। রাত-দিন দুই বিপরীত মেরুর
মতো। তবু গোধূলি ও প্রভাতে তাদের কিছুক্ষণের জন্যও দেখা হয়, কথা হয়, মিলনও হয়। সাজিক
ভাবে সে কি এগিয়ে যাবে তাহলে পরিচিত হওয়ার জন্য। কিন্তু সঙ্কোচ বোধ হয় তার। সুযোগ
যখন আসে, সঙ্কোচ তখন বসে বসে এভাবেই বুঝি বাধার দেয়াল গড়ে। আর সে দেয়ালে মিথ্যে
প্রবোধ প্রতিধ্বনিত হয় পরবর্তী সুযোগের।
অনেক পরে মেয়েটা কী ভেবে যেন মুহূর্তের জন্য সাজিকের
দিকে তাকায়। সাজিক তখনো মেয়েটার দিকে তাকিয়ে আছে যদি সে ভুল করে একবার কিছুক্ষণের
জন্যও তাকায়। চোখের পাতা যেন পড়ছে না। মেয়েটা তাকিয়ে কী ভেবে যেন একটা মুচকি হাসি
দেয়। আর তার চকিত চাহনিতে সাজিকের বুকে তখন আনন্দের ঝড় বইতে থাকে। আহ! এ ঝড় অসহ্য রকমের
ভাল লাগছে তার কাছে। মনে আচমকা বিদ্যুৎ খেলে যায়। শিরায় শিরায় রক্ত নিমিষেই সমস্ত
শরীর পরিভ্রমণ করে। হৃৎস্পন্দন একবার যেন থেমে যায়। কিন্তু একটু পরেই তা মিলিয়ে
যায়। আরো কিছুক্ষণ যদি মেয়েটি তার হাসিটি সাজিকের দিকে জিইয়ে রাখতো! খুব কি ক্ষতি
হতো তার? সাজিকের হৃদয়ে লালিত বাসনার সাথে মিলে যায় কেন সে হুবহু? দোষ তো শুধু
সাজিকের না, মেয়েটিরও। কারণ সাজিক তাকে হৃদয়ে ধরেছে, আর মেয়েটি হৃদয়ের আবেগমথিত
বহিঃপ্রকাশ হয়ে দেখা দিয়েছে। কিন্তু এ কী? সে ঝড় তার চরিত্র বদল করছে কেন এভাবে?
দুমড়ে মুচড়ে শিকড় উৎপাটন করতে চাইছে যেন। অসহ্য! আগেই তো ভাল ছিলো। হাসি হাসি
মুখখানি তার বুকে গেঁথে থাকলেও সে হাসির ওপারে ঘন মেঘের দ্রুম দ্রুম গর্জন বাজে
তার কানে ।
ঝড়ের বেগ যে সাজিককে বিধ্বস্ত করেছে সেটা সামাল দেয়ার
জন্য এবার বাইরে তাকায় সে। দেখে ঝলমল করা রোদটুকু হারিয়ে গেছে। বিবর্ণ দিনের ফিকে
আলোয় সবকিছু তবু টিকে আছে। একটু পরে আবার মেয়েটির দিকে তাকায়। এ কী? আবার হারিয়ে
গেলো বুঝি সে? বার বার হারায় কেন সে? না, মনে হয় ওখানেই আছে। তবু আগের মতো দেখা
যাচ্ছে না। ভীড়ে তবু সুড়ঙ্গ ছিলো। তখন দেখা যেতো। এখন তো বাসে ভীড় নেই। কিন্তু
অন্য কিছু ভীড় করে ঢেকে রেখেছে তাকে। এ ভীড় বাসের ভীড়ের চেয়ে শতগুণে বিরক্তিকর ও
অসহনীয়। মেয়েটির ঠোঁট ভেজাচ্ছে কে? ঝড়ের পরেও তাহলে ঝড় আসে। সে ঝড় আরো ভয়ঙ্কর,
অসহ্য। শুধু বিধ্বস্তই করে না, দেহ-মনের সব শক্তি শুষে নিয়ে বড় অসহায় ও দগ্ধ করে
চলে যায়। মেয়েটির মুখখানি আর দেখতে পায় না সে। শুধু দেখে আরেকটি শরীর যা তার পুরো
অবয়বখানি ঢেকে রেখেছে। সাজিকের কানে অনুরণিত হয় সাবরিতার চলে যাবার সময়কার সেই
কথাটি ‘তোমার কপালে অনেক দুঃখ আছে’!
No comments:
Post a Comment