Thursday, 12 June 2014

অমালোকে জাগৃতি (কাব্য)




অমালোকে জাগৃতি



শাহীনুর ইসলাম













উৎসর্গ

 ভাই-বোনদের--

মোঃ শহিদুল ইসলাম
মোঃ সাইফুর রহমান
মোছাঃ শিরিন বেগম
মোঃ শফিকুল ইসলাম
মোছাঃ রিক্তা বেগম
মোঃ সেলিম মিয়া
মোছাঃ নাসরিন আক্তার









আরো যে এক


আরো যে এক আকাশ আছে এ আকাশের নিচে
হরেক রঙে রাঙা সে যে হরেক বেশি কাছে।
সে আকাশের চাঁদ-তারায় হারিয়ে গেলে না যে
তার মেঘের মধুর গান তাই অন্য কোথাও বাজে।


আরো যে এক সাগর আছে সব সাগর বাদে
সেই সাগরে জল উপচে পড়ে যখন সে কাঁদে।
অন্য সব সাগর জলে সাঁতার কেটে গেলে
জানলে না তো ভরেছে তারা এই সাগর জলে।


আরো যে এক জমিন আছে এ জমিনের কাছে
সে জমিনেও ফসল ফলে-- ফুল যে ফোটে গাছে,
সেখানে চাষ করলে না তো ইচ্ছেমতো ফুল
বৃষ্টি রোদ পেয়েও তাই করেই গেলে ভুল।



রক্তে আগুন লাগা নিশীথের শরীরে

রক্তে আগুন লাগা নিশীথের শরীরে
বৃষ্টি ঝরবে না আর জানি সুশীতল;
দগ্ধ মনের তপ্ত সমীরে বইবে
কেবল আরো অনল-- দাউ দাউ শিখায়।
ছুটবে পরাণ বান-ভাসা পিঁপড়া হয়ে
এদিক-সেদিক-- তবু খুঁজে পাবে না তো সে
সাধের প্রাণখানি রাখার মতো আশ্রয়।
এমন বেলায় কে খুঁজবে তারে আবার?
টেনে নেবে হাতখানি ধরে জাগাতে আশা;
নৈরাশ্যে আলোকিত আঁধার যে তার
অসহ্য মনে হয় মরণেরও চেয়ে।
তামাম দুনিয়া আজ জেনে যাক এ কথা--
তপ্ত আলোয় আলোকিত হতে চায় না 
কখনোই কোনো হৃদয় নিদাঘতুল্য।
এমন আলোর চেয়ে নিশীথের হৃদয়
অন্ধকারকে তাই দেয় অতি মূল্য।

------*****------


নগ্ন নিশির মগ্ন শরীর

নগ্ন নিশির মগ্ন শরীরে দেখো
পেলব বাতাস বরফ-হৃদয় ছোঁয়,
মাখন কোমল গম্বুজ বেয়ে ওঠে
আর এক হয় দুটি বাসনা-চূড়ায়।
গ্রানাইট ঘ্রাণ সুতীব্র হলে পর
নষ্ট হৃদয় কষ্ট ভুলে তখন
আরো বেশি সুবাসে নষ্ট হতে চায়।
নষ্ট হওয়ার যথেষ্ট সুখে থেকে
ডুবেই যেন সে এবার মরতে চায়।
এমন মরণ পৃথিবীর খাঁ-খাঁ বুকে
আরেকটি বার তৃষ্ণা জাগিয়ে যায়।

যতই মিটুক বাসনা দুটি চূড়ায়,
দেবতার ফাঁদ কভু ব্যর্থ হবার 
মতো নয়; এ আরোহণ-অবরোহণ
চলে আজীবন স্ফুলিঙ্গ স্ফুরণেই,
ক্ষান্ত সেদিন হয় তারা একেবারে, 
শরীরে সফেদ বসন যখন যবে
অসাড় অক্ষমতায় জড়িয়ে যায়।

*****



দৃশ্যের বাইরে

দৃশ্যের বাইরে যে জীবন আঁধারে
নিঃসীম ওপারে ঘুরে ঘুরে বেড়ায়,
নিশীথের গর্ভে গর্বে পাড়ে ডিম
  সোনালি সময়ের শিশু দেখবে বলে,
যে জীবন দিনকে ফেলে রাতের করে
পুজো অথবা করে এখনো প্রার্থনা--
সেই জীবন তো আজীবন অধরা,
প্রতারকের টোপ, রঙিন ঘেরাটোপ--
যার ভেতরে আছে অনন্ত আঁধার,
কৃষ্ণ গহ্বর। দৃশ্যের ভেতরে
থেকে অদৃশ্যের প্রতি মায়াবী টান।
অদেখা জীবনের লোভ নগদে সুলভ
মৌবনের যৌবন করে যে ছিনতাই;
নগরের নাগর ফেরে নগ্ন হাতে
দুঃসহ কোণায় ডোবে অন্ধকারে।
তখন সে জীবনে থাকে না যে তফাৎ
আঁধারপূজারী সেই জীবনের সাথে--
এমন জীবন তো নিয়ত অঘ্রাত,
অনাস্বাদিত, অবহেলায় মলিন
কোনো এক কুসুম-- ঝরে যাবার আগে;
বিশাল সমুদ্রে একটু জলে স্নান
এত জলরাশির শরীর সত্ত্বেও।
তবে কাকে কর্জ দেয়া ভ্রষ্ট জীবন
কোন সেই নিয়ম হয় যে প্রণয়ন
টুঁটি চেপে ধরতে, জাঁতায় থেতলাতে? 
*****



আনন্দ-অনশন

নষ্ট দেহের কোনো ঠাঁই নেই সমাজ সংসারে;
সমাজে সবাই বাঁচতে চায় যে সতী দেহ অধিকারে
যেখানে নষ্ট দেহের মূল্য নেই কানাকড়ি।
অথচ নষ্ট মনের বেলায় কত বাড়াবাড়ি
যার সাথে আজ অচল সমাজ দিব্যি প্রতিনিয়ত
নিঃসঙ্কোচে করে সহবাস দিন রাত কত শত।
তবু যে নষ্ট দেহের মূল্য নেই মানুষের কাছে
অথচ নষ্ট মনের চেয়েও ঢের বেশি ভাল আছে
নষ্ট দেহটি-- তার নিঃশব্দ আনন্দ দানে,
সমাজ-পিষ্ট থেতলানো সব হৃদয়ের গানে,
হাবুডুবু খাওয়া কূলহারা সব কষ্টের বানে;
যখন নষ্ট হৃদয় ব্যস্ত কেবল কষ্ট প্রদানে,
থাকে উন্মুখ-- মসজিদ আর মন্দির ভাঙতে,
অতীব কষ্টে ফোটানো গন্ধরাজ পায়ে মাড়াতে।

অপুষ্ট দেহে থাকে এঁটো ঘ্রাণ-- সমাজের নাকে বাজে,
অপুষ্ট মন পুষ্টি যোগায় সেই তালি পরা সমাজে
আর বাহাদুরি করে যায় শুধু মূল্যবোধের ফ্যাশনে
রুগ্ণতা তাই ছাড়ে না কখনো আনন্দ-অনশনে। 
রুগ্ণতার এ স্বর্গরাজ্যে জোছনাও অভিশাপ
পায়ের তলায় পূণ্যের বাস মাথায় যে পাপ।

*****


সোনালি সূর্যের জন্য

অন্ধকারে অন্তঃসত্ত্বা নিশীথের প্রাণ
শুঁকে যেতে চায় শুধু আলোকের ঘ্রাণ।
ভালবেসে একদিন সে সূর্যের বুকে
জড়িয়েছিলো নিজের বুক বড় সুখে।
নিজ সত্ত্বা করে লীন তার তপ্ত তনু--
কেঁপেছিলো একবার হৃদ-পুস্প রেণু
যখন সূর্য গিয়েছিলো উত্তরায়ণে 
মাঘের পড়ন্ত বিকেলে নিঃশব্দ ক্ষণে
লোকালয় ছেড়ে লজ্জানত নিরজনে
চুমেছিলো আঁখিপাতে দিগন্তের কোণে।
সে সুখের ভ্রুণ বয়ে বয়ে ক্লান্ত সে যে
প্রতীক্ষার প্রহরগুলো তাই গো বাজে
অবিরাম ঘন্টাধ্বনি হয়ে তার বুকে,
মুখে ও চোখে নতুন ব্যথার মোড়কে।
ব্যথার ওপারে তবু আলো-ঈশারায়
আবার হৃদয় তার শান্ত হয়ে যায়।
আসছে প্রভাতে জন্ম নেবে তার গর্ভে
নতুন সোনালি সূর্য দাহকাল পর্বে।
                  *****




হরিণেরা বৃথা বাঁচে

এ পৃথিবী হরিণের জন্য নয়-- চিরদিন সুসময়;
হরিণেরা বৃথা বাঁচে সবুজ ঘাসের লোভে,
যে ঘাসে তাদের অতি সুপুষ্ট শরীর
সুরভিত হয়ে ওঠে, আর চুম্বকের ন্যায় কাছে টানে 
বৈরী বাঘের প্রাণঘাতী ঘ্রাণ;
বাওয়ালি নয় যে তারা, শুধু সহজ শিকার।
আর সব মানবের মতো নেই তাদের কোনো অমানবিক অস্ত্র
কিংবা গোমাংসের মতো নেই কোনো চর্বিযুক্ত ধীর-স্থির
প্রতিশোধ নেয়ার গোপন হাতিয়ার
কিংবা নেই 
চিতল মাছের মৃত্যু পরবর্তী মানুষের গলাবিদ্ধ কাঁটা।
হরিণেরা তবু বৃথা বাঁচে জীবন অমূল্য ভেবে;
ঘাসের মেঁতিস ছলনায় বন্দী হয়ে মরে নিরবধি
আর ছলনার ঘেরাটোপে আঁকা থাকে ছোপে ছোপে
সর্বাঙ্গে ফুটকি মরণের।
তবুও বাঁচার সাধ তাদের অক্ষয় অবিরল
হোক না জীবন তুচ্ছ অতি, নিমিষে গরল।

পৃথিবীর রূপ করে অপরূপ বনে বনে জাগায় যে প্রাণ,
সকলেই বাঁচে ধার করে তাদের হৃদয় পোড়ানোর ঘ্রাণ।
হরিণেরা তবু বৃথা বাঁচে নিজেদের তরে।
সবুজ ঘাসের প্রলোভনে তাদের জীবন
নিজেকে বিকিয়ে দেয় বিনামূল্যে মরণের কাছে।
হরিণেরা তাই বৃথা বাঁচে
হরিণেরা তবু বৃথা নাচে
সবুজের মুদ্রা-লয়-তাল-ছন্দে। 
*****

প্রতীক্ষা

পৃথিবী যেমন সারা দিনমান ঘুরে চলে সূর্যের চৌদিকে
অবশেষে গোধূলির হাতে হাত রেখে যায় অভিসারে
খুঁজে পায় প্রাণ তার এখনো রয়েছে বেঁচে, 
আর নিশীথে যেমন আবার অধীর হয়ে থাকে
কখন মিলবে সে ঊষার সাথে সঙ্গোপনে
পৃথিবীর সব প্রাণ জাগিয়া ওঠার আগে,
তেমনই আমরা থাকি অধীর উন্মুখ
সারা জীবনের সবগুলি নিশিদিন--
আলোতে আঁধার আর আঁধারে আলোয় 
মিলিত হওয়ার মহাকর্ষ বাসনায়।
সেই বাসনায় যদি কখনো বা লাগে গ্রহণ হঠাৎ,
মেঘের আড়ালে ঢাকা পড়ে সবটুকু আশা
অযাচিত সে গ্রহণ জ্বালা সয়ে যাই তবু মুখ বুজে
কানি বক ব্যস্ত ধৈর্য নিয়ে জীবনের পঙ্কে প্রাণ গুঁজে--
আবার হবে যে দেখা নিশীথের অন্ধকার শেষে
ভোরের আলোর বুক চিরে। কথা হবে কেবল নীরবতায়
এতদিনের আড়ষ্ট কথার যমুনা মিলে গেলে মোহনায়;
অনুভবের সকল স্রোত তখন গড়বে ফেনিল সাগর
যেখানে ডুব-সাঁতারে আর জলজ সুখের মগ্নতায়
কাটবে অন্তত কিছু ক্ষণ-- বায়বীয় রুক্ষ স্পর্শ
আর স্থলজ বেদনা থেকে মিলবে যে পরিত্রাণ।
সেই প্রতীক্ষায় আমরাও পৃথিবীর মতো ঘুরে চলি আজো।

*****


আফিমখোর

আমাদের পূর্বপুরুষেরা যারা মরীচিকা-প্রলোভনে কিংবা
অস্তিত্বের স্বার্থে করেছিলো সেবন অন্যের দেয়া অহিফেন
নিজেদের নেশাদ্রব্য পরিত্যাগ করে,
আর সেই লোভে শুধু বারবার করেছিলো তারা কারবার 
আর তাকিয়েছিলো শুধু পিছন পানে
সম্মুখ যাত্রার আলোকে আলেয়া ভেবে;
আর সেই ঘোরে চলো আজো তোমরা যখন পুরোদমে
আর মাপকাঠি করো তাকেই কেবল সব মানুষ বিচারে
জন্মান্ধ আদিম মিথ্যে সব মূল্যবোধে,
আজো সব সমস্যার দাওয়াই খোঁজো সে অহিফেনে
সকল সম্পর্ক মেপে চলো একে কেন্দ্র করে,
প্রান্তিকে বসত করা আমরা তখন নিক্ষেপিত হই
আরো দূর সে প্রান্তরে-- কখনো বা আঁস্তাকুড়ে।

সে সময় হয়তো বা এখনো আসে নি প্রান্তবাসীদের
যখন কেন্দ্রের সবটুকু শক্তি চলে যাবে তাদের মুঠোয়,
যখন বাঁচবে তারা নিজেদের একান্ত সময়ে।
তাই দুঃসময়ে হয় সুসময়ের সে হাল চাষ
আর উর্বর জমিন প্রমাণিত হয়ে চলে অনুর্বর বলে।
তোমরা তবুও চাও না যে মানতে-- পতঙ্গ ধরা বীজে
ফসল কখনো হয় না ভাল; অথচ আজো করছো বপন
সেই অহিফেন বীজ সোনা-ফলা পলিমাটি গর্ভে।

*****
ঘূর্ণিচক্র

বাতাসের দীর্ঘশ্বাসে জীবনের তপ্ত বালু ওড়ে ঘূর্ণিচক্রে,
ওড়ার যে সাধ ছিলো তার পাখি কিংবা প্রজাপতি হয়ে
এ গাছে সে গাছে, এ ফুলে সে ফুলে;
কিন্তু হায়! সে আছড়ে পড়ে উড়ে উড়ে, ঘুরে ঘুরে
আবার সে তপ্ত বালুচরে, জীবন-যাপনে জেগে ওঠা বালুচরে 
আর--
অবাধ্য সে সাধ রুদ্ধ করে যায় শুধু বাকি জীবনের গতি।
এমনই করেই উড়ে বেড়ানোর সাধ তবে
পূর্ণ করে যায় কোনো কোনো জীবন-নিয়তি!

হাপরের তপ্ত ফাপরে লৌহ কঠিন জীবনও যে গলে যায়
কামারের হাতে; গোটা এক জীবন খরচ করে
জেনে গেছে জীবন তা গলে গলে ক্ষয়ে ক্ষয়ে 
নিজেকে ফতুর করে জীবনেরই তপ্ত হাটে।
আর ফতুর জীবন দিয়ে শুধু চলে বিনিয়োগ অন্যের জীবনে,
যাদের শরীরে মেদ জমে সেই জীবনের অস্থিমজ্জাজাত
চক্রবৃদ্ধির চড়া কুসীদ খেয়ে খেয়ে।

*****


হিজড়া পুরাণ

তোমরা আমাকে গালাগাল দাও আর টিটকারি মারো
আর বক্র হাসি হাসো আমাকে ‘হিজড়া’ নামে ডেকে
আমি কে আর কেন বা এমন তা জানো না বলেই।
শোনো তবে! ‘আমি একা ছিলাম যখন
হাজার হাজার যুগ আগে এই পৃথিবীতে
তখন আমার ভাল লাগে নি তা।
কিন্তু ভাল যে বাসবো আর বংশবৃদ্ধি করে যাবো
তেমন কোনোই সঙ্গী ছিলো না আমার;
তবে আমার উভয় অঙ্গ ছিলো স্বয়ংসম্পূর্ণ রূপে
শীতের এক রাতে যা ঘষেছিলাম পরস্পরের সাথে
কেঁচোর মতন করে খানিকটা উষ্ণতার জন্য।
এরপর পৃথিবী যেদিন একবার শেষ করে এলো তার আবর্তন
ঠিক সে রকম একদিন অনুভবে বুঝলাম
পেটটি আমার বাড়ছে তো বাড়ছেই
আর একদিন এলো প্রসব-বেদনা;
আর মহাবিস্ফোরণে আমার জমজ শিশু
বেরিয়ে আসলো এই ধরাধামে।
এমন করেই চলে গেলো কয়েক প্রজন্ম।
এরপর অকস্মাৎ তোমাদের মতন বিকৃত শিশুদের
জন্ম হতে লাগলো-- যে ধারা চলতেই আছে আজো
আর যাকে নিয়ে গর্ব করো তোমরা এখন।
অতএব তোমরাই বলো এখন-- কে টিটকারিযোগ্য
আর উপহাসযোগ্য; আমার এখন যা যা আছে 
অথবা যা নেই, তা যা যা ছিলো আমার
তারই অবশেষ।’
*****

মরণের কোনো জাত নেই

মরণের কোনো জাত নেই, জীবনের আছে ঢের,
আছে উঁচু-নিচু স্তর রঙ-বেরঙের, নানা স্বাদ,
নানা গন্ধ, অন্ধ গলি, আনাচ-কানাচ-- রাস্তা ফের
বন্ধুর। যে হাঁটে অন্ধকারে তার কী যে অপরাধ?
বঞ্চিতের সঞ্চিত সাধনা সদা-ব্যাপৃত সেবায়;
পর ধনে ঋদ্ধ হওয়া চাঁদ জোছনায় মশগুল,
বিস্মিত নক্ষত্রদল শুধু কানাকানি করে যায়।
যে গাছে ফুলেরা ফোটে সে গাছের নয় সেই ফুল
পরিণত কখনো না হলে। মরণের তাই নেই 
কোনো জাত-- হোক না সে সকাল কিংবা অকাল
মৃত্যু, বিকাল অথবা জল মৃত্যু-- সব কিছুতেই
বঞ্চনা, লাঞ্ছনা-- সব জীবনের রূপ, হালচাল।
মরণ কেবল এক বর্ণা, একাকী নিঃসঙ্গ হাতিয়ার,
একাই একশো সে যে। মুহূর্তে হাজার জীবনের
সব রঙ, সব স্বাদ, সব মহাযজ্ঞ নির্বিকার
তার কাছে; তবু থেমে নেই কর্মযজ্ঞ জীবনের।
এখানেই জয় তার এখানেই সব জয়গান
বহুরূপী জীবনের কাছে মৃত্যু তাই যেন ম্লান।

*****


কিস্তিমাত

জীবন ও মরণের মাঝে মায়াবী ফারাকটুকু ঘুচে গেলে পর
প্রবল প্রতাপে সব আয়োজন আচমকা যবনিকাপাতে
চিরতরে নিরুদ্দেশ হয়ে যায়-- গনগনে আগুনে যেন বা
হঠাৎ জলের সুশীতল নিক্ষেপণ।
মুহূর্তের এই সত্যটুকু এতটাই সত্য রয়ে গেছে আজো
তার কাছে জীবনের মহাযজ্ঞ নিমিষেই যেন পরাভূত।
তবুও আগুন জ্বলে-- জ্বলতে সে চায় চিরদিন
ব্রহ্মাণ্ডের সব কাঠ-খড়-তেলকে ইন্ধন করে
এমনকি অন্য সে আগুনে নিজেকে বিলিয়ে দিয়ে
কিংবা অন্য সে আগুন ত্রাস ভরে গ্রাস করে--
সবচেয়ে বেশিদিন জ্বলতে থাকা নক্ষত্রটির
চেয়েও অনেকদিন বেশি জ্বলতে চায় সে ।
কিন্তু হায় ! চিকের আড়ালে কালবেলায় আয়েসে
কে যে বসে চিকা মারে এক এক জীবন-দেয়ালে,
আর সে নির্দেশ মোতাবেক কোন কোন আজ্ঞাবহ দাস
নিজেকে প্রস্তুত রাখে সদা সুশীতল জল নিয়ে হাতে?
কোন সে ঈশ্বর খেলে এখনো এ খেলা ইচ্ছেমতো 
সব জীবনের ঘুঁটি সাজিয়ে সাজিয়ে পৃথিবীর দাবাবোর্ডে?
আর এ কারণে সে কারণে অনিয়মকেই নিয়ম বানিয়ে
হেসে লুটোপুটি খায় অসহায় সব কিস্তিমাতে !

*****


কপোত-হৃদয়ের কান্না

দুধরাজদের মতো লুপ্ত আজ আমাদের কপোত-হৃদয়
যেখানে বসত গেড়ে আছে হাইব্রিড বোধ
যেন পিতরাজ জমিনে য়ূকেলিপ্টাস চাষ।
দোয়েলের মতন বিপন্ন প্রজাতি এখন মানবতা,
শুধু বইয়ের পাতা আর ছবি হয়ে ফেরে যার কথা,
কিংবা গৌড়, পুণ্ড্র বা অশোক আমলের মুদ্রা
হারিয়ে গেছে যা চিরতরে
অথবা চিরনিদ্রায় রয়েছে শায়িত জাদুঘরে;
ঐতিহাসিক মূল্য ব্যতিরেকে যার অন্য কোনো মূল্য নেই আর।

মানবতাই হোক বা কপোত-হৃদয় হোক--
ক্ষমতা, অর্থের কাছে দুটোই এখন যেন
অক্ষমের অন্তিম খুঁটিহীন অবলম্বন,
অচল মনের পোড় খাওয়া জমিনে শ্রাবণ ভান।
যারা পরাভূত পৃথিবীর রুগ্ন প্রতিযোগিতায়,
যারা বাঁচে নিজেদের বিচ্ছিন্ন কুটিরে নিরিবিলি,
যাদের হৃদয় আজ ভারাক্রান্ত সুকুমার বোধে,
যাদের অতল মনে কলকল ছলছল করে চলে আজো
সহস্র বছরের সংক্ষুব্ধ বেদনার নদী,
তাদের হৃদয়েই কেবল এদের আশ্রয় ঠেকনাবিহীন
অতি দূর হতে ফ্যালফ্যাল করে চেয়ে থাকা
এক একটি নিঃসঙ্গ নক্ষত্রের মতো।
কিংবা আদর্শের প্রাণহীন কোনো মহান মূর্তির মতো।

*****


এ জীবন তবে একদিন

এ জীবন তবে একদিন
হাওয়ার সাথে মিলিয়ে যাবে যে নীরবে
আচমকা সূর্যের গ্রহণে, গোধূলির আহ্বানে
নিস্তরঙ্গ পারাবারে, নিশ্চল মরুতে।

কোনো কোলাহল কানে বাজবে না আর
সুমধুর বা বিরক্তিকর।
কোনো বেদনায় দগ্ধ হবে না হৃদয়;
কোনো প্রেমে সিক্ত হবে না তো মন।

হয়তো কখনো দুই-এক ফোঁটা অশ্রু
ঝরবে সে জীবনের স্মৃতি রোমন্থনে
ধরণীর কোনো এক নিভৃত কোণায়।
অথবা চোখের পানি চোখেই শুকাবে।

যমুনার বালুচরে কোনো এক অলস দুপুরে
হয়তো বা কোনো এক স্মৃতিভূক নিঃসঙ্গ বলাকা
নিমগ্ন থাকবে তার স্মৃতির ভোজনে,
অথবা শুনবে কোনো বিষাদিত সুর
ঘুঘুটির কণ্ঠে, চোখ গেলোর প্রথম বেদনায়।

তবু হারানো জীবন যেন ফেরারী আসামী।
অচেনা মহাজনের কাছে নিয়েছিলো ধার
অমূল্য জীবনখানি-- মূল্য পরিশোধ
করার আগেই সে যে ফাঁসির আসামী।
      *****

বেদনার বুনোহাঁস

বেদনার বুনোহাঁস ডানা ঝাপটায় সুগভীর জলে
আর হাওয়া এসে চুমু খায় আলতো শরীরে অনর্গল
যখন সে ভেসে ওঠে কাশফুলের নরম গন্ধ নিয়ে
ঠোঁটে। তবু শিকারীর চোখ তাক করে থাকে তার বুক
আবার কোন নেশায়? চারিদিকে অন্ধকার নামে গাঢ়
সফেদ বকেরা উড়ে যায় তাদের সারির আহ্বানে
বালুচরে ঝরে পড়া মায়াবী শিশির ডাকে ঈশারায়
এক জীবন দূরত্বে। বেদনা বিভ্রান্ত কালা বুনোহাঁস
কেবল হাতড়ে ফেরে নিজের ডানার শব্দ বেপরোয়া।
বৃথা যায়, বৃথা যায় রাত্রির ক্রন্দন শিকারীর কানে;
ভোরের বাতাসে হয়তো বা আর ভাসবে না কভু তার
জীবনের ঘ্রাণ। আর দিনের আলোয় দেবে না ঝিলিক
জলঝাড়া পালকের সব আনন্দ-বেদনা লাগাতার।
কবেকার স্মৃতি এসে আজ বলে যায় যেন অবশেষে--
এমন যে অন্ধকার কবেই দেখেছো আর? কোথাকার?
ধরণীর আয়ুস্কালে সবগুলো অমানিশা মিললেও
একসাথে-- যেন কিছু নয় এর কাছে-- কোনো অন্ধকার।
জগতের সব ব্যথা ছোঁয় যেন তনু শেষ বেদনার
পরাজয়ের পরশে। পায়ে এসে লুটায় যে ম্লান মুখে।
রাতের প্রথম ক্ষণে শিকারী শেষ ট্রিগার টেনে যায়;
নিজ দেহের উত্তাপ নিমিষে লুকায় নিশীথের গর্ভে
বুনোহাঁসের বেদনা তখন শেষ পালকে পড়ে খসে ।

*****


নারী

নারী! তুমি রয়ে গেলে আজো অলঙ্কার
শুধু শোভিত করলে ঘর দোর শয্যা 
আর চৌকাঠ। হাতে যে পরালে কেবল
ফোস্কা, মেহেদীর সীমানায় স্বপ্ন পড়ে
রইলো মুখ থুবড়ে-- উড়াবার আগে।
টিকলিতে মেপে গেলে সারাটি জীবন।
যতটা রইলে নারী তার চেয়ে বেশি
হলে না মানুষ আজো-- থেকে গেলে নারী।
নিজেকে মিশিয়ে দিলে অন্যের ইচ্ছায়,
পুরুষের কামনার অবরুদ্ধ কক্ষে।
স্বর্ণলতার স্বভাব ছাড়লে না কেন
স্বনির্ভরতার গর্বে, আত্মপরিচয়ে?
লাটিম হয়ে যে আজো ঘুরতে থাকলে
পুরুষের বেঁধে দেয়া সুখাভাস বৃত্তে।
হলে না তো হাতিয়ার নিজের জীবনে,
কখনো বদলে দিতে নিজেকে সমাজে;
বরং নিজে হলে হাতিয়ার অপরের ।
তবে অস্ত্র হওয়ার তো প্রয়োজন নেই
নারী-- শুধু হও হাতিয়ার নিজেকেই
কেবল বদলাবার, ছাড়িয়ে যাবার।
দুই একজন গেছে নিজেকে ছাড়িয়ে
চুমেছে যে চূড়া হিমালয়ের শরীরে,
ছুঁয়েছে শিখর অন্য কিছু পর্বতের। 
তাতে বদল হয় না কিছুই তেমন।
বদলে যাও এবার সব বদলাতে
যেন শাসকের শোকে অশোকের চোখ
কলিঙ্গেই ভির্মি খায়। যেন এক ফুঁতে
বিষধর সাপ প্রাণ গুঁজে গর্তে যায়,
সদা পালিয়ে বেড়ায়। যেন আদি নারী
তার গৌরব স্বমহিমায় ফিরে পায়
তোমার হাতের কীর্তি পদচারণায়।
হেলান দেয়ার জন্য স্তম্ভ হও নিজে
পুরুষের মতো আছে তোমারো প্রতঙ্গ।
অন্ধকারের যেমন সয় না আলোক
তোমারো তেমন সয় না স্বনির্ভরতা।
তবু অন্ধকারে আঁকো আলোকের ছবি--
একবার আলোকিত হও, থাকবে না আর
অন্ধকার--যাকে ভেবে নিয়েছো নিয়তি।
তবে জেনে রাখো পরাজিতদের মতো
তোমারো নেই যে কোনো দীপ্ত ইতিহাস।
তাই ইতিহাস গড়ো এবার নিজেই।
তোমাকে জাগাতে এসেছিলো যে রোকেয়া,
সুফিয়া কামাল, সুদূরের ঐ খনা,
নবাব ফয়জুন্নেসা ও জাহানারা ইমাম
এই বাঙলার জমিনে, আনাচে-কানাচে--
শুনলে না সেই ডাক। নেশার নিগড়ে
বাঁধা থাকলে কেবল। দেখলে না রূপ
পৃথিবীর, রাখলে না খোঁজ নক্ষত্রের;
কত কী যে কাণ্ড আরো ঘটছে নিয়ত
সেসব অনুরণন তোলে না হৃদয়ে
তোমার-- ঝংকৃত কোনো সুর-তাল-লয়ে।
শুধু রচে গেলে নষ্ট নীড় কষ্ট করে
আস্ত একটা জীবন অপচয় করে।
     *****

নষ্টোদ্ধার

অনেক তো ভেজালে হে বৃষ্টি-- মাঠ ঘাট
শুকনো জমিন বন বনানী প্রান্তর,
উছলে দিলে পুকুর নদী খাল বিলে
হাজার বছর ধরে-- কখনো স্বেচ্ছায়
কখনো খামখেয়ালীপনার ওজরে।
এবার তবে ভেজাও আমার হৃদয় 
পূর্বপুরুষদের যেমন ভিজিয়েছো 
বেহুঁশ আনন্দে, দিয়েছো যে অবসর
গান রচনার-- বিরহ বিধুর সুরে
দুঃখ ভাসিয়ে দেবার দরাজ গলার
ভাটিয়ালী ভাওয়াইয়া-- কত বর্ষা গীত
যমুনার পারে বান ঠেলা ভেলা চড়ে
কিংবা ভরাট দুপুরে জমাট আড্ডায়।
আমার মন-মরুকে ভেজাও আবার
তেমন করেই শুধু-- দেহ থাক শুষ্ক।
তুমি নামলেই আমি পাবো অবসর,
নাগরিক ঘড় ঘড় গ্নানি থেকে মুক্তি, 
আলস্য উর্বর। দু’হাতে কুড়াবো রূপ
জীবনের শুধু। শুষ্ক হৃদয়ের রস
সেই কবেই না গেছে শুকিয়ে, চৌচির
হয়ে তবু বেঁচে আছে পৃথিবীর পাতে।
এবার ভেজাও জবজবে ফুরসতে।
এভাবে শরীর বেঁচে থাকলেও জেনো
হৃদয় হয় স্বল্পায়ু শরীরের চেয়ে।
আর মৃত হৃদয়ের থাকে না দেবার
কিছুই জগতে। বাকি সময় যে তার
কাটে শুধু নিজেকেই টানা-হেঁচড়ায়। 
******

যারা দিতে পারে ঢের বেশি
যারা দিতে পারে ঢের বেশি পৃথিবীতে
নির্বিঘ্নে বিছাতে পারে আনন্দ-অঞ্চল, 
নিখাদ হৃদয়ে দিতে পারে যে সন্ধান
নিপীত পানের নিধুবন সারাক্ষণ,
ঊষর জমিনে পারে ফসল ফলাতে
খনার মতন কৃষি-জ্ঞান মাথা নিয়ে,
যুদ্ধের অন্তিম চালে বিনম্র বিজয়ে
কোটি মানুষের হাহাকার বুকে ধরে
নিজেদের শেষ রক্ত বিন্দু হাতে ভরে
পারে যে সফল হতে সূর্যের মতন
এক একটি আলোক আঁধারে যেমন;
তারা কেন দূরে বসে থাকে চুপ করে
যথেষ্ট ওপারে চেনা দৃশ্যের বাইরে?
অভিমানে আবরণ ঢেকে ফেলে গাঢ়?
আর যারা ভেবে চলে সেই অভিমান
অক্ষমতার লেবাস পরা প্রজ্ঞা ভান,
তারা তো জানে না বর্তমানে দৃশ্যাবলী
ভবিষ্যতের গর্ভে যে বেদনা জাগায়
তা কালের তারে তারে কী সুর বাজায়--
দুপুরের নৈঃশব্দে নূপুরের ঝংকারে 
রাত একাত-ওকাত বেদনায় পুড়ে
অতীতের মর্মে মর্মে সব কাজে কর্মে
হাড় মড়মড় করে মজ্জাগুলো ঘিরে
কেবলই দহন করে কয়লা বানায়।
      *****



বুনো সুখের সন্ধানে

সারা রাত যুদ্ধ শেষে আসে এক কোঁকড়ানো ভোর-- কাঁধে নিয়ে 
শুধু এক ফোঁটা সুখ, বিধ্বস্ত জমিনে জেঁকে বসে তার ছবি
ক্রমাগত দূর থেকে দূরে, বহুদূরে আরো শতেক জমিনে;
সমস্ত শরীর থাকে শুকনো পাতার মতো পিপাসার্ত মুখ।
বেদানার দানার মতন বিন্দু বিন্দু করে জমে জন্ম নেয়
বেদনার এক আস্ত ঘানিক হৃদয়। বাকি দিনমান জুড়ে
ওপারের ঘেসো ক্ষেতে আকাশ যখন থাকে মেতে দুর্বিনীত
আরো-- অন্য কারো সাথে, তখন প্রেমের সঙ্গদোষে খোয়া যায়
তৃণ নির্জনতা। দ্বিতীয়ার চাঁদের মতন অধরে পড়ে না 
কোনো টোকা আঙ্গুলের, মহুয়া চোখের পাতে চুমু ঝরে না যে
উন্মত্ত-অধীর সুখে। এ বেলায় শুধু চোখে ভেসে ওঠে তার
উদ্বন্ধনের বন্ধনে ঝুলে থাকা স্বস্তি এত বছরের পর;
আর বিষাদের কারখানা তখন কে যেন করে উদ্বোধন 
হৃদয়-নগরে। সেই সময় আগুনঠুঁটো এক পাখি আসে
নরকের মতো নিদারুণ ভালবেসে; আর পাখায় না তুলে
সমস্ত হৃদয় তার ঠোকরায় ঠোঁটে ধরে, আর ফেলে আসে 
আজীবন না দেখার চৌচির শ্মশানে-- শেষ বারের মতন
পুড়ে পুড়ে শেষ তক ভস্মাধার আরো ঋদ্ধ করতেই যেন;
অথচ তার মনের উঠোনে কত না দিন সে যে উঁকি দিয়ে 
গেছে, কতই না মেতেছে নিংড়ানো সুখে, কতবার গেছে একা 
ফেলে-- ভোরের শিউলি ঝরিয়ে আপন মনে শুধু গন্ধটুকু
নিয়ে-- নিখোঁজ নির্দয় বনানী-প্রান্তরে বুনো সুখের সন্ধানে।

*****


চৌত্রিশটা বছরের পারে

চৌত্রিশটা বছরের পারে তাপসের ধ্যান ভেঙে
তবুও তুমি যে এলে প্রত্যাখ্যাত বনানীর কোলে।
জাগ দিয়ে জাগা মনে খসে পড়লে হঠাৎ যেন
এক গুচ্ছ পাটের আঁশের মতো দেহখানি ছেড়ে 
মৌন বনানীর কোলে চৌত্রিশটা বছরের পারে।
আঁশের আশায় ছিন্ন থেকেছে হৃদয় বুক থেকে।
এতদিন উৎকট গন্ধে তার কতজন দিয়ে গেছে
গালাগাল বারে বারে গোপনে কিংবা ওপেনে। আজ
যখন এসেই গেলে অবশেষে, কবিতা আমার!
এত তাড়া কেন? যতদিন নিঃশ্বাসে উড়বে ধূলি
ততদিন থেকে যাও নানা রূপে পৃথিবীকে দিতে
অদেখা রূপের খোঁজ সেই তাপসের দুই চোখে।
তোমাকেই প্রয়োজন বড় বেশি আজ পৃথিবীর
সকল ধূসরিমায় উজ্জ্বল স্ফুলিঙ্গে আলোকিত
করে দিতে তছনছ হওয়া বিধ্বস্ত হৃদয় সব।
তুমি ছিলে না বলেই জানোয়ার সব আজো বাঁচে
পশু হয়ে ধরণীর বুকে। মানুষের সাথে দেখা
হলে ভাবে না যে দেখছে তারা মানুষ এক ধরণীর,
সহজে মেলে না যা অতি সহজে, তন্ন তন্ন খোঁজে
বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের অন্যকোথাও। কেবল ধন্য তারা
পশুর মতন ঘেসো সুখে নাক ডুবে রেখে খেতে।
এলেই যদি বা থেকে যাও তবে চৌত্রিশটা মতো
বছর ধরে অন্তত-- চৌত্রিশ বছরের ওপারে--
যতদিনে পৃথিবীকে ঘোরাবে তুমি চৌত্রিশবার।

*****

যারা শুধু যুগে যুগে চলেছে হুজুগে

যারা শুধু যুগে যুগে চলেছে হুজুগে
ফ্যাশনে-বসনে শুধু সেজেছে যে বেশ,
যুগের যন্ত্রণাটুকু দু’চোখে দেখার
মতো ফুরসত হয় নি এক নিমেষ,
তারা হয়তো পেয়েছে যে অনেক কিছ,
পায় নি কেবল অনন্তের উপভোগ।
জিওল খুঁটির মতো ভার বেয়ে বাঁচে
তাই আত্মাহীন প্রাণ। অনন্তের যোগ
অন্তরে তাদের তাড়া জাগায় নি কোনো।
নগ্ন সভ্যতার খোসাপুরু সুখে তারা 
কেবল হয়েছে আজীবন মাতোয়ারা 
খোসাভূক আনন্দ তিয়াসী আছে যারা।
অথচ খোসায় থাকে ঢাকা আত্মহারা
আসল সুখের বীজ। সভ্যতার শাঁস
থাকে না বাইরে কভু-- নিতে হয় চিনে
তাকে ধ্যানের ভেতরে, করে করে চাষ
জগৎ ও জীবনের জমিন-গহীনে।
তাই যারা পেয়ে গেছে স্বাদ সে শাঁসের
তাদেরই কেবল রয়েছে যে অধিকার
যুগে যুগে এসে এসে শাসন করার
হুজুগে ভুগে যাদের হয়েছে বিকার।
তবু বিকারগ্রস্তরা হুজুগে হুজুর
লেজুড়ে শাসাচ্ছে সব শাঁসভোগী মুখ।
খোসায় শাসায়, শাঁস না শাসায় আজো
পৃথিবীকে-- আর তাই তার চ্যাপ্টা বুক
করে না যে আলিঙ্গন পলাতক সুখ। 
*****


মোহনার মোহনীয় মোহে

এতদিনে জমে রাখা ভালবাসারই সঞ্চয় প্রিয়
এ বেলায় যেন কিছুতেই নিস্ফল না হয়।
সবটুকু পুঁজি বিনিয়োগে রাজি আমি;
তবু এ লগন যেন নিস্ফল না হয়।
আমার সমস্ত আয়ু হয় যদি হোক ক্ষয় নিমেষটুকুর জন্য;
তবু এ লগন যেন নিস্ফল না হয়, প্রিয়।
আমি হারতেও রাজি তোমার প্রেমের কাছে।
যে যাই বলুক ভালবাসার নামটি ধরে,
আমি তো জানি যে ভালবাসা হলো
ভালবেসে হেরে যাওয়া ভালবাসারই মানুষটির কাছে,
কিংবা তার জন্য হেরে যাওয়া অন্য মানুষের কাছে।
পরাজয়ে প্রেম তাই জ্বলে থাকে জ্বলজ্বল,
নেভে যদি নেভে সে যে বিজয়ের গর্বে।
তুমি তো জানোই প্রিয়, জীবনের সবটুকু রস
সময়ের নালা বেয়ে চুঁয়ে চুঁয়ে জমানো থাকে প্রেমের মোহনায়--
মোহনীয় মোহে সঙ্গোপনে দহে সময়ের দেহে।
সেখানে এখন তবে চলো না মাতি ডুব-সাঁতারে
মোক্ষম সময়টুকু ধরে হারানো কাল ফিরে আনি জীবনের।
বিমুখ থাকার মত বিমূঢ় হওয়ার নয় যে সময়,
  চৌচির তৃষ্ণা মেটাতে তবু বিতৃষ্ণা ভান কেন অধর ভরে?

*****


যখন তুমি কিংবা পৃথিবী

যখন তুমি কিংবা পৃথিবী আমায় চলো যে প্রত্যাখ্যান করেই,
যখন এই জীবন করে যে অস্বীকার আমার সব সুখ,
তখন আমি সেই বিষাদ উপভোগ করে চলি গানে
আর দেই যে গড়াগড়ি সে নীরব দুখে-- শুষে নেয় যা
স্পঞ্জের মতন আমার সব বেদনা।
আর আমায় নিয়ে যে যায় স্বাপ্নিক ঘোরে ডুবাতে সে--
সেখান হতে চেনা জগতের বাইরে কোনো এক অচিনে।
তখন সেই দুখ আমার কেবলই সুরে মিশে হয় একাকার
ভারতীয় ধ্র“পদীর মতো মূর্ত কোনো রূপ ছাড়াই,
আর করে যে আমায় রাগ পাখির মতো উড়ে চলে যা।
তখন আমি উড়াল দেই সাঙ্গিতীক আকাশ পারে
কখনো ভেসে থাকি কখনো উপরে চলি;
সেই সময় কোনো বেদনা কিংবা দুঃখ ছুঁতে পারে না যে আমায়
সব কিছুর ঊর্ধ্বে থাকি এই পরম সময়।
হে সঙ্গীত! আজীবনের মতন যেন এভাবে বাঁচি
দুঃখ কিংবা বিষাদে কিংবা কোনো বিপদে।
তোমার মতো নেশাগ্রস্ত করে, সতেজ রূপে অসাড় করে
আর কিছুই পারে না কভু আমার সব বিষাদ মিশে গলিয়ে দিতে।


*****


অমালোকে জাগৃতি
ধেড়ে চাঁদ কেড়ে কেড়ে নিয়েছে জোনাকিদের এতগুলো দিন;
আর মর্মে মেরে বেধড়ক শুধু থেকে গেছে দূরে বহুদিন।
তবুও তিমির অমালোকে জোনাকিরা শুধু আলো দিয়ে গেছে।
কখনো জানে নি তো সে এসব দিনের শেষে আছে দিন এক
যা কেবল অবিরল প্রজ্জ্বলিত করে যায় বাকি দিনগুলো
স্বপ্নের মতন মগ্ন থেকে আর কল্পনার মতো নগ্ন চোখে।
  সেই চোখ ঝলসানো আলোর নাচন ভাসে স্বাপ্নিকের চোখে,
জোনাকিদেরই পাখায়। স্বপন দেখার আগে জ্বলতে যে হয়,
জ্বলার আগের স্বপ্ন কভু স্বপ্ন নয়; জ্বলে জ্বলেই স্বপন
পৃথিবীর বুকে মানুষের সাথে সুমধুর সুরে কথা কয়।
তার আগে ধেড়ে চাঁদ জোনাকিদেরই মতন আমাদের দিন
পাষাণের শানে ধার দিয়ে রাখে-- প্রয়োজনে অপ্রয়োজনের
সকল আয়োজনের গলায় ত্যাগের নামে ছুরি যে বসায়।
আজকের প্রয়োজন আগামীর সবগুলো স্বপন খসায়।
জোনাকিরা তাই জ্বলে আজ আগামীর সেই স্বপ্ন প্রত্যাশায়,
আর ইঁদুর-ছুঁচোরা আজকেই বাঁচে শুধু সব শক্তি ক্ষয়ে;
কালকের কোনো দিন তাদের করে না কভু দিনের সূচনা,
রাতের অতল গহ্বরে কেবল হারিয়ে যায় চিরতরে।

*****


এখন এমনই কাল

এখন এমনই কাল
ঘোড়া চাটে কুত্তার বাল;
কুত্তা চাটে ঘোড়ার নাল
আর বাকি সব ভেড়ার পাল।

এক শিয়াল দেয় হাঁক
বাকি শিয়াল বাধে ঝাঁক
তোলে একই সুর--
মুরগীগুলো কদ্দূর?

কাকেরা করে কা কা--
ঢাকা কর ফাঁকা
আছে যত অবোধ প্রাণী 
চঞ্চু দিয়ে চল টানি।

মশা মাছির রাজত্বে
বেশ আছে দৌরাত্মে
কীট পতঙ্গ সব--
মানুষেরা তাজ্জব।

ফিরে এসেছে জোঁক
এটা নয় কোনো জোক,
জল ছেড়ে ডাঙ্গায় এসে
এখন মানুষের রক্ত চোষে।

*****

.
তবুও নক্ষত্রের পতন হয়

এক একটি নক্ষত্রের পতন হয়
আর ধূলি-ধরার বুকে বেদনার ভস্ম রেখে যায়।
কোটি কোটি বছর ধরে জ্বলে জ্বলে
ছড়িয়েছে আলো মহাবিশ্বে,
সে নীল আলো এখনো পৌঁছায় নি যাদের চোখে
তারা কভু বুঝবে না সে বেদনা।
তবুও নক্ষত্রেরা আলো দিয়ে গেছে
নিজেদের নিঃস্ব, উজাড় করে
মূক, বিমূঢ়দের  অস্ফুট চোখে।
এমন নক্ষত্রেরও তবু পতন হয়।
তবু কবেই যে একদিন সূর্যের মতো
লেগেছিলো গ্রহণ চাঁদের অপচ্ছায়ায়
সেই নক্ষত্রের গায়,
তাই শুধু মনে গেঁথে নিলো 
মর্ত্যরে মানুষ পরম আনন্দে
বিশ্বাসঘাতকতার ছন্দে,
ঢিঢি ফেলে দিলো এ পাড়ায় সে পাড়ায়;
আর ভুলে গেলো সবটুকু ঋণ
জীবন-যাপনে ধার করা সুখ
সেই নক্ষত্রদের কাছে।
এমন অকৃতজ্ঞ মানুষও আছে!

*****


এখনো বেঁচে আছি এই তো বেশ

কেমন আছি-- করো নাকো জিজ্ঞেস
এখনো বেঁচে আছি-- এই তো বেশ
এ ধূলি-ধরার মাঝে অপরূপ রূপের খোঁজে
আজো চলছি অশেষ
এই তো বেশ।
কাঁটার আঁচড়ে সমস্ত শরীরে
বেদনা সংসার করছে বেশ।
তবু যে বেঁচে আছি-- এই তো বেশ।

কেমন আছি-- করো নাকো জিজ্ঞেস
  রোজ কত হাহাকার হৃদয়ে তোলে তোলপাড়
শান্তি থাকে নিরুদ্দেশ।
তবু যে বেঁচে আছি-- এই তো বেশ।
আজ ঘরে ঘরে আছে রূদ্ধতা ভরে
নেই মুক্তির লেশ।
এরও মাঝে বেঁচে আছি-- এই তো বেশ।

কেমন আছি-- করো নাকো জিজ্ঞেস
জীবনের প্রতিটি ক্ষণ মরণ করে শাসন।
কখন যে দেবে আদেশ!
এখনো তবু বেঁচে আছি-- এই তো বেশ।
প্রতিদিন চলার পথে বেঁচে যাই কোনোমতে
আর থাকে শুধু জীবনের রেশ।
তবুও যে বেঁচে আছি-- এই তো বেশ।

কেমন আছি-- করো নাকো জিজ্ঞেস
রাম রহিম জন শুধু স্মৃতিতে এখন
গেছে যে অচিন দেশ।
তবু যে বেঁচে আছি-- এই তো বেশ।
কাছের মানুষ যত সবাই আজ দূরে তত
মনে থাকে দুঃখ-ক্লেশ
তবু যে বেঁচে আছি-- এই তো বেশ।

তবু বেঁচে আছে যারা বেঁচে থাক তারা আরো কিছু কাল,
তবু বাজাক প্রতিটি হৃদয়-তারে আরো কিছু সুর মহাকাল। 
আরো কিছু সুখ আরো কিছু দুঃখ দিয়ে যাক দোলা
আরো কিছু আনন্দ আরো কিছু বেদনা তুলুক ঢেউ, ওরে মনভোলা।
এত যে হাহাকার এত যে অপ্রাপ্তি এত যে ব্যথা
তবু আরো কিছুটা কাল না হয় হোক আরো কিছু কথা
আরো কিছু স্বপ্নের রঙে হোক না লেখা জীবন-গাঁথা।
আর কিছুটা সময় নিজের মতো লতিয়ে উঠি, ওরে আলোক-লতা।
*****


পদ্ম পাতার থালা

গুটিকয়েক পদ্ম পাতা থালার মতো চেয়ে আছে এমন 
আগুন ভরা রোদ্দুরের স্ফুলিঙ্গ যেন বা
আর সফেদ মেঘ ঘাপটি মেরে থাকে যে একা
তার উজল করা চোখের দৃষ্টি স্থির থাকে থালায়
একাকী এক পুকুরে ভাসে দুপুর বেলা দেহ এলিয়ে
সুনীল জলে রোদের সেই প্রাখর্যের চাতুর্য কিছু ধার করে
একপাশের আবছা আলো লুকায় বাকি সব পদ্ম থালা
তবে যে কার খোরাক-নেশা ডাকে এমন নিমন্ত্রণে
মেঘেরা বুঝি এখন হয়ে গেছে অন্যরকম আততায়ী
নতুবা খেলে অনেক বেশি লুকোচুরির খেলা
নইলে যার জন্য এই যে জ্বলজ্বল করছে সাজ
সে কেন আছে এখনো দূরে, দৃশ্য থেকে বাইরে?
*****

প্রসারিত হবো বলে

জীবনকে আর কত ছোট করলে
হৃদয় তোমাদের বড় তৃপ্ত হয়?
সঙ্কুচিত আর করো না আমায়!
জানোই তো সঙ্কোচনে ঘটে বিস্ফোরণ।
তৃণ-সম যদিও আমি
আমারও সাধ আছে অপার অগাধ;
সঙ্কোচণ সীমায় এবার পিঠ নয়,
আত্মা সে আমার দেয়ালে সেঁটে থাকা পোস্টার।
মুক্ত হতে দাও না আমায় এ সময়
রকেটের মতো করে।
তোমাদের মাধ্যাকর্ষণে আটকে রেখো না আর আমায়।
চড়ুইয়ের মতো তোমাদের গৃহকোণে
উপায়ান্তরহীন আশ্রয় নিয়েছি বলেই
ভেবো না যেন তোমাদের আকাঙ্খা বা স্বপ্নে
গড়া আমার জীবন
কিংবা যেমন ইচ্ছে তোমাদের আজ্ঞাবহ দাস।

কী যেন মিলছে না কোথাও!
তবু অপেক্ষায় থাকে যেমন ব্যাটসম্যান
কখনো আজীবন-- ব্যাটে-বলে মেলাতে,
অপেক্ষায় থাকে যেমন কবি 
তাঁর শ্রেষ্ঠ কবিতাখানি লেখার জন্য,
শিল্পী তাঁর সেরা কীর্তিটি রচনায়
তেমনই অপেক্ষায় আঁকড়ে আছি
পিঁপড়ার মতো নাছোড় কামড়ে
আমি-- প্রসারিত হবো বলে।
*****



কৃষ্ণ বিবর হওয়ার আগের বছর

কৃষ্ণ বিবর হওয়ার আগের বছর
শেষ বারের মতন দগ্ধ হওয়ার আগে
স্বাতী নক্ষত্র পৃথিবীর প্রেমিকাদের 
কোনো এক হৃদয়ে খুঁজেছিল শেষ আশ্রয়
পরম নির্ভরতায়।
অশোধিত সে প্রেম আজো ঘোরে ব্রহ্মাণ্ডে
অতৃপ্তির উচ্চারণে।
সেই থেকে পৃথিবীর সকল হৃদয় এখনো
অন্য হৃদয়ে খোঁজে ফেরে আশ্রয় 
অতৃপ্তিকেই চিরন্তন সঙ্গী করে।
সে বোধ, সে হাহাকার বেনামে 
বাসা বাঁধে সকল সহৃদয় আবেগে।
এরপর কেটে গেছে কত যুগ শাসনে
সেই নাম না জানা কীটের অধীনে!
বহু পরে আর্যভট্ট প্রথম এর নাম দিলেন ‘শূন্য’;
সেই শূন্যতা এখনো ঘুমিয়ে থাকে 
আমাদের হৃদয়ে। আর সুযোগ পেলেই
লাফিয়ে ওঠে সময়ে-অসময়ে
সদ্যজাত হিংস্র কোনো শাবকের ন্যায়,
আর আমাদের ছিন্ন, আড়ষ্ট হৃদয়
পুড়ে পুড়ে কুঁড়ে কুঁড়ে খায়
দুঃস্বপ্নের মহাশ্মশানে।

*****


ইন্দ্রিয় ব্যস্ত শুধু ইন্দ্রিয়-বিলাসে 

প্রতিদিন আলো জ্বলে কোথাও না কোথাও
অথচ সে আলো দেখার মতো চোখের আলো
আমাদের নেই।
প্রতিদিন ফুল ফোটে কোথাও না কোথাও
অথচ সে ঘ্রাণ নেয়ার মতো ঘ্রাণেন্দ্রিয়
আমাদের নেই।
প্রতি রাতে নক্ষত্রেরা জীবনের কত কথা বলে যায়
অথচ তাদের কথা শোনার মতো সময়টুকু
আমাদের নেই।
প্রতি রাতে প্রতি প্রাতে কত সঙ্গীত বেজে ওঠে
কোনো না কোনো আকুল কণ্ঠে
অথচ তাতে প্রীত নয় আমাদের হৃদয়
প্রীত হওয়ার যথেষ্ট উপকরণ থাকা সত্ত্বেও।
প্রতিদিন কোনো না কোনো নতুন দৃশ্যের জন্ম হয়
অথচ সেগুলো আমাদের কাছে প্রায় অদৃশ্যই রয়ে যায়
প্রতিদিন ইন্দ্রিয়ের অগোচরে ঘটে কত ইন্দ্রিয়াতীত ঘটনা 
সেসব প্রত্যক্ষণের জন্য কোনো অতীন্দ্রিয়ও 
আমাদের নেই।
ইন্দ্রিয় ব্যস্ত শুধু ইন্দ্রিয়-বিলাসে জীবনের সবটুকু সময় ধরে
মহাজীবন মুখ ফিরিয়ে রয় তাই অভিমান করে।
কৃত্রিম আলোর ঝাঁঝে 
মহাজীবনের আলো আমাদের চোখে ঠেকে বড় বাজে!
*****


প্রেমিক পুরুষ

‘জানি না’ বললেও
ঐ শব্দগুচ্ছে রেখে যাও
তোমার মাতোয়ারা ঘ্রাণ।
আমি পাগল না হয়ে পারি না,
মাতাল না হয়েও পারি না।
আমি যে প্রেমিক পুরুষ।
প্রেমিকেরাই পাগল কিংবা মাতাল হয়
বাকিরা তার অর্থই বোঝে না।
আর যারা বোঝে অথচ প্রেমিক না
তারা প্রতারক, তারা পাষাণ।

‘না’ শব্দটি বললেও
ঐ শব্দে মেখে রাখো সযত্নে
নিষিদ্ধ আহ্বান।
আমি সাড়া না দিয়ে পারি না।
আমি যে প্রেমিক পুরুষ।
ওতে শুনতে পাই আমি
সমুদ্র মন্থনের ডাক।
হাঙর যদিও রয় সেখানে
তবুও সে আমন্ত্রণ 
পায়ে দলে না কোনো প্রেমিক।
আর যারা দলে কিংবা মন্থনে ডরে
তারা প্রেমিক পুরুষ নয়, অন্য পুরুষ।
*****

পত্র জীবন

গেলো বসন্তে এই বনের সমস্ত পাতা
যখন সবেমাত্র জন্মেছিলো
তখন থেকেই সূর্যের আলো
এসে চুমু খেয়ে যাচ্ছে অনবরত
তারপর কেটে গেছে গ্রীষ্ম, বর্ষা
শরৎ, হেমন্ত ---
সূর্যের আলো ছাড়া তাদেরকে 
আর স্পর্শ করে নি কেউ এত নিবিড়ভাবে
যদিও কখনো কখনো বৃষ্টি এসে ভিজিয়ে দিতো 
বাঁধনছুট প্রেমিকার মতো,
যদিও শরৎ এসে কুয়াশার চাদরে মুড়িয়ে দিতো
ঝগড়াটে প্রতিবেশীর মতো,
যদিও বাতাস এসে দোল দিয়ে যেতো
কৈশোরের বন্ধুর মতো।
এরপর শৈশব, কৈশোর, যৌবন পেরিয়ে
আজ যখন তারা বার্ধক্যের সদর দরজায়
তখনও সূর্যই এসে শুধু দেখা করে যায়
আর ছুঁয়ে যায় পরম সোহাগে
আজীবনের সঙ্গীর মতো।
এখন তারা ঝরা পাতা
তবুও সূর্যই তাদের বেদনাকে শুকিয়ে দিয়ে যায়
যাতে তারা তাদের অন্তিম ঠিকানা খুঁজে পায়,
চির শান্তিতে ঘুমাতে পারে জীবনের ওপারে।

*****


অকালবোধন

ঢেউ আছড়ে পড়েছে যতবার
নদীর এপার-ওপার
যতবার হয়েছে একাকার দু’ধার
তোমার প্রেমের ঘাটে নাও ভেড়াবার
ততবার তুমি থেকেছো দূর পার
আর এখন যখন নেইকো জোয়ার
নেই উজান ঢল নাব্যতার
তখন বুঝি সময় হলো তোমার
অমন করে ভালবাসি বলার
মরা নদী পার হওয়ার
এমন প্রেমময় নিবেদন করার
হাতে হাত রেখে চলার
চোখে হারানো প্রেম পুনরুদ্ধার
আর হবে না যে দুজনার
তুমি আমি চাইলেই এবার
সময় কখনো চায় না যে আর
সময় শৃঙ্খলে বাঁধে প্রেম বারবার
সেখানে কারুর নেই কিছু করার
আমি চলি আমার পথে তুমি তোমার
অনেক প্রেমের পরিণতি এমন করুণার
বেহাল বেহালায় বাজে সুর বেদনার
তখন শুধু উছলায় হাহাকার
মরা নদীর এপার-ওপার

*****


যখন চাঁদ দোলে নিশার কোলে

যখন চাঁদ দোলে নিশার কোলে 
নেশা জমে যে নদীর জলে,
যখন বৃষ্টি ঝরে সৃষ্টির তরে
দূর পাড়ার ঐ আঁতুড় ঘরে,
যখন সূর্য তার বৈরী আলো
ব্যস্ত রাখে অন্য কোথাও, 
যখন জঞ্জালের কাঙালেরা  
ঘুমায় যে নীরব নীড়ে,
তখনো কেন তুমি ওগো 
থাকো যে আড়ালে
নিযুত কিলো দূরে 
ত্রস্ত পায়ে একা মনে
কী যে করো কে জানে?
আমি যে তখন মর্মে পুড়ি
নিঃসঙ্গ এই নিধুবনে। 
*****

No comments:

Post a Comment

Pages