মহাত্মার প্রতীক্ষায়
মূল: আর. কে. নারায়ণ
অনুবাদ: শাহীনুর ইসলাম
লেখক পরিচিতি: আর. কে. নারায়ণ(১৯০৬ --২০০১) একজন ভারতীয় লেখক যার কথা-সাহিত্যের অনেকগুলোই কল্পিত নগরী মালগুদির পটভূমিতে লেখা । ভারতীয় সাহিত্যকে ইংরেজি ভাষায় লেখার জন্য মুলক রাজ আনন্দ ও রাজা রাওয়ের সাথে তাঁরও নাম উচ্চারিত হয়। ভারতের ইংরেজি ভাষায় লেখা ঔপন্যাসিকদের মধ্যে শ্রেষ্ঠদের একজন হিসেবে তাকে ধরা হয়। তাঁর উল্লেখযোগ্য কর্ম হচ্ছে “স্বামী এন্ড ফ্রেন্ডস”, “দ্য ব্যাচেলর অব আর্টস”, “দ্য ইংলিশ টিচার”, “দ্য ফাইন্যানশল এক্সপার্ট” ইত্যাদি। কল্পিত নগরী, নৈমিত্তিক জীবনের হাস্যরস ও শক্তি, মানবতাবাদ ইত্যাদির জন্য তাকে উইলিয়াম ফকনারের সাথে তুলনা করা হয়। ষাট বছরেরও বেশি সময় ধরে লেখালেখির জীবনে তিনি নানা সম্মাননা ও পুরস্কার লাভ করেন। এর মধ্যে আছে এসি বেনসন মেডেল, পদ্ম ভূষণ ইত্যাদি। নোবেল পুরস্কারের জন্যও তিনি বেশ কয়েকবার মনোনীত হয়েছিলেন। ভারতীয় সংসদের উচ্চ কক্ষ রাজ্যসভার জন্যও তিনি মনোনীত হয়েছিলেন। আর. কে. নারায়ণ সহজ সরল ভাষায় সাধারণ লোকদের সমাজ ও জীবনের জটিলতা নিয়ে লিখেছেন। সারল্য, পেলব সৌন্দর্য এবং করুণ পরিস্থিতিতেও হাস্যরস ব্যবহার করার দরূণ সমালোচকেরা তাকে ভারতের চেখভ বলেও অভিহিত করেন ।
১
শ্রীরাম যদ্দুর জানে, তার মা যিনি তাকে জন্ম দিতে গিয়ে মারা যান এবং তার বাবা যিনি মেসোপটেমিয়ায় নিহত হন, তারা কিংবদন্তীর কোনো চরিত্র হতে পারতো। যা হোক, এর জন্য তার কাছে তার দেখার জন্য দেয়ালের অনেক উঁচু স্থানে বছরের পর বছর ধরে ফ্রেমে বন্দী তার মায়ের আলোকচিত্রের মত স্পষ্ট প্রমাণ ছিলো। যখন সে আবছা ছবিটি পড়ার মত যথেষ্ট লম্বা হয়, তখন সে তার মায়ের চেহারা নিয়ে সন্তুষ্ট হতে পারেনি। সে চাইতো যদি তাকে ইউরোপিয়ান কোনো রাণীর মত দেখাতো যার গালদুটো ঠিক আপেলের মতো এবং মাথার তরঙ্গায়িত চুলগুলো বাড়ির বিপরীতে ছোট্ট দোকানে ঝুলে থাকা ছবিটার মতো, যে দোকানে সে প্রায়শই তার ঠাকুরমার দেওয়া প্রতিদিনকার টাকা দিয়ে পেপারমিন্ট কিনতে যেতো। অন্ততপক্ষে, তার বাবার সম্পর্কে এসব বারবার মনে হতো। প্রত্যেক মাসের এক তারিখে ডাকপিয়ন তার ঠাকুরমার ঠিকানায় বাদামী, আয়তাকার চিঠি নিয়ে আসতো। চিঠিটা যখন ঠাকুরমার হাতে এসে পৌঁছাতো, তখন তিনি অঝরে কাঁদতেন। আর শ্রীরামের শিশু মন ভাবতো সে চিঠিতে এমন কী থাকতো যা তার চোখ থেকে বেদনার অশ্র“ ঝরাতো। এর অনেক বছর পরেই শুধু সে বুঝতে পারে যে ঠাকুরমা তার জন্য সামরিক পেনশন পাচ্ছিলো। খামটি যখন পেতেন, তখন তিনি শুধু বলেই যেতেন - ‘তোমাকে দেখাশুনা করার জন্য তোমার পেনশন আমাকে খরচ করতে হবে না। খেয়ে পরে বেঁচে থাকার জন্য ভগবান আমাকে অনেক দিয়েছেন।’ তখন তিনি তাদের সারির চতুর্থ বাড়িটির কাছে এটি নিয়ে যেতেন, যে বাড়িটি ‘তহবিল অফিস’ নামে পরিচিত ছিলো (এ নামের অর্থ সে কখনো বুঝত না) এবং এটা বলার জন্য ফিরে আসতেন যে, ‘লাগামহীন নগদ টাকার মত ক্ষণস্থায়ী আর কিছু নেই। যখন তোমার বয়স হবে, তখন এ দিয়ে তুমি যা খুশি করতে পারো।’
**
বিপরীত পাশের দোকানের সেই প্রতিকৃতি তার কিশোর মনকে মুগ্ধ করে রাখতো। দোকানদারের নাম ক্যানি-- যে ছিলো রুক্ষ, বদমেজাজী ও ভয়ংকর প্রকৃতির লোক। সে দোকানে সারাদিন নিতম্বে ভর দিয়ে বসতো, আর খদ্দেরদের দ্রুত জিনিসপত্র বিতরণ করতো। রাত এগারটা পর্যন্ত--যে সময়টা তার দোকান খোলা থাকতো--সে সময় পর্যন্ত তার ফাঁপা কন্ঠস্বরে কাউকে বকাঝঁকা, কারো সাথে কথা কাটাকাটি কিংবা পাওনাদারকে ভয়-ভীতি দেখানোর আওয়াজ শোনা যেতো: ‘তুমি আমাকে কী মনে করো? টাকা ছাড়া আবার আমার কাছে আসার স্পর্ধা তুমি কোত্থেকে পেলে? তমি কী করে ভাবো যে টাকা ছাড়া তুমি আমার কাছ থেকে আবার কেনাকাটা করবে? তাহলে তুমি ভুল করছো। মনে রেখো, তোমার মত দশজনকে আমি একবারে গিলে খেতে পারি।’ বিড়ি, সিগারেট, পানীয় ও কঠিন কথার এই দোকানে কোমল প্রভাব শুধু ছিলো আপেলের মত গাল সমেত ভদ্রমহিলার ছবিটি, যার কোঁকড়ানো চুলগুলো তাঁর মাথার মুকুটের প্রান্ত অবধি ছুঁয়ে যেতো। আর তাঁর চোখগুলো ছিলো বিস্ফারিত ও কৃষ্ণকালো। ‘ঐ চোখদুটো আমার দিকে তাকিয়ে থাকে।’-শ্রীরাম প্রায়শই এমনটা ভাবতো। বই ফিরে দেওয়ার আনন্দে সে এটা সেটা কেনার জন্য বারবার দোকানে যেতো।‘ঐ ছবিটা কার?’- রঙিন পাণীয়তে চুমুক দেওয়ার ফাঁকে ফাঁকে সে একবার জিজ্ঞেস করলো।
‘আমি কী করে জানি?’- ক্যানি উত্তর দিলো। ‘হয়ত কোনো রাণীর হবে, খুব সম্ভবত রাণী ভিক্টোরিয়ার।’ যদিও সে সমান ন্যায্যভাবেই মারিয়া তেরেসা অথবা অ্যান বোলেইন দাবি করতে পারতো।
‘তুমি এর জন্য কত টাকা শোধ করেছিলে?’
‘তুমি কেন ওসব কিছু জানতে চাও?’- একটু বিরক্তির স্বরে ক্যানি বললো। অন্য কেউ হলে সে এতক্ষণে চিৎকার-চেঁচামেচি শুরু করে বলতো, ‘তোমার কাজ শেষ হয়ে থাকলে চলে যাও। ওখানে দাঁড়িয়ে থেকে ডজনে ডজনে প্রশ্ন করো না।’
কিন্তু শ্রীরাম অনন্য একটা জায়গা দখল করে ছিলো। সে একজন ভাল খদ্দের ছিলো, প্রতিদিন অনেক টাকা নগদ শোধ করতো, এবং তার ব্যাংক ব্যালেন্সের জন্য সে সম্মানের দাবীদার ছিলো। সে জিজ্ঞেস করলো, ‘ছবিটা তুমি কোথায় পেয়েছো?’
ক্যানি প্রফুল্ল মেজাজে থাকায় উত্তর দিলো, ‘তুমি পিলাইয়া সরণীর রাজস্ব পরিদর্শক লোকটিকে তো চেনো। তার কাছে আমি অনেক টাকা পেতাম। আমি অনেকদিন অপেক্ষা করেছিলাম, তো একদিন হেঁটে তার বাসায় গিয়ে তার রুমে ঝুঁলে থাকা এই ছবিটা নিয়ে এলাম। এটা আমার প্রাপ্যের কিছু একটা বলতে পারো।’
শ্রীরাম ভীরু মনে ইতস্ততভাবে বললো, ‘যদি তুমি কখনো এটা বিকোতে চাও, তাহলে এর মূল্য আমাকে বলো।’
‘ও হো!’ ক্যানি হেসে বললো। সে দারুণ মেজাজে ছিলো। ‘আমি জানি তুমি প্রভু জমিদারকে তো বটেই, রাণীকেও কিনতে পারো। কিন্তু আমি এটা ছাড়বো না। এটা আমার জন্য সৌভাগ্য বয়ে এনেছে। ছবিটা ওখানে টাঙিয়ে রাখার পর থেকে আমার ব্যবসা দশগুন বৃদ্ধি পেয়েছে।’
**
এক সন্ধ্যায় তার ঠাকুরমা জিজ্ঞেস করলো: ‘তুমি কি জানো কাল কোন নক্ষত্র প্রভাব ফেলবে ?'‘না। আমি কীভাবে জানবো?’ সিমেন্টের তৈরি শীতল জানালার গোবরাটে গা এলিয়ে রাস্তার দিকে দেখতে দেখতে সে বললো। তার যতদুর মনে পড়ে সকাল থেকে সন্ধ্যায় সে ওখানটায় বসে থাকতো। আর যখন তার বয়স এক বছর তখন তার ঠাকুরমা তাকে ওখানটায় বসিয়ে রাখতো এবং বাইরে যাবাহনের চলাচল দেখাতো ; গরুর গাড়ি, ঘোড়ার গাড়ি ও সেই সময়কার প্রথম কিছু মোটরগাড়ি যেগুলো রাস্তায় প্যাঁ-পোঁ ও ঝনঝন করতো। রাস্তায় কী হচ্ছে তা না দেখানো পর্যন্ত তাকে খাওয়ানো যেতো না। সে তার ঠোঁটে এক চামচ ভাত ও দই রেখে চিৎকার করে বলতো: ‘ঐ যে দেখো চমৎকার মোটরগাড়ি। আমাদের ছোট্র রাম কি এতে চড়ে বেড়াবে। আর যখন সে মুখ খুলে রামের নামের উচ্চারনে চোখের পাতা ফেলতো, তখন তিনি ভাতটুকু মুখের ভেতর ঠেলে দিতেন। এই জানালাটায় সে এমনভাবে অভ্যস্ত হয়েছিলো যে যখন সে বড় হলো, তখন কখনো কখনো বই নিয়ে ওখানে বসা ও রাস্তা দেখা ছাড়া সে অন্য কোন বিনোদন খুঁজতো না। তার ঠাকুরমা প্রায়শই এজন্য তাকে বকা দিতো। ঠাকুরমা জিজ্ঞেস করলো: ‘তুমি কেন তোমার বয়সীদের সাথে মেলামেশা করতে যাও না ?’
‘আমি যেখানে আছি সেখানেই বেশ ভাল আছি,’ সে সংক্ষেপে উত্তর দিলো। ‘ঐ জায়গাটা যদি তুমি ত্যাগ করতে, তাহলে তুমি অনেক কিছু দেখতে ও শিখতে পারতে।’ বৃদ্ধ ভদ্রমহিলা তৎক্ষনাৎ জবাব দিলেন। ‘তোমার কি জানা আছে যে তোমার বয়সে তোমার বাবা পঞ্জিকা পড়ে তছনছ করে ফেলেছিলো, আর মুহুর্তেই বলে দিতে পারতো কোন বিশেষ দিনে কোন নক্ষত্র রাজত্ব করছিলো ? ’
‘হয়তো তিনি খুব জ্ঞানী লোক ছিলেন।’ শ্রীরাম সাহসের সাথে বললো।
‘খুবই জ্ঞানী ছিলো। “হয়তো” শব্দটা বলো না।’ ঠাকুরমা শুধরে দিলেন।
‘জানো, আর তোমার ঠাকুরদা কত চালাক ছিলেন! ওরা বলে যে ঠাকুরদার অবতার তার নাতির মধ্যে আছে। তোমার নাক ও ভ্রুগুলো ঠিক তার মতো হয়েছে। তোমার আঙ্গুলগুলোও তার মতো লম্বা। তবে এ পর্যন্তই ! আমি খুব করে চাই যে শুধু তার মগজ ছাড়া তুমি অন্য কিছু যদি না পেতে।’
‘আমার দেখার জন্য তুমি যদি তার একটা ছবি রাখতে, ঠাকুরমা, তাহলে আমি সেটার পূজা করতাম, আর তার মতোই চালাক হতাম।’-শ্রীরাম বললো। এতে বৃদ্ধ মহিলা সন্তুষ্ট হলেন। আর বললেন: ‘কীভাবে এগিয়ে যাবে তা তোমাকে আমি শিখিয়ে দেবো ।’ হল বাতির নিচে ছোট অলোকচিত্রের দিকে তাকে হাত ধরে টেনে নিয়ে তিনি বাদামী কাগজে মোড়া পঞ্জিকাটি তাদের ঢালু ছাদের টাইলস থেকে নিয়ে নিলেন। তারপর মেঝেতে বসে পড়লেন, চশমা না আনা পর্যন্ত চিৎকার করলেন এবং শ্রীরামকে পঞ্জিকা খুলে নির্দিষ্ট একটি পৃষ্ঠা পড়ার জন্য বাধ্য করলেন। এত জটিল জটিল কলামে ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র ও বিভ্রান্তিকর প্রতীকে ভরা ছিলো। ঠাকুরমা শ্রীরামের মুখখানি পৃষ্ঠাটির কাছে ঠেলে দিলেন। ‘তুমি কী করতে চেষ্টা করছো?’ শ্রীরাম করুণভাবে কাকুতি-মিনতি করলো। তিনি একটি অক্ষরের উপর আঙ্গুল রেখে জিজ্ঞেস করলেন: ‘এটা কী?’
‘সা...’ সে পড়লো। ‘এর মানে ‘সাধ্য’। এটাই তোমার জন্ম নক্ষত্র।’ রেখা বরাবর আঙ্গুল সঞ্চালন করে তিনি আগামীকালের তারিখ নির্দেশ করলেন। ‘এই তারিখটা হচ্ছে আগামীকাল, যার মানে এটাই তোমার জন্ম নক্ষত্র। তোমার ২০ তম জন্ম বার্ষিকী হতে যাচ্ছে যদিও তোমার আচরণে মনে হয় তুমি তার অর্ধেক। আমি এটা উদযাপন করবো। তোমার কোনো বন্ধুকে কি তুমি দাওয়াত করতে চাও ?’
‘না, কখনো না,’ শ্রীরাম ইতিবাচকভাবে বললো।
**
পরের দিন সম্পূর্ন একাকী সে তার ২০ তম জন্মদিন পালন করলো। তার মেহমান ও মেজবান বলতে ছিলো ঠাকুরমা। বাইরের কেউ-ই আঁচ করতে পারেনি যে ১৪ নম্বর কবির সরণীর সেই বাড়িটায় কত গুরুত্বপূর্ণ অনুষ্ঠান উদযাপিত হচ্ছিলো। বাড়িটা দুশো বছরেরও বেশি পুরাতন ছিলো এবং তেমনই দেখাতো। ঐ রাস্তায় এটিই শেষ বাড়ি ছিলো, অথবা নির্মাণের সময় তার ঠাকুরমা যেমনটি বলতো ‘প্রথম বাড়ি’। এখান থেকে বাজারের ভবনগুলির পিছনটা দেখা যেতো এবং বাজারের রাস্তায় ঘুরে বেড়ানো বড় বড় জনতার শোরগোল দিন রাত শোনা যেতো। শ্রীরামের বাড়ির পরের ভবনটি ছিলো মুদ্রণ প্রেসের যা সারাদিন ঘট ঘট আওয়াজ করতো। আর এর পাশে ছিলো আরেকটি দু’শো বছরের পুরাতন বাড়ি যেখানে ছয়-ছয়টি গোলমেলে পরিবার বাস করতো। এর ওপারে ছিলো তহবিল অফিস যেখানে ঠাকুরমা তার নাতির টাকা জমা রাখতো। এই বাড়িগুলোর সামনে দিয়ে আঁকা-বাঁকা একটা রাস্তা চলে গিয়েছিলো। বাজার ও উচ্চতর প্রাথমিক শহর বিদ্যালয়, স্থানীয় তহবিল অফিস এবং সর্বোপরি বাজারের ফোয়ারার চারপাশে অর্ধ-ডজন বেঞ্চের সন্নিকটে কবির সরণীর বাড়িগুলো অবস্থিত হওয়ায় এদের মূল্য অনন্য ছিলো বলে শোনা যেতো।
বাড়িগুলো সব একই রকম ছিলো--বিশাল একটি ছাদ রোজউডের তৈরী তন্বী খাম্বা পর্যন্ত নেমে আসতো। আর খাম্বাগুলো ছিলো খোদাইকৃত ও এগুলোর উপর পিতল-অলকৃত কাজ ছিলো। এ ছাড়া গ্রীষ্মকালে জানালার নিচে ইটের তৈরী খোলা যে প্লাটফর্মে পরিবারটি ঘুমাতো সেটি ছিলো বারান্দা। দেয়ালগুলো ছিলো দুই ফুট পুরু, দরজাগুলো ব্রোঞ্জের নবে শত বছরের পুরাতন সেগুন গাছের তক্তা দিয়ে তৈরি ছিলো। আর টালিগুলো ছিলো পোড়া কাদামাটির যা শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে ঝড়-বৃষ্টি উপেক্ষা করে টিকেছিলো। সব বাড়ি একই রকম; আপনি এ প্রান্ত থেকে ও প্রান্তে তন্বী খাম্বাগুলো দেখতে পাবেন এবং টাইলগুলো এমনভাবে ঢালু হয়ে যাচ্ছিলো যেন সবগুলো শুধু একটা বাড়িরই। দুই শতাব্দী আগে এগুলো নির্মিত হওয়ার পর অনেক পরিবর্তন হয়েছিলো। মামলা-মোকদ্দমায় পড়ে অনেক আসল মালিক হেরে যাওয়ায় অনেক বাড়ির হাত বদল হয়েছিলো; কোনো কোনোটা বণিকদের, যেমন- সান প্রেস, বাটার ফ্যাক্টরি বা তহবিল অফিসকে ভাড়া দেওয়া হয়েছিলো। আর মালিকেরা তাদের গ্রামে চলে গিয়েছিলেন অথবা লাওলি এক্সটেনশনে আধুনিক ভিলা নির্মাণ করেছিলেন। কিন্তু এরপরও একটি দু’টি বাড়ি ছিলো যা অতীতের সাথে এক ধরণের ধারাবাহিকতা, যোগাযোগ রক্ষা করে আসছিলো। ১৪ নম্বর বাড়ি ছিলো এমন একটি বাড়ি। সেখানে বংশ-পরিবারের সূচনা হয়েছিলো অনেক শতাব্দী আগে এবং তখনো চলছিলো, যদিও তখন সদস্য সংখ্যা দাঁড়িয়েছিলো শুধু দুই জনে-- শ্রীরাম ও তার ঠাকুরমা।
বাড়িগুলো সব একই রকম ছিলো--বিশাল একটি ছাদ রোজউডের তৈরী তন্বী খাম্বা পর্যন্ত নেমে আসতো। আর খাম্বাগুলো ছিলো খোদাইকৃত ও এগুলোর উপর পিতল-অলকৃত কাজ ছিলো। এ ছাড়া গ্রীষ্মকালে জানালার নিচে ইটের তৈরী খোলা যে প্লাটফর্মে পরিবারটি ঘুমাতো সেটি ছিলো বারান্দা। দেয়ালগুলো ছিলো দুই ফুট পুরু, দরজাগুলো ব্রোঞ্জের নবে শত বছরের পুরাতন সেগুন গাছের তক্তা দিয়ে তৈরি ছিলো। আর টালিগুলো ছিলো পোড়া কাদামাটির যা শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে ঝড়-বৃষ্টি উপেক্ষা করে টিকেছিলো। সব বাড়ি একই রকম; আপনি এ প্রান্ত থেকে ও প্রান্তে তন্বী খাম্বাগুলো দেখতে পাবেন এবং টাইলগুলো এমনভাবে ঢালু হয়ে যাচ্ছিলো যেন সবগুলো শুধু একটা বাড়িরই। দুই শতাব্দী আগে এগুলো নির্মিত হওয়ার পর অনেক পরিবর্তন হয়েছিলো। মামলা-মোকদ্দমায় পড়ে অনেক আসল মালিক হেরে যাওয়ায় অনেক বাড়ির হাত বদল হয়েছিলো; কোনো কোনোটা বণিকদের, যেমন- সান প্রেস, বাটার ফ্যাক্টরি বা তহবিল অফিসকে ভাড়া দেওয়া হয়েছিলো। আর মালিকেরা তাদের গ্রামে চলে গিয়েছিলেন অথবা লাওলি এক্সটেনশনে আধুনিক ভিলা নির্মাণ করেছিলেন। কিন্তু এরপরও একটি দু’টি বাড়ি ছিলো যা অতীতের সাথে এক ধরণের ধারাবাহিকতা, যোগাযোগ রক্ষা করে আসছিলো। ১৪ নম্বর বাড়ি ছিলো এমন একটি বাড়ি। সেখানে বংশ-পরিবারের সূচনা হয়েছিলো অনেক শতাব্দী আগে এবং তখনো চলছিলো, যদিও তখন সদস্য সংখ্যা দাঁড়িয়েছিলো শুধু দুই জনে-- শ্রীরাম ও তার ঠাকুরমা।
**
আঁখের সময় না হওয়া সত্ত্বেও ঠাকুরমা কীভাবে যেন এক গজ লম্বা একটি আঁখ যোগাড় করেছিলেন। তিনি বললেন: ‘বাড়িতে যতক্ষণ এবং যে পর্যন্ত না কোনো আঁখ দেখা যায় সে পর্যন্ত কোনো জন্মদিন সত্যিকারভাবে পালিত হয় না। এটা শুভ ইঙ্গিত বহন করে।’ তিনি দরজার প্রবেশ পথে আমের পাতা সারিবদ্ধভাবে টানালেন, এবং রঙিন চালের গুঁড়া দিয়ে দ্বারপ্রান্ত সজ্জিত করলেন। এক প্রতিবেশি রাস্তা দিয়ে যাওয়ার সময় থেমে জিজ্ঞেস করলেন: ‘কিসের উৎসব? আমাদের বাড়ির চুলার আগুন কি নিভিয়ে দিয়ে আসবো আপনাদের উৎসব-ভোজনে যোগদানের জন্য।’
‘হ্যঁ, বিলকুল। আপনাকে স্বাগতম।’ বৃদ্ধ ভদ্রমহিলা শিষ্টাচারবশত বললেন এবং দাওয়াতটাকে নিরপেক্ষ করার জন্য এও বললেন যে, ‘আপনি তো সবসময় স্বাগতম।’ প্রতিবেশিকে দাওয়াত দিতে না পারায় তিনি দুঃখ বোধ করলেন, কিন্তু তার সেই নিভৃতচারী নাতিই তাকে অন্য কাউকে দাওয়াত দিতে বারণ করেছিলো। সবকিছু তার হাতে ছেড়ে দিলে, তিনি বাঁশি, ড্রাম ও শোভাযাত্রার আয়োজন করতে পারতেন। কেননা এই বিশেষ জন্ম দিনটার ব্যাপারে তিনি সর্বতোভাবে পরিকল্পনা করছিলেন, এই বিশতম জন্ম দিনেই তিনি তার নাতিকে সঞ্চয়ী পাসবইটি হস্তান্তর করবেন এবং ট্রাস্ট পরিত্যাজ্য ঘোষণা করবেন।
‘হ্যঁ, বিলকুল। আপনাকে স্বাগতম।’ বৃদ্ধ ভদ্রমহিলা শিষ্টাচারবশত বললেন এবং দাওয়াতটাকে নিরপেক্ষ করার জন্য এও বললেন যে, ‘আপনি তো সবসময় স্বাগতম।’ প্রতিবেশিকে দাওয়াত দিতে না পারায় তিনি দুঃখ বোধ করলেন, কিন্তু তার সেই নিভৃতচারী নাতিই তাকে অন্য কাউকে দাওয়াত দিতে বারণ করেছিলো। সবকিছু তার হাতে ছেড়ে দিলে, তিনি বাঁশি, ড্রাম ও শোভাযাত্রার আয়োজন করতে পারতেন। কেননা এই বিশেষ জন্ম দিনটার ব্যাপারে তিনি সর্বতোভাবে পরিকল্পনা করছিলেন, এই বিশতম জন্ম দিনেই তিনি তার নাতিকে সঞ্চয়ী পাসবইটি হস্তান্তর করবেন এবং ট্রাস্ট পরিত্যাজ্য ঘোষণা করবেন।
**
চারটে বাড়ি পেরিয়ে ঠাকুরমাকে তহবিল অফিসে সাথে করে নিয়ে যাওয়া দুঃসাহসিক কাজ ছিলো। খোলা আকাশের নিচে তাকে সঙ্কুচিত মনে হলো-- যিনি ১৪ নম্বরের ছাদের নিচের ভূ-দৃশ্যকে শাসন করতেন, খোলা জায়গায় তিনি তার অবস্থা সম্পূর্ণভাবে হারিয়ে ফেললেন।
শ্রীরাম মন্তব্য না করে পারলো না, ‘তোমাকে শিশুর মতো দেখাচ্ছে, ঠাকুরমা।’ ঠাকুরমা কর্কশ আলোয় তার চোখ দু’টো অর্ধ-নিমীলিত করে রেখে ফিসফিস করে বললেন, ‘চুপ! জোরে কথা বলো না, অন্যরা শুনে ফেলতে পারে।’
‘কী শুনবে?’
‘যা-ই শুনুক না কেন। ঘরের কথা শুধু ঘরের লোকদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকতে হবে। অন্যদের মুখ বন্ধ রাখাই ভালো।’
যেন ঠাকুরমার সবচেয়ে নিকৃষ্ট সন্দেহটাকে নিশ্চিত করে ক্যানি তার দোকান থেকে হালকা স্বরে চিৎকার করে বললো: ‘ও হো, ঠাকুরমা ও তার আদরের ধন বাইরে এসেছেন! চমৎকার দৃশ্য! তরুণ ভদ্রলোকটি তো ভালই বড় হয়েছে, ম্যাডাম!’
শ্রীরাম এ প্রশংসায় গর্ববোধ করলো; তাকে টাওয়ারের মতো উচ্চতা বোধ ধরে বসলো। আর স্থির প্রতিজ্ঞ হয়ে ঠোঁট কুঞ্চিত করলো। কিছুক্ষণ আগে ঠাকুরমার দেওয়া বাদামী কেলিকোয় বাঁধা পাসবইটা সে তার ডান হাতে কতকটা নাটকীয় ভঙ্গিতে ধরে রাখলো।
‘ও, তরুণ সুবেদার ঠিক স্কুলে ঠিক বইটা নিয়ে যাচ্ছে।’ ক্যানি মন্তব্য করলো। ‘সে অবশ্যই তার বাবা ও ঠাকুরদার মহত্ত্বকে এক সাথে ধারণ করে বেঁচে থাকবে।’
পদক্ষেপকে আরো বেগবান করে ঠাকুরমা বিড়বিড় করে বললেন, ‘ওখানে দাঁড়িয়ে ঐ লোকটির সাথে কথা বলো না; সে তার মন্তব্যে আমাদেরকে জ্বালিয়ে মারবে; সে জন্য আমি কখনো চাইতাম না যে তোমার ঠাকুরদা বিপরীত পাশের ঐ জায়গাটা বিক্রি করুক। কিন্তু সে ছিলো গোঁয়ার, এত গোঁয়ার একজন মানুষ! সে এই ক্যানিকেও ভালবাসতো যে সে সময় তরুণ ছোঁকড়া ছিলো।’
‘ঠাকুরদা কি কলাও কিনতেন?’
‘কলাই শুধু নয়,’ ক্যানির দোকানে ঠাকুরদার চুরুট কেনার অভ্যাস স্মরণ করে তিনি এক ঝাঁকুনি দিয়ে বললেন। তার ধারণায় চুরুট খাওয়া অবস্থায় কাউকে দেখে ফেলা হীন ব্যাপার। ‘শিশু যেমন চকলেটের কাঠি চুষে খায়!’ এমনকি তাদের বিবাহিত জীবনের মূল সুরের ছন্দপতন ঘটিয়ে তিনি এমন মন্তব্য করতে অভ্যস্ত ছিলেন। তিনি সবসময় ক্যানিকে দোষারোপ করতেন তার স্বামীকে ধূমপানে উৎসাহিত করার জন্য এবং এ ব্যাপারে সামান্য আক্রোশ কখনো তিনি সহ্য করতেন না।
তহবিল অফিসে পৌঁছানোর আগে অন্যান্য প্রতিবেশি তাদের যাত্রাকে ব্যাহত করলো, যারা দরজা দিয়ে উঁকি দিয়ে জানতে চাইলো কোন অসাধারণ জিনিস বৃদ্ধ ভদ্রমহিলাকে তার নাতির সাথে বাইরে বের হতে বাধ্য করলো। তহবিল অফিসের দিকে মাসের প্রথম তারিখে একাকি যাওয়ার অর্থ তারা বুঝতে পেরেছিলো--সেটা বোধগম্য ছিলো। কিন্তু ভদ্রমহিলাটি তরুণটির সহযোগে কেন বাইরে বের হলো, অস্বাভাবিক দৃশ্য-- যার হাতে আবার ব্যাংকের বই?
‘কী!’ একজন ভদ্রমহিলা চিৎকার করে উঠলেন, যিনি ঠাকুরমার সুবিধাপ্রাপ্ত একজন বন্ধু ছিলেন। ‘এর মানে কি এই যে এ ছোঁকড়া নিজেই স্বাধীন একটা অ্যাকাউন্টের মালিক হতে যাচ্ছে?’
‘সে এখন আর ছোঁকড়া নয়,’ বৃদ্ধ মহিলাটি চিৎকার করে বললেন। ‘সে তার নিজের ভার নিজে নেওয়ার মতো যথেষ্ট বড় হয়েছে। আর কতকাল আমি তাকে দেখাশুনা করবো! আমি তো অমর নই। সুযোগ এলে সব দায়-দায়িত্ব ছেড়ে দেওয়া উচিৎ।’ এটা কিছুটা জটিল আবেগের পরোক্ষভাবে প্রকাশ ছিলো, কিন্তু তার বন্ধু এটা তৎক্ষণাৎ বুঝলো বলে মনে হলো। আর তার বাড়ি থেকে এসে চিৎকার করে বললো, ‘তুমি কত জ্ঞানীর মতো কথা বলছো! আজকালকার মেয়েদের তোমার কাছ থেকে শেখা উচিৎ কীভাবে নিজেদেরকে পরিচালিত করতে হবে।’ এ ব্যাপারটি ঠাকুরমাকে এতটাই আনন্দিত করলো যে উনি তার কানে কানে বলার জন্য থামলেন: ‘আমি এ টাকাটার রক্ষক ছিলাম মাত্র। আজ থেকে সে তার নিজের দায়িত্ব নেবে।’
‘জ্ঞানীর কাজই করেছো, জ্ঞানীর কাজই করেছো,’ মহিলাটি চিৎকার করে বললো আর জিজ্ঞেস করলো, ‘সব মিলিয়ে কত?’
‘সে তুমি কখনো জানবে না,’ ঠাকুরমা এই বলে হেঁটে চলে গেলেন। শ্রীরাম, যে আগে ছিলো, জিজ্ঞেস করলো: ‘এটা কেমন, ঠাকুরমা, তুমি থামো আর সবার সাথে কথা বলো! তুমি তাকে কী বলছিলে?’
‘কিছু না,’ তিনি উত্তর দিলেন। ‘তুমি একই নিয়ম অনুসরণ করো, তাহলে তুমি সুখী মানুষ হবে। তোমার ঠাকুরদা কথা বলে নিজের সর্বনাশ করেছিলো। তার ভাল-মন্দ যা-ই ঘটতো, দশ মিনিটের মধ্যে তা শহরের প্রত্যেকে জেনে যেতো; নতুবা তার আত্মা অস্থির হয়ে উঠতো।’
‘কারো কাছে কোনোকিছু গোপন করা উচিৎ হবে কেন?’ ছেলেটি জিজ্ঞেস করলো।
‘কারণ সেটাই বেশি ভালো, ব্যস,’ বৃদ্ধ ভদ্রমহিলা বললেন।
পথের মাঝে এত সব ব্যাঘাতের কারণে ব্যাংকে পৌঁছাতে তাদের দেরি হলো। কাউন্টারে যখন তিনি উপস্থিত হলেন, তখন ঘড়েিত চারটা বাজলো।
‘আপনাকে কি একেবারে শেষ মুহুর্তেই আসতে হবে, ম্যাডাম?’ ম্যানেজার সাহেব জিজ্ঞেস করলেন। ‘আপনার একটু আগে না আসার কি কোনো কারণ আছে?’
‘না, কোনো কারণ নেই,’ ঠাকুরমা বললেন, ‘এই ব্যতীত যে আমি কোনো তরুণ প্রাণী নই যে চট করে চলে আসবো।’ ম্যানেজার সাহেব আর কিছু না বলে উঁচু আসন থেকে নেমে পাশের দরজাটি খুলে দিয়ে তাকে ভেতরে ঢোকালেন।
ব্যাংকের রহস্য সম্পর্কে শ্রীরামের দীক্ষা চলছিলো। ব্যাংকের ম্যানেজার তার পাসবইয়ের শেষ পৃষ্ঠাটি উল্টে বললেন: ‘এখানে কত সংখ্যা দেখতে পারছো?’ শ্রীরাম কিছুক্ষণের জন্য ভাবলো উনি কি তার পাটিগণিতের পরীক্ষা নিচ্ছিলেন, তার ছোটবেলার স্কুলের দিনগুলোতে পাটিগণিতের স্মৃতিশক্তি খুবই ভয়ংকর ছিলো। সে সতর্ক হলো এবং সাহসের সাথে বললো: ‘আটত্রিশ হাজার, পাঁচ শত টাকা, পয়তাল্লিশ পয়সা।’
‘একেবারে ঠিক বলেছো! ঠাকুরমা চিৎকার করে বললো। সে যে বুদ্ধিমত্তা প্রদর্শন করলো তাতে তিনি অবাক বনে গেলেন।
শ্রীরাম বিরক্তিকরভাবে জিজ্ঞেস করলো, ‘তুমি আমাকে কী ভেবেছিলে, ঠাকুরমা? তুমি কি ভেবেছিলে আমি এর জন্যও যোগ্য হবো না?’
‘হ্যাঁ,’ তিনি শান্তভাবে বললেন। ‘পড়ালেখায় তুমি কত ভালো করেছো সেটা বিবেচনা করলে, আমি অন্যরকম কীভাবে ভাবতে পারি!’
ম্যানেজার সাহেব যিনি একজন আপাতমধুর, শান্তিপ্রিয় মানুষ, তিনি প্রসঙ্গান্তরে গিয়ে এইসব বিপজ্জনক এলাকা থেকে তাদের সরিয়ে আনলেন: ‘দেখো বাছা, এই হচ্ছে তোমার সঞ্চয়ী জমা। সপ্তাহে তুমি দু’শো পঞ্চাশ টাকা তুলতে পারো, তার বেশি নয়। এই যে নাও টাকা তোলার ফর্ম। দেখো যেন হারিয়ে ফেলো না, আর কেউ যেন এটা পেয়ে না যায়।’
‘কেন? ঐ ফর্ম দিয়ে কি যে কেউ আমার টাকা তুলতে পারবে?’ ‘সম্ভবত না, কিন্তু টাকার বিষয়ে সব ধরণের সম্ভাব্য সতর্কতা অবলম্বন করা আমাদের দায়িত্ব,’ ম্যানেজার বললেন।
শ্রীরামের এমন প্রশ্নে ঠাকুরমা কোনো কারণে উদ্বেলিত হলেন, ‘ এত প্রশ্ন করো কেন? যদি ম্যানেজার বলেন “ এটা করো,” অথবা “ওটা করো,” তখন তোমার দায়িত্ব সেটা মান্য করা, ব্যস।’
‘আমি যা করছি তা সব সময় জানতে পছন্দ করি,’ শ্রীরাম বললো। এও বললো, ‘এতে কোনো ভুল নেই।’
ঠাকুরমা ম্যানেজারের দিকে ফিরলেন, আর গর্বভরে বললেন, ‘দেখলেন তো বর্তমান প্রজন্মের অবস্থা! ওরা আমাদের মতো নয়। আপনি আমাকে কত বছর ধরে এখানে দেখছেন? আপনি কি কখনো আমাকে কেন অথবা কীভাবে এবং কেন নয়- এসব প্রশ্ন জিজ্ঞেস করতে দেখেছেন?’
ম্যানেজার সাহেব অস্ফুট একটা আওয়াজ তুললেন, অবশ্য তার বৃদ্ধ মক্কেল অথবা নতুন মক্কেলকে অসন্তুষ্ট করার উদ্দেশ্যে নয়। তিনি বৃদ্ধ ভদ্রমহিলার সামনে একটা চিঠি রেখে তার আঙ্গুল দিয়ে চিঠিটার নিচে হালকা আঘাত করে বললেন, ‘অনুগ্রহপূর্বক এখানে স্বাক্ষর করুন। এটা নতুন অধিকারপ্রদান, আর আগের মতো আপনাকে কষ্ট করে এখানে আসতে হবে না।’
‘বিশ বছর পর কী স্বস্তি!’ ঠাকুরমা চিৎকার করে বললেন। যে বিজয়ী কঠিন দৌড়ে বিজয় লাভ করেছে, তার সেই রকম বিজয়োল্লাস ছিলো। এ সবের মানে কী তা শ্রীরাম পুরোটা উপলব্ধি করতে পারেনি, কিন্তু সে একে পুরো হালকাভাবে নিলো। সে শুধু বললো, ‘আমি যদি তুমি হতাম, তাহলে আমি টাকা জমানোর এমন কষ্ট সহ্য করতাম না।’
‘তুমি তো আমি নও, আর সেটাই ঠিক। এই লোক যিনি এত বছর তোমার সম্পত্তি রক্ষা করে আসছেন, তার সামনে এসব কথা বলতে নেই!’
শ্রীরাম তার হাতে রাখা যাদুর খেলনাটা কেমন কাজ করে তা যাচাই করতে চাইলো। সে কলমদানি ধরে দোয়াতে ডুবালো, আর দুই শত পঞ্চাশ টাকা তোলার ফর্মটি দ্রুত পূরণ করলো। এরপর পৃষ্ঠাটি ছিঁড়ে ম্যানেজারের সামনে চ্যালেঞ্জের ভাব নিয়ে ঠেলে দিলো। ‘চলুন দেখি আমি সত্যিই এই টাকার মালিক কিনা!’
তার কর্মকাণ্ডের দ্রুততা ম্যানেজারকে হতভম্ব করে তুললো। তিনি হেসে বললেন: ‘কিন্তু বাছা, তুমি জানো চারটায় আমাদের অফিস বন্ধ হয়, আর নগদ টাকা লেনদেন বন্ধ হয় প্রতিদিন দুইটার আগে। যদি তোমার নগদ টাকা লাগে, যে কোনো কর্ম দিবসে দু’টোর আগে তোমাকে অবশ্যই আসতে হবে। তারিখটা পরিবর্তন করে আগামীকাল এসে টাকাটা তুলে নিও। তুমি কি নিশ্চিত যে প্রথম উত্তোলনই টাকার পুরো অঙ্কটাই তোমার জরুরী ভিত্তিতে চাই?’
‘হ্যাঁ, আমি নিশ্চিত,’ শ্রীরাম বললো। ‘যদি আপনি একবারে দুই শো পঞ্চাশ টাকার বেশি অনুমতি দিতেন, তাহলে আমি আরো বেশি তুলতাম।’
‘তোমার এত টাকা কেন দরকার আমি কি জানতে পারি?’ ঠাকুরমা জিজ্ঞেস করলেন।
‘এটা কি আমার টাকা নয়?’ শ্রীরাম জিজ্ঞেস করলো।
‘তোমারই আবার তোমার না,’ ঠাকুরমা রহস্যজনকভাবে বললেন। ‘মনে রেখো, তুমি তোমার নিজের টাকা দিয়ে কী করবে না করবে তা আমি তোমাকে কখনো জিজ্ঞেস করবো না। এটা তোমার ব্যাপার। তুমি কী করো সেটা জানার মতো তোমার যথেষ্ট বয়স হয়েছে। এ সব ব্যাপারে আমার মাথা ঘামানোর দরকার নেই। কিন্তু আমি তোমাকে জিজ্ঞেস করতে চাই-- শুধু জানার জন্য, ব্যস-- এখন কেন তোমার দুইশো পঞ্চাশ টাকা চাই। আমি জানি এটা তোমার ব্যাপার, কিন্তু একটা কথা মনে রেখো। টাকা খরচ না করলেই মানুষ সব সময় সচ্ছল থাকে। ব্যাংক ব্যালেন্স অক্ষত রাখাই সর্বদা বেশি নিরাপদ।’
‘খাঁটি কথা, একেবারে খাঁটি কথা,’ ব্যাংকের ম্যানেজার স্বর মিলিয়ে বললেন। ‘জ্ঞানের উত্তম বাণী। আমি বলি কী বাছা, কাল এসো,’ ফর্মটি তুলে নিয়ে তিনি বললেন।
ঠাকুরমা ক্ষেপে বললেন: ‘ওটা এখানে দিন,’ তার হাত থেকে কাগজটা ছিনিয়ে নিয়ে বললেন, ‘এটা ঠিক করে পঞ্চাশ করো। তোমার দুই শত পঞ্চাশ নয়, শুধু পঞ্চাশ দরকার। আমি এটা ছিঁড়েই ফেলতাম, কিন্তু তুমি এই প্রথম টাকা তুলতে এসেছো বিধায় আমি কোন অশুভ কাজ করতে চাই না।’
‘আহ্! খুব ভালো কথা, ’ ম্যানেজার সাহেব বললেন। ‘পকেটমাররা আজকাল আশপাশে যেভাবে ঘুরঘুর করে তাতে তুমি যতো কম টাকা তোমার কাছে রাখো ততোই মঙ্গল।’
তিনি কলমটা কালিতে ডুবিয়ে শ্রীরামের হাতে দিলেন: ‘সব ঠিকঠাক করে তোমার পূর্ণ স্বাক্ষর দাও।’
শ্রীরাম মানলো ঠিকই, কিন্তু বিড়বিড় করে বললো: ‘দেখুন! আমি যা সন্দেহ করেছিলাম তাই হয়েছে! টাকার মালিক হওয়ার কথা আমার, কিন্তু আমি যা চাই তা তুলতে পারছি না! দারুণ দৃশ্য!’
ম্যানেজার ফর্মটি ফেরত নিয়ে বললেন: ‘টাকা তুলতে চাইলে কাল সাড়ে দশটায় এসো।’
‘আশা করি ঠাকুরমার সাথে আবার আসার জন্য আপনি আমাকে প্রত্যাশা করবেন না!’ বেশ খানিকটা সন্দেহ-সংশয় ভরে শ্রীরাম বললো।
পরের দিন শ্রীরাম ক্যানির দোকানে দাঁড়িয়ে রঙিন পানীয় ও কলার অর্ডার দিলো। ‘কতো?’ সন্তুষ্ট হওয়ার পর সে জিজ্ঞেস করলো।
‘চার আনা,’ ক্যানি বললো।
শ্রীরাম পকেট থেকে বেশ কয়েকটা টাকার নোট বের করে একটি নোট হাতে রাখলো। সম্পদের যথার্থ প্রদর্শন। ক্যানি ঠিকমতো মুগ্ধ হলো। সে তৎক্ষণাৎ নম্র ও শ্রদ্ধাপূর্ণ হয়ে উঠলো।
‘তোমার পকেট ভালোমতো খুঁজে দেখেছো তো যে কোথাও কোনো কয়েন নেই?’
‘যদি আমার ছোটো ছোটো কয়েন থাকতো, তাহলে কি আমি তোমায় দেবার জন্য বড় একটা নোট বের করতাম?’ শ্রীরাম হামবড়া ভাব নিয়ে বললো।
‘ঠিক আছে, ঠিক আছে।’
ক্যানি নোটটা নিয়ে সঙ্গে সঙ্গে ক্যাশ বাক্সে স্থানান্তর করলো। শ্রীরাম ভাঙতির জন্য অপেক্ষা করতে থাকলো। ক্যানি তখন অন্য খদ্দেরের দিকে মনোযোগ দিলো।
শ্রীরাম বললো, ‘আমাকে ভাঙতি টাকাটা দিলে না কেন?’
ক্যানি বললো: ‘দয়া করে একটু অপেক্ষা করো। তোমাকে আমি কিছু কথা বলবো। দেখো --’
ঠিক তখনই ভ্রাম্যমান একজন চা বিক্রেতা চায়ের কেতলি নিয়ে এক প্যাকেট সিগারেট চাইলো। আর তখন আরো চারজন খদ্দের সেখানে ছিলো। জায়গাটায় ভীড় জমলো এবং ক্যানির খদ্দের প্ল্যাটফর্মের নিচের রাস্তায় দাঁড়িয়ে থেকে শরণার্থীর মতো হাত প্রসারিত করতে হলো। এর মধ্যে শ্রীরাম গোলাপী গালের রাণী যিনি ছাদ থেকে ঝুলে পড়া কলার ছড়ির মধ্য দিয়ে দুনিয়ার দিকে তাকিয়ে আছেন, তার প্রতিকৃতির দিকে এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলো। স্কুলের ছেলেমেয়েরা আসতে থাকলো এবং বোতলের পেপারমিন্টের জন্য শোরগোল পাকালো। ক্যানি সবাইকে যন্ত্রের মতো সেবা প্রদান করলো।
সবাই চলে গেলে শ্রীরাম জিজ্ঞেস করলো, ‘ভাঙতির জন্য আমাকে আর কতক্ষণ অপেক্ষা করাতে চাও?’
‘রাগ করো না, গুরু,’ ক্যানি বললো। সে দীর্ঘ একটা নোট বই বের করে এর উপরের ধুলা ঝেড়ে পুরাতন একটা পৃষ্ঠা বের করলো, আর অঙ্গুলি নির্দেশ করে জিজ্ঞেস করলো, ‘এটা দেখতে পারছো?’
‘হ্যাঁ,’ আজকাল সবাই তাকে সংখ্যা পড়তে বলছে কেন এটা ভেবে সে জবাব দিলো। সে জোরে জোরে পড়লো: ‘নয় টাকা, বারো আনা।’
‘কয়েক বছর হলো তোমার ঠাকুরদার কাছ থেকে ঐ টাকাটা পাই। আমি নিশ্চিত যে তিনি বেঁচে থাকলে শোধ করে যেতেন-- কিন্তু কেউই জানে না মৃত্যু কখন আসে: তুমি জানো, আমি সিঙ্গাপুর থেকে তাকে বিশেষ ধরণের চুরুট এনে দিতাম।’
‘তুমি ঠাকুরমাকে কেন বলোনি?’
‘ঠাকুরমা! আমি না। তোমার ঠাকুরদা এটা মোটেও পছন্দ করতেন না। আমি জানতাম কোনো একদিন তুমি এসে পরিশোধ করে যাবে।’
‘ওহ্,’ শ্রীরাম উদারভাবে বললো। ‘ঠিক আছে সবটাই নিয়ে নাও,’ এই বলে সে যাওয়ার জন্য ঘুরে দাঁড়ালো।
‘এই না হলে যোগ্য নাতি,’ ক্যানি বিড়বিড় করে বললো। ‘এখন বৃদ্ধ মানুষটির আত্মা শান্তিতে ঘুমাতে পারবে।’
‘কিন্তু আত্মা কোথায় অপেক্ষা করতে থাকবে? তুমি কি মনে করো না তিনি অন্য কোথাও পুনর্জন্ম গ্রহণ করে থাকবেন?’ শ্রীরাম বললো।
ক্যানি মৃত্যুর পরের অস্তিত্ব নিয়ে চিন্তা-ভাবনায় নিজেকে জড়াতে চাইলো না, তাই অন্য খদ্দেরদের দিকে মনোযোগ নিবদ্ধ করলো।
যাওয়ার আগে শ্রীরাম বললো, ‘মনে রেখো, যখনই তুমি ছবিটা বেচতে চাও তখনই আমি কিনে নিতে পারি।’
‘নিশ্চয়ই, নিশ্চয়ই। যখন আমার দোকান একেবারে বন্ধ হয়ে যাবে, তখন তোমাকে দেবার কথা মনে করবো, তার আগে নয়: ছবিটা আমার জন্য তাবিজের কাজ করে।’
‘যদি ঐ ভদ্রমহিলার স্বামী এসে ছবিটা দাবি করে, তখন তুমি কী করবে?’ শ্রীরাম জিজ্ঞেস করলো। এতে ক্যানি থেমে কিছুক্ষণের জন্য চিন্তা করলো এর উপায় তখন কী হওয়া উচিৎ হবে।
‘সস্তা-ই আছে, লাগবে নাকি?’
শ্রীরাম এটা ভালো করে দেখলো। এটা বাসায় রাখার মতো জিনিস মনে হলো। এটার লাল ডোরাকাটা ক্যানভাসের আসন ছিলো এবং ভাঁজ করা যেতো। বাসায় কোনো আসবাবপত্র নেই বললেই চলে।
‘দশ টাকা স্যার, আসল সেগুন কাঠের তৈরী।’
শ্রীরাম আগ্রহভরে দেখলো যদিও রোজউড ও সেগুন কাঠ অথবা অন্য কোনো কাঠের মধ্যে তফাৎ দেখতে পায়নি সে।
‘আসল সেগুন কাঠ তো?’ সে জিজ্ঞেস করলো।
‘গ্যারান্টি দেওয়া মেমপি পাহাড়ের সেগুন, স্যার, এ জন্য এর দাম দশ টাকা: জঙ্গলের সাধারণ কাঠ হলে চার টাকায় পেতেন।’
‘সাত টাকা দেবো,’ অন্যদিকে তাকিয়ে দফা রফার ভাব নিয়ে শ্রীরাম বললো। তার লেনদেনের আর আগ্রহ নেই এমন ভান করলো। লোকটি আট টাকায় নেমে আসলো। শ্রীরাম তাকে অতিরিক্ত পঞ্চাশ পয়সা দিতে চাইলো যদি সে তার দরজা পর্যন্ত এটা পৌঁছিয়ে দেয়।
ঠাকুরমা দরজা খুলে বিস্ময়ে জিজ্ঞেস করলো, ‘এটা কী?’
শ্রীরাম ক্যানভাসের চেয়ারখানা হলের মাঝখানে স্থাপন করে বললো, ‘এটা তোমার উপহার, ঠাকুরমা।’
‘কী! আমার জন্য!’ তিনি ক্যানভাসটি ভালো করে দেখে বললেন, ‘এটা আমার কোনো কাজে আসবে না। এটা তো চামড়ার তৈরী, সম্ভবত গরুর চামড়া, আর এর উপর বসে আমি নিজেকে নোংরা করতে পারি না। তুমি কেনার আগে যদি আমাকে বলতে!’
শ্রীরাম আগ্রহের সাথে ভালোভাবে চেয়ারটি দেখে ধুলা পরিস্কার করলো এবং হাতের তালু দিয়ে টোকা মেরে বললো, ‘এটা তো চামড়া নয়, ঠাকুরমা, এটা স্রেফ ক্যানভাস।’
‘ক্যানভাস কী দিয়ে তৈরী হয়?’ তিনি জিজ্ঞেস করলেন।
শ্রীরাম বললো, ‘আমার তো কোনো ধারণা নেই, ’ আর তিনি উত্তরটা শেষ করলেন এই বলে, ‘চামড়ার আরেক নাম হচ্ছে ক্যানভাস। আমি এটা চাই না। তুমি চাইলে তুমিই এর উপর ঘুমাও।’
সে তার এই উপদেশটা মেনে চললো। সারাদিন সে এই ক্যানভাসের আসনে বসে আরাম করলো আর ছাদের দিকে তাকালো অথবা পৌরসভার গ্রন্থাগার থেকে ধার করে আনা ছেঁড়া একটি উপন্যাস পড়লো। সন্ধ্যা ঘনিয়ে আসলে সে বোম্বে আনন্দ ভবান পরিদর্শন করলো এবং অনেক মিষ্টি-টিষ্টির অর্ডার দিলো ও কফি দিয়ে গিলে খেলো। এরপর রঙিন নারিকেলের রঙিন টুকরায় ঢাকা খিলিপান হাতে তুলে নিয়ে পরম তৃপ্তিতে চিবোতে লাগলো। আর নদীর ধারে পায়চারী করতে অথবা রিগাল পিকচার প্যালেসে তামিল ছবি দেখতে গেলো।
এই শান্ত, অবিচল অবস্থা পরবর্তী চার বছর ধরে অবিরাম চলতে থাকলো, এ পরিকল্পনায় সময় কাটানোটা কদাচিৎ পরিলক্ষিত হতো-- শুধু এই ব্যতীত যে যখন সে ঋতুর একটা নয় আরেকটা উৎসব হাজির হতো এবং ঠাকুরমা চাইতো সে বাজার থেকে কিছু একটা আনুক। ‘আরেক দসরা!’ অথবা ‘আরেক দীপালি! মনে হয় যেন এইতো গতকাল আমি বাজি ফুটিয়েছি!’ সময় দ্রুত চলে যাওয়ায় বিস্মিত হয়ে সে চিৎকার করে বলতো।
শ্রীরাম মন্তব্য না করে পারলো না, ‘তোমাকে শিশুর মতো দেখাচ্ছে, ঠাকুরমা।’ ঠাকুরমা কর্কশ আলোয় তার চোখ দু’টো অর্ধ-নিমীলিত করে রেখে ফিসফিস করে বললেন, ‘চুপ! জোরে কথা বলো না, অন্যরা শুনে ফেলতে পারে।’
‘কী শুনবে?’
‘যা-ই শুনুক না কেন। ঘরের কথা শুধু ঘরের লোকদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকতে হবে। অন্যদের মুখ বন্ধ রাখাই ভালো।’
যেন ঠাকুরমার সবচেয়ে নিকৃষ্ট সন্দেহটাকে নিশ্চিত করে ক্যানি তার দোকান থেকে হালকা স্বরে চিৎকার করে বললো: ‘ও হো, ঠাকুরমা ও তার আদরের ধন বাইরে এসেছেন! চমৎকার দৃশ্য! তরুণ ভদ্রলোকটি তো ভালই বড় হয়েছে, ম্যাডাম!’
শ্রীরাম এ প্রশংসায় গর্ববোধ করলো; তাকে টাওয়ারের মতো উচ্চতা বোধ ধরে বসলো। আর স্থির প্রতিজ্ঞ হয়ে ঠোঁট কুঞ্চিত করলো। কিছুক্ষণ আগে ঠাকুরমার দেওয়া বাদামী কেলিকোয় বাঁধা পাসবইটা সে তার ডান হাতে কতকটা নাটকীয় ভঙ্গিতে ধরে রাখলো।
‘ও, তরুণ সুবেদার ঠিক স্কুলে ঠিক বইটা নিয়ে যাচ্ছে।’ ক্যানি মন্তব্য করলো। ‘সে অবশ্যই তার বাবা ও ঠাকুরদার মহত্ত্বকে এক সাথে ধারণ করে বেঁচে থাকবে।’
পদক্ষেপকে আরো বেগবান করে ঠাকুরমা বিড়বিড় করে বললেন, ‘ওখানে দাঁড়িয়ে ঐ লোকটির সাথে কথা বলো না; সে তার মন্তব্যে আমাদেরকে জ্বালিয়ে মারবে; সে জন্য আমি কখনো চাইতাম না যে তোমার ঠাকুরদা বিপরীত পাশের ঐ জায়গাটা বিক্রি করুক। কিন্তু সে ছিলো গোঁয়ার, এত গোঁয়ার একজন মানুষ! সে এই ক্যানিকেও ভালবাসতো যে সে সময় তরুণ ছোঁকড়া ছিলো।’
‘ঠাকুরদা কি কলাও কিনতেন?’
‘কলাই শুধু নয়,’ ক্যানির দোকানে ঠাকুরদার চুরুট কেনার অভ্যাস স্মরণ করে তিনি এক ঝাঁকুনি দিয়ে বললেন। তার ধারণায় চুরুট খাওয়া অবস্থায় কাউকে দেখে ফেলা হীন ব্যাপার। ‘শিশু যেমন চকলেটের কাঠি চুষে খায়!’ এমনকি তাদের বিবাহিত জীবনের মূল সুরের ছন্দপতন ঘটিয়ে তিনি এমন মন্তব্য করতে অভ্যস্ত ছিলেন। তিনি সবসময় ক্যানিকে দোষারোপ করতেন তার স্বামীকে ধূমপানে উৎসাহিত করার জন্য এবং এ ব্যাপারে সামান্য আক্রোশ কখনো তিনি সহ্য করতেন না।
তহবিল অফিসে পৌঁছানোর আগে অন্যান্য প্রতিবেশি তাদের যাত্রাকে ব্যাহত করলো, যারা দরজা দিয়ে উঁকি দিয়ে জানতে চাইলো কোন অসাধারণ জিনিস বৃদ্ধ ভদ্রমহিলাকে তার নাতির সাথে বাইরে বের হতে বাধ্য করলো। তহবিল অফিসের দিকে মাসের প্রথম তারিখে একাকি যাওয়ার অর্থ তারা বুঝতে পেরেছিলো--সেটা বোধগম্য ছিলো। কিন্তু ভদ্রমহিলাটি তরুণটির সহযোগে কেন বাইরে বের হলো, অস্বাভাবিক দৃশ্য-- যার হাতে আবার ব্যাংকের বই?
‘কী!’ একজন ভদ্রমহিলা চিৎকার করে উঠলেন, যিনি ঠাকুরমার সুবিধাপ্রাপ্ত একজন বন্ধু ছিলেন। ‘এর মানে কি এই যে এ ছোঁকড়া নিজেই স্বাধীন একটা অ্যাকাউন্টের মালিক হতে যাচ্ছে?’
‘সে এখন আর ছোঁকড়া নয়,’ বৃদ্ধ মহিলাটি চিৎকার করে বললেন। ‘সে তার নিজের ভার নিজে নেওয়ার মতো যথেষ্ট বড় হয়েছে। আর কতকাল আমি তাকে দেখাশুনা করবো! আমি তো অমর নই। সুযোগ এলে সব দায়-দায়িত্ব ছেড়ে দেওয়া উচিৎ।’ এটা কিছুটা জটিল আবেগের পরোক্ষভাবে প্রকাশ ছিলো, কিন্তু তার বন্ধু এটা তৎক্ষণাৎ বুঝলো বলে মনে হলো। আর তার বাড়ি থেকে এসে চিৎকার করে বললো, ‘তুমি কত জ্ঞানীর মতো কথা বলছো! আজকালকার মেয়েদের তোমার কাছ থেকে শেখা উচিৎ কীভাবে নিজেদেরকে পরিচালিত করতে হবে।’ এ ব্যাপারটি ঠাকুরমাকে এতটাই আনন্দিত করলো যে উনি তার কানে কানে বলার জন্য থামলেন: ‘আমি এ টাকাটার রক্ষক ছিলাম মাত্র। আজ থেকে সে তার নিজের দায়িত্ব নেবে।’
‘জ্ঞানীর কাজই করেছো, জ্ঞানীর কাজই করেছো,’ মহিলাটি চিৎকার করে বললো আর জিজ্ঞেস করলো, ‘সব মিলিয়ে কত?’
‘সে তুমি কখনো জানবে না,’ ঠাকুরমা এই বলে হেঁটে চলে গেলেন। শ্রীরাম, যে আগে ছিলো, জিজ্ঞেস করলো: ‘এটা কেমন, ঠাকুরমা, তুমি থামো আর সবার সাথে কথা বলো! তুমি তাকে কী বলছিলে?’
‘কিছু না,’ তিনি উত্তর দিলেন। ‘তুমি একই নিয়ম অনুসরণ করো, তাহলে তুমি সুখী মানুষ হবে। তোমার ঠাকুরদা কথা বলে নিজের সর্বনাশ করেছিলো। তার ভাল-মন্দ যা-ই ঘটতো, দশ মিনিটের মধ্যে তা শহরের প্রত্যেকে জেনে যেতো; নতুবা তার আত্মা অস্থির হয়ে উঠতো।’
‘কারো কাছে কোনোকিছু গোপন করা উচিৎ হবে কেন?’ ছেলেটি জিজ্ঞেস করলো।
‘কারণ সেটাই বেশি ভালো, ব্যস,’ বৃদ্ধ ভদ্রমহিলা বললেন।
পথের মাঝে এত সব ব্যাঘাতের কারণে ব্যাংকে পৌঁছাতে তাদের দেরি হলো। কাউন্টারে যখন তিনি উপস্থিত হলেন, তখন ঘড়েিত চারটা বাজলো।
‘আপনাকে কি একেবারে শেষ মুহুর্তেই আসতে হবে, ম্যাডাম?’ ম্যানেজার সাহেব জিজ্ঞেস করলেন। ‘আপনার একটু আগে না আসার কি কোনো কারণ আছে?’
‘না, কোনো কারণ নেই,’ ঠাকুরমা বললেন, ‘এই ব্যতীত যে আমি কোনো তরুণ প্রাণী নই যে চট করে চলে আসবো।’ ম্যানেজার সাহেব আর কিছু না বলে উঁচু আসন থেকে নেমে পাশের দরজাটি খুলে দিয়ে তাকে ভেতরে ঢোকালেন।
ব্যাংকের রহস্য সম্পর্কে শ্রীরামের দীক্ষা চলছিলো। ব্যাংকের ম্যানেজার তার পাসবইয়ের শেষ পৃষ্ঠাটি উল্টে বললেন: ‘এখানে কত সংখ্যা দেখতে পারছো?’ শ্রীরাম কিছুক্ষণের জন্য ভাবলো উনি কি তার পাটিগণিতের পরীক্ষা নিচ্ছিলেন, তার ছোটবেলার স্কুলের দিনগুলোতে পাটিগণিতের স্মৃতিশক্তি খুবই ভয়ংকর ছিলো। সে সতর্ক হলো এবং সাহসের সাথে বললো: ‘আটত্রিশ হাজার, পাঁচ শত টাকা, পয়তাল্লিশ পয়সা।’
‘একেবারে ঠিক বলেছো! ঠাকুরমা চিৎকার করে বললো। সে যে বুদ্ধিমত্তা প্রদর্শন করলো তাতে তিনি অবাক বনে গেলেন।
শ্রীরাম বিরক্তিকরভাবে জিজ্ঞেস করলো, ‘তুমি আমাকে কী ভেবেছিলে, ঠাকুরমা? তুমি কি ভেবেছিলে আমি এর জন্যও যোগ্য হবো না?’
‘হ্যাঁ,’ তিনি শান্তভাবে বললেন। ‘পড়ালেখায় তুমি কত ভালো করেছো সেটা বিবেচনা করলে, আমি অন্যরকম কীভাবে ভাবতে পারি!’
ম্যানেজার সাহেব যিনি একজন আপাতমধুর, শান্তিপ্রিয় মানুষ, তিনি প্রসঙ্গান্তরে গিয়ে এইসব বিপজ্জনক এলাকা থেকে তাদের সরিয়ে আনলেন: ‘দেখো বাছা, এই হচ্ছে তোমার সঞ্চয়ী জমা। সপ্তাহে তুমি দু’শো পঞ্চাশ টাকা তুলতে পারো, তার বেশি নয়। এই যে নাও টাকা তোলার ফর্ম। দেখো যেন হারিয়ে ফেলো না, আর কেউ যেন এটা পেয়ে না যায়।’
‘কেন? ঐ ফর্ম দিয়ে কি যে কেউ আমার টাকা তুলতে পারবে?’ ‘সম্ভবত না, কিন্তু টাকার বিষয়ে সব ধরণের সম্ভাব্য সতর্কতা অবলম্বন করা আমাদের দায়িত্ব,’ ম্যানেজার বললেন।
শ্রীরামের এমন প্রশ্নে ঠাকুরমা কোনো কারণে উদ্বেলিত হলেন, ‘ এত প্রশ্ন করো কেন? যদি ম্যানেজার বলেন “ এটা করো,” অথবা “ওটা করো,” তখন তোমার দায়িত্ব সেটা মান্য করা, ব্যস।’
‘আমি যা করছি তা সব সময় জানতে পছন্দ করি,’ শ্রীরাম বললো। এও বললো, ‘এতে কোনো ভুল নেই।’
ঠাকুরমা ম্যানেজারের দিকে ফিরলেন, আর গর্বভরে বললেন, ‘দেখলেন তো বর্তমান প্রজন্মের অবস্থা! ওরা আমাদের মতো নয়। আপনি আমাকে কত বছর ধরে এখানে দেখছেন? আপনি কি কখনো আমাকে কেন অথবা কীভাবে এবং কেন নয়- এসব প্রশ্ন জিজ্ঞেস করতে দেখেছেন?’
ম্যানেজার সাহেব অস্ফুট একটা আওয়াজ তুললেন, অবশ্য তার বৃদ্ধ মক্কেল অথবা নতুন মক্কেলকে অসন্তুষ্ট করার উদ্দেশ্যে নয়। তিনি বৃদ্ধ ভদ্রমহিলার সামনে একটা চিঠি রেখে তার আঙ্গুল দিয়ে চিঠিটার নিচে হালকা আঘাত করে বললেন, ‘অনুগ্রহপূর্বক এখানে স্বাক্ষর করুন। এটা নতুন অধিকারপ্রদান, আর আগের মতো আপনাকে কষ্ট করে এখানে আসতে হবে না।’
‘বিশ বছর পর কী স্বস্তি!’ ঠাকুরমা চিৎকার করে বললেন। যে বিজয়ী কঠিন দৌড়ে বিজয় লাভ করেছে, তার সেই রকম বিজয়োল্লাস ছিলো। এ সবের মানে কী তা শ্রীরাম পুরোটা উপলব্ধি করতে পারেনি, কিন্তু সে একে পুরো হালকাভাবে নিলো। সে শুধু বললো, ‘আমি যদি তুমি হতাম, তাহলে আমি টাকা জমানোর এমন কষ্ট সহ্য করতাম না।’
‘তুমি তো আমি নও, আর সেটাই ঠিক। এই লোক যিনি এত বছর তোমার সম্পত্তি রক্ষা করে আসছেন, তার সামনে এসব কথা বলতে নেই!’
শ্রীরাম তার হাতে রাখা যাদুর খেলনাটা কেমন কাজ করে তা যাচাই করতে চাইলো। সে কলমদানি ধরে দোয়াতে ডুবালো, আর দুই শত পঞ্চাশ টাকা তোলার ফর্মটি দ্রুত পূরণ করলো। এরপর পৃষ্ঠাটি ছিঁড়ে ম্যানেজারের সামনে চ্যালেঞ্জের ভাব নিয়ে ঠেলে দিলো। ‘চলুন দেখি আমি সত্যিই এই টাকার মালিক কিনা!’
তার কর্মকাণ্ডের দ্রুততা ম্যানেজারকে হতভম্ব করে তুললো। তিনি হেসে বললেন: ‘কিন্তু বাছা, তুমি জানো চারটায় আমাদের অফিস বন্ধ হয়, আর নগদ টাকা লেনদেন বন্ধ হয় প্রতিদিন দুইটার আগে। যদি তোমার নগদ টাকা লাগে, যে কোনো কর্ম দিবসে দু’টোর আগে তোমাকে অবশ্যই আসতে হবে। তারিখটা পরিবর্তন করে আগামীকাল এসে টাকাটা তুলে নিও। তুমি কি নিশ্চিত যে প্রথম উত্তোলনই টাকার পুরো অঙ্কটাই তোমার জরুরী ভিত্তিতে চাই?’
‘হ্যাঁ, আমি নিশ্চিত,’ শ্রীরাম বললো। ‘যদি আপনি একবারে দুই শো পঞ্চাশ টাকার বেশি অনুমতি দিতেন, তাহলে আমি আরো বেশি তুলতাম।’
‘তোমার এত টাকা কেন দরকার আমি কি জানতে পারি?’ ঠাকুরমা জিজ্ঞেস করলেন।
‘এটা কি আমার টাকা নয়?’ শ্রীরাম জিজ্ঞেস করলো।
‘তোমারই আবার তোমার না,’ ঠাকুরমা রহস্যজনকভাবে বললেন। ‘মনে রেখো, তুমি তোমার নিজের টাকা দিয়ে কী করবে না করবে তা আমি তোমাকে কখনো জিজ্ঞেস করবো না। এটা তোমার ব্যাপার। তুমি কী করো সেটা জানার মতো তোমার যথেষ্ট বয়স হয়েছে। এ সব ব্যাপারে আমার মাথা ঘামানোর দরকার নেই। কিন্তু আমি তোমাকে জিজ্ঞেস করতে চাই-- শুধু জানার জন্য, ব্যস-- এখন কেন তোমার দুইশো পঞ্চাশ টাকা চাই। আমি জানি এটা তোমার ব্যাপার, কিন্তু একটা কথা মনে রেখো। টাকা খরচ না করলেই মানুষ সব সময় সচ্ছল থাকে। ব্যাংক ব্যালেন্স অক্ষত রাখাই সর্বদা বেশি নিরাপদ।’
‘খাঁটি কথা, একেবারে খাঁটি কথা,’ ব্যাংকের ম্যানেজার স্বর মিলিয়ে বললেন। ‘জ্ঞানের উত্তম বাণী। আমি বলি কী বাছা, কাল এসো,’ ফর্মটি তুলে নিয়ে তিনি বললেন।
ঠাকুরমা ক্ষেপে বললেন: ‘ওটা এখানে দিন,’ তার হাত থেকে কাগজটা ছিনিয়ে নিয়ে বললেন, ‘এটা ঠিক করে পঞ্চাশ করো। তোমার দুই শত পঞ্চাশ নয়, শুধু পঞ্চাশ দরকার। আমি এটা ছিঁড়েই ফেলতাম, কিন্তু তুমি এই প্রথম টাকা তুলতে এসেছো বিধায় আমি কোন অশুভ কাজ করতে চাই না।’
‘আহ্! খুব ভালো কথা, ’ ম্যানেজার সাহেব বললেন। ‘পকেটমাররা আজকাল আশপাশে যেভাবে ঘুরঘুর করে তাতে তুমি যতো কম টাকা তোমার কাছে রাখো ততোই মঙ্গল।’
তিনি কলমটা কালিতে ডুবিয়ে শ্রীরামের হাতে দিলেন: ‘সব ঠিকঠাক করে তোমার পূর্ণ স্বাক্ষর দাও।’
শ্রীরাম মানলো ঠিকই, কিন্তু বিড়বিড় করে বললো: ‘দেখুন! আমি যা সন্দেহ করেছিলাম তাই হয়েছে! টাকার মালিক হওয়ার কথা আমার, কিন্তু আমি যা চাই তা তুলতে পারছি না! দারুণ দৃশ্য!’
ম্যানেজার ফর্মটি ফেরত নিয়ে বললেন: ‘টাকা তুলতে চাইলে কাল সাড়ে দশটায় এসো।’
‘আশা করি ঠাকুরমার সাথে আবার আসার জন্য আপনি আমাকে প্রত্যাশা করবেন না!’ বেশ খানিকটা সন্দেহ-সংশয় ভরে শ্রীরাম বললো।
পরের দিন শ্রীরাম ক্যানির দোকানে দাঁড়িয়ে রঙিন পানীয় ও কলার অর্ডার দিলো। ‘কতো?’ সন্তুষ্ট হওয়ার পর সে জিজ্ঞেস করলো।
‘চার আনা,’ ক্যানি বললো।
শ্রীরাম পকেট থেকে বেশ কয়েকটা টাকার নোট বের করে একটি নোট হাতে রাখলো। সম্পদের যথার্থ প্রদর্শন। ক্যানি ঠিকমতো মুগ্ধ হলো। সে তৎক্ষণাৎ নম্র ও শ্রদ্ধাপূর্ণ হয়ে উঠলো।
‘তোমার পকেট ভালোমতো খুঁজে দেখেছো তো যে কোথাও কোনো কয়েন নেই?’
‘যদি আমার ছোটো ছোটো কয়েন থাকতো, তাহলে কি আমি তোমায় দেবার জন্য বড় একটা নোট বের করতাম?’ শ্রীরাম হামবড়া ভাব নিয়ে বললো।
‘ঠিক আছে, ঠিক আছে।’
ক্যানি নোটটা নিয়ে সঙ্গে সঙ্গে ক্যাশ বাক্সে স্থানান্তর করলো। শ্রীরাম ভাঙতির জন্য অপেক্ষা করতে থাকলো। ক্যানি তখন অন্য খদ্দেরের দিকে মনোযোগ দিলো।
শ্রীরাম বললো, ‘আমাকে ভাঙতি টাকাটা দিলে না কেন?’
ক্যানি বললো: ‘দয়া করে একটু অপেক্ষা করো। তোমাকে আমি কিছু কথা বলবো। দেখো --’
ঠিক তখনই ভ্রাম্যমান একজন চা বিক্রেতা চায়ের কেতলি নিয়ে এক প্যাকেট সিগারেট চাইলো। আর তখন আরো চারজন খদ্দের সেখানে ছিলো। জায়গাটায় ভীড় জমলো এবং ক্যানির খদ্দের প্ল্যাটফর্মের নিচের রাস্তায় দাঁড়িয়ে থেকে শরণার্থীর মতো হাত প্রসারিত করতে হলো। এর মধ্যে শ্রীরাম গোলাপী গালের রাণী যিনি ছাদ থেকে ঝুলে পড়া কলার ছড়ির মধ্য দিয়ে দুনিয়ার দিকে তাকিয়ে আছেন, তার প্রতিকৃতির দিকে এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলো। স্কুলের ছেলেমেয়েরা আসতে থাকলো এবং বোতলের পেপারমিন্টের জন্য শোরগোল পাকালো। ক্যানি সবাইকে যন্ত্রের মতো সেবা প্রদান করলো।
সবাই চলে গেলে শ্রীরাম জিজ্ঞেস করলো, ‘ভাঙতির জন্য আমাকে আর কতক্ষণ অপেক্ষা করাতে চাও?’
‘রাগ করো না, গুরু,’ ক্যানি বললো। সে দীর্ঘ একটা নোট বই বের করে এর উপরের ধুলা ঝেড়ে পুরাতন একটা পৃষ্ঠা বের করলো, আর অঙ্গুলি নির্দেশ করে জিজ্ঞেস করলো, ‘এটা দেখতে পারছো?’
‘হ্যাঁ,’ আজকাল সবাই তাকে সংখ্যা পড়তে বলছে কেন এটা ভেবে সে জবাব দিলো। সে জোরে জোরে পড়লো: ‘নয় টাকা, বারো আনা।’
‘কয়েক বছর হলো তোমার ঠাকুরদার কাছ থেকে ঐ টাকাটা পাই। আমি নিশ্চিত যে তিনি বেঁচে থাকলে শোধ করে যেতেন-- কিন্তু কেউই জানে না মৃত্যু কখন আসে: তুমি জানো, আমি সিঙ্গাপুর থেকে তাকে বিশেষ ধরণের চুরুট এনে দিতাম।’
‘তুমি ঠাকুরমাকে কেন বলোনি?’
‘ঠাকুরমা! আমি না। তোমার ঠাকুরদা এটা মোটেও পছন্দ করতেন না। আমি জানতাম কোনো একদিন তুমি এসে পরিশোধ করে যাবে।’
‘ওহ্,’ শ্রীরাম উদারভাবে বললো। ‘ঠিক আছে সবটাই নিয়ে নাও,’ এই বলে সে যাওয়ার জন্য ঘুরে দাঁড়ালো।
‘এই না হলে যোগ্য নাতি,’ ক্যানি বিড়বিড় করে বললো। ‘এখন বৃদ্ধ মানুষটির আত্মা শান্তিতে ঘুমাতে পারবে।’
‘কিন্তু আত্মা কোথায় অপেক্ষা করতে থাকবে? তুমি কি মনে করো না তিনি অন্য কোথাও পুনর্জন্ম গ্রহণ করে থাকবেন?’ শ্রীরাম বললো।
ক্যানি মৃত্যুর পরের অস্তিত্ব নিয়ে চিন্তা-ভাবনায় নিজেকে জড়াতে চাইলো না, তাই অন্য খদ্দেরদের দিকে মনোযোগ নিবদ্ধ করলো।
যাওয়ার আগে শ্রীরাম বললো, ‘মনে রেখো, যখনই তুমি ছবিটা বেচতে চাও তখনই আমি কিনে নিতে পারি।’
‘নিশ্চয়ই, নিশ্চয়ই। যখন আমার দোকান একেবারে বন্ধ হয়ে যাবে, তখন তোমাকে দেবার কথা মনে করবো, তার আগে নয়: ছবিটা আমার জন্য তাবিজের কাজ করে।’
‘যদি ঐ ভদ্রমহিলার স্বামী এসে ছবিটা দাবি করে, তখন তুমি কী করবে?’ শ্রীরাম জিজ্ঞেস করলো। এতে ক্যানি থেমে কিছুক্ষণের জন্য চিন্তা করলো এর উপায় তখন কী হওয়া উচিৎ হবে।
**
শ্রীরাম উদ্দেশ্যহীনভাবে রাস্তায় হাঁটলো। পকেটে থাকা উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন তাবিজের অধিকারী মানুষ হতে ইচ্ছে হলো তার, যা তাকে সে যেখানে যেতে চায় সেখানে উড়িয়ে নিয়ে যেতে পারবে। সে তার জিব্বার পকেটে হাত ঠেলে নোটগুলো কচলাতে থাকলো। ম্যানেজার সাহেব যদি তাকে নতুন নতুন নোট দিতো! মনে হলো তাকে পুরাতন নোটগুলো দিয়েছে: তহবিল অফিসের ম্যানেজার সাহেব ভালো নোটগুলো সম্ভবত হোমরা চোমরা ব্যক্তিদের জন্য সংরক্ষণ করে রেখেছে। হোমরা চোমরা কারা? যে কোনো মানুষই তো হোমরা চোমরা। তাকে বাদ দিয়ে নয়। তার টাকা আছে, কিন্তু মানুষ এখনো মনে হয় ভাবছে সে তার ঠাকুরমার আঁচলে বাঁধা একজন ছোট্ট ছোঁকড়া। এ বিষয়ে তো সন্দেহ নেই যে তার ঠাকুরমা খুবই ভালো ছিলো, কিন্তু শ্রীরামকে নিজের মতো চলতে দেয়াই তার উচিৎ। তিনি কখনো তাকে যথেষ্ট বড় হিসেবে বিবেচনা করেননি। সব সময় বাচ্চা হিসেবে দেখলে সেটা ধৈর্য্যচ্যূতি ঘটায়। সে যদি চায়-ই বা, তিনি কেন তাকে পঞ্চাশের পরিবর্তে দুই শত পঞ্চাশ টাকা তুলতে দিলেন না? ভবিষ্যতে তো এটা তারই কাজ হবে, এবং সে যাতে সন্তুষ্ট হয়, তাতে ঠাকুরমার সায় দেওয়া উচিৎ। যা হোক, ক্যানির সামনে প্রদর্শন করার জন্য তার কাছে পঞ্চাশ টাকা থাকাটাই ভালো ব্যাপার ছিলো। সে যদি দুই শো টাকা দেখাতো, সে অর্ধেকটা তার ঠাকুরদার ঋণ হিসেবে দাবি করতে পারতো। মুহুর্তের জন্য শ্রীরাম পার্থিব জীবনের সমস্যা নিয়ে আচ্ছন্ন হলো: কেউ কি জন্ম নেয়, সেবা লাভ করে আর বিশ বছর বয়সী বড় হয় শুধু চুরুট বিল পরিশোধ করার জন্য? তার চিন্তার এই দার্শনিকতা সে তৎক্ষণাৎ রোধ করলো এই ভেবে: ‘আরেকটু বড় হলেই আমি হয়তো এ সব দর্শন জানবো, এখন নয়...’ সে তার চিন্তা সরিয়ে নিলো এই দিয়ে: ‘আমার নিজের টাকাসহ আমি পূর্ণবয়স্ক, যখন খুশি বাড়ি যাবো। আমি কী করে বেড়াচ্ছি ঠাকুরমা আমাকে জিজ্ঞেস করতে পারে না...’
বাজার রোডে দোকানগুলোর দিকে তাকিয়ে সে কয়েক পাক ঘুরলো, আর ভাবলো আর কিছু কেনার ছিলো কিনা। তার পকেটের টাকাটার আওয়াজে মনে হলো সবটা খরচ হয়েছে । কিন্তু তবুও দোকানে কেনার মতো কোনো কিছুই নেই বলে প্রতিভাত হলো। কিছুক্ষণের জন্য থেমে সে ভাবতে লাগলো কাউকে নগদ টাকা থেকে মুক্তি দেওয়া কত কঠিন। তুলার বসনে ধুতি পরা একজন তার কাছে ক্যানভাসের ভাঁজ করা চেয়ার তুলে ধরলো।‘সস্তা-ই আছে, লাগবে নাকি?’
শ্রীরাম এটা ভালো করে দেখলো। এটা বাসায় রাখার মতো জিনিস মনে হলো। এটার লাল ডোরাকাটা ক্যানভাসের আসন ছিলো এবং ভাঁজ করা যেতো। বাসায় কোনো আসবাবপত্র নেই বললেই চলে।
‘দশ টাকা স্যার, আসল সেগুন কাঠের তৈরী।’
শ্রীরাম আগ্রহভরে দেখলো যদিও রোজউড ও সেগুন কাঠ অথবা অন্য কোনো কাঠের মধ্যে তফাৎ দেখতে পায়নি সে।
‘আসল সেগুন কাঠ তো?’ সে জিজ্ঞেস করলো।
‘গ্যারান্টি দেওয়া মেমপি পাহাড়ের সেগুন, স্যার, এ জন্য এর দাম দশ টাকা: জঙ্গলের সাধারণ কাঠ হলে চার টাকায় পেতেন।’
‘সাত টাকা দেবো,’ অন্যদিকে তাকিয়ে দফা রফার ভাব নিয়ে শ্রীরাম বললো। তার লেনদেনের আর আগ্রহ নেই এমন ভান করলো। লোকটি আট টাকায় নেমে আসলো। শ্রীরাম তাকে অতিরিক্ত পঞ্চাশ পয়সা দিতে চাইলো যদি সে তার দরজা পর্যন্ত এটা পৌঁছিয়ে দেয়।
ঠাকুরমা দরজা খুলে বিস্ময়ে জিজ্ঞেস করলো, ‘এটা কী?’
শ্রীরাম ক্যানভাসের চেয়ারখানা হলের মাঝখানে স্থাপন করে বললো, ‘এটা তোমার উপহার, ঠাকুরমা।’
‘কী! আমার জন্য!’ তিনি ক্যানভাসটি ভালো করে দেখে বললেন, ‘এটা আমার কোনো কাজে আসবে না। এটা তো চামড়ার তৈরী, সম্ভবত গরুর চামড়া, আর এর উপর বসে আমি নিজেকে নোংরা করতে পারি না। তুমি কেনার আগে যদি আমাকে বলতে!’
শ্রীরাম আগ্রহের সাথে ভালোভাবে চেয়ারটি দেখে ধুলা পরিস্কার করলো এবং হাতের তালু দিয়ে টোকা মেরে বললো, ‘এটা তো চামড়া নয়, ঠাকুরমা, এটা স্রেফ ক্যানভাস।’
‘ক্যানভাস কী দিয়ে তৈরী হয়?’ তিনি জিজ্ঞেস করলেন।
শ্রীরাম বললো, ‘আমার তো কোনো ধারণা নেই, ’ আর তিনি উত্তরটা শেষ করলেন এই বলে, ‘চামড়ার আরেক নাম হচ্ছে ক্যানভাস। আমি এটা চাই না। তুমি চাইলে তুমিই এর উপর ঘুমাও।’
সে তার এই উপদেশটা মেনে চললো। সারাদিন সে এই ক্যানভাসের আসনে বসে আরাম করলো আর ছাদের দিকে তাকালো অথবা পৌরসভার গ্রন্থাগার থেকে ধার করে আনা ছেঁড়া একটি উপন্যাস পড়লো। সন্ধ্যা ঘনিয়ে আসলে সে বোম্বে আনন্দ ভবান পরিদর্শন করলো এবং অনেক মিষ্টি-টিষ্টির অর্ডার দিলো ও কফি দিয়ে গিলে খেলো। এরপর রঙিন নারিকেলের রঙিন টুকরায় ঢাকা খিলিপান হাতে তুলে নিয়ে পরম তৃপ্তিতে চিবোতে লাগলো। আর নদীর ধারে পায়চারী করতে অথবা রিগাল পিকচার প্যালেসে তামিল ছবি দেখতে গেলো।
এই শান্ত, অবিচল অবস্থা পরবর্তী চার বছর ধরে অবিরাম চলতে থাকলো, এ পরিকল্পনায় সময় কাটানোটা কদাচিৎ পরিলক্ষিত হতো-- শুধু এই ব্যতীত যে যখন সে ঋতুর একটা নয় আরেকটা উৎসব হাজির হতো এবং ঠাকুরমা চাইতো সে বাজার থেকে কিছু একটা আনুক। ‘আরেক দসরা!’ অথবা ‘আরেক দীপালি! মনে হয় যেন এইতো গতকাল আমি বাজি ফুটিয়েছি!’ সময় দ্রুত চলে যাওয়ায় বিস্মিত হয়ে সে চিৎকার করে বলতো।
**
এপ্রিল মাস। নিদাঘের সূর্য বৃত্তাকার প্রদীপের মতো নির্দয়ভাবে কিরণ দিচ্ছিলো- আর কুয়ার সবটুকু জল বাষ্পীভূত হয়ে উবে গিয়েছিলো এবং রাস্তার ধূলিগুলো হালকা ও নির্ভার হয়ে উড়ছিলো চূর্ণকারী চাকায় ময়দার গুড়ার মতো। শ্রীরাম যখন সন্ধ্যায় বের হচ্ছিলো তখন ঠাকুরমা বললো, ‘আগামীকালের জন্য ভালো দেখে কিছু গুড় আর পূজা করার জন্য জুঁই ফুল নিয়ে আসো না কেন?’ আজ সে বাজারে নয়, লাওলি এক্সটেনশনের দিকে যাবে বলে ঠিক করেছিলো, আর তাই সে ঠাকুরমার কথা শুনতে অনিচ্ছা বোধ করলো। কিন্তু তিনি একরোখা। বললেন,
‘কাল তো নববর্ষ।’
‘এর মধ্যে আরেকটি নববর্ষ!’ সি চিৎকার করে বললো। ‘মনে হচ্ছে এই তো গতকাল আমরা একটা নববর্ষ পালন করলাম।’
‘আগের দিন হোক আর পরশু দিন হোক, নববর্ষের দিন তো নববর্ষের দিন। এটা পালন করার জন্য নির্দিষ্ট কিছু জিনিস আমার চাই। তুমি যদি না যাও, আমি নিজেই যাবো। আমার জন্য নয়! শুধু তোমার জন্য কিছু মিষ্টান্ন তৈরি করবো বলে।’
বেশ খানিকটা বিড়বিড়িয়ে অসন্তোষ প্রকাশ করে সে উঠে দাঁড়ালো এবং পোশাক পরে বের হলো। বাজারে গিয়ে সে সন্তুষ্ট হলো যে ঠাকুরমা তাকে ওখানে যেতে বাধ্য করেছিলেন।
বাজারের ফোয়ারার কাছাকাছি এলে পর সুন্দরী একটা মেয়ে এসে তাকে থামালো।
‘আপনার চাঁদাটা?’ টিনের সীলকৃত টাকা তোলার বাক্স নাড়িয়ে সে জিজ্ঞেস করলো।
শ্রীরামের কণ্ঠ শুকিয়ে গেলো। কোনো আওয়াজ বেরোলো না। কোনো মেয়ে তার সাথে আগে কখনো কথা বলেনি; সে ছিলো তন্বী, বয়সে তরুণী, চোখে সুখের দীপ্তি ছড়াচ্ছিলো। শ্রীরাম জিজ্ঞেস করতে চাইলো, ‘তোমার বয়স কত? তুমি কোন জাতের? তোমার রাশি কী? তুমি কি আমাকে বিয়ে করার মতো স্বাধীন?’ ক্যানির দোকানের সুন্দর ছবিটার চেয়ে তাকে এত ভিন্ন দেখাচ্ছিলো; শ্রীরামের সমালোচক মন তৎক্ষণাৎ সজাগ হলো, আর সে উপলব্ধি করলো যে ইউরোপিয়ান রাণীর সেই সৌন্দর্যটা কতোই অগভীর ছিলো। আরো ভাবলো যে চিরকাল সে তাকেই ভেবে আসছিলো। এখন ক্যানি যদি তাকে ছবিটা মাগনাও দিয়ে দেয়, তবুও সে ঐ ছবিটার দিকে তাকাবেও না।
মেয়েটি টাকার বাক্সটি ঝনঝন করে নাড়া দিলো। এই আওয়াজে তার দিবাস্বপ্ন ভেঙে গেলে সে বললো, ‘হ্যাঁ, হ্যাঁ,’ সে তার জিব্বার পার্শ্ব পকেট হাতরে আট আনার একটি রূপালী কয়েন বের করে বাক্সের ছিদ্রে ফেলে দিলো। বিনিময়ে মেয়েটি তার দিকে হাসি দিয়ে চলে গেলো, যেন নর্তকীর মতো হালকাতম পদক্ষেপে। শ্রীরামের একটা বন্য আশা ছিলো যে মেয়েটি তাকে তার হাত ছুঁতে দেবে, কিন্তু সে চলেই গেলো, বাজারে মানুষের ভীড়ে হারিয়ে গেলো।
‘এমন একটা সুন্দর মেয়ের জন্য এটা কী বিপজ্জনকই না ব্যাপার!’ সে ভাবলো। সাইকেল, ঘোড়ার গাড়ি ও মোটরগাড়ি রাস্তা দিয়ে চলাচল করছিলো। বাজারের খিলানাকৃতির মূল গেট দিয়ে লোকজন হুড়াহুড়ি করে আসছিলো যাচ্ছিলো। কতই না ব্যস্ত সময়! লোকজন শাকসবজি, কলাপাতার রোল এবং নববর্ষের সব ধরণের উপকরণ বয়ে নিয়ে যাচ্ছিলো। রাস্তার তরুণ ছেলেরা মাথায় ঝুড়ি নিয়ে উপযাচক হয়ে বলছিলো, ‘কুলি, স্যার, কুলি?’ পাখি যেমন ডানায় ভর করে মিলিয়ে যায় তেমনই মেয়েটি বাজারে মিলিয়ে গেলো। শ্রীরাম তার জন্য একটি গান গাইতে চায়- এমনটি বোধ করলো। সে উপলব্ধি করলো চাঁদাটা কিসের জন্য ছিলো তাও সে জিজ্ঞেস করেনি। সে যদি ধাতব মুদ্রাটি না দিয়ে দশ টাকার একটি নোট তার সংগ্রহ বাক্সে ছুঁড়ে দিতে পারতো (তার তো সে সামর্থ্য ছিলো), আর যদি নিজের সম্পর্কে ভাল ধারণা দিতে পারতো, তাহলে হয়তো তাকে দাঁড় করিয়ে রেখে শ্রীরামের সাথে কথা বলানো যেতো। সে কোথায় থাকে সেটা তাকে জিজ্ঞেস করা উচিৎ ছিলো। তাকে ধরে রাখার ব্যবস্থা না করে কী বোকার মতোই না কাজ করলো সে। তার টাকা তোলার বাক্সে সবগুলো নোট দেওয়া উচিৎ ছিলো। বাজারের খিলানের মধ্য দিয়ে সে হারিয়ে গেলো।
তাকে আরেক নজর দেখতে পাবে এই আশায় সে অস্পষ্টভাবে তার পথ অনুসরণ করলো। সে যদি আবার কখনো তার দেখা পেতো, তাহলে সে টাকার বাক্সটার দায়িত্ব নিয়ে, যার জন্যই হোক না কেন, তার পক্ষ থেকে টাকা সংগ্রহ করতো। শাকসবজির দোকানগুলোর চারপাশে সাদা শাড়িটি আর এক নজর দেখার জন্য, জনতার মাথার উপর দিয়ে, হুড়োহুড়িপূর্ণ জনতার কাঁধের উপর দিয়ে, সে দৃষ্টি নিক্ষেপ করলো... কিন্তু হতাশাজনক অনুসন্ধান। তাকে আবার দেখার কোনো সুযোগই নেই। সে কে হতে পারে আর কোত্থেকেই বা আসতে পারে? এমন কি হতে পারে যে সে কোনো জজের কন্যা অথবা অন্য গ্রহের কোনো জীব যে দৈবাৎ তার সাথে সাক্ষাৎ করতে এসেছিলো আর তার সাথে কীভাবে ব্যবহার করতে হয় সে জানতো না? সে কতই না বোকা। তার মনে হলো আকস্মিক সাক্ষাতের এমন প্রয়োজনীয় প্রলেপটুকুর ঘাটতি তার মধ্যে ছিলো। এজন্য তাকে কলেজে গিয়ে বিএ টা পাস করার জন্য তাগিদ দেওয়া হয়েছিলো। কলেজে গিয়ে যারা বিএ পাস করেছিলো, তারা নিশ্চয়ই সেইসব লোক যারা মেয়েদের সামনে কীভাবে কথা বলতে হয় তা জানে।
মেয়েটা যেদিকে গিয়েছিলো সেদিকে বাজারের খিলানের ভেতর সে ঢুকে পড়লো। মাছি পীড়িত গুড়ের দোকানে সে অনিশ্চয়তাভরে বললো: ‘সব ধরণের জিনিস কিনতে অনেক মানুষ টাকা সংগ্রহে ব্যস্ত।’
গুড় ব্যবসায়ী কথায় টক মিশিয়ে বললো, ‘যদি দেওয়ার মতো লোক থাকে, তবে কে-ই বা টাকা সংগ্রহ করবে না?’
‘আমি একটা মেয়েকে টাকার বাক্স ঝুনঝুন করতে দেখেছিলাম। মেয়েরাও এতে অভ্যস্ত হয়েছে,’ শ্রীরাম কিছু শোনার আশায় দম বন্ধ করে কথাগুলো বললো।
‘ও তাই,’ লোকটি বললো, ‘আমাকেও কিছু নগদ টাকা দিতে হয়েছিলো। আমাদের দিতে হয়। আমরা প্রত্যাখান করতে পারি না।’
‘কে সে?’ শ্রীরাম কূটনৈতিকভাবে আর এগোতে না পেরে জিজ্ঞেস করলো।
গুড় ব্যবসায়ী তার দিকে দ্রুত একবার চোখ বুলালো, যা কিছুটা বিদ্রুপাত্মক মনে হলো, আর বললো: ‘মহাত্মা গান্ধীর সাথে মেয়েটির সম্পর্ক আছে, সে টাকা সংগ্রহ করছে। তুমি তো জানো মহাত্মা গান্ধী আসছে।’
হঠাৎ করে শ্রীরাম অতি পুরাতন নিদ্রালুতা থেকে বাস্তবে ফিরে এলো যে মালগুদি মহাত্মা গান্ধীকে পাওয়ার সম্মান লাভ করতে যাচ্ছে।
‘কাল তো নববর্ষ।’
‘এর মধ্যে আরেকটি নববর্ষ!’ সি চিৎকার করে বললো। ‘মনে হচ্ছে এই তো গতকাল আমরা একটা নববর্ষ পালন করলাম।’
‘আগের দিন হোক আর পরশু দিন হোক, নববর্ষের দিন তো নববর্ষের দিন। এটা পালন করার জন্য নির্দিষ্ট কিছু জিনিস আমার চাই। তুমি যদি না যাও, আমি নিজেই যাবো। আমার জন্য নয়! শুধু তোমার জন্য কিছু মিষ্টান্ন তৈরি করবো বলে।’
বেশ খানিকটা বিড়বিড়িয়ে অসন্তোষ প্রকাশ করে সে উঠে দাঁড়ালো এবং পোশাক পরে বের হলো। বাজারে গিয়ে সে সন্তুষ্ট হলো যে ঠাকুরমা তাকে ওখানে যেতে বাধ্য করেছিলেন।
বাজারের ফোয়ারার কাছাকাছি এলে পর সুন্দরী একটা মেয়ে এসে তাকে থামালো।
‘আপনার চাঁদাটা?’ টিনের সীলকৃত টাকা তোলার বাক্স নাড়িয়ে সে জিজ্ঞেস করলো।
শ্রীরামের কণ্ঠ শুকিয়ে গেলো। কোনো আওয়াজ বেরোলো না। কোনো মেয়ে তার সাথে আগে কখনো কথা বলেনি; সে ছিলো তন্বী, বয়সে তরুণী, চোখে সুখের দীপ্তি ছড়াচ্ছিলো। শ্রীরাম জিজ্ঞেস করতে চাইলো, ‘তোমার বয়স কত? তুমি কোন জাতের? তোমার রাশি কী? তুমি কি আমাকে বিয়ে করার মতো স্বাধীন?’ ক্যানির দোকানের সুন্দর ছবিটার চেয়ে তাকে এত ভিন্ন দেখাচ্ছিলো; শ্রীরামের সমালোচক মন তৎক্ষণাৎ সজাগ হলো, আর সে উপলব্ধি করলো যে ইউরোপিয়ান রাণীর সেই সৌন্দর্যটা কতোই অগভীর ছিলো। আরো ভাবলো যে চিরকাল সে তাকেই ভেবে আসছিলো। এখন ক্যানি যদি তাকে ছবিটা মাগনাও দিয়ে দেয়, তবুও সে ঐ ছবিটার দিকে তাকাবেও না।
মেয়েটি টাকার বাক্সটি ঝনঝন করে নাড়া দিলো। এই আওয়াজে তার দিবাস্বপ্ন ভেঙে গেলে সে বললো, ‘হ্যাঁ, হ্যাঁ,’ সে তার জিব্বার পার্শ্ব পকেট হাতরে আট আনার একটি রূপালী কয়েন বের করে বাক্সের ছিদ্রে ফেলে দিলো। বিনিময়ে মেয়েটি তার দিকে হাসি দিয়ে চলে গেলো, যেন নর্তকীর মতো হালকাতম পদক্ষেপে। শ্রীরামের একটা বন্য আশা ছিলো যে মেয়েটি তাকে তার হাত ছুঁতে দেবে, কিন্তু সে চলেই গেলো, বাজারে মানুষের ভীড়ে হারিয়ে গেলো।
‘এমন একটা সুন্দর মেয়ের জন্য এটা কী বিপজ্জনকই না ব্যাপার!’ সে ভাবলো। সাইকেল, ঘোড়ার গাড়ি ও মোটরগাড়ি রাস্তা দিয়ে চলাচল করছিলো। বাজারের খিলানাকৃতির মূল গেট দিয়ে লোকজন হুড়াহুড়ি করে আসছিলো যাচ্ছিলো। কতই না ব্যস্ত সময়! লোকজন শাকসবজি, কলাপাতার রোল এবং নববর্ষের সব ধরণের উপকরণ বয়ে নিয়ে যাচ্ছিলো। রাস্তার তরুণ ছেলেরা মাথায় ঝুড়ি নিয়ে উপযাচক হয়ে বলছিলো, ‘কুলি, স্যার, কুলি?’ পাখি যেমন ডানায় ভর করে মিলিয়ে যায় তেমনই মেয়েটি বাজারে মিলিয়ে গেলো। শ্রীরাম তার জন্য একটি গান গাইতে চায়- এমনটি বোধ করলো। সে উপলব্ধি করলো চাঁদাটা কিসের জন্য ছিলো তাও সে জিজ্ঞেস করেনি। সে যদি ধাতব মুদ্রাটি না দিয়ে দশ টাকার একটি নোট তার সংগ্রহ বাক্সে ছুঁড়ে দিতে পারতো (তার তো সে সামর্থ্য ছিলো), আর যদি নিজের সম্পর্কে ভাল ধারণা দিতে পারতো, তাহলে হয়তো তাকে দাঁড় করিয়ে রেখে শ্রীরামের সাথে কথা বলানো যেতো। সে কোথায় থাকে সেটা তাকে জিজ্ঞেস করা উচিৎ ছিলো। তাকে ধরে রাখার ব্যবস্থা না করে কী বোকার মতোই না কাজ করলো সে। তার টাকা তোলার বাক্সে সবগুলো নোট দেওয়া উচিৎ ছিলো। বাজারের খিলানের মধ্য দিয়ে সে হারিয়ে গেলো।
তাকে আরেক নজর দেখতে পাবে এই আশায় সে অস্পষ্টভাবে তার পথ অনুসরণ করলো। সে যদি আবার কখনো তার দেখা পেতো, তাহলে সে টাকার বাক্সটার দায়িত্ব নিয়ে, যার জন্যই হোক না কেন, তার পক্ষ থেকে টাকা সংগ্রহ করতো। শাকসবজির দোকানগুলোর চারপাশে সাদা শাড়িটি আর এক নজর দেখার জন্য, জনতার মাথার উপর দিয়ে, হুড়োহুড়িপূর্ণ জনতার কাঁধের উপর দিয়ে, সে দৃষ্টি নিক্ষেপ করলো... কিন্তু হতাশাজনক অনুসন্ধান। তাকে আবার দেখার কোনো সুযোগই নেই। সে কে হতে পারে আর কোত্থেকেই বা আসতে পারে? এমন কি হতে পারে যে সে কোনো জজের কন্যা অথবা অন্য গ্রহের কোনো জীব যে দৈবাৎ তার সাথে সাক্ষাৎ করতে এসেছিলো আর তার সাথে কীভাবে ব্যবহার করতে হয় সে জানতো না? সে কতই না বোকা। তার মনে হলো আকস্মিক সাক্ষাতের এমন প্রয়োজনীয় প্রলেপটুকুর ঘাটতি তার মধ্যে ছিলো। এজন্য তাকে কলেজে গিয়ে বিএ টা পাস করার জন্য তাগিদ দেওয়া হয়েছিলো। কলেজে গিয়ে যারা বিএ পাস করেছিলো, তারা নিশ্চয়ই সেইসব লোক যারা মেয়েদের সামনে কীভাবে কথা বলতে হয় তা জানে।
মেয়েটা যেদিকে গিয়েছিলো সেদিকে বাজারের খিলানের ভেতর সে ঢুকে পড়লো। মাছি পীড়িত গুড়ের দোকানে সে অনিশ্চয়তাভরে বললো: ‘সব ধরণের জিনিস কিনতে অনেক মানুষ টাকা সংগ্রহে ব্যস্ত।’
গুড় ব্যবসায়ী কথায় টক মিশিয়ে বললো, ‘যদি দেওয়ার মতো লোক থাকে, তবে কে-ই বা টাকা সংগ্রহ করবে না?’
‘আমি একটা মেয়েকে টাকার বাক্স ঝুনঝুন করতে দেখেছিলাম। মেয়েরাও এতে অভ্যস্ত হয়েছে,’ শ্রীরাম কিছু শোনার আশায় দম বন্ধ করে কথাগুলো বললো।
‘ও তাই,’ লোকটি বললো, ‘আমাকেও কিছু নগদ টাকা দিতে হয়েছিলো। আমাদের দিতে হয়। আমরা প্রত্যাখান করতে পারি না।’
‘কে সে?’ শ্রীরাম কূটনৈতিকভাবে আর এগোতে না পেরে জিজ্ঞেস করলো।
গুড় ব্যবসায়ী তার দিকে দ্রুত একবার চোখ বুলালো, যা কিছুটা বিদ্রুপাত্মক মনে হলো, আর বললো: ‘মহাত্মা গান্ধীর সাথে মেয়েটির সম্পর্ক আছে, সে টাকা সংগ্রহ করছে। তুমি তো জানো মহাত্মা গান্ধী আসছে।’
হঠাৎ করে শ্রীরাম অতি পুরাতন নিদ্রালুতা থেকে বাস্তবে ফিরে এলো যে মালগুদি মহাত্মা গান্ধীকে পাওয়ার সম্মান লাভ করতে যাচ্ছে।
**
মহাত্মা গান্ধীর অপেক্ষায় সরায্যু চরে বিশাল জনতার মাঝে বসা শ্রীরাম ছিলো ছোট্ট এক কণা। মঞ্চের চারপাশে ঘোরাফেরা করা সাদা খদ্দের কাপড় পরিহিত অনেক স্বেচ্ছাসেবক ছিলো। মাইক্রোফোনের ক্রোমিয়াম স্ট্যান্ডটি রোদে দীপ্তি ছড়াচ্ছিলো। এদিক সেদিক পুলিশ এসে দাঁড়ালো। অতি উৎসাহী মানুষগুলো আশপাশে ঘোরাফেরা করে লোকজনকে শান্ত ও নীরব থাকার জন্য বলছিলো। লোকজন তাদের কথা শুনলো। শ্রীরামের এই স্বেচ্ছাসেবক ও অতি উৎসাহী লোকদের দেখে ঈর্ষা হলো, আর ভাবলো সে একই মর্যাদা লাভের জন্য কিছু করতে পারে কিনা। বালুচর উষ্ণ ছিলো, রোদ ছিলো কড়া। জনতা কোনো অভিযোগ না করে মাটির উপর বসে পড়লো।
নদী বয়ে যাচ্ছিলো, তীরে বিশাল বটগাছ ও পিপুল গাছের পাতাগুলো খসখস করে উঠলো; অপেক্ষমান জনতা ক্রমশ বক বক করতে লাগলো, যা সবসময় সোডা জলের বোতলের ফট ফট শব্দে থামতো; দ্রাঘিমায় উৎপাদিত অর্ধচন্দ্রাকার শশার ফালি, লবণ মিশ্রিত লেবুর খোঁসাসহ একজন বিক্রেতার কাঠের ট্রে থেকে দ্রুত শেষ হয়ে যাচ্ছিলো, যে বিক্রেতা নরম স্বরে (মহান এক ব্যক্তির আগমনে ছাড় দিয়ে) ঘোষনা করছিলো, ‘পিপাসা মেটাতে শশা, পিপাসার জন্য খাসা।’ সে রোদ থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্য মাথার চারপাশে সবুজ তুর্কি গামছা বেঁধে নিয়েছিলো।
শ্রীরামের ভেতরটা শুকিয়ে গেলো, এবং সে ট্রে-র দিকে আকাঙ্খাভরে তাকালো। সে যদি উপরে উঠে অর্ধচন্দ্রাকার একটা ফালি কিনতে পারতো। এর ঠাণ্ডা রসে কামড় দেওয়ার ভাবনা ছিলো প্রলুব্ধকর। সে দূরে থাকায় আসনটা একবার ছেড়ে দিলে তা ফিরে পাবার যো ছিলো না। সে আরো অনেককে টাকা দিতে এবং তাদের দাঁতগুলো কীভাবে সেই ফালিতে কাজ করছিলো তা দেখছিলো। ‘মহাত্মার অপেক্ষা মানুষকে তৃষ্ণার্ত করে তোলে, ’ সে ভাবলো।
দশ মিনিট অন্তর অন্তর কে যেন গুজব ছড়াতে শুরু করলো যে মহান ব্যাক্তিটি এসে পড়েছেন। এতে জনতা আন্দোলিত হলো। এটা একটা মজা, প্রতীক্ষার বিরক্তি থেকে অব্যাহতি পাওয়ার জন্য কিছু একটা। মাইক্রোফোন ঠিককারী থেকে শুরু করে স্বেচ্ছাসেবক যে-ই মঞ্চ অতিক্রম করার সাহস দেখালো সে-ই শয়ে শয়ে হাজার হাজার কণ্ঠ থেকে নিঃসৃত হাসি-তামাশা দিয়ে অভিনন্দিত হলো। তার এক বুড়ো শিক্ষক ও বাজার রোডের এক বন্ধকী কারবারির মতো অনেক পরিচিত চরিত্রকে সাদা খদ্দের পোশাকে চেনা যাচ্ছিলো না। তারা মনে করে এ উপলক্ষের জন্য এ পোশাকই তাদের জন্য সঠিক পোশাক। ‘আজকে বাজার ফোয়ারার অনতিদূরে ঐ খদ্দের কাপড়ের দোকানটা নিশ্চয়ই রমরমা ব্যবসা করে থাকবে।’ শ্রীরাম ভাবলো। বেশ খানিকটা দূরে এক পাশে আবছাভাবে টেনে রাখা পুলিশ ভ্যানে কিছু সংখ্যক লোক নিরাপত্তা গ্রিলের ভেতর দিয়ে উঁকি দিচ্ছিলো।
গান্ধী যখন প্ল্যাটফর্মে এসে আসন গ্রহণ করলো তখন আকস্মিক এক স্থবিরতা দেখা দিলো।
‘উনি হচ্ছেন মহাদেব দেসাই, ’ কে যেন শ্রীরামের কানে কানে বললো।
‘গান্ধীজীর পিছনের লোকটি কে?’
‘উনি নাতেশ সাহেব, আমাদের পৌরসভার চেয়ারম্যান।’
তার নাম উল্লেখ করায় আরেকজন নাক সিটকালো। ‘মহাত্মাজী এলে কিছু লোক সুবিধাজনকভাবে দেশপ্রেমিক হয়ে যায়।’
‘নইলে কী করে তারা বিশাল মিছিলে আগে জায়গা পায় আর মঞ্চে বসতে পারে?’
এই কথা চলতে চলতে অ্যামপ্লিফায়ারে গর্জন শোনা গেলো, ‘শান্ত হোন, দয়া করে শান্ত হোন।’
দুই হাতের তালু একত্রিত অবস্থায় প্রণাম করে মহাত্মা গান্ধী মঞ্চে উঠে দাঁড়ালেন। বলিষ্ঠ স্লোগান শোনা গেলো, ‘মহাত্মা গান্ধীর জয় হোক!’ তখন তিনি তাঁর বাহু তুললে তৎক্ষণাৎ জনতার মধ্যে এক নীরবতা দেখা গেলো। ছন্দে ছন্দে তিনি করতালি দিয়ে বললেন: ‘আমি চাই আপনারা সবাই এই তালি কিছুক্ষণের জন্য চালিয়ে যান।’ লোকজন নিরুদ্যম হলো। আর অ্যামপ্লিফায়ারে বুম করে আওয়াজ এলো, ‘কোনো লাভ নেই। যথেষ্ট হয়নি। আপনাদের বাহুতে আমি আরো শৌর্য-বীর্য, আরো ছন্দ, আরো তেজ দেখতে চাই। ভারত মাতাকে বেঁধে ফেলার শিকল ভাঙতে যে সকল অহিংস সেনারা আগুয়ান তাঁদের ঢোলের আওয়াজের মতো তোমাদেরটা হতে হবে। আমি সেই মহান আওয়াজ শুনতে চাই। আমি সবার বাহুকে উত্তোলিত অবস্থায় হাততালি দিতে দেখতে চাই। এতে লজ্জিত হওয়ার কিছু নেই। সবাই এ কাজটি এক মনে করুন আমি তাই চাই।’ আর তখনই প্রত্যেকটা নারী, পুরুষ ও শিশু তাদের বাহু মাথার উপর তুলে হাততালি দিলো।
শ্রীরাম কিছুক্ষণের জন্য ভাবলো এই বিশালায়তন আওয়াজের মধ্যে তালি দিয়ে তার কোটা যোগ করা দরকার কিনা। সে দ্বিধাগ্রস্ত হলো।
‘আমি দেখতে পাচ্ছি ঐ কোণায় কে যেন আমাদের সাথে যোগদান করতে পুরোপুরি ইচ্ছুক নয় । চলে এসো, এই প্রস্তুতির জন্য তুমি গর্ববোধ করবে।’
আর শ্রীরামের মনে হলো সে ধরা খেয়েছে; তাই সে যোগ দিলো।
এখন দৃঢ় এক সমবেত সঙ্গীত সরল সুরে মাইক্রোফোনের কাছে এক বালিকার নেতৃত্বে আরম্ভ হলো: রঘুপতি রাঘব রাজা রাম/ পতিত পবন সীতা রাম। গানটি বাজতেই থাকলো আর তখনই থামলো যখন মহাত্মা গান্ধী বক্তৃতা শুরু করলেন। গান্ধী হিন্দিতে যা বললেন নাতেশ তা তামিল ভাষায় রূপান্তর করে শোনালেন। মহাত্মা গান্ধী শুরুতেই ব্যাখ্যা করে বললেন যে নীতিগতভাবে তিনি শুধু হিন্দিতেই কথা বলবেন। ‘আমি ইংরেজিতে ভাষণ দেবো না। ইংরেজি আমাদের শাসকদের ভাষা। এ ভাষা আমাদেরকে দাস করে রেখেছে। আমার খুব ইচ্ছে হয় আমি যদি আপনাদের মধুর ভাষা, তামিলে আপনাদের সাথে কথা বলতে পারতাম; কিন্তু হায়, এখন এ ভাষা আয়ত্ত করার মতো সময় আমার নেই। যদিও আমি আশা রাখি বিধাতা তাঁর অসীম দয়ায় আমাকে সোয়া শ বছর আয়ু প্রদান করলে, পরের বার আমি আমাদের বন্ধু নাতেশকে বিরক্ত না করে তামিল ভাষায় আপনাদের সাথে কথা বলবো।’
‘নাতেশের ভাল সার্টিফিকেট অর্জনের উপর দখল আছে, ’ কে যেন ক্ষুব্ধ স্বরে বিড়বিড় করে বললো।
‘খরগোশের সাথে দৌড়ায় আর ডালকুত্তার সাথে শিকার করে, ’ একজন স্কুল শিক্ষক বললো।
‘উনি তাদের সবার খুঁটিনাটি জানেন। মনে করবেন না যেন বৃদ্ধ ভদ্রলোক যাদের নিয়ে কাজ করছেন তাদের সম্পর্কে কিছু জানেন না।’
‘আমি তো দুই জন লোককে ওখানে কথা বলতে দেখছি, ’ গান্ধীজীর গর্জন শোনা গেলো। ‘যখন হয়তো আপনার পাশের জন কথা শোনার জন্য উদগ্রীব তখন কথা বলা ভাল জিনিস নয়, । আপনি যদি তাকে শুনতে ব্যাঘাত ঘটান, তাহলে এটা এক ধরনের হিংসা।’ আর সঙ্গে সঙ্গে ভাষ্যকাররা মাথা নিচু করে নীরব হয়ে রইলো। মানুষজন নড়তে বা কথা বলতে আর সাহস পেলো না।
মহাত্মা গান্ধী বললেন: ‘আমি আমার সম্মুখে বিশাল সৈন্যবহর দেখতে পাচ্ছি। আপনাদের প্রত্যেকেরই কোনো না কোনো ভাল দোষ-গুণ আছে। আমাদের দেশের স্বাধীনতা অর্জনের আশা করার পূর্বে নিজেদের সুশৃঙ্খল করার জন্য আপনাদের সর্বতোভাবে সচেষ্ট হতে হবে। সেনাবাহিনী সবসময় নিয়ম শৃঙ্খলা মেনে প্রশিক্ষণের মধ্যে থেকে নিজেদের যোগ্য করে রাখে। আমরা, এ দেশের নাগরিকরা, সবাই অহিংস সৈন্যবহরের সেনা, কিন্তু এমন সৈন্যবহরকেও নিজেদের যোগ্য রাখার জন্য প্রতিদিন কিছু জিনিস চর্চা করতে হয়। আমাদের রোদ তপালে চলবে না; আর চিৎকার করে “বাম” , “ডান” বললে হবে না। তবে অনুসরণ করার মতো আমাদের নিজেদেরই কৌশল আছে: তা হচ্ছে রাম ধুন; চরকায় সুতা কাটা আর পরম সত্য ও অহিংসার চর্চা করা।’
পরের দিন সান্ধ্যকালীন সভায় শ্রীরাম খুব কাছেই একটা আসন যোগাড় করলো। সে এখন এসব সমাবেশের কৌশল বুঝতে পারলো। সে যদি ইতস্তত করতো আর তাকে যদি ভীতু দেখাতো, তাহলে লোকজন তাকে একবার সামনে একবার পেছনে ঠেলতো। কিন্তু যদি তাকে এমন কারো মতো দেখাতো যে আসনটার মালিক, তাহলে সবাই একপাশে দাঁড়িয়ে তাকে যেতে দিতো। সে বড়, কালো একটা চশমা পড়েছিলো, তার মনে হলো, তাতে তাকে কর্তৃত্বপরায়ণ দেখাচ্ছিলো। লম্বা লম্বা পা ফেলে সে ভীড়ের মধ্যে ঢুকে গেলো। জায়গাটা বাঁশের বেড়া দিয়ে কয়েক ভাগে বিভক্ত ছিলো যাতে করে লোকজনকে দলে দলে বিন্যস্ত রাখা যায়। সে যে হামবড়া ভাব গ্রহণ করলো তাতে সে বিভিন্ন প্রতিবন্ধকতা পেরিয়ে মঞ্চের নিচে প্রথম সারিতে চলে গেলো। এতে করে শশা ও পানীয় বিক্রেতা যারা জনতার প্রান্তে ফেরি করছিলো তাদের থেকে সে অনেক দূরে যেতে পারলো। কিন্তু এ জায়গাটার আরেকটা সুবিধা ছিলো: বেষ্টনীর পাশে যেখানে রমণীরা জমায়েত হয়েছিলো সেখানে সে নিজেকে আবিস্কার করলো। ফুটানি ও বিলাসিতার প্রতি গান্ধীজীর যে বিতৃষ্ণা ছিলো তা জানায় সেখানকার বেশিরভাগ রমণীরেই কোনো অলংকার ছিলো না। তারপরও তারা বিচিত্র রঙের শাড়িতে আকর্ষণীয় একটা অংশ ছিলো। শ্রীরাম বেহায়ার মতো সমাবেশের দিকে এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে বসে থাকলো। কারণ সে মুহুর্তে তার প্রিয় শখ ছিলো স্ত্রী হিসেবে কোন ধররে মেয়েকে পছন্দ করবে তা নিয়ে চিন্তা-ভাবনা করা।
সে নিজেকে আকর্ষণের কেন্দ্রবিন্দু ভাবলো পাছে কোনো রমণী ঘটনাক্রমে তাকে দেখে ফেলে, । ‘ওহ্ , সে আমার চশমা দেখে মুগ্ধ হয়েছে-- সে আমাকে বড় মানুষ ভাবছে মনে হয়।’ সে গান্ধীজীর গতদিনের উপদেশের কথা স্মরণ করলো: ‘সকল নারীই আপনাদের মা-বোন। তাদের দিকে কামনার ভাবনায় তাকাবেন না। যদি আপনারা কখনো এমন ভাবনায় তাড়িত হন, তাহলে তার প্রতিকার হলো: দিনের বেলায় মাটির দিকে তাকিয়ে মাথা নিচু করে, আর রাতের বেলায় দৃষ্টি উপরে রেখে তারা দেখতে দেখতে হাঁটবেন।’ শ্রোতাবৃন্দের মধ্য থেকে একজনের প্রশ্নের উত্তরে তিনি এমন কথা বলেছিলেন। শ্রীরামের এ কথা স্মরণ করে অস্বস্তি বোধ হলো: ‘উনি সম্ভবত আমার চিন্তা-ভাবনা পড়ে ফেলবেন।’ মঞ্চের এতো কাছে বসে থাকাটা ঝুঁকিপূর্ণ কাজ মনে হলো।
যারা বাঁকাভাবে চিন্তা করে ও কাজে ব্যাঘাত ঘটায় তারা যতোই দূরে বসুক না কেন, গান্ধীকে তাদের ধরে ফেলার মতো মানুষ হিসেবে মনে হলো। যে মুহুর্তে তিনি মঞ্চে এসে পড়বেন সে মুহুর্তেই তিনি নিশ্চয়ই তাকে ধরে ফেলবেন এবং বলবেন, ‘এই যে আপনি! উঠে আসুন আর আপনার অপরাধ স্বীকার করুন। এই সমাবেশে বলুন আপনি কী ভাবছিলেন। যদি আপনার নিজের চিন্তার উপর নিয়ন্ত্রণ না থাকে, তবে মেয়েদের দিকে মোটেও তাকাবেন না।’ শ্রীরাম দৃঢ়তার সাথে যেদিকে পুরুষেরা বসেছিলো সেদিকে তাকিয়ে রইলো, । ‘খুবই নীরস ও বিরক্তিকর মুখের সমাহার; যেদিকেই ঘুরে দাঁড়াই, সেদিকেই কেবল হয় দোকানদার নয় স্কুল শিক্ষককে দেখতে পাই। ওদের দিকে তাকিয়ে জীবনের মুল্যবান সময় ব্যয় করে কী লাভ?’ খুব শীঘ্রই অচেতন মনে সে আবার নারীদের দিকে ঘুরে দাঁড়ালো, আর মনে মনে বললো, ‘এতোগুলো মা-বোন। তারা যদি তাদের সাথে আমাকে কথা বলতে দিতো। অবশ্য এই মুহুর্তে আমার মনে কোনো কুচিন্তা নেই।’
এখন মহাত্মাজী মঞ্চে আরোহণ করলেন। শ্রীরাম রমণীদের উপর থেকে তার চোখ দ্রুত সরিয়ে নিয়ে সময়োচিত ভক্তির সাথে করতালিতে অংশগ্রহন করলো। এরপর -রঘুপতি রাঘব রাজা রাম- গানে যোগদান করলো। এবার গান্ধী অহিংসার উপর কথা বললেন এবং বাস্তব জীবনে কীভাবে তার চর্চা করা যায় তা ব্যাখ্যা করলেন। ‘এটা সম্পূর্ণ সাধারণ একটা পদ্ধতি যদি এতে আপনি বিশ্বাস করেন। যদি আপনি নিজের দিকে লক্ষ্য করেন, তবে আপনি ছোট বড় সকল কাজ এবং যে কুচিন্তা আরেকজনের ব্যথার কারণ- সব এড়িয়ে চলতে পারবেন । যদি আপনি সতর্ক থাকেন, তবে এমনিতেই আপনি এটা করতে পারবেন, ’ তিনি বললেন। ‘কেউ যখন আপনার উপর অবিচার করে থাকে অথবা এমন কিছু করেছে যা আপনার কাছে খারাপ বলে মনে হচ্ছে, তখন সেই খারাপটা ধ্বংস হোক শুধু এই প্রার্থনা করুন। আপনি সেই ব্যক্তিটার জন্য বেশি বেশি স্নেহ লালন করুন, তাহলে দেখতে পাবেন যে আপনি তার মধ্যে একটা পরিবর্তন আনতে পেরেছেন। দুই হাজার বছর আগে যীশু খ্রীষ্ট একই জিনিস বোঝাতে চেয়েছিলেন যখন তিনি বলেছিলেন, “তোমার অন্য গালটি পেতে দাও।” ’ এভাবে তিনি বলেই চললেন। তাঁর কথা বোঝা শ্রীরামের পক্ষে মাঝে মাঝে অসম্ভব হয়ে দাঁড়ালো। তিনি যা বলছিলেন তার মর্মোদ্ধার করতে না পারলেও শ্রীরামকে বিমোহিত দেখাচ্ছিলো। সে বোঝার জন্য পূর্ণ মনোযোগ নিবদ্ধ করতে চেষ্টা করলো। এই প্রথমবারের মতো সে কোনো কিছু বোঝার প্রয়োজন বোধ করলো। প্রথমবার নিজেকে নিজের কাছে অসুবিধাজনক ঠেকলো। এখন পর্যন্ত তার ধারণা ছিলো বিশেষত ব্যাংক অ্যাকাউন্ট চালু করার পর, যে সে জীবনের সবকিছু বোঝে। এই প্রথমবার তার নিজের দক্ষতা ও বোধগম্যতা নিয়ে সে সন্দিহান হলো। মহাত্মাজী অস্পৃশ্যতা ও জাত নিয়ে কথা বললে শ্রীরাম চিন্তা করতে লাগলো, ‘উনি যা বলছেন তার মধ্যে অবশ্যই অনেক কিছু থেকে থাকবে। আমরা সব সময় ভাবি আমরা নিজেরাই শ্রেষ্ঠ। ঠাকুরমা কীভাবেই না আমাদের বাড়ির পেছনের উঠান ঝাড় দেওয়া খলপুকে ভয় দেখাতো!’ ঠাকুরমা এতোই গোঁড়া যে সে দশ গজের ভেতর ঐ খলপুকে আসতে দিতো না। আর অভ্যাসবশত ভয় দেখানোর স্বরে তাকে ডাকতো। খলপুর কাজে দোষ খোঁজা ও অপমানজনক মন্তব্যে যোগ দিয়ে শ্রীরামও পৈশাচিক আনন্দ লাভ করতো, যদিও তাদের মন্তব্যে সে বেচারার কখনো ন্যূনতম খেয়াল ছিলো না। ঝাড়– সজোরে চালনা করে সে শুধু তার কাজ করে যেতো, আর থামতো এইটুকু বলার জন্য, ‘অনেক আগে আপনি যে আমাকে শার্ট দেবেন বলেছিলেন সেই পুরানো শার্টটা কখন দেবেন, বাবু?।’ শ্রীরাম মঞ্চে সেই মেয়েটিকে হঠাৎ করে দেখতে পেলো, যে মেয়েটি বাজারে কয়েকদিন আগে তার মুখের উপর একটা টাকার বাক্স ঝন ঝন করে বাজিয়েছিলো। ঘরে বানানো সাদা খদ্দের শাড়ি পরিহিত ছিলো সে। শ্রীরাম লক্ষ করলো এ শাড়িতে তাকে কী চমৎকারই না মানিয়েছে। আগে তার মনে হতো খদ্দের পরাটা একটা শখের ব্যাপার, আর খেয়ালী মেয়েদেরই তা মানায়। কিন্তু এখন সে উপলব্ধি করলো এতে কতো সুন্দর লাগতে পারে। কিছুক্ষণের জন্য সে তফাৎ খুঁজতে লাগলো যে শাড়িটা পরেছে সে-ই কাপড়কে সুন্দর করে তুলেছে নাকি কাপড়টাই এমনিতে সুন্দর। কিন্তু পুরো সমস্যাটা নিয়ে ভাবনা তাকে থামাতে হলো। এসব বিমূর্ত চিন্তা-ভাবনার সময় এটা ছিলো না। ঐ তো উঁচু মঞ্চে মাইক্রোফোনের পাশে স্বপ্ন-বালিকা দাঁড়িয়ে আছে গোটা দৃশ্যকে নিজের করে নিয়ে। এমন মানুষই মহাত্মাজীর মাইক্রোফোনের পাশে দাঁড়ানোর যোগ্যতা রাখে। কী আত্মবিশ্বাস নিয়েই না সে জনতার মোকাবেলা করলো! শ্রীরাম যদি ঘোষণা করতে পারতো, ‘যে মাইক্রোফোনে মহাত্মাজী কথা বলছেন তাঁর পাশের জনকে আমি চিনি।’ সমস্যা শুধু এই যে তারা যদি ঘুরে এসে তাকে জিজ্ঞেস করতো, ‘তোমার নাম কী?’, তাহলে সে হারিয়ে গেছে বলে তার মনে হতো। এটা বলাও তো বিদঘুটে, ‘আমি জানি না। সে সেদিন বাজারে টাকা তোলার বাক্স নিয়ে ঝন ঝন করে বাজাতে বাজাতে এসেছিলো। যদি জানতাম সে কোথায় থাকে! কেউ কোনো তথ্য দিলে তার প্রতি কৃতজ্ঞ থাকতাম।’ এ সময় করতালি বেজে উঠলে সে তাতে যোগ দিলো। গান্ধীজী তাঁর হাত উঁচু করে বললেন, ‘হাততালি দিয়ে আমার প্রশংসা করাই যথেষ্ট নয়। আমি এ ব্যাপারটিকে এতো সহজভাবে মেনে নিতে প্রস্তুত নই। আমি চাই ইংরেজদের ভারত উপকূল ছাড়তে বলার কথা চিন্তা করার আগে আপনাদের মনের সত্যিকার পরিবর্তন নিশ্চিত করুন। চিৎকারকে গর্জনে পরিণত করা আপনাদের জন্য খারাপ কিছু নয়। কিন্তু এটাই যথেষ্ট নয়। আমি চাই আপনারা নিজেদের দিল-মন পরিস্কার করে নিশ্চিত হন যে সেখানে শধু ভালবাসাই থাকে, অতীতের তিক্ততার কোনো চিহ্ন নেই। তখনই কেবল আপনারা ইংরেজদের বলতে পারবেন, “দয়া করে আমাদের দেশকে আমাদেরই শাসন বা দুঃশাসন করতে দিন। এটা শুধু আমাদের ব্যাপার। আর আপনারা চাইলে বন্ধু এবং বিশিষ্ট অতিথি হিসেবে যখন খুশি ফিরে আসতে পারেন, আমাদের শাসক হিসেবে নয়।” তখন আপনারা দেখতে পাবেন জন বুল কীভাবে তার স্যূটকেস গোছাচ্ছে। তবে নিশ্চিত হোন যে আপনাদের হৃদয়ে তিক্ততা নয় ভালবাসা আছে।’ শ্রীরাম মাইক্রোফোনের পাশের স্বপ্ন-বালিকাটির দিকে তাকিয়ে মনে মনে বললো, ‘অবশ্যই এটা তিক্ততা নয়। আমি তাকে ভালবাসি।’ ‘কিন্তু, ’ মহাত্মাজী বলছিলেন, ‘আমার যদি ন্যূনতম সন্দেহ থাকে যে আপনার হৃদয় নিখাদ নয় কিংবা সেখানে তিক্ততা আছে, তাহলে আমি ইংরেজদের বরং থেকে যেতে বলবো। দুই মন্দের মধ্যে এই ভাল।’ শ্রীরাম চিন্তা করলো: ‘ওহ্ , শ্রদ্ধেয় মহাত্মাজীর আর কোনো সন্দেহ নেই যে আমার হৃদয় নিখাদ ও তিক্ততাহীন। এমন এক স্বর্গীয় সৃষ্টির জন্য আমার হৃদয়ে কীভাবে তিক্ততা থাকতে পারে?’ মেয়েটি মঞ্চের অনেক উঁচুতে ছিলো। বিকেলের রবি তার মুখাবয়বকে প্রজ্জ্বলিত করে রাখলেও তার মুখখানি অস্পষ্ট দেখাচ্ছিলো। সে বেশ কালো হয়ে থাকতে পারে। তবুও তার মুখখানি রবির কিরণোচ্ছটায় আপাতত ফর্সা দেখাচ্ছিলো। কিংবা সে হয়তো ফর্সা। যদি সে কালো হয়, তাহলে তার সাথে বিয়েতে ঠাকুরমা নিঃসন্দেহে সায় দেবে না। যাই হোক, এটা তো অসম্ভব নয় যে তারা তার আশীর্বাদ পাবে না। কেননা তার বিয়ের জন্য ঠাকুরমার পরিকল্পনা ছিলো-- কুম্বুমে বড় হওয়া তার এক ভাইয়ের খুবই ভয়ংকর, গেঁয়ো এক নাতনী যে তার টাকা পাহারা দিতো--তার সাথে বিয়ে দেওয়া। ঠাকুরমা শ্রীরামের টাকা নিয়ে যদি এতোই উদ্বিগ্ন থাকে, তবে পুরো টাকাটা নিয়ে সেই কুম্বুম বালিকাকে দেওয়াটাকে সাদরে গ্রহণ করা যায়। দুই মন্দের মধ্যে এটাই ভাল। কিন্তু সে কুম্বুম বালিকাকে বিয়ে করতে পারবে না। যে মেয়েকে কিনা পাড়া গাঁয়ের চকচকে শাড়ি পরলে আর ছপছপে তেলে আঁটসাঁট বেণী ঘাড়ে ঝুলিয়ে রাখলে কুৎসিত এক জীবের মতো লাগে। অথচ সেখানে তার খদ্দের শাড়ি পরা উচিৎ ছিলো। যে খাদি পোশাক পরবে না, তার দিকে শ্রীরাম তাকাবেই না। কেবল খাদি পোশাকই জাতিকে ধ্বংসের হাত থেকে বাঁচাচ্ছে এবং ইংরেজদের ভারত ছাড়া করছে যেমনটা শ্রদ্ধেয় সাধু মহাত্মাজী অক্লান্তভাবে ব্যাখ্যা করলেন। সে এই ভেবে বিষন্ন বোধ করলো যে এই বিংশ শতকেও কুম্বুম বালিকার মতো মানুষ আছে, যাকে সে বহু বছর আগে গ্রামে দেওয়ানি মামলায় তার কাকা কর্তৃক এক আইনজীবী নিযুক্ত করার সময় দেখেছিলো। মহামঞ্চের উপরকার মেয়েটিকে শ্রীরাম নিজে গিয়ে আশ্বস্ত করতে চাইলো যে সে সামান্যতম আপত্তি ছাড়াই তার চেহারা সুরত ও পোশাক-আশাক পুরোটাই ভাল লেগেছে। এটা তার কাছে গিয়ে বলাটা অপরিহার্য ছিলো। সমাবেশ শেষে সে সুযোগটা লুফে নিলো। মঞ্চ থেকে মহাত্মাজী নামতে শুরু করলেন। সামনের দিকটায় হুড়োহুড়ি হলো; কিছু স্বেচ্ছাসেবক মঞ্চের চারপাশের জায়গাটা রুদ্ধ না করার জন্য অনুরোধ করে জনতাকে পিছনে ঠেলে দিতে লাগলো। মহাত্মাজীকে তার চারপাশের এতো গোলমাল বিষয়ে বিস্মৃত মনে হলো। স্বেচ্ছাসেবকদের রক্ষা বেষ্টনী মধ্যে শ্রীরাম ফাঁক পেয়ে ঢুকে গেলো। সূর্যের তাপ তার ঘাড়ে এসে লাগছিলো; নদীর কিনারার বিশাল গাছগুলি জনতার হৈ হুল্লোড় ছাপিয়ে খস খস আওয়াজ করছিলো; পাখিরা নিচের এতো গোলমালে অনভ্যস্ত হওয়ায়, ডালে ডালে কিচিরমিচির করছিলো। জনতা এতো বিশাল হওয়ায় শ্রীরাম কোথায়, শহরের কোন অঞ্চলে ছিলো তা ভুলে গেছে। কিন্তু পাখির কলকাকলির জন্যই শুধু তার মনে পড়লো যে সে সরায়্যুর তীরে আছে। ‘মেয়েটি যদি মহাত্মাজীর সাথে থাকতে পারে, তাহলে আমিও সেখানে থাকতে পারি,’ জনতার ভীড় ভেঙ্গে ক্ষুব্ধ হয়ে সে বললো। সাদা টুপি পরা অনেক তরুণ স্বেচ্ছাসেবক ছিলো যারা মহাত্মাজীর সামনের পথ পরিস্কার করে দিয়েছিলো। শ্রীরামের মনে হলো যে সম্ভবত ঘৃণিত কারখানা থেকে তৈরী হাফ হাতা শার্ট ও মুল ধুতি পরে এতো স্পষ্টভাবে যদি নিজেকে আলাদা না করে রাখতো, তবে অনেক ভাল হতো। তার আশঙ্কা হলো যে কোনো মুহুর্তে কেউ তাকে দেখে ফেলতে পারে এবং বের করে দিতে পারে। যদি তারা তাকে চ্যালেঞ্জ ছুড়ে জিজ্ঞেস করে, ‘তুমি কে?’ তার মনে হলো সে সঙ্গত কোন উত্তর দিতে পারবে না অথবা বড় জোর সরস জবাব দিতে পারে, ‘আপনারা কার সাথে কথা বলছেন বলে মনে হয়? মহাত্মাজীর সাথে যে মেয়েটি দেখছেন সে আমার পরিচিত। আমি তাকে জানবো, কিন্তু আমাকে তার নাম জিজ্ঞেস করবেন না। সে একদিন বাজারে টাকা তোলার বাক্স নিয়ে এসেছিলো...’ কিন্তু এমন কোন উপলক্ষের উদ্ভব হলো না। কেউ তাকে প্রশ্ন করলো না। সে শীঘ্রই স্বেচ্ছাসেবকদের গড়া লেন দিয়ে মহাত্মজীর পিছন পিছন হাঁটা একদল লোকের সাথে মিশে গেলো। আর জনতা পাশ দিয়ে লাইন ধরে চললো। কেউ তাকে না থামালে সে চলতে থাকার সিদ্ধান্ত নিলো। যদি কেউ তাকে থামায় , তবে সে যে কোনো সময় ঘুরে বাড়ি যেতে পারে। তারা তো তাকে আর মেরে ফেলবে না। ‘মেরে ফেলা!’ এ শব্দগুচ্ছে সে আমোদিত হলো: যে ব্যক্তি ইংরেজদেরও আঘাত করতে চান না, তাঁর ধারের কাছে এমন কোনো শব্দই সঙ্গত হতে পারে না। যে কেউ আত্মবিশ্বাস রাখতে পারেন তাঁর স্বেচ্ছাসেবকরা ভাবী একজন অনুসারীকে হত্যা করুক এটা তিনি কখনোই হতে দেবেন না। শ্রীরাম এখন এমন একটা সুবিধাজনক অবস্থান খুঁজে পেলো যে অনুপ্রবেশকারী হিসেবে ঢুকে পড়ার সব ভয় তার উবে গেলো। হালকা মনে পরিচিত ভাব নিয়ে সে হাঁটতে থাকলো যাতে করে রাস্তার সারিবদ্ধ লোকজন তার দিকে আগ্রহভরে তাকায়। সে তার নাম ডাকতে শুনলো। ‘শ্রীরাম!’ তার বহু বছর আগেকার এক শিক্ষক তাকে ডাকছিলো। এমন পরিস্থিতিতেও শ্রীরাম তার শিক্ষকের ডাক থেকে সহজে রেহাই পেলো না: এটা ছিলো প্রতিবর্তী ক্রিয়া: কিছুক্ষণের জন্য ইতস্তত করলো এই ভেবে যে ডাকে সাড়া না দিয়ে পালিয়ে যাওয়াটা ভাল হবে কিনা। কিন্তু তার মন প্রায় পড়ে ফেলেছের মতো শিক্ষক তাকে আবার ডাকলেন, ‘একটু দাঁড়াও, শ্রীরাম।’ সে তার স্যারের সাথে কথা বলার জন্য থামলো। তিনি ছিলেন বৃদ্ধ, রঙিন শালে ঢাকা, আর তাকে চিবুকের হালকা দাঁড়ি সমেত দেবদূতের মতো দেখাচ্ছিলো। তিনি ঔৎসুক্যভরে শ্রীরামের কনুই শক্ত করে ধরে জিজ্ঞেস করলেন, ‘ তুমি কি ওদের সাথে যোগ দিয়েছো?’ ‘কাদের সাথে?’ ‘তাদের সাথে--’ অঙ্গুলি নির্দেশ করে শিক্ষক বললেন। শ্রীরাম কিছুক্ষণের জন্য দ্বিধাবোধ করলো এই ভেবে যে তার কী জবাব দেওয়া উচিৎ, আর বিড়বিড় করে বললো, ‘আমি বোঝাতে চাচ্ছি...’ ‘বেশ তো, খুব ভাল, ’ শিক্ষক বললেন। ‘তুমি পরীক্ষায় খারাপ নম্বর পেলেও আমি সবসময়ই জানতাম তুমি অনেক দূর যাবে, স্মার্ট বয়। তুমি তো নির্বোধ নও, তবে অলস। ভালমতো কাজ করলে তুমি যে কারো মতো সবসময় প্রথম শ্রেণীর নম্বর পেতে। কিন্তু তুমি সবসময় আলসেমি করতে; আমার মনে আছে যখন তোমাকে ইংল্যান্ডের রাজধানী কোথায় জিজ্ঞেস করা হলো তখন তুমি তোতলাচ্ছিলে। হো! হো! ’ স্মৃতি হাতরে তিনি হাসলেন। অধৈর্য্য হয়ে শ্রীরাম একটা মোচড় দিলো। শিক্ষক বললেন, ‘তোমাকে এখানে দেখতে পেয়ে আমি গর্বিত, সোনা। কংগ্রেসে যোগ দাও, দেশের জন্য কাজ করো, তুমি অনেক দূর যাবে, ভগবান তোমায় আশীর্বাদ করুক...’ ‘আমি আনন্দিত যে আপনি এভাবে চিন্তা করছেন, স্যার, ’ শ্রীরাম এ কথা বলে ছুটে যাওয়ার জন্য ঘুরে দাঁড়ালো। শিক্ষক শ্রীরামের কানের কাছে তার মুখ এনে ফিসফিস করে বললেন, ‘ওখানে ঢোকার পর মহাত্মাজী এখন কী করবেন?’ ‘কোথায়?’ গান্ধীকে অনুসরণ করলেও তিনি কোথায় যাচ্ছিলেন তা না জেনে শ্রীরাম জিজ্ঞেস করলো। ‘তাঁর কুটিরে, ’ শিক্ষক জবাব দিলেন। ‘উনি হয়তো বিশ্রাম নেবেন, ’ দৃঢ়প্রতিজ্ঞ হয়ে ছুটে যাওয়ার প্রস্তুতি নিয়ে শ্রীরাম জবাব দিলো। তিনি যদি নিজের ও দলের মধ্যে বিরাট এক ব্যবধান হতে দিতেন, তাহলে তারা তাকে স্বীকার করতো না। ছোট্ট একটা বালক ঠেলা দিয়ে সামনে এসে জিজ্ঞেস করলো, ‘আমাকে মহাত্মার অটোগ্রাফ এনে দিতে পারেন?’ ‘অবশ্যই না,’ শিক্ষকের কবজা হতে রেহাই পেতে হালকা চেষ্টা করে শ্রীরাম জবাব দিলো। শিক্ষক তার কানে ফিসফিস করে বললেন, ‘যাই ঘটুক না কেন, দেশকে ডুবিও না।’ ‘না, স্যার, কখনো না, আমি কথা দিচ্ছি, ’ বৃদ্ধ শিক্ষককে মৃদু ঠেলা দিয়ে দৃষ্টি থেকে দ্রুত অপসৃয়মান দলটির পিছনে ছুটতে ছুটতে সে উত্তর দিলো। কাঁটা ও বাঁশ দিয়ে নির্মিত একটি ছোট দরজার কাছে তারা আসলো। সে দেখলো মেয়েটি সামনে এগিয়ে দরজাটি খুলছে। যখন জনতা দেখলো তখন সে পূর্ণবেগে সামনে দৌড় দিলো। তার পদক্ষেপে একটা বাড়তি আশ্বাসের আভাস ছিলো। এখন তার মনে হলো সে কংগ্রেসের। শিক্ষক তার মাথায় নতুন এক চিন্তা ঢুকিয়ে দিয়েছিলো। সে নিজেকে একজন দলের কেউকেটা প্রায় ভাবলো। শীঘ্রই সে দলে যোগ দিয়ে মেয়েটির পাশে বসার মতো যথেষ্ট সাহস দেখালো। তার জন্য এটা গর্ব করার মতো মুহুর্ত ছিলো। সে মেয়েটির দিকে তাকালো। মেয়েটি মনে হলো তার উপস্থিতি খেয়াল করেনি। শ্রীরাম শিহরণে ঘামছিলো আর হাঁপাচ্ছিলো, কিন্তু মেয়েটির ব্যক্তিত্ব, গায়ের রঙ অথবা মুখের প্রত্যঙ্গের খুঁটিনাটি বুঝতে পারলো না। অবশ্য সে সন্তোষজনকভাবে লক্ষ করলো যে সে মাঝারি উচ্চতার হওয়ায় মেয়েটি তার চেয়ে বেশি লম্বা ছিলো না। গান্ধী তাকে কী যেন বলছিলো, আর সে তাতে মাথা নেড়ে সায় দিয়ে হাসছিলো। শ্রীরাম বুঝতে পারলো না তারা কী বলাবলি করছে, কিন্তু সহানুভূতিশীল শ্রদ্ধা থেকে সেও হাসলো। তাদের মতো যতোটা সম্ভব সে তাকাতে চাইলো, আর সেদিন কারখানার কাপড় পরে আসার জন্য নিজেকে শতবার ধিক ধিক জানালো। মহাত্মা তাঁর কুটিরে প্রবেশ করলেন। নদী তীরে বসবাসকারী নগর স্ইুপারদের ডজন খানেক কুটিরের মধ্যে এটি একটি ছিলো। শহরের সবচেয়ে খারাপ এলাকার মধ্যে হয়তো এটি একটি ছিলো, আর অতিরঞ্জিত করে একে কুটির বলা হতো। এগুলো ছিলো বাসের অনুপযোগী জীর্ণ কুঁড়েঘর; ছেঁড়া খড়, টিন ও নারিকেল ছোবড়ার টুকরো দিয়ে নির্মিত যেখানে সবাই গাদাগাদি করে থাকতো আর মোরগগুলো কক কক করে বেড়াতো এবং শিশুরা রাস্তার ধূলোয় বড় হতো। এখানে পৌরসভা থেকে হয় কোনো কাজ করা হয়নি নয় বাদ দিয়ে গেছে, যদিও পৌরসভা জীর্ণ কুটিরে বসবাসকারী মানুষগুলোকে শহরের ময়লা আবর্জনা পরিস্কার করার জন্য নিযুক্ত করেছিলো। তাদেরকে মাসে মাথাপিছু দশ টাকা পারিশ্রমিক দেওয়া হতো। আর তারা যেহেতু চার পাঁচটা পরিবারে কাজ করতো, সেহেতু প্রত্যেকে মালগুদির মানে বেশ টাকা কামাতো। তারা কুটিরে থাকতো না বললেই চলে। পৌর ভবনের চারপাশে কিংবা নিকটবর্তী সরকারি মদের দোকানে তাদের সবটুকু সময় কাটতো। এতে তাদের কামাইয়ের সবটুকু টাকা খোঁয়া যেতো। এ মানুষগুলো তাদের আয়ের দশ ভাগেরও কম টাকা নাওয়া-খাওয়ার পেছনে ব্যয় করতো। বেঁচে থাকার তাগিদে অবসর সময়ে ভিক্ষাবৃত্তির উপর সব সময় নির্ভরশীল ছিলো। গভীর রাতে মালগুদির সব আধা অন্ধকার রাস্তায় তাদের ভিক্ষা চাওয়ার চেঁচামেচি শোনা যেতো। তাদের আগমনে জ্বালাতনকারী শিশুদের নীরব করে দেওয়া হতো। এদের সম্পত্তিও নাই বললে চলে; কোনো গরু কিংবা বাছুর মারা গেলে, মৃতদেহটা দূরে ফেলে দেওয়ার জন্য এদেরকে ডাকা হতো। আর তখন নদী তীরের কলোনী উজ্জ্বল রং ধারণ করতো; কারণ মৃত পশুর মাংসে তারা ভোজ খেয়ে এর চামড়াটা বিকিয়ে টাকা কামাতো। সংস্কারপন্থীরা এতে বেশ উষ্মা ও শঙ্কা প্রকাশ করেছিলেন, কিন্তু তেমন কিছুই করেননি। এর কারণ ছিলো অস্পৃশ্য জাত হিসেবে এরা নালাপ্পা কুঞ্জের ওপারে শহবের সীমানা ছাড়িয়ে যেখানে কেউ যেতো না, সেখানে বাস করতো। আর নদীর ভাটির দিককার একটি অংশ এরা ব্যবহার করতো। মালগুদি পরিদর্শনকালে গান্ধী থাকার জন্য যে শিবিরটি নির্বাচন করেছিলেন সেই শিবিরে বসবাসকারী মানুষদের জীবনের পটভূমি এমনই ছিলো। পৌরসভার চেয়ারম্যান, নাতেশ সাহেবের কাছে এ ব্যাপারটা বজ্রপাতের মতো ছিলো, যিনি গান্ধীকে অভ্যর্থনা করার জন্য অভিজাত লাওলি এক্সটেনশনের প্রাসাদের মতো বাড়ি, নীল বাগ কয়েক সপ্তাহ ধরে প্রস্তুত করছিলেন। মহাত্মাজীর নিমন্ত্রাতা তিনি কেন একা হবেন সে ব্যাপারে তার যুক্তি অখন্ডণীয় মনে হলো: ‘এ পর্যন্ত বিল্ডিং, বাগানে দুই লাখ টাকা খরচ হয়েছে; আর শুধু চত্বরেই গেছে পচিঁশ হাজার টাকা। আমি কী জন্য এটা করেছি বলে আপনাদের মনে হয়? আমি একজন সাধারণ মানুষ, স্যার, আমার চাহিদাও খুব সাধারণ। বিলাসিতা আমি চাই না। আমি কুটিরেও থাকতে পারি, কিন্তু যে জন্য এ বাড়ি আমি এভাবে নির্মাণ করেছি তা হলো যাতে আমার জীবদ্দশায় একবার হলেও মহাত্মাজীর মতো মহান ব্যক্তিকে আমি অভ্যর্থনা জানাতে পারি। এ শহরে যখনই তিনি আসবেন, শুধু এ বাড়িতেই তিনি আরামদায়কভাবে থাকতে পারেন। গর্ব না করে একটা কথা বলি, মালগুদিতে এটাই হচ্ছে সবচেয়ে বড় ও সুসজ্জিত বাড়ি। আর আমাদের মানে মালগুদির মানুষদের একটা দায়িত্ব আছে তাকে যথাসাধ্য প্রদান করার। তা হলে ভাবুন কী করে আমরা তাকে নোংরা জায়গায় থাকতে দিতে পারি?’ তার বক্তৃতায় অভ্যর্থনা কমিটি হাততালি দিলো। জেলা প্রধান ডিসট্রিক্ট কালেকটর ও তাঁর নিচের কর্মকর্তা পুলিশের ডিসট্রিক্ট সুপারিন্টেন্ডেট পদাধিকার বলে উপস্থিত ছিলেন। ভিন্নমত পোষণকারী একটা কণ্ঠস্বর ভেসে এলো, ‘মহাত্মাজীকে সার্কিট হাউস দিলেন না কেন?’ শহরের প্রান্তে সার্কিট হাউসটি ছিলো ট্রাঙ্ক রোডে এক একর জমির উপর ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানীর পুরানো এক বিল্ডিং। অবরোধের হাত থেকে ত্রিচিনোপলিকে মুক্ত করার লক্ষে রবার্ট ক্লাইভের এখানে বিরতি নেওয়ার কথা ছিলো। এই ভবন নিয়ে মালগুদির নাগরিকরা গর্ব বোধ করতো এবং অন্য কেউ এ শহরে এলে তাকে দেখানোর সুযোগ কখনো হাতছাড়া করতো না। এ পথে আসা বিশিষ্ট পরিদর্শকবর্গ এ বাড়িতে থাকতেন। সেখানে তাদেরকে আপ্যায়ন করতে পারা গভর্নরদের জন্য সম্মানজনক বিষয় ছিলো। এই প্রত্যন্ত অঞ্চলেও তাদের আয়োজনে উজ্জ্বল, পরিচ্ছন্ন বাথরুমসহ সুযোগ-সুবিধার কোনো কমতি ছিলো না। সামনের দিকটায় কাচবিশিষ্ট বে রূমের বদৌলতে এটি গ্লাস হাউস নামেও পরিচিত ছিলো যেখান থেকে বিশিষ্ট অতিথিবৃন্দ সে যুগে রাতের বেলায় ভবনটির কাছে ঘুরে বেড়ানো বন্য প্রাণীদের দেখতে পেতো। অভ্যর্থনা কমিটির ভিন্নমত পোষণকারী কণ্ঠস্বর থেকে শোনা গেলো, ‘সার্কিট হাউস পাওয়া কি শুধু শাসক গোষ্ঠীরই অধিকার? আমাদের মহাত্মাজী কি এর যোগ্য নন?’ এই সম্মানজনক ব্রিটিশ ভবনের জিম্মাদার কালেকটর এ প্রশ্নের জবাবে দাঁড়িয়ে সেই কণ্ঠস্বরের লোকটিকে মৃদু ভৎর্সনা করলেন: ‘এই মুহুর্তে অবান্তর কথা বলা শোভন নয়: আমরা যদি সার্কিট হাউসকে অনুপযোগী বিবেচনা করে থাকি, তা এই কারণে যে গান্ধী সাহেবকে সাদরে বরণ করার জন্য এটা ঠিকঠাক করার সময় আমাদের নেই।’ মহাত্মা না বলে গান্ধী সাহেব বলাটা তার জন্য পেশাগত সম্মানের বিষয় ছিলো। কালেকটর হিসেবে তিনি যদি পুরো সভাটা শেষ না করতেন এবং সকল সদস্যকে ভারতের প্রতিরক্ষা আইনে গরাদের পিছনে না রাখতেন, তাহলে অনেকেই প্রতিবাদ জানিয়ে ওয়াক আউট করতো। কিন্তু তারা শান্তি বজায় রেখেছিলো এবং তিনি সেটা স্পষ্ট বুঝতে পেরেছিলেন। ‘গান্ধী সাহেবের আসাটা আকস্মিক সিদ্ধান্ত হওয়ায় তাঁর জন্য ভবনটি স্বাভাবিকভাবেই আমরা প্রস্তুত রাখতে পারিনি। আমি এমনটা বলতে পারি আমাদের চেয়ারম্যানের বাড়িটা এ উদ্দেশ্য সিদ্ধ করার জন্য উপযুক্ত ছিলো। এতো দয়াপরবশ হয়ে তিনি আমাদের কথা রেখেছেন এ জন্য তার কাছে আমরা অবশ্যই কৃতজ্ঞ থাকবো।’ ‘আর মহাত্মাজীর অবস্থানের জন্য আমার বাড়ি ছেড়ে আমি গ্লাস হাউসে উঠার ব্যবস্থা করছি।’ এটাই সিদ্ধান্ত মনে হলো। আর তার দলের লোকেরা জোরে করতালি দিলো। দশ-এক ভোটে সিদ্ধান্ত হলো যে মহাত্মাজী নীল বাগেই থাকবেন । এরপর চেয়ারম্যান ভারী, গুরুগম্ভীর দৃষ্টি নিয়ে সভা ত্যাগ করলেন। তিনি গান্ধীজীর সেক্রেটারিকে চিঠি লিখলেন এবং পরবর্তী সভায় গৃহীত জবাবটি পাঠ করলেন: ‘মহাত্মা গান্ধী ইচ্ছা পোষণ করেছেন যে তার থাকা-খাওয়ার ব্যাপারে বিশেষ কোনো কষ্ট স্বীকার না করা হোক, আর তিনি সেখানে সশরীরে উপস্থিত না হওয়া পর্যন্ত এ বিষয়টি বাদ থাক।’ পরিষদে চিঠির অর্থ নিয়ে বাক-বিতণ্ডা শেষে স্থির করা হলো যে চিঠির মানে ছিলো যে মহাত্মা যদিও কোনো কিছুতে প্রতিশ্র“তিবদ্ধ হতে অনিচ্ছুক ছিলেন, তবুও তিনি নীল বাগে থাকতে অস্বীকৃতি জানাবেন না। ভিন্নমত পোষণকারী কণ্ঠস্বরটি বললো, ‘তিনি যে অন্য কিছু বোঝাচ্ছেন না তা আপনারা কীভাবে জানেন?’ কিন্তু কালেকটরের মৃদু ভৎর্সনায় কণ্ঠস্বরটি নিশ্চুপ হয়ে গেলো। পরিশেষে অর্থোদ্ধার করা হলো এমন, ‘আমি মহাত্মাজীর মনকে বুঝি, যদি এটা কষ্টেরই বিষয় হয়, তবে তিনি কাউকে কষ্ট দিতে চান না।’ ‘তিনি হয়তো জানেন না এতে আমাদের আদৌ কোনো সমস্যা নেই।’ ‘বিলকুল, বিলকুল, ’ আরেক ভবিষ্যৎবক্তা বললেন। আর তারা সকলে এ ব্যাখ্যায় পুরোপুরি সন্তুষ্ট হলো। আরো একজন যিনি চেয়ারম্যানের কাছে নিজের সম্পর্কে ভাল ধারণা সৃষ্টি করতে চেয়েছিলেন, আরেকটি তোষামোদজনক তুলনা টানলেন: ‘আমরা যেন ভুলে না যাই যে মহাত্মাজী দিল্লী ও কলকাতায় বিরলা হাউসে থাকার ব্যবস্থা করেছেন। আমি নিশ্চিত করে বলতে পারি আমাদের চেয়ারম্যান প্রাসাদসম যে ভবন বানিয়েছেন সেখানে থাকতে তিনি কোনো আপত্তি জানাবেন না।’ ভিন্নমত পোষণকারী কণ্ঠে ভেসে এলো, ‘যদি আমরা তাকে ঠিকমতো বুঝে থাকি, তাহলে লিখিত আকারে জিজ্ঞেস করে তাঁর অনুমোদন নেওয়া আমাদের জন্য কি ভাল কাজ হবে না?’ এই কণ্ঠে পুরো কথাটি বিরক্তিসূচক হিস হিস শব্দ করে শেষ হতে দেওয়া হলো না। পুলিশের ডিস্ট্রিক্ট সুপারিন্টেন্ডেট ধীরে ধীরে বললেন, ‘নিরাপত্তার ব্যবস্থা করতে গেলেও যে কোনো জায়গা ঝামেলাপূর্ণ হবে।’ এই ভাবাবেগের দরুণ তাঁর উপরস্থ পদে আসীন ডিস্ট্রিক্ট কালেকটরের কাছ থেকে প্রশংসাসূচক সম্মতি লাভ করলেন। গান্ধীজী পৌঁছালে পর উৎসবপূর্ণভাবে তাকে অভ্যর্থনা জানানো হলো। মালগুদির রুই-কাতলা ও স্থানীয় অভিজাত সম্প্রদায়কে পৌরসভার চেয়ারম্যান এক এক করে পরিচয় করিয়ে দিলেন। পুলিশ জনতাকে নিয়ন্ত্রণ করতে গেলো। জনতা তখন বিরামহীনভাবে চিৎকার করছিলো, ‘মহাত্মা গান্ধীর জয় হোক।’ রেলওয়ে স্টেশনের বাইরে স্থাপত্য-অলংকারসহ জাঁকালোভাবে নির্মিত খিলান পথে যখন চেয়ারম্যান তাঁর স্বাগত ভাষণ পাঠ করলেন, তখন তাঁর কথা শোনা না যাওয়ায় তিনি হতাশ হলেন। স্থানীয় এক সাংবাদিকের সহায়তায় ভাষণটি তৈরি করতে তাকে গোটা এক সপ্তাহ ব্যয় করতে হয়েছিলো। এ ভাষণে তিনি তাঁর হয় দেশপ্রেম নয় মালগুদি দেশের জীবনে যে বিশিষ্ট স্থান অধিকার করে আছে তা যোগ করে দিয়েছিলেন। ভাষণটি মুদ্রণে যাওয়ার আগে কালেকটর কষ্ট করে একবার পড়েছিলেন এটা নিশ্চিত করতে যে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যকে অবমাননা করা, যুদ্ধের চেষ্টাকে বাধাগ্রস্ত করা, আর কোনোভাবেই সামরিক গোপনীয়তার সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করার মতো কিছু নেই । কয়েকটা জায়গায় অবশ্য তিনি কাটছাঁট করেছিলেন: যেখানে চেয়ারম্যান মালগুদিকে সুইজারল্যান্ডের সাথে তুলনা করেছিলেন (এটা বাদ দেওয়ার কারণ ছিলো তাঁর ধারণায় এতে নিরপেক্ষ রাষ্ট্র বিব্রত হতো); যেখানে মোজার ব্যবসার উল্লেখ ছিলো (কেননা তাঁর মতে এতে চোখে পড়ার মতো চেয়ারম্যানের পণ্যের বিজ্ঞাপন ছিলো এবং কোনো অবস্থাতেই তিনি চাননি শত্র“র প্লেন এসে খুঁজে বেড়াক এই ভেবে যে এটি যুদ্ধ সরঞ্জামের ছদ্মবেশধারী একটি প্রতিষ্ঠান); আর যেখানে রাজনৈতিক ক্ষেত্রে গান্ধীজীর কাজের আভাস ছিলো। সামাজিক সংস্কারক হিসেবে তাঁর চিত্রটি অক্ষুন্ন রাখা হয়েছিলো, এমনকি বর্ধিত করা হয়েছিলো; যিনিই ভাষণটি পড়লেন, তিনিই এই সিদ্ধান্তে উপনীত হলেন যে রাজনীতিই ছিলো শেষ জিনিস যাতে গান্ধীজী আগ্রহী ছিলেন। যাই হোক, অভ্যর্থনার কথা বিবেচনা করে কালেকটর গোটা বিষয়টাকে যেমন আছে তেমনই রেখে দিতে পারতেন, যেহেতু ‘মহাত্মাজীর জয় হোক’ এবং ‘পৌরসভার চেয়ারম্যান নিপাত যাক’ চিৎকারে ভাষণটি শোনা গেলো না। জনতা এতো গোলমাল করছিলো যে মহাত্মাজীকে দু’একবার প্রতিবাদ করতে হয়েছিলো। তিনি হাত উপরে তুললে, জনতা সরে গিয়ে তাঁর কথা শোনার জন্য অপেক্ষা করছিলো। তিনি শান্তভাবে বললেন, ‘এটা স্রেফ শৃঙ্খলার অভাব, যার আমি প্রশংসা করতে পারছি না। আপনাদের চেয়ারম্যান কিছু একটা পড়ছেন, আর আমি ভদ্রতাবশত তিনি যা বলছেন তা শুনতে বাধ্য। আপনাদের সবাইকে অবশ্যই শান্ত থাকতে হবে। তাকে পড়তে দিন।’ ‘না, ’ জনতা চিৎকার করে উঠলো। ‘আমরা মহাত্মাজীর কথা শুনতে চাই, চেয়ারম্যানের কথা নয়।’ ‘হ্যাঁ, ’ মহাত্মাজী জবাব দিলেন। ‘আপনারা শীঘ্রই এক ঘন্টার মধ্যে সরায্যু নদীর তীরে আমার কথা শুনবেন। এভাবেই কর্মসূচী সাজানো আছে।’ ‘কে সাজিয়েছেন?’ ‘কে সাজিয়েছেন, সেটা বড় কথা নয়। আমার এতে অনুমোদন আছে। সেভাবেই হচ্ছে। এক ঘন্টার মধ্যেই সরায্যুর চরে। আপনাদের চেয়ারম্যান তাঁর সদয় ভাষণের কোনো উত্তর ছাড়াই আমাকে অব্যাহতি দিতে সম্মত হয়েছেন। তাকে যা কিছু বলতে হয় তার সবকিছু আপনাদের শুনতে হবে, কেননা আমার খুবই ইচ্ছে হচ্ছে...’ এতে ক্ষিপ্ত জনতা কিছুটা শান্ত হলো এবং চেয়ারম্যান তাঁর ভাষণ পড়া চালিয়ে গেলেন, যদিও এমন বাক্য বিনিময়ে তাকে ভীত-সন্ত্রস্ত দেখাচ্ছিলো। কালেকটরকে অসন্তুষ্ট ও অস্থির দেখাচ্ছিলো এই বোধে যে ভিন্নমতের সদস্যটি যিনি সম্ভবত জনতার সব গোলমালের মূলে, তাকে হাজতে নেওয়া উচিৎ ছিলো। তিনি ঝুঁকে গিয়ে চেয়ারম্যানকে কানে কানে বললেন, ‘কিছু মনে করবেন না, ধীরে ধীরে পড়ে যান। তাড়াহুড়ো করে পড়ার দরকার নেই।’ কিন্তু চেয়ারম্যান মনে মনে বলতে লাগলেন, তাঁর পড়া শেষ হয় না কেন। জনতা আবার বিক্ষোভে ফেটে পড়ার আগে ভাষণটি শেষ করা নিয়ে তিনি উদ্বিগ্ন ছিলেন। তিনি শেষ করতে পারলেন না, যেহেতু তৎক্ষণাৎ জনতা বিপুল গর্জনে ফেটে পড়লো। এতে পুলিশ সুপারিন্টেন্ডেন্ট দ্রুত গিয়ে ব্যাপারটা কী তা দেখতে বাধ্য হলেন। এখন কোনো ব্যবস্থা নিতে গিলে অনেক বিবেচনা করে নিতে হবে, কেননা গান্ধী সব ধরনের পুলিশি ব্যবস্থাকে অপছন্দ করেন। স্থাপত্য-অলংকার নির্মিত খিলান পথ ও ‘গান্ধীর জয় হোক’ অনুরণনের মধ্য দিয়ে গান্ধী চেয়ারম্যানের রেখে যাওয়া বিশাল বেন্টলিতে গিয়ে চড়লেন। লোকজন সমস্ত পথের গাছে গাছে ও বাড়ির ছাদে-ছাদে বসে গান্ধীজী পথ অতিক্রম করায় করতালি দিলো। বাজার রোড থেকে শুরু করে বিভিন্ন রাস্তা পুলিশ ঘেরাও করে রেখেছিলো। তাই ছোট্ট মালগুদি স্টেশন থেকে লাওলি এক্সটেনশন পর্যন্ত পুরো পথ পরিস্কার ছিলো। সর্বত্র পুলিশ ছিলো, যদিও পুলিশের ডিস্ট্রিক্ট সুপারিন্টেন্ডেন্টের কাছে মনে হলো নিরাপত্তার ব্যবস্থা সন্তোষজনক নয়। সব দোকান-পাট বন্ধ ছিলো, আর সব স্কুল ও গোটা শহর এ ঘটনা উদযাপন করছিলো। গান্ধীজীর কথা ভেবে স্কুলের ছেলেমেয়েরা আনন্দ বোধ করছিলো। অফিসগামীরা খুশী ছিলো, এমনকি ব্যাংকও বন্ধ রাখা হয়েছিলো। তারা সবাই ঘন্টার পর ঘন্টা রোদে অপেক্ষা করে দেখলো যে গান্ধীজী বেন্টলিতে যাচ্ছেন, তাঁর সাদা কাপড় ও ফর্সা দেহে দ্যূতি ছড়াচ্ছে, আর দু’হাতের তালু এক করে নমস্কার জানাচ্ছেন। বাকিংহাম প্যালেসের গেটের অনুকরণে ঢালাই লোহা দিয়ে নির্মিত নীল বাগের গেটগুলো। তারা সেখানে পৌঁছালে সামনের আসনে বসা চেয়ারম্যান অপেক্ষা করেছিলেন তাকে জিজ্ঞেস করা হোক: ‘এ বাড়িটা কার?’ কিন্তু গান্ধীজী কোনো কিছু খেয়াল করলেন বলে মনে হলো না। ছাঁটা ঝোপের বেড়া, ফুলের চমৎকার সৌরভ ও উভয় পাশে প্রসারিত চত্বর বিশিষ্ট পথে তারা চলে গেলেন। আর গান্ধীজী অসতর্কতাবশত কোনো মন্তব্য করে ফেললে ধরে ফেলবেন এই আশায় তিনি কান খাঁড়া করে রাখলেন। কিন্তু তখনো গান্ধীজী কিছু বললেন না। তাঁর সেক্রেটারির দেওয়া কিছু কাগজপত্র দেখা নিয়ে ব্যস্ত ছিলেন। গান্ধীজী যে আদতেই গেটের মধ্যে ছিলো এ ভাবনায় চেয়ারম্যানের সর্বশরীরে আনন্দের শিহরণ বয়ে গেলো। তিনি সবকিছু সুন্দরভাবে আয়োজন করেছিলেন। কয়েক দিনের জন্য তাঁর নিজের সব জিনিস সার্কিট হাউসে পাঠিয়ে দিয়েছিলেন (এটি কালেকটর তাকে দিয়েছিলেন এই শর্তে যে তিনি এর দেয়ালগুলো চুনকালি করে এর কাঠের দরজা ও ঝাপগুলো আবার রঙ করবেন)। এই আত্মত্যাগের ভাবনায় তিনি শিহরিত হলেন। কিছু বছর আগে তিনি নিজের শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত কয়েকটি কক্ষ ত্যাগ করা এবং সার্কিট হাউসে নিজের ইচ্ছায় থাকার কথা অন্য কারো জন্য কখনো ভাবতে পারেননি। চেয়ারম্যান এখন তার সমস্ত বাড়িটা গান্ধীজীর কাছে সমর্পণ করলেন। তাঁর মাননীয় অতিথি ও দলের (সাদা খদ্দের পোশাকে নারী-পুরুষের বিবিধ সমাবেশ, যারা সামর্থ্যমতো মহাত্মাজীকে পরিচর্যা করতো এবং যেখানে সবাইকে একই রকম দেখাতো, আর যাদের নাম তিনি কখনো স্পষ্টভাবে জানেন না) হস্তক্ষেপ ছাড়া তাঁর নিজের পরিবারের জায়গা হওয়ার জন্য নিঃসন্দেহে এটি বড় জায়গা ছিলো। কিন্তু তিনি আর থাকতে চাননি; কেননা এমন একজন গণ্যমান্য ব্যক্তির সাথে একই ছাদের নিচে থাকা এবং তাঁর কাজে দেশপ্রেমমূলক উৎসর্গ বোধ থেকে একটুখানি গ্রহণ করা অসম্ভব মনে হলো। কাজেই তিনি সার্কিট হাউসে স্থানান্তরিত হওয়ার জন্য স্থির করলেন। তাঁর বাড়িতে তিনি কিছু পরিবর্তন সাধন করেছিলেন, যেমন- খদ্দের কাপড়ের পরিবর্তন করে জমকালো ছিটকাপড় লাগিয়েছিলেন, যার ফলে দরজার প্রবেশ পথ ও জানালাগুলো অলংকৃত হয়েছিলো, এবং শিকারী অভিজাত ব্যক্তি, অজানা দেবতা ও রাজাদের ছবিগুলো নামিয়ে রেখেছিলেন। এমনকি জর্জ ভী’র বিয়ের ছবি সরিয়ে সেখানে মওলানা আজাদ, জওহরলাল নেহেরু, সরোজিনী নাইডু, মতিলাল নেহেরু, সি. রাজাগোপালচারী ও অ্যানি বেসান্টের ছবি লাগিয়ে দিয়েছিলেন। তিনি তাঁর ম্যানেজারকে একটা নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে ‘আমাদের জাতীয় নেতাদের সহজলভ্য সব ছবি’ যোগাড় করতে আদেশ করেছিলেন। এ পাইকারী অর্ডার সন্তোষজনকভাবে পালন করা হলো। আর অন্য সব ছবি নামিয়ে ভূ-গর্ভস্থ কক্ষে পাঠানো হলো। গান্ধীর ভগবদ গীতায় পক্ষপাত ভালরূপে জানা থাকায় ভগবদ গীতার কৃষ্ণ অর্জুনের কথোপকথনরত একটি ছবিও তিনি সুবিবেচকের মতো সংগ্রহ করেছিলেন। নমুনা হিসেবে কয়েকটি চরকা তিনি গোবরাট ও আরো কয়েকটি জায়গায় রেখেছিলেন। এতো অতিরঞ্জনে সিনেমার কোনো শোভাকারও পরিবেশ সৃষ্টি করতে চাননি। এই ইফেক্ট আনার জন্য তিনি সারা পূর্ব রাত্রি কাজ করেছিলেন। আর নিজের জন্য একটি খদ্দেরের জিব্বা ও সাদা একটি গান্ধী টুপি, স্ত্রীর জন্য সাদা খদ্দের শাড়ি এবং ছেলের জন্য আগাগোড়া খদ্দেরও যোগাড় করেছিলেন। ছয় বছর বয়সী পুত্রের লম্বা মাথায় সাদা খদ্দেরের টুপি মানানসই করতে তিনি শহরে গাড়ি নিয়ে প্রায় একশ মাইল সন্ধান করেছিলেন এবং তাঁর শার্টের সামনে তিনরঙা পতাকা ও চরকার সূচকর্ম করে নিয়েছিলেন। প্রধান ভবনের কাছাকাছি এলে এখন তাঁর আশা ছিলো যে স্ত্রী ও পুত্র গান্ধীজীর সাথে সাক্ষাৎ করতে সঠিক পোশাক-আশাকে হাজির হবে। আশা ছিলো তাঁর স্ত্রীর কানেরই শুধু নয় পুত্রের কানেরও হীরার অলংকার খুলে রেখে আসার মতো সুবোধ স্ত্রীর থেকে থাকবে। এ ব্যাপারে তাদেরকে সাবধান করতে তিনি ভুলে গিয়েছিলেন। বাড়িটির সাজানো বারান্দায় যে মুহুর্তে গাড়িটা এসে থামলো, চেয়ারম্যান লাফ দিয়ে নেমে দরজাটি খুলে ধরে মহাত্মাজীকে নামতে সাহায্য করলেন। ‘আমার এই ক্ষুদ্র আবাসস্থলে আপনাকে স্বাগতম, মহামান্য স্যার,’ সঙ্গতভাবে কথা না বলতে পেরে তিনি বিভ্রান্ত হয়ে বললেন। মহাত্মাজী গাড়ি থেকে নেমে বাড়িটির দিকে তাকালেন। ‘এটা আপনার বাড়ি?’ তিনি জিজ্ঞেস করলেন। ‘জ্বী, স্যার, ভগবানের অসীম কৃপায় চার বছর আগে এটা আমি নির্মাণ করেছি।’ শুষ্ক কণ্ঠে চেয়ারম্যান বললেন। তিনি গান্ধীকে উপরের বারান্দায় নিয়ে গেলেন। খদ্দের মুদ্রিত কাপড়ে ঢেকে বারান্দায় তিনি একটি ডিভান রেখে দিয়েছিলেন। এর উপর গান্ধীকে বসিয়ে দিয়ে তাঁর সেক্রেটারিকে কানে কানে জিজ্ঞেস করলেন, ‘মহাত্মাজীকে কি এক গ্লাস কমলার রস দিতে পারি? কমলাগুলো মেমপিতে আমার নিজের এলাকা থেকে আনা।’ কিছু সংখ্যক পরিদর্শক ও বিভিন্ন ধরনের লোকজন আসছিলো আর যাচ্ছিলো। চেয়ারম্যানের মনে হলো যে মহাত্মাজীর উপস্থিতি বাড়ির দেয়ালগুলোকে ভূ-পাতিত করার ইফেক্ট সৃষ্টি করে গণ জায়গার রূপ দিয়েছে। কিন্তু সেখানে মহান ব্যক্তিকে রাখার জন্য এভাবেই মূল্য দিতে হলো। লোকজন চত্বরে উবু হয়ে বসেছিলো এবং চেয়ারম্যান অসহায়ভাবে দেখলেন যে পৌরসভার তদারককারী দিয়ে দেখাশুনা করা তাঁর বর্ষজীবী বাগানের ফুলগুলো কেউ কেউ ছিঁড়ছিলো। গান্ধী তাঁর দিকে ঘুরে জিজ্ঞেস করলেন: ‘আপনি কী বলছিলেন?’ তাঁর সেক্রেটারি তাকে কমলা খাওয়ার ব্যাপারে জানালো। গান্ধী বললেন: ‘হ্যাঁ, দিতে পারেন। আপনার নিজের বাগানের কমলা দেখে আমি খুশি হবো।’ চেয়ারম্যান উত্তেজনার সাথে দৌড়ে গিয়ে বড় একটা ট্রেতে একই ধরনের সোনালী কমলা আনলেন। তিনি হাঁপাচ্ছিলেন। আত্মদানে তিনি এতো দূর গিয়েছিলেন যে তাঁর পরিচারকদের কাছ থেকে স্বাভাবিক সেবা তিনি পাননি। মহাত্মাজীর সামনে তিনি ট্রেটি রেখে দিলেন। ‘মহান ব্যক্তির কাছে এ আমার ক্ষুদ্র নিবেদন: মেমপি পাহাড়ে আমার নিজের ফলেব বাগান থেকে এগুলো আনা,’ তিনি বললেন । ‘আজ সকালেই পাড়া হয়েছে।’ এরপর জিজ্ঞেস করলেন, ‘আপনাকে এক গ্লাস কমলার রস দেওয়ার সম্মান থেকে আমাকে কি বঞ্চিত করবেন?’ সারাদিন আপনার উপর কী ধকলটাই না গেছে!’ এখন কোনোকিছু খাওয়ার সময় তাঁর নয় এই ব্যাখ্যায় মহাত্মা অস্বীকৃতি জানালেন। একটা ফল নিয়ে ধীরে ধীরে আঙ্গুলের মধ্যে ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে দেখে প্রশংসা করলেন। চেয়ারম্যান এমন খুশি বোধ করলেন যেন তাকেই খুঁটে খুঁটে দেখে প্রশংসা করা হয়েছিলো। জনতার এক প্রান্তে দাঁড়িয়ে মহাত্মাজী ছোট্ট একটি ছেলেকে লক্ষ করে তাকে ইঙ্গিতে কাছে আসতে বললেন। ছেলেটি ইতস্তত করলে মহাত্মাজী হিন্দিতে বললেন, ‘আব, আব---’। এতে ছেলেটির মনে কোনো অভিঘাত সৃষ্টি না হলে তিনি দেশের এ অঞ্চলের যে দু’একটা তামিল শব্দ শিখেছিলেন, তাতে তাকে বললেন, ‘ইঙ্গে বা ’। অন্যরা ছেলেটিকে সামনে ঠেলে দিলে সে থেমে থেমে এলো। গান্ধী তাঁর ডিভানে তাকে বসতে বলে একটা কমলা দিলেন। এটা সিগন্যালের কাজ করলো। বর্তমানে ডিভানটি শিশুদের দিয়ে ভরে গেলো। ট্রেটি খালি হলে মহাত্মা চেয়ারম্যানকে জিজ্ঞেস করলেন: ‘আরো আছে?’ চেয়ারম্যান ভেতরে গিয়ে ঝুড়িতে করে আরো কিছু সরবরাহ করলেন। সবগুলো শিশু তাদের রিজার্ভ সাবাড় করে হৈ হুল্লোড় শুরু করলো, আর শীঘ্রই ঝুড়িটা আবার খালি হয়ে গেলো। ‘গাড়িতে কিছু ফুল ও মালা আছে, ’ গান্ধী তাঁর সেক্রেটারির কানে কানে বললেন। এগুলো বিভিন্ন সংস্থা তাকে সারা পথ ধরে তাঁর আসা উপলক্ষে উপহার দিয়েছিলো। গোলাপ ও জুঁই ফুলের সুরভিতে জায়গাটি ভরে গেলো। ফুলগুলো তিনি সমাবেশে আসা সকল ছোট্ট মেয়েদের মাঝে বিতরণ করলেন । উৎসবটি যে শিশুদের পার্টিতে রূপ নিচ্ছিলো তা ভেবে চেয়ারম্যান হতাশা বোধ করলেন। তাঁর আশা ছিলো যে কমলা ও ফুল পাওয়ার পর শিশুরা চলে যাবে, কিন্তু তাদেরকে তখনো সেখানে দেখতে পেলেন। ‘আমার মনে হয়, ওরা এখন আপেলের জন্য অপেক্ষা করছে!’ তিক্তভাবে ভেবে দেখলেন তিনি। গান্ধী পুরোদমে বিশ্রাম নিয়েছিলেন। তাঁর সেক্রেটারি তাকে বলছিলো: ‘পনের মিনিটের মধ্যে ---- থেকে প্রতিনিধিবর্গ এখানে হাজির হবে, আর তারপর----।’ একটা ইনগেজমেন্টের প্যাড থেকে তিনি পড়ছিলেন। চেয়ারম্যান দুঃখ প্রকাশ করলেন যে পুলিশের ডিস্ট্রিক্ট সুপারিন্টেডেন্ট ও কালেকটর উভয়কেই তাঁর বাকিংহাম প্যালেস পর্যন্ত অফিশিয়াল সৌজন্য হিসেবে শোভাযাত্রায় এসে ফিরে যেতে হয়েছিলো: তারা যদি এখন এখানে থাকতেন, তাহলে জনতাকে সামলে নিতে পারতেন। জনতা সারারাত থেকে যাওয়ার প্রস্তাব করবে কিনা এ বাস্তব দুশ্চিন্তা তাকে কিছুক্ষণের জন্য পেয়ে বসলো। কিন্তু তাঁর এ সমস্যা অপ্রত্যাশিতভাবে সমাধান হয়ে গেলো। মহাত্মাজী একটা শিশুকে অন্যদের থেকে আলাদা দাঁড়িয়ে থাকতে দেখলেন--- কালো রঙের ছোট একটি বালক যার পেটটি বেরিয়ে আছে, আর সারা শরীর জুড়ে পরিত্যক্ত, বয়স্কদের পরা, ফুঁটাসহ একটি অন্তর্বাস যা তার পায়ের গোঁড়ালি অবধি ছিলো তা ছাড়া কিছুই নেই। বাকিদের থেকে দূরে জনতার একেবারে এক প্রান্তে বালকটি দাঁড়িয়ে ছিলো। তার মুখমন্ডল কাদায় ঢাকা ছিলো; পাগুলো ছিলো নোংরা। সে তার হাতের আঙ্গুলগুলো মুখে গুঁজে দিয়ে বারান্দার চলমান দৃশ্য আগ্রহভরে দেখছিলো । বিস্ময় ও আকাঙ্খায় তার চোখ দুটো স্ফীত হয়ে ছিলো। কাছে আসতে তার সাহস হয়নি, যদিও কমলাগুলো তাকে টানছিলো। সে ভীড়ের মধ্যে একটু রাস্তা বের করার চেষ্টা করছিলো। মহাত্মার চোখ জনতার উপর দিয়ে ঘুরে এই বালকটির উপর নিবদ্ধ হলো--- তাঁর দৃষ্টি অনুসরণ করে চেয়ারম্যান হতভম্ব হলেন। তাঁর অসস্থি হতে লাগলো। মহাত্মাজী ঈশারায় ছোট্ট বালকটিকে ডাকলেন । তাঁর একজন গিয়ে বালকটিকে নিয়ে এলো। চেয়ারম্যানের রক্ত টগবগ করে উঠলো। মানুষের অবশ্যই গরীবদের পছন্দ করতে হবে, কিন্তু এমন নোংরা, অস্পৃশ্য একটা বালককে এনে কেন তাকে এতো গুরুত্বপূর্ণ করা হচ্ছে? কিছুক্ষণের জন্য তিনি মহাত্মাজীকে নিয়েই একটু বিরক্তি বোধ করলেন, কিন্তু শীঘ্রই একে পাপপূর্ণ আবেগ হিসেবে দমন করলেন। বিক্ষুব্ধহীনভাবে তাঁর চারপাশের ঘটনা পর্যবেক্ষণ করার জন্য তিনি পরিপার্শ্ব থেকে নিজেকে পর্যাপ্তভাবে বিচ্ছিন্ন করার প্রয়োজন বোধ করলেন। মহাত্মাজী ছোট পথশিশুটিকে তুলে তাঁর পাশে ডিভানে বসালেন। ‘হে প্রভু, দুনিয়ার তাবৎ ময়লা এই শিশুটার গায়ে লেপটে আছে, আর সে ঐ কাশ্মীরি বেড-কভারে তার স্থায়ী ছাপ রেখে যাচ্ছে।’ মহাত্মার আতিথেয়তা গ্রহণ করে বালকটি ডিভানে আরামেই ছিলো। সে মহাত্মার কাছ ঘেঁষে বসলো যখন তিনি জট পাকানো চুলগুলো আঙ্গুল দিয়ে ঠিক করছিলেন, আর তার সাথে ঘনিষ্ট আলাপে মত্ত হলো। চেয়ারম্যান তাদের কথার ধারা বুঝতে পারলেন না। তিনি কাছে এসে শ্রদ্ধাভরে শুনে দেখার চেষ্টা করলেন। এর যে পুরস্কার তিনি পেলেন তা ছিলো মহাত্মাজীর নিজের হাসি। বালকটি বলছিলো: ‘আমার বাবা রাস্তা ঝাঁড়– দেয়।’ ‘বড় ঝাটা দিয়ে না ছোট ঝাটা দিয়ে?’ মহাত্মা জিজ্ঞেস করলেন। বালকটি ব্যাখ্যা করলো, ‘তার ছোট বড় দুই ধরনেরই ঝাটা আছে।’ সে কমলার বিচিগুলো মুখ থেকে থু করে ফেলে দিলো। মহাত্মা যেন কার দিকে ফিরে ব্যাখ্যা করলেন: ‘তার মানে সে পৌরসভারও ঝাড়–দার আবার বাসা-বাডিতেও ময়লা-আবর্জনা পরিস্কার করে। বড় ঝাঁড়–টা পৌরসভার জন্য।’ ‘তোমার বাবা এখন কোথায়?’ ‘বাজারে কাজ করছে। কাজ শেষ হলে আমাকে বাড়ি নিয়ে যাবে।’ ‘আর তুমি এখানে কীভাবে আসতে পারলে?’ ‘রাস্তায় বসে বাবার জন্য অপেক্ষা করছিলাম আর জনতার সাথে চলে এলাম। গেট দিয়ে ঢোকার সময় কেউ আমাকে থামায়নি।’ ‘এই তো খুব চালাক ছেলে, ’ মহাত্মাজী বললেন। ‘তোমাকে দেখে আমার খুব খুশি লাগছে। কিন্তু ঐ বীচিগুলো এখানে সেখানে ফেলা তোমার ঠিক নয়, আসলে তুমি আর কখনো মোটেও এমন করে থু মারবে না। এমন করলে জায়গাটা অপরিস্কার হয়; তাতে অন্যদের সমস্যা হয়। কমলা খাওয়ার সময় অন্যরা তোমাকে যেন মোটেও না দেখে। একসাথে ছয়বার পরিস্কার করলেও জায়গাটা একদম অপরিচ্ছন্ন থাকবে। নিজের বুদ্ধিদীপ্ত মন্তব্যে তিনি সুখের হাসি হাসলেন, আর বালকটিকে বীচিগুলো দিয়ে কী করতে হবে, কীভাবে ছিলতে হবে এবং কমলার বাড়তি অংশের কী করতে হবে তা শিখিয়ে দিলেন। বালকটি আনন্দে হাসলো। আশপাশের সব লোক শ্রদ্ধাপূর্ণ মনোযোগের সহিত এসব লক্ষ করলো। তখন গান্ধী প্রশ্ন করলেন: ‘তুমি কোথায় থাকো?’ বালকটি হাত উপরের দিকে ছুঁড়ে অনেক দূর নির্দেশ করলো: ‘ঐ যে নদীর ধারে...’ ‘তুমি তোমার বাসায় আমায় যেতে দেবে?’ বালকটি ইতস্তত করে বললো, ‘এখন না--- কারণ, কারণ এতো দূরে।’ ‘ও নিয়ে তুমি চিন্তা করো না। তুমি দেখছো না, ঐ ধনী লোকটি আমাকে এখানে একটা মোটর-গাড়ি দিয়েছে। মুহুর্তের মধ্যেই আমি ওখানে যেতে পারি। মোটর গাড়িতে তোমাকেও নিয়ে যেতে পারি যদি তুমি তোমাদের বাড়িটা দেখিয়ে দাও।’ ‘ওটা তো এটার মতো বাড়ি নয়, ’ বালকটি বললো, ‘ বাঁশ না কিসের যেন তৈরী।’ ‘তাই নাকি!’ মহাত্মা বললেন। ‘তাহলে আমার আরো বেশি পছন্দ হবে।’ ওখানটায় আমি খুব সুখে থাকবো।’ যে প্রতিনিধিদল অ্যাপয়েন্টমেন্ট নিয়ে তাঁর সাথে দেখা করতে এসেছিলো তাদের সাথে তিনি অল্প সময় কথা বললেন। তারা চলে গেলে তিনি কিছু নোট করতে বললেন, কিছু নিজে লিখে রাখলেন। এরপর তাঁর কর্মচারীদের তুলে নিয়ে চেয়ারম্যানকে বললেন, ‘চলুন এই ছোট ছেলেটির বাসায় যাই। আমি নিশ্চিত আপনারও ভাল লাগবে।’ ‘এখন? ’ মহাতঙ্কে চেয়ারম্যান জিজ্ঞেস করলেন। তিনি অস্ফুট স্বরে বললেন, ‘আমাদের আগামীকাল গেলে হয় না?’ ‘না, আমি এ শিশুটিকে বাসায় নিয়ে যাবো বলে প্রস্তাব করেছি। তাকে অবশ্যই হতাশ করবো না। আমি ওর বাবাকেও দেখতে চাই, যদি পথে কোথাও তাকে দেখা যায়।’ মহাত্মাজী ছোট বালকটিকে তর্জনী এগিয়ে দিয়ে ধরতে বললেন এবং বারান্দা দিয়ে নামতে লাগলেন। চেয়ারম্যান বেদনার সাথে প্রশ্ন করলেন, ‘আপনি ভেতরে এসে আমার ক্ষুদ্র বাসাটার চারপাশ একবার দেখবেন না?’ ‘এটা কেমন হবে আমি জানি। অবশ্যই খুব জমকালো হবে। ঐ সব বিশাল বিশাল জায়গার মধ্য দিয়ে হাঁটানোর বিরক্তি থেকে আপনি আমার মতো একজন বুড়ো মানুষকে বরং রেহাই দিচ্ছেন না কেন? আমি একজন ক্লান্ত, বৃদ্ধ মানুষ। যাই হোক, এই ছোট্ট মানুষটির বাসায় আমাদের সাথে জলদি এসে পড়–ন। ভাল লেগে গেলে ওখানটায় আমাকে থাকতে দেবেন কিন্তু।’ চেয়ারম্যান অস্ফুট স্বরে বললেন, ‘আমার আশা ছিলো--- ’ কিন্তু গান্ধিজী তাকে হাসি দিয়ে একপাশে রেখে দৃপ্ত পদে যেতে যেতে বললেন: ‘আপনি চট করে আমার সাথেও আসতে পারবেন। কুটিরে এসে আপনাকে আমার সাথে থাকার দাওয়াত দিলাম।’ আর কোনোকিছু বলতে না পেরে চেয়ারম্যান শুধু জবাব দিলেন, ‘ঠিক আছে, স্যার, আসবো।’ মহাত্মার দাওয়াতের উষ্ণতায় চেয়ারম্যান হিসেবে তাঁর সমস্যাদি ও দায়িত্ব-কর্তব্যের কথা তিনি ভুলে গিয়েছিলেন। অন্য কোনো কিছু হলে তিনি ব্যাপারটা ভুলে যেতেন না যে সুইপারদের কলোনিটি শো পিস ছাড়া অন্য যে কোনোকিছু ছিলো। পরে যে পর্যন্ত না কালেকটর তাকে খুঁজে তার ত্র“টির জন্য অভিযুক্ত করে যে সে কী ভুলটাই না করেছিলো। কালেকটর বললেন, ‘আপনার কী একটুও সেন্স নেই, চেয়ারম্যান, গান্ধী সাহেবকে অন্ততপক্ষে দু’ঘন্টা দেরি করাতে পারতেন না, যে সময়ে মানুষজন ঐ ভয়ংকর জায়গাটা ঝাঁড়– দিয়ে পরিস্কার করতে পারতো? আপনিও জানেন, আমিও জানি জায়গাটা কিসের মতো!’ চেয়ারম্যান টু শব্দটি না করে সব সয়ে গেলেন। মহাত্মাজী যখন তার সাথে কথা বলছিলেন তখন তিনি সংকীর্ণ আত্মতৃপ্তির দৃষ্টি নিয়ে তাকিয়ে ছিলেন পরে যে পর্যন্ত না তাঁর স্ত্রী তাকে তাদের না নিয়ে যাওয়ার কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে আক্রমণ করলেন। স্ত্রী ক্রোধান্বিত স্বরে বললেন, ‘তুমি যেভাবে চেয়েছিলে সেভাবে ছেলেটাকে নিয়ে ওখানটায় আমি অপেক্ষা করছিলাম, আর তুমি কিনা চলে গেলে; আমাদের ডাকলেও না!’ ‘তুমি কেন বের হয়ে আসতে পারলে না?’ তিনি স্ত্রীকে নির্বোধের মতো প্রশ্ন করলেন। ‘আমি কীভাবে আসতে পারবো, যখন তুমিই বলেছিলে তোমার ডাকের জন্য আমি অবশ্যই যেন অপেক্ষা করি?’ স্ত্রী ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে বললেন, ‘আমাদের বাড়িতে মহান মানুষটি থাকা সত্ত্বেও তাঁর সামনে যাওয়ার সৌভাগ্যও আমার হলো না। আর বাচ্চাটা--- কী হতাশই না হলো!’ প্রারম্ভিক চমক কাটিয়ে উঠার পর কর্তৃপক্ষ জায়গাটির রূপান্তর সাধনের জন্য সবকিছু করলেন। সবটুকু দুর্গন্ধ রহস্যজনকভাবে মিলিয়ে গেলো; এখানে সেখানে পড়ে থাকা সব আবর্জনা ও পশুপাখির অংশ, আর ছাঁদে শুকোতে দেওয়া মাংস ও চামড়া নাই হয়ে গেলো। পৌরসভা ও অন্যান্য কর্মচারী মিলে সারা রাত পেট্রোল ল্যাম্পের সাহায্যে কাজ করলো: সেখানে আলো এমন একটা বিরল ব্যাপার ছিলো যে শিশুরা সারা রাত ল্যাম্পের চারপাশ দিয়ে নাচছিলো। গান্ধীজী এই কর্মব্যস্ততা খেয়াল করলেন, কিন্তু বদান্যতা বোধ থেকে কোনো মন্তব্য করা থেকে বিরত থাকলেন। সব কাজ শেষ হলেই তিনি কেবল বললেন, ‘এখন যে কেউ বিশ্বাস করবে যে শহরের সত্যিকারের পরিস্কারকেরা এখানে থাকে।’ কলোনির পুরুষেরা মাথার চারপাশে ধবধবে সাদা পাগড়ি বাঁধলো, আর মহিলারা তাদের সবচেয়ে ভাল শাড়িটা পরলো, তাদের ছেলেমেয়েদেরকে নদীতে টেনে নিয়ে গিয়ে চিৎকার করে কান্নাকাটি না করা পর্যন্ত ঘষেমেজে পরিস্কার করলো, আর হলুদ রঙা ক্রিসেনথিয়াম ফুল দিয়ে তাদের মাথার কেশ সজ্জিত করলো। লোকজন মারামারি বন্ধ করে মদের দোকান থেকে সাধ্যমতো দূরে থাকলো। তারপরও অল্প কয়েকজন পাকা মদখোর গোপনে মদ পান করলো। আর তাদের তৈজসপত্র ভাঙ্গার মতো কিংবা স্ত্রীদের পেটানোর মতো তাড়নাকে দমন করে রাখলো। ল্যাম্প, ল্যাম্পপোস্টের এপাশ ওপাশে বাঁধা কাঁচা আমপাতা ও গাছের ডালে সমস্ত জায়গাটি জ্বলজ্বল করে উঠলো। অনেকদিন কেউ প্রবেশ করেনি এমন একটি কুটিরে গান্ধী অবস্থান করলেন। তিনি কাউকে কুটির থেকে বিতাড়িত করতে চাননি, কিন্তু কুটিরটির অধিবাসী অন্যত্র চলে যাওয়ায় এটি অনেকদিন ধরে খালি পড়ে ছিলো-- সেটা নিশ্চিত করার পর নদীর বালুর দিকে মুখ করে থাকা এই কুটিরটিকে বাছাই করলেন। চেয়ারম্যান নিচু একটা ডিভান এনে মোটা মাদুর দিয়ে গান্ধীজীর পরিদর্শকদের বসার জন্য মেঝেটি ঢেকে দিলেন। শ্রীরাম মাদুরটির উপর সবার অলখে বসে পড়লো। গান্ধী ডিভানে বসলেন এবং তাঁর এক সেক্রেটারিকে ডিকটেট করলেন। তারা বিপুল লেখা লিখলো। মহাত্মাজী একই সাথে কয়েকটা কাজ করলেন। তিনি পরিদর্শকদের সাথে কথা বললেন। ডিকটেট করলেন। লিখলেন। প্রার্থনা করলেন। বাদাম ও দুধ দিয়ে হালকাভাবে ডিনার সেরে এখন ডিভানে গা এলিয়ে দিয়ে ঘুমিয়েও পড়লেন। তখন কে যেন বাতি নিভিয়ে দিলেন, আর লোকজন কুটির থেকে হেঁটে বাইরে চলে গেলো। শ্রীরামের এখন মনে হলো ওখানে আর বসে থাকতে পারবে না সে। কী করছিলো এমন প্রশ্ন কেউ তাকে না করলেও সে ওখানে আর থাকতে পারতো না। মেয়েটি কুটির ছেড়ে যাওয়ার প্রস্তুতি নিলে সে ভাবলো এখন তার উঠে চলে যাওয়াই ভাল; নয়তো কেউ হয়তো তাকে অপ্রীতিকর কিছু বলতে পারে। মেয়েটি গান্ধীর চরকাটি তুলে শব্দ করে এক পাশে রেখে দিলো এবং পা টিপে হেঁটে ঘর থেকে বের হলো। বের হলো তাকে প্রথমে খেয়াল না করেই। কিন্তু যে নিবদ্ধ দৃষ্টিতে শ্রীরাম তার পিছু নিলো মনে হলো তা তাকে প্রভাবিত করলো। সে শ্রীরামকে অতিক্রম করে গেলো, কিন্তু হঠাৎ থেমে ফিসফিস করে বললো: ‘এখন তোমাকে যেতে হবে, ’ আর শ্রীরাম এক লাফে কুটিরের বাইরে চলে গেলো। মেয়েটি বেশ নির্মমভাবে বললো: ‘তোমার কি জানা নেই যে বাপুজী যখন ঘুমায়, তখন তাকে রেখে আমাদের চলে যেতে হয়?’ তার জিজ্ঞেস করতে ইচ্ছে করলো, ‘বাপুজী কে?’ কিন্তু মুহুর্তের জন্য তার বুদ্ধি কাজে লাগিয়ে সে বুঝতে পারলো এটা মহাত্মাকেই বুঝিয়ে থাকবে। আর দৃঢ়প্রতিজ্ঞ মেয়েটির তাড়া খাওয়ার ঝুঁকি না নিয়ে বললো, ‘অবশ্যই, আমি জানতাম। আমি শুধু তোমার বাইরে আসা পর্যন্ত অপেক্ষা করছিলাম।’ ‘তুমি কে? আমার তো মনে হয় না তোমাকে আগে দেখেছি।’ এ প্রশ্ন তাকে জিজ্ঞেস করা হোক সে জন্য সে অনেক ক্ষণ ধরে অপেক্ষা করেছিলো। কিন্তু এখন যখন জিজ্ঞেস করলো, তখন তার মুখ দিয়ে কথা বেরোলো না। তাকে এতো বিভ্রান্ত ও গড়বড়ে ঠেকলো যে মেয়েটি তার প্রতি দয়াপরবশ হয়ে প্রশ্ন করলো, ‘তোমার নাম কী?’ সে উত্তর দিলো, ‘শ্রীরাম।’ ‘এখানে কী করছো?’ মেয়েটি জিজ্ঞেস করলো। ‘আমাকে তোমার মনে নেই? সে অবান্তরভাবে বললো। ‘তোমায় আমি দেখেছি যখন বাজারে টাকা তোলার বাক্স নিয়ে তুমি এসেছিলে সেদিন...’ ‘ওহ্ , বুঝেছি, ’ ভদ্রতাবশত মেয়েটি বললো। ‘কিন্তু অনেক লোক সেদিন আমার বাক্সে টাকা ফেলার কারণে তোমায় আমার ঠিক মনে পড়ছে না। যা হোক, আমি তোমায় জিজ্ঞেস করেছিলাম তুমি এখন এখানে কী করছ?’ ‘হয়তো আমি স্বেচ্ছাসেবকদের একজন, ’ শ্রীরাম বললো। ‘ “হয়তো ” কেন?’ মেয়েটি জিজ্ঞেস করলো। ‘কারণ আমি এখনো একজন হয়ে উঠিনি, ’ সে উত্তর দিলো। ‘যে কেউ স্বেচ্ছাসেবক হতে পারে না, ’ মেয়েটি বললো। ‘তুমি কি তা জানো না?’ সে জিজ্ঞেস করলো। ‘আমি কি তা জানি না? আমার মনে হয় আমি তো সেটা জানি, তার চেয়েও বেশি জানি।’ ‘বেশি কী জানো?’ মেয়েটি প্রশ্ন করলো। ‘জানি যে আমি যে কেউ নই, ’ সে জবাব দিলো এবং মেয়েটির সাথে ওভাবে কথা বলার মধ্যে নিজের হঠকারিতায় সে বিস্মিত হলো; মুহুর্তের মধ্যেই মেয়েটি তাকে ক্যাম্পের বাইরে বের করে দিতে পারতো। ‘তুমি গুরুত্বপূর্ণ কেউ হবে বলে আমার মনে হচ্ছে? ’ হেসে মেয়েটি জিজ্ঞেস করলো। ‘আচ্ছা, গুরুত্বপূর্ণ একজন হতে তুমি আমাকে সাহায্য করবে, আশা রাখি,’ হঠকারী ও বেপরোয়া কথায় নিজের ক্ষমতা দেখে চমকিত হয়ে শ্রীরাম বললো। মেয়েটির সাথে তার মিলবে বলে মনে হলো, কারণ এখন সে একটু বিরক্তি নিয়ে জিজ্ঞেস করলো, ‘তুমি কি এখানে দাঁড়িয়ে সারা রাত কথা বলবে?’ ‘হ্যাঁ, যদি তুমি না দেখিয়ে দাও কোথায় আমরা যেতে পারি।’ ‘জানি আমার কোথায় যাওয়া উচিৎ, ’ মেয়েটি বললো । ‘ঐ কুটিরটা দেখছো না, ’ গান্ধীর কুটির থেকে চার দরজা পেরিয়ে ছোট্ট একটা কুটির নির্দেশ করলো সে, ‘এই ক্যাম্পের সব মেয়েমানুষ ঐখানে থাকে।’ ‘কতজন থাকে?’ শ্রীরাম শুধু আলাপ চালিয়ে যাওয়ার জন্য জিজ্ঞেস করলো। তৎক্ষণাৎ মেয়েটি জবাব দিলো, ‘এখন তোমার সামনে যতজন দেখছো তার চেয়েও বেশি, ’ আর জিজ্ঞেস করলো, ‘তোমার এত আগ্রহ কেন?’ শ্রীরামের আত্মসম্মানে একটু আঘাত লাগলো, ‘তোমাকে বদমেজাজী ও রূঢ়ভাষী মেয়ে বলে মনে হচ্ছে। চ্যালেঞ্জ ছাড়া একটা প্রশ্নেরও উত্তর দিতে পারো না।’ ‘চুপ! এখানে দাঁড়িয়ে কথা বললে বাপুজী জেগে উঠবে, ’ সে বললো। ‘ঠিক আছে, তিনি যদি কারো কথায় জেগে যান, তবে সেটা তোমার কথায়, কারণ অন্য কেউ-ই কথা বলছে না।’ শ্রীরাম জবাবে বললো। ‘এখানে তুমি কী করছো সেটা জিজ্ঞেস করা এবং তোমাকে আমার পছন্দ না হলে ক্যাপ্টেনকে সেটা জানানোর অধিকার আমার আছে, ’ মেয়েটি আকস্মিকভাবে কৃর্তৃত্বপরায়ণ স্বরে বললো। ‘তুমি আমাকে পছন্দ করবে না কেন?’ সে জিজ্ঞেস করলো। ‘ঘনিষ্ঠজন ও অ্যাপয়েন্টমেন্টের লোকজন ছাড়া কারুর-ই বাপুজীর কাছে আসার অনুমতি নেই।’ ‘তাদেরকে বলবো যে আমি তোমার বন্ধু এবং তুমিই আমাকে ভেতরে নিয়ে গিয়েছিলে, ’ শ্রীরাম উত্তরে বললো। ‘তুমি কি মিথ্যা উচ্চারণ করবে?’ মেয়েটি প্রশ্ন করলো। ‘কেন নয়?’ ‘মহাত্মাজীর শিবিরে পরম সত্যবাদী ব্যতীত কেউ-ই অনুমতি প্রাপ্ত নয়। যে সব লোক এখানে আসে তাদেরকে মহাত্মাজীর কাছে যেতে হলে অবশ্যই পরম সত্যের শপথ করতে হয়।’ ‘শিবিরের সদস্য হলে আমি শপথ করবো। সে নাগাদ যা সত্যের মতো মনে হয় তা-ই বলে চালিয়ে যাবো।’ সে বললো। ‘মহাত্মা এ বিষয়ে জানতে পারলে খুবই ব্যথা পাবেন এবং তিনি তোমার সাথে এ বিষয়ে কথা বলবেন।’ শ্রীরাম আসলেই ভয় পেয়ে গেলো এবং করুণভাবে জিজ্ঞেস করলো, ‘আমি কী করেছি যে আমাকে হুমকি -ধামকি দিচ্ছো?’ এতে মেয়েটি নরম হলো এবং প্রথম বারের মতো শ্রীরাম তার স্বরে একটু কোমলতা খেয়াল করলো। ‘ওখানটায় গিয়ে অপেক্ষা করতে কি তোমার আপত্তি আছে? মহাত্মাজীর কুটিরের কাছে এভাবে আলাপ করতে থাকা আমাদের উচিৎ নয়। আমার কুটিরে গিয়ে আমি তোমার সাথে যোগ দেবো।’ মেয়েটি ঘুরে অদৃশ্য হয়ে গেলো নর্তকীর বিজলী সম গতিতে। আবার সে তার ঝন ঝন করা বাক্স বহন করতে ব্যালে নাচের দ্রুত ঘূর্ণন ব্যবহার করলো। গলি অতিক্রম করে গেলো। শ্রীরাম ধীরে ধীরে গেলো। দাঁড়িয়ে থাকতে থাকতে সে ক্লান্ত হয়ে গিয়েছিলো। নদীর কিনারায় বোলডারে বসে পায়ের বৃদ্ধাঙ্গুলি দিয়ে সে বালুতে লাথি মারছিলো এবং তার সৌভাগ্যের কথা রোমন্থন করছিলো। এ রকম কোনো কিছু সে কখনো আশা করেনি। এটা স্বপ্ন হয়ে থাকতে পারে। গতকাল সে ভাবতেও পারেনি যে এবার এসব বিষয়ে টাকা তোলার বাক্স বহনকারিণীর সাথে তার কথা হবে। সে উপলব্ধি করলো যে সে তাকে এখনো তার নাম জিজ্ঞেস করেনি। তার মনে পড়লো যে অনেক আগে তার ক্ষুধা ও পিপাসা পেয়েছিলো। ‘তারা যদি মহাত্মাজীর শিবিরে খাওয়ার মতো কিছু একটা দিতো!’ তার মনে পড়লো মহাত্মা শুধু চীনাবাদাম ও খেঁজুর খেয়েছিলো। সে আশপাশ তাকিয়ে দেখলো এই আশায় যে ওখানে এসব জিনিসের বিক্রেতা থাকবে। তালুক অফিসের ধাতব ঘন্টায় নয়টা বাজার শব্দ শোনা গেলো। এই শব্দ ইচ্ছে করে গুনে গুনে সে ভাবলো যে ঠাকুরমা এখন তার অনুপস্থিতির অর্থ কী বুঝে নেবে। ‘অস্থির হয়ে পুলিশকে জানাবে, মনে হয়!’ সংশয়ভরে সে ভাবলো। সে যদি তার শিক্ষককে বলে দিতো যে ঠাকুরমাকে যেন বলে গান্ধীজী শহর ছেড়ে না যাওয়া পর্যন্ত সে বাসায় ফিরবে না! তার মনে আরেকটা ভাবনা খেলে গেলো যে সে তো শিক্ষকের সাথে কথা বলেনি, যিনি গিয়ে হয়তো গুজব রটিয়েছেন যে গান্ধীর প্রতি তার আগ্রহ শুধু লোক দেখানো; সে আসলে মেয়েটার পেছনে ঘুর ঘুর করছে। মেয়েটার নাম কী ছিলো? বিস্ময়কর ব্যাপার যে সে এখনো তাকে নাম জিজ্ঞেস করেনি, আর যে মুহুর্তে মেয়োট ফিরে আসলো তখন তাকে বললো, ‘তোমার নাম কী?’ ‘ভারতী, ’ মেয়েটি উত্তর দিলো। ‘কেন?’ ‘স্রেফ জানার জন্য, ব্যস। তোমাকে কি বলেছি আমার নাম শ্রীরাম?’ ‘হ্যাঁ, কয়েকবার বলেছো, ’ মেয়েটি বললো। ‘বারবার শুনেছি যে তুমি শ্রীরাম।’ ‘তুমি অতিমাত্রায় রূঢ়ভাষী, ’ সে জবাবে বললো। ‘বিস্ময়ের ব্যাপার হচ্ছে ওরা এখানে তোমাকে বরদাশত করছে, যেখানে অবশ্যই শান্তি ও দয়ার চর্চা করতে হয়।’ ‘আমি তো দয়ারই চর্চা করছি, তা না হলে তোমার সাথে আমি আদৌ কথা বলতাম না। তোমার প্রতি সদয় হতে না চাইলে তো আমি ভেতরে গিয়ে ক্যাপ্টেনের অনুমতি নিয়ে সরাসরি এখানে চলে আসতাম। এ সময় মানুষজনের সাথে কথা বলতে গেলে আমাদের অবশ্যই অনুমতি নিতে হয়। প্রতিটি শিবিরে শৃঙ্খলা বলে একটা জিনিস আছে। ভেবো না যেন যে এটা মহাত্মাজীর শিবির এতে শৃঙ্খলা বলে কিছু নেই। তাঁর কাছে এ প্রশ্ন তুললে তিনিই সর্বপ্রথম তোমাকে এ ব্যাপারে বলবেন।’ ‘তুমি আমার ঠাকুরমার মতো করে কথা বলো। তিনিও তোমার মতো রূঢ়ভাষী, ’ শ্রীরাম করুণভাবে বললো। তুলনা গায়ে না লাগিয়ে মেয়েটি জিজ্ঞেস করলো, ‘তোমার মায়ের সমন্ধে কিছু বলছো না যে?’ ‘তাকে আমি কখনো দেখিনি, ঠাকুরমাই আমার বাবা-মা। তার সাথে দেখা করবে? তোমার পছন্দ হবে, তোমাদের দু’জনের মধ্যে কথা বলায় এতো মিল!’ ‘জ্বী, জ্বী, ’ মেয়েটি শান্তভাবে বললো, ‘এসব কিছু শেষ হলেই কোনো একদিন তার সাথে এসে দেখা করবো। দেখছো তো এখন কত ব্যস্ত।’ সে নরম হলো যখন সে দেখলো যে মা-হারা একজনের সাথে কথা বলছিলো, আর এটা খেয়াল করে শ্রীরামের বোধ হলো যে মাতৃহীন হওয়া ও ঠাকুরমার সেবা-শুশ্র“ষায় বড় হওয়া অনেক কাজে দিলো। পা দুটি নদীতে নাচিয়ে নাচিয়ে এবং দু’জনার মধ্যে কয়েক ফুট ব্যবধান রেখে মেয়েটি একই পদক্ষেপে বসে পড়লো। অন্ধকার তারকালোকিত রাত্রিতে নদীটি কলকল করছিলো, প্রাচীন পদক্ষেপের উপর দাঁড়িয়ে থাকা বিশাল গাছটির পাতা খস খস করছিলো ও দীর্ঘশ্বাস ফেলছিলো। অতি দূরে নালাপ্পা কুঞ্জে গরুর গাড়ি ও পথচারীরা নদী পার হচ্ছিলো। রাতের নির্জনতা ভেঙ্গে দূরবর্তী কণ্ঠস্বর ভেসে আসছিলো। মহাত্মাজীর শিবির ঘুমিয়ে ছিলো। এত শান্ত ছিলো যে শ্রীরামের ইচ্ছে করছিলো মেয়েটিকে তার বাহুতে জড়াতে, কিন্তু এ ধারণা সে দমন করলো। মেয়েটি কলহপরায়ণ ছিলো, তার ঐ তীক্ষè জিহ্বা নিয়ে সে নিশ্চয়ই ঠাকুরমার মতো হবে। তার নৈকট্য শ্রীরামের রক্তকে খোঁচা মেরে প্রবাহিত করলো। ‘কেউ ধারের কাছে নেই। সে কী করতে পারে?’ শ্রীরাম ভাবলো। ‘সে চেষ্টা করে ঠেলে আমাকে নদীতে ফেলে দিক, আর তখন জানবে সে কার মোকাবেলা করছে, ’ এবং পরের মুহুর্তেই সে নিজের স্থুল চিন্তাকে দোষারোপ করলো। ‘ওখানে মহাত্মা থাকায় এটা নিরাপদ নয়। তিনি ইতোমধ্যেই আমার চিন্তা পড়ে এদিকে এসে থাকবেন।’ তিনি একজন মহাত্মা, ঘুমিয়েই থাকুন আর জেগেই থাকুন তাঁর চারপাশে কী ঘটছে তা সম্পর্কে তিনি সজাগ। ভগবানই শুধু বলতে পারে যেখানে মেয়েদের ব্যাপার জড়িত সেখানে যার চিন্তার পরম বিশুদ্ধতা নেই তার তিনি কী করবেন। নিঃসন্দেহে এর মানে কষ্ট, কিন্তু কাউকে যদি এই শিবিরে থাকতে হয়, তাহলে মহান আত্মা থেকে উৎসারিত আদেশ তাকে মানতেই হবে। কুচিন্তার বিরুদ্ধে সংগ্রাম করে সে বললো, ‘ভারতী! ’ এতো পরিচিতভাবে ডাকায় মেয়েটি চমকে গেলো এবং তার নামের সুর মূর্ছণায় শ্রীরাম নিজেই চমকিত হলো। ‘কী সুন্দর নাম!’ সে মন্তব্য করলো। ‘আমার আনন্দ লাগছে যে তোমার এটা পছন্দ হয়েছে, ’ মেয়েটি বললো। ‘বাপুজী নিজেই নামটি দিয়েছিলেন।’ ‘ওহ্ , কী জাঁকালো!’ শ্রীরাম চিৎকার করে বললো। মেয়েটি আরো বললো, ‘জানো ১৯২০ সালের আন্দোলনে আমার বাবা মারা যান। ঠিক তখনই আমার জন্ম। বাপুজী যখন এটা জানলেন, তিনি তখন দক্ষিণ ভারতে এসেছিলেন, নিজেকে আমার ধর্মপিতা বানিয়ে নাম রাখলেন ভারতী, যার মানে--- আশা করি তুমি জানো।’ ‘হ্যাঁ, ভারত হচ্ছে ভারতমাতা, আর ভারতী হচ্ছে ভারতমাতার কন্যা, আমার মনে হয়।’ ‘ঠিক বলেছো, ’ মেয়েটি বললো, আর শ্রীরাম মেয়েটির প্রশংসাসূচক কথায় খুশী হলো। ‘মা মারা যাওয়ার পর আমাকে আসলে স্থানীয় সেবক সংঘ দত্তক হিসেবে গ্রহণ করেছিলো, আর তারপর থেকে অন্য কোনো বাসা আমি চিনি না, ’ মেয়েটি বললো। ‘তুমি কি বলতে চাও সবসময়ই তুমি এসব লোকের সাথে থাকো?’ ‘এতে অন্যায় কী আছে? মেয়েটি প্রশ্ন করলো। ‘এটা তো আমার বাসা হয়ে গেছে।’ ‘তা নয়, তোমাকে দেখে শুধু ঈর্ষা হচ্ছিলো। আমার জীবনটা নষ্ট না করে আমিও যদি তোমাদের সাথে থেকে কিছু করতে পারতাম!’ এ কথা তার মনে আবেদন সৃষ্টি করলে মেয়েটি প্রশ্ন করলো, ‘তুমি কী করতে চাও?’ ‘তুমি যা করছো ঠিক তা-ই। তুমি কী করছো?’ সে জিজ্ঞেস করলো। ‘সেবক সংঘ আমায় যা করতে বলে তা-ই করি। কখনো তারা আমায় মানুষকে সুতা কাটা শেখাতে যেতে বলে আর মহাত্মাজীর চিন্তা-চেতনা জানাতে বলে। কখনো আমায় গ্রামে ও গরীব এলাকায় পাঠায়। আমি তাদের সাথে দেখা করি, কথা বলি এবং আরো কিছু কাজ করি। মহাত্মাজীর সেবা করি।’ ‘দয়া করে তোমার সাথে আমাকেও কিছু করতে দাও, ’ সে অনুনয় জানালো। ‘আমাকে তোমার ছাত্র হিসেবে গ্রহণ করো না কেন?’ আমি ভাল কিছু করতে চাই। গরীব মানুষদের সাথে কথা বলতে চাই।’ ‘তাদেরকে কী বলবে?’ মেয়েটি নির্দয়ভাবে প্রশ্ন করলো। শ্রীরাম অস্ফুট আওয়াজ করলো। ‘তুমি যা বলে দেবে তা-ই তাদেরকে বলবো, ’ সে বললো, আর তার উৎকৃষ্ট বুদ্ধির প্রতি এই শ্রদ্ধায় মেয়েটি সন্তুষ্ট হলো। ‘হ’ম! কিন্তু কেন?’ সে জিজ্ঞেস করলো। সবটুকু সাহস একত্র করে শ্রীরাম উত্তর দিলো, ‘কারণ তোমাকে আমি পছন্দ করি, আর তোমার সাথে থাকতে পছন্দ করি।’ উচ্চস্বরে হাসি দিয়ে মেয়েটি বললো, ‘ওটাই যথেষ্ট নয়... তারা...’ সে তার পিছনের বৈরী গোষ্ঠীর বিশাল সৈন্যবহরের দিকে ইঙ্গিত করলো। ‘ওভাবে কথা বললে তার তোমাকে তাড়া করতে পারে।’ সে গোমড়া ও অখুশী হলো। নতুনভাবে উজ্জীবিত হয়ে সে এবার বললো, ‘আচ্ছা, আমিও স্বেচ্ছায় কিছু করবো।’ ‘কী?’ মেয়েটি আবার তাকে উপহাস করলো। শ্রীরাম অসহায়ভাবে, মরিয়া হয়ে মেয়েটির মুখের দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করলো, ‘তুমি কি আমাকে নিয়ে মজা করছো?’ ‘না, তুমি যা বলছো তা বোঝার চেষ্টা করছি মাত্র।’ এখন একটু বিগলিত হয়ে বললো, ‘বাপুর কাছে তোমাকে নিয়ে যাবো, তুমি যাবে?’ শ্রীরাম আতঙ্কগ্রস্ত হয়ে বললো, ‘না, না। আমি যেতে পারবো না।’ ‘তুমি তো ইতোমধ্যে সেখানেই আছো।’ শ্রীরাম যুক্তিসঙ্গত কোনো ব্যাখ্যা দিতে পারলো না এবং এখন সে নিজের হঠকারিতার ব্যাপকতা উপলব্ধি করলো। সে বললো, ‘না, না, ওনার সাথে কীভাবে কথা বলতে হবে কীভাবে ওনার কথার জবাব দিতে হবে আর ওনাকে কী বলতে হবে সেটা জানতে গেলে আমি বিমূঢ় হয়ে যাবো।’ ‘কিন্তু তুমি তো তাঁর সামনে ওখানটায় বসেছিলে যেন তাঁর চিরচেনা! মেয়েটি বললো, ‘তাঁর সবচেয়ে সেরা বন্ধুর মতো।’ মেয়েটি হাসলো এবং তাকে টিটকারী করাটা উপভোগ করলো। ‘যে কোনোভাবেই হোক তা আমি করেছিলাম, কিন্তু আর করবো না, ’ শ্রীরাম ঘোষণা দিলো, ‘তাঁর সামনে আবার গেলে তিনি আমাকে খুঁজে বের করতে পারেন।’ ভারতী হঠাৎ করে গুরুগম্ভীর হয়ে বললো, ‘তুমি যদি আমাদের সাথে কাজ করতে চাও, তবে বাপুজীর সামনাসামনি তোমাকে হতে হবে।’ শ্রীরাম নির্বাক বনে গেলো। তার হৃদয় উত্তেজনায় ধড়ফড় করলো। সে যদি উঠে এক দৌড়ে এ জায়গাটি থেকে শেষবারের মতো পালিয়ে যেতে পারতো! আর চিরদিনের জন্য এ কাজটিকে পৃষ্ঠ প্রদর্শন করতে পারতো! বেশি বেশি। তার ধৃষ্টতা ও দুঃসাহসের জন্য তাকে শাস্তি দিতে দেবতারা মনে হয় বের হয়েছে। সে কেঁদে বললো, ‘ভারতী, অন্য কোথাও তোমার সাথে দেখা করতে পারি কিনা আমায় বলো, নইলে দয়া করে আমায় যেতে দাও।’ তার ঘাম ঠাণ্ডা হয়ে আসছিলো। ‘তাঁর সাথে যখন কথা বলবো কী বলবো আমি? বোকার মতো কথা বলবো।’ ‘তুমি তো এর মধ্যেই সে রকম বলছো, ’ হাসি দমাতে না পেরে সে বললো। শ্রীরাম করুণভাবে বললো, ‘মনে হচ্ছে আমাকে জ্বালাতন করে তোমার ভাল লাগছে। আমি দুঃখিত যে এখানে এসেছিলাম।’ ‘তুমি এতো কাপুরুষ কেন? ’ ভারতী জিজ্ঞেস করলো। শ্রীরাম দৃঢ়চিত্তে বললো, ‘মহাত্মাজীর সাথে আমি কথা বলতে পারবো না। তাঁর সামনে কেমন আচরণ করতে হয় আমি জানি না।’ ‘তুমি তোমার মতো বলবে। তাহলে সব ঠিক হবে।’ ‘তাঁর প্রশ্নের সঠিক জবাব দিতে আমি পারবো না।’ ‘স্কুলের পরিদর্শকের মতো তিনি তোমাকে পরীক্ষা করে দেখবেন না। কোনো কিছু বলার না থাকলে তাঁর সাথে তোমার কথা বলতে হবে না। তুমি মুখ বন্ধ রাখলে তিনি কিছু মনে করবেন না। তুমি শুধু তোমার মতো থাকবে, যা বলতে ইচ্ছে হবে তা-ই বলো। তিনি কোনোকিছুতেই কিছু মনে করবেন না, কিন্তু কথা বলতে হলে তোমাকে সত্য কথা বলতে হবে।’ ‘সত্য কথা! সব কিছুতে!’ তাকে ভীতসন্ত্রস্ত দেখালো। ‘হ্যাঁ, সবকিছুতেই। তুমি যেমন খুশি তেমনভাবে কথা বলতে পারো, তিনি কোনো ভুল ধরবেন না, যদি সেটা সত্য কথা হয়।’ শ্রীরামকে আগের থেকে বেশি ভেঙ্গে পড়া দেখালো। এই অন্ধকার রাতে তার সামনে ভয়ংকর এক সমস্যা আছে মনে হলো। কিছুক্ষণের জন্য ভেবে চিন্তে সে বললো, ‘ভারতী, তোমার সাথে অন্য কোথাও দেখা করতে পারি কিনা আমায় বলো। নইলে আমাকে যেতে দাও।’ ভারতী সমান প্রতিজ্ঞ হয়ে জবাব দিলো, ‘আমার সাথে দেখা করতে চাইলে বাপুজীর কাছে এসো, আমার দেখা পাওয়ার একমাত্র জায়গা। অবশ্য তুমি যদি আমার সাথে দেখা করতে না চাও, চলে যাও।’ এতে সে উভয়সঙ্কটে পড়লো। ‘কোথায়? কীভাবে?’ শ্রীরাম জিজ্ঞেস করলো। ‘বাপুর কুটিরের দরজায় এসে আমার জন্য অপেক্ষা করবে, ’ ‘কবে? কোথায়?’ ‘আগামীকাল ভোর তিনটায়। তোমাকে আমি তাঁর কাছে নিয়ে যাবো।’ এই বলে সে লাফিয়ে উঠলো এবং তার কুটিরের দিকে দৌড়ে চলে গেলো। ** ঠাকুরমা থেকে থেকে ঘুমিয়েছিলেন। সন্ধ্যায় পাঁচবার তিনি ক্যানির দোকান পর্যন্ত গিয়েছিলেন কেউ শ্রীরামকে দেখেছিলো কিনা তার খোঁজ-খবর নিতে, আর সেখানে কেনাকাটা করতে আসা একটি ছেলেকে শ্রীরামের খোঁজে সর্বত্র পাঠিয়েছিলেন। অবশেষে স্কুলশিক্ষক যিনি রাস্তায় রাস্তায় ঘুরে বেড়িয়েছিলেন তিনি ঠাকুরমার বাড়ি অতিক্রম করার সময় তাকে বলেছিলেন, ‘আপনার আদরের ধন মহাত্মার শিবিরে। আমি তাকে সেখানে দেখলাম।’ ‘আহ্ ! সেখানে সে কী করছিলো?’ আতঙ্কিত হয়ে ঠাকুরমা জিজ্ঞেস করলেন। তার মতে মহাত্মা সেই ব্যক্তি ছিলেন যিনি ভয়ংকর মতবাদ প্রচার করে বেড়াতেন, যিনি অস্পৃশ্যদের মন্দিরে আনার চেষ্টা করতেন, আর যিনি মানুষজনকে পুলিশের সাথে ঝামেলায় জড়াতেন। তিনি ব্যাপারটি পছন্দ করলেন না। বিলাপ করে বললেন, ‘ওহ্ , মাস্টার, আপনি কেন তাকে ওখানে থেকে যেতে দিলেন? আপনার ওকে এনে দেওয়া উচিৎ ছিলো। এতো দেরি হয়ে গেছে অথচ সে বাসায় আসেনি। ওর পুরোনো শিক্ষক হিসেবে ওকে আপনার ছাড়িয়ে আনা উচিৎ ছিলো।’ ‘দুশ্চিন্তা করবেন না, ম্যাডাম, সে একদম নিরাপদে আছে। মহাত্মার এত কাছে যাওয়ার সুযোগ আমাদের কজনই বা পায়? আপনি অবশ্যই খুশি হবেন যে সে এত ভাল করছে! ওর মতো তরুণদের দরকার আমাদের দেশে।’ ঠাকুরমা উত্তরে বললেন, ‘আপনার মতো শিক্ষকরাই আমাদের ছেলে ও এই দেশকে নষ্ট করেছেন, ’ দ্রুম করে দরজা বন্ধ করে তিনি ভেতরে ঢুকলেন। শ্রীরাম পৌঁছে দরজায় করাঘাত করার সময় তিনি অর্ধ-ঘুমন্ত এবং সম্ভাব্য সবচেয়ে খারাপ মেজাজে ছিলেন । দরজা খুলে তাকে ভেতরে ঢুকতে দিয়ে তিনি আবার দরজা লাগিয়ে দিলেন এবং আবার ঘুমোতে যেতে যেতে বললেন, ‘ঐ গামলাটায় দই মিশিয়ে কিছু ভাত রেখেছি আর আরেকটায় দই ছাড়া। খাওয়ার পর বাতিটা নিভিয়ে দিও।’ বিছানায় শুয়ে তিনি শ্রীরামের থালাটি একপাশে রেখে দেওয়ার শব্দ ও রান্নাঘর ত্যাগ করার শব্দ শুনলেন। তখন তিনি দেয়ালের দিকে মুখ ঘুরিয়ে নিলেন এবং ঘুমানোর ভান করে থাকলেন। তার আশা ছিলো যে নাতি তার মেজাজ বুঝবে, কাছে আসবে এবং তাকে আশ্বস্ত করবে যে সে খারাপ পথে যায়নি। কিন্তু তরুণটি অন্য কাজে ব্যস্ত হলো। সে অর্ধেক মোহাবস্থায় ছিলো। ভারতীর সঙ্গ ও কথা এখনো তার মনে অনুরণিত হলো। তাকে স্পর্শ করার শিহরণ তার মনে পড়লো। তার ভাবতে ভাল লাগলো যে যখন সে খেয়াল করেনি, তখন সে তার বাহু ছুঁয়েছিলো এবং কাঁধে হাত বুলিয়েছিলো। সে ভাবলো ভারতীর ঠাট্টা শুনতে শুনতে বাকি জীবনটা তার কতটুকু ভাল লাগবে, কিন্তু তার মানে তো--- দ্বন্দটা এখানেই--- তাকে তার সামনে হাজির হতে হবে। এই দুশ্চিন্তার কাছে অন্য সব তার কাছে তুচ্ছ ঠেকলো। অন্য কোনো দিন হলে সে ঠাকুরমাকে ঘুম থেকে টেনে জেগে তুলে তাকে সারাদিনের ঘটনা বর্ণনা করতো। তিনি যদি খারাপ মেজাজেই থেকে থাকতেন, তবে সে জোর করে মেজাজ ভাল করে দিতো। সে জানতো এখন তিনি ভাল মেজাজে নেই; দরজায় পা দেওয়ার মুহুর্তেই সে টের পেয়েছিলো, কিন্তু সে তাকে ওভাবেই থাকতে দিলো; তার মনে হলো ঠাকুরমার মেজাজ ঠিক করার থেকে আরো গুরুতর সমস্যা তার আছে। সে বিছানায় গিয়ে এক ঘন্টার কম সময়ে ঘুমিয়ে পড়লো। ভারতী ভোর তিনটায় ওখানে তাকে থাকতে বলেছিলো, আর সেখানে যেতে তার লাগবে এক ঘন্টা। একটার আগেই সে জেগে উঠলো, হাত-মুখ ধুইলো এবং গোসল সেরে বিশেষ কাপড় পরে নিলো। ঠাকুরমার বিছানায় ঝুঁকে কানে কানে বললো, ‘আমাকে এখন যেতে হচ্ছে, দরজাটা লাগিয়ে দিও।’ তিনি জিজ্ঞেস করতে চেষ্টা করলেন, ‘কী! এই সময়ে, তোমার কী হয়েছে?’ কিন্তু সে আস্তে আস্তে পা ফেলে দরজা বন্ধ করে চলে গেলো। ** মহাত্মাজীর কুটিরের প্রবেশপথে এসে দম বন্ধ করে সে দাঁড়ালো। এখন কী করা উচিৎ তা স্থির করা খুবই কঠিন ছিলো। ভারতী তাকে জিজ্ঞেস করেছিলো মহাত্মার ফটকে উপস্থিত থাকতে, কিন্তু হয়তো সে তাকে বোকা বানাচ্ছিলো। তার আশঙ্কা হলো কোনো শব্দ করলেই মহাত্মা জেগে উঠে পুরো শিবিরটা তার কানের চারপাশে এনে রাখতে পারে। সে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে অনুতপ্তভাবে শিবিরটার দিকে তাকালো। রাস্তার কুকুরগুলো কোথায় যেন ঘেউ ঘেউ করছিলো। মাঝে মাঝে নদী তীরের গাছের ডালগুলি খস খস ও ক্যাঁচ ক্যাঁচ করলো। দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে অনুতপ্তভাবে সে নারীপল্লীর দিকে তাকালো। সেখানে একটা হারিকেন জ্বলছিলো, লোকজনকে জাগ্রত এবং চলা ফেরা করছে মনে হলো। সে ভাবলো, ‘হারিকেনটা জ্বলতে থাকলে কী হবে? আলো জ্বালিয়ে তারা ঘুমিয়ে থাকতে পারে। নারীরা তো ভীতুই হয়।’ নড়াচড়ার যে শব্দ সে শুনতে পেলো সেটা বিছানায় তাদের গড়াগড়ির শব্দ হতে পারে, গোলমেলে জীব! ব্যাখ্যাতীতভাবে নারীদের কথা ভেবে ভেবে সে জ্বালাতন অনুভব করছিলো, এই প্রজাতির মধ্যে ভারতীও পড়েছিলো। মহাত্মাজীর শিবিরে সে একটা আলো দেখতে পেলো। দরজা বন্ধ ছিলো। সেখানে সে নরম পদক্ষেপে চলার শব্দ শুনতে পেলো। অনেকক্ষণ আগে তালুক অফিসের ঘন্টায় রাতের শেষ প্রহরের ধ্বনি বেজেছিলো। সে প্রায় বিশ্বাসই করতে পারছিলো না সে সত্যিই ঘুমকে উৎসর্গ করেছিলো এবং অপার্থিব সময়ে ঠাণ্ডা হাওয়ায় এখানে দাঁড়িয়েছিলো। খলপুরা, যারা শহরে সবার আগে ওঠে, তারাও ঘুমিয়ে পড়েছিলো। হঠাৎ করে সে ভয় পেয়ে গেলো যে চোর কিংবা ভূত তাকে আক্রমণ করতে পারে। অথবা এত রাতে ঘুর ঘুর করছে বলে পুলিশ যদি তাকে দেখে ফেলে, তখন সে কী ব্যাখ্যা দেবে? সে ভালভাবে হয়তো বলতে পারতো না, ‘ভোর তিনটার দিকে ভারতী তাকে মহাত্মার কুটিরে অপেক্ষা করতে বলেছিলো।’ সে ঘুরে চলে যেতে চাইলো। এখানে ঘুর ঘুর না করে এবং কী করা যায় তা না ভেবে বাসা গিয়ে অন্ততপক্ষে ঠাকুরমায়ের কাছে সারাদিনের অভাব পূরণ করা যেতে পারতো। তাকে বলতে পারতো: ‘মহাত্মাকে দেখতে গিয়েছিলাম, কিন্তু ইচ্ছা পরিবর্তন করে চলে এলাম। তাকে জেনে অত সব ঝামেলায় জড়িয়ে কী হবে? তোমার কি তাই মনে হয় না, ঠাকুরমা?’ আর এতে তিনি নিশ্চয়ই পুনরিজ্জীবিত হয়ে আবার খুশি হবেন। নারীপল্লীর দিকে একটা কাতর দৃষ্টি দিয়ে সে ঘুরে দাঁড়ালো। মহাত্মার মতো বড় মানুষের এবং ভারতীর মতো উন্নাসিক মেয়ের আজব ও সন্দিগ্ধ নেক নজর পাওয়ার চেয়ে ঠাকুরমার বাস্তব সুনজর পেতে সে মনকে পুরোদমে স্থির করলো। ভগবানই জানতেন আর কে সেখানে আসবে। কিন্তু ভারতীর আকর্ষণ এত তীব্র ছিলো যে সে যেমন ভেবেছিলো জায়গাটা ছেড়ে অতো সহজে যেতে পারলো না । তাকে দেখে বিদায় জানানোর শুধু আরেকবার চেষ্টা করতে চাইলো। হয়তো সে এমন কোনো পরিস্থিতিতে আছে যাতে তাকে সাহায্য করা যায়: লোকজন তাকে তার খাটের সাথে বেধে রেখে মুখ বন্ধ করে রাখতে পারে। তার মতো সুন্দরীদের অনেক কিছুই হতে পারে। তা না হলে তো তার না আসার কোনো কারণই নেই। যাই হোক, তার মনে হলো কী হয়েছে ওখানে তা দেখার দায়িত্ব তারই হবে। সে স্বেচ্ছায় নারীপল্লীর কাছে যেতে পারে, কিন্তু এর জন্য প্রয়োজনীয় সাহসের অভাব ছিলো তার এবং পরবর্তী সর্বোৎকৃষ্ট কাজটা সে করলো: আবার হঠকারী কাজের পুনরাবৃত্তিÑ পা টিপে মহাত্মাজীর কুটিরের দিকে গেলো। তার ধারণা ছিলো সবার অগোচরে উঁকি মেরে ওখানে না অন্য কোনো খানে ভারতী নিরাপদে আছে তা দেখে চলে আসা। কিন্তু এই বিভ্রান্ত অবস্থায় তার মনে হলো না যে সে কাউকে দেখার আগে কেউ তাকে হয়তো দেখে ফেলতে পারে। আর তাই হলো। মহাত্মাজীর দরজাটি অর্ধেক খোলা ছিলো। ফাঁক দিয়ে আলো আসছিলো। মুগ্ধ পতঙ্গের মতো শ্রীরাম এর দিকে এগিয়ে গেলো। সে যদি একটু থেমে চিন্তা করতো, সে দ্বিতীয়বার হঠকারী কাজ করার মতো যোগ্য হিসেবে নিজেকে বিশ্বাস করতে পারতো না। কিন্তু অনিদ্রা ও স্নায়ুচাপের কারণে একটা বেপরোয়া ভাব তার মধ্যে এসেছিলো। একই ধরণের নির্দোষ ভারে সে গত সন্ধ্যায় এ কুটিরে এসেছিলো, এখনো আসলো। ভাঁড়ের মতো সে ভেতরে উঁকি দিয়ে দেখলো। দরজাটি অর্ধেক খোলা ছিলো; দূর থেকে সে এর প্রস্থ বেশি হিসেব করে ফেলেছিলো, কারণ মাথা ভেতরে না ঠেলে দিয়ে সে উঁকি দিতে পারেনি। ‘ওহ্ , ঐ তো সে!’ কণ্ঠস্বরে হাসি মিশিয়ে ভারতী চিৎকার করলো। ‘ভেতরে আসতে চাইলে দরজাটা খুলতে পারো, ’ সে বললো। শ্রীরামের আবার মনে হলো যে মেয়েটি তাকে নিয়ে মজা করছে। মহাত্মার উপস্থিতিকেও সে পরোয়া করছে না মনে হয়। শ্রীরামের আশা ছিলো এখানে সে অন্তত কোনো চাপা দুর্বুদ্ধি ছাড়াই কথা বলবে। তার এতো বিরক্ত লাগলো এই ভেবে যে তার কণ্ঠস্বরে সে যত ঝাঁঝ ধারণ করতে পারে তার সবটুকু দিয়ে জবাব দেবে: ‘তুমিÑÑ ওখানে তোমার জন্য আমি অপেক্ষা করছিলামÑÑÑÑ’ ‘এসো, ভেতরে এসো, ’ মহাত্মা বললেন। ‘ওখানে দাঁড়িয়ে ছিলে কেন? তুমি সরাসরি ভেতরে আসতে পারতে।’ ‘কিন্তু সে আমাকে বাইরে অপেক্ষা করতে বলেছিলো, ’ শ্রীরাম সন্তর্পণে পা ফেলে বললো। দরজা থেকে মহাত্মা যেখানটায় বসেছিলো তার দূরত্ব ছিলো দশ ফুটেরও কম, কিন্তু তার মনে হলো এটুকু আসতে তার ঘন্টার পর ঘন্টা লেগেছিলো। পা দুটো দুর্বল ও জড়িয়ে যাচ্ছিলো মনে হলো, তাকে মাতালের মতো হাঁটছিলো বলে মনে হলো। মহাত্মার ধারণায় এটা বিশেষ ধরণের বিপজ্জনক ব্যাপার, যিনি খলপুদেরও মদ খাওয়া ছেড়ে দেওয়ার জন্য বোঝাচ্ছিলেন। এক ঝলকে শ্রীরামের মনে হলো যে হঠাৎ করে ঘুরে যদি তাকে প্রশ্ন করে, ‘টোডি না হুইস্কি পান করছিলে?’ , তবে তার যুক্তিসঙ্গত একটা উত্তর প্রস্তুত করে রাখা উচিৎ। কিন্তু তার বিচার শেষ হলো যখন গান্ধী বললেন, ‘ভারতী একটু আগেই তোমার কথা বলছিলো।’ হাত দিয়ে চরকা ঘুরিয়ে নতুন একটা সুতা বের করতে করতে তিনি কথা বললেন। কোণায় বসে থাকা একজন লোক হাঁটুতে প্যাড রেখে লিখছিলো । সবসময় যেমন তেমনই মহাত্মাজী একই সাথে কয়েকটি কাজ করছিলেন। হাত দিয়ে চরকা ঘুরানোর সময়, তাঁর চোখ আরেকজন কর্তৃক তাঁর সামনে ধরে রাখা চিঠি পড়ছিলো এবং শ্রীরামকে স্বাগত বাণী দেওয়াও সম্ভব মনে করলেন। কুটিরের পিছনের দরজা দিয়ে অনেকেই আসছিলো আর যাচ্ছিলো। তাদের প্রত্যেককেই মহাত্মাজী কিছু না কিছু বললেন। তিনি শ্রীরামের দিকে তাকিয়ে বললেন: ‘বসে পড়ো, যুবক। আমার যত কাছে আসতে চাও তত কাছে এসে বসো।’ তাঁর কণ্ঠস্বরে এতখানি অকৃত্রিম দয়া ছিলো যে সব ভয় ও দ্বিধা শ্রীরামের মন থেকে হারিয়ে গেলো। চট করে উঠে পড়লো সে। মহাত্মাজীর কাছে মেঝেতে বসে মোহাবিষ্ট হয়ে সুচারুরূপে চরকা ঘুরানো দেখলো। কুটিরের ভেতরের দিকে গিয়ে ভারতী শ্রীরামের দিকে চকিত চাহনি নিক্ষেপ করলো, সে যার মানে করে নিলো, ‘মনে রেখো, বোকার মতো যেন কিছু বলো না।’ মহাত্মা বললেন, ‘এটা যাতে করতে পারি সেজন্য আজকাল আমি সাধারণত এক ঘন্টা আগেই উঠি। একটা নির্দিষ্ট পরিমাণ সুতা বানানো আমার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজ। এমনকি আমার প্রার্থনাও এর পরে করি । আমি খুব করে চাই তুমি শপথ করো যে প্রতিদিন তোমার নিজের হাত দিয়ে বানানো কাপড়ই শুধু তুমি পড়বে।’ ‘জ্বী, তাই করবো, ’ শ্রীরাম প্রতিজ্ঞা করলো। তালুক অফিসের ঘন্টায় চারটা বাজলে মহাত্মা শ্রীরামকে তাঁর সাথে বাইরে হাঁটতে বললেন। তিনি তাঁর লাঠিটা এক হাতে ধরে আরেক হাত দিয়ে ভারতীর কাঁধে ভর দিলেন এবং কুটির থেকে বেরিয়ে পড়লেন--- সাদা কাপড়ে লম্বা শরীর। কোমরে সাদা ধুতির মধ্যে তাঁর ঘড়িটা ভাঁজ করে রেখেছিলেন। এটা বের করে বললেন: ‘আধা ঘন্টা হাঁটতে হবে, আমার সাথে আসো, শ্রীরাম। আমার সাথে নির্বিঘেœ কথা বলতে পারো।’ আরো কয়েকজন যোগ দিলো। শ্রীরামের মনে হলো সে কোনো কাল্পনিক স্বপ্নের জগতের মধ্যে দিয়ে হাঁটছিলো। ভারতী ও তার মাঝে মহাত্মা ছিলেন। তাই যতবারই সে চাইলো ততবারই ভারতীর দিকে দৃষ্টি দেওয়া কঠিন কাজ হলো। তার হাস্যজ্জ্বোল মুখখানি এক নজর দেখার জন্য তাকে মাঝে মাঝে সিকি ইঞ্চি পিছনে পা ফেলতে হলো। নদী তীর ধরে তারা হাঁটলো। পূবের আকাশ গোলাপী ছিলো। গান্ধী ঘুরে তাঁর পেছনের লোকগুলির সাথে কাজের আলাপ করলেন। হঠাৎ নিজেই তিনি শ্রীরামকে বললেন: ‘তোমাদের শহরটা খুবই সুন্দর। আগে কি কখনো তা খেয়াল করেছো?’ শ্রীরাম অখুশি হয়ে হাঁপাতে লাগলো। সকালের হাওয়া তার মুখে এসে আঘাত করলো, পাখিরা কিচির মিচির করছিলো, আর শহরটা ছিলো শান্ত: সব সুপরিচিত ছিলো, কিন্তু মহাত্মা কেন তা এখনই উল্লেখ করলেন? তার কি ‘হ্যাঁ ’ বা ‘না ’ বলা উচিৎ? যদি ‘হ্যাঁ ’ বলে, তবে মিথ্যা বলা হবে যা তৎক্ষণাৎ ধরা পড়বে; যদি ‘না ’ বলে, তবে ভগবানই জানেন মহাত্মা তাকে কী ভাববে। সে আশেপাশে তাকালো। কলোনির কয়েকজন খলপু যারা এ দলে যোগ দিয়েছিলো তারা সে কী বলবে তার জন্য সাগ্রহে অপেক্ষা করছে: তারা নিশ্চয়ই তার এ দূরাবস্থা উপভোগ করছে, আর ভারতীর দিকে তাকাতে তার সাহস হলো না। মহাত্মা বললেন: ‘ভগবান সর্বত্রই আছেন। তার উপস্থিতি অনুভব করতে চাইলে এরকম একটা জায়গায় তাকে দেখতে পাবেÑ যেখানে সুন্দর নদী বইছে, সূর্য তার সব রঙ নিয়ে উদয় হচ্ছে এবং বাতাস এত বিশুদ্ধ। সুন্দর একটা সময় বা দৃশ্য বা জিনিস অনুভব করাই হচ্ছে এক ধরনের প্রার্থনা।’ শ্রদ্ধাবনত নীরবতায় শ্রীরাম শুনলো এবং আনন্দিত হলো যে এত হালকার উপর দিয়ে সে বেঁচে গেলো। গান্ধীজী সূর্য ও বাতাস সম্পর্কে সৌন্দর্যের কথা বললে তা অবাস্তব শোনালো, কিন্তু শব্দটি বাস্তব তাৎপর্য্য বহন করলো যখন সে তা ভারতীর ক্ষেত্রে ভাবলো। গান্ধী বললেন: ‘পরের বার দেখা হলে তুমি অবশ্যই তোমার সম্পর্কে আমাকে ভাল একটা বর্ণনা দেবে।’ তিনি দয়ালুর মতো করে হাসলেন, আর শ্রীরাম বললো, ‘জ্বী, বাপুজী, আমি ভিন্ন একজন মানুষ হবো।’ ‘তুমি “ভিন্ন ” বলছো কেন? তুমি যদি সম্পূর্ণরূপে নিজের হও, তাহলে তুমি ঠিক থাকবে।’ ‘আমার মনে হয় না তাতে হবে, বাপু, ’ ভারতী বললো, ‘নিজের হওয়া থেকে তার বদলে যাওয়া উচিৎ, যদি ভাল কোনো কাজে সে আসতে চায়। আমার মনে হয় ও খুব অলস। সকাল আটটায় ঘুম থেকে ওঠে, আর সারাদিনটা অলসভাবে কাটায়।’ ‘তুমি কী করে জানো?’ ক্রুদ্ধ হয়ে শ্রীরাম জিজ্ঞেস করলো। ‘অনুমান করেছি মাত্র, ’ মেয়েটি বললো। তার দায়িত্বজ্ঞানহীন কথাবার্তায় শ্রীরাম তার সাথে রাগান্বিত বোধ করলো। সবাই হেসে উঠলো। মহাত্মা বললেন: ‘এমন কথা অবশ্যই তুমি কখনো বলবে না, ভারতী, যদি না তুমি তার দায়িত্বভার নিয়ে তাকে সাহায্য করো।’ এভাবে হাঁটতে হাঁটতে শেষ পনের মিনিটে মহাত্মা কিছু বললেন না; সামনের মাটির দিকে তাকিয়ে নীরবে হাঁটলেন। মহাত্মা নীরব থাকলে পর বাকিরা আরো বেশি নীরব রইলো, তারা তাঁর সাথে তাল মিলাতে বালিতে শুধু একটার আগে আরেকটা পা ফেললো: কেউ কেউ বেশ হাঁপালো আর শব্দটা দমন করার কঠোর চেষ্টা চালালো। মহাত্মার নীরবতা ছিলো ভারী ও পরিব্যাপ্ত, আর শ্রীরাম ঢোক গিলতে অথবা কাশি দিতেও ভয় পেলো, যদিও খুব করে চাইলো গলা পরিস্কার করতে, হাঁচি দিতে, হাত দুটো ছুঁড়তে। সে সময়ে একমাত্র আওয়াজ ছিলো নদীর বয়ে যাওয়া ও পাখির কিচির মিচির। কোথায় যেন একটা গরু হাম্বা হাম্বা ডাকলো। ছ্যাবলামির অবতার ভারতীকেও মলিন মনে হলো। মহাত্মা তাঁর ঘড়িটি বের করে দ্রুত দেখে বললেন, ‘আমরা ফিরে যাবো, এইটুকুই আজ হাঁটতে পারলাম।’ শ্রীরাম জিজ্ঞেস করতে চাইলো, ‘কেন?’ কিন্তু সংযত হলো। তারা পেছনে হাঁটায় মহাত্মা ঘুরে বললেন, ‘তোমার একজন ঠাকুরমা আছে, শুনেছি, বাবা-মা নেই।’ ‘জ্বী। ঠাকুরমা, অনেক বুড়ি।’ ‘হ্যাঁ, তা অবশ্যই হবে, নইলে তাকে তুমি ঠাকুরমা বলছো কেন?’ লোকজন হেসে উঠলো, শ্রীরামও ভদ্রতাবশত সে হাসিতে যোগ দিলো। ‘এতক্ষণ ধরে যে তুমি তার কাছ থেকে দূরে আছো তিনি তোমাকে খুব মিস করছে না?’ ‘জ্বী, খুবই। তিনি আমার সাথে রাগ করে আছেন। আমি জানি না এখন কী করা যায়, ’ সামনে এগিয়ে সাহসের সাথে শ্রীরাম বললো। স্বেচ্ছায় কিছু একটা বলতে পারায় তার খুশি লাগলো, কিন্তু তার একমাত্র ভয় ছিলো যে ভারতী এর মধ্যে এসে নোংরা ও বিব্রতকর কিছু বলতে পারে। কিন্তু ভারতী শান্ত ছিলো দেখে সে খুশি হলো। মহাত্মাজী বললেন: ‘ঠাকুরমাকেও দেখাশুনা করতে হবে, তোমাকে বড় করতে তিনি অবশ্যই নিজেকে উৎসর্গ করে থাকবেন।’ ‘জ্বী, কিন্তু আমি এভাবে দূরে থাকলে তিনি অনেক ঘাবড়ে যান।’ ‘তার কাছ থেকে দূরে থাকা কি তোমার এতই প্রয়োজন?’ ‘জ্বী, বাপু, নইলে এ বিশ্বে কেমন করে আমি কিছু করতে পারবো?’ ‘তুমি ঠিক কী করতে চাও?’ এখন শ্রীরাম অসঙ্গত হলো। নানা ভাবনা ও সব বিভ্রান্তি তাকে পেয়ে বসলো এবং তাতে অনেক বেশি ধারণার সৃষ্টি হলো। সে কিছু একটা বললো, আর মহাত্মা ধৈয্যের সাথে তাকে লক্ষ করলো, অন্যরাও দম বন্ধ করে লক্ষ করলো । আত্ম-অভিব্যক্তির সংগ্রাম করার কিছুক্ষণ পরে শ্রীরাম অকাট্য বাক্য খুঁজে পেলো। অবচেতন আকাঙ্খার অবিগলিত চাপেই তার ঠোঁটে বাক্য কেঁপে উঠলে সে বললো, ‘ভারতী যেখানে আছে আমি সেখানে থাকতে চাই।’ মহাত্মা বললেন, ‘ওহ্ , তাই!’ তিনি ভারতীর পিঠে হাত বুলিয়ে বললেন, ‘তুমি কী চমৎকার বন্ধু পেয়েছো! এমন একজন নিবেদিতপ্রাণ বন্ধু পেয়ে তোমার অবশ্যই সন্তুষ্ট হওয়া উচিৎ। কতদিন ধরে তাকে চেনো?’ ভারতী ঝটপট উত্তর দিলো, ‘গতকাল থেকে। আমি ওকে তোমার কুটিরে বসে থাকতে দেখেছি। আর আমি তাকে জিজ্ঞেস করেছিলাম সে কে।’ শ্রীরাম কথার মাঝখানে বললো, ‘কিন্তু আমি তাকে আগেই চিনতাম, যদিও গতকাল মাত্র তার সাথে কথা বলেছি।’ মহাত্মা তাঁর কুটিরে চলে গিয়ে অন্যান্য কাজ করতে শুরু করলেন। অনেকে তাঁর জন্য অপেক্ষা করছিলো। যে মুহূর্তে তারা কুটিরে এসে পৌঁছালো, সে মুহূর্তেই ভারতী মহাত্মার কুটিরে অদৃশ্য হয়ে গেলো। শ্রীরাম পিছনে পড়ে রইলো এবং বাইরে অপেক্ষমান জনতার সাথে মিশে গেলো। ভারতীর অবস্থানে তার হিংসা হলো। ভারতী তাকে পরে খুঁজে বের করে বললো, ‘তুমি হয়তো এতে অনভ্যস্ত, কিন্তু বাপুজীর উপস্থিতিতে আমরা কেবল পরম সত্যটাই বলি, এর চেয়ে কম কিছু বলি না, বেশি কিছুও বলি না।’ শ্রীরাম তাকে তিরস্কার করলো: ‘এখন তিনি আমার সমন্ধে কী ভাববেন যখন তিনি জানবেন যে আমি তোমাকে যথেষ্ট আগে থেকে চিনি না আর তবুও---’ ‘আচ্ছা, কী?’ ভারতী তাকে খোঁচা মেরে বললো। ‘আর তবুও তোমার সাথে থাকতে চাই।’ ‘তো ভেতরে গিয়ে তাকে বলছো না কেন যে তুমি আজেবাজে বকছিলে এবং পূর্ব চিন্তা বা আত্ম-নিয়ন্ত্রণ না থাকায় বোকার মতো ওসব কথা বলেছো? তাকে বলতে পারলে না কেন যে তুমি দেশের সেবা করতে চাও, যে তুমি দেশপ্রেমিক, যে ইংরেজদের দেশ ছাড়া দেখার জন্য তুমি তোমার রক্ত দিতে চাও? মহাত্মার কাছে এলে এটাই তো অনেকে বলে । তাঁর কাছে এসে একই কথা বলতে আমি শত শত লোককে দেখেছি।’ ‘আর তিনি সব বিশ্বাস করেন?’ শ্রীরাম প্রশ্ন করলো। ‘হয়তো না, কিন্তু তিনি মনে করেন কাউকে অবিশ্বাস করা ঠিক নয়।’ ‘কিন্তু তুমি বলছো তার উপস্থিতিতে আমাদেরকে অবশ্যই সত্য কথা বলতে হবে।’ ‘পারলে অবশ্যই, কিন্তু না পারলে সবচেয়ে ভাল কাজ হচ্ছে চুপ করে থাকা।’ ‘আমার সাথে এত রেগে আছো কেন? অন্যের সাথে রাগ না করা কি তোমার দায়িত্বের অংশ নয়?’ শ্রীরাম করুণভাবে জিজ্ঞেস করলো। ‘আমি পরোয়া করি না, ’ ভারতী বললো, ‘মহাত্মাকেও জ্বালাতন করার জন্য এই যথেষ্ট। এখন তিনি আমাকে কী মনে করবেন যদি তিনি উপলব্ধি করেন আমি তোমার মতো ছেলেকে এ জায়গায় ঘুর ঘুর করতে উৎসাহিত করছি, যে ছেলেকে এখনো একটা গোটা দিনের জন্যও চিনি না!’ শ্রীরাম বেপরোয়া হয়ে উৎফুল্লভাবে বললো, ‘তোমাকে কতদিন ধরে চিনি তাতে কী এসে যায়? তুমি কি মনে করেছিলে আমার কথা বলার আগে তুমি কথা না বললে তাঁর কাছে আমি মিথ্যা বলতে যাচ্ছিলাম।’ এইসব ঝগড়া শেষ হলো যখন অন্য কুটির থেকে কে যেন ‘ভারতী ’ বলে ডাকলো। তাকে সেখানে ফেলে ভারতী অদৃশ্য হয়ে গেলো। ভারতীর কথায় সে একটা বুদ্ধি পেলো। তার নিজের বাদ পড়া উপলব্ধি করলো ও পরের বার মহাত্মার সাথে হাঁটলে এটি পুুষিয়ে নেওয়ার প্রস্তাব রাখলো। শ্রীরামের উৎকণ্ঠা পাছে সে ঘুমিয়ে পড়ে যখন মহাত্মা সারারাত নিজে জেগেছিলো। শিবিরে লোকদের মাঝে একজনের সাথে সে মেঝে ভাগ করে নিলো। কুটিরে শুয়ে থাকা এক ধরণের অদ্ভুত অনুভূতি ছিলো, আর তার মনে হলো সে সম্পূর্ণ নতুন এক বিশ্বের নাগরিক হচ্ছিলো। কবির লেনে তার বাড়ির আরামদায়ক কক্ষটার অভাব অনুভব করলো সে। অভাব অনুভব করলো দুটো বালিশ ও নরম তোষক এবং এর নিচের কার্পেটের; এমনকি গৃহস্থ জীবনের মানে সংযোজিত কবির সরণীর রাস্তার শোরগোল; সবকিছুর অভাব সে ব্যাপকভাবে অনুভব করলো এখন। জীবনের সম্পূর্ণ নতুন ধরণ তাকে গ্রহন করতে হলো। নিজের পছন্দে তাকে সংকীর্ণ, খড়ের চালা কুটিরে থাকতে হলো। নোংরা, কালি পড়া, দুগন্ধ সবকিছুতে লেগে আছে। মেঝেটি গোবর দিয়ে লেপে হালকা বালু দিয়ে ঢেকে দেওয়া হয়েছিলো। হাতটাকে বালিশের মতো করে মাথায় গোঁজাতে হলো । শিবিরের আরেকজন স্বেচ্ছাসেবকের সাথে জায়গাটি ভাগ করে নিতে হলো। এই মড়ামুখো গুরুগম্ভীর তরুণটি খাদী কাপড়ের হাফ প্যান্ট, অন্তর্বাস ও পুরোপুরি কামানো মাথায় সাদা টুপি পরে ছিলো। চোখে ছিলো অগ্নি-দৃষ্টি, মুখে ছিলো না হাসি। উত্তর ভারত থেকে এসেছিলো, ভাঙ্গা ভাঙ্গা ইংরেজি বলতো এবং তামিল কোন শব্দ জানতো না। এই লোকটি একটি ছোট ব্যাগে কাপড় পুরে মাথার নিচে ঠেস দিয়ে মেঝেতে সটান হয়ে ইতোমধ্যেই শুয়েছিলো। ভারতী শ্রীরামকে বললো, ‘শিবিরের চারপাশে তোমার বরং শক্তভাবে অবস্থান করাই ভাল, যদি তুমি মহাত্মাজীর সাথে থাকতে চাও। এখানে তোমার কোনো আরাম থাকবে না, মনে রেখো। এভাবে থাকার জন্য আমরা সবাই প্রশিক্ষনপ্রাপ্ত।’ নাক সিঁটকে শ্রীরাম বললো, ‘ওহ্ , কে এখানে আরাম চায়? নিজের আরামের জন্য পরোয়া করি না। তোমার কি মনে হয় আমি সেই ব্যক্তি যার জীবনে বিলাসিতা দরকার?’ এক শ্রেণীর সমাজে বিলাসিতা সামাজিক মর্যাদা প্রদান করে, আর এখানে এখন তার বিপরীত। যতই কেউ বিলাসহীনতার কথা ঘোষণা করে ততই সে দুঃখ-কষ্টের দিকে ঝোঁক দেখায়, আর তত বড় সুযোগ মেলে তার এখানে প্রবেশ করার। শিবিরে পা দিতেই শ্রীরাম তা উপলব্ধি করেছিলো। এখানে ভোগান্তি ও মর্মাঘাতের প্রচলন আছে। সবাইকে মনে হলো প্রতিবেশীর অস্বস্তিকর পরিস্থিতি চমৎকারভাবে সামলাচ্ছে। এই স্পৃহা শ্রীরামকেও ধরে বসলো, যদিও বিশদ বুঝতে ও অভ্যস্ত হতে তার সময় লাগলো। সন্ধ্যায় সভা শেষ করার পর মহাত্মা যথারীতি সাড়ে সাতটায় বিছানায় গেলেন, আর পুরো শিবিরটার জন্যই এটি হচ্ছে বিছানায় যাওয়ার সংকেত। ভারতী শ্রীরামকে খুঁজে বের করে থালাভর্তি ভাত ও ঘোল এবং একটি কমলা দিলো। আর শিশুদের কোনো এক প্রতিনিধিবর্গ মহাত্মাকে যে ফুলের তোড়া দিয়েছিলো সেখান থেকে ছোট একটি জুঁই ফুল নিয়ে তাকে প্রদান করলো। শ্রীরাম কৃতজ্ঞচিত্তে ফুলটি গ্রহণ করে গন্ধ শুঁকলো এবং জিজ্ঞেস করলো, ‘তুমি কী করে জানলে যে আমি জুঁই ফুল পছন্দ করি?’ ‘সেটা জানা কঠিন কোনো কাজ নয়, ’ এই বলে সে তৎক্ষণাৎ বিষয়টি বাদ দিলো। সে বললো, ‘গোর্পদ নামে এক স্বেচ্ছাসেবকের সাথে তোমার ঘুমানোর একটা জায়গা পেয়েছি।’ শ্রীরাম কুটিরে প্রবেশ করার সময় গোর্পদ অর্ধ-ঘুমন্ত ছিলো। ভারতী উঁকি মেরে বললো, ‘ভাই... ’ আর হিন্দিতে কিছু একটা বললো এবং ঘুরে জায়গাটি থেকে অদৃশ্য হলো। অন্যজন হালকা মাথা তুলে বললো, ‘ভেতরে এসে ঘুমাতে পারো।’ ‘মেঝেতেই শুধু?’ শ্রীরাম জিজ্ঞেস করলো। ‘অবশ্যই, অবশ্যই, ’ অন্যজন বললো। ‘কেন? ’ শ্রীরাম জিজ্ঞেস করলো। ‘কেন? কারণ মহাত্মাজী তাই বলে।’ ‘ওহ্ , ’ বিপজ্জনক ভুমিতে সে হাঁটছে এমন বোধ করে শ্রীরাম বললো। ‘নইলে মেঝেতে ঘুমানোর আমি তো কোনো কারণ দেখছি না ।’ ‘ নইলে দ্বারা কী বোঝাতে চাচ্ছো? বাদানুবাদের সহিত অন্যজন বললো। শ্রীরাম গোর্পদের পাশে শুয়ে বললো, ‘আমি সেটা বোঝাতে চাইনি।’ ‘কী বোঝাতে চাওনি?’ অন্যজন বললো। তাকে কলহপরায়ণ মনে হলো। শ্রীরামের তাকে ভয় লাগলো। এই যোদ্ধার সাথে তাকে রাখার উদ্দেশ্য কী ভারতীর? এমন কি হতে পারে যে মেয়েটি তাকে অপছন্দ করে, আর চায় সে মার খাক? যদি সে অপছন্দই করতো, তবে তাকে জুঁই ফুল দিতো না। সবাই জানে যে জুঁই ফুল দেওয়া-নেওয়া হয় শুধু পরস্পর পছন্দ করে এমন দু’জনের মধ্যে। তারপরও মেয়েটি তাকে জুঁই ফুল দিয়েছিলো এক হাতে আর আরেক হাতে এই ভয়ংকর লোকটির কাছে ঠেলে দিলো। সে ঘুমালে পরে গোর্পদ তার বুকের উপর বসে তাকে শ্বাসরোধ করার চেষ্টা করতে পারে। গোর্পদ বললো, ‘তুমি এখানে নতুন, মনে হয়? ‘হ্যাঁ, ’ শ্রীরাম বললো। ‘এ জায়গায় আমি নতুন। মহাত্মাজীর দয়ায় আমি এখানে আছি, নইলে বাড়ি গিয়ে এতক্ষণে ঘুমাতাম।’ ‘হু, ’ সজীব আলোয় পরিস্থিতি বোঝার মতো ভাব করে গোর্পদ বললো। ‘তোমাকে এখানে স্বাগতম। আমাদের সবাইকে শিবিরে সেনাদের মতো করে থাকতে হয়। আমাদের দেশ থেকে ইংরেজদের বিতাড়িত করার যুদ্ধে আমরা প্রকৃতপক্ষে সেনাই। এ কাজের জন্য আমাদের জীবন উৎসর্গ করতে আমরা প্রস্তুত। এখানে খালি মেঝেতে ঘুমাই কারণ জীবনের বেশিরভাগ সময়টাই আমাদের জেলে কাটাতে হবে, যেখানে আমাদেরকে কোনো আরামদায়ক বিছানা দেওয়া হবে না যদি না আমরা এ বা বি শ্রেণীর কয়েদী হই। এ বা বি শ্রেণীতে পড়ার মতো গুরুত্বপূর্ণ আমরা নই, আর তোমার এসব কিছুতে অভ্যস্ত হওয়াই ভাল। পুলিশের হাতে মার খাওয়া, লাঠির গুঁতা খাওয়া, জেলে টেনে-হেঁচড়ে নেওয়া এমনকি গুলি খাওয়ার জন্য সবসময় আমরা প্রস্তুত। এক পুলিশের গুলিতে আমার বাবা দশ বছর আগে মারা গেছেন।’ রাজনৈতিক স্মৃতিচারণে আরো বেশি চরম হয়ে শ্রীরাম বললো, ‘আমি জানি ভারতীর বাবাও একইভাবে মারা গেছেন, পুলিশের পিটুনিতে।’ ‘১৯২০ সালে প্রথম অসহযোগ দিনগুলো ছিলো সেটি। মাদ্রাজে সচিবালয় থেকে ইউনিয়ন জ্যাক ছিনিয়ে নিতে সত্যাগ্রহীদের প্রথম যে ব্যাচটা ছিলো তাদেরকে তার বাবা নেতৃত্ব দিয়েছিলো। পুলিশের লাঠি দিয়ে তাকে পেটানো হয়েছিলো। বুকে একটা আঘাত লাগলে তিনি মাটিতে পড়েই মরে গেলেন, কিন্তু আমার বাবাকে গুলি করেছিলো। তুমি কি জানো তাকে আসলে পুলিশের রাইফেল দিয়ে গুলি করা হয়েছিলো? জনতার মধ্যে আমিও তাকে দেখছিলাম। তিনি একটা দোকানে পিকেটিং করছিলেন যেখানে তারা টোডি ও অন্যান্য মদ বিক্রি করছিলো। তখন একদল পুলিশ এসে তাকে চলে যেতে বললো, কিন্তু তিনি যেতে চাইলেন না। জনতা ভীড় করলো, অনেক গোলমাল হলো আর শেষে পুলিশ তাকে সরাসরি গুলি করলো।’ এটা স্মরণ করে সে অশ্র“ মুছে ফেললো। ‘ইংরেজদের ভারতের বাইরে না পাঠানো পর্যন্ত আমি ক্ষান্ত হবো না, ’ তার কণ্ঠস্বর দুঃখভারাক্রান্ত হলো। ‘আমার ভাই সন্ত্রাসী হলো, আর অনেক ইংরেজ কর্মকর্তাকে গুলি করে মেরে ফেললো। কেউ তার ঠিকানা জানে না। তার সাথে আমারও যোগ দিয়ে আরো অনেক ইংরেজকে গুলি করা উচিৎ ছিলো, কিন্তু আমাদের মহাত্মা চিন্তা-ভাবনাতেও সহিংস হতে দেবেন না, ’ মনস্তাপের সাথে সে বললো। শ্রীরাম অনেকটা সহানুভূতিশীল হতে চেয়ে বললো, ‘সব ইংরেজকে গুলি করা দরকার। তারা অনেক নির্দয় হয়ে গেছে।’ ‘ওসব ব্যাপারে তোমার চিন্তাও করা ঠিক নয়, যদি তুমি সত্যিকারের একজন সত্যাগ্রহী হতে চাও, ’ অন্যজন বললো। ‘না, না, ওসব নিয়ে আসলে ভাবছি না, ’ সঙ্গে সঙ্গে শ্রীরাম নিজেকে শুধরে নিলো। ‘আমার অনেক দুঃখ লাগছিলো। কাউকে গুলি করা সম্পর্কে কথা বলা আমাদের অবশ্যই উচিৎ নয়, আর অস্ত্রই বা কোথায়? আমাদের কোনো অস্ত্র নেই। ঠাকুরমা বলতো যে বাড়িতে বাবার একটা বন্দুক ছিলো। তুমি কি জানো তিনি মেসোপটেমিয়ায় মারা যান? তাকেও সরাসরি গুলি করা হয়েছিলো।’ ‘যুদ্ধে, গত যুদ্ধে মারা যান?’ ‘হ্যাঁ, ’ শ্রীরাম বললো। ‘তাহলে অবশ্যই ইংরেজ সেনাবহিনীর একজন সৈন্য হবেন, ’ গোর্পদ তার কণ্ঠস্বরে অবজ্ঞা নিয়ে বললো। শ্রীরাম তা খেয়াল করলো, কিন্তু বিনা প্রতিবাদে মেনে নিলো। পুষিয়ে নেওয়ার ভাব নিয়ে সে বললো, ‘তারা বলে তিনি একজন বড় মাপের সৈন্য ছিলেন।’ ‘সম্ভবত, সম্ভবত, ’ অন্যজন উৎসাহদানের স্বরে বললো। শ্রীরাম একে বিচার হিসাবে মেনে নিলো। সে রাতে সে প্রচুর রাজনৈতিক জ্ঞান লাভ করলো। গোর্পদ রাত দু’টো পর্যন্ত কথা বলেই গেলো এবং পরে তারা দুজনেই নদীর উদ্দেশ্যে রওয়ানা দিলো, সেখানে হাত-পা ধৌত করলো এবং যে সময় নাগাদ শিবিরের সবাই জেগে উঠলো, সে সময় নাগাদ শ্রীরাম পরিস্কার-পরিচ্ছন্ন হয়ে ফিরে এলো, যার ফলে ভারতী বললো, ‘প্রথম দিনটা আমাদের সাথে খুব ভালভাবেই শেষ করলে।’ মনোযোগ দিয়ে গোর্পদের কথা শোনার মাধ্যমে সে অনেক রাজনৈতিক শব্দ শিখে ফেলেছিলো এবং বিব্রতকর অবস্থা ছাড়াই মহাত্মার সাথে হাঁটতে নিজেকে প্রস্তুত মনে করলো। সে মহাত্মাকে বললো, ‘জীবনে আমার সবচেয়ে বড় আকাঙ্খা হলো ভারত থেকে ইংরেজদের উচ্ছেদ করার শপথ নেওয়া।’ হাসি দিয়ে মহাত্মা তার দিকে তাকালেন এবং জিজ্ঞেস করলেন, ‘এটা কীভাবে সমাধা করার প্রস্তাব করো তুমি?’ শ্রীরাম কোনো তৈরী উত্তর খুঁজে পেলো না। সে যে অযথা কথা বলেছিলো এরকম অনেক উপলক্ষের মধ্যে এটি একটি ছিলো। অন্যপাশে ভারতীকে সে এক নজর দেখলো, তার দুষ্টামিভরা মুখখানি শ্রীরামের এমন বিভ্রান্তির আনন্দে ঝলমল করে উঠলো। তার চাহনি শ্রীরামের আত্মসম্মানে আঘাত হানলো। দম্ভভরে সে বললো, ‘আপনার আশীর্বাদ পেলে, স্যার, আমি কাজটার জন্য যথেষ্ট যোগ্য হিসাবে নিজেকে গড়ে তুলবো। যতদিন সম্ভব আমি আপনার সাথে থাকবো, আর দয়া করে আপনি যদি আমাকে পথনির্দেশ করেন, তবে আমাদের দেশ ছাড়াতে ইংরেজদের সাথে যুদ্ধ করতে আমাকে একজন যোগ্য সৈনিক হিসেবে গড়ে তুলতে পারবেন।’ মহাত্মা তার দৃঢ়সংকল্পে আনন্দের প্রতিটি চিহ্ন প্রদর্শন করলেন। তিনি কিছুক্ষণ নীরব থাকলেন যখন তারা মৃদু পায়ে বালুর উপর হাঁটছিলো, সবার উপর গভীর নীরবতা দেখা দিলো। ‘ঠিক আছে, তরুণ বন্ধু, ভগবান চাহে তো তুমি বড় কিছু করতে পারবে, তার উপর বিশ্বাস রাখলে তোমার সবকিছু ঠিক থাকবে।’ একে সৈনিক হিসেবে টিকে থাকার জন্য বেশ নীরস প্রস্তুতি মনে হলো শ্রীরামের কাছে। যদি সম্ভব হতো সে খাকি পোশাকে ও শোভাকৃত বুকে ভারতীর সামনে বুক ফুলিয়ে হেঁটে যেতো, যদিও বিশ্বে তখন শোভার আতিশায্যে অরুচি ধরেছিলো। তার ধারণা দূর করে মহাত্মা এখন নিজেই কথা বললেন: ‘এ দেশ থেকে ইংরেজদের তাড়িত করতে চাওয়ার আগে তোমাদের প্রথা থেকে সহিংসতার প্রতিটা চিহ্নকে অবশ্যই তাড়াতে হবে। মনে রেখো যে এ যুদ্ধ লাঠি ও চাকু বা বন্দুক দিয়ে হবে না, শুধু ভালবাসা দিয়ে হবে। যে পর্যন্ত তুমি নিশ্চিত না হও যে তোমার শত্র“র জন্য তোমার হৃদয়ে প্রবল ভালবাসা আছে, সে পর্যন্ত তাকে তাড়িয়ে দেওয়ার কথা চিন্তা করো না। তোমাকে ধীরে ধীরে “শত্র“” শব্দটি ভুলে যেতে হবে। তাকে অবশ্যই বন্ধু ভাবতে হবে যে তোমাকে অবশ্যই ছেড়ে যাবে। শতভাগ অহিংস সৈনিক হওয়ার জন্য তোমাকে অবশ্যই প্রশিক্ষণ নিতে হবে। তোমাকে এতো স্পর্শকাতর হতে হবে যে জবাই করা পশুর চামড়ার তৈরী স্যান্ডেল তোমার পড়া যাবে না; স্বাভাবিকভাবে মরে যাওয়া প্রাণীর চামড়া সংগ্রহ করতে না পারলে, অর্থাৎ তোমার জন্য মেরে ফেলা পশুর চামড়া পরার থেকে বরং খালি পায়ে চলা তোমাকে বেছে নিতে হবে। ’ শ্রীরাম বললো, ‘জ্বী, প্রতিজ্ঞা করছি, ’ কিন্তু বলার সময় তার চোখ দুটো মহাত্মাজীর পায়ে নিবদ্ধ হলো; তার মনে উছলে পড়া প্রশ্ন দমন করতে প্রাণপণে চেষ্টা করলো সে। মহাত্মা তার মনের চিন্তা পড়ে বললেন, ‘হ্যাঁ, এগুলো ঠিক এরকম চামড়ার তৈরী স্যান্ডেল। বর্ধে আমাদের ট্যানারিতে আমরা এটা বিশেষভাবে বানাই। আমাদের আশ্রমের কেউ অন্য কিছু পরে না।’ শ্রীরাম জিজ্ঞেস করতে চাইলো, ‘কেমন করে জানবেন কোন পশু কখন মারা যাচ্ছে, আর কেমন করে তা দেখবেন?’ কিন্তু অপদার্থের মতো প্রশ্নটি নির্দয়ভাবে সে চেপে গেলো পাছে তার আসল রূপ ধরা পড়ে। শ্রীরামকে বলা হয়েছিলো যে সে গ্রামে গ্রামে মহাত্মাজীর সাথে যেতে পারবে এই শর্তে যে বাড়ি গিয়ে ঠাকুরমার অনুমতি নিয়ে আসতে হবে। শ্রীরাম বিষয়টি আড়াল করার চেষ্টা করে বললো যে এর প্রয়োজন হবে না, সে ইঙ্গিত দিলো বাসা থেকে বের হওয়ায় অভ্যস্ত একজন স্বাধীন মানুষ সে। মহাত্মার স্মৃতি এর থেকেও ভাল ছিলো। হাসি দিয়ে তিনি বললেন, ‘আমার মনে আছে তুমি বলেছিলে যে আমাদের সাথে তুমি মিশছো সেটা দেখতে তিনি পছন্দ করতেন না।’ শ্রীরাম ভেবে বললো, ‘জ্বী, গুরু, কিন্তু কীভাবে চিরকাল আমি তার আঁচলে বাধা থাকতে পারি? এটা সম্ভব নয়।’ ‘তুমি কি একেবারে নিশ্চিত যে তুমি তোমার জীবন ধরণ পাল্টাতে চাও?’ মহাত্মা জিজ্ঞেস করলেন। ‘আমি অন্য কিছু ভাবতে পারছি না, ’ শ্রীরাম বললো। ‘এত বছর যেভাবে জীবন যাপন করেছি এখন কীভাবে সেরকম জীবন যাপন করতে পারি?’ ভারতীর দিকে সে চকিত চাহনি ফেললো যখন ভারতী মহাত্মার জন্য ভেতর থেকে কিছু চিঠি নিয়ে এলো। তার চাহনি তাকে বাক্যটি শেষ করতে দিলো না, যে বাক্যটি হতে পারতো, ‘আর আমি সবসময় চাই ভারতীর সাথে থাকতে, আমার ঠাকুরমার সাথে নয়।’ মহাত্মা বললেন, ‘যতদিন চাও তুমি আমাদের সাথে থাকবে, আর তাতে আমি খুশি হবো, কিন্তু তোমাকে অবশ্যই সর্বপ্রথমে বাড়ি গিয়ে ঠাকুরমার কাছে বলে তার আশীর্বাদ নিতে হবে । তুমি কী করতে চাও তা তাকে অকপটে জানাতে হবে, কিন্তু তাকে অবশ্যই কোনো ব্যথা দেওয়া যাবে না।’ শ্রীরাম ইতস্তত করলো। ঠাকুরমার মুখোমুখি হওয়ার ব্যাপারটিতে সে বিচলিত হয়ে উঠলো। তার সম্পর্কে চিন্তাটা ছিলো অবাস্তব ঝামেলাপূর্ণ জগতের চিন্তার মতো, যে জগতকে সে আশা করেছিলো চিরদিনের জন্য পিছনে ফেলে এসেছে। এখন তার বাস্তব জগত ছিলো ভারতী, গোর্পদ, জবাই না করে স্বাভাবিকভাবে মরে যাওয়া পশু, মহাত্মা, চরকার জগত। সব সময়ের জন্য সে এখানে থাকতে চাইলো: কবির সরণী, সেই বারান্দা, সেই দোকান ও সেইসব মানুষ যারা তাকে আট বছরের বালকের মতো মনে করতো তাদের কাছে ফিরে যাওয়া তার কাছে অসম্ভব মনে হলো। ঠাকুরমার কাছে গিয়ে তার মুখোমুখি হওয়ার জন্য তাকে জোরাজুরি না করার আবেদন জানানোর জন্য যেন সে মহাত্মার সামনে দাঁড়ালো । কিন্তু গুরু ছিলো অবিগলিত। ‘যাও তার সাথে কথা বলো। আমার মনে হয় না তোমার আকাঙ্খাকে অস্বীকার করার মতো তিনি এতটা অযৌক্তিক । তাকে বলো যে আমি তোমাকে আমার সাথে পেতে চাই। আমার সাথে পরের দুই সপ্তাহ বের হলে তুমি অনেক কিছু দেখবে ও শিখবে যা তোমার পরবর্তী জীবনে কাজে আসতে পারে। তাকে বলো যে তোমাকে যেতে দিয়ে তিনি আনন্দবোধ করবেন। তাকে আশ্বস্ত করো যে তোমাকে আমি নিরাপদে দেখাশুনা করবো।’ প্রতিটি শব্দ তাকে আতঙ্কে ভরে তুললো যখন তার মনে পড়লো সেই শব্দগুলো যেগুলো দিয়ে ঠাকুরমা মহাত্মাকে উল্লেখ করেছিলো। ঠাকুরমা কীভাবে তার প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করবেন তার সামান্যতম কোনো চিহ্ন প্রদান করতে তার সাহস হলো না। মহাত্মার জন্য তার দয়া হলো, এতো নিস্পাপ যে কেউ তার সম্পর্কে খারাপ কিছু বলার স্বপ্নও সে দেখতে পারলো না। ঠাকুরমার কথা ভেবে সে রাগান্বিত হলো, এমনই খারাপভাবে তিনি জানেন, এমনই অজ্ঞ ও গোঁড়া ব্যক্তিত্ব! কী কাজে তাকে তার অস্তিত্বকে এভাবে জটিল করে তুলতে হয়েছিলো? ইচ্ছেমতো চলতে পারলে সে ঠাকুরমাকে উপেক্ষা করতে পারতো, কিন্তু এখন তাকে মহাত্মাকে মেনে চলতে হলো। সে বললো, ‘ঠিক আছে, স্যার। আমি বাসায় গিয়ে ঠাকুরমার আশীর্বাদ আনবো। আগামীকাল সকাল সকাল ফিরে আসবো।’ পথে ছয় ছয়বার ফিরে এসে মহাত্মাকে বলার জন্য সে দৃঢ়সংকল্প হলো যে ঠাকুরমার সাথে সে দেখা করেছে। কীভাবে তিনি সত্যটা খুঁজে পাবেন? কিন্তু এ ভাবনাকে অবাস্তব হিসেবে সে বাদ দিলো, যদিও এমন পরিস্থিতিতে হয়তো তত অকাজের না। আচ্ছা যদি এমন হয় ঠাকুরমা চেঁচামেচি করা শুরু করলো, অজ্ঞান হলো অথবা আত্মহত্যার হুমকি দিলো, আর প্রতিবেশীদের জড়ো করার মতো যথেষ্ট গোলমাল করলো, যারা বাসায় এসে তাকে তালাবদ্ধ করে রেখে বাইরে যেতে দিলো না? গান্ধীজীকে বলার জন্য তার কি এ ঝুঁকি নেওয়া উচিৎ হবে যে সে একরোখা বৃদ্ধ ভদ্রমহিলাকে পরিকল্পনামাফিক দেখেছে? যৌক্তিক মানুষের মতো বলা কি বিচক্ষণ হবে না যে কাজটি হয়ে গেছে? ঠাকুরমা হয়তো অনুমান করে নেবে যে এসবের পিছনে ভারতী ছিলো এবং সে মহাত্মাজী সম্পর্কে যা বলবে তা অবিশ্বাস করবেন। অথবা তিনি যদি মহাত্মাজীর সম্পর্কে অপমানজনক কথা বলেন, তবে ধৈর্য্যসহকারে সে তার কথা শুনতে পারবে না। সে এমন কিছু করতে পারে যার জন্য সে পরে দুঃখবোধ করবে। মানস চোখে সে শক্তি ও সহিংসতা দিয়ে ঠাকুরমার কথা দমন করা দেখলো। কিন্তু তার মনে পড়লো এরকম কাজ করা ঠিক হবে না যেখানে মহাত্মা জড়িত। এটা শুনলে তিনি বিচলিত হবেন। এখন যা করার হা হচ্ছে ঘোড়ার গাড়িটা ঘুরিয়ে নিয়ে মহাত্মাকে বলা যে সে ঠাকুরমার আশীর্বাদ নিয়ে এসেছে। কিন্তু তখন , এটা মহাত্মা হওয়ায়, তিনি তার চিন্তা ধরে ফেলে তাকে ঠাকুরমার কাছে ফেরত পাঠাতে পারেন অথবা যে পর্যন্ত না তিনি আশ্বস্ত হন যে ঠাকুরমার সাথে দেখা হয়েছে সে পর্যন্ত তাঁর কর্মসূচী বাতিল করে রাখতে পারেন কিংবা এটা না হলে তিনি অনশন শুরু করতে পারেন। মহাত্মা ঠাকুরমাকে কেন এত গুরুত্ব দিচ্ছেন যখন করার মতো তাঁর এত কিছু আছে? ইংরেজদের তাড়ানোর মতো গুরুত্বপূর্ণ কাজ যখন তাঁর হাতে আছে, তখন ঠাকুরমার মতো সাধারণ বিষয় আমার হাতে ছেড়ে দেওয়া উচিৎ ছিলো। ঘোড়ার গাড়িতে চড়া অবস্থায় তার চিন্তাগুলো বিভ্রান্তিকর বিশৃঙ্খলায় ছিলো, কিন্তু শীঘ্রই ঘোড়াটি তাকে কবির সরণীতে পৌঁছে দিলো। দর কষাকষি না করে সে ভাড়া মেটালো এবং গাড়িটিকে শান্তভাবে পাঠিয়ে দিলো। সে চায়নি তার গতিবিধি প্রতিবেশীদের কাছে লক্ষণীয় হয়ে উঠুক। ঠাকুরমাকে সে অর্ধ-প্রীতিকর মেজাজে দেখতে পেলো। শ্রীরামের দীর্ঘ অনুপস্থিতি তাকে অস্থির করে তুলেছে মনে হলো। তিনি তার প্রতি সদয় হতে চেষ্টা করলেন। তার হয়তো আশঙ্কা ছিলো সে বাড়ি থেকে গটগট করে চলে যাবে যদি গতকালের মতো তার সাথে আচরন করে। তার কণ্ঠস্বর থেকে বকুনির সব রকম চিহ্ন তুলে নিয়ে তিনি এইটুকু বললেন: ‘কত দীর্ঘ সময় তুমি দূরে ছিলে, বাছা।’ তিনি শান্ত থাকার ভান করলেন। সে ঠাকুরমার জন্য কিনে আনা ক্যানভাস চেয়ারটি টেনে হল বাতির নিচে বসে পড়লো। ঠাকুরমা অস্থির হয়ে উঠলেন যেন তিনি অনেকদিন ধরে হারানো কাউকে ফিরে পেয়েছেন। এক থালা ঘি ভাজা খাবার তার সামনে রেখে তিনি বললেন, ‘এটা উকিলের বাড়ি থেকে পাঠিয়েছে: তার অষ্টম পুত্রের প্রথম জন্মদিন। মনে হয় না তারা কোনো সন্তানের জন্য কোনো কিছু মিস করে।’ এক টুকরো মুখে দিয়ে শ্রীরাম কড়মড় করে চিবালো। মাথা নেড়ে সায় দিয়ে সে বললো: ‘হ্যাঁ, খাঁটি ঘি দিয়ে তৈরী করেছে। ভালো মানুষ।’ কচকচ শব্দ করে সে চিবালো। ঠাকুরমা বললেন: ‘তোমার জন্য এটা তুলে রেখেছিলাম, আমি জানতাম এটা তোমার ভাল লাগবে। ভাবছিলাম কত সময় তুলে রাখবো। জানোই তো আমার দাঁত নেই। তুমি যখন এখানে নেই, তখন ওরকম খাবার কে চায়? সবটুকু খেয়ে ফেলো না, রাতের খাবার খেতে পারবে না।’ ‘ওহ্ , রাতের খাবার! রাতের খাবার খেয়েছি, ঠাকুরমা।’ ‘এত তাড়াতাড়ি!’ ‘হ্যাঁ, আশ্রম শিবিরে, সাধারণত সাতটার আগেই আমাদেরকে খেতে হয়। এটাই নিয়ম।’ ‘সাতটায় আবার কী ধরণের ডিনার হয়!’ হতাশ হয়ে তিনি চিৎকার করে বললেন, ‘এসো আবার খাবে, এখন তোমার আসল ডিনারের উপযুক্ত হওয়া উচিৎ।’ ‘না, ঠাকুরমা। সবকিছু খুব কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ করা হয়। চাইলেই আমরা সবকিছু করতে পারি না। সব বিষয়ে নিয়ম-কানুন আমাদের মেনে চলতে হয়। ওখানে আমরা ভাল খাবারই পেয়ে থাকি।’ ‘এর জন্য তোমাকে টাকা দিতে হয় না?’ ঠাকুরমা জিজ্ঞেস করলেন। ‘অবশ্যই না, ’ শ্রীরাম বললো। ‘তোমার কী মনে হয়, তুমি কি মনে করো মহাত্মাজী হোটেল খুলে বসে আছেন?’ ‘তাহলে তারা তোমাদের খাওয়ায় কেন?’ ‘কারণ আমরা সেখানে থাকি।’ ‘তারা কি প্রচুর গণ খাবার খাওয়ায়?’ শ্রীরামের মেজাজ এতে ঠিক থাকলো না। ঠাকুরমার এত গভীরে যাওয়ায় সে শঙ্কিত হলো। ‘আমি বললাম যারা ওখানে থাকে সবাইকে তারা খাওয়ায়, তুমি কি তা বোঝোনি?’ ‘কেন তারা তোমাদের খাওয়াবে?’ ‘কারণ আমরা হচ্ছি স্বেচ্ছাসেবক।’ ‘চমৎকার স্বেচ্ছাসেবক!’ যে কোনো মুহূর্তে গতকালের মেজাজ তার ফিরে আসতে পারে এই হুমকি দিয়ে চিৎকার করে তিনি বললেন। ‘আর তোমাদের কী খেতে দেয়?’ ‘চাপাতি, দই, ঘোল ও শাকসবজি।’ ‘আমার আনন্দ লাগছে। আমি ভয়ে ছিলাম যে তারা তোমাদের ডিম ও মুরগী খেতে বাধ্য করবে।’ শ্রীরাম আতঙ্কগ্রস্ত হলো। ‘মহাত্মাকে তুমি কী মনে করছো! জানো, জবাই করা পশুর চামড়া দিয়ে তৈরী স্যান্ডেলও তিনি পরেন না!’ ঠাকুরমাকে এক চিলতে হাসি ধরে বসলো। গাল বেয়ে অশ্র“ গড়িয়ে গেলো। ‘স্যান্ডেল পড়বে না!’ অনিয়ন্ত্রিত হাসির মধ্যে চিৎকার করে বললেন। ‘এমন কথা তো আগে কখনো শুনিনি! কীভাবে চলে তাদের? জবাই করার আগেই পশুর চামড়া ছিলে ফেলে, তাই না?’ ‘চুপ করো, ঠাকুরমা!’ মহারোষে শ্রীরাম চিৎকার করে বললো। ‘ কী দায়িত্বজ্ঞানহীন পরচর্চাকারী তুমি! তোমাকে কখনো এত খারাপ ভাবিনি!’ ঠাকুরমা এই প্রথম বারের মতো তার নাতির মধ্যে অগ্নিময় ব্যাগ্রতা খেয়াল করলেন এবং নিজেকে সামলে নিয়ে বললেন: ‘ওহ্ ! তিনি তোমার ভগবান, তাই না?’ ‘হ্যাঁ, তিনি ভগবান। আমি শুনতে চাই না তাঁর সম্পর্কে কেউ হালকাভাবে কথা বলুক।’ ‘আমার মতো অজ্ঞ ডাইনি বুড়ি আর কী জানতে পারে! আমি কি সংবাদপত্র পড়ি? বক্তৃতা শুনি? কে কী তা কি আমাকে বলা হয়েছে? ঐ গান্ধী মানুষটা সম্পর্কে কোনো কিছু আমি কী করে জানবো!’ ‘তিনি মানুষ নন; তিনি একজন মহাত্মা!’ শ্রীরাম চিৎকার করে বললো। ‘আচ্ছা, তুমি মহাত্মার সম্পর্কে কী জানো?’ ঠাকুরমা জিজ্ঞেস করলেন। শ্রীরাম অস্থির হয়ে রাগে চেয়ারে নিজেকে দোলাতে লাগলো। এ ধরণের পরিস্থিতির মোকাবেলা করার জন্য সে প্রস্তুত হয়ে আসেনি। তার অনুপস্থিতিতে বিষন্ন হয়ে থাকবেন, সে চলে যেতে চাইলে ঝামেলা করবেন এবং লঘুপণার থেকে বেশি দুঃখ ও রাগ প্রদর্শন করবেন এসব মোকাবেলা করার প্রস্তুতি নিয়েই শুধু এসেছিলো সে । কিন্তু এখানে সামান্যতম দায়িত্ববোধ বা সম্মান না দেখিয়ে তিনি পুরো হঠকারী ও ছ্যাবলার মতো আচরন করলেন। এ রকম পরিস্থিতির কথা সে আগে ভাবেনি, আর একে মোকাবেলা করার মতো তার কোনো কৌশলও ছিলো না। তার উপলব্ধি হলো ন্যায়নিষ্ঠ উষ্মা প্রদর্শন করে কোনো লাভ নেই: এতে বুড়ো ভদ্রমহিলার সুড়সুড়ি আরো বেড়ে যাবে। তার অনুমতি নিয়ে যাওয়ার সময় যখন হবে, তখন তিনি খুব বেশি অনিয়ন্ত্রিত হতে পারেন। প্রতিবেশীদের ডেকে এনে তাকে নিয়ে কৌতুক করতে পারেন। সে সিদ্ধান্ত নিলো তাকে অবশ্যই কৌশল বদলাতে হবে। হঠাৎ করে লাফিয়ে সে জিজ্ঞেস করলো: ‘ঠাকুরমা, তুমি খেয়েছো তো? এমন করে কথা বলে তোমাকে খাওয়া থেকে দূরে রাখছি!’ ‘তাতে কিছু এসে যায় না,’ প্রায় খিলখিল করে হাসার মুহূর্তে তিনি বললেন। ‘কত বছর হলো রাতে মুখ ভরে ভাত খাওয়ারÑÑÑ প্রায় বিশ বছর তো হবেই। তোমার জীবনে তুমি আমাকে রাতে খেতে দেখোনি।’ তার কণ্ঠে এত অহংকার ছিলো যে শ্রীরাম বলতে বাধ্য হলো: ‘এতে অসাধারণ কিছু নেই। না খেয়ে যে কেউ থাকতে পারে।’ সে আরো বলতে চাইলো, ‘মহাত্মা প্রায়ই একটানা এত দিন না খেয়ে থাকেন, ’ কিন্তু চেপে গেলো। বৃদ্ধ ভদ্রমহিলাকে অবশ্য কোনো কিছুর বলার প্রয়োজন হলো না। তিনি সঙ্গে সঙ্গে বললেন, ‘না! মহাত্মা গান্ধী না খেয়ে থাকলে সবাই তা নিয়ে কথা বলে।’ ‘আর তুমি শুধু রাতে না খেলে, কেউ তা খেয়াল করে না। এটাই শুধু তোমার ও গান্ধীজীর মধ্যে তফাৎ’ যে তীক্ষèভাবে সে কথা বললো তাতে তিনি অবাক হলেন। তিনি জিজ্ঞেস করলেন: ‘তুমি কি রাতে খেতে চাও?’ ‘হ্যাঁ, শুধু তোমাকে সন্তুষ্ট করার জন্য, ব্যস। আমার ক্ষুধা লাগেনি, তা তোমায় বলেছি। আর এই খাবারটা ভাল, ভাল ঘি দিয়ে বানানো। তুমি তাদেরকে এটা বলতে পারো। এর অনেকটা আমি খেয়েছি। আর আমি ক্ষুধার্ত নই।’ এই সব অপ্রত্যাশিত পরিবর্তনের পর ঠাকুরমা তার আসল মেজাজে ফিরে গেলেন। আগ্রহভরে বললেন: ‘তোমাকে অবশ্যই রাতে খেতে হবে, বাছা, ’ বিশিষ্ট পরিদর্শকের মতো তিনি যেন আবার ব্যস্ত হয়ে উঠলেন। রান্নাঘরের র্যাকের বোঝা থেকে একটা খাবার পাল্লা টেনে মেঝেতে বিছালেন, একটু জল ছিটালেন, ও ভাত রাখা ব্রোনজের পাত্রটি কাছে টেনে নিলেন এবং বসে পড়লেন যাতে করে তাকে খাবার পরিবেশন করতে পারেন ও সে আবার উঠে না যায়। ছোট প্রদীপের শিখা কাঁপছিলো। সে নীরবে খেয়ে সুপ্রাচীন কাঁসার পানপাত্র থেকে জল পান করলো; প্রাচীন ব্রোনজের পাত্রটির দিকে সে দৃষ্টি নিক্ষেপ করলো যার থেকে বছরের পর বছর ধরে তাকে খাবার পরিবেশন করা হয়েছিলো। এটা দেখে হঠাৎ সে বিষন্ন হলো। সে এই ভাবনা পীড়িত হলো যে এইসব পুরাতন সঙ্গ সে ত্যাগ করছে, আর এটা সত্যিই বিদায় উৎসব। সে এখান থেকে অজানা জীবনে যাচ্ছে। ভগবান জানেন তার কপালে কী আছে। এ সব ভেবে সে অনেকটা বিষন্ন হলো। সে জানতো তার পরিকল্পনা, অথবা মহাত্মা কিংবা ভারতীকে নিয়ে ঠাকুরমার সাথে কথা বলে কোনো লাভ ছিলো না । এসব পুরোপুরি তার বোধগম্যতার বাইরে। প্রতিবেশীকে কৃচ্ছ্বতাসাধন দিয়ে মুগ্ধ করার জন্য তিনি শুধু খাবার-দাবার, ডিনার ও রাতে উপবাস থাকা এসব বুঝতেন। তার সাথে কোনো কিছু নিয়ে কথা বলে কোনো লাভ নেই। সবচেয়ে ভাল কোনো গোলমাল না করে সকালে চলে যাওয়া। মহাত্মাজীর আদেশ মান্য করতে গিয়ে সে তার সাথে দেখা করে কথাও বলেছে। মহাত্মার সন্তুষ্ট থাকা উচিৎ এবং এটা প্রত্যাশা করা উচিৎ নয় যে সে বৃদ্ধ ভদ্রমহিলার দৃষ্টিভঙ্গিতে পরিবর্তন আনবে, যা তার আশীর্বাদ পাওয়ার জন্য যথেষ্ট। ঠাকুরমার অনেক বয়স হয়েছিলো, সম্ভবত আশি, নব্বই অথবা একশো। সে কখনো ঠিকভাবে তার বয়স নিরূপণ করতে চেষ্টা করেনি। আর তিনি নতুন বিষয় বুঝবেন না। গভীর রাতে নিজেকে আশ্বস্ত করলো যে ঠাকুরমা গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন হলে সে ঘুম থেকে উঠে প্রদীপটার পাশে একটা চিরকুট লিখে গোবরাটের উপর জল রাখা কাঁসার পাত্রটিতে রেখে যাবে। সকালে তিনি গোবরাটটিই প্রথমে তুলতে যাবেন। চশমা খুঁজে পেতে কষ্ট হলে তিনি চিরকুটটা প্রতিবেশীদের কাছে গিয়ে পড়িয়ে নেবেন। সম্ভবত তিনি প্রতিবেশীদের দ্বারা এটি পড়িয়ে নেবেন না। সবসময় তো চিৎকার করতেন: ‘শ্রীরাম, আমার চশমা, কোথায় রাখলাম এটা?’ যখনই পড়ার জন্য কোনো কিছু তার হাতে আসতো। আর কাবার্ডের দিকে গিয়ে চশমাটা এনে দেওয়া তার কর্তব্য ছিলো। এবার সে আগেভাগেই সে কর্তব্য পালন করলো। পা টিপে আলমারির দিকে গিয়ে চশমাটি নিঃশব্দে খাপমুক্ত করে হলে ফিরে গেলো। কিন্তু খাপটি খোলা রাখলো, কারণ বন্ধ করতে গেলে এটি জোরে শব্দ করতো। বিদায়ের চিঠিটার পাশে সে চশমাটা রেখে নিঃশব্দে দরজা খুলে রাতের অন্ধকারে পা বাড়ালো। ২ সে দলটির সর্বজনস্বীকৃত একজন সদস্য হয়ে গেলো, আর অনেক গ্রামে মানুষজন তাকে নিয়ে ত্রস্তব্যস্ত হওয়ায় ও সম্মান দেখানোয় সে আনন্দিত হলো। তারা তার দিকে বিস্ময়ের দৃষ্টিতে তাকালো। ভারতী ও গোর্পদের সাথে সে ত্রয়ী গঠন করলো। মহাত্মার সম্পর্কে গ্রামবাসীরা কোনো কিছু জানতে চাইলে, তারা এসে তাদের কাছে শ্রদ্ধার সাথে কথা বললো। আর এতে গোর্পদ ও ভারতীর সংস্পর্শে অর্জিত জ্ঞান কাজে লাগানোর সুযোগ সে লাভ করলো। এতে লিপ্ত থেকে এ কাজকে জানার একটা উপায় হলো। তখন পর্যন্ত গ্রামীণ জীবন সম্পর্কে তার কোনো ধারণা ছিলো না। মালগুদি শহরে ছিলো তার জন্ম ও বেড়ে ওঠা। আর এমনকি সেখানে মহাবিশ্বের সীমানা সম্পর্কে তার ধারণা ছিলো কবির সরণী, বাজার রোড, অন্য দু’একটা জায়গায় আবদ্ধ। “গ্রাম” শব্দটি শুনলেই তার মানসপটে ডাবের বাগান, সুদীর্ঘ ও বহু পদক্ষেপে বিশাল ট্যাংকের দিকে হাঁটা, কলসী কাঁখে মার্জিত পল্লী নারী এবং ট্যাংক বান্ডের ওপারে মন্দিরের মোচাকার চূড়া, প্রশস্থ বারান্দাসহ নিচু ছাদের বাড়ি এবং গলায় ঝোলানো টুং টাং আওয়াজ করা ঘন্টাধ্বনিসহ ষাঁড়, গাড়িয়ালের সব সময় গান গাওয়ার ছবি ভেসে উঠতো। এ ধারণাটি সে লাভ করেছিলো রিশাল হলে অনেকগুলো তামিল ছবি দেখার ফলে। কিন্তু এখানে সে রকম কিছু সে দেখলো না। বাস্তবতা ছিলো ভিন্ন। কিছু কিছু গ্রামে কয়েকটা কুটিরের বেশি ছিলো না। এই প্রথম বারের মতো সে আসল গ্রাম দেখলো, আর গ্রামে প্রথম দিনে মালগুদি থেকে দশ মাইল দূরে সে এত হতচকিত বোধ করলো যে সে গোপনে ভারতীকে জিজ্ঞেস করলো: ‘গ্রামটা কোথায়?’ ‘কোন গ্রাম?’ ‘কেন, যে কোনো গ্রাম, ’ সে বললো। ‘এটা কি তোমার কাছে গ্রামের মতো লাগছে না?’ ভারতী জিজ্ঞেস করলো। ‘না, ’ সে উত্তর দিলো। মহাত্মা সন্ধ্যায় বিছানায় গেলে তারা আলাপ করার সময় পেলো। ‘কী করুণ ব্যাপার, ’ ভারতী বললো, ‘যে এটা এমন। কিন্তু শেখো, যুবক, এটাই আসল গ্রাম। মিথ্যে বলছি না। আমাদের দেশে কমবেশি এরকম সাতশ হাজার গ্রাম আছে।’ ‘তুমি কী করে জানো?’ আলাপ দীর্ঘ করার জন্য শ্রীরাম জিজ্ঞেস করলো। ‘জ্ঞানী লোকদের কাছ থেকে শিখি, ’ সে বললো। ‘কত জ্ঞানী?’ শ্রীরাম জিজ্ঞেস করলো। তার ছ্যাবলামি উপেক্ষা করে ভারতী তাদের মিশন নিয়ে কথা বলতে শুরু করলো। যে গ্রামগুলো সম্প্রতি দুর্ভিক্ষ পীড়িত হয়েছে সে গ্রামগুলোতে জরিপ চালাতে তারা বের হয়েছিলো। এটা দয়াজাত মিশন ছিলো; দুর্ভিক্ষ নিয়ে প্রত্যক্ষভাবে গবেষণা করার জন্য এবং পীড়িতদের মধ্যে মনোবল ও আশা সঞ্চারের জন্য উদ্যোগ ছিলো এটি। এ যাত্রায় মহাত্মা এত বেশি গুরুত্ব দিয়েছিলেন যে তিনি অন্য সব কাজ বাতিল করেছিলেন। ইউরোপে যুদ্ধ হওয়ায় এবং সম্ভবত দূরপ্রাচ্যে তা শুরু হওয়ার উপক্রম হওয়ায়, তার প্রভাব এখানে পড়েছিলো। বোমা না মারা হলেও তারা এখনো যুদ্ধের কারণে ভুগছিলো; কেউ এ. আর. পি. অথবা কোনো যুদ্ধের পোস্টার দেখেনি, কিন্তু পথের পাশের ছোট ছোট স্টেশনগুলো পশ্চিম ইউরোপে ব্যাপক যুদ্ধ ভাণ্ডারের গুরুত্বপূর্ণ সংযোগ, রসদ যোগানো চ্যানেল হিসেবে কাজ করছিলো। স্টেশনের সংযুক্ত ছোট লাইনের মালবাহী ট্রেনগুলো দিনরাত মেমপি বনের কাঠ, এখানে উৎপাদিত ভূট্টা এবং নিজের জমিতে কাজ করে এমন সক্ষম দেহের লোকজনকে বহন করে নিয়ে যাচ্ছিলো। পরিপার্শ্ব যতই ভয়ানক হোক না কেন, শ্রীরাম ও ভারতী কিছুই খেয়াল করলো না বলে মনে হলো। পরস্পরের সঙ্গলাভে তাদের আনন্দ হলো যা পরিপার্শ্বের বিষন্ন ভাবের উপশম ঘটালো। শুদু গোর্পদকে করুণবোধে পীড়িত দেখালো। সে কম কথা বললো, আগে আগে শুতে গেলো এবং উত্তোরোত্তর মর্ম যাতনা বোধ করলো। সে বললো: ‘দেখো ইংরেজরা আমাদের দেশের কী অবস্থা করেছে: এই দুর্ভিক্ষ হচ্ছে আমাদেরকে দাস করে রাখার জন্য তাদের কারসাজি। তাদের যুদ্ধ যন্ত্র চলমান রাখার জন্য তারা বন ও মাঠ লুণ্ঠন করছে, আর এর প্রকৃত ভৃক্তভোগী হচ্ছে এই শিশুটি।’ যেকোনো পল্লী শিশু যার এ পথে আসার সম্ভাবনা আছে, যার পাঁজর দেখা যাচ্ছে, যে উলঙ্গ ও পেট ফোলা তাকে নির্দেশ করে সে বললো। ‘এসব গ্রামে কোনো খাবার নেই, ’ গভীর আবেগে চিৎকার করে বললো। ‘তাদের দেখার কেউ নেই; তাদের নিয়ে কে মাথা ঘামায়? কে এই কষ্টে তাদেরকে সাহায্য করবে? সবাই এ যুদ্ধে জড়িত। এই চাষিদের নাগালের বাইরে মুনাফাভোগীরা সব শস্য জমা করে রেখেছে। যুদ্ধ যন্ত্র তা যে কোনো মূল্যে কিনছে। এ গরীব লোকগুলোর তুলনায় প্রতিযোগী খুবই বড়।’ ‘সে আমাকে এসব বলছে কেন?’ শ্রীরাম চিন্তা করলো যখন ভারতীর সাথে একা থাকার অপেক্ষায় অধৈর্য্য হয়ে উঠছিলো। ‘এর জন্য আমি দায়ী নই।’ গোর্পদ ছিলো লৌহ মানব এবং তাদেরকে একা ছেড়ে দিতে তার উপর আস্থা রাখা যেতে পারতো। কারণ করার মতো তার অন্যকিছু ছিলো। আর সে পিঠ ফেরালে তাদের চোখাচুখি হলো, আর এইমাত্র শোনা বা দেখা সব করুণ বা খারাপ বিষয় মনে করে খিলখিল করে তারা হেসে উঠলো। গ্রাম সম্পর্কে শ্রীরামের যে ধারণা ছিলো তা কোথাও দেখতে পাওয়া গেলো না। ক্ষুধার্ত, ঝলসানো নারী-পুরুষ যাদের হাড়-হড্ডি স্পষ্ট দৃশ্যমান, খালি মাটি, শুকনো পুকুর, কাদা মাটির ভাঙ্গা দেয়ালের উপর শোচনীয়, জীর্ণ খড়ের ছাদ, গর্ত ও আলগা বালুতে ভরা রাস্তা, অনাকর্ষণীয় শুকনো মাঠÑÑ এই ছিলো গ্রাম। শ্রীরাম প্রায় বিশ্বাসই করতে পারলো না সে মালগুদি ও সভ্যতার বিশ মাইলের মধ্যে ছিলো। এখানে শুকর ও কুকুরগুলি শুকনো পয়োনালীর উপর শুয়ে আরাম করছিলো। এ অঞ্চলের সবকিছুতে শুকনো পয়োনালীর চেহারা পরিলক্ষিত হলো। শ্রীরাম ভাবলো মানুষ কীভাবে এমন জায়গায় বেঁচে থাকতে পারে। সে থেমে সবাইকে জিজ্ঞেস করতে চাইলো: ‘কতদিন ধরে আপনারা এখানে আছেন? মালগুদি বা অন্য কোনোখানে যাবেন না আপনারা? এখানেই কি চিরদিন থাকতে হবে?’ মহাত্মা তাঁর যাত্রাসূচী দিতে অস্বীকৃতি জানিয়ে এবং অপ্রত্যাশিত জায়গাগুলো পরিদর্শন করে সরকারি কর্মকর্তাদের হিসাব-নিকাশ নিস্ফল করে দিলেন। তিনি কোথায় যেতে চাচ্ছেন তা তাদেরকে জানানোর জন্য সরকারি কর্মকর্তারা ভদ্রভাবে জিজ্ঞেস করলেন। তিনি এইটুকুই বললেন: ‘যদি পারি, সব জায়গায়’ অথবা ‘আমি যদি জানতাম!’ ‘কিন্তু আমরা তো ঠিকঠাক ব্যবস্থা করতে চাই।’ ‘আমার জন্য? নিজেরা কষ্ট করবেন না। যে কোনো কুটিরে আমি ঘুমাতে পারি। অন্যরা যেখানে থাকছে সেখানে আমি থাকতে পারি। আমার মনে হয় না আমার অনেক বিলাসিতার দরকার আছে। ভাববেন না। আমরা নিজেরাই নিজেদের দেখতে পারবো। আমি এখানে মেহমান নই, মেজবান। মেহমান হিসেবে আমাদের সাথে যোগ দিচ্ছেন না কেন?’ ডিস্ট্রিক্ট কালেকটরকে তিনি বললেন। ‘ আপনার যে যে আরাম চাই তা দিয়ে আপনাকে দেখাশুনা করার অঙ্গীকার আমরা করবো ।’ তাঁর যাত্রায় কর্মকর্তাদের পুরো একটি দল তাকে অনুসরণ করে চললো। মহাত্মা গান্ধী প্রধানত পায়ে করে গ্রামগুলো ঘুরতে দেখলেন। যেখানে চাইলেন থামলেন। গ্রামের সবচেয়ে ছোট কুটিরটি সহজলভ্য হলে তিনি সেখানে সাময়িক থাকবেন অথবা মন্দিরের করিডোরে কিংবা খোলা জায়গায় থাকবেন। ঘন্টার পর ঘন্টা তাঁর লাঠিটায় ভর করে এবং এক হাত আরেকজন শিষ্যের কাঁধে রেখে তিনি নীরবে হাঁটলেন। গাছ কাটায় রত কিংবা জমি খোঁড়ায় লিপ্ত কৃষকের সাথে কথা বলতে তিনি মাঝে মাঝে থামলেন। নির্ধারিত সময়ে কোন গ্রাম দিয়ে তারা যাচ্ছে সেটা জানা শ্রীরামের কাছে অপ্রয়োজনীয় মনে হলো। সবই একই রকম, একই কর্মসূচী। গান্ধীজীর ব্যক্তিগত জীবন যেন এক জায়গায় স্থিরভাবে কেটে গেলো; অন্যরা এতে খাপ খাইয়ে নিয়েছে। তিনি গ্রামের স্থানীয় নারী-পুরুষের সাথে দেখা করে তাদের সাথে ভগবান সম্পর্কে কথা বললেন, অসুস্থদের সান্ত্বনা দিলেন ও যারা তাঁর দিক নির্দেশনা চাইলো তাদেরকে উপদেশ দিলেন। তাদের সাথে সুতা কাটা, যুদ্ধ, ব্রিটেন ও ধর্ম নিয়ে কথা বললেন। তাদের কুটিরে সাক্ষাৎ করলেন ও গ্রামের বট গাছের নিচে(এখনো কোনো গ্রাম এত খালি হয়নি যে সেখানে বটগাছ ছিলো না) তাদের সাথে কথা বললেন। লাঙ্গল চষা জমির মধ্য দিয়ে পা টেনে টেনে হাঁটলেন, নরম কাদার মধ্য দিয়ে শক্ত শিলাময় জায়গাগুলোতে চড়লেন, কিন্তু সবসময় খোশ মেজাজে এসব করলেন। আর কোনো জায়গাই তাঁর দৃষ্টি এড়ানোর মতো এত ছোট মনে হলো না। ** গান্ধীজীর যাত্রা শেষ হয়ে আসছিলো। মেমপি পাহাড়ের পাদদেশে কোপাল নামক ছোট্ট স্টেশনে তাঁর ট্রেনে উঠার কথা ছিলো। মহাত্মা চাইতেন তাঁর আগমন ও গমন গোপন থাক। আর কয়েকজন কর্মকর্তা যাদেরকে তাকে বিদায় জানানোর জন্য প্রতিনিধি হিসেবে পাঠিানো হয়েছিলো, তারা ছাড়া প্লাটফর্মে কোনো বহিরাগত ছিলো না। স্টেশনমাস্টার যিনি কাইজারের মতো গোঁফবিশিষ্ট ছোট-খাটো একজন মানুষ ও যার পরনে ছিলো ফিতাসহ সবুজ পাগড়ি এবং ধুতি, তিনি তার কুলির সাহায্যে পুরাতন বড় একটা চেয়ার টেনে প্ল্যাটফর্মে আনলেন। তিনি তার ছেলেমেয়েদেরকে পরিপাটি করে এক সারিতে ছয়জন করে রেখে শান্তভাবে প্রস্ফুটিত গোল্ড মোহুর গাছের ছায়ায় এক পাশে দাঁড় করিয়ে রাখলেন। এর মাঝে বিভিন্ন টেলিফোন বার্তা শুনে তাকে মহাত্মাজীর মেজবান হিসেবে কাজ করতে হলো। প্ল্যাটফর্মের চেয়ারে মহাত্মাজীকে বসার জন্য তিনি অনুরোধ করলেন। ‘অন্য যে কারো মতোই আমি দাঁড়িয়ে থাকতে পারি, ’ আশপাশে তাঁর অনুসারীদের দিকে তাকিয়ে মহাত্মা বললেন । অন্যদের মুখে বিষন্নতা লক্ষ করে শ্রীরাম তাকে অনুরোধ করলো, ‘বাপুজী দয়া করে বসেন।’ আর মহাত্মা বসে পড়লেন, তাঁর অনুসারীরা আশপাশে দাঁড়িয়ে থাকলো। ছোট্ট স্টেশনমাস্টার উত্তেজিত ও আন্দোলিত হলেন এবং তার চোখের পাতা দিয়ে ফোঁটায় ফোঁটায় ঘাম গড়িয়ে গেলো। রেললাইনের ওপারে রক্তিম আকাশের বিপরীতে পাহাড়ের একটি সারি দাঁড়িয়ে ছিলো। স্টেশনমাস্টার হাঁপাতে থাকলেন, আর তার ছেলেমেয়েদের কনুই দিয়ে ঠেলে ঠিকঠাক মতো আচরন করতে বললেন যদিও তারা সব সময় শক্ত হয়ে যেন কুচাওয়াজ মাঠে দাঁড়িয়ে ছিলো। মহাত্মাজী বললেন: ‘স্টেশন মাস্টারজী, আপনি কেন ওদেরকে ইচ্ছেমতো ছোটাছুটি করতে ও খেলতে দিচ্ছেন না। ওদেরকে বাধা দিচ্ছেন কেন?’ ‘আমি ওদেরকে বাধা দিচ্ছি না, স্যার। এটা ওদের অভ্যাস, ’ ছেলেমেয়েদের প্রশিক্ষণে পরিদর্শনকারীকে মুগ্ধ করার আশায় তিনি বললেন। মহাত্মা বললেন: ‘বন্ধু, আপনি বুঝি আমার সামনে ওদেরকে দিয়ে ভাল ব্যবহার করিয়ে নিচ্ছেন। তারা যদি স্বাভাবিকভাবে ছুটে বেড়াতো ও খেলতো এবং মাটিতে পড়ে থাকা ফুলগুলো তুলতো যা তারা চায়, তবে আমি সেটা আরো ভাল পছন্দ করতাম। ছেলেমেয়েরা মুক্ত ও খুশি থাকুক তাতে আমি বেশি আগ্রহী।’ রীতি মেনে মহাত্মাকে পথে উপহার দেওয়া মালা ও ফলমূলগুলো তুলে নিয়ে তিনি ছেলেমেয়েদেরকে ডেকে বিতরণ করলেন। ওদের বাবা বিচলিত হলেন, তার স্নায়ুগুলো খাড়া হলো পাছে কেউ হঠাৎ করে খারাপ ব্যবহার করে। রেললাইনের ওপারে আকাশ লাল হচ্ছিলো। তার ছোট্ট অফিসে ঘন্টাধ্বনি বাজলো। তিনি ছুটে গিয়ে মুখখানাকে মেঘাচ্ছন্ন করে আরো শিশির বিন্দুসহ বললেন: ‘সেভেন ডাউন পেরিয়াপুর ছেড়েছে। পনের মিনিটের মধ্যে এখানে পৌঁছাবে। আঠারোটা বিয়াল্লিশ বাজার সাথে সাথে।’ ট্রেনটি যদি তার কথা না রাখে সে জন্য তাকে উদ্বিগ্ন দেখালো। মহাত্মা বললেন: ‘ক্যাবিনে আপনি আপনার কাজে যেতে পারেন, আমাদের নিয়ে ভাববেন না।’ ‘আমি কি যেতে পারি? ’ তিনি বেপরোয়াভাবে জিজ্ঞেস করলেন। ‘আমাকে ভাড়াগুলো লিখতে হবে, স্যার, আর ট্রেন ধরার জন্য লাইনটা প্রস্তুত করতে হবে।’ ‘অবশ্যই, চালিয়ে যান, ’ মহাত্মা বললেন। এতগুলো সপ্তাহের মধ্যে এই প্রথম শ্রীরাম বিষন্ন ও অসুখী বোধ করলো। মহাত্মাজী ব্যতীত সাদামাটা বেঁচে থাকতে হবে সে ভাবনা তাকে শঙ্কিত করে তুললো। ভারতীর কাছে থাকলেও এ দুর্দশার উপশম হবে না মনে হলো। ট্রেন আসার শব্দ শোনা গেলে তাকে এতো বিস্মিত দেখালো যে মহাত্মাজী বললেন: ‘সুখে থাকো। ভারতী তোমাকে দেখে রাখবে।’ শ্রীরাম ভারতীর দিকে আশার দৃষ্টিতে তাকালো। মহাত্মাজী আরো বললেন: ‘মনে রেখো সে তোমার গুরু, আর তার সম্পর্কে শ্রদ্দা ও সম্মানের সাথে চিন্তা করবে। তাহলে তোমার সব ঠিক থাকবে এবং তারও সব ঠিক থাকবে।’ এ বাক্যটি হজম করতে শ্রীরামের সময় লাগলো। ট্রেনে বাস্প ভরানো হলো। মহাত্মাজী তৃতীয় শ্রেণীর একটি কামরায় প্রবেশ করলেন। গোর্পদ যে ঠাণ্ডা মাথার নির্বিকার একজন মানুষ যাকে কোনো বিদায় নাড়া দিতো না, সে শ্রীরামকে বললো: ‘এখন তুমি তো জানো তোমার কী কর্তব্য, আর কীভাবে তা করতে হবে। আপু, তুমি আমাদের নির্দেশনা পাবে। নমস্কার।’ এই বলে গান্ধীজীর কামরায় উঠে গেলো। তার দল তাকে অনুসরণ করে ভেতরে ঢুকলো। প্রথম ঘন্টা বাজলো, তারপর দ্বিতীয়টা। স্টেশনমাস্টার বেরিয়ে এসে বললেন: ‘সেভেন ডাউন সাধারণত এখানে দুই মিনিট থামে, কিন্তু আজকে আমরা এটি সাড়ে তিন মিনিট থামিয়ে রাখবো, স্যার।’ মহাত্মাজীর জানালার সামনে জড়ো হওয়া অন্য গাড়ি থেকে ভীড় করা যাত্রীদের দিকে হতাশভাবে তাকালেন। ইঞ্জিন চালু হলো। ইঞ্জিন চালক এক পাশ থেকে এবং গার্ড আরেক পাশ থেকে মহাত্মাকে দেখতে তাদের স্টেশন ত্যাগ করলেন । মহাত্মা তাদের অভিবাদন ফিরে দিয়ে জিজ্ঞেস করলেন: ‘ট্রেন কেমন করে চলবে, স্যার, এর হৃদয় ও আত্মা এখানে থাকলে?’ ইঞ্জিন চালক তার মুখে চাপা হাসি নিয়ে ফিরে গেলেন। মহাত্মা অন্য লোকদের বললেন, ‘এখন আপনাদের সবাইকে নিজ নিজ আসনে ফিরে যেতে হবে।’ জনতা ছত্রভঙ্গ হয়ে চলে গেলো এবং স্টেশনমাস্টার তার পতাকা উড়ালেন। গান্ধীজী শ্রীরামকে বললেন: ‘আমাকে প্রায়ই চিঠি লিখবে। আমিও তোমাকে মোটামুটি নিয়মিত চিঠি দেবো কথা দিচ্ছি। ভবিষ্যতে তুমি জানবে কোথায় তোমার কাজ আছে। সুতা কাটায় ওস্তাদ হও। নিরাশ হয়ো না।’ ‘জ্বী, গুরু, ’ শ্রীরাম বললো; বিদায়টা তাকে খুব নাড়া দিলো। ভারতী পরিস্কার কণ্ঠে শুধু বললো: ‘নমস্কার, বাপু।’ বাপু হাসলেন এবং হাত বের করে তার কাঁধ বুলিয়ে দিলেন। ‘তুমি অবশ্যই তোমার কর্মসূচী চালিয়ে যাবে এবং প্রায়ই আমার কাছে লিখবে।’ ‘জ্বী, অবশ্যই, বাপু।’ ‘যে কোনো ত্যাগের জন্য প্রস্তুত থেকো।’ ‘জ্বী, বাপু, ’ সাগ্রহে সে বললো। ‘কোনো কিছুতেই দুশ্চিন্তা করবে না।’ ‘জ্বী, বাপু।’ আকাশ লাল থেকে আরো লাল এবং অন্ধকার থেকে আরো অন্ধকার হলো, আর সেভেন ডাউন মহাত্মাকে ট্রিচি এবং তারপর মাদ্রাজ, বম্বে, দিল্লী এবং বাইরে বিশ্বজগতে নিয়ে চলতে লাগলো । ছোট স্টেশনটিতে রাত্রি ঘনিয়ে এলো, আর ছোট্ট স্টেশনমাস্টার গ্যাস বাতি ও সিগন্যাল জ্বালাতে অগ্রসর হলেন। ** মহাত্মার শারিরীক উপস্থিতি তার সাথে না থাকলেও শ্রীরামের এই অনুভূতি ছিলো যে তাঁর আন্দোলন চালিত হচ্ছে। এখন তার বাসা ছিলো উপত্যকার নিচে মেমপি পাহাড়ের ঢালের উপর পরিত্যক্ত মাজার। এর নিচে রাস্তা এঁকেবেঁকে গিয়ে মহাসড়কে লেগেছে যা কোপাল স্টেশন থেকে এক মাইল দূরে গিয়ে শেষ হয়েছে। সে প্রায়ই ডাক-হরকরাটিকে দেখতো যিনি তার কাঁধের ব্যাগ ও এক হাতের লাঠি দিয়ে (লাঠিটার শেষে ছোট্ট ছোট্ট ঘন্টা বাঁধা ছিলো যা তার আগমনকে এক মাইল দূর থেকেও ঘোষণা দিতো) পা টেনে টেনে হেঁটে বাঁক নির্মাণ করতেন । শ্রীরাম কোনো চিঠি আশা করতো না, কিন্তু শিলাপ্রস্তরে পা রাখা ও মেমপি পাহাড়ের উচ্চতর বাঁকে বিভিন্ন এসটেট ও গ্রামে চলে যাওয়া মূল সড়ক থেকে বিচ্যূত সংক্ষিপ্ত পথ নেওয়া পর্যন্ত সে ডাক-হরকরাকে দেখতে ভালবাসতো। মনে হলো এই জায়গাটা তার ভাগ্যে নির্ধরিত ছিলো, হাজার হাজার বছর আগে কেউ নির্মাণ করেছিলেন যিনি তখনই ভেবে থাকবেন যে শ্রীরাম পরিত্যক্ত ভবন ব্যবহার করবে। জায়গাটি ছিলো ধ্বংসাবশেষ, দেয়াল বরাবর কয়েকটা ভাস্কর্য ছিলো, রাজমিস্ত্রীর কাজ করা অংশগুলো এখানে সেখানে ধ্বংস হয়ে পড়ে আছে। আগাছায় ভরপুর অভ্যন্তরীণ এক পবিত্র স্থানে চার হাতবিশিষ্ট কোনো এক দেবতার প্রতিমূর্তি ছিলো। কিন্তু মানুষের অধিকার করার মতো সবচেয়ে আরামদায়ক ধ্বংসাবশেষ ছিলো । কেন্দ্রীয় হলে ইট দিয়ে নির্মিত রাজকীয় স্তম্ভ ছিলো; দেয়াল ছিলো ছাদবিহীন, যেখান থেকে অচেনা লতা বেয়ে নিচে গিয়েছে; একরোখা, নির্বিঘœ ভাস্কর্যের একটি ছিলো বিরাট তোরণের উপর ষাঁড় ও ময়ুরের ভাস্কর্য। এই তোরণে বিশাল বড় নব্যুক্ত কাঠের দরজা ছিলো যা সেগুলোর প্রকাণ্ড কব্জার উপর মোটেও নড়ানো যেতো না। এটা শ্রীরামের জন্য কম বড় অসুবিধা ছিলো না যেহেতু কেউ এ পথে আসতো না; যদি বা আসতো, তার তালা দিয়ে রাখার মতো কিছু ছিলো না। সে দৃষ্টির বাইরে থাকতে চাইলে ভূগর্ভস্থ কক্ষে আগাছার আবরণে চলে যেতো। ঐ দূরে ট্রেন আসা-যাওয়ার শব্দ শুনতে পারতো। গ্রাম থেকে উপরের এসটেটে গ্রামবাসীদের দলে দলে যাতায়াতকালে তাদের স্বর শুনতে পারতো। তার সম্পত্তি হিসেবে ছিলো শুধু একটা চরকা, একটা কম্বল যার উপর ঘুমাতো আর একজোড়া পাত্র, কিছু খাবার সামগ্রী ও একটা দিয়াশলাইের বাক্্র। রাতে কাজ করতে চাইলেই ছোট হারিকেনটির ফিতা সে জ্বালিয়ে নিতো। পাখির ডাকে জেগে উঠলে প্রতিদিনকার কর্তব্যসাধন নির্ধারণ করতো। ‘ওহ্ , ভগবান, কবির সরণীই অনেক ভাল, ’ সে ভাবতো। ‘পাখিগুলো এখানে এত বেশি কিচিরমিচির করে যে এগুলো কাউকে শান্তিতে ঘুমোতে দেবে না।’ এ সত্ত্বেও সে বিছানা থেকে উঠলো। কৃচ্ছত্বা সাধন ও বেশ কঠিন একটা কাজ করার প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে সে যাচেছ, কারণ নিজের চিন্তা-ভাবনা নিয়ন্ত্রণ করতে গিয়ে সে দেখলো যে সেগুলো আগের মতোই অনাকাঙ্খিত। সে ভেবেছিলো যে গোর্পদের সাথে কৃচ্ছ্বতার চর্চা করে সে হঠাৎই আলাদা হতে পারতো। মহাত্মাজী তার আত্ম-উন্নয়ন ধারণাটিকে আশীর্বাদপুষ্ট করেছে। তিনি বলেছিলেন: ‘সুতা কাটো, ভগবদ গীতা পড়ো আর সর্বদা রাম নাম জপো, তাহলে জীবনে কী করতে হবে তা তুমি জানবে।’ বদল করার জন্য একটি কাপড় নিয়ে শ্রীরাম পাহাড়ের নিচে ছোট নদীটিতে গিয়ে গোসল করলো। শীতল জলে স্নান শেষে সে এত উজ্জীবিত বোধ করলো যে সেই ধূ ধূ নির্জনে সে পুরো একাকী জোরে জোরে গান গাইলো। বারবার গাইতে লাগলো: ‘রঘুপতি রাঘব রাজা রাম, পতিত পবন সীতা রাম, ’ÑÑÑমহাত্মাজীর প্রার্থনা সঙ্গীত। গানটি গাওয়ার সময় সে তাঁর নৈকট্য লাভের ও তাঁর নির্দেশে কিছু একটা করার বোধ অনুভব করলো। তাকে এমন পবিত্রতা বোধ ধরে বসলো যে সে প্রায় নেচে উঠলো যখন নির্জনবাসে ফিরে গেলো। নদীতে ধৌত করা দুইটা কাপড় সে বয়ে নিয়ে গিয়ে মাজারটির চারপাশে সবুজ বেড়ার উপর শুকাতে দিলো। নিজের হাতে বানানো কাপড় পরে তার গর্ব হলো। ভারতী তাকে শিখিয়েছিলো তুলার সুতা কীভাবে ঢোকাতে হয়, কীভাবে চাকা ঘুরাতে হয়, আর কীভাবে সুতা কাটতে হয়। গান্ধীজী তাকে কোনো এক গ্রামে একটা চরকা দিয়ে ব্যাখা করে বলেছিলেন: ‘এটা হচ্ছে তোমার ভবিষ্যতের চাবি।’ শ্রীরাম এত শ্রদ্দাবোধ করেছিলো যে এর মানে কী তা জিজ্ঞেস করতে পারেনি। কিন্তু চাকাটি পরম শ্রদ্ধার সাথে গ্রহণ করে আক্ষরিকভাবে তার বুকের কাছে রেখেছিলো, যদিও এটি ভারী দুর্বহ যন্ত্র ছিলো। ভারতী তাকে শেখাতে চেষ্টা করেছিলো কীভাবে কোনো একটা গ্রামে অবস্থানকালে এটা ব্যবহার করতে হবে। হাত দিয়ে ঘুরানোর চেষ্টা করার সময় সে অসংখ্য ভুল করেছিলো। না ছিড়ে সে কখনোই একবারে কয়েক ইঞ্চি সুতা তৈরি করতে পারেনিÑÑ সুতার থেকে বরং একে তুলার পাকানো পশমি সুতার টুকরার মতোই অনেকটা দেখাচ্ছিলো। তার হস্তকর্ম দেখে ভারতী হাসি চেপে রাখতে পারেনি। সে মন্তব্য করেছিলো: ‘এক গজ সুতা তৈরি করতে তুমি ভারত ও মিশরের সব সুতা নষ্ট করবে।’ এরপর সে শ্রীরামের আঙ্গুলগুলো নিচে ধরে সঠিক চাপে সুতা কাটার অবস্থানে নিয়ে এসেছিলো। কিন্তু হাত সরিয়ে নিলে শ্রীরাম তার আঙ্গুলগুলোও ছেড়ে দিতো, আর তুলা পড়ে গিয়ে কোনো উদ্দেশ্যে সিদ্ধ করতো না। পুরাটা যাত্রায় সে এতে লিপ্ত ছিলো, দিনে থামার সময় তার পাঠ শুরু হতো। মহাত্মাজী প্রতিদিন খোঁজ-খবর নিতেন: ‘আচ্ছা, কতদূর?’ আর শ্রীরাম উত্তর দেওয়ার আগে ভারতী সাধারণত মাঝখানে বলতো: ‘আরো দুই ইঞ্চি বাপুজী; আজকে সব মিলিয়ে সে ছয় ইঞ্চি তৈরি করেছে, কিন্তু বিশেষভাবেই গণনা করতে হবে। সে হিসেবে এটি পাঁচ কাউন্ট সুতা হবে, সম্ভবত বাতির সলতের মতো একই পরিমাণ হবে!’ মহাত্মা বলতেন: ‘ঠিক আছে, এমন একটা সময় আসবে যখন সে শত কাউন্ট তোমায় দিতে পারবে, এত অহংকার করো না, সোনা।’ ‘আমি করছি না, ’ ভারতী বলেছিলো। ‘আমি শুধু সত্য ঘটনাটি উল্লেখ করলাম।’ ‘কতই না অহংকার তার! তুমি কি জানো কয়েক বছর আগে খাদি প্রতিযোগিতায় সে পুরস্কার পেয়েছিলো? তার সুতা প্রদর্শনীতে রাখা আছে।’ ‘সবকিছুতে সে আমার চেয়ে এক ডিগ্রী উপরে থাকে, ’ শ্রীরাম ভাবলো। ‘এর কারণ হচ্ছে সে অতিরিক্ত সমর্থন পায়। নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। এটাই তার সমস্যা। সে ভাবে তার নিজের কোনো শেষ নেই।’ ‘আমি নিশ্চিত ভারতী তোমাকে শেখাবে কীভাবে তাকে ছাড়িয়ে যেতে হবে, ’ মহাত্মা বলতেন এবং ভারতী সে অঙ্গীকার অনুযায়ী জীবন-যাপন করেছিলো। দিন রাত কোনো সময়েই সে শ্রীরামকে বিশ্রাম দিতো না। ভ্রমণ থেকে সামান্যতম ফুরসত পেলেই সে এসে বলতো, ‘এখন মহান ছাত্রের কর্মসূচী কী?’ আর শ্রীরাম চাকাটা টেনে বের করে তুলার ছোট ছোট প্যাকেট নিতো এবং ভয়ে ভয়ে কাজ শুরু করতো। ভুল করার মধ্য দিয়ে মেয়েটির মজা পাওয়াকে সে ভয় করতো। তার হালকামি ও প্রায়ই শ্রীরামকে বোকার মতো মনে করানোর জন্য সে তাকে ঘৃণা করতো। কিন্তু মরিয়া হয়ে চেষ্টা চালিয়ে যেতো। তার হাত ফসকে গেলে ভারতী হাসতো, সে অসৎ চিন্তার কবলে পড়তো যখন ভারতী তার উপর নুয়ে পড়তো , তার হাত ধরতো এবং তাকে কৌশল শিখিয়ে দিতো। চরকার আধেক ফিসফিসানি গতিতে যখন মন অবশ হয়ে যেতো তখনই শ্রীরাম পূর্ণ মনোযোগ দিতো । কম্পমান বর্ধনশীল সুতা ধরে থাকতে থাকতে তার আঙ্গুলগুলো ব্যথা করতো ও চোখ জ্বালা করতো। মহাত্মাজী চলে যাওয়ার প্রায় বারো সপ্তাহ পর অবশেষে সে বিজয়ী বেশে আবির্ভূত হলো। মালগুদি থেকে প্রায় পঞ্চাশ মাইল দূরে চরকা কাটার একটি কেন্দ্রে শিক্ষানবিশির জন্য সে থেকেছিলো। ভারতী সেখানে একদম বাসার মতো ছিলো এবং নিজেকে উঁচু মানের কাজের ওস্তাদ হিসেবে প্রমাণ করেছিলো; শ্রীরামকে হাতে-কলমে শেখানো সে ছাড়েনি যতক্ষণ পর্যন্ত না শ্রীরাম একটা ধুতি ও একটা হাফ শার্টের জন্য জট ছাড়া যথেষ্ট সুতা বানাতে পেরেছিলো। এটা ছিলো সপ্তাহের পর সপ্তাহের কাজের ফসল। আর এটাই হওয়ার কথা ছিলো। শ্রীরামের কর্ম সফলতায় ভারতী খুবই উত্তেজিত হয়েছিলো। সে পত্রিকার নিচের সাদা অংশ ছিঁড়ে সেখানে ছোট ছোট অক্ষরে লিখেছিলো: ‘অর্থাৎ শ্রী শ্রীরামকে এখন থেকে সুতা কাটার ওস্তাদ বলা যায়, আর সে যেখানেই যাক না কেন তাকে অবশ্যই সম্মান জানাতে হবে।’ মাদ্রাজে মূল ভাণ্ডার থেকে সুতা বান্ডিল ছাড়া করতে এবং বিনিময়ে একই কাউন্টের বোনা কাপড় পেতে ভারতী তাকে সাহায্য করতো । হঠাৎ করে শ্রীরামের মনে হলো যে সে যাদু জগতের একজন বাসিন্দা যেখানে আপনার যা যা প্রয়োজন তা নিজ হাত দিয়ে আপনারা তৈরি করেছিলেন। তার দুঃখ ছিলো সে এখনো একশত কাউন্ট করতে পারেনি, আর তার সুতা ছিলো কতকটা এবড়োথেবড়ো। কিন্তু ভারতী বললো: ‘ব্যবহার করার জন্য চল্লিশ কাউন্টই হচ্ছে আসল কাপড়: একশ কাউন্ট কেবল লোক দেখানো ও মুল্য বৃদ্ধির জন্য, এ নিয়ে ভেবো না।’ যেদিন সে তার খাদি কাপড়, সাধারণ একটা ধুতি ও জিব্বা (গ্রাম্য দর্জিকে দিয়ে সেই জায়গায় কেটে সেলাই করা) পেলো, সেদিন সে তার পরিধেয়(কারখানায় তৈরী) খুলে রাস্তার মাঝে জমা করে রেখে অর্ধেক বোতল কেরোসিন তার উপর ঢেলে ম্যাচের কাঠিতে করে আগুন জ্বালিয়ে দিলো; তার পুরানো কাপড়গুলো আগুনে জ্বলজ্বল করে জ্বলে পুড়ে গেলো। চরকা কেন্দ্রের কয়েকজন সদস্য আগুনের চারপাশে দাঁড়িয়ে দেখলো। গ্রামবাসীদের কেউ কেউ আগ্রভভরে দেখলো। উল্লম্ফনকারী শিখায় মোহিত হয়ে শ্রীরাম সমাবেশে ব্যাখ্যা করলো: ‘যন্ত্র দিয়ে তৈরী কাপড় আমি আর কখনো পরবো না।’ ধুতি ও জিব্বাটি ছিলো ভারী যেন নকশায় বুনানো এক টুকরো সীসা। কিন্তু তার মনে হলো এটি গর্ব করার মতো কিছু একটা ছিলো। সে অনুভব করলো সে জীবনের অস্তিত্বের নতুন স্তর প্রত্যক্ষ করছে ও সেখানে পৌঁছে গেছে। বসে পড়ে সে মহাত্মাকে লিখলো, ‘আজকে আমার পুরানো কাপড়-চোপড় পুড়ে ফেললাম। চল্লিশ কাউন্ট বানিয়েছি। ভারতী সন্তুষ্ট।’ সঙ্গে সঙ্গে মহাত্মাজী তাকে লিখে পাঠালো: ‘খুবই খুশি। চালিয়ে যাও। ভগবান আশীর্বাদ করুক।’ ** সন্ধ্যায় ভারতী পাহাড়ে উপরে উঠে আসলো। শ্রীরাম অস্থির হয়ে ছিলো: ‘এসব জায়গায় তুমি কী করে খালি পায়ে হাঁটতে পারো?’ ‘কেন পারবো না? পায়ে স্যান্ডেল নিয়ে তো আমরা জন্মাইনি। বর্ধ থেকে এখনো আমি চামড়াটি পাইনি, আর যে পর্যন্ত না পাওয়া যায় সে পর্যন্ত আমাকে সামলে নিতে হবে। কিন্তুÑÑÑ’ দীর্ঘশ্বাস ফেলে ভারতী বললো, ‘ওখানে হয়তো কেউ নেই যে আমাদের চাহিদা মেটাতে পারে। আমরা জানিও না তাদের কতজন জেলে আছে। সরকার সে তথ্য দেওয়াও বন্ধ করে দিয়েছে।’ তারা শীতল কাদার মেঝেতে বসেছিলো মাঝখানে একটা বাতি রেখে। শ্রীরাম তার মুখ অধ্যয়ন করলো, ১৯৪২ এর আগস্টের পর থেকে মহাত্মাজী কারাবরণ করায় তার মুখ আজকাল এত রেখায় ভরপুর যেন দেশের বোঝা তার পিঠে ছিলো। সর্বত্র পুলিশের পাকড়াও রাজনীতি সত্ত্বেও ইংরেজদের দেশ থেকে বিতাড়িত করতে ভারতী (শ্রীরামসহ) বিশাল জটিল যন্ত্রের একটা ছোট্ট খাঁজকাটা দাঁত হিসেবে কাজ করছে। শ্রীরাম আবার বললো: ‘তোমার খালি পায়ে হাঁটা ঠিক নয়।’ ‘কেন নয়? ভারতের তিনশ ষাট মিলিয়ন মানুষ হাঁটে খালি পায়ে।’ তার জাতীয় এ পরিসংখ্যান শ্রীরামকে বিরক্ত করলো। সে তৎক্ষণাৎ বললো: ‘তারা পারে, কিন্তু তার মানে এই নয় যে তোমারও খালি পায়ে হাঁটতে হবে। আশপাশে কোবরা সাপ থাকতে পারে, এ জায়গাটা এরকম জিনিসে ভরপুর।’ ‘বা, মনে হয় স্যান্ডেল পায়ে মাড়িয়ে গেলে কোবরা সাপ কামড়াবে না!’ ‘তুমি বেশি তর্ক করো।’ ‘বলছি তো বর্ধ থেকে স্বাভাবিক চামড়াটি আমি পাইনি, ’ ভারতী অভিযোগ করলো, আর বললো: ‘তোমাকে আমি ভয় পাই না, আর তোমার কাছে ব্যাখ্যা করতে হবে না কেন আমি এরকম বা সেরকম। কোবরা বা নির্জন রাস্তাকেও আমি ভয় পাই না । নইলে এখানে থাকতাম না।’ ‘অবশ্যই, আমাকে ভয় পাওয়ার দরকার নেই, ’ শ্রীরাম বললো। ‘তুমি শুধু আশা করো অন্যরা তোমাকে ভয় পাক।’ ‘হ্যাঁ, কারণ আমি তোমার গুরু।’ শ্রীরামের মনে হলো, ‘সমস্ত জিনিসটা একদম মিথ্যা। আমার বউ হয়ে তার আমার বাহুবন্ধনে আসা উচিৎ।’ কিছুক্ষণের জন্য সে ভাবলো, ‘কী বা তাকে স্পর্শ করতে দিচ্ছে না? ভারতী কী বা করতে পারে । এ জায়গায় তো সে সম্পূর্ণ একা। সে যদি বা চিৎকারও করে, কেউ তার চিৎকার দশ মাইলের মধ্যে শুনতে পারবে না।’ এমন ভয়ংকর সম্ভাবনায় সে পুলকিত হলো। কিন্তু এ ছিলো কেবলই স্বপ্ন। ভারতী তার মিশন ব্যাখ্যা করলো: ‘কাল মাদ্রাজের উদ্দেশ্যে যাত্রা করছি, আর কিছু দিনের জন্য তুমি আমায় দেখতে পাবে না।’ ‘কখন? কোথায় যাচ্ছো?’ ‘নির্দেশনার জন্য আমাকে তলব করা হয়েছে। পুলিশ সতর্ক প্রহরা রাখছে নিঃসন্দেহে, কিন্তু কোনো ঝামেলা ছাড়াই আমি গিয়ে আসতে পারি।’ সে চলে যেতে শুরু করলো। শ্রীরাম ভাবলো, ‘সে কেন এটা আমাকে বলতে এসেছে? বিষয়টা কী? আমার প্রতি তার ভালবাসা হিসেবে কি আমি এটা ব্যাখ্যা করতে পারি? কেউ দুই মাইল খালি পায়ে হেঁটে শুধু বলতে আসবে না পরবর্তী তিন দিন করার মতো কিছু থাকবে না। সে নিশ্চয়ই কোনো উদ্দেশ্য নিয়ে এসে থাকবে। হয়তো সে আমাকে খুব পছন্দ করে, আমার মনের কথা তার হাত ধরে শোনার জন্য অপেক্ষা করছে; আর তারপর নিজেকে আমার কাছে সঁপে দেবে।’ চিন্তা করাও আজব ব্যাপার যে সে শুধু তার ‘গুরু’, গুরুই বটে! আজব ব্যাপার যে এক সুশ্রী যুবতী এক পুরুষকে শিক্ষা দেবে! তাকে কিসে শিক্ষিত করবে? এ ভাবনায় সে মুখ টিপে হাসলো। ভারতী বললো: ‘তুমি হঠাৎ করেই খুবই ভাবুক হয়ে গেছো। কেন? ’ শ্রীরাম তার হাত স্পর্শ করলো: নিজর্ন পরিবেশ খুবই উৎসাহব্যাঞ্জক ছিলো, কিন্তু ভারতী তার হাত আলতোভাবে নিচে সরিয়ে দিয়ে মন্তব্য করলো, ‘নির্দেশনা নিয়ে ফিরে না আসা পর্যন্ত তুমি এখানে বিশ্রাম করো।’ আর ঘুরে রাস্তায় যেতে যেতে বললো, ‘বাইরে যেন তোমাকে খুব বেশি দেখা না যায়।’ শ্রীরাম বললো: ‘তোমার সাথে আমি অর্ধেকটা পথ যাবো।’ ‘প্রয়োজন নেই, ’ এই বলে ভারতী চলে গেলো। শ্রীরাম তাকে পাহাড়ের নিচ দিয়ে যেতে দেখলো। ‘কোনো একদিন কেউ একজন তাকে অপহরণ করবে; সে মনে হয় ভাবে না যে সে একজন নারী, ’ এই ভেবে সে ফিরে এলো। তার চারপাশে ধ্বংসাবশেষ নিয়ে সে গভীরভাবে ভাবলো। অনেক দূরে একটা ট্রেন এসে থেমে চলেও গেলো। ট্রেনের ছায়াময় এ.আর.পি বাতিগুলো ভূ-দৃশ্যের সাথে হামাগুড়ি দিয়ে গেলো। সে আশা করলো যে কোনো দূর্ঘটনা ছাড়াই মেয়েটি তার গ্রামে নিরাপদে পৌঁছাবে। তিন দিন পর সে নির্দেশনা নিয়ে উপস্থিত হলো, আর সে সময় থেকেই শ্রীরামের কর্মকাণ্ড নতুন মোড় নিলো। ভারতী রং তুলির একটা কৌটা এনে অস্ত্রাগার থেকে অস্ত্রবিতরণকারী প্রধানের ভাব নিয়ে তার কাছে হস্তান্তর করলো। সে বললো: ‘উপরে সবটুকু আবাদ করার জন্য তারা তোমাকে নিযুক্ত করেছে। তার মানে অনেক হাঁটতে হবে। পথে বারোটা গ্রামের মধ্যে কোনো গ্রাম বাদ দেওয়া যাবে না। গ্রামবাসীরা তোমাকে সবখানে সাহায্য করবে। মালগুদি ও আশপাশের এলাকায় আমরা কাজে থাকবো। সাবধানে থেকো, আবার কোনো এক সময় দেখা হবে। মহাত্মাজী জেলে থাকায় আমাদের নিজের মতো করে কাজ করতে হবে। তার বার্তা আমাদের সব জায়গায় পৌঁছাতে হবে।’ ১৯৪২ সালের আগস্ট প্রস্তাবে মহাত্মাজী বলেছিলেন: ‘ব্রিটেনকে ভারত ছাড়তেই হবে, ’ এ কথাটিতে মন্ত্র বা যাদুসূত্রের অমিত শক্তি ছিলো। দেশের সর্বত্র মানুষজন চিৎকার করে বললো ‘ভারত ছাড়ো ’। এর আওয়াজ শুনে স্বরাষ্ট্র সচিব অস্বস্তি বোধ করলো। ভদ্র সমাজে এটি নিষিদ্ধ কথন হলো। এ কথন উচ্চারণ করার পর মহাত্মাকে কারাগারে প্রেরণ করা হয়েছিলো; কিন্তু কথনটি নতুন জীবন নিয়ে বিকশিত হলো, আর শেষ পর্যন্ত ইংরেজদের ফেরত পাঠানোর মতো যথেষ্ট শক্তি উৎপাদন করলো। সারাদেশে কোনো খালি দেয়াল ছিলো না যেখানে এ বার্তাটি ছিলো না। কেউ ঘুরলেই দেখতো ‘ভারত ছাড়ো ’। পরের দিন শ্রীরাম তার ছোট্ট টিনের কৌটা, তুলি, ন্যকড়া ঝুলিতে করে কাঁধে নিয়ে পা টেনে টেনে হেঁটে পর্বত পথে আরোহণ করলো। পথে প্রথম গ্রামটিতে সে থেমে সবচেয়ে যুতসই দেয়ালটি নির্বাচন করলো, যা ঘটনাক্রমে নতুন একটা বাড়ির বহির্দেয়াল ছিলো, যার বারান্দায় গ্রামের শিশুরা বর্ণমালা শিখছিলো। সমস্বরে তারা বর্ণমালার বর্ণ পড়ছিলো, এতে তাদের শিক্ষক ঘটনাক্রমে ঝিমোচ্ছিলো, কিন্তু তাদের চোখ অনুসরণ করছিলো কাফেলার মধ্যে ঠক ঠক করা গরুর গাড়ি, ধূলোর মেঘে হারিয়ে যাওয়া দ্রুত ধাবমান বাস, এবং এদিক সেদিক ছুটে যাওয়া মানুষজন। দিনটি ছিলো উজ্জ্বল আর সবুজ গাছে ও ডালে এবং ঝোপের লতায় চোখ ধাঁধানো আলো ছিলো মনোমুগ্ধকর; তাদের চোখ মন বিক্ষিপ্ত হলো। আর তাই শ্রীরাম দেয়ালে লিখতে এলে তারা এক ধরণের গভীর স্বস্তির বোধ নিয়ে সটকে পড়লো। গ্রামের বয়স্করাও তাদের স্বাভাবিক কাজকর্ম ফেলে চারপাশে দাঁড়িয়ে দেখতে থাকলো। শ্রীরাম রঙে তুলিটা ডুবিয়ে সতর্কতার সাথে দেয়ালে লিখলো, ‘ভারত ছাড়ো ’। ‘ছ’ অক্ষরটি লিখতে তার ইচ্ছে হলো না। অক্ষরটিতে প্রচুর কালো কালি লাগতো। শুধু একটা অক্ষরে সবটুকু রঙ নষ্ট করে কোনো লাভ নেই। সে ভাবলো রঙ সাশ্রয়ের জন্য অক্ষরটির লেজ না লিখলে যদি চলতো। ইংল্যান্ডের মতো প্রথম শ্রেণীর অস্ত্রশস্ত্রসজ্জিত দেশের সাথে তারা যুদ্ধ চালাচ্ছে; অস্ত্র হিসেবে ছিলো শুধু এই তুলি, কালো রঙ ও খালি দেয়াল। শুধু একটা অক্ষর লিখতে গিয়ে তাদের যুদ্ধ সম্পদের অপচয় করার সামর্থ্য নেই। তার কাছে আরো সম্ভব মনে হলো যে ব্রিটেন এ অক্ষরটি ভারতে আমদানি করেছিলো যাতে করে কালো রঙের একটা জাতীয় ড্রেন থাকে। এ ভাবনায় সে এতটাই আচ্ছন্ন হলো যে সে পরিমার্জিত ‘ছ ’ লিখতে লাগলো, এর লেজের দিকটায় ন্যূনতম রঙ খরচ করে যাতে করে পড়া যায় এবং যে পর্যন্ত না কেউ খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে পড়ে, ‘ভারত ছাড়ো ’। গ্রামবাসীরা জিজ্ঞেস করলো: ‘এটা কতোদিন শুধু দেয়ালেই থাকবে, মশাই?’ ‘যতোদিন পর্যন্ত না কার্যকর হয়।’ ‘এতে কী বলা আছে, মশাই?’ ‘এতে আছে “ছাড়ো”ÑÑ মানে ইংরেজদের আমাদের দেশ ছাড়তেই হবে।’ ‘তারা ছাড়লে কী হবে, মশাই? দেশ চালাবে কে?’ ‘আমরা নিজেরাই চালাবো।’ ‘মহাত্মাজী কি আমাদের সম্রাট হবেন, মশাই?’ ‘কেন নয়?’ তাদের দিকে পিঠ রেখে অক্ষরগুলো আকারে ফেলতে ফেলতে সে বললো। সে স্কুলের শিশুদের সমস্বরে চিৎকার করে বলতে শেখালো, ‘ভারত ছাড়ো ’। তারা আনন্দের সাথে তার কথা মানলো। তাদের শিক্ষক এসে অনুযোগ করে বললো: ‘আপনি এ কী করছেন, মশাই, ওদের নষ্ট করছেন!’ ‘কীভাবে?’ ‘ওদেরকে রাষ্ট্রদ্রোহী আচরণ শিখিয়ে। পুলিশ শীঘ্রই আমাদের পিছু নেবে। আপনি কি চান আমরা জেলে পচে মরি?’ ‘জ্বী, কেন নয়? আপনার চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিরা যখন ওখানে ইতিমধ্যেই আছে।’ জনতা শিক্ষককে বিদ্রুপ করলো। ছেলেরা তাকে বিদ্রুপ করার এমন সুযোগ কাজে লাগানোর জন্য সবসময় প্রস্তুত থাকে। কিন্তু বৃদ্ধ লোকটিকে যেমন দেখালো তার চেয়ে বেশি কঠোর ছিলো। চশমা পরে তিনি শ্রীরামকে উপরে-নিচে দেখলেন। ছেলেরা চিৎকার করে উঠলো: ‘ওহ্ , মাস্টারজী চশমার ভেতর দিয়ে দেখছেন, ওহ্ !, ওহ্ !,’ তারা হাসাহাসি করলো ও চিৎকার করে বললো: ‘ছঁরঃ ওহফরধ’। শিক্ষক ভীড় ঠেলে বের হয়ে চিৎকার করে বললো: ‘সম্ভব হলে “ঃ” এর আগে “ব” যোগ করো; এদেশে আমাদের যা দরকার তা “ছঁরঃ”কর্মসূচী নয়, কিন্তু “ছঁরবঃ ওহফরধ ”। আপনি ওটা লিখছেন না কেন?’ শ্রীরাম লেখার কাজ শেষ করে ফেললো। কার কাছ থেকে যেনো একটা মই ধার করেছিলো। সে ঘুরে শিক্ষককে বললো: ‘মাস্টারজী, ওখানে দাঁড়িয়ে কথা না বলে আরো কাজের কিছু করেন। দয়া করে খেয়াল রাখুন যেন এ মইটি মালিকের কাছে ফেরত দেওয়া হয়, তার নাম ভুলে গেছি, আর দেশকে মুক্ত করতে আপনি আপনার কাজের অংশটা করে থাকবেন।’ শিক্ষক কিছুটা বিগলিত হলেন। সামনে এসে তিনি বললেন: ‘এমন নয় যে আমি আমাদের দেশকে মুক্ত দেখতে চাই না। আপনি যতটা দেশপ্রেমিক আমিও ততটা দেশপ্রেমিক, কিন্তু আপনি কি সৎভাবে চিন্তা করেন আমরা নিজেদেরকে শাসন করতে প্রস্তুত? আমরা প্রস্তুত নই। বিভ্রান্ত হবেন না। আমরা এখনো কোনো কিছুর জন্য প্রস্তুত নই। এ যুদ্ধ শেষ হোক, আর স্বরাজ প্রতিষ্ঠার জন্য যুদ্ধ করতে আপনি আমাকে প্রথমে পাবেন। দেশপ্রেম আপনার একচেটিয়া অধিকার নয়।’ ছেলেরা আশপাশে দাঁড়িয়ে চিৎকার করে স্লোগান দিলো। শ্রীরাম বললো: ‘সাবধান, ব্রিটেন ভারত ছাড়লে আপনার শিরোচ্ছেদ করা হবে। যাদের যাদের শিরোচ্ছেদ করা হবে তাদের সবার তালিকা আমাদের কাছে আছে।’ শিক্ষকের মেজাজ পুরো বিগড়ে গেলে বললেন: ‘আপনার কতো স্পর্ধা এমন কথা বলছেন! আমি দেখতে চাই না ব্রিটেন চলে যাক। হয়তো আপনার মতো লোকদের সাহায্যে হিটলার আসুক সেটা ভেবে যারা অধিকতর খুশি হবে আমি তাদের একজন নই। আপনাকে বলছি তখন আপনাকেই প্রথম গুলি করা হবে।’ জনতার কিছু অংশ শিক্ষকের এ দৃষ্টিকোণকে প্রশংসা করে বললো: ‘মাস্টারজী ঠিকই বলেছেন, সরকারকে আমরা কেন জ্বালাতন করবো?’ শ্রীরাম তাদের প্রতি ক্রোধে ক্ষেপে গিয়ে বললো: ‘আপনারা শুধু জ্বালাতনই করবেন না, সরকারকে অবশ্যই স্বীকৃতিও দেবেন না। একে আদৌ কোনো কর দিতে হবে না। আমাদের থেকে তারা দশ হাজার মাইল দূরে থাকে, আপনাদের কর তাদের কেন দিচ্ছেন?’ ‘এ রকম লোকদের ইচ্ছেমতো চলতে দেয়া ঠিক নয়: সে জন্য এখানে আমি সবসময় একটা থানা স্থাপনের জন্য বলেছি। এখানে কোনো পুলিশ যদি থাকতো, তবে এখানে এসে উনার এভাবে বক্তৃতা দেয়ার স্পর্ধা কি থাকতো?’ ‘থানা কতদূর?’ শ্রীরাম জিজ্ঞেস করলো। ‘সার্কেল স্টেশন দশ স্টোনের বেশি দূরে, ’ কেউ একজন জবাব দিলো। শ্রীরাম বললো, ‘দেখুন আপনাদের সরকার আপনাকে একটা থানাও দেয়নি! আপনাদের মাঝে এ শিক্ষকের মতো লোক আছেন বলেই কি এর প্রয়োজন নেই?’ ছেলেগুলো প্রশংসায় চিৎকার করে একতানে গাইলো, ‘ভারত ছাড়ো ’। এ ছিলো উচ্চকিত খুশির সমাবেশ। তাদের হর্ষধ্বনি ও সাধারণ গোলমেলে আচরনে রাস্তায় খড়ের বোঝা টানা এক জোড়া বলদ গরু ভয় পেয়ে গেলো। আর এতে সাধারণ বিশৃঙ্খলার সৃষ্টি হলো, লোকজন এখানে সেখানে ছুটলো এবং পরস্পরের দিকে চেঁচামেচি শুরু করলো। পশুগুলোকে রাস্তায় টেনে আনতে আনতে গাড়িয়াল তাদেরকে বিঘœতার জন্য গালিগালাজ করলো। ‘এই সব রাজনীতিবিদ, গান্ধীগোষ্ঠী কাউকে শান্তিতে থাকতে দেবে না। এখানে এসে আমাদের ঝামেলায় ফেলছেন কেন?’ শ্রীরাম বললো: ‘এই যে, গাড়ি টেনে তুলুন আর আমার কথা শুনুন। বাচ্চার মতো কথা বলবেন না। যে বিষয়ে কথা বলছেন তা বোঝার মতো যথেষ্ট বয়স হয়নি কি আপনার? আপনার বয়স কত?’ ‘গাড়িয়াল লাগাম তুলে তার পশুদের গলায় ঘন্টা টু টাং বাজাতে বাজাতে বললেন, ‘মনে হয় বিশ হবে!’ ‘বিশ! খুব সম্ভবত আপনার বয়স পঞ্চাশ।’ ‘হতে পারে, স্যার, একটু এদিক সেদিক । বিশ হবে।’ ‘ছেলেমেয়ে কতজন?’ ‘পাঁচ ছেলে, স্যার, আর একটা নাতি।’ ‘ভাই, আপনার বয়স পঞ্চাশ হবে, আর আপনাকে তাই দেখায়। দায়িত্বজ্ঞানহীন কথা বলবেন না। জানেন মহাত্মা গান্ধী জেলে আছেন?’ ‘জ্বী, স্যার।’ ‘জানেন কেন জেলে আছেন?’ লোকটি মাথা নাড়ালো। ‘যাতে করে আপনি এ দেশে স্বাধীন মানুষ হতে পারেন। এখন এ দেশে আপনি স্বাধীন নন।’ ** শ্রীরামের অপারেশনের পরিমণ্ডল হচ্ছে এখানে সেখানে বিক্ষিপ্ত পার্বত্য গ্রামে গ্রামে যেখানে কম-বেশি ঘন গাছপালা ও বনের মধ্য দিয়ে নিজে নিজে গড়ে ওঠা আঁকাবাঁকা রাস্তা পরস্পরকে সংযুক্ত করেছে। বহির্জগতের সাথে এ গ্রামগুলোর যোগাযোগ হয় ডাকপিয়নের মাধ্যমে যিনি সপ্তাহে দু’একবার ভাল ভাল কিছু গ্রামের মধ্য দিয়ে যান এবং কোপালের রেলস্টেশনে চিঠিগুলো ফেলে দেন। সমস্ত জায়গাটা জুড়ে ছড়ানো ছিটানো কয়েকটা পুলিশ ফাঁড়ি আছে। প্রতিটি ফাঁড়িতে একজন করে পাতি অফিসার ও মুষ্টিমেয় কয়েকজন লোক থাকে যারা সদর দপ্তরের সাথে যোগাযোগ রাখে টেলিফোনের মাধ্যমে। টেলিফোন লাইন মাথার উপর দিয়ে চলে গিয়ে পার্বত্য ঢালের বনানীতে প্রায়ই মিলিয়ে গেছে। কেউ এই প্রত্যন্ত সবুজ প্রান্তরের সাথে রাজনীতি কদাচিৎ সংশ্লিষ্ট করতে পারে, কিন্তু অন্য যে কোনো কিছুর মতো ব্রিটেনের সাথে যুদ্ধ করার জন্য এটি ভাল একটি সম্মুখ লাইন। সে জঙ্গলের এক অংশে গিয়ে ঢুকলো যেখানে হাতি সবলে কাঠ টানছিলো। বড় বড় গুঁড়ি কাটা হচ্ছে এবং হাতির পাল সেগুলো শুঁড়ে তুলে পেচিয়ে জঙ্গলের কেন্দ্রে অপেক্ষমান ট্রাকগুলোতে স্তুপ করে রাখছে। নিজের বার্তা নিয়েই শ্রীরাম এখানে ঢুকলো। কাজে নিমগ্নদের লক্ষ করে সে মন্তব্য করলো: ‘সবুজ কাঁচা কাঠ কেটে ফেলছেন। জানেন কোথায় যাচ্ছে এ কাঠ?’ হাতির পিঠে বসা মাহুত কাজ থামিয়ে শ্রীরামের দিকে মজার দৃষ্টিতে তাকালেন। শ্রীরাম ব্যাখ্যা করলো, ‘এগুলো জাহাজ, রাইফেল, সেতু এবং আরো কত কী নির্মানের জন্য নিয়ে যাওয়া হচ্ছে, যার সবগুলো এ বিশ্বকে ধ্বংস করার কাজে ব্যবহার করা হবে। তারা যুদ্ধে লিপ্ত হতে যাচ্ছে যে যুদ্ধ করতে আমরা বাধ্য। কারণ ব্রিটেন এতে আমাদেরকে টেনে নিচ্ছে। এ কাজে আমাদের বন উজাড় করা ঠিক হবে না। অনেক দূরে, দূরবর্তী দেশে যাচ্ছে, আর আপনি যে টাকা পাচ্ছেন তা হলো ফাঁপানো ইন্দ্রজালিক মুদ্রা যা শীঘ্রই মূল্য হারাতে যাচ্ছে। যুদ্ধের জন্য এসব উপাদান সরবরাহ করবেন না, এসব গাছ আবার জন্মাতে শতাব্দীর পর শতাব্দী লাগবে। এ কাজ ছেড়ে দিন; এটা আপনার হাতে। যে হাতে নিস্পেষিত হচ্ছেন সে হাতকে জোরদার করবেন না।’ যে কাঠ ব্যবসায়ী তাকে পর্যবেক্ষণ করছিলেন তিনি কাছে এসে অনুনয় জানালেন, ‘দয়া করে আমাদেরকে ঝামেলায় ফেলবেন না, হাজার হলেও আমরা ব্যবসায়ী। কাল আপনি যদি ভাল দামে বেশ কিছু কাঠের অর্ডার দেনÑÑÑ’ ‘সম্পদ কামানোর সময় এটা নয়। এটা স্বাধীনতা যুদ্ধে যোগদানের সময়।’ কন্ট্রাক্টর শুধু বললেন, ‘দয়া করে আমাদেরকে আমাদের মতো থাকতে দিন। এসব ঝামেলায় জড়াতে চাই না আমরা।’ কানে কানে বললেন, ‘দয়া করে আমাদের শ্রমিকদের কাজে ব্যাঘাত ঘটাবেন না।’ ‘শ্রমিক ঝামেলা পাকাতে আমি বের হইনি। এই নারকীয় উদ্দেশ্যে আপনি অবশ্যই ঐ কাঠ পাঠাবেন না। সব যুদ্ধই হচ্ছে মহাত্মাজীর অহিংসা মতের বিরুদ্ধে। মানেন কি মানেন না?’ ‘আহ্ , মহাত্মাজী। হরিজন তহবিলে পাঁচ হাজার টাকা দিয়েছিলাম। আমার বাড়িতে তাঁর একটা প্রতিকৃতি আছে, বিছানা থেকে উঠেই যার মুখ প্রথমে দেখি তা হচ্ছে তাঁর মুখ।’ ‘অহিংসা বলতে তিনি কী বুঝিয়েছেন জানেন?’ ‘হ্যাঁ, হ্যাঁ, তিনি মালগুদিতে এলে তাঁর একদিনের বক্তৃতাও আমি বাদ দেইনি।’ ‘তাহলে মনে হচ্ছে সমান সংখ্যক লয়েলিস্ট মিটিংও আপনি অবশ্যই করে থাকবেন।’ কন্ট্রাক্টর লজ্জায় মাথা নোয়ালেন। বিড়বিড় করে বললেন: ‘আসলে, কালেক্টর এসে “এটা করেন, ওটা করেন” বললে আমাদের মেনে চলতে হয়। সরকারি কর্মকর্তাদের আমরা নাখোশ করতে পারি না।’ ‘যুদ্ধ তহবিলে কতটুকু দিয়েছিলেন?’ ‘মাত্র পাঁচ হাজার। আমি খুবই নিরপেক্ষ; গভর্নমেন্ট নিজে এসে আমাদের কাছে আবেদন জানালে কী করে অস্বীকৃতি জানাই? হাজার হোক আমরা ব্যবসায়ী তো।’ লোকটি চালাকি করে শ্রীরামকে গাছের নিচে তাবুতে নিয়ে গেলো। এতে কথা শুনতে শুনতে মাহুতদের সময় নষ্ট হলো না। কাঠের গুঁড়ি গড়িয়ে নামানোর শব্দে বন অনুরণিত হলো, আর মাহুতরা ঠাট্টা-তামাশা করতে করতে হাতি চালিত করলো। বাতাসে ইউক্যালিপটাস, সবুজ পাতা ও মাহুতদের ধূমপান করা তামাকের হালকা গন্ধ ভাসছিলো। কন্ট্রাক্টর শ্রীরামকে চেয়ারে বসিয়ে চুলায় ধোঁয়া উদগীরণশীল একটি কেতলি বের করে দুই কাপ চা ঢাললেন। তাকে দেখে শ্রীরাম হতোদ্যম হলো। তিনি ছিলেন লম্বা কৃশকায় ও মাথা ছিলো পুরোটাই কামানো, পরনে ছিলো হাতে বোনা ঢিলেঢালা ফ্ল্যানেলের জ্যাকেট ও ধুতি, আর তার কোমরে গোঁজা ছিলো চামড়ার থলে ও মোড়ানো কিছু কাগজ। লোকটির গলায় চিকন স্বর্ণের চেইন ও বাম হাতে ঘড়ি দেখে ধনী মনে হলো, কিন্তু বেশি খাঁটুনির ফলে চোখ মুখ বসে গেছের মতো দেখাচ্ছিলো। শ্রীরাম বললো: ‘আপনি নিঃসন্দেহে প্রচুর টাকা কামাচ্ছেন, কিন্তু এর কোনো মূল্য নেই যদি না আপনার ÑÑইয়ার ÑÑচেতনা বিকশিত হয় ’ সে শব্দ হাতড়ে বেড়ালো। সে বলতে চাইলো, ‘জাতীয় সেবা ’ বা ‘দেশপ্রেম ’, কিন্তু এসব কথা বলতে বলতে তার আর ভাল লাগছিলো না, এসব কথায় মঞ্চের বক্তৃতার গন্ধ ছিলো। সে বললো: ‘আপনার কাছে মহাত্মা গান্ধীর ছবি থাকলে প্রার্থনা করুন যেন যুক্তিসঙ্গত চিন্তা করতে তিনি আপনাকে অনুপ্রাণিত করতে পারেন, এইটুকুই বলতে পারি।’ হঠাৎ সে উঠে পড়লো। লোকটি বললো: ‘আপনার চা খেয়ে যান।’ শ্রীরাম বললো, ‘এর দরকার নেই।’ তাবু থেকে বেরিয়ে ঝোপের ফাঁকের মধ্য দিয়ে সে দূরে চলে গেলো। সময় জ্ঞান সে হারিয়ে ফেললো। যন্ত্রের মতো কাজ করেই চললো। বনে গ্রামে ঢূকে মহাত্মাজীর বার্তা সবার কাছে পৌঁছে দিলো। যেখানেই গেলো লিখলো, ‘ভারত ছাড়ো ’। আর পরে লয়েলিস্টরা তা সংশোধন করে দিলো: ‘ছাড়ো না ’ অথবা ‘আমি ছাড়ছি ’ দিয়ে। এক জায়গায় একজন শ্রীরামকে জিজ্ঞেস করলো: ‘ এসব জায়গায় “ভারত ছাড়ো ” লিখে আপনার লাভ কী? আপনি কি চান আমরা ছেড়ে যাই?’ ‘এর মানে তা নয়।’ ‘তাহলে যাদের উদ্দেশ্যে এটা লেখা তাদের চোখে পড়ে এমন জায়গায় সেটা লিখুন।’ ‘ওরা সব জায়গায় আছে, কখনো দেখা যায় কখনো দেখা যায় না। সব জায়গায় লিখে দেওয়াই অনেক ভাল।’ ‘সময় ও রঙের অপচয়, ’ লোকটি বললো। ‘আমি আদেশ পালন করছি মাত্র, আর থেমে থেমে খুব বেশি জ্ঞানের কথা শুনতে আমি পারবো না।’ সাগর পৃষ্ঠ থেকে ৪০০০ ফুট উপরে আবাদ হয়েছিলো যেদিকে শ্রীরাম তার রঙের কৌটা ও তুলি নিয়ে গেলো। তার জন্য এটা প্রায় অর্ধেক দিনের কাজ ছিলো। এক পড়ন্ত বিকেলে সে এস্টেটে গিয়ে পৌঁছালো। এর উপর ‘ম্যাথিয়েসান এস্টেট’ লেখা চিত্রবৎ একটা গেট-পোস্ট দেখলো। আশপাশে মাইলের পর মাইল জুড়ে কোনো মানুষ দেখা যাচ্ছিলো না। শ্রীরাম কিছুক্ষণের জন্য ভাবলো: ‘এখানে কোনো বার্তা লিখে কি লাভ হবে?’ আশপাশে তাকিয়ে সে ইতস্তত বোধ করলো, কিন্তু সন্দেহটাকে অকাজের হিসেবে উড়িয়ে দিলো। গেট-পোস্টের এক অংশে চট করে ধূলি ঝেড়ে সে সুন্দর গোটা গোটা হস্তাক্ষরে লিখলো: ‘ভারত ছাড়ো ’, এবং যাওয়ার জন্য ঘুরে দাঁড়ালো। ঐ পথ দিয়ে যাওয়া এক এস্টেট শ্রমিক বার্তাটি দেখার জন্য থামলো ও জিজ্ঞেস করলো: ‘আপনি কি বোর্ড লিখছেন?’ শ্রীরাম বার্তাটির তাৎপর্য বিস্তারিত ব্যাখ্যা করলো। লোকটি কিছুক্ষণ শুনে বললো: ‘চলে যান। ঐ দরাই(ইউরোপিয়ান সাহেব) খারাপ লোক। সবসময় বন্দুক রাখে। আপনাকে গুলি করতে পারে।’ শ্রীরাম কিছুক্ষণ ইতস্তত করে ভাবলো শান্তিপূর্ণভাবে চলে যাওয়া না গুলি খাওয়া বেশি কাজের হবে। হঠাৎ তার মনে হলো এতদূরে আসার কোনো দরকার ছিলো না যদি শুধু নিরাপদে ফেরার কথা থাকতো। সমুদ্র পৃষ্ঠ থেকে ৪০০০ ফুট উপরে সে অকারণে আসেনি। দোধারী কুড়ালটা নিয়ে শ্রমিকটি সতর্কতা বাণী উচ্চারণ করে চলে গেলো। সামনে দেখা পুরাতন এক বাঙলোর দিকে সে হাঁটতে লাগলো। ‘আশা করি তার কোনো বুলডগ নেই, ’ শ্রীরাম চিন্তা করলো। কতকটা রক্তাক্তভাবে সে দৃশ্যটি আগেভাগে কল্পনা করলো। সিঁড়ির কাছে আসবে আর দরাই দোনলা বন্দুক দিয়ে শ্রীরামকে ধোঁয়া ও রক্তে মিশে দিবে। হয়তো ভারতী এতে অনুশোচনায় পুড়বে। মনে মনে বলবে: ‘সে জীবিত থাকতে আমি যদি আমার ভালবাসা আরো স্পষ্ট করে জানাতাম!’ যাই হোক, সে কেন এটা করছে? হাই কমান্ড তো তাকে বন্দুকওয়ালার কাছে গিয়ে বুক পেতে দিতে নির্দেশ দেয়নি। লাল মুখাবয়ব ও হলুদাভ লাল চুলবিশিষ্ট সাত ফুট উচ্চতার এক ব্যক্তি বারান্দার পাশে এসে তার সাথে গায়ে পড়ে আলাপ জুড়ে দিলেন। পাইপ খাচ্ছিলেন, আর ট্রাউজারের পকেটে এক হাত আরামদায়কভাবে ঢুকিয়ে রেখেছিলেন। মুহুর্তের জন্য শ্রীরাম সামনে অগ্রসর হতে একটু অনিচ্ছা বোধ করলো। ‘হ্যালো! আপনি কে হতে পারেন?’ তার পাশে নিজেকে শ্রীরামের বামন মনে হলো। উঠে গিয়ে তীক্ষè কণ্ঠে বললো: ‘আমি একটা বার্তা এনেছি।’ ‘ওহ্ , ভাল। কোত্থেকে?’ ‘মহাত্মাজীর কাছ থেকে।’ মুখ থেকে পাইপটা বের করে লোকটি বললেন: ‘ওহ্ ! কী?’ ‘মহাত্মা গান্ধীর কাছ থেকে।’ ‘তাই নাকি? তো কী সেটা?’ ‘সেটা হচ্ছে আপনাদের অবশ্যই ভারত ছাড়তে হবে।’ কিছুক্ষণের জন্য লোকটিকে অপ্রস্তুত দেখালো। কিন্তু মুহুর্তের মধ্যেই তিনি স্থৈর্য ফিরিয়ে আনলেন। বললেন: ‘আপনি ও কথা কেন বলছেন?’ ‘আমি বলছি না। আমি শুধু বার্তাটা আপনাকে দিচ্ছি।’ ‘ওহ্ ! ভেতরে এসে কিছু পান করেন, আসবেন না?’ ‘না, আমি কখনো পান করি না।’ ‘ওহ্ , হ্যাঁ, হ্যাঁ। আমি মদ বুঝাইনি, তবে আপনি যা চাও তা-ই পান করতে পারেনÑ শরবত, বা কফি বা চা।’ ‘আমার কিছুরই দরকার নেই।’ ‘আপনাকে ক্লান্ত দেখাচ্ছে, ভেতরে আসেন, আলাপ করি। বেয়ারা!’ উচ্চস্বরে বলাতে তার বেয়ারা হাজির হলো। ‘দুই গ্লাস কমলার রস, ’ তিনি অর্ডার দিলেন। ‘তাড়াতাড়ি করো।’ ‘জ্বী, স্যার, ’ বলে বেয়ারা চলে গেলো। অনেকগুলো বোতামওয়ালা সাদা একটি ইউনিফর্ম পরেছিলো চাকরটি। শ্রীরাম চিন্তা করলো, ‘যে সব ভারতীয় তার চাকর হিসেবে কাজ করে তাদের জন্য এই লোকটি বিশেষ ধরণের পোশাকও চায়’, আর ব্যাখ্যাতীত রাগ অনুভব করলো। লোকটি কিছুক্ষণ তার মুখের দিকে তাকিয়ে বললেন, ‘জলদি আসেন, বারান্দায় যাই।’ তিনি শ্রীরামকে সিঁড়ি বেয়ে বারান্দায় নিয়ে গেলেন । বারান্দাটা সুন্দর একটি ছিটকাপড়ে ঢাকা বেতের চেয়ারে সজ্জিত ছিলো। এখানে সেখানে বড় বড় পাত্রে আরো কিছু শোভাকৃত গাছের চারা ছিলো। শ্রীরাম এর সাথে নিজের পরিপার্শ্ব, হাজার হাজার বছর আগেকার নির্মিত ধ্বংসপ্রাপ্ত ভবন যেখানে সাপ বিচ্ছু ও ঘুমানোর একটি মাত্র মাদুর আছে তার সাথে তুলনা করলো। সে প্রশ্ন না করে পারলো না, ‘কীভাবে এতকিছু করলেন? জানতে পারি?’ ‘কী করেছি?’ ম্যাথিয়েসান জিজ্ঞেস করলেন। ‘এত সাজসজ্জা ও বিলাস?’ আশপাশের সবকিছু নির্দেশ করে শ্রীরাম বললো। মাথিয়েসান মৃদু হেসে বললো, ‘একে আমি বিলাসিতা বলবো না, বন্ধু।’ ‘আর এদিকে মিলিয়ন মিলিয়ন মানুষ অন্নাভাবে বাসস্থানের অভাবে আছে!’ শ্রীরাম সাধারণভাবে বললো । এই মুহূর্তে তার কাছে না থাকা ভারতীর কাছ থেকে সে পরিসংখ্যানটি পেয়েছিলো। ‘এ তো আমাদের প্রার্থনা, ’ মাথিয়েসান বললো, ‘যে তাদের সবার খাওয়ার মতো শুধু যথেষ্ট না থাকতে পারে তাদের থাকার মতো সুন্দর বাড়িও থাকতে পারেÑ আমি আশা করি তা এর থেকেও ভাল। এটা তো একটা অস্থায়ী বাড়ি।’ শ্রীরাম এ ব্যাখ্যাটিকে জাতিগত ঔদ্ধত্যের দিকে নিয়ে গেলো। ‘নিজের সমৃদ্ধি ও এ দেশের মালিক হওয়ার অনুভূতিই তাকে এরকম করে কথা বলাচ্ছে, ’ সে চিন্তা করলো, আর কণ্ঠস্বরকে তুঙ্গে তুলে চিৎকার করে বলতে চাইলো, ‘ছাড়ো, ছাড়ো, নিজেদের দেখভাল আমরা নিজেরাই করবো, বেতের আসবাবপত্র ও সেগুলোর জমকালো কাভারের জন্য আমরা পরোয়া করি না, খাবারের জন্যও আমরা পরোয়া করি না, আমরা যা পরোয়া করি তা হলোÑÑ’ কীভাবে কথাটি শেষ করতে হবে সে ব্যাপারে সে স্বচ্ছ ছিলো না। সে জোরে এইটুকুই বললো, ‘আমরা তা-ই পরোয়া করি যা মহাত্মাজী আমাদের করতে বলেন।’ ‘আর আপনাদের কী করতে উপদেশ দিয়েছেন?’ ‘আমরা চরকা কাটবো, খাদি পরবো, বিলাসহীন জীবন-যাপন করবো, আর আমরা ভারতীয়রাই ভারতকে চালাবো।’ ‘কিন্তু তা চেষ্টা করার সুযোগ আপনারা প্রত্যাখ্যান করেছেন। আপনার কি মনে হয় না যে ক্রিপের প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করে নিজেদের করুণার পাত্র করেছেন?’ শ্রীরাম কিছুক্ষণ কোনো উত্তর দিলো না। তার কাছে এটি শাস্ত্রীয় বিষয় মনে হলো যার অর্থ সে জানতো না। তার মাথায় এমন জটিল জটিল শাস্ত্রীয় বিষয় ঢুকলো না, আর তাই সে শুধু বললো, ‘মহাত্মাজী তা মনে করেন না, ’ এভাবে আলোচনা শেষ হলো। সে এলোমেলো কিছু শব্দ জানতোÑÑঅধিরাজ্যের মর্যাদা, মুসলমানদের জন্য সংরক্ষিত কোটা, আর এটা সেটা । কিন্তু পত্র-পত্রিকা থেকে সে এসব সংগ্রহ করলেও সেসব তার কাছে অপ্রাসঙ্গিক মনে হলো। শুধু যে বিষয়টা তার কাছে গুরুত্বপূর্ণ ছিলো তা হলো মহাত্মাজী মনে করেন না যে প্রস্তাবগুলোর সাথে ভারতের স্বাধীনতার বিষয়ে কোনো সম্পর্ক ছিলো। ‘এ তো শুধু লোক দেখানোর জন্য, ’ পত্রিকার একটা মন্তব্য মনে করে সে বললো। ‘আমরা ওসব চাই না। এমন প্রস্তাবে আমাদের কোনো লাভ নেই। আমরা বদান্যতা চাই না।’ শেষের এই ভাবনাটা তাকে এত বিধ্বস্ত করে তুললো যে চাকরটি ট্রেতে দুই গ্লাস কমলার রস আনার সাথে সাথেই ট্রেটি নাটকীয়ভাবে ভূপাতিত করে বলতে চাইলো, ‘এ আমি চাই না, ’ কিন্তু লম্বা ও অদৃশ্যপ্রায় এক পান-পাত্রের মধ্যে পানীয়টা ছিলো সুন্দর, সজীব ও হলুদ। আর উপরে ওঠার ক্লান্তি ও খাঁটুনিতে তার গলা শুকিয়ে গিয়েছিলো। সে ইতস্তত করলো। তাকে এক গ্লাস দিয়ে ম্যাথিয়েসান নিজেরটা তুলে নিয়ে বললেন, ‘আপনার স্বাস্থ্য ও সৌভাগ্যের জন্য।’ শ্রীরাম শুধু অস্ফুটস্বরে বলতে পারলো, ‘ধন্যবাদ’, আর গ্লাসটি এক চুমুকেই শেষ করলো। রস তার গলা দিয়ে নামার সময় তা এতো আরামদায়ক ছিলো যে তার মনে হলো কোনো অবস্থাতেই একে বাধাগ্রস্ত করতে পারলো না। দিব্যানন্দে চোখ বন্ধ করলো। রাজনীতি, ভারতী, বিবাদ, এমনকি মহাত্মাজীকেও মুহূর্তের জন্য সে ভুলে গেলো। এক সেকেন্ড মাত্র সে অনুভূতি স্থায়ী হলো। শ্রীরাম গ্লাস নামিয়ে রেখে দীর্ঘশ্বাস ফেললো। লোকটি তার গ্লাসের উপরের স্তর থেকে অদৃশ্য ক্ষুদ্র এক আস্তরণ সরিয়ে নিয়ে বললেন, ‘আরেক গ্লাস হবে নাকি?’ ‘না, ’ এই বলে শ্রীরাম চলে যাওয়ার প্রস্তুতি নিলো। লোকটি শ্রীরামের সাথে অর্ধেক পথ সঙ্গ দিলো। শ্রীরাম বললো, ‘আপনার দরজার প্রবেশপথে যে বার্তাটি আমি লিখেছি তা মুছে ফেলবেন না।’ ‘ওহ্, না, মুছবো না। এটা তো স্মৃতিচিহ্ন আর এটি গর্বভরে সংরক্ষণ করবো।’ ‘কিন্তু আপনারা কি দেশ ছেড়ে যাবেন না মানে ত্যাগ করবেন না?’ শ্রীরাম বললো। ‘আমি তা মনে করি না। আপনি কি এ দেশ ছাড়তে চান?’ ‘আমি কেন ছাড়বো? এখানে আমার জন্ম হয়েছে, ’ উষ্মাভরে শ্রীরাম বললো। ‘দূভার্গ্যজনকভাবে আমি এখানে জন্ম নেয়নি, কিন্তু আপনার থেকেও বেশি সময় ধরে আমি এখানে আছি। আপনার বয়স কত? ‘সাতাস না হয় ত্রিশ। তাতে কী এসে যায়?’ ‘ভালো কথা, আমি যখন এখানে এসেছিলাম তখন আপনার বয়সী হবো। আর এখন আমার বয়স বাষট্টি। দেখুন, এটা তো সম্ভব যে আপনি এ দেশে যতটা জড়িত আমিও ততটা জড়িত।’ ‘কিন্তু আমি তো ভারতীয়, ’ শ্রীরাম জিদ বজায় রেখে বললো। ‘আমিও তাই, ’ লোকটি বললো, ‘আর পাঁচ হাজার মাঠ শ্রমিক এবং দুইশ জন ফ্যাক্টরি ও অফিস কর্মী হিসেবে নিয়োগ দিয়েছি তা বিবেচনা করলে আমি হয়তো এদেশের মানুষের কিছুটা কাজে এসেছি।’ ‘নিজের ফায়দা লোটার জন্য আপনি তা করছেন। আপনার মনে হয় আমরা আপনার চাকর ছাড়া আর কিছু হতে পারি না, ’ আর ভাল কিছুর চিন্তা না করতে পেরে শ্রীরাম বললো এবং এরপর জিজ্ঞেস করলো, ‘আপনি কি ভয় পান না? আপনি সম্পূর্ণ একা থাকেন, ভারতীয়রা যদি আপনাকে বের করে দেয়, তবে আপনার জন্য তা নিরাপদ হবে না।’ মাথিয়েসান কিছুক্ষণের জন্য চিন্তায় পড়ে গেলেন এবং বললেন, ‘ঠিক আছে, আমার মনে হয় আমি আমার সুযোগটা নেবো, ব্যস, কিন্তু একটা ব্যাপারে আমি বেশ নিশ্চিতÑÑ কোনোকিছুকেই আমি ভয় পাই না।’ ‘এর কারণ কি এই যে মহাত্মাজী আপনার সর্বেত্তাম বন্ধু। তিনি চান এ সংগ্রাম সম্পূর্ণরূপে অহিংস উপায়ে পরিচালিত হোক।’ ‘অবশ্যই সেটাও একটা বিষয়। আচ্ছা, আপনার সাথে পরিচিত হয়ে ভাল লাগলো, ’ হাত প্রসারিত করে তিনি বললেন, ‘বিদায়।’ শ্রীরাম পথ দিয়ে নিচে চলে গেলো যার উপরে কফি গুল্ম, ঝোপ-ঝাড়, বাঁশঝাড় এবং অন্য সবকিছুর উপর দিয়ে এঁকেবেঁকে যাওয়া পেপার ভাইন, তার সাথে পাশে নর্দমা জুড়ে ঘন সবুজ ঘাসে ভরা ছিলো। তার এত ক্লান্ত লাগলো যে সে ভাবলো মখমলের চাবড়ার উপর শুয়ে সে কেন ঘুমালো না, কিন্তু তার করার মতো অন্য কাজ ছিলো। করার মতো অসংখ্য কর্তব্য তার ছিলো। ** তার পরবর্তী গন্তব্য ছিলো তিন মাইল দূরে সোলুর নামক গ্রামে। জায়গাটায় পাহাড়ের ঢালে পঞ্চাশটির মতো বাড়ি ছিলো। এর নিচে উপত্যকা ও চারণভূমি প্রসারিত হয়ে ছিলো। সাতটা বাজে শ্রীরাম সেখানে পৌঁছালো। গ্রামটি ছিলো কর্মব্যস্ত। নারী, পুরুষ ও শিশুরা দলে দলে উৎসাহজনকভাবে কথা বলতে বলতে গ্রামটির বটগাছের নিচে সমবেত হলো। গাছটিতে একটি গ্যাস লাইট ঝুলে ছিলো, আর দু’একজন লোক গ্রামটির ধনী পরিবারগুলোর একটি থেকে দুইটি লোহার চেয়ারের ব্যবস্থা করছিলো। লোহার চেয়ার দুটি আনার উদ্দেশ্য ছিলো অভ্যাগত কোনো বিশিষ্ট অতিথিদের জন্য। শ্রীরাম গ্রামটির একমাত্র দোকানে গিয়ে দু’টি কলা কিনে এক বোতল সোডা পানি দিয়ে খেয়ে ফেললো। নিজেকে সতেজ মনে হলো। দোকানদারকে জিজ্ঞেস করলো, ‘সভা কখন শুরু হবে?’ ‘খুব শীঘ্রই, আমাদেরকে বিনোদন দেয়ার জন্য তারা কাকে যেন আনতে গেছে। সুন্দর অনুষ্ঠান হবে। আপনি কি ততক্ষণ থাকবেন?’ ‘হ্যাঁ, থাকবো।’ ‘কোথা থেকে আসছেন?’ ‘অনেক দূর থেকে, ’ শ্রীরাম বললো। ‘কোথায় যাচ্ছেন?’ দোকানদার জিজ্ঞেস করলো। ‘আবার অনেক দূরে, ’ যতটা এড়িয়ে চলা সম্ভব তার চেষ্টা করে শ্রীরাম বললো। লোকটি একে চমৎকার একটা কৌতুক মনে করে হাসলো। ছাদ থেকে ঝোলা রশি এক হাতে ধরে লোকটি দাঁড়িয়েছিলো। দোকানটি ছিলো বাক্সের মতো ছোট্ট, সম্পূর্ণরূপে পুরাতন প্যাকিং কেসের তৈরী, আর মালিকের বসার জন্য চটের বস্তা দিয়ে গদি করা আসন ছিলো। রংধনুর রঙে গ্যাসীয় পানির বোতলগুলি দিয়ে তার উপরের তাকটি সজ্জিত, দোকানের সামনে কাঁচা কলার কাঁদি পেরেক দিয়ে ঝোলানো, মুখের উপর কাউকে আঘাত করছে মতো, আর কয়েকটা ছোট্ট বাক্স ও ভাজা চাল, ভাজা ছোলা, পেপারমিন্ট, সুগার ক্যানডি ইত্যাদির হালকা টিন ছিলো। লোকটি শ্রীরামের কৌতুকে এতটাই মজা পেয়েছিলো যে সে জিজ্ঞেস করলো, ‘আমার কাছে চমৎকার কিছু বিস্কুট আছে, খেয়ে দেখবেন নাকি?’ ‘ওগুলো কি ইংরেজদের?’ শ্রীরাম জিজ্ঞেস করলো। ‘ইংরেজদের সবচেয়ে ভাল বিস্কুট।’ ‘আপনি কী করে নিশ্চিত হলেন?’ ‘সেনাবাহিনীর এক বন্ধুর কাছ থেকে ওগুলো পেয়েছি। ওগুলো এখন শুধু সেনাবাহিনীদেরকেই সরবরাহ করা হয়। একেবারে বিশুদ্ধ ইংরেজ বিস্কুট, আশপাশে মাইলের পর মাইল খুঁজলেও আপনি পাবেন না। আজকাল কেউ আর ওগুলো পায় না।’ ‘আপনার কি কোনো লজ্জা নেই?’ শ্রীরাম জিজ্ঞেস করলো। ‘কেন, কেন, কী হয়েছে?’ লোকটি অবাক হয়ে বললো । আরো বললো, ‘এই যে, যা খেয়েছেন তার টাকাটা দিয়ে এখান থেকে বেরিয়ে যান। আপনি তো খাদি পরা লোক, তাই না? ওহ্ ! ওহ্ ! আমি তো খেয়ালই করিনি। আর তাই আপনি মনে করেন যা খুশি করতে পারেন, যা খুশি বলতে পারেন, আর উচ্ছৃঙ্খলের মতো আচরণ করতে পারেন।’ ‘আমার সম্পর্কে যা খুশি বলতে পারেন, কিন্তু এই পোশাক সম্পর্কে খারাপ কথা বলবেন না। এটা হচ্ছেÑÑ এটা হচ্ছেÑÑ এতই পবিত্র যে এভাবে এর সম্পর্কে কথা বলা যায় না। তার আচরণে দোকানদার ভয় পেয়ে বললো, ‘ঠিক আছে, স্যার, আমাদেরকে আমাদের মতো থাকতে দিন, আর আপনি চলে যান। এখানে বক্তৃতা দেন সেটা আমি চাই না। আপনার টাকা হয়েছে দুই আনা ছয় পয়সা... দুটা কলা দুই আনা, আর সোডা ছয় পাই। ‘এই যে নেন, ’ ছোট্ট মানিব্যাগ থেকে দুটো কয়েন ও একটা ছয় পাই বের করে তার হাতে দিয়ে বললো। ‘দেখুন, ’ লোকটি নরম হয়ে বললো, ‘কলার সময় এটা নয়, তাই ওগুলো যত সস্তা হতে পারতো ততটা সস্তা নয়।’ ‘আপনার দাম নিয়ে তো আমি কোনো সন্দেহ করছি না, কিন্তু আমি চাই আপনি এটা বুঝুন যে বিদেশি জিনিস আপনার বেচতে থাকা ঠিক নয়। ইংরেজদের বিস্কুট আপনার বিক্রি করা ঠিক নয়।’ ‘ঠিক আছে, স্যার, এরপর থেকে বর্তমান মজুদ শেষ হলে আমি সতর্ক থাকবো।’ ‘ভারতীয় হিসেবে যদি আপনার কোনো গর্ব থাকে, তবে আপনি পুরো মজুদটাই নর্দমায় ফেলে দেবেন আর একটা কাককেও তাতে ঠোকরাতে দেবেন না। বুঝেছেন?’ ‘জ্বী, স্যার, ’ গোল করে সমবেত হওয়া সতর্ক লোকজনকে পছন্দ না করে দোকানদার বললো। রাস্তার শেষ প্রান্তে দলে দলে প্রহরারত লোকজনদের নিয়ে বক্তৃতা মঞ্চ নির্মিত হচ্ছিলো। গ্রামবাসীরা খুবই খুশি ছিলো, সেখানে কিছু কিছু ভ্রাম্যমান ব্যবসাও চলছিলো। দোকানদার তার পুরানো এক শত্র“র দেখা পেলো যে তার মুখে হাসি নিয়ে জনতার এক প্রান্তে দাঁড়িয়ে তাকে বিপদে দেখতে পছন্দ করতো। যেন তাকে সন্তুষ্ট করতে দেবতারা এখানে খাদি পোশাকে এই লোকটিকে ডেকে এনেছিলো, একজন আজন্ম ঝামেলা সৃষ্টিকারী। সে শ্রীরামের কাছে আবেদন জানালো, ‘স্যার, এখন দয়া করে একটু চলে যান। আমাকে অবশ্যই দোকান বন্ধ করতে হবে।’ ‘চাইলে আপনি দোকান বন্ধ করতে পারেন, কিন্তু আমি চাই আপনি ঐ বিস্কুটগুলো নষ্ট করে ফেলুন, ’ শ্রীরাম দৃঢ়ভাবে বললো। ‘কোন বিস্কুটগুলো?’ সন্ত্রস্ত হয়ে দোকানদার জিজ্ঞেস করলো। ‘দয়া করে আমাকে আমার মতো থাকতে দিন, স্যার।’ ‘আপনি তো বললেন, আপনার কাছে ইংরেজদের বিস্কুট আছে।’ ‘আমার কাছে ইংরেজদের কোনো বিস্কুট নেই, আমি কোথায় ওগুলো পাবো? কালো বাজারেও ওগুলো পাওয়া যায় না।’ ‘ওগুলো ইংরেজদের বিস্কুট না হলেই অনেক ভাল। আপনার প্রতি আমার শ্রদ্ধা বাড়বে, কিন্তু আমি কি একটা দেখতে পারি?’ ‘আমার মোটেও কোনো বিস্কুট নেই, ’ দোকানদার অনুনয় করে বললো। জনতা উচ্চস্বরে হাসলো। কে যেন কাকে চিৎকার করে বললো, ‘এই যে এখানে ঝোলের মধ্যে রঙ, চলে আসো।’ ‘তোমার ঐ বাক্সে ওগুলো আছে, ’ শ্রীরাম টিনের বাক্সগুলোর একটি নির্দেশ করে বললো। দোকানদার সঙ্গে সঙ্গে ওটার ঢাকনি তুলে ভেতরের জিনিস দেখালো, সৌভাগ্যবশত ময়দা। ‘কিন্তু কিছুক্ষণ আগে আপনি কি বলেননি যে আপনার কাছে বিস্কুট ছিলো?’ ‘কে? আমি? আমি তো শুধু মস্করা করছিলাম। আমি গরীব দোকানদার, কীভাবে আমি বিস্কুটের কালো বাজার মূল্য পরিশোধ করে নিরাপদে রাখতে পারবো?’ ‘ওগুলো সে ভেতরে রেখেছে, স্যার। দোকানের ভেতরটা আমাদের দেখাতে বলেন, ’ রসিকদের একজন বললো। প্রতিটা মুহূর্তে পরিস্থিতি আরো জটিল হচ্ছিলো। ‘আমি এটা খেয়াল করে খুবই দুঃখিত যে বিদেশি কালো বাজারের মাল বিক্রেতা হওয়া ছাড়াও আপনি মিথ্যাবাদী। আপনার দ্বারপ্রান্তে আমার জীবন উৎসর্গ করতেও আমি প্রস্তুত আছি, যদি এতে আপনি শুধু সত্যবাদী ও দেশপ্রেমিক হয়ে থাকেন। যে পর্যন্ত না আপনি আপনার সকল মজুদ খালি করে ঐ নর্দমায় ফেলে দেবেন এবং আমার কাছে অঙ্গিকার করবেন যে আপনি কখনোই আপনার জীবনে আর মিথ্যা উচ্চারন করবেন না সে পর্যন্ত এ জায়গা ছেড়ে আমি যাবো না। আপনার দরজায় পড়ে না মরা পর্যন্ত আমি এখানে থেকে যাবো।’ ‘আমার সাথে আপনি অযথা যুদ্ধ বাধাচ্ছেন, ’ লোকটি বিলাপ করলো। ‘আমি শুধু আপনার ভেতরের মন্দটার সাথে যুদ্ধ করছি, এ হচ্ছে অহিংস যুদ্ধ।’ এক মহিলা অর্ধেক আনা মূল্যের লবণ কিনতে এলো। শ্রীরাম মাঝখান থেকে বললো, ‘দয়া করে এখানে কোনো কিছু কিনবেন না।’ মহিলাটি তাকে ছাড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টা করলে শ্রীরাম তার সামনে কর্দমাক্ত মাটিতে শুয়ে পড়লো: ‘চাইলে আপনি আমার উপর দিয়ে হেঁটে যেতে পারেন, কিন্তু আমি আপনাকে তার দোকানে কোনো কিছু কিনতে দেবো না।’ দোকানদারকে শোচনীয় দেখালো। কী খারাপ দিন! সকালে ঘুম থেকে উঠে কী খারাপ মুখই না সে দেখেছিলো! সে অনুনয় করে বললো, ‘স্যার, আপনি যা বলবেন তা-ই করবো, দয়া করে আমাকে বিপদে ফেলবেন না।’ শ্রীরাম বললো: ‘বন্ধু, আপনি ডাঁহা ভুল করছেন। আপনাকে বিপদে ফেলানোর ইচ্ছা আমার নেই। আমি শুধু আপনাকে সাহায্য করতে চাই।’ লবণ কিনতে আসা মহিলাটি বললো: ‘আমি যদি আপনার যুক্তি-তর্ক শেষ করা পর্যন্ত অপেক্ষা করি, তাহলে চুলার সস উবে যাবে,’ আর মাটিতে শুয়ে থাকা দেহটির দিকে তাকিয়ে তিনি অনুনয় জানালেন: ‘স্যার, ওখানকার দোকানটায় আমি কি লবণ কিনতে পারি?’ মাথা নিচু রেখে শ্রীরাম না হেসে পারলো না। বললো: ‘যেখানে খুশি আপনি সেখানেই লবণ কিনছেন না কেন?’ তার দৃষ্টিকোণ মহিলাটি বুঝতে না পেরে ব্যাখ্যা করলো: ‘স্যার, মাসে একবার আমি লবণ কিনি। হাজার হলেও আমরা তো গরীব মানুষ। জীবনে বিলাস করার সামর্থ্য আমাদের নেই। লবণের দাম হতোÑÑ’ এখনো উপুড় হয়ে শুয়ে থাকা শ্রীরাম তার মাথা তুলে বললো, ‘আপনার মতো মানুষদের জন্যই মহাত্মা গান্ধী যুদ্ধ করছেন। জানেন লবণ কর রদ না করা পর্যন্ত তিনি ক্ষান্ত হবেন না?’ ‘কেন, স্যার?’ নিস্পাপের মতো মহিলাটি জিজ্ঞেস করলো। ‘আপনি যে লবণ খান তার প্রতিটি চিমটির জন্য ইংরেজ সরকারকে আপনার কর দিতে হয়। সে জন্য এত দাম দিয়ে আপনাকে লবণ কিনতে হয়।’ কে যেন মাঝখান থেকে ব্যাখ্যা করে বললো: ‘আর কর উঠে গেলে এক আনায় আপনি এত লবণ পাবেন,’ হাত দিয়ে বিশাল পরিমান নির্দেশ করলো। মহিলাটি ঠিকমতো মুগ্ধ হয়ে চোখ বিস্ফারিত করে বললেন: ‘এত সস্তা হতো,’ অশ্র“পূর্ণ চোখে রশিতে ভর দিয়ে পায়ের আঙ্গুলের উপর দাঁড়ানো দোকানদারের দিকে বৈরী দৃষ্টি নিক্ষেপ করে আরো বললেন, ‘আজকাল আমাদের দোকানদারেরা সবকিছুর দাম বাড়িয়ে দিচ্ছে। তারা অনেক অর্থলোলুপ হয়েছে,’ জনতার মধ্যে সাধারণ একটা সম্মতিসূচক ধ্বনি শোনা গেলো। পায়ের আঙ্গুলে ভর করে দাঁড়িয়ে থাকা দোকনদারটি বললো, ‘আমরা কী করতে পারি, সরকার যে দাম নির্ধারণ করে দিয়েছে সে দামে আমরা লবণ বেচি।’ ‘এ সব প্রশ্নে আমরা যারা সরকারের সাথে লড়াই করছি তাদেরকে আপনি সমর্থন দিতে পারেন,’ শ্রীরাম বললো, ‘যদি আপনি অন্য কিছু করতে না পারেন। ১৯৩০ সালে ডান্ডি উপকূলে মহাত্মার অভিযান আপনার মনে আছে? ডান্ডি উপকূলে লবণ-পানি সিদ্ধ করে যে কাউকে লবণ পানি সিদ্ধ করতে সাহায্য করে তাদের নিজের লবণ তৈরি করতে গোটা দেশে তিনি তিনশ মাইল হেঁটেছিলেন ।’ দোকানদারটি শোচনীয় অবস্থারই প্রতিচ্ছবি ছিলো। নিচু স্বরে সে বললো, ‘আপনি আমাকে দিয়ে যা করাতে চান আমি তা-ই করবো, দয়া করে উঠে চলে যান। ময়লায় শুয়ে থেকে আপনার কাপড় এত নোংরা হচ্ছে।’ ‘আমার কাপড় নিয়ে ভাববেন না। সে আমি দেখবো; কাপড় আমি ধুইতে পারি।’ ‘কিন্তু স্যার, এ মাটি শক্ত হলে সহজে উঠবে না।’ দোকানদার বললো। জনতার মধ্যে কেউ একজন চিৎকার করে বললো, ‘আপনি কিসের কথা বলছেন? উনি হয়তো ভাল একজন ধোপাকে কাপড়টি দেবেন।’ ‘ধোপা খুঁজে না পেলে আপনি কাপড়টা আমার ধোপা শামাকে দিতে পারেন, যে কোনো দাগ সে তুলে ফেলবে। এমনকি উপরের এস্টেটের ইউরোপিয়ানরাও তাদের কাপড় ধোয়ার জন্য তাকে ডাকে, স্যার।’ অন্য আরেকজন তাকে কনুই দিয়ে গুঁতা মেরে বিড়বিড় করে বললো, ‘এখন ইউরোপিয়ানদের কথা উল্লেখ করো না; উনি ওদেরকে পছন্দ করেন না।’ শ্রীরামের কাছে মনে হলো যে এখানকার লোকজন তাকে মাটিতে শুয়ে থাকতে দেখতে পছন্দ করলো, আর তাকে দমিয়ে রাখার জন্য সবকিছু করছিলো। এ রকম মনে হওয়ায় সে হাতে ভর করে উঠে বসে পড়লো। নাকে ও কপালে কাদা এবং চুলে বালু লেগেছিলো। একটা গেঞ্জি ও তার আকারের দ্বিগুণ ট্রাউজার পরা একটা ছোট্ট বালক হাতে একটা ছয় পাই শক্ত করে ধরে দৌড়ে আসলো। চিৎকার করে বললো: ‘ঠাকুরদার জন্য ভাল দেখে তিন পাইয়ের তামাক গুড়া আর তিন পাইয়ের নারকেল বরফি দেন তো।’ সে সবেগে ছুটে শ্রীরামকে পেরিয়ে দোকানটিতে গিয়ে হাতে কয়েনটি ধরে রাখলো। দোকানদার কয়েনটা এক ঝটকায় চোখের নিমিষে তার হাত থেকে নিয়ে নিলো। ছোট্ট বালকটির পা ছুঁয়ে শ্রীরাম কাকুতি জানালো: ‘এ দোকানে কোনো কিছু কিনবে না।’ ‘কেন নয়?’ শ্রীরাম ব্যাখ্যা করতে লাগলো, ‘দেখো, আমাদের দেশÑÑ’ জনতার মধ্যে দুই তিনজন লোক বালকটির ঘাড় ধরে টেনে নিয়ে বললো, ‘প্রশ্ন করো কেন? তোমাকে যা করতে বলা হয়েছে তা-ই শুধু করো না কেন?’ তারা তাকে টেনে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করলো, কিন্তু ছোট একটি কাঠের রেলিং ধরে সে চিৎকার করে বললো: ‘উনি আমার টাকা নিয়েছেন। আমার টাকা, আমার টাকা।’ রাগতস্বরে লোকজন দোকানদেরকে চিৎকার করে বললো, ‘ছেলেটাকে ওর টাকা দিয়ে দাও।’ দোকানদার চিৎকার করে বললো: ‘আমি কী করে দিবো? আজ শুক্রবার, আর কয়েন ফিরে দেওয়া অশুভ হবে না? বাকি জীবনটা আমার বরবাদ হবে। টাকাটার জন্য সে যা চায় তা-ই দিতে আমি প্রস্তুত, সে চাইলে আরো একটু বেশি দেবো; কিন্তু না, টাকাটা ফেরত দিতে আমি পারবো না। বন্ধুরা, আমার উপর দয়া করো। আমার সাতটা বাচ্চা আছে।’ ছোট্ট বালকটি চিৎকার করে বললো: ‘তামাক গুড়া না নিয়ে গেলে ঠাকুরদা আমাকে মেরে ফেলবে। তার বাক্স খালি হয়েছে। আমার জন্য অপেক্ষা করছে।’ ‘ঐ দোকানে গিয়ে কিনে আনো,’ কেউ একজন বললো। বালকটি উত্তর দিলো, ‘অন্য দোকান থেকে আনলে তিনি তা ফেলে দেবেন।’ অসময়োচিত অহংকার দেখিয়ে দোকানদারটি বললো, ‘গত দশ বছর ধরে সে আমার দোকানের খদ্দের। অন্য কোনো জায়গা থেকে সে এ তামাক গুঁড়া আনতে পারে না। যে কাউকে এটা আমার চ্যালেঞ্জ।’ রেলিং আঁকড়ে ধরা বালকটি চিৎকার করে বললো, ‘আমাকে অবশ্যই তামাকের গুঁড়া পেতে হবে, নইলেÑÑ’ জনতার মধ্যে থেকে কে যেন বিড়বিড় করে অভিশাপ দিয়ে তার উপর ঝাঁপিয়ে পড়লো এবং রেলিং থেকে সরিয়ে নিয়ে গেলো। বালকটি জোরে কাঁদতে লাগলো। জনতা জোরে হাসলো। দোকানদার হতাশায় বিমর্ষ হলো। সামনের মাটির দিকে গম্ভীরভাবে এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে শ্রীরাম মূর্তির মতো ধূলায় বসলো। কেউ একজন বালকটির কানে কানে বিড়বিড় করে কথা বলে শান্ত করলো, ‘ঐ লোকটি চলে যাওয়ার পর তোমার তামাক গুঁড়া নিয়ে আসবে।’ ‘কখন যাবেন?’ বালকটি ফিসফিস করে বললো। ‘খুব তাড়াতাড়ি যাবেন। এ জায়গার মানুষ নন,’ লোকটি ফিসফিস করে বললো। ‘কিন্তু ঠাকুরদার তামাক বাক্স এক্ষুণি অবশ্যই ভরাতে হবে।’ ‘আমি এসে তোমার ঠাকুরদার সাথে কথা বলবো, চিন্তা করো না।’ শ্রীরাম বসে বসে সবকিছু শুনলো, কিন্তু কিছুই বললো না, নড়লোও না। দোকানের পাশের জনতা ধীরে ধীরে চলে গেলো যেহেতু অন্য প্রান্তে লোকজন জমায়েত হতে লাগলো। গাছে দ্বিতীয় হারিকেন লাগানো হচ্ছিলো। জনতা উপরে তাকিয়ে বললো, ‘রামু হারিকেন নিয়ে গাছে চড়ছে।’ তারা খাকি পোশাকের হাফ প্যান্ট ও খালি গায়ে ডোরাকাটা ঢিলেঢালা ফ্ল্যানেলের জ্যাকেট পরিহিত এক যুবককে নির্দেশ করলো। নিচ থেকে দেখে তার মা চিৎকার করে বললেন, ‘ও রামু, গাছের উপরে উঠিস না, কেউ ঐ ছেলেটিকে নামিয়ে আনো না, সবসময় সে গাছে চড়ে বেড়ায়।’ ‘ভাবছেন কেন, গাছে চড়লে ছেলেটার কী হবে? কেউ একজন জিজ্ঞেস করলো। ঝগড়া বেঁধে গেলো। মা সমুচিত জবাব দিলেন, ‘আপনার যদি এমন ছেলে থাকতো যে সবসময় নিজের বিপদ ডেকে আনে, তবে আপনি ওভাবে কথা বলতেন না।’ গাছের উঁচু থেকে ছেলেটি চিৎকার করে বললো, ‘আপনারা ঝগড়া করতে থাকলে আমি নিচে লাফ দিয়ে সবাইকে আতঙ্কিত করে তুলবো।’ জনতা পরিস্থিতি উপভোগ করলো। মুহূর্তের জন্য দোকানদার নিজের কষ্ট ভুলে গিয়ে গাছের উঁচুতে এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলো এবং মন্তব্য করলো, ‘ভয়ানক ছেলে তো, সবসময় বেপরোয়া সং সেজে মাকে দুশ্চিন্তায় রাখে। ওকে নিয়ে ওনার কোনো শান্তি নেই।’ ‘আচ্ছা, নিজের দেখ্ ভাল করার জন্য ওকে তো যথেষ্ট বয়সী দেখাচ্ছে।’ শ্রীরাম বললো। ‘হ্যাঁ, কিন্তু ওর মা-ই ওকে নষ্ট করেছে, সবসময় গাছে চড়ছে, বা সাঁতার কাটছে বা লোকজনকে জ্বালাতন করছে, উচ্ছৃঙ্খল,’ দোকানদার বললো। ‘আপনারাই ওকে খুব বেশি জ্বালাতন করছেন । ওকে একা থাকতে দিলে কাউকে সে বিরক্ত করবে না, ’ শ্রীরাম বললো, ‘সবাই ওকে উপদেশ দিচ্ছে আর দুশ্চিন্তাগ্রস্ত করছে।’ গাছের উঁচু থেকে এবার একটা চিৎকার আসলো, ‘হারিকেনটা বেঁধেছি। আর কে এ কাজ করতে পারতো?’ হারিকেনটা বাতাসে দুললো এবং পিছনে শিলা পাহাড়ের ঢালে চলিষ্ণু ছায়া ফেললো। জনতা তাকে দেখে ঠাট্টা-তামাশা করলো। ‘কেউ মস্করা করলে দড়ি কেটে বাতিটা আপনাদের সবার উপর ফেলে দেবো,’ সে চ্যালেঞ্জ ছুড়লো। ‘শয়তান ছেলে, ’ তার মা চিৎকার করে বললো। এ কথাবার্তা শ্রীরামের কাছে অনর্থক মনে হলো। এ জায়গার সব লক্ষহীন ছ্যাবলা লোকদের কথা চিন্তা করে সে রাগান্বিত বোধ করলো। দোকানদার যোগ করলো, ‘এ গ্রামে কোনো শান্তি নেইÑÑ ঐ দুইজন কোনো না কোনোভাবে সবাইকে সবসময় জ্বালিয়ে বেড়াচ্ছে।’ ‘আপনিও ভাল নন।’ শ্রীরাম রাগতস্বরে বললো। দেশ বাঁচার লড়াইয়ে লিপ্ত; এক ঝলকে তার মনের মধ্যে খেলে গেলো গান্ধী, তার চরকা, তার সাথে ঘন্টার পর ঘন্টা ধরে হাঁটা, নানাভাবে নিজেকে ভাবা ও মর্মাহত হওয়া, তাঁর কারাবরণ, আর যাদের জন্য এত সব, সে ধরণের লোকদের দেখে এসব কিছু তার কাছে অনর্থক মনে হলো। হঠাৎ তার খারাপ লাগলো। নিজের সব কর্মকাণ্ড তার কাছে অর্থহীন মনে হলো। কবীর সরণীর আরামদায়ক নির্জনতায় সে তো ফিরতেও পারতোÑÑ যাতে অন্তত এক বৃদ্ধা আত্মা খুশি হতো। দোকানদারটি ইংরেজদের নাকি স্ক্যান্ডিনেভিয়ানদের বিস্কুট নাকি চাইনিজদের ক্র্যাকার নাকি ফরাসি বাটার বিক্রি করলো তাতে কী এসে যায়? এটা তো বিবেকহীন বেনিয়া ও মোটা চামড়ার জনগণের মধ্যে শুধু ব্যবসার বিষয় ছিলো। কাদায় বসে থাকা, ঝামেলা পাকানো ও লড়াই করাÑ সব অযাচিত ছিলো। হঠাৎ সে সতর্ক বোধ করলো। দোকানদারকে জিজ্ঞেস করলো, ‘একটা কাগজ, কলম ও খাম দিন তো। এর জন্য টাকা দেবো।’ ‘না, স্যার,’ দোকানদার বললো, ‘এ দোকানে কাগজ ও এ রকম জিনিসের চাহিদা নেই। এখানে যারা আসে তারা সাধারণ মানুষ, তারা কোনো কিছু খাওয়ার জন্য নয় পান করার জন্য আসে।’ ‘আর যারা শুধু ইংরেজদের বিস্কুট চায়, আমার মনে হয়?’ সংশয়পূর্ণভাবে শ্রীরাম বললো। ‘ওটা ভুলে যান, স্যার। আর কখনো তা করবো না,’ দোকানদার আশ্বস্ত করলো, ‘আপনি যদি ঐ জায়গাটা থেকে উঠে আমাকে ভুলে যান।’ এ প্রশংসা ও ব্যক্তিত্বের বিশাল গুরুত্ব অর্জনে শ্রীরাম তুষ্ট হলো। খুবই সন্তোষজনক ছিলো এটি। ‘আশা করি কাগজ ও খামের ব্যাপারে আপনি মিথ্যা বলছেন না?’ সে জিজ্ঞেস করলো। ‘আপনার কাছে সম্ভবত ইংরেজদের সবচেয়ে সস্তা কাগজ ও কালি শুধু আছে?’ ‘না, স্যার, ঐ মন্দিরের দেবতার নামে শপথ করে বলছি। আমার কাছে কোনো মজুদ নেই, আর যা কিছু পবিত্র আছে তাদের নামে শপথ করে বলছি এরপর থেকে ইংরেজদের সব মাল এড়িয়ে চলবো। কোথাও কখনো কোনো বিস্কুট দেখতে পেলে তা আমি নর্দমায় ফেলে দেবো। যে ইংরেজদের বিস্কুট চাইবে, তাকে লাথি মারবো। এই গ্রামে অন্তত ইংরেজদের আর কোনো বিস্কুট থাকবে না। এর মধ্যে আমি কি স্কুলশিক্ষকের কাছে গিয়ে আপনার জন্য কাগজ-কলম নিয়ে আসতে পারি? এ জায়গাটায় তিনিই শুধু কিছু লেখেন।’ দোকানদার আরো বললো, ‘দয়া করে একটু সরুন, দোকানটা খোলা রেখে যেতে পারছি না, আশপাশে এত বেশি চোর-বদমাশ।’ শ্রীরাম বললো, ‘আপনি চলে গেলে আমি আপনার দোকান দেখে রাখবো, ’ তারপর অলুক্ষণভাবে, ‘আপনি জানেন কত ভালভাবে লোকজনদের আমি তাড়াতে পারি।’ একে মজা হিসেবে সে উপভোগ করলো। এ মজায় যোগ দেওয়াটাকে দোকানদার সর্বোত্তম মনে করলো এবং দোকানের দরজাগুলো বন্ধ করার প্রস্তুতি নিয়ে নার্ভাসভাবে হাসলো। তার স্নায়ুগুলো ছিলো আঁটসাঁট পাছে শ্রীরাম হঠাৎ তার মন বদল করে ফেলে। এ সম্ভাবনার নিরাপত্তা হিসেবে সে আরো বললো, ‘স্যার, আপনি যতই ব্যস্ত থাকুন না কেন, আপনাকে চিঠি অবশ্যই লিখতে হবে। কিছুক্ষণের মধ্যে আমি ফিরে আসবো।’ পিতলের তালাটি মেরে লাফ দিয়ে নিচে নামায় সে খুশি বোধ করলো। মুক্ত মানুষের মতো লাগলো তার। তার সারা জীবনে নিরঙ্কুশ স্বাধীনতার এই প্রথম স্বাদ ছিলো এটি। ‘স্যার, আমি ফিরে আসবো, ফিরে আসবো, স্যার,’ চাবির ঝোকা ঝিন ঝিন করে বাজিয়ে দৌড়ে যেতে যেতে সে বললো । ভুঁড়িওয়ালা লোকটিকে দৌড়াতে দেখা মজার একটা দৃশ্য ছিলো। শ্রীরাম কিছুক্ষণ তা উপভোগ করে সাবান ও চুলের তেল বিজ্ঞাপনের এনামেল প্লেটে সজ্জিত দোকানটির দরজায় হেলান দিয়ে রইলো এবং কাগজটা পেলে চিঠিতে কী কী লিখবে তা মনে মনে ঠিক করলো। মাজারের উপরে গাছের ডালে দুলে থাকা হারিকেনগুলো দেখছিলো সে, আর এর নিচে লোকজন সভার জন্য জমায়েত হলো। চিঠিটা নিয়ে তার মন ব্যস্ত ছিলো: ‘শ্রদ্ধেয় মহাত্মাজী, আমি জানি না কেন আমরা এসব মানুষদের নিয়ে ভাবি। তাদের জন্য আমরা যা কিছু করতে পারি তারা তার যোগ্য বলে মনে হয় না। তারা বিদেশি বিস্কুট খায় ও বিক্রি করে। তারা সবাই ছ্যাবলা-মনা, সবসময় তরুণ এক ছোকড়াকে বিরক্ত করছে যে গাছে চড়েছে। জানি না সে নেমে এসেছে কিনা; সে পড়ে গেলেও আমি পরোয়া করি না; সংশ্লিষ্ট সবার জন্য এটা একটা ভাল মুক্তি হবে। কীভাবে স্বরাজ লাভ করতে হবে সে সম্পর্কে তাদেরকে বলার চেয়ে বরং তাদেরকে তাদের মতো থাকতে দিলেই তারা আমাদের প্রতি কৃতার্থ থাকবে। তারা তো পরোয়াই করে না। এ মুহূর্তে তারা লয়েলিস্ট সভার আয়োজনে নিমগ্ন। আমার শ্রদ্ধেয় মহাত্মাজী, আমি যা জানতে চাচ্ছি তা হচ্ছেÑÑ’ সে ভাবলো মহাত্মাজীকে কী বলতে চাইছিলো। সমস্যাটি আসলে কী ছিলো। সমস্যাটি তার অগোচরে চলে গেলো। হঠাৎ তার মনে হলো যে সে এত বেশি ক্লান্ত ও অখুশি। ক্ষুধার্ত ছিলো ও বাড়ির জন্য মন কাঁদছিলো। বরং ভারতীর সাথে তার কবীর সরণীতে ফিরে যেতে চাইলো, আর এসব ভুলে যেতে চাইলো। যে ধকলের মধ্য দিয়ে সে গেলো তাতে কলা ও সোডা-পানি কদাচিৎ পর্যাপ্ত ছিলো। লোকটি এসে দোকান খুললে সে যদি আরো চাইতে পারতো! জড়তা তাকে এমনভাবে ঘিরে ধরলো যে নড়াচড়া না করে তার সামনের সভার কার্যবিবরণী দেখলো। তার বিবেকে সবসময় বাধলো। কিছু একটা তাকে বললো: ‘তুমি এখানে এসেছো এই সভার বিরোধিতা করার জন্য, কিন্তু এ বিষয়ে তুমি কিছুই করছো না।’ সে মনে মনে শুধু এইটুকুই বললো, ‘আমার কিছুই করার নেই। নেতার কাছ থেকে কোনো নির্দেশনা না পাওয়া পর্যন্ত সবকিছুই বাদ রাখতে চাই। নির্দেশনা ছাড়া ছুটাছুটি করে কোনো লাভ নেই।’ নিরাবেগে সে একদল লোককে জীপে করে আসতে দেখলো। অ্যামপ্লিফায়ারসহ গ্রামোফোনে ছায়াছবির কিছু গান বাজলো যার মধ্যে লোকজন সময়টা চিহ্নিত করলো। আর তারপর কেউ একজন হারমোনিয়াম নিয়ে জোরে জোরে গাইতে গাইতে আসলো। হারমোনিয়ামের আওয়াজে শ্রীরাম কান বন্ধ করলো: ‘নিকুচি করি ও যন্ত্রের,’ মনে মনে বিড়বিড় করে বললো। এর কর্কশ শব্দে তার স্নায়ুগুলো বিকারগ্রস্ত হলো। ‘আশা করি মহাত্মা গান্ধী ভারতের সম্রাট হলে এ যন্ত্র তৈরি করা বা বাজানোকে তিনি শাস্তিযোগ্য অপরাধ হিসেবে গণ্য করবেন। এটাও তো ইংরেজদের উপহার, মনে হয়।’ মনে মনে বললো। এ সঙ্গীত শেষে কেউ একজন রামায়ণ থেকে সঙ্গীত ও ধারাবর্ণনা পরিবেশন করলো। লোকজন অনুষ্ঠানটি উপভোগ করলো। ঠিক এসবের মাঝে লোহার চেয়ারে বসে থাকা দুইজন কর্মকর্তা হঠাৎ উঠে কোনো রকমে তামিল ভাষায় বক্তৃতা দিলেন। তারা যুদ্ধের গুরুত্ব ব্যাখ্যা করলেন, কীভাবে ব্রিটেন জয়লাভ করছিলো, কীভাবে ভারতের সাহায্য করা কর্তব্য ছিলো, আর কীভাবে ভেতরের ও বাইরের শত্র“ থেকে ভারতের নিজেকে রক্ষা করা উচিৎ। সাধারণ পোশাকে পুলিশ ছিলো, প্রশস্থ বেল্ট ও খাকি জামায় তাদেরকে কম সাধারণ লাগলো; পশমী-বুশ কোটে মাথায় চকচকে চুলসহ সরকারি কর্মকর্তা ছিলো; কেউ একজন সমাবেশের সকল শিশুকে টিন থেকে চকলেট বিতরণ করছিলো। শ্রীরাম মনে মনে বললো, ‘আমি এখানে আছি এটা থামানোর জন্য, কিন্তুÑÑ কিন্তুÑÑ মহাত্মাকে আগে লিখে উপদেশ নেইÑÑÑ’ আশপাশে তাকালো। প্রতিশ্র“ত চিঠির কাগজের জন্য অপেক্ষা করার অজুহাত তার ছিলো। কিন্তু সে জনতার মধ্যে দোকানদারকে দেখে ফেললো। ‘ঐ, মিথ্যাবাদী!’ শ্রীরাম মন্তব্য করলো: ‘সে হয়তো ভান করছে যে সে শিশু, চকলেট চাচ্ছে আর সেটা তার দোকানে কাল কালো বাজারি দামে বিক্রি করবে।’ ** যেন তার অলিখিত চিঠির উত্তরে সে মহাত্মাজীর কাছ থেকে বার্তা পেলো। ভারতীর উদ্দেশ্যে বার্তাটি লেখা ছিলো: ‘তোমার কাজ হওয়া চাই অন্তর্বিশ্বাসের বিষয়। তুমি যা দেখছো বা বুঝছো তার উপর এটি নির্ভর করে না। প্রতিটি কাজে তোমার বিবেকই তোমার পথপ্রদর্শক হওয়া উচিৎ। এরপর তা পরামর্শ করো, তাহলে ভুল হবে না। যা দেখছো তা দিয়ে নিজেকে চালিত করো না। তোমাকে তোমার কর্তব্য করা উচিৎ কারণ তোমার ভেতরের কণ্ঠস্বর সেটা করতে তোমায় চালিত করে, এইটুকুই থাকলো। প্রতিটি কাজে ভগবান তোমাদের আশীর্বাদ করুন।’ বার্তাটির ফলে ভারতী তাকে দেখার একটা উপলক্ষ পেলো। শ্রীরামের একদিন কোনো কাজ ছিলো না; সৈনিকদের ছুটির দিন, যেমনটা সে ভাবলো। ধ্বংসপ্রাপ্ত মন্দিরের তোরণে বসে বসে সে সেদিন কিছুই করছিলো না, কুঁড়িয়ে পাওয়া পুরাতন একটা পত্রিকা পড়ছিলো। এতে অচল সব সংবাদ ছিলোÑÑ ম্যাজিনো রেখা ও এর মতো সংবাদ ছিলো। কিন্তু তার জন্য এই যথেষ্ঠ ছিলো। চিঠি বাহক বোল্ডারের নিচ দিয়ে অনেক আগে চলে গিয়েছিলো তার ফিরতি যাত্রায়, আর সমতল ভূমিতে ফিরে গিয়েছিলো । পশ্চিম দিগন্তে সূর্য স্থির হয়ে ছিলো। শ্রীরাম তার চারাগাছের কাণ্ড দিয়ে তৈরি মাদুরটি বের করে এনে বিছিয়ে তার উপর শুয়ে পড়লো, আর পত্রিকার শুধু সব বাসি খবর পড়ায় নিমগ্ন হলো না সব কৌতুক, টুকিটাকি খবর এবং নিচের কলামে ভরে যাওয়া সিন্ডিকেটেড কার্টুনেও নিমগ্ন হলো। মহাসড়কে সে পত্রিকাটি কুঁড়িয়ে নিয়েছিলো যখন সোলুর গ্রাম থেকে অভিযান শেষে ফিরছিলো। পত্রিকাটি মহাসড়কের ওপারে উড়ে গিয়ে একটা গাছের কাণ্ডে লেগেছিলো। গাছের কাণ্ড থেকে পাতাগুলো আলগা করে নিয়ে টর্চ জ্বালিয়ে দেখেছিলো যে সেটি অদেশিয় পত্রিকা ছিলো যা প্রতিক্রিয়াশীল মতবাদ ও গান্ধীজীর নিন্দা করার জন্য সুবিদিত ছিলো। কিন্তু তারপরও তাতে রোববারের পড়ার মতো মজাদার কিছু ছিলো। কিছুক্ষণের জন্য সে বিরক্ত বোধ করলো এই ভেবে যে কেউ এমন একটা সাম্রাজ্যবাদী পত্রিকা এ অঞ্চলে ছড়িয়ে রাখতে পারে, কিন্তু সে সাবধানে ভাঁজ করে সেটি তার ব্যাগে রেখেছিলো। যখন তার মনে হলো যে ঢালের পর ঢাল জুড়ে বিশাল সেগুন গাছগুলো ও বাঁশঝাড়গুলো এবং এস্টেটের গাছগুলো তার মনটাকে নষ্ট করে দেবে, তখন সে কিছু সময় চরম বিরক্তির শিকার হয়েছিলো। সেগুলো তার স্নায়ুকে দুর্বল করায় সে প্রতিবাদে জোরে চিৎকার করতে চাইছিলো। বিরক্তি কাটাতে একবার সে নিজে নিজে জোরে কথা বলতে চেষ্টা করেছিলো । নিজেকে প্রশ্ন করেছিলো, ‘এই, তুমি এখানে কী করছো?’ আর নিজেকে বলেছিলো, ‘দেশের জন্য লড়াই করছি।’ ‘এটা কী ধরণের লড়াই? তোমাকে তো ভবঘুরের মতো দেখাচ্ছে, ইউনিফর্ম নেই, অস্ত্র নেই, আর দৃশ্যত কোনো শত্র“ নেই, কী ধরণের লড়াই এটা? মস্করা করছো নাকি?’ আর সে জোরে জোরে হাসছিলো, ‘ওহ্ , ওহ্ , ওহ্ !’ পাহাড়গুলো তার কণ্ঠের প্রতিধ্বনি না করা পর্যন্ত সে তার কণ্ঠের উচু গ্রামে কথা বলছিলো, আর নিকটবর্তী গাছে বসে থাকা দু’একটা পাখি ভয়ে উড়ে গিয়েছিলো। এই উচ্ছ্বাসে তার মন অনেকটা হালকা হয়েছিলো। এখন সে আশা করলো পত্রিকার এ পাতাটি দিয়ে বিরক্তি কাটিয়ে তুলবে। গাছের ঐ সব মগডাল ও উপত্যকা অবিরামভাবে দেখার পরিবর্তে এখানে অন্তত পড়ার মতো কিছু ছিলো। এখানে থাকাটা তার ভাগ্যে ছিলো। এর বিরুদ্ধে সে যেতে পারলো না। মাদুরে গা সটান করে সে শুয়ে পড়লো। তার কোচের পিছন দিকটায় ঠেকনা দেওয়ার জন্য সে একটা পাথরের ব্লক গড়িয়ে দিয়েছিলো। এ ব্লকটিকে দু’দিন আগে ঘাস ও আগাছায় পড়ে থাকা অবস্থায় সে পেয়েছিলো, এবং কষ্ট করে সরিয়ে নিয়েছিলো। এতে তার এক ঘন্টা লেগেছিলো। পাথরটির উপরে ক্ষয়ে যাওয়া অক্ষর ও অলঙ্কার খোদাই করা ছিলো। সে জল্পনা-কল্পনা করতে লাগলো এগুলোর তাৎপর্য্য কী হতে পারে, এগুলো গোল গোল অক্ষর ছিলো যা পরিচিত দেখাচ্ছিলো, কিন্তু পড়া গেলো না; হয়তো ইতিহাসের বইয়ে পাওয়া কোনো রাজা বা সম্রাট কিংবা অত্যাচারী কেউ হাজার হাজার বছর আগে কোনো বার্তা খোদাই করেছিলো। ইতিহাসের বইয়ে তো বদমায়েশ চরিত্র দিয়ে ভরা, শ্রীরামের মতে। সে প্রায়ই ভাবতো পড়ে এবং দুইপাশে গোঁফওয়ালা গুণ্ডাদের বিষয়ে কাউকে প্রশ্ন করে কোন্ ভাল উদ্দেশ্য সাধিত হতে পারতো? পাথরের ব্লকটিতে গা এলিয়ে দিয়ে সে ভাবলো যে সে যদি তার স্বাভাবিক পরীক্ষাগুলো অন্তত পাস করতো, তাহলে এখনকার এই জীবনে জড়িয়ে পড়ার তার কোনো দরকার হতো না। কোনো এক অফিসে ভাল স্বভাবের এক কেরানী হিসেবে আসন করে নিতে পারতো যেমনটা তার বন্ধু, প্রসন্ন করেছিলো। এইতো গতকালই সে চ্যাম্পিয়ন স্ট্রীট ফুটবলার হয়েছিলো, কিন্তু সে ইতোমধ্যেই লাগামে বন্দী হয়েছে, দিনে কয়েক ঘন্টা কোষাগার টেবিলে দাসবৃত্তি করতে হয়। পুরানো সেই পাথরটায় আরামদায়কভাবে গা এলিয়ে দিয়ে সে একটা কৌতুক পড়লো যাতে ‘একটা ছেলে’ ও ‘একটা মেয়ে’র চার লাইনের একটা সংলাপ ছিলো: ‘কখন আমি টাই চাপ দিয়ে লাগিয়ে দেবে?’ এতে মেয়েটি চটপট উত্তর দিলো: ‘ওটা নামিয়ে আনার ঠিক এক ঘন্টা পর।’ শ্রীরাম এটি বারবার পড়লো, আর বিরক্তি বোধ করলো। এর মধ্যে কৌতুকটা কী ? এর মধ্যে হাসি কোথায়? সে ভাল করে খুঁটে খুঁটে এটা দেখলো, কিন্তু এর মধ্যে কোনো অর্থ উদ্ধার করতে পারলো না। এর সাথে ছিলো দেখতে অদ্ভূত এক দম্পতি, কোমরের দিকটা মোটা। শ্রীরাম ভাবলো: ‘কেউ বলতে পারে না ইংরেজরা কোন রস উপভোগ করবে!’ কাগজটা সে দূরে রাখলো, আর এর মুড়িটা বাতাসে খস খস করে উঠলো। এখন যেন সে তার প্রিয়ার গোঁড়ালির শব্দ শুনলো, আর সেখানে সে নিচেই ছিলো। ভারতী অর্ধেক মাইল দূর থেকে রাস্তায় আসছিলো। তাকে কখনোই এত বেশি স্বাগতম জানানো হয়নি। শ্রীরাম উঠে গিয়ে উম্মত্ত আনন্দের চিৎকারে তার কাছে ছুটে গেলো। সে দেখলো ভারতী যেন দেবদূতের মতো তার বিরক্তি দূর করতে এলো। ভারতীর হাতে যথারীতি একটা ব্যাগ ছিলো, আর সে এমন আশ্বাস ও সুখ নিয়ে সদর্পে হাঁটছিলো। মোড় নেওয়ার সময় শ্রীরাম যখন তার সাথে প্রথম কথা বলেছিলো তখন ভারতী অবাক হয়েছিলো। ‘হ্যালো!’ তার কণ্ঠের উচুগ্রামে সে চিৎকার করে বললো: ‘এই তো আমার দেবী এসেছে!’ ভারতী তার পদক্ষেপ ধীর করে বললো: ‘তোমার কী হয়েছে? কেউ আমাদের দেখলে কী ভাববে!’ ‘আমাদের দেখে ভাবার মতো কে আছে?’ উদ্ধতভাবে শ্রীরাম জিজ্ঞেস করলো। ‘বিশাল এক জনতা যেন চারিদিকে ছোটাছুটি করছিলো!’ তার নিঃসঙ্গ থাকার সমস্ত বিষ অনুভব করে সে এ অভিব্যক্তি দিলো। ভারতী শ্রীরামের কণ্ঠের এই তিক্ততা ধরে ফেললো, কিন্তু সেটা বরং উপেক্ষা করতেই অধিকতর পছন্দ করলো। ‘কী চাই তোমার? সবসময় তোমার চারপাশে বড় একটা মেলা?’ হাঁটতে হাঁটতে ভারতী হালকা মনে বললো। শ্রীরাম জিজ্ঞেস করলো, ‘কোথায় যাচ্ছো? ‘তোমার সাথে দেখা করতে।’ ‘এই তো আমি!’ ‘এখানে তোমার উপস্থিতি অফিসিয়ালভাবে আমি নেবো না, কিন্তু তুমি আমার কাজের বর্ণনা শুনতে চাইলে আমি তা বলে ফিরে যাবো। তোমার জন্য চমৎকার এক সংবাদ নিয়ে এসেছি।’ ‘কী সেটা?’ তাকে অনুসরণ করে শ্রীরাম উদ্বেগের সাথে চিৎকার করে বললো। ভারতী চলতে চলতে বললো, ‘তোমার নিজের জায়গায় এসে তা শোনো।’ শ্রীরাম তার নিজের জায়গায় ভারতীকে মাদুরটি আনুষ্ঠানিকভাবে দেখিয়ে তাকে আরাম করে ব্লকটিতে গা এলিয়ে দিতে বললো। ভারতী তার কথা শুনলো। পা সটান করে পাথরটিতে সে গা এলিয়ে দিলো, আর তার শরীর যখন শ্রীরামের মধ্যে বন্য আবেগ জাগাচ্ছিলো, তখন ছোট্ট ব্যাগ থেকে চিঠিটা বের করে সে শ্রীরামকে দিলো। ‘এই নাও বাপুর কাছ থেকে তোমার চিঠি। কেমন লাগছে?’ শ্রীরাম চিঠিটা পড়ে ভাবতে থাকলো। পেঁচা ডাকছিলো, আকাশ অন্ধকার করে এসেছিলো; ঝিঁ ঝিঁ পোকা অন্ধকার ঝোঁপের মধ্যে শব্দ করছিলো। শ্রীরাম তার পাশে মাদুরে বসলো। তার পরনের খদ্দের শাড়ির নিচে বাম স্তনটি নড়তে দেখতে পেলো। মনে হলো, যে অনুভূতি ভারতী শ্রীরামের মধ্যে জাগ্রত করছিলো তা সম্পর্কে সে অসজাগ ছিলো। ভারতী বললো, ‘এর মানে কি তুমি জানো? বাপু চান এখানে থেকে তুমি তোমার কাজ করে যাও। তিনি মনে করেন এখানে তোমার কাজটা খুবই ফল দিচ্ছে এবং তোমাকে সেটা চালিয়ে যেতে হবে।’ ‘তুমি কী করে জানো যে তিনি অন্য কিছু না বুঝিয়ে এটাই বুঝিয়েছেন?’ ‘আমি জানি কারণ তিনি যা লেখেন তা পড়ে আমি বুঝতে পারি।’ ‘তিনি যা লেখেন তা আমিও পড়তে পারি, ’ অনর্থক দম্ভে শ্রীরাম বললো। ‘তাকে কি তুমি কিছু লিখেছিলে?’ ভারতী জিজ্ঞেস করলো। জেরা করাটাকে শ্রীরামের ভাল লাগলো না। ‘হয়তো লিখেছি, হয়তো বা লিখিনি,’ কণ্ঠে উষ্মা নিয়ে সে বললো। ‘রাগ করছো কেন? পরের বার আমি বাপুকে লিখবো যে তুমি খুব রাগী মানুষ।’ জবাবে শ্রীরাম তার উপর নিজেকে আকস্মিকভাবে ফেলে দিয়ে অস্ফুটভাবে বললো, ‘তুমি শুধু তাকে লিখবে যে আমরা বিয়ে করেছি।’ কোনো পূর্বপরিকল্পনা ছাড়াই এটি হলো, আর এতে ভারতী প্রায় অভিভূত হলো। শ্রীরাম তাকে মুক্ত হওয়ার সুযোগ দিলো না। পাগল হয়ে সে তাকে লৌহকঠিন বন্ধনে আবদ্ধ করলো। তার অঙ্গ-প্রতঙ্গ সে দেখতে পেলো না। সময়টা ছিলো অন্ধকার। তার মুখের কাছে শ্রীরাম ভারতীর নিঃশ্বাস অনুভব করলো যখন ভারতী বললো, ‘না, এ হয় না, শ্রীরাম।’ শ্রীরাম বিড়বিড় করে বললো, ‘হ্যাঁ, এ হয় না। এখন তোমার আমার বিয়ে কেউ ঠেকাতে পারবে না। এভাবেই দেবতারা বিয়ে করে।’ তার বাহুতে ভারতীর বেণীর ভার ভালই লাগছিলো। তার গালদুটোতে চন্দন সাবানের গন্ধ ছিলো। তার গলায় সে চুমু খেলো। তার শরীরের চন্দনের গন্ধে শ্রীরাম আনন্দ উপভোগ করছিলো। ‘তুমি মিষ্টি গন্ধী,’ শ্রীরাম বললো। ‘আমি তোমার দাস হবো। তোমার জন্য আমায় যা যা করতে বলবে আমি তা-ই করবো। পৃথিবীর সব জিনিস তোমাকে কিনে এনে দেবো।’ নির্বোধের মতো সে আচরণ করলো। তার কবজায় ভারতী কিছুক্ষণ মোচড়ালো এবং একই সাথে শ্রীরামের আদরে সাড়া দিলো বলে মনে হলো। শ্রীরাম তার মাথা ভারতীর বুকে রেখে নীরব রইলো। তার মনে হলো যে এই মুহূর্তে কোনো কথা বলা অসম্মান হবে। পুরো অন্ধকারের রাত ছিলো। গাছগুলো খসখস করছিলো, ঝিঁ ঝিঁ পোকা ও রাতের পোকামাকড় অবিরাম ডাকছিলো। তারা ও জোছনা সম্পর্কে শ্রীরাম কিছু বলতে চাইলো, কিন্তু মনে হলো মুখে কথা আটকে গিয়েছিলো। এখন শুধু যে জিনিসটায় কাজ হতো বলে মনে হলো তা ছিলো শ্রীরামের কাছে তার উষ্ণ নিঃশ্বাস ফেলানো শরীর। শ্রীরাম বিড়বিড় করে বললো: ‘আমি সবসময় এটা জানতাম। তুমি আমার বউ।’ তার কবজা থেকে হালকা মুক্ত হয়ে ভারতী বললো, ‘এখনো নয়। বাপুর অনুমোদনের জন্য আমাকে অবশ্যই অপেক্ষা করতে হবে।’ ‘কী করে তা পাবে?’ ‘কাল তার কাছে লিখবো।’ ‘তিনি যদি সায় না দেন?’ ‘তাহলে অন্য কাউকে বিয়ে করবে।’ ‘তুমি কি আমাকে পছন্দ করো না? আমাকে বলোÑÑ আমাকে বলোÑÑ’ উত্তেজিত হয়ে শ্রীরাম বললো। ভারতী শ্রীরামের দেহকম্পন অনুভব করে বললো: ‘পছন্দ না করলে আমি এখানে আসতাম না বা তোমার সাথে দেখা করতাম না।’ ‘মহাত্মাজী কি জানতো না?’ ‘না, তাঁর মন এতোই নিখাদ যে অন্যায় কিছুর কথা তিনি ভাবতেই পারেন নাÑÑ’ ‘কী অন্যায়?’ ‘এইটা অন্যায়ÑÑআমাদেরÑÑআমাদের উচিৎ ছিলো নাÑÑআমারÑÑআমারÑÑ’ ভারতী ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদলো। ‘আমি জানি না বাপু আমার সম্পর্কে এখন কী ভাববে। যা ঘটেছে তা তাকে অবশ্যই ÑÑআমাকেÑÑলিখতে হবে। শ্রীরাম তাকে কখনোই এতো মেয়েসুলভ ও অবলা হিসেবে দেখেনি। সে ক্ষণকাল সন্তুষ্টি বোধ করলো যে সে তার দর্প চূর্ণ করেছে, তার বিক্ষিপ্ততা দমন করেছে। আক্রমণাত্মকভাবে সে বললো: ‘বাপু কিছুই বলবেন না। তিনি বুঝবেন। তিনি মানুষের অনুভূতি জানেন, কাজেই চিন্তা করো না। প্রেমে অন্যায় কিছু নেই। তুমি ও আমি বিয়ে করেছি।’ ‘কবে?’ ‘প্রথম যেদিন তোমাকে দেখেছি সেদিন।’ ‘ওটাই যথেষ্ট নয়। বাপুর অনুমোদন ছাড়া আমি বিয়ে করতে পারি না।’ ইতিবাচক ও গতিশীল হলো শ্রীরাম। শপথ করলো: ‘আমরা এক্ষুণি বিয়ে করবো।’ হাত ধরে তাকে টেনে নিয়ে ভেতরের ব্যক্তিগত কক্ষে গেলো। এটা সেটা করতে ব্যস্ত হয়ে সে এখানে সেখানে ছুটলো। বাতিটা জ্বালিয়ে নাক ও হাতভাঙ্গা মূর্তিটার সামনে রাখলো, কিন্তু চোখদুটো এখনো দীপ্তি ছড়াচ্ছিলো। দৌড়ে বাইরে গিয়ে কয়েকটা পাতা ও ফুল নিয়ে সে ফিরে এলো, আর পেডেস্টালের পাদদেশে রেখে দিলো। চরকা থেকে একটা সুতা নিয়ে সে বললো, ‘এর থেকে পবিত্র মঙ্গলসূত্র তুমি আর পাবে না, এই দেবতার থেকে পবিত্র যাজকও তুমি পাবে না।’ সুতাটা তার গলায় পরিয়ে দিতে গেলে ভারতী তার কাছ থেকে নিজেকে হালকা সরিয়ে নিলো। ভারতীর কণ্ঠে আকস্মিক দৃঢ়তা ভর করে বসলো যখন সে বললো: ‘এটা জেনে রেখো, শ্রীরাম। তোমাকে যদি বিশ্বাস না করতাম, তাহলে বারবার এখানে আমি আসতাম না।’ সে কেন এমন কথা বললো শ্রীরাম তা বুঝলো না। সে হতভম্ব হলো। এরকম করে সে কথা বলছিলো কেন? হয়তো হঠাৎ তার মনে হলো যে গোর্পদ অথবা অন্য কাউকে তার বিয়ে করা উচিৎ। হ্যাঁ, এখন তার মনে ঝলকে উঠলো যে তার ও গোপর্দের মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ দৃষ্টি বিনিময় হতো। কী ধরণের মানুষকে বিয়ে করবে, ইমারি কাগজের মতো রাফ! এক চোট ঈর্ষা কিছুক্ষণ তাকে ঝাঁকিয়ে দিয়ে গেলো, আর সে বললো, ‘এই দেবতার সামনে তুমি কি শপথ করবে যে তুমি শুধু আমাকেই বিয়ে করবে।’ ‘হ্যাঁ, যদি আদৌ বিয়ে করি, আর মনে রেখো, যদি বাপু এতে সায় দেন।’ ‘বাপু! বাপু!’ এটা তাকে হতাশায় ভরিয়ে দিলো। বিলাপ করে সে বললো: ‘তিনি এত বড় যে আমাদের তিনি পরোয়া করবেন না। আমাদের বিষয় নিয়ে তাকে জ্বালাতন করো না।’ ভারতী বললো, ‘আমি বিয়ে করবো না তিনি যদি সায় না দেন। আমি তা করতে পারি না।’ ‘অন্য কাউকে বিয়ে করতে বললে, ’ শেষ মুহূর্তে ‘গোর্পদ’-এর নামটা চেপে রেখে করুণভাবে সে জিজ্ঞেস করলো। ‘আমার জন্য ছেলে খোঁজার চেয়ে বাপুর আরো ভাল কিছু করার আছে,’ দ্ব্যর্থহীন ও স্পষ্টভাবে সে জানিয়ে দিলো। শ্রীরাম কিছুক্ষণ চোখ পিটপিট করলো। উত্তেজনায় তার গলা শুকিয়ে আসছিলো। আবার সে কিছু একটা জিজ্ঞেস করতে চাইলো। কিন্তু তার এই বিভ্রান্ত অবস্থায়ও সে সচেতন ছিলো যে সে বার বার একই কথা বলছিলো। করুণভাবে চোখের পাতা ফেললো। ভাঙ্গা বাহুর দেবতাটি তাকিয়ে রইলো। এমন নিস্ফল প্রেমের জন্য সে কখনো দর কষাকষি করেনি। এর শুরু তার অনুভূত চেতনা থেকে যে পরের মুহূর্তে সে দিব্যানন্দে নিক্ষিপ্ত হবে, কিন্তু এখানে সে অচল এক দেবতার সামনে দাঁড়িয়ে ছিলো আর দুর্বোধ্য কথা শুনছিলো। মেয়েটি হয়তো তাকে বোকা মনে করবে তাদের মধ্যে এতটা ফাঁকা জায়গা রাখার জন্য। আবার তার কাছে গিয়ে ঝড় বয়ে আনার চেষ্টা করে, যা সে কিছুক্ষণ আগে করেছিলো , তা পুষিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করলো। প্রথমবার আকস্মিক ভাবাবেগের সুযোগ ছিলো তার। কিন্তু এখন তাতে কাজ হলো না। তার প্রসারিত বাহুকে ভারতী এক ঝটকায় নামিযে দিলো: ‘না। আর আমাকে স্পর্শ করবে না।’ ভারতী এমন কর্তৃত্ব নিয়ে বললো যে শ্রীরাম নিজেকে বোকার মতো বোধ করলো। ‘তুমি না চাইলে আমি তা করতে চাইনি। আমি জানি তুমি আমাকে ঘৃণা করো, ’ শিশুর মতো করে শ্রীরাম বললো। ভারতী শুধু বললো, ‘আমি কেন তোমাকে ঘৃণা করবো?’ ‘কারণ তোমাকে জ্বালাচ্ছি।’ ‘কীভাবে?’ ভারতী জিজ্ঞেস করলো। ‘বলেÑÑ আমাকে বিয়ে করতে বলে। এ তো অন্যায়, হয়তো অন্যায়।’ ‘বাপু রাজী থাকলে অন্যায় হবে না।’ সে মেনে নিলো। ‘ঠিক আছে, ’ বললো। ‘তোমার যেমন খুশিÑÑ’ ‘আমরা বিয়ে করবো, ’ ভারতী বললো, ‘ঠিক যে মুহূর্তে বাপু মত দেবেন।’ সে অনেকটা বিবেচক হলো। শ্রীরামের মনে হলো তাকে আবার জিজ্ঞেস করার সময় হলো: ‘তুমি কিÑÑ আমাকে পছন্দ করো?’ ‘হ্যাঁ, যখন তুমি খারাপ আচরণ করছো না।’ ** হতোদ্যম ও উৎকণ্ঠার দিন শুরু হলো। বেশ কিছুদিন ভারতীর দেখা পেলো না সে। সে ভাবলো তাকে চিরদিনের জন্য সে হারিয়ে ফেলেছে। এতে সে এতই অবশ হলো যে কুটিরের সামনে বসে থেকে রাতে যা যা ঘটেছিলো সেসব মনে করা ছাড়া সারা দিন সে কিছুই করলো না। তার স্বাভাবিক বক্তৃতা দেওয়া, আন্দোলন, ও বিক্ষোভ প্রদর্শন Ñ সবকিছু সে বাদ দিলো; দেশের প্রতি কর্তব্যের কথা ভাবছিলো বলে মনে হলো না। খাওয়া-দাওয়া করে সারাদিন তার গুহায় সে রইলো, ‘একটা ছেলে’ ও ‘একটা মেয়ে’ সম্পর্কে কৌতুকটা সে ইতোমধ্যে দুইশো বার পড়েছিলো। ট্রেন আসতে যেতে সে দেখলো। ডাকপিয়নকে বোল্ডারে থেমে এস্টেটের দিকে চলে যেতে দেখলো। কোণার পাথরটায় আরাম করে বসে সে অবিরাম চিন্তা করতে থাকলো। মোটের উপর একদিন ভারতী উপস্থিত হলো। দুপূর বেলা এলো। যে সে সন্ধ্যা এড়িয়েছিলো সেটা গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে হলো । মোড়ে যখনই শ্রীরাম তাকে দেখতে পেলো, তখনই আনন্দের চিৎকারে জানতে চাইলো, ‘ নিরাপদ সময় বলে এখনই আসছো নাকি? কিন্তু সে নিজেকে সংযত করলো। রাস্তার মোড়টিতে তার সাথে দেখা করার জন্য সে দৌড় দিলো। জিজ্ঞেস করলো: ‘খবর কী?’ তাদের জায়গায় না যাওয়া পর্যন্ত ভারতী কথা বললো না। বসে পাথরটাতে হেলান দিয়ে নিজের ব্যাগ থেকে ভারতী একটা চিঠি বের করলো। ক্ষুধার্তের মতো শ্রীরাম সেটা ছিনিয়ে নিয়ে দ্রুত চোখ বুলালো: ‘আশীর্বাদপ্রাপ্ত, এখনই নয়...। সব কর্মীকে জিজ্ঞেস করবো তারা বেরিয়ে আসার জন্য আন্ডারগ্রাউন্ডে আছে কিনা। আমি চাই নিকটতম থানায় তুমি আত্মসমর্পণ করো। তোমার শিষ্যকেও সাথে নিয়ে যেও। ভগবান তোমাদের দু’জনের মঙ্গল করুক।’ শ্রীরাম অবাক হলো। তাৎপর্য্য বোঝার চেষ্টা করে সে বারবার চিঠিটা পড়লো। সে ব্যাখ্যা করতে চেষ্টা করলো। তিনি বলেছেন ,‘ “এখনই নয়,” এর মানে কী?’ ‘তিনি সেটাই বোঝাতে চেয়েছেন, অন্যকিছু নয়, ’ ভারতী উত্তর দিলো। ‘বাপুজী যা বলেন তা বোঝা কখনই কঠিন নয়।’ মেয়েটির দৃঢ়তা ও স্থৈর্যে শ্রীরাম হতবাক হলো। মনে হলো তার কোনো অনুভূতিই ছিলো না। এমন উদাসীনভাবে সে এ ব্যাপারে কথা বললো। তার স্থৈর্যে শ্রীরাম আতঙ্কিত হলো। মেয়েটি হয়তো স্বস্থি বোধ করছিলো যে বাপুজী তাদের পরিকল্পনা না করে দিয়েছে। এটা তাকে খুবই মানিয়েছিলোÑÑ গোপর্দ। আর অবশ্যই অসুস্থ কল্পনায় শ্রীরামের মনে হলো মহাত্মাজীও হয়তো গোপর্দের পক্ষেই ছিলো, তার সাথে গোপর্দের মতো ভয়ানক ও ধুলিশুষ্ক কর্মীর সাথে বিয়ে হোক তা-ই তিনি বেশি চাইবেন। কিন্তু ভারতী তার সাথে সরাসরি কথা বলছে না কেন?’ ‘তুমি সরাসরি কথা বলতে পারো না?’ হঠাৎ করে শ্রীরাম তাকে জিজ্ঞেস করলো। ‘কী বলতে চাচ্ছো?’ শ্রীরামের মুখ দিয়ে জবাব বের হলো না। জিজ্ঞেস করলোা: ‘বাপু কেন চান না আমাদের বিয়ে হোক?’ ‘তিনি তো সে কথা বলেন না।’ শ্রীরাম দীর্ঘশ্বাস ফেললো: ‘আমি ভেবেছিলাম তিনি আমাদের আশীর্বাদ পাঠাবেন, কিন্তু তিনি তো শুধু আমাদের কর্মসূচী বাতিল করেছেন।’ নিজের হতাশায় সে গোটা জগতের ক্ষত অনুভব করলো, বাপুকে বাদ দিয়েও নয়। হঠাৎ সে ভারতীকে জিজ্ঞেস করলো: ‘আমাদের যে বিয়ে হয়নি তাতে তোমার হতাশ লাগছে না?’ ‘ভাবার মতো আমার অন্য অনেক কিছু আছে,’ ভারতী বললো। ‘ওহ্ !’ শ্রীরাম গুরুত্বপূর্ণভাবে বললো। ‘সেগুলো কী হতে পারে?’ ‘জেলে যাবো...।’ পুরো ব্যাপারটার তাৎপর্য্য এখন তার মনে উম্মোচিত হলো। সে চিৎকার করে বললো, ‘ভারতী, তুমি তো তা করতে পারো না, তুমি কী বলতে চাচ্ছো?’ ভারতী জবাব দিলো, ‘তোমাকেও আসতে হবে...।’ চিঠিটা খুলে সে আবার চোখ বুলালো। ‘জেলে কী নিয়ে ব্যস্ত থাকবো বাপু সে ব্যাপারেও নির্দেশনা দিয়েছেন। “তোমার নতুন কোনো ভাষা শেখার এই সুযোগ। আশা করি কোনো সাহায্য ছাড়াই তুমি তুলসী দাসের রামায়ণ পড়তে পারবে; তুমি তো হিন্দি ভাল বলতে পারো, কিন্তু তোমার সাহিত্য চর্চাও একইভাবে ভাল হবে। তোমাকে সুযোগ-সুবিধা দেওয়ার জন্য জেল সুপারিন্টেডেন্টকে বলে দেখতে পারো যদি তুমি চরকা সাথে নেওয়ার মতো বি শ্রেণীতে পড়ো। আমি শুনতে চাই যে তুমি জেলে তোমার ভাগের সুতা তৈরি করবে। মুহূর্তের জন্যও কখনো ভেবো না যে তোমার সময় নষ্ট হচ্ছে। যেখানেই তুমি এক কপি রামায়ণ ও গীতা এবং চরকা নিয়ে যাবে, সেখানেই ব্যস্ততার মধ্যে তোমার সময় কাটবে। যাহোক, তোমার স্বাস্থ্যের দিকে নজর রেখো। খুবই হালকা ব্যায়াম দরকার হতে পারে, অনুমতি থাকলে চত্বরে হেঁটে সেটা করতে পারো...। আর বি শ্রেণীতে না থাকলে অন্যদের মতো সাধারণ শ্রেণীর বন্দী হিসেবে থাকতে চাইলে সেটা তোমাকে চেয়ে নিতে হবে। তোমাকে যা যা বললাম তা তোমার শিষ্যের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য।” ’ শ্রীরাম অনুনয় করে বললো, ‘বলো না, দয়া করে বাপুকে বলো না...’ ভারতী তার দিকে বিস্ময়ে তাকালো, ‘এতগুলো মাস এক সাথে থেকে কাজ করার পর এরকম করে তুমি কথা বলতে পারলে? বাপুজী আমাদের যা করতে বলেন তা ব্যতীত কী করে আমরা অন্য কিছু করতে পারি?’ শ্রীরামের দেওয়ার মতো কোনো অকাট্য জবাব ছিলো না। সে মাথা নিচু করে রাখলো। কিছুক্ষণ মনে হলো সে ভুলে গেছে যে সে মুক্তির লড়াইয়ের একজন সৈনিক ছিলো। ভারতী দৃঢ়প্রতিজ্ঞ হয়ে বললো, ‘এর মধ্যে আমাকে সেখানে থাকা উচিৎ ছিলো। থানায় হাজিরা দিতে যাচ্ছি...’ ‘তারা তোমাকে কতদিন জেলে আটকে রাখবে?’ শ্রীরাম করুণভাবে জিজ্ঞেস করলো। ‘আমি কী করে বলতে পারি?’ ভারতী জবাবে বললো। ‘তুমিও আসছো না?’ শ্রীরাম বললো, ‘এখন নয়। আরো ভাবতে চাই। কিন্তু আমি এক্ষুণি আসবো যদি তারা আমাকে একই কারাগারে রাখে আরো ভাল হয় যদি একই কক্ষে রাখে।’ ‘তা সম্ভব হবে না, সরকার আমাদের একসঙ্গে রাখবে না, ’ ভারতী বললো। শ্রীরাম এতে রেগে গেলো। মনে হলো সমস্ত মহাবিশ্বটা তার উদ্দেশ্য পূরণে বাদ সাধতে সংগঠিত হয়েছিলো, এমনকি যে সরকার মহাত্মার সাথে বিভিন্ন বিষয়ে ভিন্ন মত পোষণ করতো সেও মনে হলো যেখানে তার এবং ভারতীর বিষয় জড়িত সেখানে একমত। সবচেয়ে খারাপ দিক ছিলো যে ভারতী নিজেই মনে হলো এ আয়োজনে আনন্দ লাভ করছিলো। শ্রীরাম এ ভেবে উম্মত্ত হয়ে বললো, ‘তোমার জন্য আমার ভালবাসাকে সবাই কেন বিরোধিতা করে?’ ভারতী তার প্রতি দয়াপরবশ হয়ে মৃদুভাবে বললো, ‘বোকা কোথাকার। তোমার মাথা পুরো নষ্ট হয়ে গেছে।’ ‘চিৎকার করে তোমার কোনো লাভ নেই, ’ ভারতী বললো। ‘আমাদের ঝগড়া করা যাবে না। কিছুক্ষণের মধ্যে আমি চলে যাবো... চারটা বাজার আগে আমাকে হাজিরা দিতে হবে। কেন্দ্রীয় বা অন্য কোনো জেলে আমাকে পাঠাতে চাইলে তাদেরকে সন্ধ্যার ট্রেন ধরার সময় অবশ্যই দিতে হবে।’ ‘তোমাকে ছাড়া আমি কী করবো?’ শ্রীরাম বিলাপ করলো। ‘সে জন্য বাপু তোমাকেও হাজিরা দিতে বলেছে।’ সে মাথা নাড়ালো। ‘বাইরে আমার অনেক কিছু করার আছে... নিজের মতো করে সত্যাগ্রহ চালিয়ে যেতে বাপু সবাইকে স্বাধীনতা দিয়েছেন। তিনি কিন্তু আমাকে বোঝাননি,’ শোকের সাথে শ্রীরাম বললো। জবাবে ভারতী চিঠিটা লুফে নিয়ে শ্রীরামের নাকের নিচে খুলে ধরলো। ‘ “তোমার শিষ্যের ক্ষেত্রেও তা প্রযোজ্য,” তিনি বলেন।’ ‘কিন্তু তার মানে তো আমি নই। এর মানে যে কেউ হতে পারে,’ শ্রীরাম বললো। ‘আমি ভাবতাম তিনি সবসময় বুঝতেন “শিষ্য” দ্বারা তিনি কাকে বুঝাতেন,’ ভারতী ভয়ানকভাবে বললো। ‘কোনটা বেছে নেবে সেটা সবসময় তোমার ব্যাপার। তোমার যা সর্বোত্তম মনে হয় তা-ই করতে পারো। যা সঠিক বলে আমার মনে হচ্ছে আমি তা-ই করতে যাচ্ছি।’ ‘তুমি কী করে জানো যে করার মতো এটাই সঠিক কাজ?’ ‘ও প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার দরকার নেই আমার,’ বিরক্ত হয়ে ভারতী বললো। ‘আমি যদি জানতাম যে বাপুজীর কথা তুমি এত হালকাভাবে নেবে, তবেÑÑÑ’ তার কথার সুরে শ্রীরাম খুবই আহত হলো। ‘ওহ্ , ভারতী, আমাকে সম্পূর্ণরূপে ভুল বুঝে আমার জ্বালা আর বাড়িয়ো না। আমি মহাত্মাকে শ্রদ্ধা করি, তুমি তো জানো আমি শ্রদ্ধা করি। আমাকে সন্দেহ করছো কেন? তিনি যা যা বলছেন তার সবই কি আমি মেনে চলিনি?... নইলে আমি এখানে পড়ে থাকতাম না। আমার বাসার আরাম ফেলে আসতাম না। আমি যা চাই তা হলো এটা নিয়ে ভাবার জন্য আরো কিছু সময়। আমি...’ সে তার সেরা দৃষ্টান্তটি উৎসাহভরে উপস্থাপন করলো। ‘আমি শুধু ঠাকুরমার কথা ভাবছি। অবশেষে জেলে যাওয়ার আগে তাকে দেখতে চাই। সে জন্য তোমাকে জিজ্ঞেস করেছিলাম কতদিন আমরা জেলে থাকবো। তিনি খুবই বৃদ্ধা, তুমি তো জানো। তাকে একবার দেখে আমি আত্মসমর্পণ করবো। তাকে দেখার সুযোগ অবশ্যই বের করতে হবে।’ এ ধারণায় মেয়েটি নরম হলো বলে মনে হলো। পাথরের গায়ে হেলান দিয়ে সে আবার ভাবলো। ঠাকুরমার জন্য তার কোমল অনুভূতির সে প্রশংসা করলো মনে হলো। ‘ঠিক আছে, শ্রীরাম। আমি দুঃখিত যে তোমাকে ভুল বুঝেছিলাম।’ শ্রীরাম তার বাহু স্পর্শ করতে চাইলো, কিন্তু তা করতে তার ভয় হলো। ভারতী নিশ্চয়ই বলবে, ‘নিরাপদ দূরত্বে থাকো, যে পর্যন্ত না,’ আর সেটা শ্রীরামের আবার বিরক্তির কারণ হবে এবং তার ফলে বাজে বকবে। ভারতী উঠে দাঁড়ালো। শ্রীরাম জিজ্ঞেস করলো, ‘তোমাকে কি অবশ্যই যেতে হবে?’ ‘হ্যাঁ, আমার দেরি হয়ে গেছে।’ শ্রীরাম বিব্রত হয়ে তার পিছু পিছু গেলো, ‘জেল শেষে আমাদের আবার যখন দেখা হবে, আর যেখানেই আমাদের দেখা হবে... তুমি আমাকে ভুলে যাবে না তো?’ ‘তোমাকে ভুলবো না, ’ ভারতী হালকাভাবে নিঃশ্বাস ধরে বললো। যখন ভারতী উঠে দাঁড়ালো, তখন শ্রীরাম তাকে তার জীবনের যে কোনো সময়ের চেয়ে বেশি ভালবাসলো, কিন্তু যে কোনো সময়ের চেয়ে সে ভয়ও বেশি পেলো। সে শুধু বললো, ‘ভারতী তুমি রাগ না করলে, তোমাকে একটা কথা জিজ্ঞেস করতে চাই। ‘কী?’ থেমে তার দিকে তাকিয়ে ভারতী বললো। শ্রীরাম ভারতীর উপরের ঠোঁটে ঘামের বিন্দু খেয়াল করলো এবং তার আঙ্গুল দিয়ে সেগুলো মুছে দিতে চাইলো। এ ভেবে নিঃসঙ্গতা তাকে পেয়ে বসলো যে রাস্তার মোড়টিতে সে আর তাকে আসতে দেখতে পাবে না। সে বাহুতে তাকে আবদ্ধ করে তার কাছ থেকে ঝটিকা বিদায় নিতে চাইলো, কিন্তু এই জিজ্ঞেস করে তাকে তুষ্ট হতে হলো, ‘এ সব শেষ হয়ে গেলে তুমি কি আমায় বিয়ে করবে, কথা দাও, যদি বাপুজী অনুমতি দেন?’ হ্যাঁ, কথা দিচ্ছি...’ তার সাথে কথা বলা বা তাকে অনুসরণ করার আগেই ভারতী এই বলে দ্রুত চলে গেলো। শ্রীরাম যেখানে ছিলো সেখানেই দাঁড়িয়ে রইলো, আর জমে থাকা অশ্র“ মুছে ফেলার জন্য ভারতীকে তার হাত চোখ পর্যন্ত তুলতে দেখলো । ৩ একদিন জগদীশ নামে একজন এমনিতে এসে নিজেকে জাতীয় কর্মী হিসেব পরিচয় দিলো। সে বললো পেশায় ফটোগ্রাফার হিসেবে মালগুদিতে কাজ করে, আর দাবি করলো ভারতে ব্রিটেনকে অচল করে দেয়ার মতো সূত্র তার জানা আছে। মালগুদিতে তার স্টুডিওর ভেতরের দিকটা দেশের জন্য তাৎক্ষণিক স্বাধীনতা অর্জনে ইচ্ছুক লোকদের জন্য সভা স্থল হিসেবে কাজ করে। জগদীশ এলো কারণ শহরের বাইরে তার গোপন জায়গার প্রয়োজন ছিলো, আর তাই সে একটা জায়গা খুঁজছিলো যেখানে সে ছোট একটা রেডিও স্থাপন করতে পারে যার মাধ্যমে সাংকেতিক বার্তাও প্রেরণ করা যেতে পারে। কষ্ট করে পাহাড় বেয়ে বেয়ে সে এলো যখন শ্রীরাম তার পাথরটায় গা এলিয়ে ছিলো। লোকটি ফিতাওয়ালা ব্যাগ নিয়ে এসেছিলো, আর খাদি পোশাক পরেছিলো। শ্রীরাম পুরানো পত্রিকাটি পড়েই যাচ্ছিলো। তার জীবন থেকে ভারতীর প্রস্থানে একটা শূন্যতা সৃষ্টি হয়েছিলো, যা পূরণ করা তার কাছে কঠিন মনে হলো। এখন কী করবে সে ব্যাপারে সে কতকটা বিভ্রান্ত বোধ করলো। ফিতাওয়ালা ব্যাগটি নামিয়ে জগদীশ শ্রীরামের পাশে বসলো এবং জিজ্ঞেস করলো, ‘তুমি শ্রীরাম?’ ‘জ্বী।’ ‘আমি জগদীশ। ভারতীকেও আমি চিনতাম। আমরা কম-বেশি একই কাজ করছি।’ শ্রীরামের আলস্যভাবকে নাড়া দেওয়ার জন্য এই যথেষ্ট ছিলো। সে উঠে বসে লোকটিকে অনেক উষ্ণতা দিয়ে ব্যাপকভাবে স্বাগতম জানালো এবং জিজ্ঞেস করলো, ‘কোথায়, কোথায় সে?’ ‘ডিটেন্টশনে আছে... আমরা জানি না কোথায়, কিন্তু আমাদের একজন ছেলের সাথে তার দেখা হয়েছিলো পুলিশের কাছে আত্মসমর্পণের ঠিক আগে আগে।’ শ্রীরাম জিজ্ঞেস করলো, ‘সে লোকটি কোথায়?’ ‘সেও পুলিশের কাছে আত্মসমর্পণ করেছে; তার আগে সে এসে আমার সাথে দেখা করেছিলো।’ শ্রীরাম একই চিন্তা-চেতনার একজনকে পেয়ে খুশি হলো, আর তৎক্ষণাৎ সে তার কানে নিজের অনুভূতি বর্ষণ করলো। ‘ভারতীকে আমি বোকা না হতে বলেছিলাম...’ ‘ও কথা বলো না। এ বিষয়ে আমরা সবাই বিচার-বিবেচনা করে নিজের মতো করে কাজ করি। যারা মহাত্মাজীর আদেশ মান্য করতে পারে না, তারাই নিজেরা যা সর্বোত্তম মনে করে তা করার মতো স্বাধীন।’ ‘তুমি একেবারে ঠিক কথা বলছো,’ সঠিক কাজে মস্ত ভুল করেছে বোধ করে শ্রীরাম চিৎকার করে বললো। লোকটি বললো, ‘এটা এমন একটা যুদ্ধ যেখানে আমরা জড়িয়ে গেছি, আমরা অস্বাভাবিক সময়ের মধ্য দিয়ে যাচ্ছি, আর আমাদের যা সবচেয়ে ভাল মনে হয় তা-ই করি।’ লোকটি ফিতাওয়ালা ব্যাগটি খুলতে লাগলো। সব সময় ক্ষুধার্ত এবং একঘেয়ে খাবার খেতে খেতে বরং ক্লান্ত শ্রীরাম শিশুর মতো আশা করলো যে এ ব্যাগ থেকে চমৎকার কিছু বের হয়ে আসবে। আশা করলো চকলেট বা ফলমূল কিংবা বিস্কুট হবে। ওহ্ , কতদিন হয়ে গেলো বেশিরভাগ রোববারে তার ঠাকুরমার বানানো সাদা সাদা সেইসব স্পর্শকাতর ভাপা পিঠা সে খায় না। সে প্রায়ই জিজ্ঞেস করতো রোববারে কেন, অন্য দিন নয় কেন। এখন ব্যাগ থেকে জগদীশ চারপাশে মোড়ক খোলা ছোট একটি বাক্স এবং ছোট একটা রেডিও বের করলো। ‘এটি তোমাকে রাখতে হবে,’ লোকটি বললো। ‘এতে বার্তা পাঠানোও যায় আবার গ্রহন করাও যায়। এতদিন আমার স্টুডিওতে এটা ছিলো... কিন্তু আজকাল পুলিশ খুবই সতর্ক হয়েছে।’ সে দেবতার মূর্তির পেছনে এটি স্থাপন করে কিছু বাঁশপাতা দিয়ে ছদ্মবেশে রাখলো। তারপর থেকে দেবতা চোখবিহীন খালি গর্ত দিয়ে জগদীশকে অনেক দেখলো। সে ছিলো ছোট-খাট মানুষ। কাঁধ ঘিরে বাদামী আবরণে মোড়া ছিলো। উস্কোখুস্কো কোঁকড়ানো ছোট ছোট চুলের ছাঁট ছিলো যা তার কান পেরিয়ে কয়েক ইঞ্চি বের হয়ে মাটির সমান্তরালে ছড়িয়ে পড়েছিলো। মাঝখানে সিঁথি করে অনেকটা তেল মাখা ছিলো যাতে করে তার খুলির উপরের দিকটা চকচক করে, আর শ্রীরাম প্রায়শই দেখতো যে তার মাথা থেকে মধ্যাহ্ন সূর্য হাজার রঙে চকচক করে উঠছে। রঙ ছিলো কৃষ্ণবর্ণ ও বিশাল নাকটি ছিলো মোটা এবং গোলাকার, কিন্তু তার মধ্যে একটা আগুন ছিলো যা তার সামনের যে কোনো কিছুকে খেয়ে ফেলতে পারতো, আর শ্রীরাম তার বিরোধিতা করতে ভয় করলো। অবিশ্বাস্য মনে হলো যে ভারতীর মতো মার্জিত তন্বী এক সৈনিক ভাল্লুকের মতো দেখতে এই ব্যক্তিত্বের সাথে কখনো কথা বলেছে। তার মধ্যে এক ধরণের আকস্মিক ঈর্ষা ভর করলো । এমন কি হতে পারতো যে ভারতী তাকে বিয়ে করার চিন্তা কখনো করেছিলো? ভগবানই জানতেন চোখের আড়ালে লোকটি নিজের সাথে কী করেছিলো। ছবি তুলে কী করে তার চলতো? মাঝে মাঝে কয়েক দিন সে আসতো না, আর এলে ব্যাখ্যা করতো, ‘বিয়ের ঋতু, আপনি তো জানেন। আরো বোকারা বিয়ে করছে, আর তারা এসে ছবি তোলে। আমি তো সব কাজে ছাড় দিতে পারি না।’ অথবা ব্যাখ্যা করতো, ‘জুঁই ফুলের ঋতু, আর এ ঋতুতে ফটোগ্রাফারদের রমরমা অবস্থা। বেণীতে জুঁই ফুল বেঁধে কত মেয়ে আসেÑÑ ফটোগ্রাফারের জন্য সমস্যাটা হচ্ছে একই সাথে মেয়ের মুখের ও পিছনের জুঁই ফুলে ঢাকা মাথার ছবি তোলা। আর এটাই তাদের দাবি। খারাপ বিষয় হলো তাদের জুঁই ফুল পাছে বালিশে ঘষা লেগে নষ্ট হয়ে যায় সেজন্য তারা সারা রাত বসে থাকে। মিনিটে তাদের দুজন করে আসে। যখন তারা স্টুডিওর অন্ধকারে থাকে, তখন তাদের রাজনীতি খুঁজে বের করে তাদেরকে আমাদের সাইক্লোস্টাইলের সার্কুলার ও সর্বশেষ সংবাদ প্রদান করি। এ কাজে স্টুডিওটা এক ধরণের সাহায্য করে। কেউ সেখানে গেলে অন্য যে কোনো জায়গার চেয়ে বেশি সাড়া দেয়। লোকজন প্রফুল্ল মনে ফটোগ্রাফারের কথায় একমত হয়ে ও সাড়া দিয়ে এবং নাপিতের মতো ফটোগ্রাফার যা বলেন তা মনোযোগ দিয়ে শুনে সাধারণত স্টুডিওতে আসে। তাদের এ বোধ আছে যে অস্পষ্টভাবে ফটোগ্রাফারকে মেনে দ্রুত তার কথা শুনতে হয় তাদের। আর জাতীয় কাজে আমি সেটা কাজে লাগাই। সেজন্য স্টুডিওটা চালু রেখেছি, যদিও মালের সঠিক সরবরাহ ছাড়া কাজটা খুবই কঠিন। দেশ স্বাধীন হলে আমার যদি ওসবের সাথে সম্পর্ক থাকে, তবে দেখবে এখনকার যারা কালোবাজারী স্পুল সেইসব ভিক্ষুকদের কী করি!’ তাদের কথা ভাবতে ভাবতে সে দাঁত কিড়মিড় করলো। মন্দিরটিকে শীঘ্রই সে দূর্গে রূপান্তরিত করলো। ব্যাখ্যা করলো: ‘জানো এ জায়গাটার সুবিধা কী? কয়েকজন পুরাতত্ত্ববিদ ব্যতীত কেউ এর অস্তিত্ব জানে না। আর বাইরে থেকে এটা দেখাও যায় না। নানা দিক থেকে আমি এটি দেখেছি। নিচের রাস্তাটি থেকেও দেখা যায় না। ভাবছি কেন কেউ একজন এখানে কোনো মন্দির নির্মাণ করলো না। আমার বিশ্বাস হাজার বছর আগে য়ড়যন্ত্রকারীদের জায়গা হিসেবে এটি অবশ্যই ব্যবহৃত হয়ে থাকবে।’ সে হাসলো। শ্রীরামও হাসলো। তাকে পছন্দ করতে শুরু করলো। ‘ভেবো না যে এ জায়গাটা সবসময়ই নিরাপদ,’ লোকটি বললো। ‘আজ হোক কাল হোক তারা এটা খুঁজে পাবে।’ ‘একটা ভূগর্ভস্ত কক্ষ আছে, ’ শ্রীরাম শুরু করলো। ‘হ্যাঁ, আমি জানি সেখানে বুড়ো বুড়ো কোবরা থাকে, যদি পুলিশের চেয়ে সেগুলো অধিকতর পছন্দ করো। কিন্তু কোনো না কোনোভাবে কোবরা ও পুলিশের মাঝামাঝি আমাদের ব্যবস্থা করতে হবে।’ ‘হ্যাঁ, হ্যাঁ, এত কিছু করার নিয়েÑÑ’ জগদীশ তাকে ছোট একটা কুঠার দিয়ে বাঁশপাতা, বড় বড় কঞ্চি কাটতে এবং সেগুলো টেনে উপরে সরাতে বললো। শ্রীরাম কাজ শুরু করে চালাতে থাকলো যতক্ষণ পর্যন্ত না তার হাতের তালুর চামড়ায় টনটন ব্যথা শুরু করলো ও চামড়া উঠে গেলো। জগদীশের নির্দেশনায় পুরাতন মন্দিরের প্রতিরক্ষা বূহ্যে চড়ে শ্রীরাম বাঁশপাতাগুলো যত্র-তত্র রাখলো। পরম উদ্যমে সে চিৎকার করছিলো। সারা দিন রোদে দাঁড়িয়ে তার মুখ ঘামে মেহগুনির মতো চিকচিক করছিলো। সে বললো, ‘এতে হলে সমস্ত পর্বতটাকে আমি ঢেকে দিতে পারি,’ শ্রীরাম ক্লান্ত ও রাগান্বিত বোধ করলো। ভাবলো, ‘এ লোকটিকে আমি আদেশ করতে দিচ্ছি কেন, সে যখন দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে নির্দেশ দেওয়া ছাড়া কিছুই করছে না? জেলে যাওয়াই মনে হয় বেশি সন্তোষজনক হতো। কিন্তু এমন ভাবনায় আলোচনা করতে জগদীশ তাকে কখনোই কোনো সুযোগ দেয়নি। সে বললো, ‘মনে রাখবে, আমরা যুদ্ধে লিপ্ত হয়েছি। মহাত্মাজী তাঁর নিজের মতো করে, আর আমরা আমাদের মতো করে। আমাদের সবার লক্ষ এক।’ ‘কিন্তু আমি ভাবতাম আমরা সবাই মহাত্মার আদেশ অনুযায়ী কাজ করছি।’ ‘করছি, আমরা তো করছি, ’ সে অস্পষ্টভাবে বললো। ‘আমিও নিবেদিত একজন অনুসারী ছিলাম। এখনো আছি, কিন্তু তিনি আমাদেরকে আর পথ নির্দেশ করছেন না। আমাদের কী করার আছে? যথাসাধ্য কাজ চালিয়ে যাওয়ার জন্য তিনি আমাদের সবাইকে অনুমতি দেন।’ ‘তবে কঠোর অহিংসভাবে,’ শ্রীরাম বললো। ‘অবশ্যই, এ ছদ্মবেশ সহিংসতা নয়। এতে কেউ আঘাত পায় না। এটা করা হয় শুধু এজন্য যে যাতে করে হস্ত-ক্ষেপ ছাড়াই আমাদের পরিকল্পনামাফিক কাজ করতে আমরা নিজেদের মতো থাকতে পারি। আমি এও চাইনা যে ঐ ডাকপিয়ন এই জায়গাটা খুব বেশি দেখুক। হাজার হলেও সে তো সাম্রাজ্যবাদী সরকারের একজন সদস্য।’ শ্রীরামের পরবর্তী কাজটি ছিলো আরো জটিল। সে দেখতে পেলো যে সে জগদীশের একজন অন্ধ দাস হয়েছে। তার উৎসাহব্যঞ্জক একটি কথায় শ্রীরামের গহীন আত্মা পর্যন্ত সন্তুষ্ট হয়। তার অবস্থান নিয়ে সে গর্ব বোধ করলো। ভাবলো অন্যান্য সহযোগীরা তার কাছ থেকে হয়তো কদাচিৎ কোনো ভাল কথা শুনেছে। দেবতার পেছনে রেডিওটা নিয়ে ও কোলে লেখার প্যাড এবং আঙ্গুলের মাঝে পেনসিল নিয়ে সারাদিন বসে বসে সে রেঙ্গুন, সিঙ্গাপুর ও জার্মানি থেকে আসা খবর ও বার্তা টুকে নিলো। এসব খবরে ছিলো ইউরোপ ও দূরপ্রাচ্যে সংঘটিত যুদ্ধের ঘন্টায় ঘন্টায় সর্বশেষ সংবাদ। গভীর রাত অবধি শ্রীরাম কাজ করলো। তিন দিন অন্তর অন্তর তার পেনসিল ফুরিয়ে যেতো। সারা জীবনে সে কখনো এত বেশি খাটেনি। এর একমাত্র পুরস্কার ছিলো জগদীশের ‘খুব ভাল! চমৎকার কাজ। আমাদের আরো সৈন্য ভারতের জাতীয় সেনাবাহিনীতে যোগ দিয়েছে, তারা শীঘ্রই ভারতের অভ্যন্তরে অভিযান চালাবে।’ বাতিটার পাশে বসে মনোযোগ সহকারে প্রতিবেদন পড়তে পড়তে আলোর দিকে দলে দলে ছুটে আসা ড্যাঁশ মাছি ও গুবরে পোকা তাড়ালো। বার্তাগুলোর উপর জগদীশ কয়েকটা দাগ দিয়ে সাইক্লোস্টাইলে মালগুদিতে তার স্টুডিও থেকে প্রেরণ করলো। রেডিওতে ভেসে এলো: ‘টোকিও থেকে প্রচারিত হচ্ছে। এখানে সুভাষ চন্দ্র বসু আছেন, আপনাদের নেতা যিনি মাইকে বিশেষ উপলক্ষে আপনাদের ভাষণ দেবেন।’ কয়েক সেকেন্ড পরে বার্তাটিতে বলা হলো, ‘আমি সুভাষ চন্দ্র বসু বলছি।’ শ্রীরাম সম্মানের সাথে উঠে বসলো। ‘কী সৌভাগ্য তাঁর কণ্ঠ শুনছি!’ এ শব্দে শ্রীরাম এ মানুষটির প্রতি শ্রদ্ধা অনুভব করলো যিনি নিজের দেশ, আরাম-আয়েশ, নিরাপত্তা বিসর্জন দিয়ে এ দেশ থেসে সে দেশ ছুটে বেড়াচ্ছেন এবং মাতৃভূমিকে স্বাধীন করার উপায় খুঁজছেন। কী দক্ষতার সাথেই না তিনি পুলিশ প্রহরা সত্ত্বেও সাধুবেশে কলকাতায় নিজের বাসা ছেড়েছিলেন! শ্রীরামের মনে হলো সে বীরের কণ্ঠ শোনার মতো অদ্ভূত ভাগ্যবান। সুভাষ চন্দ্র বসুর কণ্ঠ থেকে ভেসে এলো, ‘ভারতীয় সেনাবাহিনীর লোকেরা, দেশপ্রেমিক হন। আমাদের প্রিয় মাতৃভূমিকে মুক্ত করতে সাহায্য করুন। ভারতীয় সেনাবাহিনীতে যোগদান করা আমাদের অনেক বন্ধুই এখানে আছেন যারা আপনাদের সীমানায় আক্রমণের জন্য প্রস্তুত। আমরা প্রস্তুত। শীঘ্রই আমরা ওপারে যাবো এবং তখন আপনারা আমাদের পক্ষে যোগদান করতে পারেন। সে নাগাদ আপনাদের বন্দুক আমাদের দিকে তাক করবেন না, কিন্তু আমাদের শত্র“র হৃদপিণ্ড বরাবর করবেন।’ আর তারপর ন্যাশনাল সার্ভিসের দশ দফা কর্মসূচী প্রচারিত হলো যে ভারতীয় সেনাবাহিনীর লোকদের উদ্যোগ নেওয়া উচিৎ। শ্রীরাম গলাভাঙ্গা গতিতে লিখে ফেললো। তার মনে হলো সুভাষ চন্দ্র বসুর আদেশদানকারী উপস্থিতি যেন তার কনুইয়ে এসে নির্দেশ দিচ্ছে। শ্রদ্ধাপূর্ণ নীরবতায় সে প্যাডের কয়েকটা কাগজ লিখে ভরিয়ে ফেললো। বাতিটা পুড়ে পুড়ে যখন লাল হলো, তখন সে অতি শ্রদ্ধাপূর্ণ ভয়ে রেডিওর দিকে তাকালো। বাইরে ঝিঁ ঝিঁ পোকা ডাকছিলো, ট্রেন কোথায় যেন ঝিক ঝিক করে যাচ্ছিলো, আর বাঁশঝাড় খসখস করে উঠছিলো। রেডিওটা বেজেই চললো। এর লাল চোখে দীপ্তি ছড়ালো, আর পেডেস্টালে দেবতার গোঁড়ালিতে লাল রশ্মি নিক্ষেপ করলো। শ্রীরাম সময়টা ঠিক বুঝতে পারলো না। তার জীবনে এত লেখা সে কখনো লেখেনি। সম্প্রচারটা যে ইংরেজিতে হয়েছিলো তাতে তার ভাল একটা পরীক্ষা হলো, কারণ তার কোনো বানানই খুব বেশি ভাল ছিলো না। সুভাষ চন্দ্র বসু বলছিলেন: ‘আর এখন খুবই গুরুত্বপূর্ণ একটা বার্তার জন্য উঠে দাঁড়ান। মনোযোগী হোন।’ ভুলের কোনো সম্ভাবনা ব্যতিরেকে যে কোনো ভাবেই হোক শ্রীরাম বার্তাটি ধরতে চাইলো, কিন্তু ঠিক সেই মুহূর্তে রেডিও থেকে পাল্টা একটা শব্দ আসতে শুরু করলো। মহাবার্তাটার সাথে তাল মিলিয়ে একটা মৌমাছি যেন ভনভন করতে লাগলো। শ্রীরাম দুর্দশাগ্রস্ত বোধ করলো। আর কয়েক সেকেন্ড শব্দটা অব্যাহতভাবে চলতে থাকলে, বার্তাটি শেষ হয়ে যাবে। কান খাঁড়া করলো, কিন্তু ঐ শব্দটা তীব্রতর হচ্ছিলো। দাঁত কিড়মিড় করলো সে। বাম হাত দিয়ে রেডিওর নব ঘুরালো। শুধু মনে হলো যেন এতে রেডিওটাকে আরো জ্বালাতন করা হচ্ছিলো। কাগজ থেকে চোখ তুলে সে রেডিওর দিকে দৃষ্টি নিক্ষেপ করলো। কাচের বাইরে হালকা আলোয় আলোকিত ডায়াল বক্সে সে খুব ছোট একটা তেলাপোকা দেখতে পেলো। দেখলো এর বিবর্ণ শরীর রেডিও থেকে আসা শব্দের আঘাতে কাঁপছিলো। কাঁচের ডায়ালে এর সাদা শরীরটা পিষ্ট দেখে শ্রীরাম বিতৃষ্ণা বোধ করলো। সে দেখতে পেলো, কিন্তু নাগাল পেলো না। তার অস্বস্তি লাগলো ও রাগ হলো। চিৎকার করে বললো, ‘অভিশপ্ত জীব, তোর কত বড় সাহস যে তুই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ এই বার্তাটায় এসে হস্তক্ষেপ করিস! দূর হ।’ আঙ্গুল দিয়ে কাচে মৃদু টোকা দিলো। খুবই রাগ হলো। ‘তোর বিতৃষ্ণ ভনভন শব্দ টুকে পেনসিলটা ক্ষয়ে ফেলার জন্য কি আমি এখানে আছি!’ তার টোকায় এত রাগ ছিলো যে তাতে পোকাটি আক্রান্ত হোক আর না হোক সে আলোটা দূরে সরিয়ে নিলো, আর এতে সব শব্দ যন্ত্রটি থেকে থেমে গেলো। রেডিওটা বাজলো না। প্যাড ও পেনসিলটি একপাশে রেখে শ্রীরাম রেডিওটাতে ঝাঁকি দিলো, কিন্তু কিছুই হলো না। নবটি ঘুরিয়ে হাতের মুষ্টিতে নাড়া দিলো আর অভিশাপ দিয়ে চিৎকার করলো, কিন্তু কিছুই হলো না। করুণভাবে জিজ্ঞেস করলো, ‘আর পাঁচ মিনিট অপেক্ষা করতে পারলি না!’ এমনটা কেন হলো যখন বার্তাটার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশ প্রচারিত হচ্ছিলো? জগদীশ তার সম্পর্কে এখন কী বলবে? শ্রীরাম রেডিওটার দিকে তাকিয়ে তার চরম অসহায়ত্ব উপলব্ধি করলো। সে দেখতো যুবকেরা যেকোন যন্ত্রকে টুকরো টুকরো করে আবার সেগুলোকে একত্রে লাগাতে পারতো। সে তো একটা স্ক্রুও ঘোরানোর যোগ্য নয়। নিজের সীমাবদ্ধতাই তার কাছে প্রচুর শক্তি নিয়ে ফিরে আসলো, আর বললো, ‘আমি বোকা, আমার ঠাকুরমা বোকা করে মানুষ করেছে। বিস্ময়ের ব্যাপার যে ভারতীর মতো মেয়েও আমাকে পরোয়া করে!’ এই আত্ম-ভৎর্সনা পুরোপুরি সমর্থিত হলো যখন রাত দুইটায় জগদীশ এসে হাজির হলো। রেডিওটা বিকল হয়ে যাওয়ায় শ্রীরাম কী করবে তা-ই কিছুক্ষণ ভাবলো। এরপর বাতিটা নিভিয়ে দিয়ে লাথি দিয়ে মাদুরটা খুলে তার উপর শুয়ে পড়লো। জগদীশ এসে বাতি খোঁজার জন্য ম্যাচের কাঠি জ্বালালে শ্রীরাম জেগে উঠে উত্তেজিতভাবে চিৎকার করলো, ‘কে আপনি?’ কাঠির আলোয় আলোকিত কৃষ্ণ লোকটির ঘুমকাতর কল্পছায়া ভীতিকর ছিলো। ‘চুপ, আমি, উঠে পড়ো।’ চোখ ঘষতে ঘষতে শ্রীরাম উঠে বসলো। বাতিটা জ্বালানো হলো। পুরোপুরি জাগানোর জন্য জগদীশ তাকে হালকা ঝাঁকুনি দিলো; পাশে বসে জিজ্ঞেস করলো, ‘আজকে বিশেষ কী আছে?’ বিজয়োল্লাসে শ্রীরাম তার প্যাডটি জগদীশের কাছে তুলে ধরলো। জগদীশ উত্তেজিতভাবে চিৎকার করে তা ছিনিয়ে নিলো, ‘আহ্ , সুভাস বাবুর বার্তা! তুমি কতই সৌভাগ্যবান যে তুমি তাঁর কথা শুনতে পেয়েছো। ভাল ছেলে! ভাল ছেলে! দেশ মুক্ত ও স্বাধীন হলে তুমি মস্ত বড় হবে।’ সে এর উপর চোখ বুলিয়ে বিড়বিড় করে বললো, ‘এসব মানুষ পৃথিবীর দেবতা; যাদের কর্ম অবশ্যই পরবর্তী প্রজন্মের কাছে পুনরাবৃত্ত হবে। সুভাষ বাবুর জীবন, ত্যাগ, দেশপ্রেম, সাহসিকতা নিয়ে একটা লাবনি(বর্দিক গান) বানিয়ে এ দেশের স্কুলে স্কুলে গাওয়া বাধ্যতামূলক করে দেবো।’ সে জোরে জোরে গানের সুরে পড়তেই থাকলো, ‘ “দেশবাসী, ভারতীয় সেনাবাহিনীর বীর”ÑÑ’ , মাঝখানে তার নিজের প্রশংসাসূচক মন্তব্য ছুঁড়ে দিলো যেমন- ‘বহুত আচ্ছা!’ ‘খাঁসা কথা ’, ‘মহামানব বলছেন!’ ‘শুনুন আর শিখুন, ও ভাইসকল,’ ইত্যাদি। যতক্ষণ না সে এখানে এলো, ‘ “এখন মনোযোগ দিন। প্রথমত আপনাদের যারা ”ÑÑ’ হাতের কাগজটা উল্টিয়ে জিজ্ঞেস করলো, ‘বাকিটা কোথায়?’ ‘বাকিটা নেই, বার্তাটা এখানেই থেমে গিয়েছিলো। কেউ একজন সম্প্রচারে বিঘœ ঘটাচ্ছিলো।’ ‘তার মানে কী? চলো তো দেখি।’ রেডিওটা যেখানে ছিলো সেখানে ছুটে গিয়ে সে নবটি ঘুরালো। চালু হওয়ার কোনো চিহ্ন নেই। নাড়া দিয়ে চিৎকার করে বললো, ‘এই আশীর্বাদের রেডিওটার কী হয়েছে?’ ‘আমি কী করে বলবো? আমি কি রেডিওর ইঞ্জিনিয়ার?’ ‘এ ব্যাপারে আমার সাথে তর্ক করবে না। এতে আমরা কোথাও যেতে পারবো না। সুভাষ বাবু নিশ্চয়ই খুবই গুরুত্বপূর্ণ কিছু বলে থাকবেন, আর তুমি রেডিওটাকে শ্বাসরুদ্ধ করে বন্ধ করে ফেলেছো।’ ‘না। আপনি ভুল করছেন। নিজেই শ্বাসরুদ্ধ হয়ে বন্ধ হয়ে গেছে। ওখানটায় একটা তেলাপোকা দেখেছিলাম, সম্ভবত সেটি এ কাজ করে থাকবে।’ জগদীশ তার মুষ্টি বদ্ধ করে নীরব থাকলো। শ্রীরামের ভয় হলো সে তাকে আঘাত করবে। যদি করতো, লড়াই না করে ছেড়ে দিতো না। সে এক কোণায় তাকালো যেখানে কোবরা ও বিচ্ছুর জন্য বাঁশের লাঠি রেখেছিলো। কিছুক্ষণ ভাবলো এখনই ছুটে গিয়ে সেটা নিয়ে আসবে কিনা। লোকটি কি তাকে প্রয়োজনীয় সময়টা দেবে? অনেক্ষণ ভয়ানক নীরবতার পর লোকটি বললো, ‘আচ্ছা, চলো এ নিয়ে আর মাথা ঘামাবো না। সৈনিক হিসেবে নিশ্চিত অতীত, মনে রেখো, যা নিশ্চিত অতীত তা নিয়ে আমাদের অবশ্যই চিন্তা করা যাবে না।’ সে বললো, ‘ঐ পেনসিলটা দাও তো।’ শ্রীরাম পেনসিলটা তাকে হাতে হাতে দিলো। জগদীশ বাতিটা ঠিক করে যতœসহকারে বার্তাটি পড়লো, আর এক মিনিট চিন্তা করে বাকি কাগজটা চটপট করে লিখে ফেললো। ‘অবশ্যই আপনাদেরকে, অবশ্যই আপনাদেরকে এবং অবশ্যই আপনাদেরকে।’ অনুপ্রেরণার সাথে সে লিখলো। বার্তাটির লেখা শেষ করতে তার প্রায় এক ঘন্টা লেগে গেলো। এর উপর চোখ বুলিয়ে সন্তোষজনকভাবে মাথা নাড়ালো। শ্রীরামকে প্যাডটা দিয়ে আদেশ দিলো, ‘এখন পড়ো, যুবক, ঠিক এভাবেই তিনি চালিয়ে যেতেন যদি তেলাপোকাটা ওখানে দাঁড়িয়ে সেন্সর না করতো।’ এ বিজয়ের পর আকস্মিক এক দুঃখ তাকে আক্রমণ করলো। তাকে রেডিওর কথা মনে করে দেয়া হলো। ‘শেষ ব্যাটারি জোড়াÑ আপনি সুভাষ বাবুর সাথে ফিরতি কথা বলতে পারতেন যদি শুধু সাবধানে থাকতেন। এটা তো দ্বিমুখী রেডিও...। মনে হয় এটা আমার সাথে ফেরত নিয়ে গিয়ে ঠিক করাই ভাল হবে। সৈনিক হিসেবে আমি নষ্ট হয়ে যাওয়া দুধের জন্য কাঁদবো না।’ ‘এটা কি নষ্ট দুধ?’ শ্রীরাম ভয়ে ভয়ে জিজ্ঞেস করলো। ‘অবশ্যই তাই,’ জগদীশ হলফ করে বললো, ‘দুধ যখন নষ্ট হয়ে যায়, তখন তা পানিতে পরিণত হয়ে শক্ত হয়, জানোই তো। পড়ে যাওয়া দুধের জন্য কেঁদে কোনো লাভ নেই, ’ সে পুনরাবৃত্তি করলো। ** পরের দিন বিকেলে ট্রেনের হুইসেল বেজে ওঠার একটু পরে জগদীশ তার শার্টের নিচে লুকিয়ে এক বান্ডিল কাগজ নিয়ে হাজির হলো। এতগুলো কাগজ বহন করার উদ্দেশ্যে সে বড় একটা পকেটওয়ালা শার্ট ভেতরে ও এর উপরে আলখাল্লা ধরণের একটা শার্ট পরেছিলো, আর তার পাশে লুকানো এত সব কাগজে তাকে এত বড় দেখালো যে শ্রীরাম কখনো কখনো ভাবলো অতিরিক্ত কাগজ গুঁজে দেয়ার জন্য তার ব্যক্তিত্বের ছাপ ফেলানো মুগ্ধতা নাও থাকতে পারে। জগদীশ পরনের কাপড় হালকা করে এক বান্ডিল কাগজ বের করলো, আর আবারও শ্রীরাম যথারীতি শিশুর মতো তার কাছ থেকে কিছু চমৎকার খাদ্য প্রত্যাশা করলো। ‘চলে আসো, বসো,’ জগদীশ বললো। জগদীশ প্রথমে উপরে নিচে তাকিয়ে আশ্বস্ত হলো যে কেউ দেখছে না। নাটকীয়ভাবে সে বিশাল দরজাটি বন্ধ করতে চেষ্টা করলো যা শক্তিশালী কবজায় ক্যাঁচ করে শব্দ করলো, কিন্তু অর্ধ ইঞ্চি সামনে সরানো গেলো। শ্রীরাম টু শব্দটি না করে শুধু দেখলো। এ সব প্রস্তুতির পর সে শ্রীরামকে মাদুরের উপর তার পাসে টেনে বসালো। তার হাতে রাখা সাইক্লোস্টাইলের বার্তার একটা কাগজে চাপ দিয়ে বললো, ‘পড়ো।’ শ্রীরাম জোরে জোরে পড়লো, ‘ “ভারতীয় সেনাবাহিনীর লোকেরা ইত্যাদি, ইত্যাদি,” ’ যে সব সে আগের দিন পর্যবেক্ষণ করেছে, কিন্তু আরো কয়েকটা প্যারাগ্রাফ ধরে এটি চললো। ‘ “প্রথমত, আমাদের শত্র“ সরকারকে সহযোগিতা করবেন না। আপনাদের অস্ত্র ছাড়–ন, প্রয়োজন হলে জীবন বিসর্জন দিন। ভারতের জাতীয় সেনাবাহিনী যেদিন দিল্লীতে যেখানে আমাদের লোকেরা এখন বন্দী হয়ে আছে সেখানে অভিযান চালিয়ে লালকেল্লায় ভারতের পতাকা উড়াবে, আপনারা সেদিনের বীর হবেন।” ’ দেশের মুক্তির জন্য সেনাবাহিনীর কী করা উচিৎ সে ব্যাপারে যথার্থ নির্দেশনা এতে আরো ছিলো। শ্রীরাম লোকটির জন্য এক ধরণের গভীর শ্রদ্ধা অনুভব করলো। ‘কীভাবে তুমি বাকি বার্তাটা যোগাড় করলে?’ নিস্পাপভাবে সে জিজ্ঞেস করলো। ‘কীভাবে করেছি তা নিয়ে ভেবো না,’ জগদীশ উত্তর দিলো, ‘ইচ্ছা থাকলে উপায় হয়। এটা থাকলে সব হয়,’ কপাল ছুঁয়ে গর্বের সাথে সে বললো। ‘আমি অনায়াসেই অনুমান করতে পারতাম বাকি বার্তাটা কী হতো। এ তো কম-বেশি চিন্তা পড়ার বিষয়, ’ গর্বভরে ঘোষণা করলো সে। ‘এ মুহূর্তে আমাদের সেনাবাহিনীর জন্য চরম গুরুত্বপূর্ণ বার্তা এটি। আমাদের জন্য খুবই অপরিহার্য। আর তোমার সম্মানে তুমিই প্রথম পেলে, যদিও (কিছু মনে করো না, যা অতীত তা নিয়ে আর না ভাবি) পূর্ণ বার্তাটা তুমি পেতে না; কোনো কিছুই বাদ যায়নি, আর তাই এ নিয়ে ভেবো না। তাছাড়া বার্তাটা যাদের উদ্দেশ্যে তাদের কাছে পৌঁছে গেছে। এটা ভেবে তোমার সম্মানিত বোধ করা উচিৎ।’ শ্রীরাম কিছুটা হতভম্ব হলো। জিজ্ঞেস করলো, ‘আমার কী করা উচিৎ?’ ‘আমার কথা মনোযোগ দিয়ে শোনো । এর পঞ্চাশটা কপি আমি তোমাকে দেবো। তুমি বেলালির সৈন্য শিবিরে সেগুলো নিয়ে যাবে। বিশ্বে কী ঘটছে না ঘটছে সে ব্যাপারে সেখানকার বেচারাদের কোনো ধারণাই নেই। কারণ ইংরেজদের যুদ্ধ বিভাগের প্রচারিত গাঁজাখুড়ি গল্প ছাড়া সত্য কথা শোনার অনুমতি তাদের নেই। আমাদের ছেলেদের অবশ্যই সত্য জানতে হবে। তাদের অবশ্যই জানতে হবে যে সুভাষ বাবু কোথায় আছেন, ভারতের জাতীয় সেনাবাহিনী কোথায় অবস্থান নিয়েছে, আর এখন কী করণীয়। যেখানেই হোক না কেন সত্য প্রচার করা আমাদের দায়িত্ব। মহাত্মাজী আমাদের কি তা-ই বলেননি?’ ‘হ্যাঁ, হ্যাঁ,’ শ্রীরাম একমত হয়ে বললো। তার কাছে এ যুক্তিুর আবেদন ছিলো। ‘বাকি কপিগুলো দিয়ে তুমি কী করবে? আমাকে আরো কিছু নিয়ে যেতে দিচ্ছো না কেন?’ ‘না, শুধু পঞ্চাশটাই দিতে পারি। সব মিলিয়ে দেড়শো কপি করেছি। মনে রেখো, আজকাল কাগজের ঘাটতি দেখা দিয়েছে। লক্ষ্মী শিবিরে পঞ্চাশটা পাঠাবো, আর এক জায়গায় তৃতীয় ব্যক্তির কাছে পঞ্চাশট আমি নিজেই নিয়ে যাবো। আজ রাতেই গিয়ে তোমাকে দেয়া কাজটা শেষ করবে।’ ‘রাজী,’ শ্রীরাম বললো। বিদায়ের আগে জগদীশ বললো, ‘সব মিলিয়ে আমরা তিনজনই হয়তো এ কাজে ধরা খাবো। তবে চিন্তা করো না। আমাদের জীবন খুব গুরুত্বপূর্ণ নয়। আমাদের কাজই বেশি গুরুত্বপূর্ণ।’ ‘বাঁচি কিংবা মরি তাতে আমার কিছু যায় আসে না,’ ভারতীকে নিয়ে হতাশার কথা স্মরণ করে শ্রীরাম বললো। সব সময় অগম্য এই বালিকার সাথে কারো অস্তিত্ব টেনে এনে কী লাভ? জাতীয় এই যুদ্ধ হয়তো কখনো শেষ হবে না, আর শেষ হলেও, সে আরো কোনো কর্মকাণ্ডে জড়িত হয়ে পড়বে। সারা জীবন সে অন্য কিছুর খোঁজে ব্যস্ত ছিলো...। এ ভাবনায় শ্রীরাম এত শ্রান্ত হলো যে সবটুকু আন্তরিকতা দিয়ে তাৎক্ষণিক মৃত্যুর ঘোষণা দিলো। আরো বললো, ‘ফিরে আসতে ব্যর্থ হলে ভারতীকে নিয়ে আমি যা ভাবি তা তাকে বলবে?’ ‘তাকে নিয়ে কী ভাবো?’ মজা করে জগদীশ জিজ্ঞেস করলো। ‘ভাবি যে সে যদি আমাকে বিয়ে করতো, তবে আমি হয়তো মরতাম না বা সেরকম কিছু করতাম না।’ ‘আচ্ছা, তাকে বলবো। আমি গুলি খেলে তুমি আমার স্টুডিওর দায়িত্বভার নিতে পারো। চাইলেই এটা তোমার।’ শ্রীরাম এতই বিচলিত হলো যে সে কথা বলতে পারলো না। ‘তোমার অনেক দয়া,’ বিড়বিড় করে সে বললো। ‘তুমি কত ভাল!’ জগদীশ তার জমকালো স্কার্ফের মাথাটা মোচড়ালো, ‘কিন্তু আমার ভয় হচ্ছে রাসায়নিক পদার্থগুলো যেমন আছে তেমন অবস্থা নিয়ে এটা চালানো তোমার জন্য কঠিন হবে। যা হোক, ভাগ্য তোমার প্রতি সুপ্রসন্ন হোক।’ ** প্যাম্ফলেটগুলো সুবিধামতো আকারে লেখা হলো যাতে করে সহজেই বহন করা যায়, লুকিয়ে রাখা যায়। শ্রীরাম গামছার লম্বা একটা বহরের দুই মাথা একখানে বেঁধে সেখানে পাম্ফলেটগুলো পরিপাটি করে রেখে ছোট একটা বান্ডিল বানালো। এরপর বান্ডিলটি কোমরে বেঁধে নিয়ে এর উপর তার খাদি পোশাকটা পরে নিলো এবং এরও উপরে তার জিব্বাটা পরলো। প্যাম্ফলেটগুলো তার পেটে অস্বস্তিদায়ক চাপ ফেললো, কিন্তু সে তা সহ্য করলো। সন্ধ্যায় পাহাড়ের নিচে চলে গেলো। জগদীশ এ ব্যাপারে তাকে যথার্থ নির্দেশনা দিয়েছিলো। রাস্তায় হেঁটে হেঁটে শ্রীরাম একটা গাছের তলায় বাসের জন্য অপেক্ষা করলো। গাছটার নিচে দু’একজন গ্রামবাসীও অপেক্ষা করছিলো। অন্ধকার ছিলো তখন, আর দিগন্তের ওপারে মালগুদি শহরের দীপ্তি ছিলো। জাতিচ্যূতের মতো শ্রীরাম দীর্ঘশ্বাস ফেললো। ‘জীবনের মুখোমুখি হতে যখন যাত্রা করলাম, তখন কী হতভাগ্য সময়ই না করলাম! ঠাকুরমা!’ তাকে মনে মনে ডাকলো, ‘আমি ফিরে যেতে চাই, কিন্তু পারছি না, চিন্তা করো না। সব ঝামেলার অবশ্যই অবসান হবে। মহাত্মাজীকে যদি তারা ছেড়ে দিতো! তিনি যতদিন জেলে থাকবেন, ততদিন এই পৈশাচিক সরকারের সাথে আমরা লড়াই করবো। কত বড় স্পর্ধা তাঁর উপর হাত তোলে? তারা এটা না করলে ভারতী বাইরে থাকতো আর খুশি হতো এবং মহাত্মাজী তার বিয়েতে মত দিতেন।’ ‘এই যে? কী বলছেন, স্যার? গ্রামবাসীদের একজন তাকে কৌতুহলভরে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করলো। শ্রীরাম সতর্ক হয়ে জিজ্ঞেস করলো, ‘ওখানে কে?’ আরো কাছে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করলো, ‘আপনি কী জন্য অপেক্ষা করছেন?’ ‘বাসটা আজকে দেরি করছে,’ আলাপের সূত্র ধরে তারা বললো, আর শ্রীরাম তাতে একমত হলো, ‘অনেক আগেই তো এখানে আসার কথা ছিলো, তাই না?’ ‘লড়াই কেমন চলছে, স্যার?’ তাদের একজন জিজ্ঞেস করলো। যাকে তথ্য জানতো বলে মনে হতো তাদের যে কাউকে যে কোনো গ্রামবাসীই এ ধরণের প্রশ্ন জিজ্ঞেস করতো। শ্রীরাম হঠাৎ খুবই সতর্ক হলো। জিজ্ঞেস করলো, ‘কেন?’ অন্যজন বললো, ‘কারণ লড়াই তাড়াতাড়ি শেষ হলে, আমরা সবাই ঝামেলা থেকে রেহাই পাবো।’ ‘আমি জানি না,’ শ্রীরাম ধীরে ধীরে টেনে টেনে বললো। যার সাথে কথা হচ্ছিলো অন্ধকারে তার চেহারাটা সে ভালভাবে বুঝতে পারেনি। পুলিশের গুপ্তচর কিংবা কন্সটেবল নিজেও হতে পারেন। ‘লড়াইটা কেমন চলছে, স্যার?’ লোকটি গোঁ ধরে বললো। ‘আচ্ছা, পত্রিকায় তো এটা সেটা বলছে, আর আমি সেটুকুই জানি।’ শ্রীরাম জবাব দিলো। ‘কিন্তু কে যেন বলছে এর সবটাই মিথ্যা! আমার ভাই অনেক লোককে চেনে, আর সে বলেছিলো যে ইংরেজরা সর্বত্র পরাভূত হচ্ছে। আরো বলেছিলো যে জার্মানরা এরই মধ্যে মাদ্রাজে এসে গেছে। তারা যদি আসে, তবে মহাত্মাজীকে কি কারাগার থেকে ছাড়িয়ে আনবে?’ শ্রীরাম প্রশ্নটি অন্যদিকে নিতে চাইলো আর বললো, ‘মহাত্মা গান্ধীকে দেখেছেন?’ ‘জ্বী, স্যার, তিনি আমাদের গ্রাম দিয়ে যেতেন,’ লোকটি শুরু করলো, আর বাসের হেডলাইটদুটো অনেক দূর থেকে দৃশ্যমান হলো। লোকটি তার বোঁচকা তুলে নিয়ে রাস্তার মাঝখানে দৌড়ে গিয়ে চিৎকার করে উঠলো, ‘আমরা যদি না থামাই, তাহলে বাস থামবে না।’ এ সময়ে বাস এসে রাস্তার ঠিক মাঝখানে বেপরোয়াভাবে দাঁড়ালো । ‘আপনি তো চাপা পড়বেন!’ শ্রীরাম চিৎকার করে বললো। চালক আচমকা ব্রেক কষে রাগতস্বরে বললো, ‘কী করছেন? নিজেকে মেরে ফেলতে চান নাকি? মরার যখন এতই সাধ তখন সেনাবাহিনীতে যোগ দিয়ে মরেন?’ এত কিছু বললে পর বাস থেকে হাসি ভেসে এলো। গ্রামের লোকটি চিৎকার করে বললো, ‘আমি যেতে চাইÑÑ’ ‘দূর হয়ে যান আর ওখানে দাঁড়িয়ে কথা বলবেন না। এ গাড়িতে পিঁপড়ারও কোনো জায়গা নেই।’ ‘ওনাকে ভেতরে আসতে দিন,’ কন্ডাক্টর জোরে বললো। কারণ তার কাছে এর অর্থ ছিলো অতিরিক্ত কামাই। দিনের শেষে এমন যাত্রীকে গোনার মধ্যে রাখা হতো না। ‘মেঝেতেই বসবো,’ গ্রামের লোকটি কাকুতি করে বললো। ‘পাঁচ আনা,’ কন্ডাক্টর জোরে বললো। ‘তিন আনা,’ যাত্রীটি চিৎকার করে বললো। ‘গত সপ্তাহে আমার কাছ’ থেকে তো তিন আনা নিয়েছিলেন।’ ‘গত সপ্তাহ আর এ সপ্তাহ এক কথা নয়,’ কন্ডাক্টর চেঁচিয়ে বললো। শ্রীরাম এখন পর্যন্ত এ বিষয়ে নাক না গলিয়ে শুধু দেখে যাচ্ছিলো। হঠাৎ সে এগিয়ে এলো, ‘গত সপ্তাহে তিন আনা নিয়ে থাকলে তার কাছ থেকে তা-ই নেন।’ ‘জ্বী, স্যার,’ শ্রীরামের ব্যবহারে শ্রদ্ধা ও ভয়ে কন্ডাক্টর বললো। ‘আর আমাকে নামিয়ে দেবেন ইয়াতেÑÑ। কত?’ ‘তিন আনা, স্যার।’ ‘ভেতরে কোনো জায়গা না থাকলে আমি ফুটবোর্ডে গিয়ে দাঁড়াবো,’ শ্রীরাম বললো। কন্ডাক্টর খুঁতখুঁতে হয়ে বললো, ‘আপনি ভেতরে আসতে পারেন, স্যার। আমি জায়গা করে দেবো।’ সব যাত্রী বাস থেকে ঘাড় প্রসারিত করলো; ইঞ্জিনটা সাপের মতো হিস হিস করছিলো। ‘না, আমি ফুটবোর্ডে দাঁড়িয়ে থাকবো,’ বাস যাত্রা শুরু করলে শ্রীরাম এই বলে হ্যান্ডরেইলটা আঁকড়ে ধরলো। ‘সে হয়তো ভাবছে কর্তব্যের বাইরে বাস পরিদর্শক হিসেবে আমি এসেছি,’ শ্রীরাম শীতল হ্যান্ডরেইলটা আঁকড়ে ধরে ভাবলো। সে সময় রাতের মেদুর হাওয়া তার মুখে এসে ঝাপটা দিলো। বাসে কেউ নাক ডাকছিলো, কেউ যুদ্ধ ও এর সামগ্রিক অগ্রগতি ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ করছিলো, আবার কেউ ঈশ্বর ও অদৃষ্ট নিয়ে কথা বলছিলো, একটা শিশু কাঁদছিলো, একটা মহিলা হাই তুলছিলো, আর চালক এবং কন্ডাক্টর ব্যক্তিগত কৌতুক বিনিময় করে হো হো করে হাসছিলো। ‘নিজেদের অসৎ উপায়ে অর্জিত টাকার কথা ভেবে তারা হয়তো মজা করছে,’ শ্রীরাম ভাবলো। অত্যধিক ভারে বাসটি ঘড়ঘড় করে আওয়াজ করলো। তার আশ্কংা হলো যে বাসের নিচটা আলাদা হয়ে পড়ে যেতে পারে। দুর্ভাগ্যজনকভাবে সে বাস পরিদর্শক ছিলো না। তা সত্ত্বেও কর্তৃত্বের স্বরে সে জিজ্ঞেস করলো, ‘কন্ডাক্টর সাহেব, আপনাদের লোড নেয়ার সীমা কতো?’ কন্ডাক্টর ভদ্রভাবে জবাব দিলো, ‘স্যার, সরকার নিয়মটা বাতিল করেছে। বাসে যতজন ধরে ততজনকে আমরা নিতে পারি। এখন তো যুদ্ধের সময়, স্যার, নইলে কত বেচারা প্রধান সড়কে আটকা পড়তো।’ যাত্রীরা সম্মতিসূচক অনেক গুঞ্জন তুললো। ‘এসব বিমান হামলা ও ঝামেলার আর কী বিপদ, তার চেয়ে রাস্তায় আটকা পড়াটাই সবচেয়ে বেশি বিপদ।’ কেউ একজন সাহস করে বললো। ঘুমন্ত গ্রামগুলো পেরিয়ে বাসটি হেলে দুলে চললো। যুদ্ধের নিয়ম মাফিক আলোগুলো আবছা রাখা হয়েছিলো, আর হেডলাইটদুটো শুধু সামনে এক চিলতে ক্ষীণ আলো ফেলেছিলো। কেউ একজন গুনগুন করে গান গাচ্ছিলো; মানুষের এসব শব্দ শ্রীরামের ভাল লাগলো, যা একা জীবন-যাপন করতে করতে দুর্বল হয়ে গিয়েছিলো। মানুষের কণ্ঠসঙ্গীত সে উপভোগ করলো। বাসটির গতি কমলে শ্রীরাম একলাফে সংগ্রাম নামক এক গ্রামে নেমে পড়লো। রাত তখন এগারোটা বাজে। গোটা গ্রাম ঘুমিয়েছিলো। বাসটি দৃষ্টির আড়ালে না যাওয়া পর্যন্ত সে রাস্তায় অপেক্ষা করলো। এরপর তার মালামাল ঠিকমতো আছে কিনা তা দেখতে তার বোঁচকাটির উপর হাত বুলালো। ভেতরের পকেটে তার-কাটা যন্ত্র আর কোমরে মূল্যবান বার্তাটি ছিলো। সে যখন নিচু হলো, পেটের মধ্যে তখন একটা দলা তাকে যন্ত্রনা দিলো। ‘এই যন্ত্রনা থেকে যদি মুক্তি পেতাম, তাহলে বার্তাটি রটিয়ে দিতাম,’ সে ভাবলো। বামের রাস্তার একেবারে কিনারা দিয়ে সে হাঁটলো; কেননা দু’একটা সামরিক লরি যাচ্ছিলো, কেউ তাকে দেখুক সেটা সে চায়নি। বাঁশ ও মাটির একগুচ্ছ কুটিরে ঘেরা যেখানে আঁকাবাকা ব্যক্তিগত রাস্তা চলে গিয়েছে তার চারপাশে বিশাল কাঁটাতারের জঙ্গলের মুখোমুখি হলো সে । প্রধান প্রবেশ ফটকটি ছিলো অন্য পাশে। এ জায়গাটি সামরিক ভাণ্ডার ও প্রশিক্ষণ কেন্দ্র ছিলো, আর এখান থেকেই সারাদিন কনভয়ের ঝন ঝন শব্দে নীরবতা আন্দোলিত হতো। এখন সে কাঁটাতারের বেড়ার একটি অংশ কাটতে লাগলো। তার কাটার শব্দে জায়গাটি অনুরণিত হলো; তার ভয় হলো কেউ তাকে মেশিন গান উঁচিয়ে ধরতে পারে। টহলদার সেন্ট্রির পদধ্বনি শুনলো সে, আর নিচু হয়ে রইলো। ভাবলো, ‘হয়তো এটাই আমার শেষ মূহুর্ত। মনে হয় আমাকে নরকে পাঠানো হয়েছে?’ নরকের সব খুঁটিনাটি মনে করলো সে যা ঠাকুরমা শিশুকালে তাকে শুনিয়েছিলো, আর কাঁপতে লাগলো। ‘অচেনা সেন্ট্রির হাতে গুলি খাওয়ার কোনো মানেই হয় না,’ সে চিন্তা করলো। ‘একজন অচেনা মানুষ আরেকজন অচেনা মানুষকে গুলি করবে, এটা হাস্যকর ব্যাপার।’ এই শক্তিতে সে কাঁটাতারটি ফেলে দিলো। সামান্য একটু আঁঠা বের করে সে বসে পড়লো এবং কয়েকটা শীটের পিছনে পরিপাটি করে লাগিয়ে ভেতরের ব্যারাকের সামনে তারবাহী থাম্বাগুলিতে নোটিশগুলো সেঁটে দিলো। কাঁটাতারে তার হাতের সামনের দিকটার চামড়া উঠে গেলো। ‘রক্ত ঝরানো হয়েছে, আর জগদীশের আদেশে এটা ঝরাতে এটাই আমার চরম প্রস্তুতি।’ এরপর শীটগুলো একসঙ্গে জড়ো করে বেষ্টনীর মধ্যে নিক্ষেপ করলো। তারকালোকিত আকাশের নিচে নোটিশগুলো পতপত করতে দেখলো সে। ‘ছেলেরা বার্তাগুলো তুলে নিয়ে কাল সকালের অবসরে পড়তে পারে,’ এ ভেবে সে ফিরে গেলো। ** জগদীশ বললো, ‘তোমার চোখে অমন নি¯প্রভ, দূরবর্তী দৃষ্টি কেন, যুবক? মহান কাজে তুমি তো অনেক সেবা দাও। কিন্তু এতে তোমার হৃদয় সত্যিই নেই। জানতে পারি কেন?’ উত্তর দেওয়ার মতো শ্রীরামের কাছে নির্দিষ্ট কিছু ছিলো না। ফটোগ্রাফার হিসেবে আমার বলা উচিৎ ছিলো, “সন্তোষজনক দৃষ্টি” বা “হাস্যজ্জ্বোল দৃষ্টি,”-এর কথা। তোমার হৃদয়কে অবশ্যই তোমার কাজে জড়াতে হবে, প্রিয় যুবক, নইলে দেশকে সাহায্য করতে পারবে না। আমাদের খুব সঙ্কটকাল যাচ্ছে, যেমনটা আমাদের রাজনীতিবিদরা বলেন, আর আমাদের কিছু একটা করতে হবে। আমার তো সন্দেহ হয় তুমি কোনো এক ব্যক্তিকে ঘিরে তোমার চিন্তা-ভাবনা খুব বেশি কেন্দ্রিভূত করে রেখেছো। ঠিক বলছি?’ ‘হ্যাঁ।’ ‘ঠিক আছে, ওটা নিস্ফল কাজ, যেহেতু সরকারই মনে করে তোমাদের দুজনকে আলাদা রাখাই তোমার সর্বোত্তম স্বার্থের কাজ হবে। তুমি তো জানোও না তারা তাকে কোথায় রেখেছে।’ ‘তা সত্য,’ কাতরভাবে শ্রীরাম বললো। ‘কিন্তু আমি জানি সে কোথায়,’ জগদীশ বললো। ‘আমার নিজস্ব কিছু লোক আছে। সব জেল এখন ভরে যাওয়ায় সে আসলে নিয়মিত কোনো কারাগারে নেই। তড়িঘড়ি করে বানানো একটাতে... সে আছে। পুরানো কসাইখানা চেনো? সে ওখানে আছে, আরো কিছু বন্দিনীদের সাথে।’ ‘তুমি কী করে জানো?’ ‘সেখানকার এক প্রহরীকে আমি চিনি। সে আমাকে পছন্দ করে কারণ সে আমার পুরানো মক্কেল, আমার মজুদে তার ছবি পারিবারিক মামলা-মোকদ্দমায় তাকে সাহায্য করেছিলো। ওভাবে ইচ্ছুক থাকলে তোমার বন্ধুর সাথে দেখা করতে সে তোমাকে সাহায্য করবে।’ শ্রীরামের বুকটা ধড়ফড় করলো। যেন কোনো মৃত মানুষ জীবন ফিরে পেয়েছে, কিংবা অন্তত জীবন ফিরে পাওয়ার প্রতিশ্র“তিবদ্ধ। ‘চমৎকার একজন মানুষ সে, নিজের জীবনের ঝুঁকি নিয়ে ভারতীর সাথে দেখা করে প্রায় আধা ঘন্টা কথা বলতে সে তোমাকে সাহায্য করবে।’ ‘কখন? কখন?’ শ্রীরাম উদ্বিগ্ন হয়ে জিজ্ঞেস করলো। ‘যখন তোমার কাজ স্মার্টলি শেষ করবে। ক্রোমিয়াম আকরিকের কাজ, এ ব্যাপারে তোমার সহযোগিতা প্রয়োজন।’ ‘তুমি বলতে চাচ্ছো আমার কাজের পুরস্কার দেবে।’ ‘হ্যাঁ, ঠিক সেটাই বলতে চাচ্ছি। ভাল একটা কাজ আরেকটা কাজের দাবি রাখে।’ ‘আমার কাজে কে লাভবান হবে?’ শ্রীরাম জিজ্ঞেস করলো। ‘বেশ তো, দেশ। ইংল্যান্ডের উদ্দেশ্যে ক্রোমিয়ামের আকরিকে ভরা একটা ট্রেন এক স্টেশন থেকে ছাড়ছে। এটাকে বন্দরে পৌঁছাতে দেয়া যাবে না। পৌঁছাতে দিলে এটা আমাদের কাছে ট্রিগার এবং আরো কত কী আকারে ফিরে আসবে আমাদের জ্বালাতন করতে...। এ কাজে সাহায্য করতে তুমি ছাড়া আর কাউকে আমি ভাবতে পারছি না।’ শীঘ্রই শ্রীরামের ছবি প্রকাশ করে তার খোঁজ-খবর দেওয়ার জন্য পুরস্কার ঘোষণা করাটা পুলিশের জন্য অপরিহার্য ছিলো। ** শ্রীরামের মনে পীড়াদায়ক ভয় হলো যে জগদীশ তাকে নিয়ে আসলে কোনো মজা করতে পারে। ‘যদি মজা করে, তাহলে ভগবান তার সহায় হোক,’ মনে মনে বললো। ‘বড় পাথর দিয়ে ওর মাথার খুলি গুড়া করে ফেলবো,’ আর অসামান্য সহিংসতার স্বপ্নে সে আনন্দ উপভোগ করলো। তার মনটাকে সঙ্গে সঙ্গে পিছনে টেনে নিলো যখন উপলব্ধি করলো ভারতী কীভাবে প্রতিক্রিয়া করবে। ভারতীর চিন্তা তাকে নরম করে তুললো। মনে মনে বললো কোনো বদমায়েশের পায়ে পড়তে সে দ্বিধাবোধ করবে না যদি ভারতী তেমনটা তাকে দিয়ে করাতে চায়। তার মন রক্ষা করতে ও অনুমোদন লাভ করতে যে কোনোকিছু করা যায়। তার পুরো সত্ত্বাটা অর্থপূর্ণ হয় শুধু যখন ভারতীর বিষয়ে কিছু একটা করে। সে ভাবলো ভারতী বের হয়ে এলে আর ফটোগ্রাফারটাও সেখানে থাকলে তার কেমন আচরণ করা উচিৎ। আশা করলো তার ঈর্ষা যেন তাকে উচ্ছৃঙ্খল কোনো কাজ করতে তাড়িত না করে। যা হোক, সে আশা করলো ফটোগ্রাফার যেন নিজের চরকায় তেল দেয় আর তাকে যেমন ইচ্ছে জীবন-যাপন করতে দেয়। আশা করলো ব্রিটিশ সরকারের সাথে লড়াই যেন তাড়াতাড়ি শেষ হয়। আশা করলো ব্রিটেন যেন ভারত ছেড়ে যায় যাতে করে সে কবীর সরণীতে ফিরে গিয়ে ভারতী এবং ঠাকুরমার সাথে শান্তিতে থাকতে পারে! আহ্ , ওখানেই সমস্যা। ঠাকুরমা এতে কী করবে? সে হয়তো দিন রাত ভারতীর সাথে খ্যাঁচ খ্যাঁচ করবে এবং নিজের ভাইয়ের নাতনীর সাথে চেহারায়, যোগ্যতায়, গৃহস্থ কাজকর্মে তার তুলনা করবে। কিন্তু তার আশা ভারতী এসে ঠাকুরমাকে যেন চ্যালেঞ্জ করে যে তার সেই গ্রাম্য ভাগিনীটি পুলিশ বাহিনীর চার্জের শিকার হয়েছে কিংবা মহাত্মাজীর সাথে কথা বলেছে কিনা। তার গুহার প্রবেশ পথের পাথরটায় গা এলিয়ে দিয়ে সে নীল গাম গাছের চূড়ায় তাকালো। তার মন তখন অনিয়ন্ত্রিতভাবে ঘুরে বেড়ালো। মুহূর্তের মধ্যে জগদীশ এসে হাজির হলো। তার পাশে এসে দাঁড়িয়ে ছিলো। সে বললো, ‘খুবই অনিরাপদ, যুবক। আমি না হয়ে যদি কোনো পুলিশ হতো, তাহলে তুমি এখনো এখানে বসে বসে দিবাস্বপ্ন দেখো, গলায় সুন্দর একটা কলার বেঁধে জেলে টেনে নিয়ে যেতো।’ বেশ খানিকটা বিরক্ত হয়ে শ্রীরাম জিজ্ঞেস করলো, ‘দিবাস্বপ্নে ক্ষতিটা কী?’ ‘এমন অনেক কিছুই আছে যা ঠিক নয়। তোমাকে অবশ্যই আরো বেশি সতর্ক হতে হবে। বাইরে থেকে আমাদের গুহা হয়তো দেখা যায় না, কিন্তু এ জায়গাটা অনুসন্ধান করার কথা কেউ হয়তো ভাবতে পারে। তোমাকে হয়তো কেউ দেখেনি, কিন্তু ভেবো না যেন চিরকাল তা চলবে। ছদ্মবেশেও তোমার সব সময় নজর রাখতে হবে। সাবধান।’ ‘ঠিক আছে,’ জগদীশের আচরণে ভীত হয়ে শ্রীরাম বললো, অনেকটা সার্কাস রিঙের বাঘের মতো যা রিং মাস্টারের নির্দেশে গর্জন তুলে ঠিক জায়গায় এসে পড়ে। জগদীশ তার পাশে বসে মন্তব্য করলো, ‘আর যদি ভাবো যে পুলিশ তোমাকে তাড়া করলেই ভাল যাতে করে পুরানো কসাইখানায় তোমাকে আটকে রাখতে পারে, তাহলে তুমি ভুল করবে। তারা এ ধরণের কিছুই করবে না: সেটা শুধু মহিলাদের জন্য সংরক্ষিত।’ পুরানো কসাইখানার নাম শুনে শ্রীরাম নরম হলো। পুরানো কসাইখানা সঙ্ঘ সবার জন্য সন্তোষজনক নাও হতে পারে, কিন্তু শ্রীরামের কাছে নামটি সর্বোচ্চ খুশির অনুষঙ্গ এবং খুবই গভীর এক শান্তিবোধের উদ্রেক করলো। ‘পুরানো কসাইখানা? পুরানো কসাইখানা?’ অনেক দিন পর এই প্রথম বার বালখিল্য মনোভাব গ্রহণ করে শ্রীরাম বললো। ‘পুরানো কসাইখানা, শব্দটা খুবই পরিচিত! আমাদের সাথে এর সম্পর্ক কী?’ ‘এর গুণ হচ্ছে যে এটা পুরানো কসাইখানা এবং নতুন নয়, ’ জগদীশ বললো। ‘অনেক ছাগলই এই ভবনে ঢোকার সময় কাঁপতে থাকে, কিন্তু এতে তুমি হাসবে আর মজা করবে। জায়গাটার সব জবাই বিস্মৃত...। তবুও এটা এমন একটা জায়গা যা হৃদয়কে হানা দেয়, তাই না?’ সে বললো। শ্রীরাম পুরোপুরি খুশি বোধ করলো। তার বাকি দিনগুলো সে কসাইখানার গল্প বলে যেতো: এক ধরণের আফিম তাকে রাজনীতি, ইতিহাস, পুলিশ এবং তার নিজের নিঃসঙ্গতা সম্পর্কে ভুলিয়ে রাখলো। ‘জায়গাটা দেখতে যেতে চাইলে তোমার ভাল সত্ত্বাটার কিছু পরিবর্তন সাধন করতে হবে,’ জগদীশ বললো। ব্যাখ্যা করলো, ‘প্রথমত, পুলিশ যে ছবিটা প্রকাশ করেছে তার থেকে ভিন্ন চেহারায় তোমাকে অবশ্যই আবির্ভূত হতে হবে। কেউ পুলিশকে জানিয়ে টাকা কামাতে চাইলে তাকে সেটা করতে সাহায্য করা তোমার ঠিক হবে না। আমার তো ভয় হচ্ছে পুলিশ তোমার ছবি সর্বত্র ছাপিয়ে দিয়েছে, আর কোনো রাস্তার ছেলে তোমাকে বিদ্রুপ করতে পারে। কারো ছবি ছাপানোর খারাপ দিক এতে প্রকাশ পায়। এ ব্যাপারে আমার একটা সুবিধা আছেÑÑ আমার নিজের কোন ছবি নেই, আর তারা শুধু আমাকে বর্ণনা করেছে: অন্যদের ছবি তুলতে এত ব্যস্ত থাকায় নিজের ছবি তোলার কোনো সময় নেই। ছায়াছবির তারকার মতো তুমি তোমার প্রতিকৃতি ছড়িয়ে বেড়াচ্ছো।’ ‘হ্যাঁ, হ্যাঁ,’ কাতরভাবে শ্রীরামকে সম্মত হতে হলো। এক টাকায় চারটা দ্রুত সস্তা ফটোর কথা সে স্মরণ করলো যাতে সে ধনী হওয়ার পর কোনো এক সময় আসক্ত হয়েছিলো। প্রায়ই শ্রীরাম তার ছবিগুলো ফটোগ্রাফারের বিজ্ঞাপন বোর্ডে প্রদর্শিত হতে দেখেছিলো; আর তার বাড়ির দেয়ালগুলো নিজের ছবিতে ভরা ছিলো। তার মনে পড়লো ঠাকুরমার কথা, ‘আমাদের যুগে মানুষ দেবতা আর পূর্বপুরুষদের প্রতিকৃতি টাঙিয়ে রাখতো, আর তুমি তোমার নিজেরটা ছাড়া কিছুই রাখোনি!’ আমি ভেবে পাই না তুমি এমন করো কেন?’ ‘এর মানে কি পুলিশ কবীর সরণীতে আমাদের বাড়ি থেকে ছবিগুলো নিয়েছে?’ আকস্মিক এক ভাবনায় পীড়িত হয়ে শ্রীরাম জিজ্ঞেস করলো। ‘অবশ্যই। প্রথমে তারা এটাই করে থাকবে।’ ‘ঠাকুরমা কী বলেছিলো, ভাবছি।’ ‘তোমাকে পরের বার দেখলে তিনি আবার বলবেন। দুশ্চিন্তা করো না,’ সে জবাব দিলো। শ্রীরামকে নিবিড়ভাবে পাঠ করে সে বললো: ‘তোমার চেহারা পরিবর্তন করতে হবে। জোরালো পরিবর্তন করতে হবে। প্রথমে ছোট করে সুন্দর গোঁফ জন্মাতে হবে, শেষের দিকটায় বেঁকে গেলে ছোট্ট গোঁফে তোমাকে মোঙ্গলের মতো লাগবে। কিন্তু ওতে মন ভার করো না, তারা তোমাকে খুঁজছে, মোঙ্গলকে নয়। এরপর তুমি কি মনে করো ছবিটা পূর্ণাঙ্গ করতে তোমার ক্রপ কাট কামিয়ে ফেলতে হতে পারে?’ পুরানো চুলের গোছা ফেলে দিতে এবং বর্তমান ক্রপ কাটের চুল গজাতে যে সব মনোবেদনা সে পেয়েছিলো তা স্মরণ করে এ পরামর্শে শ্রীরামে মনে ভয় হলো। প্রথম প্রথম ঠাকুরমা এতে কান দেয়নি। তিনি নিশ্চিত ছিলেন যে এতে তার চেহারা নষ্ট হবে, কিন্তু একদিন শ্রীরাম নাপিতরা যে টেম্পল ট্যাংকে বসে মক্কেলদের চুল কাটে সেখানে চট করে গেলো। পুরানো এক নাপিতকে ফুসলিয়ে তার চুলের গোছাটা কাটিয়ে নিয়ে যন্ত্রটি কানের উপর দিয়ে চালিয়ে নিলো। আর নিজের সীলকৃত টাকার বাক্স থেকে চুরি করা পকেটের পুরোটা টাকা তার কোলে সে খালি করেছিলো। টাকা রাখার বাক্সটার ছিদ্র আরো বড় করে ঝাঁকিয়ে মুদ্রাগুলো বের করেছিলো যখন তার ঠাকুরমা রান্নাঘরে ছিলো। ঝনঝন শব্দ লুকাতে এক টুকরা কাপড় দিয়ে চেপে ধরে কাজ চালিয়েছিলো যতক্ষণ পর্যন্ত না তামার ছোট ছোট আট আনা বের হয়েছিলো। ঠাকুরমা রান্নাঘর থেকে চেঁচামেচি করেছিলো, ‘কীসের শব্দ রে?’ ‘কোন শব্দ?’, শ্রীরাম ফিরতি চিৎকার দিয়েছিলো, আর তার কাজ চালিয়ে গিয়েছিলো। ক্রপ কাটের জন্য নাপিত কত করে চাইতে পারে সে সম্পর্কে তার কোনো স্পষ্ট ধারণা ছিলো না। শ্রীরাম তা কমিয়ে ছয় আনায় এনে আরো দুই আনা অপ্রত্যাশিত খরচে দিয়েছিলো। কিন্তু ট্যাংকে বসা নাপিতটি শ্রীরামের ঘন কোঁকড়ানো চুলের গোছা ছেঁটে ফেলার জন্য এক টাকা দাবি করেছিলো। দর কষাকষি করে শ্রীরাম ছয় আনায় নামিয়ে এনেছিলো; নাপিত কাঁচির চুল কাটার তালে তালে হতাশজনক মন্তব্য অস্ফুটভাবে ছুঁড়ে দিচ্ছিলো। নাপিতের টিনের বাক্স থেকে তৈরী ছোট একটা আয়নায় শ্রীরাম নিজেকে দেখেছিলো, আর আনন্দিত হয়েছিলো। তার মনে হয়েছিলো সে কয়েক পাউন্ড চুল থেকে অব্যাহতি পেয়েছিলো। চুলগুলো ট্যাংকের পাথরের গায়ে পড়েছিলো। আর শ্রীরাম অজানা কারণে শরীরের এই বাড়তি অংশ দেখে কীভাবে কেঁপে উঠেছিলো তা স্মরণ করলো। চুলগুলো ছিলো লম্বা ও কোঁকড়ানো। সে বলেছিলো: ‘এগুলো বিক্রি করলে দশ টাকা পাবেন।’ এ পরামর্শে নাপিত ক্ষেপে গিয়ে বলেছিলো: ‘আপনি আমাকে চুলের হকার মনে করে ভুল করছেন। মুখ সামলে কথা বলুন, যুবক। আপনি না হয়ে অন্য কেউ হলে গলা কেটে ফেলতাম। দেখুন, আমি কিছু চাই না, আপনার পরনের ধুতিটা শুধু আমাকে দিয়ে দেন: এরকম পরিস্থিতিতে এটাই স্বাভাবিক রীতি।’ শ্রীরাম ভীত হয়েছিলো: ‘আর আমি কী করে বাড়ি পৌঁছাবো? ‘এ ট্যাংকে গোসল করে কেউ লক্ষ করার আগে দৌড় দেন। ও! আপনার তো আবার ধুতির নিচে টুকরা কাপড়টা নেই? সেটাই আপনার বয়সী যুবকের জন্য যথেষ্ট হবে।’ এ কথা বলে সে শ্রীরামের ধুতির এক প্রান্ত ধরে প্রায় টান দিয়েছিলো, আর শ্রীরামের তাকে বেপরোয়াভাবে ফাঁকি দিতে হয়েছিলো। ‘ওহ্ !’ বিপুল বিস্ময়ে নাপিত চিৎকার করে উঠলো। তার অনুভূতি প্রকাশ করতে মুখটাকে অদ্ভূত করেছিলো। ‘আপনি কি বলতে চাচ্ছেন আপনি ইয়া ÑÑ নিয়ে চলাফেরা করেন।’ সম্মানিত ও সৎ নাগরিকদের অন্তর্বাস ও আধুনিক প্রজন্মের অভ্যাসের প্রাণবন্ত বর্ণনা দিয়েছিলো সে। বিষয়টা কোমরের এত নিচে গিয়েছিলো যে শ্রীরাম লজ্জা পেয়েছিলো। অবশেষে মোচড় দিয়ে মুক্ত হয়ে সে দৌড়ে পালিয়েছিলো। এখন এসব কিছু তার মনে ঝলক কেটে গেলো। হাতটা মাথায় রেখে আঙ্গুল চালনা করলো এবং জগদীশকে বললো: ‘এ ক্রপ কাট আমি ফেলে দিতে পারবো না। এটা আমার ভাল লাগে।’ কীভাবে তার চেহারা পরিবর্তন করতে পারে তা ভেবে ভেবে শ্রীরাম নির্ঘুম রাত কাটালো। এমনও ভাবলো যে পর্দাপরা মহিলার মতো ছদ্মবেশ নিয়ে তার মুখ আদৌ দেখাবে না। জগদীশ তার এসব ভাবনাকে হেসে উড়িয়ে দিলো। নিজের মতো করে চেহারার বিকৃতি সাধন করতে তাকে আগ্রহী মনে হলো; যতটা সম্ভব হাস্যকর করে ডিমের মতো করে চুল কাটাতে ইচ্ছুক মনে হলো। হয়তো জগতের হাসির পাত্র করে তুলতে এবং ভারতীর সাথে শেষ সুযোগটা নষ্ট করতে চাইলো সে । ভারতী বাকি জীবন তার মুখের দিকে দ্বিতীয়বার দেখতে চাইবে না। সে ভেবে পেলো না জগদীশ যে বুদ্ধি দিলো তা করতে কেন সে অস্বীকৃতি জানালো না। এমনকি কসাইখানাও বিরাট বাস্তব কৌতুক বা মোটের উপর প্রকৃত কসাইখানা হিসেবে দেখা দিতে পারে! কিন্তু তার আশঙ্কার কোনো মূল্য ছিলো না। যে ব্যাপারটা সে ভয় করতে পারে বা অনুভব করতে পারে তা ছিলো যে জগদীশ পালাতে পারবে না, আর সে যা আদেশ করেছিলো তা কাউকে না কাউকে করতে হবে। শ্রীরামের উপরের ঠোঁটে সম্মানজনক মোঁচ গজানোর জন্য জগদীশ তিন সপ্তাহ সময় দিলো। দ্রুত বৃদ্ধির জন্য এক বোতল মালিশ নারকেল তেল সে তাকে এনে দিলো। ‘ভারতীকে দেখার আগে আমাকে কতো কী করতে হবে!’ শ্রীরাম ভাবলো। দিনের পর দিন জগদীশ শ্রীরামের গোঁফ বৃদ্ধি যাচাই করলো। প্রতিবার অনুৎসাহীভাবে সে মাথা নাড়িয়ে সায় দিলো। ‘খুব ধীরে, খুব ধীরে, অনেক বেশি ধীরে,’ সে এমনভাবে বললো যেন শ্রীরাম নিজেই এজন্য দায়ী ছিলো। মাফ চাওয়ার ভঙ্গিতে শ্রীরাম তার জিহ্বা দিয়ে ক্লিক করে শব্দ করলো। তিন সপ্তাহ সময়টা কোনোভাবেই নষ্ট হয়ে যায়নি। জগদীশ সহযোগে ও তার দক্ষ নির্দেশনায় শ্রীরাম নানা ধরনের কাজ করেছিলো যা দেশের স্বাধীনতার লড়াইয়ে সাহায্য করবে বলে তার আশা ছিলো: বিভিন্ন গ্রামে অর্ধেক ডজন কোর্টের রেকর্ডে সে আগুন ধরিয়ে দিয়েছিলো; এক জোড়া ট্রেন লাইনচ্যূত করে নানা স্কুলের কাজ অচল করেছিলো; একটা স্থুল বোমা ফাটিয়ে কৃষি গবেষণা স্টেশনের প্রধান ফটক ছিন্নভিন্ন করে এর ছাই দিয়ে বিজয়ের ইংরেজি ‘ভী ’ তৈরি করেছিলো এবং প্রতীকটার উপর লিখেছিলো ‘ভারত ছাড়ো ’। এ কর্মকাণ্ডে সে এত পাকা হয়ে উঠেছিলো যে এক ধরনের বেপরোয়া ভাব তার মধ্যে বিকশিত হয়েছিলো। পুলিশকে তার কোনো ভয় ছিলো না: তারা তার কাছে দূরবর্তী, তাত্ত্বিক শরীর, তার বিষয়ে সম্পর্কিত নয় হিসেবে মনে হয়েছিলো। সে জানতো সবসময় সে পিছলে যেতে পারবে। যেখানে তাকে পাওয়া যাবে সেখানটা বাদে তারা সর্বত্র খোঁজ করছিলো। জগদীশ বারবার বলছিলো: ‘ব্রিটেন সালাম জানিয়ে ভারত ছাড়বে যদি তার প্রশাসনের মেরুদণ্ডটা আমরা ভেঙ্গে গুড়িয়ে দেই।’ মাঝে মাঝে সে বলতো: ‘তুমি জানো ব্রিটেনের মেরুদণ্ড কোথায়?’ ‘মনে হয়, তার পিছনে?’ শ্রীরাম মজা করে বলতো। ‘জানো তার পিছনটা কোনখানে?’ ‘তার সামনের পিছনটায়, মনে হয়,’ শ্রীরাম এবারও মজা করে বলতো। সে এ সময়টাকে উপভোগ করছিলো যা তার নিঃসঙ্গ, নোংরা, মানব সঙ্গ থেকে বিচ্ছিন্ন জীবনে স্বস্তি ছিলো। তার কূটকৌশল জগদীশ ক্ষমা করে দিয়েছেলো। ব্যাখ্যা করেছিলো: ‘কসাইখানার সম্ভাবনায় তুমি এমন ধারালো কথা বলছো, তাই না?’ অনেক ধৈর্য্য নিয়ে সে ব্যাখ্যা করেছিলো, ‘ব্রিটেনের মেরুদণ্ড অবশ্যই চূর্ণ করতে হবে, আর সেটা আছে আদালত, স্কুল, অফিস, রেললাইনে যেখান থেকে সে বাঁচার শক্তি পায়।’ এমন জটিল যুক্তি শ্রীরাম সহজে বুঝতে পারেনি। সে করুণভাবে জিজ্ঞেস করেছিলো, ‘তার সামনের দিকটাও আমরা ভেঙ্গে বিচূর্ণ করছি না কেন?’ ‘কারণ সেটা অনেক দূরে, আর আমরা অতদূর যেতে পারবো না।’ জগদীশ তাকে এখানে সেখানে নিয়ে গিয়ে তার যন্ত্র ও প্রতিনিধি বানালো। উত্তেজনা ও নতুনত্ব এবং সর্বোপরি পুলিশের সাথে লুকোচুরি খেলা শ্রীরাম আদতে উপভোগ করতে শুরু করছিলো। এতে সে রোমান্টিক গুরুত্বের অনুভূতি পেলো। তার মনে হলো যে সে মহাকাব্যের কোনো চরিত্র, আর তার কর্মকাণ্ডের উপর নির্ভর করে ভবিষ্যৎ ইতিহাস। কিন্তু মাঝে মাঝে এক ধরনের সন্দেহ তার মনে হানা দেয়। জগদীশের সাথে নালায় বসে লুকিয়ে থাকাকালীন রেল স্টেশন না সরকারি ভবন থেকে আগুনের শিখা জ্বলে উঠে রাতটাকে রোশনাই হতে দেখলো। একবার সে ফিসফিস করে বললো, ‘তোমার কি মনে হয় এ আগুনে ব্রিটেন আক্রান্ত হবে?’ জগদীশ দ্ব্যর্থহীনভাবে ঘোষণা করলো, ‘চার্চিল এ সম্পর্কে ইতোমধ্যেই জানবে। এতে সে গোঙাবে। রাত জেগে বসে থাকবে। সারা দেশে দিনের প্রতিটা ঘন্টায় এটা অবশ্যই চলতেই থাকবে যতক্ষণ না পর্যন্ত ব্রিটেন আমাদেরকে বলে, “ পোটলা পুটলি বেঁধে কালই আমরা চলে যাচ্ছি, আপনাদের দেশ নিয়ে যা করতে চান তা-ই করেন”।’ পরে শ্রীরাম জিজ্ঞেস করলো, ‘ভাবছি এ সব ব্যাপারে মহাত্মাজী কী বলবে!’ ‘জানি না,’ জগদীশ জবাব দিলো। ‘এটা তার পথ নয়। কিন্তু ফল সন্তোষজনক হলে, আমি নিশ্চিত, তিনি বলবেন, “তোমরা ভালই করেছো, বাছা ”।’ শ্রীরাম সন্দিহান বোধ করলো। মাথা নাড়িয়ে বললো, ‘আমি নিশ্চিত না। শুধু ভারতীই সঠিক জানে মহাত্মাজী কী ভাববেন বা বলবেন...।’ এরপর তার ভাবনা চলে গেলো কসাইখানার দিকে। জগদীশ এ বিষয়ে কিছুটা দুর্বল হলো মনে হলো: ‘আমরা তো ইচ্ছা করে কারো মৃত্যু ঘটাইনি। কোনো জীবন যেন হারিয়ে না যায় সে ব্যাপারে আমি সবসময় সতর্ক, কিন্তু আমাদের পূর্বসতর্কতা সত্ত্বেও কিছু লোক দূর্ঘটনাক্রমে বিশৃঙ্খলায় আটকে পড়ে মারা যাচ্ছে, আমাদের কিছু করার নেই।’ ‘আমাদের সাহায্য করতে জনতা যখন একত্র হয় তখন তাদের ছত্রভঙ্গ করতে পুলিশের দ্বারা অনেক লোক গুলিবিদ্ধ হয়।’ ‘কিন্তু সেটা তো আমাদের বিষয় নয়,’ জগদীশ বললো। আরো বললো, ‘যুদ্ধে জীবন হারিয়ে যেতে বাধ্য। যা হোক, এখনকার কাজটা যে কোনো তাত্ত্বিক জল্পনার চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ। বর্ধতে মহাত্মাজীর সাথে থাকাকালে তিনি আমাকে এ দর্শন শিখিয়েছিলেন। সে যাক গে, এসব বিষয় নিয়ে খুব বেশি ভেবো না। আমাদের নিজেদের সামর্থ্য মোতাবেক আন্দোলনের জন্য কাজ করতে তিনি আমাদের বলেছেন।’ ** একদিন জগদীশ শ্রীরামের মুখাবয়ব পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে ঘোষণা করলো, ‘আমার জীবনে এ যাবৎ দেখা সবচেয়ে সন্তোষজনক গোঁফ।’ রেজর ও কাঁচি দিয়ে গোঁফের প্রান্তটা নিচের দিকে মোড় নিতে সে শ্রীরামকে সাহায্য করলো। রূপার প্রান্তবিশিষ্ট পুরানো চশমাও তৈরি করলো এবং তার নাকের উপর বসিয়ে দিলো। সে তাকে বেখাপ্পা আঁটসাঁট বোতামওয়ালা কোট এবং মাথা ঢাকার জন্য সাদা পাগড়িও সরবরাহ করলো। সকল সম্মানিত মানুষের মতো ধুতিটা দুইভাগ করে বেঁধে পরতে সে তাকে আদেশ করলো। এসবের পরে শ্রীরাম আয়নায় দেখলো, যে ছোট্ট আয়নাটি দাঁড়ি-গোফ কামানোর সময় সে ব্যবহার করতো; এতে পুরো ছবিটা দেখা যায়নি, কিন্তু তার মন্তব্য করার মতো যথেষ্ট দেখা গেলো: ‘আমাকে পাইকারি চাল ব্যবসায়ীর মতো দেখাচ্ছে।’ জগদীশ প্রশংসাসূচকভাবে মাথা নাড়িয়ে সায় দিলো এবং কণ্ঠস্বরে বেশ আনন্দ নিয়ে বললো, ‘সত্যি, সত্যি...। তোমার কপালে যদি শুধু কালো জাতের চিহ্ন দিতে পারতাম, তাহলে ছবিটা আসলেই পূর্ণাঙ্গ হতো।’ সূর্যাস্তের পর প্রায় সাতটায় শ্রীরাম যখন সাহসিকতার সাথে বের হলো তখন সে এত ভিন্ন বোধ করলো যে সে ভেবো পেলো না ভারতী কখনো তাকে স্বীকার করুক তা কেন সে প্রত্যাশা করে। এ ভাবনায় সে মিটিমিটি হাসলো, ‘ভারতী ভাবতে পারে কেন ধনী একজন চাল ব্যবসায়ী হঠাৎ করে তার সাথে দেখা করার জন্য বেছে নিয়েছে।’ তার নাকের মাঝখানে চশমার কারণে হালকা একটু ব্যথা বোধ হলো, আর চশমাটি অনবরত নিচে নেমে যাচ্ছিলো তার অস্পষ্ট, কুয়াশাচ্ছন্ন দৃষ্টি দিয়ে জ্বালাতন করে। ‘এ সব কিছু হচ্ছে ভারতী পুলিশের কাছে আত্মসমর্পণ করতে উপদেশ দিয়েছিলো তা না শোনার জন্য!’ সে ভাবলো। ছোট্ট স্টেশনে সে মালগুদি গামী ট্রেনে চড়লো। সমস্ত লোককে উপেক্ষা করলো। ‘এসব লোকের সাথে কথা বলা কোনো আত্মসম্মানওয়ালা চাল ব্যবসায়ীর কাজ না।’ এ ভেবে সে উদাসীনভাবে সহযাত্রীদের দিকে তাকিয়ে বসলো। জগদীশ নিজেকে তীক্ষèধী হিসেবে প্রমাণ করেছিলো: গোঁফটা বিশাল একটা সম্পদ ছিলো; মনে হচ্ছিলো শ্রীরাম যেন মুখের উপর মুখোশ পরেছিলো, রূপান্তরটা এতো অনবদ্য ছিলো। মালগুদি স্টেশন থেকে বাজার রোড হয়ে কসাইখানা পর্যন্ত দক্ষিনে এক ঘন্টা হাঁটার রাস্তা ছিলো। পরিচিত রাস্তা ধরে যখন সে হাঁটলো, তখন শ্রীরাম ভাবাবেগপূর্ণ ও অখুশি বোধ করলো। মনে হলো এ জগৎ যেন যুগ যুগ আগে সে ত্যাগ করেছিলো। নিঃশব্দ ও অন্ধকার দোকানগুলোর সারির ওপারে ছিলো তার ঠাকুরমার বাড়ি। জগদীশ তাকে যথাযথ নির্দেশনা দিয়েছিলো। চাল ব্যবসায়ী পুরানো কসাইখানার পূবের দেয়ালের পিছনে হাঁটু গেড়ে নিচু হলো। ভারতী ঐ কোণায় টয়লেটের দিকে এসে বড় একটা পাথরে উঠে দাঁড়াবে, যে পাথরটি সেই উদ্দেশ্যে গড়িয়ে এমন অবস্থায় রাখা হয়েছিলো, এবং নিচে তাকিয়ে তার সাথে কথা বলবে। শ্রীরাম ভেবে পাচ্ছিলো না অন্ধকারে তার গোঁফটা ভারতী দেখতে পাবে কিনা, ভাবছিলো ভারতীর হাতটা ছুঁয়ে দেখার মতো নাগাল পাবে কিনা। ধৈর্য্য সহকারে সে অপেক্ষা করলো। তালুক অফিসের ঘন্টাধ্বনিতে সকাল দুইটা বাজলো। সে ঘুম ঘুম বোধ করলো। মনে পড়লো মহাত্মা যখন মালগুদিতে এসেছিলো , তখন ভোর তিনটায় ভারতী যে তাকে দেখা করতে বলেছিলো তার কথা। ‘অন্য মানুষের ঘুম নষ্ট করতে ভালবাসে বলে মনে হচ্ছে,’ সে ভাবলো। সেখানে মাটিতে বসে পড়লো। তালুক অফিসের ঘন্টাধ্বনিতে পরের ঘন্টা বাজলো। ‘এখানে কতক্ষণ থাকতে হবে?’ সে ভাবলো। ‘কেউ আমাকে নিয়ে মজা করছে না তো?’ ক্রুদ্ধ চিন্তা তার হৃদয়ে জাগ্রত হচ্ছিলো। ‘এই যে,’ একটা কণ্ঠস্বরের চিৎকার এলো। আশান্বিত হয়ে সে উপরে তাকালো। দেয়ালের উপরে একটা মাথা আবির্ভূত হলো, কিন্তু সেটা ভারতীর মাথা ছিলো না। সেটা ছিলো একজন ওয়ার্ড বালিকার। ‘কোথায়...?’ পায়ের বুড়ো আঙ্গুলে ভর দিয়ে প্রসারিত হয়ে বললো। ‘চুপ, ভাল করে শোনেন। সে আসবে না।’ ‘সে আসবে না?’ ‘না। এটা ধরেন।’ সে একটা চিঠি ফেলে দিলো। ‘এটা পড়ে চলে যান,’ মাথাটা বললো। কাগজের টুকরাটা হাতে শক্ত করে ধরে চাল ব্যবসায়ী চলে গেলো। মাথায় হাজার জল্পনা-কল্পনা ভন ভন করছিলো। রাস্তার প্রথম বাতির নিচে সে কাগজটা খুললো। এটি ছিলো মেমো প্যাড থেকে ছেঁড়া এক টুকরা কাগজ। এর উপরে তড়িঘড়ি করে পেনসিল দিয়ে হিজিবিজি করে লেখা ছিলো: ‘আজকে তোমার সাথে দেখা করতে পারছি না। এরকম অবস্থায় দেখা করাটা খারাপ মনে হচ্ছে। বাপু সবসময় বলেছে প্রতারণামূলক কৌশল অবলম্বন করা অসম্মানজনক। জেলের মধ্যে আমাদের নিয়ম-কানুন অবশ্যই মেনে চলতে হবে, নইলে খোলাখুলিভাবে সত্যাগ্রহ দিয়ে এসব বদলে দিতে হবে যদি সম্ভব হয়। আমাকে ক্ষমা করো। আবার দেখা হবে। কিন্তু তার আগে দয়া করে তোমার ঠাকুরমার সাথে দেখা করে এসো। এক বন্দী যে এখানে এসেছিলো সে আমাকে বলেছিলো যে তিনি খুবই অসুস্থ। তাকে দেখতে জীবনের ঝুঁকি নেওয়াটা তোমার দায়িত্ব। খুব বেশি দেরি হওয়ার আগেই যাও।’ ** যখন সে কবীর সরণীর ১৪ নম্বর সিঁড়ি বেয়ে উঠলো খুব বেশি লোক তাকে চিনতে পারেনি। সে দোকানদার ক্যানিকে বাড়ি থেকে বের হয়ে আসতে দেখলো। তার পিছনের দরজাটি হালকা করে বন্ধ করছিলো সে। সে শ্রীরামকে চেনেনি। মুহূর্তের জন্য সে ভুলে গেলো যে তাকে চেনা যেতে পারে না, আর প্রায় অনিচ্ছাকৃতভাবেই ‘ক্যানি!’ বলে ডাক দিলো। তার কণ্ঠস্বরে তার রূপ ধরা পড়লো। ক্যানি থেমে হঠাৎ চিৎকার করে উঠলো, ‘ওহ্,! আমাদের ছোট মনিব এসেছে। হায়, রাম, বাড়ি আর বৃদ্ধা ভদ্রমহিলা যিনি তোমার বাবা, মা, চাচাতো বোন, সবকিছু, তাকে ছেড়ে তুমি নিজে কী করে বেড়াচ্ছো। হৃদয় বলে কি তোমার কিছু নেই? ভগবানকে ধন্যবাদ যেকোনো ভাবে হোক তুমি এসে গেছো। কিন্তু তুমি অনেক দেরি করে ফেলেছো।’ ‘কেন?’ কেন?’ শ্রীরাম চিৎকার করে বললো। ‘কী হয়েছে?’ ‘তিনি মারা গেছেন। কাল রাত দশটায় মারা গেছেন।’ শ্রীরাম দৌড়ে তাকে ছাড়িয়ে বাড়িতে ঢুকলো। ঐ তো পুরানো পরিচিত জায়গায়, পুরানো ভাল হল বাতির নিচে বৃদ্ধা ভদ্রমহিলা শুয়ে আছে। তার গা জুড়ে সাদা কাপড় টানানো। পাশের বাড়ির দুইজন মহিলা তার পাশে জেগে বসে আছে। শ্রীরাম দুঃখ ভারাক্রান্ত হলো: পরিচিত বাড়ি, পুরানো বর্ষপঞ্জি এখনো ছাদের টাইলের নিচে পড়ে আছে: যে তামার পাত্রে তিনি খাবার পানি রাখতেন তা জানালার গোবরাটে এখনো আছে। তার প্রথম টাকা দিয়ে যে ইজি চেয়ারটা ঠাকুরমার জন্য এনেছিলো সেটা এখনো সে যেখানে রেখেছিলো সেখানেই আছে। অতীত জীবনকে এক নজর দেখলো সে। বাড়িটার যে কোণায় সে থাকতো সে কোণার উপরে গেলো এবং তার বই, কলম, কাপড়-চোপড় যাচাই করে দেখলো। পুরানো টিনের ট্রাঙ্কটির ঢাকনি খুলে ভেতরে দেখলো। যেসব জিনিসের সাথে সে বড় হয়েছিলো সেসব জিনিস সেখানে নিরাপদ ও ঠিকঠাকমতো আছে। যারা রাত জেগেছিলো তারা নীরস, ঘুমভরা চোখে শ্রীরামের গতিবিধি অনুসরণ করলো। শ্রীরাম কাঁদলো। কিন্তু অশ্র“ মুছে ফেলতে পারলো না; উপলব্ধি করলো যে তার চশমাটা ছিলো তার জন্য ঝামেলার: হঠাৎ সেটা খুলে নিচে ফেলে রাখলো এই মনে করে: ‘এ জন্য জগদীশের কাছে জবাবদিহি করতে হবে। নিজের সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করছি।’ দরজার প্রবেশ পথে ক্যানি দাঁড়িয়ে শ্রদ্ধাভরে দেখছিলো। ‘ঠাকুরমাকে কতো উদ্ধত দেখাচ্ছে! এখনও!’ সে চিৎকার করে বললো। ‘মহান একজন মানুষ’ ‘আমি বিশ্বাস করতে পারছি না ঠাকুরমা মরে গেছে। তাকে ঘুমন্ত দেখাচ্ছে! তুমি কী করে জানো যে সে মরে গেছে?’ শ্রীরাম জিজ্ঞেস করলো। ক্যানি শুধু গুরুগম্ভীরভাবে হাসলো। ‘তুমি বরং তোমার সব আত্মীয়-স্বজনকে টেলিগ্রাফ করো। আমি নিশ্চিত যে অনেকেই তার মুখটা শেষবারের মতো দেখতে চাইবে।’ বৃদ্ধা ভদ্রমহিলার পাশে মেঝেতে বসে শ্রীরাম ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদলো। মহিলারা কিছুক্ষণ তার দিকে তাকালো, আর শোকাতুর নীরবতায় হারিয়ে গেলো। তাদের একজন ক্যানির দিকে ঘুরে জিজ্ঞেস করলো, ‘পৌঁছানোর মতো সে-ই কি একমাত্র আত্মীয় নাকি আরো কারো জন্য অপেক্ষা করবো আমরা?’ ক্যানি প্রশ্নটা উপেক্ষা করতে অধিকতর পছন্দ করলো। রাতটি একেবারে শান্ত ও নীরব ছিলো। রাস্তার কুকুরগুলোও ঘুমিয়ে ছিলো। নি¯প্রভ আলোর নিচে কথোপকথনরত মৃদু কণ্ঠস্বর ব্যতীত ঠাকুরমার নিজের দৃষ্টান্ত অনুসরণ করে সারা দুনিয়া ঘুমিয়ে ছিলো। শ্রীরাম হঠাৎ দাঁড়িয়ে ক্যানির কাছে গিয়ে তার বাহু দিয়ে ক্যানির কাঁধ জড়িয়ে ধরলো, আর ফিসফিস করে বললো, ‘ক্যানি, আমার খুব ক্ষুধা পেয়েছে। দোকানটা খুলে আমাকে খাওয়ার মতো কিছু দিতে পারবে? রান্নাঘরে কিছুই নেই।’ ‘কীভাবে কিছু থাকবে? তিনি এতদিন ধরে অসুস্থ ছিলেন; ঐ ভদ্রমহিলাগুলো তার জন্য দুধ ও জই মণ্ড আনছিলো।’ ‘আমার খুব ক্ষুধা পেয়েছে, ক্যানি,’ আবার শ্রীরাম করুণভাবে বললো। চাবিগুলো ঝন ঝন শব্দ করে ক্যানি বললো, ‘আমার সাথে এসো।’ তারা রাস্তা পার হলো। ক্যানি তার দোকানের দরজাটা খুলে বাতি জ্বালালো। শ্রীরাম উঁচু বেদিটাতে উঠে ভেতরে ঢুকলো এবং ভেতর থেকে আবার দরজার খিল লাগিয়ে দিলো। দোকানটা গরম ও গুমোট ছিলো। ঝোঁকায় ঝোঁকায় কলা ঝুঁলে ছিলো, আর বন রুটি ও বিস্কুটে বিভিন্ন কাচের পাত্র ভরা ছিলো। আর সবকিছু অবশ্যই আপেল গাল সমেত ইউরোপিয়ান রাণীর অধীনে ছিলো। দোকানটা ছিলো গুমোট বলে শ্রীরাম অভিযোগ করলো । ক্যানি ব্যাখ্যা করলো, ‘আমি চাইনা কেউ তোমার উপস্থিতিকে সন্দেহ করুক। যদিও তোমাকে ধরিয়ে দিয়ে পুরস্কার সংগ্রহ করাটা এই দুঃসময়ের ব্যবসা চালানোর থেকে অধিকতর ভাল ব্যাপার হিসেবে প্রমাণিত হতে পারে!’ শ্রীরাম কেমন ক্ষুধার্ত ছিলো তা সে উপলব্ধি করেনি। সে চাইলো আর যা দেখলো তা সবই খেয়ে ফেললো। ক্যানি একটা কাগজ বের করে হিসাব করলো: ‘দুই টাকা চার আনা হবে। তোমার অ্যাকাউন্ট থেকে কেটে নেবো।’ এখন শ্রীরাম আর ক্ষুধার্ত নয়। সে বললো: ‘ঠাকুরমার ব্যাপারে আমাকে বলো। তার কী হয়েছিলো?’ উত্তর দেওয়ার আগে ক্যানি কিছুক্ষণ থেমে থাকলো। ‘যদি ঠিকমতো বলতে পারি, তবে এ বাড়িতে পুলিশ এসে তোমার খোঁজ করার পর থেকে তিনি তার আসল মেজাজ হারিয়ে ফেলেছিলেন। তার সব সময় মনে হয়েছিলো যে তুমি তার সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করেছো। মহাত্মা এবং আরো অনেক কিছু সম্পর্কে তুমি সব জানতে পারো, কিন্তু তিনি যা জানতেন তা ছিলো তেমন যেমনটা লোকজন তাকে বলেছিলো যে তুমি একটা মেয়ের পিছু নিয়েছিলে। বৃদ্ধা ভদ্রমহিলা খুবই আঘাত পেয়েছিলেন। এরপর তিনি ঘরের বাইরে প্রায় বেরই হতেন না, আর পুলিশ যখন তোমার ছবি নিতে এসেছিলো, তখন তিনি খুবই ঘাবড়ে গিয়েছিলেন। তার মনে হয়েছিলো যে তিনি আর লোকের সামনে মাথা তুলে দাঁড়াতে পারবেন না। তিনি সবসময় বলতেন তুমি তার সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করেছো। পুলিশ এসে আমাকেও তোমার সম্পর্কে প্রশ্ন করেছিলো। আমি বলেছিলাম, “আপনারা শুধু আমার দোকানের সময়টা নষ্ট করছেন। তার বাড়ির বিপরীতে আমার একটা দোকান থাকার মতো দূর্ভাগ্য আছে বলে শহরের প্রত্যেকটা গুণ্ডার ব্যাপারে আমাকে জ্বালাতন করবেন না।” আর এতে তারা সন্তুষ্ট হয়েছিলো। তুমি যদি তাকে না বলে চলে না যেতে! এতে তিনি অত্যন্ত দুশ্চিন্তায় পড়েছিলেন। তিনি বলেই যাচ্ছিলেন, “ গাভীর দুধ খাইয়ে বড় করলেও ছোট্ট একটা কোবরা কী করতে পারে? এটা শুধু তা-ই করতে পারে যা সে শিখেছে। শ্রীরাম এমন তুলনায় দৃশ্যত বিরক্ত হলো। ‘সে খুবই রুক্ষ-ভাষী ছিলো, সে জন্য তাকে আদৌ কিছু না বলে আমি চলে যাওয়াটাই বেশি পছন্দ করেছিলাম। এমন অযৌক্তিক চরিত্রের সাথে কারো কথা বলার কী সুযোগ ছিলো?’ কিছুক্ষণ সে ভুলে গেলো যে সে মৃত কারো সম্পর্কে কথা বলছিলো। ‘লোকজন এসে তোমার সম্পর্কে তাকে চুল-খাড়া করা গল্প বলেছিলো। তোমার কর্মকাণ্ডে তিনি ভীত হয়েছিলেন। তোমার কী হয়েছিলো? আমি কখনোই ভাবিনি এত আগ থেকে যে ছোট মনিবকে আমি চিনতাম সে কখনো জিগোমার হতে পারে।’ পুরানো ধ্রুপদী এক ডাকাতের সাথে তুলনা করায় শ্রীরাম আহত বোধ করলো। অনেক আত্ম-করুণা নিয়ে সে বললো, ‘ঠাকুরমাকে দেখতে ইচ্ছা না করলে আমি আসতাম না।’ ‘তা সত্য, ’ ক্যানি বললো। ‘বাজার রোডের ডাক্তার তাকে প্রায়ই দেখতেন; শেষ সন্ধ্যায়ও তিনি তার নল ও সূঁচ নিয়ে সেখানে ছিলেন, আর তোমার ঠাকুরমা মারা যাওয়া পর্যন্ত ছিলেন।’ ‘সে কি সব সময় কথা বলছিলো?’ শ্রীরাম জিজ্ঞেস করলো। ‘বলেনি, কিন্তু বলে থাকতে পারে। এখন ওসব ভাবছো কেন?’ ক্যানি বললো। ‘পরবর্তীতে আমাদের কী করা উচিৎ চলো তা-ই নিয়ে ভাবি।’ ‘হ্যাঁ, কী করতে হবে?’ ‘শ্রাদ্ধ। এটা তাড়াতাড়ি সেরে ফেলো। আত্মীয়-স্বজনের জন্য অপেক্ষা করছো নাকি?’ এ রকম কঠিন ও জটিল গৃহস্থ সমস্যায় সে অনভ্যস্ত ছিলো। এগুলো নিয়ে সে গভীরভাবে চিন্তা করলো। ‘আত্মীয়-স্বজন’ বলতে তার চাচার চাচা-র কথা শুধু মনে এলো যার কালো উত্তরসূরীর সাথে তার বিয়ে হওয়ার কথা ছিলো। আর মনে পড়লো নানান জনের সমাবেশে একটা দলের কথা যারা তাদের গ্রাম থেকে মাঝে মাঝে এক বেলা বা দুই বেলা খাবারের জন্য হাজির হয়ে সব সময় জমি ও মামলা-মোকদ্দমা নিয়ে কথা বলতো। ঠাকুরমার কাছে তাদের কথাবার্তা মনোমুগ্ধকর লাগতো এবং শ্রীরামের আসা-যাওয়া খেয়াল করতে ভুলে যেতো, যখন সে সাধারণত চুরি করে নিকটবর্তী সাইকেলের দোকানে গিয়ে একটা বাইসাইকেল ভাড়া করে পেডেলে ভারসাম্য আনতে শিখতো। আবার সেই সমস্ত জনতাকে একত্র করার দায়িত্ব নেওয়ার আকস্মিক দৃশ্য শ্রীরাম কল্পনা করলো: তারা লাশের চারপাশে দাঁড়িয়ে তাদের জমি ও মামলা-মোকদ্দমা নিয়ে বিলাপ করতে পারে। এ ভাবনায় সে ভীত হলো। বললো: ‘আমি কাউকে পরোয়া করি না।’ ‘হ্যাঁ, আমি জানি। আমারও মনে হয় লাশটাকে বেশিক্ষণ রাখা তোমার ঠিক হবে না। বেশি ভাল হয় তাড়াতাড়ি শ্রাদ্ধ করে ফেলা। কিন্তু বৃদ্ধা ভদ্রমহিলা অন্তত এই তৃপ্তি পাক যে তার নাতি তার চিতায় আগুন ধরিয়েছে। এতে তার আত্মা শান্তি পেতে পারে।’ ‘এসব বিষয়ে কী করতে হয় আমি তো জানি না,’ শ্রীরাম বিলাপ করলো। ‘আমি তোমাকে সাহায্য করবো,’ ক্যানি বললো। ‘একটা বিষয়। শ্রাদ্ধ যাত্রায় আমি যেতে পারবো না,’ শ্রীরাম বললো। ‘অন্য বিষয়গুলো তুমি সামলে নিলে আমি শেষে আসতে পারবো।’ ‘পুলিশও এখন নাক গলাবে না। হাজার হলেও তারাও তো মানুষ।’ ক্যানি বললো। শ্রীরাম বাড়িতে গিয়ে তার ঠাকুরমাকে আরেকবার দেখে নিলো। যে দুজন রাত জাগছিলো তারা ঘুমিয়ে পড়েছে। হাত মেঝেতে রেখে কুঁজো অবস্থায় কোঁকড়া হয়ে লাশটির পাশে ছিলো, ‘ঠাকুরমার চেয়ে ওদেরকে বেশি মরা দেখাচ্ছে,’ শ্রীরাম ভাবলো। কোথায় যেন একটা মোরগ ডাকলো। শ্রীরাম তার পিছনের দরজাটি আলগোছে বন্ধ করে বেরিয়ে পড়লো। এদিকে ক্যানি দোকানে তালা মেরে ফিরে আসলো। ‘তার দায়িত্ব তোমার উপর,’ শ্রীরাম বললো। ‘আটটায় ওখানে থাকবে? সব কিছু সুন্দরভাবে করো। খরচ নিয়ে ভেবো না।’ ‘হ্যাঁ, আমি জানি। আমার ঋণ সব সময় ফেরত পাবো। তোমার অ্যাকাউন্টের বিস্তারিত আমি রেখে দিয়েছি। এক আনা নিয়েও তোমার সন্দেহ থাকা উচিৎ নয়। মাঝে মাঝে ডাক্তারকে যা শোধ করে আসছি তাও অ্যাকাউন্টে রেখে দিয়েছি। তুমি কি নিশ্চিত তার আত্মীয়-স্বজন পরে আমাদের সাথে রাগ করবেন না?’ ‘তারা রাগলো না খুশি হলো সেটা তুমি ভাবছো কেন? তাদের সাথে আমাদের কী সম্পর্ক? এক দল অথর্ব গেঁয়ো ভূত,’ কণ্ঠে কিছুটা অযথা তিক্ততা নিয়ে শ্রীরাম বললো। প্রায় আটটার সময় সরায্যু নদীর ওপারে শ্মশানে শ্রীরাম উপস্থিত হলো। আগের দিন যে এক জোড়া চিতা জ্বালানো হয়েছিলো তা এখনো ধিকিধিকি জ্বলছে। এখানে সেখানে বাঁশ ও লাশের কাপড়ের টুকরা ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে। একটা শ্রাদ্ধ যাত্রা নালাপা কুঞ্জ পার হচ্ছিলো। খাঁটলিটা ছিলো ফুলে সজ্জিত, আর কিছু লোক সাদা শার্ট ও আঙ্গুলে আঙটি পরে লাশটিকে কাঁধে নিয়ে যাচ্ছিলো। ‘অবশ্যই পরম আত্মীয় হবে,’ সে ভাবলো। ‘ওরা ভার বইছে। কিন্তু বেচারি ঠাকুরমাকে বয়ে নেওয়ার কেউ নেই।’ গ্রামের সেইসব আত্মীয়দের ভেবে আবার সে রাগান্বিত বোধ করলো। চরম গরম ছিলো যদিও তখনও সকাল আটটা বাজেনি। ‘এ জায়গাটা খুব গরম,’ সে ভাবলো। গরুর গাড়ি নদী পার হচ্ছিলো, গ্রামবাসীরা শহরে যাওয়ার পথে তাদের মাথায় ঝুঁড়ি নিয়ে অবিরাম বকবক করছিলো। নদীতে স্নান করতে আসা লোকদের সে লক্ষ করলো। চোখে যা যা দেখলো তা তার মনে নীরস সুর বাজালো। এখন তার মূল কাজ হলো ঠাকুরমার আগমনের জন্য অপেক্ষা করা। ওরা এতক্ষণ কথা বলছে কেন? হয়তো পুরোহিতরা লাশটা ধরেছে যাতে করে তারা শ্রাদ্ধ মন্ত্র পাঠ করার জন্য বেশি করে টাকা পায়। কিংবা পুলিশ কি শ্রাদ্ধ যাত্রা আটকাতে পারে? অদ্ভূত একটা ভয় তাকে কিছুক্ষণ পেয়ে বসলো পাছে পুলিশ অসদাচরণ সন্দেহে লাশটা ময়না তদন্তের জন্য আটকে রাখে। ঘনিষ্ট আত্মীয়-স্বজনের বয়ে আনা আরেকটা আদুরে লাশ গেট দিয়ে এখন ভেতরে এনে মাটিতে রাখা হলো। তারা আনুষ্ঠানিক অনেক কর্মকাণ্ড সারছিলো...। ঠাকুরমার চিতাও ছোট একটা বেদীতে শুকনো গোবর দিয়ে নির্মিত হচ্ছিলো: আর সব আয়োজন দেখাশুনা করছিলো ক্যানির দোকানের সহকারি যে জ্বালানি সরবরাহকারীদের সাথে দর কষাকষি করছিলো এবং শ্মশান সহযোগীদের এটা সেটা আদেশ করছিলো। তারা তার কথা প্রফুল্ল মেজাজে শুনলো। এতে শ্রীরাম অবাক হয়ে ভাবলো কেন তারা তার কথা শুনছিলো। ‘কোনো কোনো মানুষের রক্তকে সব ধরণের মানুষই সম্মান করে,’ ধনীরা তাদের হাতে লাশ নিয়ে যে আধিখ্যতা দেখাচ্ছিলো তাতে কিছুটা ঈর্ষান্বিত হয়ে শ্রীরাম ভাবলো। আগুনের গোলা হাতে ক্যানির নেতৃত্বে দুজন প্রতিবেশি, তহবিল অফিসের ম্যানেজার এবং দুজন পুরোহিতসহ চারজন ভয়ানক মানবেতর পেশাদার বাহক বাঁশের চিতায় করে ঠাকুরমাকে পৌঁছে দিলো। যাত্রায় মোলাকাত করার জন্য শ্রীরাম ছোট কাঠের দরজার প্রবেশপথে ছুটে গেলো। ক্যানি প্রথম এগিয়ে এলো। আগুনের গোলাটা শ্রীরামকে ধরতে দিয়ে সে বললো, ‘আসলে এটা বহন করা তোমারই কর্তব্য।’ শ্রীরাম দায়িত্বটা নিলো। ঠাকুরমার মুখখানি অনাবৃত হয়ে সূর্যের মুখ করে ছিলো। এটা দেখে শ্রীরাম নতুন করে দুঃখ-বেদনা অনুভব করলো। খাঁটুলিটা মাটিতে রাখা হলো। ‘শ্রীরাম, তাড়াতাড়ি নদীতে স্নান করে ভেজা কাপড়ে চলে আসো। এতটুকু বিচার-বিবেচনার অধিকার অন্তত তার আছে।’ কথাগুলো বললেন পরিবারের বৃদ্ধ পুরোহিত। শ্রীরাম অনুধাবন করলো যে সে এখনো পাইকারি চাল ব্যবসায়ীর পোশাকে আছে, আর এতে হাস্যকর বোধ করলো। শ্রীরামের যতদূর মনে পড়ে বৃদ্ধ পুরোহিত তার প্রথম জন্মদিন মহাসমারোহে উদযাপনসহ ঘরোয়া উৎসব-অনুষ্ঠানাদি পরিচালনা করতো। বৃদ্ধ লোকটি ঠাকুরমার কয়েক বছর বড়, কিন্তু চিকন হলেও উল্লেখ করার মতো বেশ বলিষ্ঠ ও সতর্ক ছিলো। চোখদুটো ছিলো সবুজাভ ও নাক ছিলো বাঁকানো, আর অনুষ্ঠানিদির টাকার প্রতি ছিলো তার লোভ । তিনি শ্রীরামকে জিজ্ঞেস করলেন, ‘তোমার কাছে কি দু’টাকার মুদ্রা হবে?’ শ্রীরাম উত্তর হাতড়াতে গেলে সদা-সতর্ক সেই ক্যানি ক্রুদ্ধ হয়ে তার উপর চড়াও হলো, ‘আপনি সেটা জিজ্ঞেস করছেন কেন? সব কিছুর জন্য আপনাকে টাকার একটা অঙ্ক দিতে আমরা চুক্তিবদ্ধ হয়নি?’ লাশের পাশে উবু হয়ে বসা পুরোহিত ঘুরে বললো, ‘কে বলেছে এর মধ্যে সে অঙ্ক আছে? এটা তো কখনোই ওর মধ্যে যেতে পারে না। এটা আলাদা হিসাব। আমাদের বড়রা আদেশ জারি করেছিলো যে নিকটতম ও প্রিয়তম মানুষের কাছ থেকে ‘প্রিয় বিদেহী ’র বুকে দু’টি রৌপ্য মুদ্রা থাকা উচিৎ। বলা হয়ে থাকে এতে পরপারে আত্মার যাত্রা সহজ হয়। শাস্ত্রে যা বলা আছে আমি শুধু তা-ই বলছি। আমাদের পূর্বপুরুষরা জানতেন আমাদের জন্য সবচেয়ে কী ভাল ছিলো, আমি মুখপাত্র মাত্র।’ ‘আর মুদ্রাগুলোর কী হয়েছে?’ তহবিল অফিসের ম্যানেজার জিজ্ঞেস করলেন। পুরোহিত প্রশ্নটি উপেক্ষা করার ভান করলেন, কিন্তু ক্যানি বললো, ‘অন্যান্য মুদ্রার মতোই সেগুলো পুরোহিতের টাকার বাক্সে গেছে।’ ‘জ্বী, গেছে। আপনারা কি প্রত্যাশা করেন যে আত্মাটা রৌপ্য বহন করে নিয়ে যাক? আপনাদের সঠিক আলোকে এটা দেখতে হবে, শুধু এর দার্শনিক অর্থটাকেই আপনাদের গ্রহণ করতে হবে। এ ধরাধাম থেকে আমরা কিছুই নিয়ে যাই না,’ এই বলে পুরোহিত সংস্কৃত একটা পংক্তি আওড়ালো। হঠাৎ করে শ্মশানের অপর প্রান্তে তার নজর গেলো যেখানে ধনী লোকগুলো তাদের শ্রাদ্ধের কাজ-কর্ম পরিচালনা করছিলো। ‘ঐ যে দেখেন। ওনারা খুবই নিবেদিত এবং শুদ্ধ। কোনো আচারকে ওরা বাদ দিচ্ছে না।’ ‘আমরাও কোনোকিছু বাদ রাখছি না,’ ক্রুদ্ধ হয়ে ক্যানি বললো। তার কথার সুরে পুরোহিত ভয় পেয়ে গেলো, আর বিড়বিড় করে বললো, ‘মনে করবেন না যেন আমি টাকার পেছনে ছুটছি: কয়েক দশক ধরে আমার চেনা এক মহান আত্মাকে সন্তুষ্ট করতে আমি শুধু এসব করছি।’ শ্রীরামের দিকে তাকিয়ে বললো, ‘এখন যাও, তাড়াতাড়ি করে স্নান করে আসো। স্নান না করলে কোনোকিছুই শুরু করা যাবে না।’ একটুখানি থেমে আবার বললেন, ‘ওখানে একজন নাপিতকে পাবে। তোমার গোঁফ ও মাথার উপরটা কামিয়ে নিতে হবে। নইলে তা নিয়মের ব্যত্যয় হবে। শাস্ত্রে বলা আছে...।’ ‘মাথাও কামাবো না গোঁফও কামাবো না,’ শ্রীরাম জোরালোভাবে বললো। ‘ঠিক আছে, ’ পুরোহিত বললো। ‘শাস্ত্রে যা বলা আছে তা বলে দেওয়া আমার কর্তব্য, আর সেটা মানবে কি কোনোভাবে সংশোধন করবে সেটা তোমার ব্যাপার। অবশ্য আধুনিক জীবনে সব নিয়ম মানা কঠিন, আর লোকজন নিয়মের সাথে খাপ খাইয়ে নেয়। এমনও লোক আছে যারা আজকাল ইউরোপিয়ান টুপি পরে তাদের শ্রাদ্ধ ক্রিয়া সাধন করে। এ ব্যাপারে কার কী করার আছে? “যা ঘটে তা মেনে চলাই জ্ঞানীর কাজ,” শাস্ত্রে বলা আছে, আর আমরা সে বিধিনিষেধের কাছে মাথা নত করি।’ শ্রীরাম এখন নদীতে স্নান সেরে ফিরলো, মাথার লেপটে যাওয়া চুলগুলো থেকে চুয়ে চুয়ে পানি ঝরছিলো এবং পরনের কাপড় শরীরের সাথে লেগে গিয়েছিলো। তারা এখন মৃতদেহটি চিতায় শুইয়ে দিলো। দূরের চিতাটি ইতোমধ্যে জ্বলছিলো এবং দলের লোকগুলি শ্মশান ত্যাগ করছিলো। ‘ওরা খুবই বাস্তববাদী,’ পুরোহিত বললো। ওরা যা করেছিলো তার সবই সে প্রশংসা করলো মনে হলো। শ্রীরাম আত্মসম্মানে আঘাত বোধ করলো, আর ক্যানি বললো, ‘অযথা কথা বলতে থাকবেন না।’ চিতা জ্বালানোর আগের আচার আরম্ভ হলো। বৃদ্ধা ভদ্রমহিলাকে গোবর জ্বালানীর উপর সোজা হয়ে শুয়ে রাখা হলো। শ্রীরামের হাতে ছোট একটা পাত্র দিয়ে পুরোহিত তাতে দুধ ঢেলে মৃত দেহটির ঠোঁটে দিতে বললো। শ্রীরাম দুধ ঢেলে কিছু মন্ত্র আওড়ালো এবং শেষে ঠাকুরমার বুকে আগুনটা ফেলে দিলো, যা আসলে জ্বালানীর নিচে ফেলেছিলো। আগুনটা ধিক ধিক করে জ্বলে পট পট শব্দ করলো। ‘এখন তার সব শেষ,’ শ্রীরাম বললো। তহবিল অফিসের ম্যানেজার হঠাৎ চিৎকার করে বললো, ‘ঐ যে দেখেন, দেখেন।’ তিনি উত্তেজিত হলেন। তিনি যেখানটা নির্দেশ করলেন তারা সেখানটায় তাকালো। ভদ্র মহিলার বাম পায়ের বড় আঙ্গুলটি নড়তে দেখা গেলো। ‘আগুনটা টেনে বের করো, আগুনটা টেনে বের করো...।’ কেউ একজন হাত ভেতরে ঠেলে দিয়ে জ্বলন্ত টুকরোটা ছিনিয়ে নিয়ে ফেলে দিলো। বৃদ্ধা মহিলার শাড়ির এক পাশ এর মধ্যে পুড়ে যাচ্ছিলো। শ্রীরাম এর উপর এক বালতি পানি নিক্ষেপ করে আগুনটা নিভিয়ে দিলো। এখন আগুন নিভে গেলে তারা চারপাশে দাঁড়িয়ে পর্যবেক্ষণ করলো। আঙ্গুলটা নড়ছিলো। ‘সে মরেনি, তাকে বের করো,’ শ্রীরাম চিৎকার করে বললো। ‘এমন কথা আমি আগে কখনো শুনিনি, আপনারা তা করতে পারেন না,’ পুরোহিত চেঁচিয়ে বললো। মনে হয় মানুষ হঠাৎ করে তাদের সব কাণ্ডজ্ঞান হারিয়ে ফেলেছে। ‘ঠাকুরমাকে আমরা জ্যান্ত পুড়িয়ে মারি আপনি সেটাই চান, তাই না? আমাদের পথ থেকে সরে দাঁড়ান, পুরোহিত,’ শ্রীরাম চিৎকার করে বললো। জ্বালানীর স্তুপটায় লাথি মেরে দেহটি তুলে আবার মাটিতে নেমে রাখলো সে। ‘আমি জানতাম কোথায় যেন একটা গরমিল ছিলো। জানতাম ঠাকুরমা মরবে না,’ শ্রীরাম বললো। তার মুখে জল ছিটিয়ে দিয়ে গলায় জোর করে কিছু দুধ দিলো এবং মুখে বাতাস করলো। পুরোহিত শোকার্ত অভিব্যক্তি নিয়ে এক পাশে দাঁড়িয়ে রইলো। ক্যানি এতই হতভম্ব হলো যে সে কথাই বলতে পারলো না বলে মনে হলো। দোকানের সহকারি চারদিকে দৌড়ে দৌড়ে আনন্দের সংবাদটা ঘোষণা করছিলো, আর মানুষ জড়ো করছিলো। তহবিল অফিসের ম্যানেজার চেঁচিয়ে বললেন, ‘চলেন আর সময় নষ্ট না করি। আমি ডাক্তার ডেকে নিয়ে আসছি।’ তিনি শহরের দিকে ছুটতে লাগলেন। ক্যানি চিৎকার করে বললো, ‘ওহ্ , আজকাল আবার কীসের ডাক্তার! তারা তো জানেও না কেউ বেঁচে আছে না মরে গেছে! আমরা সময়মতো খেয়াল না করলে... ওহ্ , কীসের ডাক্তার।’ তাদের সেবা-শুশ্রƒষায় আঙ্গুলটার নড়াচড়া ক্রমশ বিস্তার লাভ করলো। প্রথমে পায়ের সব আঙ্গুল তারপর পা, তারপর হাতের পুনরুজ্জীবিত হওয়ার লক্ষণ দেখা গেলো। বৃদ্ধা ভদ্র মহিলা একটু একটু করে জীবন ফিরে পাচ্ছিলো বলে মনে হলো। চোখদুটো এখনো বন্ধ। শ্রীরাম বিড়বিড় করে বললো, ‘ঠাকুরমা, ঠাকুরমা, চোখ খোলো। এই তো আমি এখানে।’ এ সময় সব রাজনীতি, সব বিবাদ ও যুদ্ধ, ব্রিটেন, এমনকি ভারতী- সব বিস্মৃত হলো। ‘ওঠো ঠাকুরমা, তুমি একদম ঠিক আছো।’ এখন ঠাকুরমার হৃদপিণ্ড ধুক ধুক করতে লাগলো, শ্বাস ক্রিয়া ফিরে এলো ক্ষীণভাবে। শ্রীরাম বিশাল স্বস্তির কান্না কাঁদলো। দোকান সহকারিকে ডেকে বললো, ‘আমার ঠাকুরমা মরবে না, সে মরেনি। ভগবান তাকে আশীর্বাদ করুন।’ ক্যানিকে হাত ধরে টেনে বললো, ‘ক্যানি, ঠাকুরমা বেঁচে আছে।’ এক হাতে ঠাকুরমার সেবা-শুশ্রƒষা করলো এবং আরেক হাত ক্যানির কাঁধ জড়িয়ে ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদলো। তার মুখখানি অশ্র“তে ভিজে গেলো। ক্যানি তার পিঠে হাত বুলিয়ে দিয়ে বললো, ‘না, কেঁদো না। মনে সাহস রাখো। তোমার ভেঙ্গে পড়লে তো চলবে না। তিনি চোখ খুলতে পারেন, আর তখন তাকে অবশ্যই সুখি মুখ দেখতে হবে।’ দূরে পুরানো একটা গাড়ির ঘট ঘট শব্দ শোনা গেলো। সবাই চিৎকার করলো, ‘ডাক্তারের গাড়ি।’ নড়বড়ে হুড সহ ছোট্ট গাড়িটা এখন নালাপ্পা কুঞ্জের মোড়ে বালু ও নুড়ির উপর দিয়ে শ্মশানের দক্ষিণ দরজাগামী এবড়ো থেবড়ো বালুময় পথ দিয়ে আসছে। ডাক্তার ছোট-খাট একজন মানুষ। পরনে ছিলো বড় সাদা ওভারল, আইনস্টাইনের মতো সামান্য কিছু চুলের ক্রপ কাট; ছোট একজন মানুষ যার পাশে সবাইকে টাওয়ারের মতো লাগতো। তিনি গাড়ি থেকে লাফ দিয়ে বের হয়ে তহবিল অফিসের ম্যানেজারকে অনুসরণ করলেন। ‘এ কি সত্যি, এ কি সত্যি?’ ডাক্তার সামনে ছুটে গিয়ে চিৎকার করে বললেন। হঠাৎ থেমে বললেন, ‘কেউ গিয়ে গাড়ি থেকে ঐ ব্যাগটা নিয়ে আসেন তো।’ এখন বৃদ্ধা ভদ্রমহিলার পাশে হাঁটু গেড়ে বসে তার কবজি হাতে নিয়ে নিজের ঘড়িটা টেনে বের করলেন এবং নিজের আঙ্গুলগুলো তার নাসারন্ধ্রের নিচে ধরে রেখে ক্যানিকে হেসে বললেন, ‘হ্যাঁ, তিনি তো মরেননি।’ ‘ওহ্, ডাক্তার, কেউ মরে গেছে না বেঁচে আছে তাও আপনি ঠিকঠাক বলতে পারেন না?’ ক্যানি জিজ্ঞেস করলো। ‘এখন ওসব কথা কেন? তিনি যে পরপার থেকে ফিরে এসেছেন চলেন সেজন্য আমরা খুশি থাকি।’ ডাক্তার গভীরভাবে ভাবলেন। তার অভিজ্ঞতায় এটাই এ ধরণের প্রথম ঘটনা। আগে তিনি শুধু একমুখী যান সম্পর্কে জানতেন। চিন্তাপূর্ণভাবে চিবুকে ঘষা দিলেন। ‘উনি কেমন আছেন, ডাক্তার?’ ক্যানি জিজ্ঞেস করলো। ‘ওনার নাড়ি তো ভাল। ঠিক আছেন। ওনার বিশ্রাম ও আরোগ্য লাভের প্রয়োজন।’ ব্যাগ থেকে কিছু জিনিস বের করলেন। একটা সিরিঞ্জ সূঁচ জীবাণুমুক্ত করে একটা শিশি তুলে নিলেন এবং ঠাকুরমার হাতের সামনের দিকটায় ইনজেকশন দিলেন। ঠাকুরমা সূঁচের স্পর্শে একটু নড়ে হালকা গোঙালেন। ডাক্তার তার দিকে প্রশংসাভরে তাকালেন। ‘হ্যাঁ, এ রকম খেয়ালী ঘটনা তো হয়ে থাকে। কেন বা কীভাবে হয় তা আমরা বলতে পারি না। গত রাতে তিনি বাস্তবেই মৃত ছিলেন। আমি জানি না। আত্মা, কর্ম এবং এসবে কারো বিশ্বাস স্থাপন করার জন্য এই যথেষ্ট।’ ডাক্তার তার দিকে তাকিয়ে ঠোঁট কামড়ালেন। ‘বেশ বছর আগে এক মেডিক্যাল সাময়িকীতে এ রকম একটা ঘটনা পড়েছিলাম কিন্তু কখনো ভাবিনি সেটা আমি স্বচক্ষে দেখবো।’ ঠাকুরমা একটু একটু করে পুনরূজ্জীবিত হয়ে উঠছিলেন। শ্বাস-প্রশ্বাস স্বাভাবিক হচ্ছিলো। ডাক্তার বললেন, ‘জ্ঞান পুরোপুরি ফিরে এলে তাকে এখানে রাখা ঠিক হবে না। অবশ্যই সরিয়ে নিতে হবে। তাকে বাড়ি ফিরে নিয়ে যাচ্ছেন না কেন? আমার গাড়িতে নেন।’ পুরোহিত মাঝখান থেকে বললো, ‘আপনি তা করতে বলছেন কেন? যাকে এখানে একবার বয়ে নিয়ে আসা হয়েছে সে কখনো আর শহরে যেতে পারে না। আপনি জানেন না এতে... এতে...।’ ‘কী হবে?’ ‘হবে! গোটা শহর আগুন বা প্লেগে ছাড়খাড় হয়ে যাবে। এটা খুবই অশুভ। যা খুশি করেন, কিন্তু উনি শহরে ফিরে যেতে পারেন না।’ এ দৃষ্টিকোণে অনেক সমর্থন মিললো। খবরটা শহরে ছড়িয়ে গেলো। লোকজন শ্মশানে জড়ো হতে লাগলো। যারা এলো তাদের সবাই বললো, ‘এ তো মস্ত বড় সমস্যা। ওনাকে নিয়ে আপনারা কী করতে যাচ্ছেন?’ ‘এ মত মেনে তাকে নদী তীরে ছোট পরিত্যক্ত এক ভবনে নিয়ে যাওয়া হলো, যে জায়গাটা এক সময় টোল তোলার স্টেশন ফটক হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছিলো, আর নদীটা যেহেতু শহর এবং ঠাকুরমার মাঝখানে ছিলো, সেহেতু তিনি শহরের সীমানার বাইরে ছিলেন। টোল অফিসে তাকে রেখে ডাক্তারের সেবা-শুশ্রƒষা দেয়া হলো। ক্যানি, তহবিল অফিসের ম্যানেজার, শ্রীরাম, বৃদ্ধ বাঁকা নাকওয়ালা পুরোহিত, দুজন শোকার্ত মহিলা যারা রাত জেগেছিলো তারা এবং নিজেকে ঘিরেই তার জগৎ গুঞ্জরিত হলো। পুরাতন ভবনটির বিছানায় শুয়ে তিনি খাওয়া-দাওয়া ও তাদের সেবা-শুশ্রƒষা লাভ করলেন। ডাক্তারের ছোট্ট গাড়িটা দিনে ছয়বার আসা-যাওয়া করতো এবং ক্যানি এখানকার কাজকর্ম করতে গিয়ে তার দোকানটা বস্তুত পরিত্যাগই করলো। অলৌকিক ঘটনাটি প্রত্যক্ষ করতে বিশাল জনতা হাজির হতে লাগলো। ঠাকুরমার কিছু ঘনিষ্ট আত্মীয় যারা তাকে অনেক বছর ধরে দেখেননি তারা এসে কান্নাকাটি করে বললো, ‘ওহ্, দিদি, তোমাকে দেখে যে কী ভাল লাগছে! কেউ আমাদেরকে কোনো খবর দেয়নি যে তুমি মরে গেছো।’ ‘খবর পাঠানো হয়নি কারণ পাঠানোর মতো কিছু ছিলো না।’ ‘কিন্তু কাছের কোনো আত্মীয় মারা গেলে, কি... নয়?’ ‘কিন্তু তিনি তো মারা যাননি, তো খবর পাঠানো কেন?’ ‘আপনি কী করে জানতেন যে মারা যায়নি?’ আত্মীয়রা জিজ্ঞেস করলো, আর কথোপকথন এভাবে চলতে চলতে বেশ খানিকটা বিভ্রান্তিকর মোড় নিলো। এতে শ্রীরামের ভয় হলো যে এ ভীড় ও প্রচারণা শেষ পর্যন্ত তাকে বিপদে ফেলে দেবে। নিজেকে সে এসব থেকে দূরে রাখতে চেষ্টা করলো। অনেক বেশি লোকজন পোঁছালে সে ভবনটির পেছনে চলে গেলো। অন্যদিকে ক্যানি ও অন্যরা দর্শনার্থীদের সামলে নিলো। সে দূর থেকে লোকজনকে বলাবলি করতে শুনলো, ‘ওনার সেই নাতিটা কোথায়?’ ‘ওহ্, সে দুঃসাহসী হয়তো বার্মায় আছে,’ ক্যানি বললো। কিন্তু এর কিছুতেই কোনো কাজ হলো না। সাধারণ পোশাকে এক পুলিশ পরিদর্শক ও দুজন কনস্টেবল তৃতীয় দিন বিকেলে এলো যখন শ্রীরাম তহবিল অফিসের ম্যানেজারের পাত্রে আনা খাবার ঠাকুরমাকে খাইয়ে ও নিজে খেয়ে টোল ফটকের ভবনটির পেছনে একটা গাছের ছায়ায় ঘুমাচ্ছিলো। ঠাকুরমা ও তার পরিচারিকারা শান্তিপূর্ণভাবে ঘুমাচ্ছিলো। পরিদর্শক শ্রীরামের দিকে তাকিয়ে বললো, ‘ওঠো।’ ‘কেন?’ শ্রীরাম উঠে জিজ্ঞেস করলো। ‘কী চান?’ ‘আপনাকে বন্দী করা হলো,’ পরিদর্শক বললো। ‘অনেক দিন ধরে আপনাকে খুঁজে বেড়াচ্ছি।’ ‘পুরস্কারটা কে পাবে?’ বেশ সংশয় নিয়ে শ্রীরাম জিজ্ঞেস করলো। পরিদর্শক কোনো উত্তর দিলো না। বললো, ‘যে বিশেষ উপলক্ষ আপনাকে এখানে এনেছে আমরা তা জানি, আর আমরা কোনো গোলমাল করতে চাই না যদি আপনি না করেন। সে জন্য আমাদের জীপটা ওখানটায় রেখে দিয়েছি। এতে আমার আরো কিছু লোক আছে। প্রস্তুত হলেই আপনি আমাদের সাথে আসতে পারেন। বেশি সময় নেবেন না।’ শ্রীরাম বললো, ‘জ্বী, আমাকে একটু সময় দিন।’ ‘আমার কাছে অস্ত্র আছে এবং আমি গুলি করবো যদি পালাতে চেষ্টা করেন,’ পরিদর্শক বললো। শ্রীরাম ঠাকুরমাকে এক নজর দেখতে গেলো। সে তাকে বসে থাকতে ও তার কাছে দুজনের সাথে কথা বলতে দেখলো। যে মুহূর্তে তিনি শ্রীরামকে দেখলেন সে মুহূর্তে তিনি কেঁদে ফেললেন, ‘ওহ্, বাছা, তুমি কখন ফিরে এসেছো? ওরা আমাকে বললো যে তুমি এখানে আছো, কিন্তু গোঁফসহ। তুমি কী জন্য গোঁফ রাখলে, সোনা? ওটা ফেলে দাও, ওটাসহ আমার সামনে এসো না, অন্য যে কোনো কিছু তুমি করতে পারো।’ ‘হ্যাঁ, ঠাকুরমা,’ অনুগত হয়ে সে বললো। তার বৃদ্ধ আত্মাকে পুররুজ্জীবিত হতে দেখে সে খুব খুশি হলো। কেউ সন্দেহ করতে পারলো না যে ঠাকুরমা কথা বলছিলো। তার কথায় যেন সেই আসল সুর ছিলো। তার ব্যক্তিত্ব পরপার থেকে অক্ষত অবস্থায় ফিরে এসেছে। শিয়রে বসে ঠাকুরমার হাতের বিভিন্ন জায়গায় পরশ বুলিয়ে দিলো সে। ঠাকুরমা তার দিকে নিবিড় দৃষ্টিতে তাকিয়ে বললো, ‘তুমি ছন্নছাড়া হয়ে গেছো, এ ব্যাপারে কোনো সন্দেহ নেই।’ অত্যন্ত দুঃখের সাথে মাথা নেড়ে আবার বললেন, ‘আমি জানি না কী তোমাকে ঐ লোকগুলোর সাথে মিশতে প্ররোচিত করেছে; আমি তো তোমাকে সম্মানীয় একজন মানুষ হিসেবে গড়ে তুলতে চেষ্টা করেছিলাম, কিন্তু তুমি যদি বি. এ. পরীক্ষা দিতে না গিয়ে থাকো, সেটা আমার দোষ না। এ ব্যাপারে কেউ আমাকে কোনোভাবে দোষারোপ করতে পারবে না। কিন্তু লোকে তোমার সমন্ধে যে সব বলে, তা কি সত্যি?’ শ্রীরাম চিন্তা করে ধীরে ধীরে উত্তর দিলো, ‘ তুমি যা শোনো তার একটা কথাও বিশ্বাস করো না। মনে রেখো মানুষ মিথ্যা বলে।’ খুশির হাসিতে ঠাকুরমার মুখে ভাঁজ পড়লো। ‘যত্তোসব কটূভাষী,’ তিনি চিৎকার করে বললেন। ‘যারা কটূ কথা বলে, কুচিন্তা করে, তোমার নামে কুৎসা রটায়, কিংবা তোমাকে বিপথগামী করে, কিংবা প্ররোচিত করে, তারা সবাই তোমার রাস্তা থেকে দূরে সরে যাক...।’ ঠিক সেই মুহূর্তে শ্রীরামের একটু সন্দেহ জাগলো যে বৃদ্ধা ভদ্রমহিলা ভারতীকে বোঝাতে পারে। সে তার মনোযোগ ঘোরানোর চেষ্টা করলো। ‘বেশি কথা বলো না, ঠাকুরমা, শুয়ে পড়ো।’ ‘তা কেন করবো? আমার তো কিছু হয়নি। ঐ ডাক্তারকে বিশ্বাস করো! আমার সামনে আসুক সে। তার সমন্ধে আমি যা ভাবি তা তাকে বলবো। সে তার মতো করে চললে আমাকে জ্যান্ত পুড়িয়ে মারতো!’ ঠাকুরমা গম্ভীর হাসি হাসলেন। এখন তার না দেওয়া অভিশাপগুলোর কথা মনে পড়লো যেগুলো তিনি অন্য কাউকে দিতে চেয়েছিলেন। ‘যে-ই তোমাকে দূরে সরিয়ে নিক না কেন, সে পুরুষ হোক বা নারী হোক বা যা-ই হোক, সে ধ্বংস হয়ে যাক আর নিকৃষ্টতম নরকে ভুগুক!’ অভিশাপ উচ্চারণ করার পর তিনি সুখ ও স্বস্তি বোধ করলেন। শ্রীরাম বাইরে অপেক্ষমান পুলিশের কথা ভাবলো এবং বললো, ‘উত্তেজিত হয়ো না ঠাকুরমা, তোমার বেশি কথা বলা ঠিক হবে না।’ ‘কেন হবে না? আর সেটা কে বলে?’ তিনি জিজ্ঞেস করলেন। ‘আমার যত খুশি কথা বলবো, কেউ আমাকে থামাতে পারবে না।’ এ সময় একজন পুলিশ দরজায় উঁকি মারলো। ঠাকুরমা বললেন, ‘কে?’ এত কর্তৃত্বপরায়ণ হয়ে বললেন যে পুলিশটি সঙ্গে সঙ্গে তার মাথা সরিয়ে নিলো। ‘সে কে?’ ঠাকুরমা জিজ্ঞেস করলেন। ‘কেউ আমার সাথে দেখা করতে এসেছে,’ শ্রীরাম বললো। সে ঠাকুরমার হাতে এত আলতো পরশ বুলিয়ে দিলো যে তিনি এখন ঘুম ঘুম বোধ করলেন। সে তাকে কিছু দুধ দিলো। তিনি বললেন, ‘তোমাকে দেখে আমার আনন্দ হচ্ছে। লক্ষ্মী ছেলে, মানুষ যেন তোমার পথ থেকে বিচ্যূত করতে তোমাকে প্ররোচিত করতে না পারে। আমার সাথে থাকো। আমাকে আর ছেড়ে যেও না।’ বিছানায় গা ছেড়ে শুয়ে পড়তে শ্রীরাম তাকে সাহায্য করলো, আর শীঘ্রই তিনি ঘুমিয়ে গেলেন। এরপর হেঁটে পুলিশ অফিসারের কাছে গিয়ে বললো, ‘চলেন যাই।’ ক্যানি তার পিছু পিছু জীপ পর্যন্ত গেলো। শ্রীরাম বললো, ‘ক্যানি, আমি ফিরে না আসা পর্যন্ত ঠাকুরমাকে দেখে রেখো। জানি না তারা আমাকে কতদিন আটকে রাখবে। সে কেমন থাকে না থাকে আমার সাথে দেখা করে জানাবে। আমার মনে হয় কালেক্টর তোমাকে আমাদের সাথে জেলে দেখা করতে দেবে। জানি না ঠাকুরমার ব্যাপারে তুমি কী করবে।’ সে অবনত মস্তকে কিছুক্ষণ দাঁড়ালো যেন সমস্যাটির কোনো সমাধান নেই। এরপর জীপের দিকে পা বাড়ালো। ক্যানি বললো, ‘চিন্তা করো না। তিনি তো আমাদের মায়ের মতো। আমরা তাকে দেখে রাখবো।’ ৪ কেন্দ্রীয় কারাগারে তাকে ডিটেনশনে রাখা হলো। আরো কয়েকজনের সাথে একটি কক্ষে থাকলো ও সিমেন্টের শক্ত মেঝেতে ঘুমালো। সকাল সাতটায় তারা তাকে জাগালো। এতে সে সবচেয়ে বেশি ক্ষিপ্ত হলো। মাঝে মাঝে তার ইচ্ছে হলো তারা যেন স্বপ্নমধুর অবস্থা থেকে কারাজগতের কঠোর বাস্তবতায় টেনে না নিয়ে যায়। আর তারপর তড়িৎ গতিতে ঘুম থেকে ওঠা ও ফোঁটায় ফোঁটায় পড়া ট্যাপের জলে হাত মুখ ধোয়া এবং পাবলিক টয়লেটে কাজ সারা; এ সব প্রথম প্রথম তার কাছে অস্বস্তি লাগলো। তার প্রার্থনা ছিলো অন্যরা চলে যাওয়া পর্যন্ত তারা যেন তাকে অপেক্ষা করতে দেয়, কিন্তু তা হয় না; প্রহরী তার এবং অন্যদের উপর এসে পড়ে তাদেরকে ঠেলাঠেলি করতো। শ্রীরাম এ ব্যাপারে একবার এ জগতের ঈশ্বরের নিকটবর্তী হতে চেষ্টা করলো যখন তিনি জেলখানা পরিদর্শনে এলেন। জেল সুপার সম্মানের সাথে ঈশ্বরের পিছনে ছিলো, আর অন্য সব কর্মকর্তা তাদের পিছনে পিছনে আসছিলো। ভয়ানক রকমের স্লেট রঙের ব্যারাকে ঘেরা কেন্দ্রীয় চত্বরে পরিদর্শনের জন্য শ্রীরাম একটা লাইনে অপেক্ষা করছিলো; মহামানবটি লাইনের দিকে উদ্ধত দৃষ্টি নিক্ষেপ করে অগ্রসর হচ্ছিলো। তিনি যাওয়ার সময় কারাবন্দীদের একদম স্থির থাকতে ও কোনো কথা না বলতে বা কোনো রকম নড়চড় না করতে বলা হয়েছিলো; যতক্ষণ না তাদের সাথে কথা বলা হয়েছিলো ততক্ষণ তারা কথা বলেনি। কিন্তু মহান দেবতা শ্রীরামের লাইনের কাছে এলে সে সামনে গিয়ে কথা বলার আবেগ সামলাতে পারেনি: ‘স্যার, আমার একটা অভিযোগ ও অনুরোধ আছে।’ সঙ্গে সঙ্গে কিছু লোক তাকে ধরে দূরে নিয়ে গেলো; আর কোনো কিছু না দেখার ভান করে মহামানব চলে গেলেন। তিনি চলে গেলে শ্রীরামকে জেল সুপারের অফিসে তলব করা হলো। গার্ডরা তাকে বাহু ধরে জেল সুপারের টেবিলের সামনে সোজা করে দাঁড় করিয়ে রাখলো। জেল সুপার উপরে তাকিয়ে বললেন: ‘তুমি জেলের শৃঙ্খলা ভঙ্গ করেছো এবং এ জন্য শাস্তি পাবে।’ ‘কী শাস্তি?’ শ্রীরাম জিজ্ঞেস করলো। এক ঘন্টা আগে যে লোকটি নিরীহ কুকুরছানার মতো পরিদর্শকের পিছন পিছন ছুটছিলো তিনি তার পা টেবিলে দ্রুম করে ফেলে চেঁচিয়ে উঠলেন, ‘আমার সাথে ওভাবে কথা বললে তোমাকে বরদাশত করবো না, বুঝেছো?’ শ্রীরাম ভয় পেয়ে গেলো। আশঙ্কা হলো সে উম্মত্ত হয়ে তাকে লাথি দিতে পারে: সেই এখানে হর্তকর্তা আর চাইলে মানুষ হত্যা করার অধিকার তার ছিলো। লোকজন যে রাজতন্ত্র বিলুপ্ত হওয়ার কথা বলে, কিন্তু এখানে তো নিরঙ্কুশ রাজতন্ত্র। এ জগতটা একান্তই তার ছিলো, তার কর্তৃত্বে শাসিত, আর কেউ এ ব্যাপারে কিছু বলতে পারতো না। তাই শ্রীরাম শান্তভাবে বললো, ‘জ্বী, স্যার,’ তার জীবনে এই প্রথম বারই সে শান্ত সুরে কথা বললো। জেল সুপার তার বশ্যতায় সন্তুষ্ট হয়ে জিজ্ঞেস করলেন, ‘তুমি লাইন থেকে বেরিয়ে এলে কেন? তুমি কী বলতে চেয়েছিলে?’ শ্রীরামের মনে হলো সোজা সাপ্টা কথা বলাই ভাল হবে। ‘আমি বলতে চেয়েছিলাম যে টয়লেটে আমাদের প্রাইভেসি রক্ষার জন্য কি কিছু করা যায় না।’ জেল সুপার বালখিল্যসুলভ হাসি হেসে বললেন, ‘তা তুমি ভেবেছিলে যে ঘোড়া ডিঙিয়ে ঘাস খাবে? না?’ ‘তা নয়, স্যার, কিন্তু আগে আমার এমনটা হয়নি তো, এইটুকুই,’ শ্রীরাম বললো। জেল সুপার বললেন, ‘বেশি কথা না বলে বেঁচে গেছো, বুঝলে? তার সাথে কথা বললে তোমাকে শিকল পরানো হতো। মনে রেখো, এ কারাগারে আমরা বিশৃঙ্খলা চাই না, বুঝেছো?’ ‘জ্বী, স্যার,’ এরকম ব্যবহারে পুরো ভেঙে পড়ে শ্রীরাম বললো। এতে জেল সুপার কিছুটা নরম হয়ে বললেন, ‘তোমার যা লাগে আমার কাছে চাইবে।’ ‘জ্বী, স্যার,’ শ্রীরাম দেখতে পেলো যে এটাই হচ্ছে লোকটির সাথে কথা বলার সর্বোত্তম উপায়; একমাত্র কথা যাতে তিনি ক্ষেপেননি। জেল সুপার জিজ্ঞেস করলেন, ‘তুমি কী বলেছিলে আই. জি. কে বলতে চেয়েছিলে?’ ‘আমি টয়লেটের ব্যাপার-স্যাপার নিয়ে বলতে চেয়েছিলাম,’ বারবার বলা ও প্রচারণায় বিরক্ত হয়ে সে বললো। ‘ওহ্, তাই নাকি?’ তিনি বললেন, ‘এই নাও তোমার প্রতিনিধিত্বের জবাব।’ ‘কী, স্যার?’ ‘ইতোমধ্যে টয়লেটের যেসব সুবিধা আছে তার চেয়ে বেশি তুমি পাচ্ছো না, বুঝেছো?’ ‘জ্বী, স্যার,’ প্রাণ ঠাণ্ডা করা কথাটি বললো শ্রীরাম। ‘কিন্তু জানতে পারি কেন?’ গার্ডরা তার বাহুতে চিমটি কেটে তার প্রগলভতা সম্পর্কে সজাগ করে দিলো। কিন্তু জেল সুপার তাতে কিছু মনে করলো বলে বোধ হলো না। তিনি শুধু জবাব দিলেন, ‘অন্য কোনো সময় হলে টু শব্দটি না করে তোমাকে গুলি করে মারা হতো, মনে রেখো। তুমি আমাদের অতিথি নও, বন্দী মাত্র। তুমি কোনো শ্রেণীর বন্দী নও, ভারতীয় প্রতিরক্ষা আইনের অধীনে হেফাজতে থাকা একজন মাত্র, মনে রেখো।’ ‘কিন্তু কোনো বিচার হয়নি। আমাকে কতদিন এখানে থাকতে হবে?’ ‘তোমার মতো এমন মামলায় বিচারের কোনো প্রয়োজন নেই। গোটা দুনিয়া জানে তুমি এখানে কেন আছো।’ ‘আমি তো শুধু আমার কর্তব্য করতে চেষ্টা করছিলাম,’ শ্রীরাম বললো। জেল সুপার টেবিলে লাথি মেরে বললেন, ‘এখানে রাজনীতি নিয়ে তোমাদেরকে আমি কথা বলতে দেবো না।’ ‘রাজনীতি’ শব্দটি তাকে বিঁধেছে মনে হলো। ‘জ্বী, স্যার,’ শ্রীরাম বললো, আর এতে আবারও লোকটির মেজাজ ঠাণ্ডা হলো। কিছুটা ছাড় দিয়ে তিনি বললেন, ‘তুমি গান্ধীর লোকও নও সাধারণ অপরাধীও নও, কিন্তু উভয়ের চেয়ে বেশি বিপদজনক।’ শ্রীরাম বিষয়টিতে নিজে কোনো মত প্রকাশ করতে পারলো না। ‘গান্ধী ’ শব্দটি তার মনে ভারতীর স্মৃতিকে জাগিয়ে দিলো এবং আন্তরিকভাবে কামনা করলো সে যদি তার সাথে পুলিশের কাছে আত্মসমর্পণ করতো। তারা হয়তো শ্রীরামকে সম্মানীয় রাজনৈতিক বন্দী হিসেবে বিবেচনা করতো। ‘ভারতী কোথায়? সে কি কোনোভাবে এ জেলে আছে? যদি তাই হয়, তবে তাকে কি দেখতে পারবো না? সে ভাল আছে তো?’ হাজার প্রশ্ন তার মাথায় গুঞ্জরিত হলো আর দেয়ালের দিকে এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলো। জেল সুপার বললেন, ‘আমার আনন্দ হচ্ছে যে তুমি আমার কথায় পূর্ণ মনোযোগ দিচ্ছো। কিন্তু তোমাকে এক্ষুণি বলছি এ দেয়ালগুলোর মাঝে ঝামেলা পাকিয়ে কোনো লাভ হবে না। কী চিন্তা করছো?’ হঠাৎ করে তিনি বলে বসলেন। ‘ভেবে পাচ্ছিলাম না আমাকে এখানে কতদিন আটকে রাখা হবে। এর মধ্যে কয়েক মাস হয়ে গেলো। মাসের হিসাবও ভুলে গেছি।’ ‘অযথা কোনোকিছুর হিসাব করার দরকার নেই, এতে তোমার কোনো লাভ হবে না। তোমার এখানে ততদিন থাকতে হবে যতদিন সরকার চায় তুমি এখানে থাকো, ব্যস। এখানে বিভিন্ন মেয়াদে সশ্রম কারাদণ্ডে দণ্ডিত তোমার অন্য সতীর্থদের থেকে তোমাকে খুব ভিন্নভাবে না রাখার নির্দেশ আছে আমাদের উপর। ব্যস, মামলা খতম।’ গার্ডরা দুই পা দ্রুত একখানে করে স্যালুট দিয়ে শ্রীরামকে ঘুরিয়ে নিলো। তার যাওয়ার সময় জেল সুপার তার পিছে মন্তব্য ছুঁড়ে দিলো, ‘তোমার যা চাই আমাকে বলবে।’ ‘জ্বী, স্যার।’ ‘ব্যস, মামলা খতম।’ আর গার্ডরা তাকে মার্চ করে নিয়ে চলে গেলো। এরপর দিন গেলো, সপ্তাহ গেলো, মাস গেলো একইভাবে, একদিন আরেকদিনের থেকে তেমন ভিন্ন কিছু নয়। শ্রীরাম নিজের বাড়ির মতো বোধ করতে লাগলো: তার এ অস্তিত্বের মাঝে সে ছোট খাট উত্তেজনার দিকে তাকিয়ে রইলো। জেলের পিছনে খনিতে পাথর ভাঙ্গার জন্য যখন তাকে নিয়ে যাওয়া হলো তখন সে একে পরিবর্তন হিসেবে স্বাগত জানালো: যে শিলাগুলো সে কাটলো সেগুলো তার বসার জায়গার নিচে গরম হয়ে গেলো, রোদে তার শরীর ঝলসে গেলো, যে লোহার হাতুড়ি দিয়ে সে পাথরগুলো ভাঙ্গলো সেটি তার চামড়া ছিলে নিলো, কিন্তু তবুও কাজটা তার ভাল লাগলো কারণ কড়া প্রহরার মধ্যে থাকলেও এতে সে জেলের বাইরে থাকতে পারলো। তার সাথে এক দল লোক ছিলো, নানান ধরণের অপরাধী যারা খুন থেকে শুরু করে দক্ষভাবে পকেটমারার জন্য সাজা পেয়েছিলো। তাদের বেশিরভাগই সাজার মেয়াদ শেষে কী করবে তা-ই পরিকল্পনা করছিলো, কেউ কেউ বারবার ফিরে এসে বাকি জীবনটা এখানে কাটানোর পরিকল্পনা করছিলো। এ রকম রূঢ় সঙ্গ শ্রীরামের ভাল লাগলো না। এরা নরম হাত ও নরম মাথার মানুষটাকে নিয়ে হাসাহাসি করলো। এরা কিছুতেই বুঝতে পারলো না কেন সে পুলিশের ঝামেলার ঝুঁকি নিয়েছিলো তার কারণ এই যে কেউ একজন চেয়েছিলো সে কিছু একটা করুক, এই কারণে নয় যে ট্রেন লাইনচ্যূত করার মতো দূঃসাহসিক কাজ করায় সে লাভের ভাগ পেয়েছিলো। আত্মকেন্দ্রিক রাজনৈতিক জীবনে শ্রীরামের জন্য এটা ছিলো না ঘটা নতুন এক দৃষ্টিভঙ্গি। তার মনে হলো সে নতুন প্রজাতির এক মানুষের সাথে মোকাবেলা করছিলো, দানবের মতো কথা বলছিলো, কিন্তু তারপরও মাঝে মাঝে মানবীয় গুণ দেখা যাচ্ছিলো; এরা উদ্বিগ্ন ছিলো যে অল্প খেয়ে অপুষ্টিতে ভোগা তার উচিৎ নয়; মুখে খাবার না রোচার জন্য এরা তার প্রতি দয়াপরবশ হলো: খাবারটা ছিলো পানি দিয়ে বেশ পাতলা করা ঘোল দিয়ে সিদ্ধ জোয়ারের শক্ত গোলার বানানো। (ঘোলটা সাম্প্রতিককালে যোগ করা হতো কারণ কে যেন এর জন্য আন্দোলন করেছিলো সংবাদ সম্মেলনে ও সভা-সমাবেশে, আর বাটারমিল্কের মধ্যে যা ছিলো তা সাধারণভাবে সব আন্দোলনকারীদের যান্ত্রিক প্রয়োজন মেটাতে যথেষ্ট ছিলো।) খাওয়ার সময় সেইসব ভাল ভাল বিষয়ের কথা ভাবলো যা ঠাকুরমা তার জন্য বানিয়ে দিতো এবং মনে করলো বাড়িতে ঠাকুরমাকে শেষবার দেখতে যাওয়ার সময়ও একজন প্রতিবেশির পাঠানো জিনিস তাকে কীভাবে খেতে দিয়েছিলো। মচমচে ঘিয়ের গন্ধ ভরা ভাতের কথা মনে করে সে বেদনা বোধ করলো; নিজের ভাগেরটা এলুমিনিয়ামের থালায় নিয়ে তাতে কামড় দিয়ে খাওয়ার সুর সে শুনতে পেলো। ঠিক একইভাবে কড়মড় করে খাওয়ায় তার সহবন্দীরা মন্তব্য করলো। ‘তুমি এখনো বাদাম হালুয়ার কথা ভাবো?’ হত্যার সামিল না হয়ে দণ্ডণীয় ঘাতক জিজ্ঞেস করলো। মধ্যদূপুরে খাওয়ার বিরতির সময় তারা পাশাপাশি বসেছিলো। ‘আমি যদি এ জায়গাটা কখনো ছেড়ে যাই, তবে কোণার দোকানে বাদাম হালুয়ার জন্য একশ টাকা খরচ করবো, তুমি কৃষ্ণ ভিলা চেনো, দোকানটা ছোট কিন্তু চমৎকার একটা জায়গা; পরিস্কার কলাপাতায় খাবার দেয়, থালায় নয়। জানো এখানকার ভাপা পিঠা মনে হয় যেন একেবারে হালকা করে তৈরী...।’ এ রকম তুলনায় শ্রীরাম হতবিহ্বল হলো, আর এ তুলনায় তার জুঁই, গোলাপ পাঁপড়ি, নরম মাখন ইত্যাদি উপমার কথা মনে পড়লো। আবেগে গদ গদ হয়ে শ্রীরাম বললো, ‘আর তুমি জানো সেখানে মাগনা চাটনি দেয়, পৃথিবীতে তুমি এ রকম দ্বিতীয়টি আর দেখতে পাবে না। কোণার হোটেলটা তুমি অবশ্যই চিনে থাকবে?’ ‘না,’ তার সঙ্গীটি মাথা নাড়ালো। ‘আমি এসেছি বেলারি থেকে, এ শহর আমার পরিচিত নয়।’ ‘ঐ হোটেলটা আমি চিনি,’ গার্ড তাদের কথাবার্তায় যোগ দিয়ে বললো, ‘ভাল জায়গা, কিন্তু ওখানে খুব কম যাওয়া হয়। এ জায়গা ছেড়ে বাইরে যাওয়ার খুব বেশি সুযোগ আমার নেই।’ ‘তুমি আমাদের মতোই?’ বন্দীদের একজন বললো, আর এ কৌতুকে সবাই মন ভরে হাসলো। খাবার সময়টাই সবচেয়ে ভাল। শ্রীরামের প্রতিবেশি যে একজন বড় জালিয়াত সে তাকে ফিসফিস করে বললো, ‘কাউকে বলো না যেন। আসছে বৃহস্পতিবার খাওয়া-দাওয়া করার মতো ভাল ভাল কিছু জিনিস পাচ্ছি। ওগুলো পাইলে তোমাকে কিছু দেবো।’ ‘তুমি কী পাবে?’ কৌতুহল দমাতে না পেরে শ্রীরাম জিজ্ঞেস করলো। ‘কিছু বাদাই আর কিছু সুস্বাদু মুরগী পোলাও।’ মুরগী উল্লেখ করায় শ্রীরামের বিবমিষা জাগলো। মুখটা বাঁকালো: ‘মুরগী! মুরগী! ওহ! আমি এটা সহ্য করতে পারি না! বিতৃষ্ণায় মুখ বাঁকিয়ে সে বললো। ‘ওসব জিনিস আমি খাই না!’ সে চিৎকার করে বললো। ‘পিঠাও খাই না আমি কারণ সেগুলোতে ডিম থাকে।’ জালিয়াতকারী লোকটি মজা পেলো। হাসিতে গড়িয়ে পড়লো যে পর্যন্ত না গার্ড যে এখন পর্যন্ত বন্ধুত্বপূর্ণ ছিলো সে আপত্তি জানালো: ‘থামুন, আপনারা কোথায় আছেন বলে মনে করেন!’ কেন্দ্রীয় টাওয়ারটার ছায়ায় একটা স্বাগতম ভাব ছিলো। বিকেলটা অবসন্ন হলেও উষ্ণ ছিলো। জেল সুপার তার কোয়ার্টারে বিকেলের ঘুম উপভোগ করতে করতে নাক ডাকতে থাকেন: কোনো কিছুতে আপত্তি জানানোর মতো আসলেই কেউ ছিলো না, আর এ সময়টায় শুধু কারাগারটাকে কিছুক্ষণ কারাগার মনে হলো না এবং মানবিক ও বসবাসযোগ্য পরিবেশ বিরাজ করলো; প্রহরীরা নিজেরাই বন্ধুত্বপূর্ণ ভাব সৃষ্টি করে সব ধরণের কথাবার্তা মানবিক পর্যায়ে চালিয়ে দিলো। এ সময়েই জেলের কঠোর পরিবেশ বজায় রাখা অসম্ভব ছিলো-- এ ছিলো শ্রীরামের কৈশোরে আলবার্ট মিশন স্কুলে মধ্যদূপুর কাটানোর মতো। জালিয়াতকারী লোকটি প্রহরীর কাছে আবেদন জানালো: ‘দয়া করে কিছুক্ষণ আমাদের বিরক্ত করো না। দিনের সব কাজ শেষে মানুষের কিছু বিশ্রাম দরকার হয়। দয়া করে কিছুক্ষণ আমাদেরকে আমাদের মতো থাকতে দাও।’ এরপর শ্রীরামের দিকে মনোযোগ ঘুরিয়ে বললো: ‘আমি জানি পোলাওয়ে তারা বিশুদ্ধতম ঘি ও জায়ফল পাতা এবং দারুচিনি ব্যবহার করবে। তুমি যদি এক মুঠ তুলে নাও, তবে তোমার আঙ্গুল দিয়ে ঘি ফোঁটায় ফোঁটায় পড়বে; এত গুরুপাক খাবার। বলো না যেন তুমি তা খাবে না। তোমাকে অবশ্যই এটা নিতে হবে। এতে তোমার ভাল হবে। একবার চেখে দেখলে প্রতিদিন তুমি এটা চাইবে। এই হচ্ছে এটার সবচেয়ে খারাপ দিক। প্রতিদিন তো এটা এ জায়গায় পাওয়া অসম্ভব, যদিও একবারই আমরা যা কিছু করতে পারি। আমাদের এখানকার বন্ধু এবং তার বন্ধুরা আমরা যা করি তাতে কিছু মনে করবে না। সে জানে সে তার ভাগ পাবে।’ ঘন্টাধ্বনিতে ঘন্টা বাজলো। প্রহরী লাফ দিয়ে উঠে বললো: ‘ওঠেন মার্চ করেন,’ আর জেলের পিছনের খনিতে তাদেরকে নিয়ে গেলো। রাতে শ্রীরামের কক্ষে সঙ্গী ছিলো। কম্বল দিয়ে মোড়ানো সিমেন্টের বিছানায় শোয়ার আগে তারা বসে বসে কথা বললো। করিডোরের সেন্ট্রি চিৎকার করে বললো, ‘চুপ! কথা বলবেন না।’ যে ব্যক্তিটি ঘর ভাঙচুর ও খুন করেছিলো সে একটি স্তুতি সঙ্গিত গাওয়ার দায় ভার নিয়ে অন্য সবাইকে তাতে যোগ দিতে পীড়াপীড়ি করলো। রাম, রাম, সীতা রাম, সুরে সুরে গেয়ে অন্য সবাইকে সমবেত সুরে গাইতে বললো। দার্শনিকভাবে বললো, ‘শুধু এই জিনিসটাই বাস্তব। আপনাদের অবশ্যই জানতে হবে বাস্তব কোনটি আর অবাস্তব কোনটি। আপনাদের অবশ্যই যে বিশ্বে থাকেন তার গতিপ্রকৃতি জানতে হবে। প্রভুর নাম অবিরাম জপতে হবে।’ আর সে প্রভুর নামে ভক্তিমূলক গান শুরু করলো। অন্যরা তা অনুসরণ করলো। তারা যদি থামতো, তবে সে অন্ধকারে চিৎকার করে বললো, ‘এ রুমে আমার সাথে কোন শয়তানের বাচ্চা আছে? তাকে আমি বের করে দেবো।’ শ্রীরাম জিজ্ঞেস না করে পারলো না, ‘তুমি যদি এতই ধার্মিক হয়ে থাকো, তবে বাইরে থেকে তোমার অনুসারীদের পথ দেখালে না কেন?’ ‘কারণ পুলিশ আমাকে সেটা করতে দেয়নি, ব্যস,’ সে বললো। ‘অবশ্যই, পুলিশ না থাকলে আমরা সবাই সুখি মানুষ হতাম,’ কেউ একজন বললো। এরপর তারা আবার গাইতে শুরু করলো। সেন্ট্রি এসে তাদেরকে উঁকি দিয়ে দেখলো। তারা অট্টহাসি হাসলো। সে বিড়বিড় করে কী একটা বলে চলে গেলো। অন্ধকারে নেতা বললো, ‘আমি কাউকে ভয় পাই না, কোনো জেলারকে ভয় পাই না।’ ‘কারণ তুমি অনেক অভিজ্ঞ,’ আরেকজন প্রশংসাসূচকভাবে বললো। ‘অনেক আগেই আমি ঐ চালাঘরে ঝুলতে থাকতাম, কিন্তু জজ বুঝেছিলেন যে আমি খুন করিনি, করতে চেয়েছিলাম। আমি শুধু চেয়েছিলাম ঐ হতভাগা বোকাটার হাড্ডি গুঁড়া করতে।’ ‘কোন হতভাগা বোকার কথা বলছো?’ কৌতুহল দমাতে না পেরে শ্রীরাম জিজ্ঞেস করলো। এখানকার মানুষগুলো যেন নতুন এক প্রজাতির মানুষ। এ পরিবারের সদস্য হিসেবে তাকে হয়তো বাকি জীবনটা কাটাতে হতে পারে। উত্তর এলো: ‘আমি শুধু চেয়েছিলাম সে আমাকে চাবিগুলো দিয়ে দিক যেমনটা অন্য অনেকে করেছে, কিন্তু হঠাৎ করে সে জানালায় দৌড়ে গিয়ে পুলিশের উদ্দেশ্যে চিৎকার করলো, আর আমি পালাতে গেলে সে আমার উপর লাফিয়ে পড়ে আমাকে পাকড়াও করলো। আমার কী করার ছিলো? কিছু একটা করতে হয়েছিলো। ভাবলাম তার পা ভেঙ্গে দেই-- কিন্তু সে আমাকে ঠেলা দিলো, আর তাতে কাজ হলো না। এ লোকগুলো অপ্রীতিকর, খারাপ লাগা জিনিসগুলো করতে আমাদের বাধ্য করে।’ কিছুক্ষণ স্মৃতি চর্বণ করে সে দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললো, ‘এটা করে লাভ হয়নি, তবে ম্যাজিস্ট্রেট বুঝেছিলো, আর জেল ছেড়ে গেলে আমি তার কাছে কিছু ফলমূল, কমলা, কলা, এ রকম কিছু নিয়ে যাবো। চলো সময় নষ্ট না করি।’ অন্যদের যোগ সাধন করিয়ে সে গাইতে শুরু করলো। শ্রীরাম তাদের সাথে রাজনীতি, মহাত্মাজী, অহিংসতা এবং ব্রিটিশ শাসন নিয়ে আলাপ করতে চাইলো। আলাপ করতে শুরু করলো, কিন্তু লোকটি তাকে থামিয়ে বললো, ‘কে শাসন করছে তাতে কার কী এসে যায়? আমরা তো সে জগতের নই। ঐ সব গান্ধী অনুসারীদের আমি জেলে দেখেছি, আর তারা ভাবে তারা সম্মানিত অতিথি! তুমি সাবধানে থাকলে তুমিও সেটা ভোগ করতে পারতে। তারা তোমাকে বাবুর্চি ও পকেট খরচসহ বাংলোতে রাখতো এবং পড়ার জন্য বই ও খাওয়ার জন্য শরবত দিতো।’ তার কথায় শ্রীরামের রক্ত টগবগ করে উঠলো। ‘দেশের জন্য যারা ভুগছে তাদের ব্যাপারে তুমি ওরকম করে কথা বলার স্পর্ধা কোথায় পেলে? তুমি ভুল করছো। একদম ভুল করছো।’ উঠে গিয়ে তাকে মারতে চাইলো সে, কিন্তু তার মনে পড়লো ভারতী তাকে মহাত্মাজীর অহিংস মতের প্রতি বিশ্বাসঘাতকতার কাতারে ফেলবে। হয়তো বলবে, ‘তোমার মুখ আমি আর দেখতে চাই না। এখান থেকে বের হয়ে যাও।’ আর তাই সে শুধু অস্ফুট স্বরে বললো, ‘আমাদের দেশপ্রেমিকদের ব্যাপারে ওরকম গণ্ড মূর্খের মতো কথা বলো না।’ লোকটি গর্জে উঠে বললো, ‘আমার সাথে ও সুরে কথা বলার তুমি কে?’ একটু থেমে জালিয়াতকারী লোকটি তার পাঁজরে গুঁতা দিয়ে বললো, ‘বলো তুমি এর জন্য দুঃখিত। ওকে ক্ষেপিয়ো না। সে খুব শক্তিশালী।’ কক্ষের অপর প্রান্ত থেকে ভারী পদক্ষেপে কাউকে আসতে শুনলো শ্রীরাম। লোকটি শ্রীরামের সামনে দাঁড়িয়ে গর্জে উঠলো: ‘আমি তো বলেছি যে তোমাদের রাজনৈতিক বন্দীরা সত্যিকারের কোনো বন্দী না, বুঝেছো? এ পর্যন্ত দশটা জেলে আমি ছিলাম। তাদের অনেককে আমি দেখেছি। তারা মনে করে তারা তাদের শশুর বাড়িতে থেকে দীপাবলী দেখতে এসেছে। আমি জানি কোন ব্যাপারে আমি কথা বলছি। তুমি আমায় শুধরে দিলে আমি বরদাশত করবো না, শুনছো?’ ‘তোমার সাথে আমি একমত নই, ’ শ্রীরাম স্পর্ধার সাথে বললো। ‘আমি যা করতে চাইনি তা ব্রিটিশ সরকারও আমাকে দিয়ে করাতে পারেনি!’ লোকটি অবজ্ঞা করে বললো: ‘হু, লেখাপড়ার পরিণাম এমনি হয়। তোমায় বলছি তুমি তো কোনো ধরণের আনুগত্য জানো না। মানুষের কখনো স্কুলে যাওয়া ঠিক না। এরা কথা বেশি বলে।’ ‘আমি যদি বাইরে থাকতাম, তবে মহাত্মাজীর সামনে তোমাকে সাষ্টাঙ্গে প্রণাম করাতাম, আর তোমার অপরাধ স্বীাকার করিয়ে নিতাম,’ চরম আবেগে শ্রীরাম বললো। মহাত্মার উল্লেখ করায় লোকটি হাতের তালু ঘষে বললো, ‘এখানে তাঁর নাম টেনে এনো না; সেই মহা সাধু। ‘তিনিও কারাগারে আছেন, মনে হয় তুমি তা জানো, ’ শ্রীরাম বললো। ‘থাকতে পারেন, কিন্তু তাতে তোমার কী? তোমার কি ধারণা যে এখানে থাকার কারণে তুমিও মহাত্মাজী হয়ে গেছো?’ ‘তোমার বিছানায় ফিরে যাও, ভায়া,’ শ্রীরাম আদেশ করলো। ‘কোন ব্যাপারে কথা বলছো তুমি তা জানো না।’ ‘তুমি তো নিজেকে মহাত্মার শিষ্য বলে থাকো, অথচ তুমি তাঁর কাছ থেকে ভাল কিছু পাওনি। আমাদের মাঝে আসার মতো আর কী কাজ আছে? শ্রীরাম বিতৃষ্ণায় বললো, ‘তোমার বিছানায় ফিরে যাও, ভায়া, তোমার সাথে আমি কথা বলবো না।’ দলপতি শ্রীরামকে মারার জন্য বাহুটি এক পাশ থেকে আরেক পাশ দোলালো। শ্রীরাম অন্ধকারে বাতাসের বেগ বুঝতে পারলো, আর মাথাটা নিচে নামালো। লোকটি তখন তার বিছানায় গেলো। লোকটি তার বিছানায় সটান হয়ে শুয়ে লম্বা গোলমালপূর্ণ হাই তোলার পর শুধু শ্রীরাম সুখ ও স্বস্তি বোধ করলো, হাইকে সে গানে গানে প্রলম্বিত করলো যতক্ষণ পর্যন্ত না সেন্ট্রি বারের মধ্য দিয়ে চিৎকার করে বললো, ‘চুপ! একদম চুপ। আর কোনো কথা নয়।’ ** দিনের বেলায় তাকে বিভিন্ন ধরণের কাজ করতে হলো আর কারাগারে ছন্নছাড়া যে বিভিন্ন মানুষ সে দেখলো তা তাকে বিষন্ন ভাব থেকে দূরে রাখলো। কিন্তু তার কক্ষে শেষ বন্দীটি যখন ঘুমিয়ে পড়ে নাক ডাকলো, তখন নিঃসঙ্গতা তাকে হানা দিলো এবং সে অন্তদর্শনের শিকার হলো। ভারতীর সাথে দেখা করার ও কথা বলার বাসনা তাকে পেয়ে বসলো। কোথায় সে? মারা গেছে? অন্য কারো সাথে বিয়ে হয়েছে? নাকি কারাগারে ফাঁসি হয়েছে? তার জানার কোনো উপায় ছিলো না। এ ধরণের উদ্ভাবিত বিচ্ছিনতায় সে অবাক হলোÑÑ একই গ্রহে বসবাস করেও একজন আরেকজনের কাছ থেকে পুরোপুরি বিচ্ছিন্ন। রাষ্ট্র ও তাদের পুলিশ চামচা মানুষের জন্য যে কোনো অত্যাচার উদ্ভাবন করতে পারঙ্গম মনে হয়। ভারতী হয়তো গোপর্দকে বিয়ে করে উত্তর ভারতে চলে গেছে। কত মাস বছর পার হয়ে গেলো তাদের দেখা হয় না। সময়ের হিসাব সে ভুলে গেছে। শুধু যে হিসাবটা তাদের ছিলো তা হলো সকাল, দূপুর ও রাত যার বিরতিতে খাবার সময়, একঘেয়ে ক্লান্তিকর কাজ ও তার কক্ষে মাঝে মাঝে ভয় দেখানোর মতো উত্তেজনাকর কিছু। সে ভেবে পেলো না ভারতী তাকে জিজ্ঞেস করবে কিনা, ‘তুমি কে?’ যদি সে ভারতীর সামনে হাজির হয়। এ ভাবনায় সে আচ্ছন্ন হলো যে দিন দিন তার যে এত অবনতি হচেছ তাতে ভারতী তার সাথে যে দেখা করবে সে তারও যোগ্য হবে না। সে তার পরিচয় হারাচ্ছে। দেশপ্রেমমূলক লক্ষ হারিয়েছে। ভেবে পেলো না নিজেকে রাজনৈতিক ভুক্তভোগী বলা নিশ্চিত করতে সে কী করেছে। জগদীশ না থাকলে সে সেসব কাজ করতো না যার ফিরিস্তি সে এখন কোনো ভদ্র মানুষের সামনে দিতে চায়নি। এটা যদি জগদীশ না হতো, তবে হয়তো পুলিশ তাকে ভুলে না যাওয়া পর্যন্ত ধ্বংসপ্রাপ্ত সেই মন্দিরে সে থেকে যেতো। আর তখন ভারতীর সাথে দেখা সাক্ষাৎ হওয়ার সুযোগ মিলতে পারতো। ভারতীর চিন্তা তার মধ্যে এক ধরণের অস্বস্তি জাগ্রত করলো: আন্তরিকভাবে কামনা করলো ভারতী যদি এমন আপোসহীন গোঁড়া না হতো। সে যা ভাবতো বা বলতো বা আশা করতো তা ছিলো প্যানপ্যানানি আর মেনে চলা কঠিন ছিলো। বাস্তব সব উদ্দেশ্যে শ্রীরাম এখন সেকেলে, জালিয়াত ও ঘাতকের চেয়ে ভাল কিছু নয়: তাদের জগৎ ছিলো তার জগৎ। সে কেন ভিন্নভাবে ভাববে? যত দীর্ঘ দিন সে এখানে থাকলো ততদিন ভারতীর কাছ থেকে তার সরে আসার সম্ভাবনা বাড়লো। চলে যাওয়াটা তার জন্য অপরিহার্য ছিলো। কিন্তু কীভাবে? তার মনে ঘুরপাক খেলো গল্পের বইয়ে পড়া সেইসব উখা ও হ্যাকসো ব্লেডের কথা যা জেলে চোরাচালানকৃত হলে তা দিয়ে কাজ করে লোকজন জেল থেকে বের হওয়ার রাস্তা খুঁজে নিতো। এটা নিয়ে সে যতই ভাবলো ততই অখুশি হলো। পুরো কাজটার চরম অসহায়ত্ব তাকে ভারগ্রস্ত করে তুললো। নীরব ও শান্ত হয়ে রইলো সে। পালানোর সময় সারা রাত ধরা পড়া, খুন হওয়া এবং গুলি খাওয়ার স্বপ্নে তাড়িত হলো, আর এই গুলি করার দলটি ছিলো ভারতী পরিচালিত দল। শীতল ঘামে জেগে উঠে ব্যাপক স্বস্তি পেলো যে হাজার হলেও সে বাড়ির মতো কারাগারে আছে। স্বপ্নের ভেতরও কেন ভারতী তাকে দুশ্চিন্তাগ্রস্ত করে তুলছে? অন্য অনেক স্বাভাবিক প্রিয়তমার মতো সে কেন নিজেকে আনন্দময়ী ও বশ্য করে তুলতে পারে না? ** তহবিল অফিসের ম্যানেজার তার সাথে দেখা করার জন্য বিশেষ অনুমতি প্রার্থনা করলো। সূতা বোনার চালাঘরে যখন সে কাজ করছিলো তখন তার ডাক এলো। একজন প্রহরী এসে বললো, ‘আজকে বিকেল তিনটা থেকে চারটার মধ্যে একজন দর্শনার্থীকে দেখার অনুমতি আছে আপনার।’ শ্রীরাম উত্তেজনা বোধ করলো। ‘কোন দর্শনার্থী?’ চিৎকার করে বললো সে। ‘নারী না পুরুষ?’ তার মনে অনিয়ন্ত্রিত আশা ছিলো যে দর্শনার্থী ভারতী হতে পারে। পারে কি? তাকে কী বলবে? কীভাবে তার সাথে কথা বলবে? নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে যা যা সে চেয়েছিলো তা কীভাবে তাকে বলবে? হয়তো ভারতী তাকে দেখলে টিটকারী মারবে। তার সাথে বরং দেখা না করাই ভাল। শ্রীরাম কি তাকে কথা ফেরত দিতে পারবে যে সে কারো সাথে দেখা করবে না? এ সব চিন্তা এক ঝলকে তার মনে খেলে গেলো। সে জিজ্ঞেস করলো: ‘কোন ধরণের লোক?’ কিন্তু প্রহরী বললো, ‘নিজেই দেখে আসুন। সাক্ষাৎকারটা হবে প্রধান সাহেবের কক্ষে। প্রশ্ন করে বেশি সময় নষ্ট না করলে আপনি দর্শনার্থীর সাথে কয়েক মিনিট বেশি কাটাতে পারবেন।’ শ্রীরাম প্রহরীকে নীরবে অনুসরণ করে কাজ বন্ধ করলো। তার প্রতিবেশিরা বিড়বিড় করে বললো: ‘তোমার শাশুড়ী হয়তো মিষ্টি নিয়ে তোমার সাথে দেখা করতে এসেছে!’ প্রধান সাহেবের অফিসের প্রবেশ পথে প্রহরী কিছুক্ষণ থেমে তার দিকে উপরে নিচে তাকিয়ে জ্যাকেট থেকে ময়লা ঝাড়া দিলো, আর পোশাকটা সাধারণভাবে উপরে টেনে দিলো: বিড়বিড় করে বললো: ‘মনে রাখবেন প্রধান সাহেবের সামনে কীভাবে ব্যবহার করবেন। কোনো ঝামেলা করলে তিনি আপনাকে চাবুক মারিয়ে নেবেন।’ শ্রীরাম উত্তর দিলো, ‘আমি চাবুক মারা পছন্দ করি না,’ এতে সে সরস জবাব দিলো, ‘মুখে মুখে কথা বলবেন না। আপনাকে যা বলা হয়েছে তা করলেই চলবে।’ তখনি কেবল শ্রীরাম অস্ফুটভাবে অকুণ্ঠ সমর্থন প্রদান করলো যে প্রহরী তাকে যেভাবে শিখিয়েছে সেভাবে সে আচরণ করবে। সে তহবিল অফিসের ম্যানেজারকে তার জন্য অপেক্ষা করতে দেখলো। তাকে পরিপার্শ্বের কারণে ভীত সন্ত্রস্ত দেখালো; একটা টুলে বসে পাদুটো দোলালো, আর তাদেরকে অতিক্রম করতে ভয় পেলো। প্রধান সাহেব চকিত চাহনি নিক্ষেপ করে বললেন, ‘বন্দী, আজকে একজন দর্শনার্থীর সাথে দেখা করার জন্য তোমার বিশেষ অনুমতি আছে।’ ঐ ইউনিফর্ম পরে ওখানে দাঁড়িয়ে তহবিল অফিসের ম্যানেজারের মুখোমুখি হতে শ্রীরাম লজ্জা বোধ করলো। ম্যানেজারের দিকে সে অপলক দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলো। তিনিও শ্রীরামের দিকে অপলক দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলেন। প্রধান সাহেব ব্যস্ত ছিলেন টেবিলে রাখা কাগজপত্র দেখা নিয়ে। ‘কথা বলতে পারেন,’ তিনি আদেশ করলেন। ‘চারটার পর আমি এ সাক্ষাৎকার চলতে দিতে পারি না। কিছু বলার থাকলে শুরু করেন, সময় নষ্ট করবেন না।’ নিজেকে শ্রীরামের বোকার মতো মনে হলো। ভাবলো ম্যানেজার বরফ গলিয়ে কথা শুরু করবেন। কিন্তু লোকটির কোনো কথা নেই বলে মনে হলো। কাগজপত্র দেখে আদেশ করে প্রধান সাহেব আবার পরিস্থিতি সহজ করার চেষ্টা করলেন, ‘গার্ড বাইরে অপেক্ষা করো।’ যে দুজন গার্ড শ্রীরামের উপর নজর রাখছিলো তারা স্যালূট জানিয়ে দুই পা একখানে করে বাইরে চলে গেলো। এতে সামান্য অগ্রগতি হলো, কিন্তু এখনো সাক্ষাৎকারটি পারস্পরিক দেখাদেখির বাইরে এগুলো না। এখন যে শ্রীরামকে তার সামনে দেখছে তাতে তহবিল অফিসের লোকটিকে হতভম্ব মনে হলো। তার সন্দেহ হলো বলে মনে হলো যে এই প্রাণহীন, হলুদাভ রোগাটে, ছোট চুলের ক্রপ কাটে ডোরাকাটা নিকার ও জ্যাকেট পরিহিত মানুষটি কি সে হতে পারে যার সাথে তিনি দেখা করতে এসেছেন। শ্রীরাম তার অবাক হওয়া ও ইতস্তত করা খেয়াল করে মনে মনে বললো: ‘আমার পরিচয় স্বীকার করতে ম্যানেজারেরই যখন এত অনীহা, তখন ভারতী আর কী করবে? হয়তো বলবে, “বের হয়ে যাও, বদমায়েশ। তুমি নিজেকে কী মনে করো?” ’ প্রধান সাহেব ঘড়ির দিকে তাকিয়ে চিন্তায় পড়ে গেলেন। বললেন: ‘রাজনীতি ও নিষিদ্ধ বিষয় বাদে যে কোনো কিছু নিয়ে আপনারা কথা বলতে পারেন।’ শ্রীরামের কণ্ঠ থেকে হঠাৎ বের হলো, ‘সবাই কেমন আছে, ম্যানেজার সাহেব?’ ‘খুব ভাল, খুব ভাল,’ ছোট পাদুটো দুলিয়ে এখনো তাদেরকে অতিক্রম করার ভয়ে ভীত থেকে লোকটি বললো। ‘ঠাকুরমার সম্পর্কে বলেন,’ শ্রীরাম বললো। ‘সেজন্য আমি এখানে এসেছি,’ ম্যানেজার বললো। ‘আজকে তার সাথে আমাদের যোগাযোগ হয়েছে।’ ‘যোগাযোগ! কোত্থেকে?’ ‘জানো না? তিনি তো এখন বেনারসে?’ ‘ওখানে কবে গেলো?’ ‘কাহিনীটা জানো না? শ্মশানের মামলা শেষ হলে কিছু গোঁড়া লোক বললো যে তিনি শহরে ফিরতে পারবেন না কারণ এটা অশুভ আর এতে শহরটা আক্রান্ত হতে পারে। তিনি তাদের ইচ্ছেকে সম্মান জানিয়ে কিছুদিন টোল ফটকে ছিলেন, এরপর তিনি বলেছিলেন তিনি বেনারসে যাবেন। তালাপুর ট্রেন ধরতে আমরা তাকে সাহায্য করেছিলাম।’ ‘বেনারস! বেনারসে সে কী করছে?’ ‘আরো কিছু লোক তার সাথে আছে যারা তাদের শেষ সময়গুলো সেখানে কাটাচ্ছে, বয়স্ক লোক যারা মৃত্যুর প্রতীক্ষায় আছে। উৎফুল্লভাবেই তারা মৃত্যুর জন্য অপেক্ষা করছে, আর পবিত্র গঙ্গায় শেষ আগুন ও শেষ স্নানের দিকে তাকিয়ে আছে।’ ‘আমার কথা জিজ্ঞেস করেছিলো?’ ‘ওহ্, তিনি এত ইয়ে ছিলেন ’ ম্যানেজার শুরু করলো, এ সময় প্রধান সাহেব কাগজপত্র থেকে চোখ না তুলে বললেন, ‘অনুমতি নেই। অন্য কিছু নিয়ে কথা বলুন।’ ‘কিন্তু এটা তো রাজনীতি নয়,’ শ্রীরাম শুরু করলো। ‘তর্ক করো না। অন্য কিছু নিয়ে কথা বলো,’ প্রধান সাহেব আদেশ করলেন। শ্রীরাম অসহায়ভাবে তার দিকে তাকিয়ে ম্যানেজারকে বললো: ‘তারপর কী হয়েছিলো?’ ‘বেনারসে তিনি সম্পূর্ণ ভাল আছেন। তাদের পুরো একটা রাস্তা আছে, যেসব বয়স্ক লোক মহাগঙ্গার তীরে চাকুরি থেকে অবসর নিয়েছে তারা সেখানে অন্তিম মুহূর্তের জন্য অপেক্ষা করছে। কেউ কেউ সেখানে বছরের পর বছর ধরে আছেন। শাস্ত্রে বয়স্ক লোকদের ব্যাপারে যেভাবে নির্দেশ আছে। কেউ সুখময় অন্তিম মুহূর্তের জন্য অপেক্ষা করতে পারলো না।’ তহবিল অফিসের লোকটিকে এ বিষয়ে এত আগ্রহী মনে হলো যে তিনি অনর্গল কথা বলে গেলেন, আর শ্রীরাম জিজ্ঞেস না করে পারলো না, ‘আপনিও কি ওখানে অবসর নিতে চান?’ ‘হ্যাঁ, সময় ভাল থাকতে। ভগবান যদি চান। তোমার ঠাকুরমার মতো তো সবাই ভাগ্যবান না!’ কিছুক্ষণ থেমে ভাবলেন এবং ছোট পাদুটো হালকা দোলালেন। তিনি সম্মানজনকভাবে অফিসের বাইরে স্যান্ডেল রেখে এসেছিলেন আর শ্রীরাম খেয়াল করলো তার পাদুটো কত নোংরা এবং ধুলো ময়লায় কেমন কালো হয়ে গেছে। জীর্ণ পৃথিবীতে আবার ফিরে তিনি বললেন, ‘তার বাড়ি ভাড়ার ব্যাপারে নির্দেশনা দিয়েছেন। তিনি চান টাকাটা তার কাছে পাঠানো হোক।’ ‘কেউ কি বাড়িটাতে থাকছে?’ ‘অবশ্যই, অবশ্যই। জানতে না?’ শ্রীরামকে নৈরাশ্যজনকভাবে সেকেলে মনে হলো। কোথায় কী ঘটছে না ঘটছে সে সম্পর্কে সে কিছুই জানতো না। ‘তার নির্দেশ ছিলো বাড়িটার জন্য ভাড়াটিয়া খুঁজে বের করা, আর সে মাফিক আমরা কেবল চল্লিশ টাকা ভাড়া দেওয়ার মতো একজনকে পেয়ে গেলাম। এ ভাড়াটা তারা বৃদ্ধা ভদ্রমহিলার অ্যাকাউন্টে জমা দিয়ে আসছে।’ শ্রীরামের জন্য এটা ভয়ানক ভাবনা ছিলো যে অন্য কেউ বাড়িটির দরজা বন্ধ করছে ও খুলছে। ‘কারা তারা?’ ‘এক সূতা ব্যবসায়ী।’ ‘সূতা ব্যবসায়ী! কখনো ভাবিনি যে সূতা ব্যবসায়ীর কাছে আমাদের পুরাতন বাড়িটা ছেড়ে দিতে হবে!’ বিতৃষ্ণায় সে বললো। ‘এটা তো ছেড়ে দেওয়া নয়, এক মাসের নোটিশে তারা খালি করে দেবে। এ তথ্যে শ্রীরাম অস্বস্তিতে ভরপুর হলো। ‘আমি কোথায় থাকবো?’ সে ভাবলো। ‘ভারতীকে বিয়ে করলে কোথায় রাখবো?’ এতগুলো বছর সে পুরানো বাড়িটাতে না থাকলেও এখনো তার এক ধরণের অনুভূতি আছে যে যতদিন ঠাকুরমা সেখানে ছিলো সব ঠিক ছিলো এবং ততদিন সে এটাকে নিজের বাসা ভাবতে পারতো। এ বাড়ির পিতলের গাঁথুনী, তন্বী থাম্বা, পয়োনালীর উপর বারান্দা ও ভবন সারির উপর নারিকেল গাছের জন্য সে স্মৃতিকাতর হয়ে পড়লো। ‘এটাই বিষয়,’ ম্যানেজার বললেন। ‘তিনি চেয়েছিলেন আমি যেন এ ব্যাপারটা তোমাকে বলি, আর তুমি এ টাকাটা না চাইলেÑÑ বেশ একটা অঙ্কে জমা হতো, যেমনটা তোমাকে এর মধ্যে আমি বলেছি, তিনি বলেছিলেন এ টাকাটা তাকে পাঠানো হোক। যে টাকা তিনি সাথে করে নিয়ে গিয়েছিলেন তা হয়তো শেষ হয়েছে মনে হচ্ছে। মনে হয়, এটা করা যেতে পারে।’ ‘অবশ্যই, কেন নয়?’ ‘আামি তো শুধু তার নির্দেশ পালন করছি। তিনি চান এ বিষয়ে আমি যেন তোমার ইচ্ছা জেনে নেই।’ ‘সে আপনাকে যা করতে বলে তা-ই করুন। তার আরো টাকা লাগলে আমার তহবিল থেকে নিতে দ্বিধা করবেন না। বেচারি ঠাকুরমা! আমি যদি তার বিষয়ে আরো সময় দিতে পারতাম! আমার জন্য এত করেছে। কেমন আছে সে? খুব একা লাগে নাকি তার?’ ‘মোটেও না। বেনারস থেকে আজকে একজন বন্ধু এসেছে। তিনি খুব ভাল আছেন; গঙ্গায় তিনবার স্নান করেন এবং মন্দিরে প্রার্থনা করেন, খাবার রান্না করেন, ভাল সঙ্গ লাভ করেন। অন্য রকম জীবন; এই বন্ধুটিই চিঠিটা এনেছে।’ আবার বাড়ির কথা ভেবে শ্রীরামের খারাপ লাগলো। ‘তারা হয়তো সব দেয়ালে পেরেক লাগাচ্ছে, আর আমার সব বই ও অন্যান্য জিনিসের কী অবস্থা?’ তার যা যা ছিলো তার একটা ফিরিস্তি দিলো, আর ম্যানেজার প্রাণ ঠাণ্ডা করা ভাষায় বললেন, ‘ওসব নিয়ে ভেবো না। সেগুলো নিরাপদেই রাখা আছে। শেষের রূমটায় যেটা তোমার নিজের ব্যবহারের জন্য আমরা রেখেছি।’ ‘আর কী খবর? লড়াই কেমন চলছে?’ ‘ও ব্যাপারে কথা বলো না,’ প্রধান সাহেব বললেন। ‘অন্য সবকিছু কেমন চলছে?’ লোকটি কিছু একটা বলবে বলে দাঁড়ালেন, কিন্তু শ্রীরাম মাঝখানে বললো: ‘আমি তো জানিও না এটা কোন মাস বা কোন বছর।’ ‘ওসব বিষয়ে কোনো আলাপ চলবে না,’ প্রধান সাহেব বললেন। ‘কোনো রাজনীতি নয়, কোনো লড়াই নয়।’ ** মধ্যরাতের নির্জনতায় শ্রীরাম তার কক্ষে পালানোর ফন্দি আঁটলো। পালানোর যে সকল কৌশল সে পড়েছিলো বা শুনেছিলো তা তার মনে ঘুরপাক খেলো। চোরাচালানকৃত ফাইল ও রশি অবশ্যই পুরো কাজটার প্রধান বিষয় ছিলো। দেয়াল টপকানো ও ঘুলঘুলির মধ্য দিয়ে হামাগুড়ি দিয়ে যাওয়া অপরিহার্য এক বিষয় ছিলো। মন্ট কৃস্টের দুঃসাহসিক অভিযানের কথা সে স্মৃতিচারণ করলো; এসব ছিলো খুবই মজাদার এবং তার মনকে পরিকল্পনা করতে ব্যস্ত রাখলো। পুরানো বন্দীদের জন্য প্রশংসা অকৃত্রিম হয়ে উঠলো; তার সহানুভূতি সত্যিই বাড়ছিলো। জেলার যা করতে অনুমতি দেয় তা ব্যতীত জেলের চার দেয়ালের মধ্যে কোনো কিছু করা কতই না অসম্ভব ছিলো বলে সে উপলব্ধি করলো। প্রহরীরা কর্তব্য পালন করতে ব্যক্তিগত আনন্দ লাভ করতো বলে মনে হলো, তারা দূর্নীতিগ্রস্ত না হওয়ায় তাদেরকে কোনোভাবেই প্রভাবিত করা যেতো না। তবুও লোকজন কী করে হ্যাকসো ও এরকম জিনিস ভেতরে চোরাচালান করে? হাত দিয়ে যখন সে মাটি খুঁড়তে কিংবা চাকা ঘুরাতে ব্যস্ত, তখন তার মন উখা বার ও ক্ষিপ্রগতিতে ঝুলন্ত রশিগুলো বেয়ে ওঠে পালানোর স্বপ্নে বিভোর হলো যা গল্প ও ছবির লেখকেরা খুব সুচারুরূপে বর্ণনা করেন। এ স্বপ্ন এত সমস্যাজনক হলো যে সে নিজেকে আর সামলাতে পারলো না। রাতে সিমেন্টের বিছানায় শুয়ে শুয়ে সে একটা রশি তৈরি করতে ব্যস্ত হলো যে রশি ছাদের ঘুলঘুলি পর্যন্ত যাবে। এ ছাদ দিয়ে আকাশ দেখা যায়, জ্বলজ্বল করা মুক্ত বিশ্বকে এক নজর দেখা মাত্র। তার যথেষ্ট বিকৃত প্রবোধ ছিলো যে ভারতী নিজে হয়তো পুরাতন কসাইখানার চৌহদ্দির মধ্যে একইভাবে কাতরাচ্ছে। এমন তো নয় যে ভারতীর ভোগান্তি সে দেখতে চায়নি, কিন্তু তার ভোগান্তির ধারণা শ্রীরামের মধ্যে আগ্রহবোধ সঞ্চার করলো। জেল থেকে পালাতে পারলে এ বুদ্ধিটা সে ভারতীর কাছে পাচার করবে, সে যেখানেই থাকুক না কেন যাতে করে ভারতী জেল থেকে নেমে এসে ভয়ানক দেয়ালগুলোর বাইরে তার সাথে দেখা করতে পারে এবং তার নায়ক হিসেবে শ্রীরামকে জড়িয়ে ধরতে পারে। কিন্তু যথাযথ রাষ্ট্রীয় নিয়মে তাকে গেট খুলে না দিলে জেল থেকে হেঁটে বের হতে অস্বীকৃতি জানিয়ে ভারতী তো নিজের কক্ষে ফিরে যাওয়ার জন্য পীড়াপীড়ি করতে পারে। তার শ্রমের জন্য ভারতী তাকে প্রত্যাখ্যান করতে পারে। সে তো আবার আচরণে সতর্ক নয়। বাপুজীর অনুমোদন লাগবে হয়তো। বাপুজী হয়তো প্রস্তাব- টার প্রশংসা করবে যদি প্রমাণ করা যায় যে শ্রীরামের এ কৌশলে জেল থেকে সব বন্দীকে নামিয়ে বের করা যায়; তখনই তারা এর জাতীয় তাৎপর্য্য উপলব্ধি করবে: ব্রিটিশদের কী করে হতাশায় নিমজ্জিত করা যায় যদি তাদের বোধে আনা যায় যে তাদের কারাগারগুলো কাউকে আটকে রাখতে পারে না। এতে তারা পাগল হয়ে অবশেষে সিদ্ধান্ত নিতে পারে, ‘ঠিক আছে, আমরা চলে যাচ্ছি। ভারতকে আমরা আর ধরে রাখতে পারছি না।’ এটা ছিলো বড় আকারের কপোলকল্পনা, কিন্তু এতে তো কাজ হয় না। এ উত্তেজনাই সে শুধু কল্পনা করতে পারে। তার এই বেপরোয়া ভাবের মধ্যে যখনই সুযোগ মিললো কক্ষের বুলিটার সাথে সে পরামর্শ করলো । একদিন সন্ধ্যায় সে অস্বাভাবিক রকমের বন্ধুপরায়ণ হলো, আর শ্রীরাম দ্রুত তার সিমেন্টের বিছানায় বসে পড়লো। ফিসফিস করে বললো: ‘এ নরক থেকে আমরা সবাই পালাচ্ছি না কেন?’ লোকটি সহানুভূতি সিক্ত হাত শ্রীরামের উপর রেখে বললো, ‘এ রকম বোধ হওয়া স্বাভাবিক। কিন্তু আজকাল আমার সে রকম হয় না। আমি শুধু ভজন করে ভাল থাকি। তুমিও আমাদের ভজনে অবশ্যই যোগ দেবে।’ ‘ঠিক আছে, ও বিষয়ে আমরা পরে কথা বলবো। কিন্তু এখন চলো কীভাবে পালাবো তা নিয়ে আলোচনা করি।’ ‘কীভাবে?’ লোকটি জিজ্ঞেস করলো। ‘আমাদেরকে তোমার অবশ্যই সাহায্য করতে হবে। তোমার তো অনেক অভিজ্ঞতা আছে। তুমি কি কখনো জেল থেকে পালাওনি?’ ‘হ্যাঁ, দুইবার, সেজন্য আমার সাজার এখন সাত বছর চলছে।’ ‘তোমার ধরা পড়া ঠিক হয়নি।’ ‘হুম, এসব ঘটনা তো ঘটেই, আমাদের কিছু করার নেই,’ লোকটি দার্শনিকতার সাথে বললো। পদ্ধতিটিতে আগ্রহী হয়ে শ্রীরাম জিজ্ঞেস করলো, ‘তুমি কীভাবে পালিয়েছিলে?’ ‘সহজ,’ ঘুলঘুলির দিকে তাকিযে লোকটি বললো। ‘এক কক্ষে আমরা ছয়জন ছিলাম মাত্র। কম্বলের সূতা দিয়ে রশি তৈরি করে একে অপরের কাঁধে উঠে রশি দিয়ে বাঁধলাম আর উপরে উঠে বেরিয়ে গেলাম: বেশি সময় লাগেনি। এক ঘন্টায় চলাম মাঠ পার হয়েছিলাম। আমাদেরকে কেউ আর খুঁজে পেতো না, কিন্তু আমাদের মধ্যে একজন পথিমধ্যে এক বাড়ির তালা ভেঙেছিলো আর ধরা পড়েছিলো।’ ‘আমরা কি ওরকম কিছু করে এখান থেকে বের হয়ে যেতে পারিনা?’ লোকটি ভেবে বললো, ‘আমি কেন বের হবো? বাইরে আমি কী করবো?’ ‘কিন্তু আমি বাইরে বেরোতে চাই। এ জায়গাটা আমার আর সহ্য হচ্ছে না,’ শ্রীরাম বললো। ‘এ জায়গাটা তোমার ভাল না লাগলে এখানে আসার মতো কাজ না করলেই পারতে, ব্যস,’ লোকটি বললো। ‘কোনো রকমে বেরোতে পারলেও তারা তোমাকে শীঘ্রই আবার ফেরত নিয়ে আসবে, ওসব ঝামেলা করে লাভ নেই। তুমি তো তোমার মুখ লুকাতে পারবে না। ‘দাঁড়ি রাখবো।’ ‘তখন তোমাকে কেমন দেখায় তা দেখতে তারা তোমার দাঁড়ি ছিড়ে ফেলবে। আর এতে দাঁড়িওয়ালা পবিত্র সাধুদেরকেও তোমার অসম্মান করা হবে।’ ‘কথা দিচ্ছি আমি পুলিশ থেকে দুরে থাকবো।’ লোকটি মাথা নাড়ালো। ‘স্বাধীনভাবে চলাফেরা করতে না পারলে বাইরে গিয়ে লাভ কী?’ তাকে টিটকারী মেরে এবং জেল জীবনকে যারা পছন্দ করে না তাদেরকে অবজ্ঞা করে সে আনন্দ পেলো মনে হলো । অবশেষে শ্রীরাম তার ট্রাম্প কার্ড বের করে বললো, ‘আমি পালাতে চাই কারণ যে মেয়েটাকে আমি ভালবাসি সে বাইরে আছে।’ ‘কোথায়?’ লোকটি নির্দয়ভাবে বললো। এর জবাব দিতে শ্রীরাম ভয় পেলো, কিন্তু নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করার আগেই সে গড়গড় করে বলে দিলো। ‘সেও জেলে আছে।’ ‘ওহ! ওহ!’ লোকটি মজার সাথে চিৎকার করে বললো। ‘তুমি কি বলতে চাচ্ছো পালিয়ে তার জেলে যাবে আর জেলারকে বলে বিয়ের আনুষ্ঠানিক কাজ সারবে?’ রূঢ়ভাবে বললো সে। শ্রীরাম ক্রদ্ধ হয়ে আফসোস করলো যে সে তার দেবীর কথা এই রূঢ় লোকটিকে বলেছে। ভগবান জানেন এখন সে কী ভয়ংকর কথা বলবে। নীরবে রইলো, মুখ খুলতে ভয় পেলো। আর লোকটি বললো: ‘সে মেয়েটি যদি জেলে যাওয়ার মতো মেয়ে হয়, তবে আমার কথা শোনো, তাকে তার মতো থাকতে দাও। তুমি তো তোমার সন্তানদের জেলে মানুষ করতে পারবে না। কাউকে না কাউকে তো সংসার দেখাশুনার জন্য অবশ্যই থাকতে হবে। এটা মোটেও ঠিক না যে স্বামী-স্ত্রী দুজনই জেলের ঘানি টানবে।’ ‘তোমার ক্ষেত্রে ব্যাপারটা কেমন?’ শ্রীরাম জিজ্ঞেস করলো। ‘এখানে সেখানে আমার তিনটা বউ আছে, আর আমি না থাকলে তারাই সংসার চালায়: না চালালে তাদের মধ্যে সে বোধ সঞ্চারিত করতে আমি দ্বিধাবোধ করি না। এটাই উপায়। তুমি তো আর এখানে সারা জীবন থাকছো না। শোনো, এখান থেকে বের হতে দিলে ভাল একটা মেয়ে দেখে বিয়ে করো। এই জেলের পাখি তোমার জন্য ভাল হবে না।’ ‘সে তো অপরাধী না, মহাত্মাজীর আদেশে সে জেলে গেছে।’ ‘ওহ! ওহ! ওহ!’ লোকটি মুখ বাঁকিয়ে অবজ্ঞা করলো। ‘ঐ মহান ব্যক্তিটির নাম তুমি এখানে টেনে আনছো কেন?’ শ্রীরাম বিরক্ত হলো। ভারতীর নাম কোনো না কোনোভাবে লোকটির মধ্যে নিকৃষ্ট ধারণার জন্ম দিলো। শ্রীরাম হঠাৎ দাঁড়িয়ে বিছানায় গেলো এবং বিড়বিড় করে বললো, ‘যাও, ঘুমাও গিয়ে। আর কোনো কথা না বলি।’ ‘তুমি ভয় পেয়েছো যে আমি প্রধান সাহেবকে বলে দেবো, তাই না?’ লোকটি মুখে অবজ্ঞার অভিব্যক্তি এনে বললো। ‘তুমি যদি মহা উদ্যমে আমাদের ভজনে শরীক না হও, তবে প্রধান সাহেবের কাছে তোমার কথা বলে দেবো।’ ‘আমি ভয় পাই না, ’ স্পর্ধার সাথে শ্রীরাম বললো। ‘ঠিক আছে, দেখবো, তারা তোমাকে নির্জন কক্ষে তালা দিয়ে রাখলে অবাক হয়ো না যেন। কথা বলার জন্য তখন শুধু দেয়াল থাকবে,’ লোকটি বললো। শ্রীরামের প্রতিশ্র“তিশীল নরকের পৈশাচিক আনন্দ সে পেল্ ো কিছুক্ষণ থেমে শ্রীরাম বললো, ‘আমি তো তোমার প্রতি কোনো অন্যায় করিনি। তুমি আমাকে ঘৃণা করছো কেন?’ গোমড়া মুখের ভাব ধরে লোকটি বললে, ‘যারা ভগবানে বিশ্বাস করে না তাদের জন্য আমার কোনো সহানুভূতি নেই। যারা ভগবানের নিন্দা করে তাদেরকে আমি দেখতে পারি না।’ ‘ভগবানের বিরুদ্ধে তো আমি কোনো কথা বলিনি,’ বিষয়টি যেদিকে মোড় নিচ্ছে সেদিকটা ভেবে ভেবে শ্রীরাম বললো। ‘আমি কী বলেছি?’ ‘তা আর বলবো না,’ লোকটি জবাব দিলো। ‘ভগবানকে না মানলে জেলখানায় তোমাকে চাবুক মারা হবে, মনে রেখো। এটা আমার অভিজ্ঞতা। অভিজ্ঞ কারো কাছে তোমার শোনা উচিৎ, ব্যস।’ ‘কারো কোনো উপদেশের দরকার নেই আমার,’ উদ্ধতভাবে শ্রীরাম বললো। জালিয়াতকারী লোকটি ঘুমের মধ্যে ঘুরে রাগারাগি করে বললো, ‘তোমরা কি ঘুমাবে না সারা রাত কথা বলে যাবে? এমনিতে হতচ্ছাড়া একটা জায়গা, তার উপর বাজারের চেয়েও নিকৃষ্ট হচ্ছে। যে ঘুমাতে চায় তার জন্য কোনো শান্তি নেই। তোমরা যদি এখনই কথা বন্ধ না করো, তাহলে আমি কিন্তু গার্ডকে ডাকবো।’ জবাবে বুলিটা পুরো শহরটাকে জাগিয়ে দেওয়ার মতো উচ্চস্বরে চ্যালেঞ্জিং গান ধরলো। বাইরে পায়ের ছুটাছুটির আওয়াজ হলো। শ্রীরাম সন্তর্পণে বিছানায় গেলো। গার্ড বারের মধ্য দিয়ে জিজ্ঞেস করলো: ‘এখানে কী হচ্ছে?’ ‘লোকজন বকবক করছে তো করছেই। এতে জায়গাটা বাজারের চেয়েও নিকৃষ্ট হয়েছে,’ বিছানা থেকে বুলি বললো। ** একজন বন্ধুসুলভ প্রহরী তাদেরকে বহির্বিশ্বের সংবাদ এনে দিতো: ‘মহাত্মা গান্ধী ভারতের সম্রাট হচ্ছেন,’ একদিন সে বললো। ‘এসব ব্যাপার জানে এমন একজনের কাছ থেকে আমি আজকে শুনেছি। প্রস্তাবটা নিয়ে ইংল্যান্ড থেকে কিছু লোক প্লেনে করে এসেছে।’ ‘অবোধের মতো কথা বলো না। মহাত্মা ভারতের রাজা হোক সেটা তারা কীভাবে চাইতে পারে যখন তারা তাকে কারাগারে রেখেছে এই ভয়ে যে তিনি একদিন তা হতে পারেন?’ ‘আপনি জানতেন না? মনে হয় তিনি জেলের বাইরে আছেন।’ ‘আমার বিশ্বাস হয় না।’ ‘কসম খেয়ে বলছি বাইরে আছেন। তারা তাকে অনেক আগেই ছেড়ে দিয়েছেন কারণ তিনি অসুস্থ ছিলেন আর তার স্ত্রী মারা গেছেন। যে মহিলাটা এখানে ঘাস কাটতে আসে সে আমাকে বলেছে।’ ‘ঘাস কাটা মহিলাদের সাথে লেনদেন থাকাটা নিরাপদ না। তারা তোমাকে বিপদে ফেলবে,’ এক দাগী বন্দী বললো। ‘আপনি কী করে জানেন?’ ‘জানি কারণ আমি ভুগেছি। ওরা ছলনাময়ী। তুমি কোথায় আছো সেটা জানার আগে ওরা তোমাকে ফুসলিয়ে ফেলবে। আর তখন দেখবে তোমার ঝামেলা সবখানে। জেলে এমন কাণ্ড-কারখানা ওরা পছন্দ করে না।’ ‘কিন্তু সে মহিলা তো বুড়ি যে কাউকে ফুসলাতে পারে না। সে তো ঠাকুরমা, কাজেই ভয় পাবেন না।’ ‘তাহলে ঠিক আছে। চালিয়ে যাও।’ ‘তার ছেলে সেনাবাহিনীতে আছে। নাতি বাজারে সংবাদপত্র বেচে আর তাকে বলে বাইরের জগতে কী হচ্ছে।’ বন্দীদের সবাই এবং গার্ডরাও আগ্রহভরে তাকে ঘিরে ধরে জিজ্ঞেস করলো, ‘কী হচ্ছে, কী হচ্ছে? আমাদেরকে বলো।’ ‘মনে হয় মহাত্মাকে রাজা বানাতে ইংল্যান্ড থেকে কিছু লোক এসেছে।’ আনন্দে তারা হাততালি দিলো। ‘ওহ, এটা শুনে কী যে ভাল লাগছে!’ ‘এতে তোমার এত আনন্দ কেন?’ ‘কারণ মহাত্মা আমাদের দেশের রাজা হলে তিনি কাউকে জেলে রাখতে দেবেন না। এটা তিনি পছন্দ করেন না। এর কারণ তিনি অত্যন্ত ভাল একজন মানুষ। মনে হয় তিনি এমন কথা বলেন বলে ব্রিটিশরা তাকে পছন্দ করে না।’ ‘তারা এখন তাকে পছন্দ করে, ঠিক আছে।’ এভাবে মজে যাওয়া প্রহরীটি তাকিয়ে দেখলো বন্দীরা তাদের বিভিন্ন কর্তব্য পালন করতে করতে এসব বিষয় নিয়ে নিজেদের মধ্যে আলোচনা করছে। প্রহরীর অবশ্য কারগারবিহীন রাষ্ট্রের ধারণাটা পছন্দ হয়নি। সে বললো: ‘জেলখানা না থাকলে হয়? যিনিই রাজা হোন না কেন জেলখানা সব সময়ই থাকবে।’ এটা তো সুঁড়সুঁড়ি দেওয়ার মতো কারিগরী দিক। সবচেয়ে ভাল হয় রাজনীতি বিশেষজ্ঞের সাথে তাদের পরামর্শ করা। তারা নির্দেশনার জন্য শ্রীরামের দিকে ঘুরে দাঁড়ালো। তারা যা বলছিলো শ্রীরাম সেদিকে মন না দিয়ে পাথর ভাঙছিলো। তাদের আলোচনা শুনছিলো, কিন্তু কোনো উৎসাহ দেখাতে চাইলো না। সে বললো, ‘কোনো কিছু সম্পর্কে আমি কিছু জানি না।’ তারা তাকে প্রশ্নের পর প্রশ্ন করলো: ‘একি সত্যি নাকি সত্যি না?’ ‘আমি কী করে জানবো? আমি তো তোমাদের মধ্যে আছি।’ ‘তারা কি আমাদের সবাইকে জেল থেকে মুক্তি দেবে?’ ‘সবাইকে? আমার তা মনে হয় না; তারা শুধু রাজনৈতিক বন্দীদের মুক্তি দিতে পারে।’ এ কথা শুনে প্রহরী স্বস্তি পেলো মনে হলো। ‘আহ্ , আপনি এমন কথা বলছেন। রাজনৈতিক বন্দীরা ভিন্ন। অন্য ব্লকে কেউ কেউ আছে। শুনেছি তাদের কেউ কেউ প্রতিদিন চলে যাচ্ছে। সব মিলিয়ে সেটা ভিন্ন বিষয়। কিন্তু আপনারা সবাই তো রাজনৈতিক বন্দী নন।’ তারা সবাই বললো, ‘না হলেই বা কী? আমরাও মানুষ। আমাদেরকেও কেন ভালভাবে দেখা হবে না? তুমি যা-ই বলো, মহাত্মা গান্ধী আমাদের সাহায্য করবেন। তুমি কি বলতে চাচ্ছো যে মহাত্মাজী আমাদেরকে নিয়ে ভাববেন না? তিনি তো দয়ালু ব্যক্তি।’ তাদের কৌতুহল দমানো গেলো না। দিন রাত তারা এটা নিয়ে উদ্বিগ্ন থাকলো যতক্ষণ না পর্যন্ত বন্ধুসুলভ প্রহরীটি ভাল অফিসের মাধ্যমে একটা সংবাদপত্র পড়ে বিশ্লেষণ করার জন্য চুরি করে শ্রীরামের হাতে এনে দিলো। শ্রোতাবৃন্দ তাকে ঘিরে বসে পড়লে জেলের বাইরে খনিতে গার্ড তাদের উপর নজর রাখলো, আর শ্রীরাম “ডেইলি নিউজ” এর প্রথম থেকে শেষ লাইন পর্যন্ত তাদেরকে পড়ে শোনালো। যেন তাকে বিস্তৃত ও ব্যস্ত জগতের আকস্মিক আলোচনা করতে দেওয়া হয়েছিলো। আসন্ন রাজনৈতিক পরিবর্তন, হিন্দুস্থান ও পাকিস্তান নামে ভারতের প্রস্তাবিত বিভাজন, সে প্রস্তাবে মহাত্মাজীর অনড় প্রত্যাখ্যান এবং মৃত্যু, বিপর্যয় ও বৈপ্লবিক পরিবর্তন নিয়ে অনবরত আলোচনা সম্পর্কে পড়লো সে। শ্রীরামের সবচেয়ে বড় বিজয় ছিলো ব্রিটিশরা নিশ্চিত ভারত ছাড়ছে। গর্বভরে সে বললো, ‘সব দেয়ালে আমি নিজে লিখেছিলাম “ভারত ছাড়ো” , আর তোমরা দেখো এটা কার্যকর হয়েছে।’ লোকজন তার দিকে বিস্ময়ের দৃষ্টিতে তাকালো। তাদের মাঝে সে নায়ক হয়ে গেলো। ‘তোমার সব কাজের জন্য তারা কি এখন তোমাকে কোনো পুরস্কার দেবে?’ সে পড়লো, আর দেশের সব জেলখানার রাজনৈতিক বন্দীদের মুক্তির জন্য তা ছিলো উৎসাহব্যাঞ্জক; কিন্তু এ শ্রেণীভুক্ত হওয়ার আশা সে করতে পারলো না। তাকে তো রাজনৈতিক বন্দী হিসেবে শ্রেণীভুক্ত করা হয়নি। ** প্রধান সাহেব শ্রীরামকে ডেকে পাঠালেন। তার কণ্ঠস্বর হঠাৎ করে বন্ধুত্বপূর্ণ হলো। ‘তোমার ব্যাপারে সরকারের আদেশ কী হবে তা আমি জানি না। কিন্তু এ সপ্তাহে জেল থেকে মুক্তি দেওয়ার লক্ষে কিছু নাম আমরা পেয়েছি। এটা করতে আমার আনন্দ হচ্ছে কারণ এতে আমাদের কাজের চাপ কমবে।’ তালিকাটা দেখে বললেন, ‘তোমার নাম অবশ্য এতে নেই।’ শ্রীরাম দমে গেলো। তার বোধ হতে লাগলো যে অন্য সবাই যখন বিরাট পৃথিবীতে স্বাধীনভাবে চলাফেরা করছে তখন তাকে খাঁচায় বন্দী করে রাখা হচ্ছে। অখুশী হয়ে ভাবলো যে কেউ তার সাথে বৈষম্যমূলক আচরণ করছে। জগতটা নিষ্ঠুর ও ধর্ষকামী। তার মুখাবয়বে যন্ত্রনা লক্ষ করে প্রধান সাহেব বললেন, ‘স্পষ্টতই তোমাকে রাজনৈতিক বন্দী হিসেবে শ্রেণীভুক্ত করা হয়নি। তুমি যা করেছো তা যারা যারা করেছে তারা সবাই সরকারের বিবেচনায় আছে। চাইলে তুমি অঙ্গীকারনামা দিয়ে প্রধিনিধি পাঠাতে পারো, আর আমি তা ফরওয়ার্ড করে দেবো।’ ‘কোন প্রতিনিধি আর কোন অঙ্গীকারনামা?’ শ্রীরাম জিজ্ঞেস করলো। ‘কিছু সময় পুলিশের কাছে তোমার গতিবিধি জানিয়ে একটা অঙ্গীকারনামা লিখতে হবে যে পর্যন্ত না সব কাগজপত্র নিরীক্ষণ করে তোমার শ্রেণীভুক্তির নিস্পত্তি করা হয়।’ শ্রীরাম এটা নিয়ে ভাবলো। ‘এটা কি নতুন ভারত নাকি ব্রিটিশরা এখনো এখানে আছে?’ প্রধান সাহেব উত্তর দিলেন, ‘এ ব্যাপারে তোমাকে আমি কোনো কিছু বলতে পারছি না। এটাই রাজনীতি। আমি শুধু নিয়ম মাফিক চলছি।’ মুহূর্তের মধ্যে শ্রীরামের মনে ঝলক কেটে গেলো যে যেসব কঠিন, ঝুঁকিপূর্ণ কাজ সে করেছিলো তা এই অঙ্গীকারনামার মাধ্যমে শুন্যে চলে আসবে। ভারতীর সাথে দেখা হলে সে হয়তো বলবে, ‘জেল থেকে তুমি গোপনে চলে এসেছো, তাই না? বর্ণনাতীতভাবে তুমি নিচে নেমে গেছো। আমার সামনে থেকে দূর হও।’ প্রধান সাহেবকে সে বললো: ‘না। আমি এমন কোনো অঙ্গীকারনামা দিতে পারবো না।’ ‘ঠিক আছে, শান্ত হও। ঠিক আছে, বাদ দাও।’ প্রহরীরা তার বাহু ধরে রাখলো, আর আগের চেয়ে বেশি বিষন্ন হয়ে সে ঘুরে রূমের বাইরে হেঁটে চলে গেলো। ** সবকিছুর পরেও এমন একদিন এলো যেদিন সে প্রধান সাহেবের রূম সংলগ্ন অফিসে ঢুকলো। অফিসটা ছিলো প্রশস্ত যেখানে কিছু সংখ্যক র্যাক ছিলো। তার স্বাভাবিক প্রহরীরা বেশি হৈ হুল্লোড় না করে তাকে সেখানে নিয়ে গেলো; টেবিলে বসা ইউনিফর্ম পরিহিত এক ব্যক্তির হাতে সে এক টুকরা কাগজ দিলো; তাকে ঘিরে আরো কিছু লোক সেখানে ছিলো যাদের প্রত্যেককে সে কাপড়ের বোঁচকা দিচ্ছিলো। নিজের পালা না আসা পর্যন্ত শ্রীরাম ধৈর্য্য সহকারে অপেক্ষা করলো; তার হাত থেকে লোকটি টুকরাটি নিয়ে তাকে উপরে নিচে তাকিয়ে চিৎকার করে বললো, ‘ছয় সাত নম্বর,’। এতে একজন পরিচারক মই বেয়ে উপরে ওঠে এক বোঁচকা বের করে আনলো এবং টেবিলে রাখলো। লোকটি বোঁচকাটি খুঁটে খুঁটে দেখে শ্রীরামের দিকে তাকালো, আর জিজ্ঞেস করলো, ‘এগুলো কি তোমার?’ শ্রীরাম কাপড়গুলোর দিকে তাকালো; অনেক অনেক আগে এগুলো খুলে রেখে জেলের পোশাক পরতে তাকে বাধ্য করা হয়েছিলো। দৃশ্যটি দেখে সে রোমাঞ্চিত হলো। তাদেরকে বুকের কাছে জড়িয়ে ধরে সে বললো, ‘জ্বী, এগুলো আমার।’ ‘দাঁড়াও,’ তার হাত থেকে কাপড়গুলো ছিনিয়ে নিয়ে লোকটি বললো, ‘এখানে স্বাক্ষর করো।’ তিনি হাতে একটা কাগজ ধরে রেখেছিলেন; অনেক কাগজ স্বাক্ষর করার আছে। এ ঘৃণ্য জায়গাটা থেকে বের হওয়ার আগে তাকে যেসব বাধা পার হতে হয়েছিলো তাতে সে ক্ষিপ্ত হলো। অবশেষে লোকটি সন্তুষ্ট হলেন। তাকে বোঁচকা, পুরানো আঁটসাঁট কলারের কোট, শার্ট ও ধুতি দিয়ে দিলেন, আর এগুলো পরা অবস্থায় অনেক আগে শ্মশানে তাকে গ্রেফতার করা হয়েছিলো। ‘এখন তোমার নিজের কাপড় পরে নাও। তুমি এখন আর বন্দী নও।’ সবার সামনে জেলের পোশাক খুলতে গেলো শ্রীরাম। এখানকার জীবন তাকে শক্ত করে তুলেছে। লোকটি বললেন, ‘ঐ তাকটার পিছনে গিয়ে পোশাক পরতে পারো।’ পুরানো বিবর্ণ কাগজপত্রে ভরা তাকটির পিছন থেকে শ্রীরাম যখন হাজির হলো তখন তার মনে হলো সে পুরানো অবস্থায় ফিরে গেছে। ডোরাকাটা শর্টস ও জ্যাকেটটা গুটিয়ে উপরে তুলে এক কোণায় ঠেলে দিলো সে। লোকটি বললেন, ‘তুমি মুক্ত, ছাড়া পেয়েছো।’ কোন দিকে যাবে তা ঠিক করতে না পেরে শ্রীরাম স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে রইলো। ‘এদিকে যাও, ঐ দরজা দিয়ে বাইরে যেতে পারবে,’ লোকটি বললেন। তাকে অস্পষ্ট স্যালুট দিয়ে শ্রীরাম বিড়বিড় করে বললো, ‘যাচ্ছি,’ আর দরজাটি খুললো; বাইরে ছোট একটা আঙ্গিনা ছিলো যার অপর প্রান্ত র্বা গেট দিয়ে বন্ধ ছিলো; এর সামনে এক সশস্ত্র সেন্ট্রি এলো। তাকে দেখে শ্রীরামের প্রথম প্রবৃত্তি ছিলো ফিরে যাওয়া, কিন্তু মনে মনে বললো, ‘আমি তো আর কোনো বন্দী নই,’ আর উদ্ধতভাবে হেঁটে চললো। সে কাছে এলে লোকটি দরজা খুলে দিলো। শ্রীরামের যাওয়ার সময় লোকটি বললো, ‘চলে যাচ্ছেন! খুব ভাল, ফিরে আসার চেষ্টা করবেন না যদি এ জায়গাটা আপনার ভাল না লাগে।’ ‘এটাকে আমি ঘৃণা করি,’ অনুভূতির সাথে শ্রীরাম বললো। ‘আর কোনো কারাগার দেখতে আমি চাই না।’ ‘এ চেতনাই সঠিক,’ লোকটি বললো, ‘এটাই ধরে রাখুন।’ লোকটি সব বিদায়ী বন্দীর কাছে এ সূত্র আওড়াতে স্পষ্টতই অভ্যস্ত ছিলো। এ ছিলো এক ধরণের সমাবর্তন ভাষণ। পিছনের বার গেটটি বন্ধ হয়ে গেলে শ্রীরামের প্রায় বিশ্বাসই হলো না যে সে মুক্ত। সে দুর্বল ও নাজুক, আর ব্যাখ্যাতীতভাবে অসুখী বোধ করলো। জেলে তার কক্ষ সঙ্গীরা তার চলে যাওয়ার কথা শুনে বিষন্ন ও বেদনাবিধুর হয়েছিলো তাদের স্মৃতি তাকে যন্ত্রনা দিলো। বুলিটা বলেছিলো, ‘তুমি তো স্বার্থপর ধরণের লোক, আমরা হবো কেন? মহাত্মাজীকে বলো যে আমরা বের হয়ে আসতে চাই।’ আরেক জন বলেছিলো, ‘তুমি যদি বড় মন্ত্রী বা এমন কিছু হও, আমাকে ভুলো না যেন।’ বুলিটা আরো বলেছিলো, ‘আমি ছাড়া পেলে কোনো এক রাতে তোমার বাড়িতে জোর করে ঢুকে তোমাকে সুবোধ শিখিয়ে আসবো। তোমার মতো স্বার্থপরদের আমি পছন্দ করি না।’ প্রহরীরা তার পিছনে সারিবদ্ধ হয়েছিলো বকশিশের জন্য। অল্প কিছু টাকা সে পারিশ্রমিক হিসেবে জমিয়েছিলো যা জেলের একাউন্টেট তাকে দিয়েছিলো, আর তার পুরানো প্রহরীরা তার পিছু নিয়ে বিড়বিড় করে বলছিলো, ‘এতদিন আমরা একসাথে ছিলাম। আমি চাই আপনি আমাদেরকে মনে রাখবেন।’ ‘আমার বাচ্চাটার জন্মদিন। আপনাকে মনে রাখার মতো আমাকে কিছু একটা দেন।’ ‘এ ব্লক পার হয়ে আমাদের যেতে নেই, আপনি যা চান তা-ই দেন দয়া করে।’ ‘এতগুলো মাস আমরা আপনাকে দেখাশুনা করেছি।’ দলটার প্রত্যেককে এক টাকা করে দিলো শ্রীরাম যারা তার পিছু নিয়ে কাকুতি মিনতি করছিলো, আর এতে তার উপার্জনের পঞ্চাশ ভাগ চলে গেলো। ৫ সে যেন স্বপ্নের মধ্যে হেঁটেই চললো। কোনো গার্ড তাকে অনুসরণ করছে না এবং কোথায় যেতে হবে তা বলছে না এমন অবস্থায় চলাফেরা করা তার জন্য কঠিন হয়ে দাঁড়ালো। সন্ধ্যার আলোটা তার চোখে ঝলসে উঠলো, আর বিস্তীর্ণ খোলা প্রান্তর তাকে বেদনার্ত করে তুললো। যে ভবনটা সে বছরের পর বছর দখল করেছিলো সেটার দিকে এখন দৃষ্টিপাত করার জন্য ঘুরে দাঁড়ালো। ভবনটিকে স্লেট ধুসর রঙে যথেষ্ট নিস্পাপ দেখাচ্ছিলো, কিন্তু এর ভেতরে কী অত্যাচারের জগতই না ছিলো: কেউ সেখানে কিছু করতে চাইলে করতে পারতো না, প্রকৃতির ডাকেও সাড়া দিতে হতো নিয়ম মেনে! জেলখানাটা ছিলো শহরের সীমানার বাইরে ট্রাঙ্ক রোডের শেষে। আগে সে সেখানে কখনো যায়নি; সে এতদিন ট্রিচি ট্রাঙ্ক রোডে বাস করে আসছিলো যা সে জানতো না। শহরের উদ্দেশ্যে রাস্তা দিয়ে সে হেঁটে চললো, আর ভাবলো এখন তার কোথায় যাওয়া উচিৎ। কয়েকটা বাস তাকে অতিক্রম করে চলে গেলো। তার আশা ছিলো লোকজন তাকে চিনতে পারবে না। একটা বাসে একজন পুলিশ বসেছিলো, আর শ্রীরাম সহজাতভাবে তার দৃষ্টি থেকে মুখ সরিয়ে নিলো। রাস্তার কিনারা ধরে সে হেঁটেই চললো। ‘আমি এখন স্বাধীন ভারতের মধ্য দিয়ে হাঁটছি,’ সে ভাবলো। দেশ যে স্বাধীন হয়েছে তার কী চিহ্ন আছে? আশপাশে তাকালো সে। গাছগুলো আগের মতো, রাস্তাটার মোটেও কোনো উন্নতি হয়নি, আর পুলিশ এখনো মহাসড়ক বাসের ফুটবোর্ডে চড়ে। ক্লান্ত ও ক্ষুধার্ত বোধ করলো সে। প্রহরীদের দাবি মিটিয়ে তার কাছে এখন কয়েক টাকার বেশি নেই। কামনা করলো জেল থেকে যারা বেরোয় তাদের জন্য যদি কোনো ধরণের যানবাহনের ব্যবস্থা করা হতো: এটা তো খুবই অবিবেচকের কাজ, স্বাধীন ভারতেও এর মুখোমুখি হতে হবে! সে আশা করলো কোনো একদিন তারা তাকে মন্ত্রী বানাবে, আর তখন সে একটা ক্যান্টিন খুলবে এবং জেল গেটে বন্দীদের চলে যাওয়ার জন্য স্টেশন ওয়াগন স্থাপন করবে যাতে করে যারা জেল থেকে বের হয় তার এত দিশেহারা বোধ না করে। বাজার রোডে ঢুকলে সন্ধ্যা হয়ে গেলো। কেউ তাকে খেয়াল করলো বলে মনে হলো না। এখানে সেখানে ভবনগুলোতে মাঝখানে চরকাসহ তিন রঙা পতাকা ঝুলতে দেখলো সে। দেখলো আগের চেয়ে কম যানবাহন। দোকানগুলোতে আলো জ্বালানো হয়েছিলো আর আগের মতোই ভীড় ছিলো। সে হতাশার যন্ত্রনা বোধ করলো। ভেতরে ক্ষুধায় কামড়াচ্ছে। এখনো পকেটে কিছু টাকা আছে, বলতে গেলে কপালের ঘামে কষ্টার্জিত কিছু টাকা। হাতটা পকেটে রেখে মুদ্রাগুলো ঝনঝন করে বাজালো, আর কুঠার বহন করে অভাবিত স্বপ্নের সেসব কাজ করার কথা মনে করলো। কঠিন পরিশ্রমে অর্জিত টাকাগুলোর কথা ভেবে সে এক ধরণের গর্ববোধ করলো: কেউ বলতে পারবে না সে জমির উদ্বৃত্ত অংশ খেয়ে জীবন ধারণ করেছে। ঠাকুরমাও তার এ অর্জন ও সামর্থ্যে গর্ববোধ করতে পারে। নিউ এক্সটেনশন ও বাজার রোডের যানবাহনের জংশনে গড়ে ওঠা ছোট পার্কের একটা বেঞ্চিতে সে বসে পড়লো। সেখানটায় বসলো স্পষ্টভাবে ভেবে বের করতে যে কীভাবে সবকিছু সে সামলে নেবে। হাঁটতে হাঁটতে সবকিছু ঠিক করার চেষ্টা করে লাভ নেই। দেশ তো এখন স্বাধীন, আর কেউ এসে জিজ্ঞেস করবে না অন্য কোথাও না বসে সে সেখানে কেন বসেছে। এ ভাবনায় অভ্যস্ত হওয়া কঠিন, এ ছিলো বিলাসী ভাবনা যার উপর অনেক ভাবতে হয়। কিন্তু সে বারবার চমকে উঠলো মনে হলো যখন অভ্যাসবশত ভাবলো যে নিজেকে জনগণের সামনে বেশি তুলে ধরছে, আর ভাবলো যে তাকে দ্রুত কোনো এক গোপন জায়গায় গা ঢাকা দিতে হতে পারে। ঢেঁকি শাকের এক পাত্রের পাশে সিমেন্টের বেঞ্চিতে বসে মনে মনে বললো: ‘আমি তো স্বাধীন। এখন কেউ আমার পিছু পিছু আসতে পারে না। আমার দাঁড়ি কামানো আছে নাকি নেই তা নিয়ে কেউ বিরক্ত করবে না।’ প্রথম প্রথম সে আহত হলো যে পথচারীরা তাকে খেয়াল না করে, আর যানবাহনগুলো একটু থেমে না বলেই চলে যাচ্ছে, ‘এই যে নায়ক!’ কিন্তু এতগুলো বছর সব জায়গায় তাকে তন্ন তন্ন করে খোঁজার পর এখন একা থাকার আশীর্বাদের কথা সে শীঘ্রই উপলব্ধি করলো। আরো উপলব্ধি করলো যে তার প্রথম কাজ হচ্ছে কিছু একটা খাওয়া। পার্কের বেঞ্চিতে বসার পরিবর্তে হোটেলের চেয়ারে বসে বসে সে স্পষ্টভাবে চিন্তা করতে পারবে। সেখান থেকে উঠে গিয়ে চট করে রাস্তায় নেমে পড়লো; বাল্বের আলোয় জ্বলজ্বল করা প্রথম হোটেলটা ছিলো ‘শ্রী কৃষ্ণ ভিলা ’। সেখানে উপস্থিত হলো। বেশিরভাগ টেবিলই খালি ছিলো। তখন ব্যস্ত সময় পার হয়ে গিয়েছিলো। উপরের দিকটায় মর্মর পাথর লাগানো টেবিলটায় সে বসে যা চাইলো তার জন্য কেউ এসে তাকে জিজ্ঞেস করুক সেজন্য অপেক্ষা করলো। বাইরে যাওয়ার পথে ক্যাশ বাক্সে উঁচু আসনে একজন বসেছিলো। ওয়েটার ছেলেগুলো সবাই একটা দল হয়ে নিজেদের মধ্যে গালগল্প করছিলো। ‘এরা তো পাত্তাই দিচ্ছে না, ’ শ্রীরাম মনে মনে বললো। ‘মনে হচ্ছে আমাকে নর্দমার ইঁদুরের মতো দেখাচ্ছে। এরা আমাকে তাড়িয়ে দেবে।’ আশপাশে তাকালো। একজন ওয়েটারকে সে চিনতে পারলো: আগের দিনগুলোতে সে এখানে প্রায়ই আসতো। ‘হে, মনি!’ ডাকলো সে, আর ওয়েটারটি ঘুরে দাঁড়ালো। ‘এখানে আসো,’ আদেশ করলো সে। ওয়েটারটি হাজির হলো। শ্রীরামকে চিনতে পারলো, আর চিৎকার করে বললো, ‘কেন, আপনি! এত বছর কোথায় ছিলেন, স্যার? অনেক দিন হয়ে গেলো আপনাকে দেখি না।’ ‘কাজের জন্য দূরে ছিলাম। খাওয়ার জন্য ভাল কিছু দাও আমাকে।’ ‘ভাল ’ শব্দটাতে ওয়েটারটি দুশ্চিন্তায় মুখ কুঁচকে ফেললো। ‘স্যার, এখন তো খুব ভাল কিছু নেই, চাল ও বিশুদ্ধ খাবার বর্তমানে পেতে কষ্ট হচ্ছে। আমাদের সরকার এখনো এ ব্যাপারে কিছু করছে না। জানেন ভাঁজার তেল পাওয়া কী কঠিন হয়ে দাঁড়িয়েছে? শোনেন, বেশিরভাগই হচ্ছে ভেজাল খাবার।’ দেশের পরিস্থিতি, খাদ্য ঘাটতি, যুদ্ধ পরবর্তী গোলমাল, এবং লোকজনের ভোগ করা বিভিন্ন দুঃখ-কষ্ট সম্পর্কে সে বিশদ বিবরণ শুরু করলো। এর সবটাই প্রকাশ পেলো: সমসাময়িক বিশ্ব সম্পর্কে শ্রীরাম এটাই প্রথম প্রতিবেদন পাচ্ছিলো। কিন্তু এর বেশিটা শোনার মতো ধৈর্য্য তার ছিলো না। ‘কী কী আছে?’ ওয়েটারটি তাকের দিকে তাকালো যার উপর খাবারের ট্রেগুলো প্রদর্শিত করা ছিলো, আর বলতে শুরু করলো, ‘করা সেভ, ভাদাই, আর আলু বন্দ...’ শ্রীরাম সঙ্গে সঙ্গে বললো, ‘এখান থেকে আমি কিন্তু সব দেখতে পাচ্ছি। জানতে চাচ্ছি ভেতরে টাটকা কিছু, চুলার উপর কিছু বা আরো ভাল কিছু আছে নাকি?’ নরম ও হালকা ভাপা পিঠা এবং দশাইয়ের ভাবনাটা ছিলো প্রলুব্ধকর। মনে হলো যেন পূর্ব জনমে সে এগুলোর স্বাদ নিয়েছে। যখন কথা বললো তখন একটা ভাবনায় সে জর্জরিত হলো যে সে হয়তো সাধারণ লোকের সাথে কথা চালিয়ে যেতে প্রয়োজনীয় কথা হারিয়ে ফেলেছে। হয়তো জেলের সহচরদের সাথে কথা বলার সামর্থ্যই ছিলো তার। বললো, ‘খুব ভা... কিছু দাও’ সে ‘ভাল ’ শব্দটি এড়ালো পাছে ওয়েটারটি এতে আবার বিশ্ব পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করতে শুরু করে। সে বললো, ‘ভারী কিছু , সদ্য তৈরি এমন কিছু চাই আমার, খুব ক্ষুধা লেগেছে।’ ‘ভেতরে কিছু নেই, স্যার। এখন তো বন্ধের সময়, আর রান্নাঘরই সবকিছুর আগে বন্ধ হয়। আমাদের মালিক যখন চান আমরা দশটা পর্যন্ত কাজ করি, তখন যারা আগুনের পাশে বসে তারাÑÑÑÑ’ শ্রীরাম ধৈর্য্য হারিয়ে ফেললো। দোকানের কথা শুনে বাকি সন্ধ্যাটা কাটাতে চাইলো না সে। সঙ্গে সঙ্গে বললো, ‘ঠিক আছে, ঠিক আছে, খাওয়া যায় এমন কিছু একটা নিয়ে আসো, দৌড় দাও আমার জন্য কফি, ভাল কফি নিয়ে আসো,’ আর এতে তার দুঃখবোধ হলো যে শব্দটা বলে আবার সে ডাঁহা ভুল করেছে, কারণ ওয়েটার ছেলেটি ভাল কফি বানানোর ঝামেলা সম্পর্কে কিছু একটা বলতে লাগলো: দুধ সরবরাহের সমস্যা, চিনি কেলেঙ্কারী এবং বিভিন্ন ধরনের কালো বাজারীদের অর্থলোভ। শ্রীরাম বুঝলো না কী করতে হবে। ধৈর্য্য পুরোপুরি হারিয়ে ফেললো, ‘ওসব আমাকে বলছো কেন?’ ‘কারণ ঘটনা তাই।’ ‘ঠিক আছে,’ অনুভূতিহীন হয়ে বললো সে, ‘আমার ক্ষুধা লেগেছে। আমাকে কিছু দিতে চাইলে তাড়াতাড়ি করো। এখানে দাঁড়িয়ে বকবক করলে আমি উঠে চলে যাবো।’ ‘আপনাকে কী দেবো, স্যার?’ ওয়েটারটি অফিশিয়ালি জিজ্ঞেস করলো এই প্রথম বারের মতো, আর এতে একটা ধারণার সৃষ্টি করলো যে সে দায়িত্বরত আছে। ‘দুটা মিষ্টি, একটা মশলা খাবার আর প্রচুর গরম কফি,’ শ্রীরাম আদেশ দিলো। অনেক মাসের মধ্যে এই প্রথম সে কাউকে আদেশ করতে পারলো। নিজের কণ্ঠস্বরে অবাক হলো প্রায় এই ভয়ে যে কেউ এসে তাকে বলবে তোমাকে নির্জনে আটকে রাখা হবে। কিন্তু এতে কাজ হলো। ওয়েটারটি আগ্রহ ও ক্ষিপ্রতার সাথে ছুটে গেলো। টিফিন এবং পান সুপাড়ি খাওয়ার পর সে অত্যন্ত আনন্দ বোধ করলো। তার মনে হলো সে যেন সেই সময়ে ফিরে গেছে যে সময়ে কোনো যুদ্ধ ছিলো না, কোনো ধরনের রাজনৈতিক সংগ্রাম ছিলো না। সে তো নিজেই জৌলুসপূর্ণ এমন এক বৃদ্ধা ভদ্রমহিলার নাতি যার জীবনে কোনো উদ্বেগ ছিলো না, যে পড়াশুনার স্বাধীন কক্ষে, বাজারে এবং ক্যানির দোকানের মধ্যে যাতায়াত করতো নির্ধারিত কাজকর্মের জন্য, কোনো উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা ছিলো না, সবকিছুই সহজে বলা যেতো ও পূর্বেই আঁচ করা যেতো। কবীর সরণীর দিকে সে ছুটে চললো। এরকম ঘরে ফেরাটা ছিলো দারুণ ব্যাপার। সাতটা বাজলো, কিন্তু ছেলেমেয়েরা যথারীতি রাস্তায় খেলছিলো, আর প্রত্যেকটা বাড়ির সামনের জায়গাটা ধুয়ে মুছে সাদা ময়দায় সজ্জিত করা হয়েছিলো। এসব মানুষের মতো কোনো প্রকার উদ্বেগ কিংবা বাড়তি দুঃসাহসী কর্মকাণ্ড ব্যতিরেকে সে কেন জীবন-যাপন করতে পারেনি; মনে হয় কোনো ধরণের পরিবর্তন ছাড়াই স্থির জীবনের একটা নির্জন মোহ আছে। বেশিরভাগ বাড়িতেই আলো জ্বলছিলো। চোখদুটো বিস্ফারিত করে সে রাস্তায় চললো। নিজের বাড়ির সামনে এসে থামলো। দরজার প্রবেশপথ দিয়ে তাকালো। কিছু আগন্তুক চলাফেরা করছে। সে রাগান্বিত ও প্রতারিত বোধ করলো। তার জায়গা দখল করার কী অধিকার আছে তাদের? বাতি-- সেই পুরানো বাতি যার নিচে ঠাকুরমা তাকে জীবনের এত কিছু শিখিয়েছে সেখানে অচেনা কিছু ছেলেমেয়ে হলের সামনের দিকে পরস্পরকে তাড়া করছে! ছুটে গিয়ে ছেলেমেয়েদের বলতে চাইলো: ‘তোমরা এখানে ছোটাছুটি করতে পারো না, চাইলে আমি তোমাদের ছোটাছুটি থামাতে পারি।’ এরা হয়তো দেয়ালে দেয়ালে গর্ত করছে, দরজা ও শার্সিতে দ্রুম দ্রুম শব্দ করছে, তার থাকার জন্য এখন শুধু ধ্বংসাবশেষ পড়ে আছে। ক্যানির সাথে দেখা করে কথা বলতে সে চলে গেলো। কিন্তু দোকানটা উঠে গেছে: মারিয়া তেরেসার প্রতিকৃতিটা সেখানকার পরিপার্শ্বকে উজ্জ্বল করতে আর নেই। ক্যানির জায়গাটায় জানালাবিহীন সিমেন্টের নতুন এক ভবন উঠেছে, সম্ভবত কোনো গোডাউন হবে। আবার সে ব্যথিত ও প্রতারিত বোধ করলো। রাস্তা দিয়ে হাঁটতেই থাকলো। কোনো প্রতিবেশীই তাকে লক্ষ করলো না। কয়েকজনকে তাদের বাড়িতে জানালার পাশে বসে সান্ধ্যকালীন পত্রিকা পড়তে দেখলো সেÑÑ আয়েসী মানুষ। তাদের কাছে গিয়ে কথা বলতে ইচ্ছে হলো তার, কিন্তু তারা হয়তো নানা ভুল ত্র“টির জন্য তাকে তিরস্কার করবে আর কারো সাথে কথা বলতে পারার ব্যাপারে সে দ্বিধা বোধ করলো! সে এই ভাবনায় আচ্ছন্ন হলো যে এসব মানুষের সাথে যোগাযোগের বাক্য সে হারিয়ে ফেলেছে। রাস্তাটাকে শেষবার সে যেমন দেখেছে এখনো সেটা তেমনি অপরিবর্তিত রয়েছেÑ ক্যানির দোকানটা শুধু উঠে গেছে, আর এমন কেউ নেই যার কাছে সে খোঁজ খবর নিতে পারে। হঠাৎ করে তার মনে হলো যে সে রাতে কোথাও যাওয়ার মতো জায়গা তার নেই। জেলখানায় অন্তত রাত্রিযাপনের জায়গা হিসেবে নিশ্চিত থাকা যেতো। ** ফটোগ্রাফারের প্রতিষ্ঠানটি উজ্জ্বল আলোয় আলোকিত ছিলো, আর এর আলো রাস্তায় ছড়িয়ে পড়েছিলো। এর ছাদটা ছিলো নিচু, সামনে ছিলো যথারীতি কাচ। শিশু, সুন্দরী বালিকা ও গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের নানান ধরনের বিবর্ধিত প্রতিকৃতি এখানে প্রদর্শিত করা ছিলো। সামনের যে পার্লারটায় ছোঁবড়ার কার্পেট ও ছোট একটা টুল যার উপর পাত্রে শোভা বর্ধনকারী চারাগাছ ছিলো, সেই পার্লারে কেউ নেই। কেউ সেখানটায় যে থাকে তার কোনো চিহ্নই নেই। শ্রীরাম পরের কক্ষে ঢুকলো, সেটাও খালি। তার উপস্থিতি বোঝানোর জন্য সে গলা খাঁকারি দিয়ে পা দিয়ে আওয়াজ করলো । ‘কে ওখানে?’ ডাক এলো। এটা ছিলো ফটোগ্রাফারের কণ্ঠ। শ্রীরাম উত্তর দিলো: ‘জেলের ঘুঘু।’ তার আনন্দ হলো যে সবকিছুর পরেও চেনা একজনকে পাওয়া গেলো যার সাথে সে দেখা করতে পারে। দর্শনার্থীর পরিচয় জানার চেষ্টা করতে ফটোগ্রাফার অন্দরমহল থেকে বের হয়ে এলো । সে নিশ্চয়ই আলোর কাছে কাজ করছিলো, আর তাই স্পষ্ট করে কিছু দেখতে পাচ্ছিলো না। যথেষ্ট কাছে এলে সে চিৎকার করে বললো, ‘তুমি! ছাড়া পেলে কখন? কী করুণ ব্যাপার আমি জানতাম না। ভেবে পাচ্ছিলাম না তুমি নিজে কী করেছিলে। কোথায় ছিলে? তারা আমাদেরকে বলেনি তুমি কোথায় ছিলে। যদি জানতাম তুমি আজকে বের হচ্ছো, তাহলে ফুল ও মালা দিয়ে জেল গেটে তোমার জন্য সাদর সম্ভাষণের ব্যবস্থা করতাম। সমস্যাটা হচ্ছে সবকিছু এখনো এলোমেলো হয়ে আছে। কিন্তু আমি কাউকে দোষ দেই না। আমাদের রাষ্ট্র তো এখনো নবজাতকের অবস্থায় আছে, এখনো শিশু, এখনো অনেক কিছু করতে হবে, আমাদেরকে অবশ্যই খুশি হতে হবে যে আমরা আমাদেরই শাসক, আর কোনো বিদেশি জাতি আমাদেরকে শাসন করছে না। আমাদেরকে অবশ্যই খুশি হতে হবে যে সবকিছু করা হচ্ছে এবং অন্যের দোষ ধরে সময় নষ্ট করা যাবে না।’ ‘আমাদের আনন্দ করা উচিৎ যে আমাদের নিজেদের লোকেরাই মস্ত ভুল করছে, তাই না?’ দায়িত্বজ্ঞানহীন চেতনা ফিরে এলে শ্রীরাম জিজ্ঞেস করলো। ‘ওখানে বসে থাকা নেহেরু, প্যাটেল এবং বাকিদের কথা ভাবো তো যেখানে সামনে দাম্ভিক ভাইসরয়রা ছিলেন। চার্চিল মহাত্মাজীকে কি “উলঙ্গ ফকির” বলেনি? “উলঙ্গ ফকির”ই এখন সবকিছু, এটা ভাবো তো...।’ সে উত্তেজিত হলো। ‘ভুল তো অবশ্যই হবে, সব জায়গায় ডাঁহা ভুল থাকবে, কিন্তু আমাদের অবশ্যই বেশি ভুল করা যাবে না।’ সে উম্মত্তভাবে অসঙ্গত ও খুশি হলো। ‘তুমি জেলের বাইরে থাকলে তোমার গলায় ফুলের মালা পরিয়ে স্বাধীনতা দিবসের শোভাযাত্রায় বয়ে নিয়ে যাওয়া হতো। কী করুণ ব্যাপার যে তুমি সেটা পাওনি। সেটা তো জমকালো ব্যাপার ছিলো।’ জগদীশ শ্রীরামকে বড় একটা সোফায় বসিয়ে তার কোলে বড় একটা এ্যালবাম রাখলো এবং পাশে বসে পাতা উণ্টালো। সে মন্তব্য করলো, ‘ফটোগ্রাফার হিসেবে এটা নিয়ে আমি গর্ব করি। ভবিষ্যৎ প্রজন্ম দায়িত্বে অবহেলা করার জন্য আমাকে কখনো দোষ দিতে পারবে না। আমার সাধ্যমত আমি করেছি। এখানে আমাদের সংগ্রাম ও স্বাধীনতা দিবসের সমাপনী উদযাপনের পূর্ণ ইতিহাস আছে।’ সে নিজের বিভিন্ন ছবি এ্যালবামে রেখে নিজেকে ক্ষুদ্র একজন যোদ্ধা হিসেবে উল্লেখ করেছে। শ্রীরাম যেখানে থেকে কাজ করেছিলো সেই ধ্বংসপ্রাপ্ত মন্দিরটর ছবিও ছিলো। ফটোগ্রাফার এর শিরোনাম দিয়েছে: ‘মুক্তিবাহিনীর একটি গোপন সদর দপ্তর।’ শ্রীরাম অ্যালবামটি আগাগোড়া দেখলো যেটি কার্যত স্বাধীনতা আন্দোলনের একটি দলিল ছিলো। জগদীশ জেলখানা ও সেগুলোর বহিরাঙ্গে আলোকচিত্রও সেঁটে দিয়েছে। কাঁটাতারের জটের ছবিও আছে। পুরাপুরি রোমান্টিক ছবি। কোথাও কোনো ঘাটতি ছিলো বলা যায় না। স্বাধীন ভারতের প্রধান স্থপতি ও ব্রিটিশদের তাড়ানোর ক্ষেত্রে প্রধান চালক ছিলো সে। মালগুদির সড়ক দৃশ্যেরও কিছু ছবি অন্তর্ভূক্ত আছে। প্রতিটা দরজার প্রবেশপথ ও দোকান থেকে পতাকা উড়ছিলো, জনতা গান গেয়ে যন্ত্র বাজিয়ে শোভাযাত্রায় যাচ্ছিলো। সব জায়গায় ফুল আর ফুল। জগদীশ মহাগর্বের সাথে দৃশ্যগুলো দেখলো। তার মনে হলো সে মানুষকে ভাল একটা সময় উপহার দিতে চেষ্টা করেছে এবং তাতে সফলও হয়েছে। বললো, ‘যে ঝামেলা পোহাতে হয়েছে এবং যে ঝুঁকি নিতে হয়েছে মোটের উপর তার জন্য আমি কী পাচ্ছি? তারা কি আমাকে কোনো মন্ত্রী বানাবে? কোনো সুযোগ নেই, স্যার, এ সুবিধা পাওয়ার জন্য আরো অনেকে অপেক্ষায় আছে। আমি যদি বা নির্বাচনে দাঁড়াই, আমি কে সেটা কে জানবে? সংসদীয় কমিটি কি তাদের প্রার্থী হিসেবে আমাকে নির্বাচন করবে? কোনো সুযোগ নেই, স্যার, সে কারণে আমার ক্যামেরা ও স্টুডিওতে আমার নানা কর্মকাণ্ড দ্রুত ধরে রেখেছি। কেউ এটা ছিনিয়ে নিতে পারবে না।’ তার কণ্ঠে আফসোসের সুর ছিলো, আর শ্রীরাম তা বুঝতে পারলো না। ‘এখন তুমি যেমনটা বললে, সব মিলিয়ে জাতি হিসেবে আমরা তো নবজাতক।’ শব্দটার মধ্যে বেশ প্রত্যয় উদ্দীপনা আছে, এটি বাসার মতো এবং প্রীতিকর শোনায়, কারো উদ্বিগ্ন হওয়ার দরকার নেই যে এর মানে কী বা কেন এটা উল্লেখ করা হলো। ‘সত্যি কথা, সত্যি কথা,’ ফটোগ্রাফার বললো, ‘আমার কোনো অভিযোগ নেই বা অসন্তোষ নেই। আমি যা করেছি তা চরম সন্তুষ্টির সাথে করেছি। এ ব্যাপারে আমি মোটেও উদ্বিগ্ন নই। আমি যা বলছি তা হলো আমরা যা যা করেছি সেসব রেকর্ড করতে আমি এ ছবিগুলো তুলেছি, এইটুকুই।’ দেখার মতো শয়ে শয়ে ছবি ছিলো। শ্রীরাম দ্রুত পাতা উল্টাতে লাগলো। বিরক্ত বোধ করলো। ছবিগুলো দেখতে একঘেয়ে ছিলো। আরো বেশি শোভাযাত্রা। আরো বেশি মানুষ। পতাকা। জাতীয় নেতা ও অন্যান্যদের শোভাযাত্রায় বয়ে নেওয়া ছবি এবং আরো বেশি মানুষ। পুরো ব্যাপারটায় একটা ঐক্য আছে; সে তো আর সহ্য করতে পারছে না। এ্যালবামের পাতাগুলো দ্রুত উল্টিয়ে সে শেষ পাতায় এলো যেখানে কোনো এক জনসমাবেশে জগদীশকে পতাকা উত্তোলন করতে দেখা গেলো। এ্যালবামটি ফেলে রেখে শ্রীরাম জিজ্ঞেস করলো, ‘তুমি নিজের ছবি কী করে তুললে?’ ‘আহ্ , প্রাসঙ্গিক প্রশ্ন, কেই বা ফটোগ্রাফারের ছবি তুলতে পারে? অনুমান করে বলো তো কীভাবে তোলা হয়েছে। তুমি কি কল্পনা করছো আমার পিঠে ক্যামেরা লাগিয়ে নিজেকে অনুসরণ করেছি আর ছবি তুলেছি?’ ‘হয়তো, হয়তো,’পুরো ব্যাপারটায় আগ্রহ হারিয়ে শ্রীরাম বললো। আর কোনো ছবি দেখতে বা সে সম্পর্কে কিছু শুনতে চাইলো না সে । স্বাধীনতা দিবস উদযাপনের দৃশ্য তাকে বিরক্ত করে তুললো। সে প্রায় বলেই ফেললো, ‘যদি শুধু জানতাম যে মানুষ সবকিছুকে এতটুকুতে সীমাবদ্ধ করে ফেলবে, তাহলে ঘুরে ঘুরে দেয়ালে “ছাড়ো” খোদাই করতাম না এবং এক ফটোগ্রাফারকে শুধু তার এ্যালবামের রসদ যোগাতে ট্রেন লাইনচ্যূত করতাম না।’ সে ঠিক করলো যে সে আর ছবি দেখবে না। ফটোগ্রাফার বললো, ‘আমার আরো তিনটা এ্যালবাম আছে। সেগুলোতে আমাদের সংগ্রামের আরেক পর্যায় আছে।’ তাক থেকে সেগুলো নেমে আনার চেষ্টা করলো সে। শ্রীরাম তার হাত ধরে বললো, ‘না, এখন না। আমার মাথাটা ব্যথা করছে। আর কোনো ছবি দেখবো না।’ আরো ভীড়, আরো পতাকা, আরো সমাবেশ দেখতে হবে সে সম্ভাবনায় সে সন্ত্রস্ত হয়ে উঠলো। ফটোগ্রাফার বললো: ‘ভাল ছবি মাথা ব্যথার অমোঘ প্রতিকার। এই তো সম্প্রতি আমেরিকার এক বিজ্ঞানী এ তথ্য খুঁজে বের করেছে।’ শ্রীরাম প্রতিরক্ষা হিসেবে বললো, ‘কাল আবার ওগুলো ভাল করে দেখবো।’ ‘ঠিক আছে। আমার সবচেয়ে বড় আফসোস কী তুমি জানো?’ উত্তর আঁচ করার জন্য তাকে একটু সময় দিয়ে আবার বললো, ‘আমার কোনো সিনেমার ক্যামেরা নেই। শুধু একটা যদি থাকতো, তবে তুমি যে যে দৃশ্য দেখতে পাওনি সেগুলো তোমাকে আমি দেখাতাম এমনভাবে যেন নিজের চোখের সামনে তুমি দেখছো। এটাই হচ্ছে মূল বিষয়। অন্য ফটোগ্রাফারের মতো দাম নিলে সবচেয়ে বড় ক্যামেরাটা আমার থাকতো। কিন্তু, ওহ, আমরা কেউ কেউ ঝামেলাপূর্ণ বিবেকের তাড়নায় তাড়িত!’ শ্রীরাম লোকটির সাথে হতাশ বোধ করলো: আন্ডারগ্রাউন্ড কর্মী হিসেবে তাকে এত কর্তৃত্বপরায়ণ মনে হয়েছিলো: এত যথাযথ, পরিস্কার বুদ্ধিসম্পন্ন ও উদ্দেশ্যপূর্ণ মনে হয়েছিলো। কিন্তু এখন তাকে মনে হলো অগোছালো ও বিভ্রান্তিকর এবং অস্পষ্ট চিন্তার মানুষ হিসেবে। তার প্রকৃতির সাথে শান্তিপূর্ণ পরিবেশ খাপ খায় না। শ্রীরাম কিছুক্ষণ ভেবে পেলো না কেন তার আদেশ তখন পালন করেছিলো সে । হতাশ হলো যে তার নিজের জেল জীবনে লোকটি এত কম আগ্রহ দেখালো। জিজ্ঞেস করলো, ‘পুলিশ কি তোমাকে পেয়েছিলো?’ ‘আমাকে! ওহ্, না! তারা কীভাবে পাবে? তারা তো আমার খোঁজ-খবর জানতো না। তাদেরকে পুরোপুরি এড়িয়ে চলা আমার পক্ষে সম্ভব ছিলো। তুমি চলে যাওয়ার পর আমি ঐ মন্দিরে থাকতাম; প্রথম ছবিতে তা দেখোনি? খেয়াল করোনি কীভাবে আমি সেটা চিহ্নিত করেছি?’ সে আবার এ্যালবামটা আনতে চেষ্টা করলো। শ্রীরাম তাড়াতাড়ি করে বললো, ‘হ্যাঁ, হ্যাঁ, একদম ঠিক বলেছো। খুব যোগ্য হয়েছে,’ যদিও সে স্পষ্ট করে মনে করতে পারলো না সেটা কোন ছবি ছিলো। ‘তাছাড়া,’ ফটোগ্রাফার শেষ মন্তব্য করলো, ‘আমাকে পাওয়ার মতো পুলিশ কোনো উপলক্ষ খুঁজে পায়নি। আমার ঠাকুরমা তো অসময়ে মরতে বসেনি। তোমার ঠাকুরমার ক্ষেত্রে সেটা না ঘটলে তুমিও কখনো জেলে যেতে না।’ জবাবে শ্রীরাম কিছু বললো না। এমন একটা বিষয় ছিলো যা নিয়ে সে ভাবতে চাইলো না। তার আশা ছিলো দুজনার সাধারণ কোনো বিষয়ে তারা কথা বলতে পারে, ছবি থেকে কোনো আনন্দ পেতে পারে। সে সোজাসুজি জিজ্ঞেস করলো, ‘ভারতী কোথায়? জেল থেকে বেরিয়েছে নাকি?’ ‘ওহ্ , হ্যাঁ, আমি ভেবে পাচ্ছিলাম না তার ব্যাপারে তুমি আমাকে কিছু জিজ্ঞেস করছো না কেন। ভেবেছিলাম তুমি হয়তো তাকে ভুলে গেছো!’ ‘না, কখনো না! এক মুহূর্তের জন্যও না!’ চরম আবেগে শ্রীরাম চিৎকার করে বললো। ‘তাকে দেখেছো নাকি?’ ‘অবশ্যই,’ ফটোগ্রাফার এমন সুরে বললো যার ফলে শ্রীরাম উদ্বিগ্ন ও ঈর্ষান্বিত হলো। সে যখন মানুষ হত্যাকারীদের সাথে মেলামেশা করছিলো, তখন ভারতী মনে হয় জেল থেকে বের হয়ে এসে এই ফটোগ্রাফার ও তার বন্ধুদের দ্বারা ফুলের মালা দিয়ে সাদরে গৃহীত হয়েছে, আর সম্ভবত তারা সবাই বেশ মজা করেছে। ভারতী অবশ্যই ভেবে থাকবে শ্রীরাম কেন সেখানে নেই! তার আশা ছিলো যে অন্যরা অন্তত তাকে মনে করিয়ে দেবে যে শ্রীরাম জেলে আছে। ‘তাকে কী জেলখানার গেটেই বরণ করে নিয়েছিলে?’ হঠাৎ করে সে জিজ্ঞেস করলো। ‘তা-ই করা উচিৎ ছিলো, কিন্তু তার দেখা করা অসম্ভব ছিলো। যে ব্যাচগুলো আগে ছাড়া পাওয়ার কথা ছিলো সে ছিলো সেরকম একটি ব্যাচে। আর সেই সন্ধ্যায় সঙ্গে সঙ্গে সে নোয়াখালীর ট্রেন ধরেছিলো।’ ‘নোয়াখালী; ওখানে সে কী করবে? জায়গাটা কোথায়?’ তার ভূগোল জ্ঞান খারাপ ছিলো। ভৌগোলিক প্রশ্নটি উপেক্ষা করে ফটোগ্রাফার বললো, ‘পূর্ব বঙ্গে কী হচ্ছে সে ব্যাপারে কী তুমি কিছু জানো না? হিন্দু বনাম মুসলিম। তারা পরস্পরকে হত্যা করছে। কোনোকিছুই জানো না?’ ‘না। কীভাবে জানবো?’ শ্রীরাম বললো। ‘আমাকে তো পৌরসভার পড়ার কক্ষে কিংবা গণ গ্রন্থাগারে রাখা হয়নি। তুমি যা বলছো সে ব্যাপারে কিংবা কোনো কিছুর ব্যাপারেই আমি কিছু জানি না।’ ‘সাম্প্রদায়িক দাঙ্গায় গ্রামকে গ্রাম পুড়ে ফেলা হয়েছে। হাজার হাজার লোক মরেছে, স্বজনহারা হয়েছে, সর্বস্ব খুঁইয়েছে, বিকারগ্রস্ত হয়েছে, আহত হয়েছে।’ ‘কে কী করছে, কেন করছে?’ ‘ওসব জিজ্ঞেস করো না। আমার মধ্যে সাম্প্রদায়িক চিন্তা-চেতনা নেই, আর এব্যাপারে কথা বলতেও আমি পছন্দ করি না। একজন অন্য আরেকজনকে মারছে। এইটুকুই আমি জানি। জীবন স্থবির হয়ে আছে আর মহাত্মাজী সেখানে শান্তির লক্ষে গেছেন। গ্রামে গ্রামে হাঁটছেন, লোকজনকে ছোটাছুটি করতে নিষেধ করছেন, সাহসী হতে বলছেন, এটা সেটা করতে বলছেন। সিংহ ও ভেড়াকে তিনি আসলে একই থালায় খেতে বলছেন। আর ভারতী মনে হয় ডাক পেয়েছে।’ শীতল ভয় শ্রীরামকে পেয়ে বসলো। এত ঘটনার নতুন মোড় যার জন্য সে আদৌ কোনো আশা করেনি। নোয়াখালী, কলিকাতা, বাংলা, এসবের অর্থ কী? তার কাছ থেকে দূরে সরে যাওয়ার মানে কী? ভারতী কি ইচ্ছা করেই এটা করেছে? শ্রীরাম জেল থেকে বের হওয়ার আগে ভারতী কি তার পালিয়ে যাওয়ার ক্ষতি পুষিয়ে নিলো? ‘চলে গিয়ে সে কী বোঝাতে চাইলো?’ এ প্রশ্নে ফটোগ্রাফার শুধু হাসলো। ‘সে কি জেলে এসে আমার সাথে দেখা করতে পারতো না? আমি যে জেলে আছি সেটা তো সে নিশ্চয়ই জেনে থাকবে?’ ‘কীভাবে?’ ফটোগ্রাফার জিজ্ঞেস করলো। ‘খোঁজ-খবর নিয়ে, ব্যস, এটা তো সোজা,’ অনুভূতির সাথে শ্রীরাম বললো। সে বললো, ‘হয়তো আমাকে নিয়ে তার কোনো ভাবনা নেই। হয়তো সে আমাকে একদম ভুলে গেছে!’ তার মন খারাপ দেখে জগদীশ ভাবগম্ভীর হলো। ‘ওসব নিয়ে এত মাথা ঘামিয়ো না। তুমি কি তার কথা প্রায়ই ভাবো?’ জবাবে শ্রীরাম কিছু একটা বলতে লাগলো, কিন্তু কথা খুঁজে পেলো না। কথা জড়িয়ে যাওয়ায় আর কিছু বললো না এবং ফুপিয়ে ফুপিয়ে কাঁদতে লাগলো। ফটোগ্রাফার তার পিঠে হাত বুলিয়ে দিয়ে বললো, ‘কী হয়েছে তোমার যে এখন এ ব্যাপারে এত খারাপ লাগছে?’ জবাবে শ্রীরামের বেশি কিছু বলার ছিলো না। সে শুধু ফুপিয়ে ফুপিয়ে কাঁদতে থাকলো। ফটোগ্রাফার বললো, ‘তুমি বোকা! তার সংস্পর্শে থাকার মতো তুমি কী করেছো?’ ‘তুমি কী বলতে চাচ্ছো? শৃঙ্খলিত ও বন্দী থাকা অবস্থায় আমি কী করতে পারতাম?’ ‘এখন, আমি বলতে চাচ্ছি। এ ব্যাপারে তুমি কী করতে যাচ্ছো এখন? তুমি তো এখন শৃঙ্খলিত বা বন্দী নও। এ ব্যাপারে কী করতে যাচ্ছো?’ ‘আমার কাছ থেকে সে এত দূরে, হাজার হাজার মাইল দূরে,’ শ্রীরাম বিলাপ করলো। নোয়াখালীর ভাবনাটা তাকে খুবই জ্বালালো। ‘কিন্তু ডাক বিভাগ বলে তো একটি জিনিস আছে। তোমার চিঠি বহন করতে বিশেষ কোনো দূত নিয়োগ করতে হবে না। তাকে লিখছো না কেন?’ ‘তুমি কি চিঠিটাতে ঠিকমতো ঠিকানা লিখে পাঠিয়ে দেবে?’ ‘কথা দিচ্ছি দেবো। আমাকে ওটা দাও। আমি পাঠিয়ে দেবো।’ এতে শ্রীরামের মধ্যে আশার আলো জেগে উঠলো। হঠাৎ করে সে জিজ্ঞেস করলো, ‘তার কাছে কী লিখবো?’ ‘হুম, সেটা তো আমি তোমাকে বলতে পারবো না। এসব বিষয়ে প্রত্যেকটা মানুষের নিজস্ব স্টাইল থাকে।’ এটা স্পষ্ট যে তার মন পুরো কুয়াশাচ্ছন্ন ছিলো। স্বচ্ছভাবে চিন্তা করা বা পরিকল্পনা করা তার সাধ্যের বাইরে ছিলো। জেল জীবনের ক্ষতি এখন মাত্র প্রকাশ পেলো। ফটোগ্রাফারের দয়া হলো তার প্রতি। বললো, ‘একটু বিশ্রাম নাও। চোখ বন্ধ করে বিশ্রাম নাও।’ ছোট একটা টেবিলে গিয়ে একটা কলম ও একটা কাগজ নিয়ে লিখতে শুরু করলো সে। বাইরের রাস্তায় তখন যানবাহন চলাচল থেমে গিয়েছিলো। ‘ তোমার দোকান বন্ধ করতে চাও না?’ শ্রীরাম জিজ্ঞেস করলো। ‘ও নিয়ে তুমি মাথা ঘামিয়ো না। নিজের দেখাশুনা আমি নিজেই করতে পারি। এ ধরনের লেখা লিখতে আমি খুব একটা পারঙ্গম নই। যাই হোক, চেষ্টা করছি। যদি পারো এর মধ্যে চোখ বন্ধ করে চিন্তা করা বাদ দাও।’ সে বসে বসে বিশ্বস্ততার সাথে দীর্ঘ একটা চিঠি লিখলো যার শুরু এভাবে: ‘প্রিয়তমা, Ñ এভাবে কে পালিয়ে বেড়ায়! আমিও তো জেলে থাকতে পারি। কিন্তু জেলে থাকি আর বাইরে থাকিÑÑ আমার মনে সব সময় একটাই ভাবনা, সেটা হচ্ছো তুমি। দিন রাত তোমাকে নিয়ে ভাবি, আর জেলের কোনো নিয়ম-নীতিই তোমার ভাবনা থেকে আমাকে বিরত রাখতে পারেনি। আর আজ আমি জেলের বাইরে এলাম এবং আমার ভাল বন্ধু জগদীশ (চমৎকার মানুষ, বলতে হবে) তোমার ব্যাপারে আমাকে বললো। জেলখানার বার আমাকে তোমার কাছ থেকে এতদিন দূরে রেখেছে, আর এখন এখানকার এবং সেখানকার মধ্যে মাইলের পর মাইল দূরত্ব, কিন্তু কোনো ফল নেই। এ দূরত্ব আমার কাছে কোনো দূরত্বই নয়। আমি কি এসে তোমার সাথে যোগ দিতে পারি, কারণ আটকে পড়া মাছের মতো হাঁপাতে হাঁপাতে আমি মারা যাবো যদি তোমাকে না দেখি, তোমার সাথে কথা না বলি? যত তাড়াতাড়ি সম্ভব আমাকে উত্তর দেবে।’ চিঠিটা লিখতে গিয়ে জগদীশ এমনভাবে হারিয়ে গেলো যে সে ভুলেই গেলো এতে কত সময় লাগছিলো, আর শ্রীরাম তার আসনে ঝিমোতে লাগলো এবং মৃদু নাক ডাকতে লাগলো। তার দিকে তাকিয়ে জগদীশ কিছুক্ষণ দ্বিধা বোধ করলো। পেপার ওয়েটের নিচে চিঠিটা রেখে সে কাভারিং নোট লিখলো: ‘অনুমতি মিললে এ চিঠিটা স্বাক্ষর করে সকালে প্রথমে পাঠাতে হবে, যদিও এটা তোমার হাতে কপি করা উচিৎ হবে।’ উঠে গিয়ে দোকানের সামনের দরজাটা সে বন্ধ করলো। বাতি নিভিয়ে থাকার ঘরে গেলো এবং আস্তে করে পিছনের দরজাটা বন্ধ করে দিলো। দশদিন উদ্বেগের সাথে ও মরিয়া হয়ে অপেক্ষা করার পর শ্রীরাম একটা চিঠি পেলো: ‘তোমার খবর শুনে খুশি হলাম। দিল্লীতে চলে আসো। যদি পারো নয়াদিল্লীর বিরলা হাউসে আসো। আমাদের কর্মসূচী এখনো ঠিক হয়নি। বাপুর সাথে আমরা বিহারে যাচ্ছি যেখানে সমস্যা দেখা দিয়েছে। তোমাকে অনেক কথা বলার আছে। ১৪ জানুয়ারী আমরা দিল্লীতে থাকবো। তারপর যখন খুশি এসো। তোমার সাথে দেখা হলে আমরা খুশি হবো। ভারতী ’ ** গ্রান্ড ট্রাঙ্ক এক্সপ্রেসটি শেষে নিউদিল্লী স্টেশনে এসে পৌঁছালো। ভারতীকে প্রথম নজরে দেখার জন্য শ্রীরাম জানালায় পৌঁছাতে সংগ্রাম করলো। জানালার ধারের লোকজন তাকে এর কাছে আসতে দিলো না। তাদের সাথে কথা বলেও কোনো লাভ হলো না: তারা ভিন্ন এক জগতে বাস করে বলে মনে হলো। সে তামিল ও ইংরেজিতে বললো, আর তারা হিন্দি, হিন্দুস্তানি, উর্দু বা এরকম যা কিছুই হোক না কেন তা বুঝতো। ভারতী যে হিন্দি শেখার জন্য তাকে এত পীড়াপীড়ি করেছিলো সেটার তাৎপর্য্য এখন সে উপলব্ধি করতে পারলো। ভারতীকে সন্তুষ্ট করতে সে হিন্দির প্রাথমিক কিছু বই পড়েছিলো, কিন্তু এতে সে কিছুই শেখেনি। গত ছত্রিশ ঘন্টা ধরে সে বিচ্ছিন্ন আছে। বসে বসে গভীরভাবে ভাবছে, নিজের সঙ্গ বজায় রাখার শিক্ষা সে জেল জীবন থেকে শিখেছে। তার সবচেয়ে বড় বিচার হলো যখন ট্রেন চলন্ত থাকা অবস্থায় দুজন লোক হঠাৎ করে কোথা থেকে যেন হাজির হয়ে কম্পার্টমেন্টের সব লোককে খুঁটে খুঁটে দেখলো; যখন তারা তার কাছে এলো, তখন তারা তার সামনে থেমে একটা প্রশ্ন জিজ্ঞেস করলো। অনেক কিছুর মধ্যে সে শুধু ‘সাহেব’ এবং ‘হিন্দী’ শব্দদুটো বুঝতে পারলো। তারা দেখতে ছিলো উচ্ছৃঙ্খল। ভাঙ্গা ভাঙ্গা হিন্দী, তামিল এবং ইংরেজিতে সে কিছু বললো যা তাদের মধ্যে কোনো ধারণার সৃষ্টি করলো বলে মনে হলো না। ভয়-ভীতি দেখানোর ভাব নিয়ে তারা তার কাছে এসে মুখের দিকে তাকালো; শ্রীরাম আত্মরক্ষার্থে লড়াই করার জন্য প্রস্তুত হচ্ছিলো। সে লাফিয়ে উঠলো এবং তাৎক্ষণিকভাবে যে ভাষাটা মুখে এলো সে ভাষায় জিজ্ঞেস করলো, ‘আপনারা কী বোঝাতে চাচ্ছেন, সবাই আমার দিকে এভাবে তাকিয়ে আছেন কেন?’ সে উঠলে পরে দুজনার একজন তাকে ভাল করে দেখার জন্য কানের লতি ধরে টান দিলো, শৈশবে লতিতে হওয়া ছোট গর্তটা দেখলো এবং ছেড়ে দিয়ে বিড়বিড় করে বললো, ‘হিন্দু’। আগ্রহ হারিয়ে তারা চলে গেলো। তারা চলে যাওয়ার পর কম্পার্টমেন্টে বিরাট একটা উৎকণ্ঠা দূর হয়ে গেলো। কেউ একজন ব্যাখ্যা করতে লাগলো বিভিন্ন ভাষায় এবং অনেক চেষ্টার পর শ্রীরাম বুঝলো যে অনুপ্রবেশকারীরা কম্পার্টেমেন্টে মুসলমানদের খোঁজ করছিলো: কোনো মুসলমান পাওয়া গেলে তাদেরকে চলন্ত ট্রেন থেকে ফেলে দেওয়া হতো: দেশের অন্যান্য অঞ্চলে লড়াইয়ের প্রতিধ্বনি হচ্ছিলো। যাত্রার বাকি সময়টা শ্রীরাম নীরব হয়ে রইলো। যাত্রাটা ছিলো খুবই অস্বস্তিদায়ক: সে ভেঙ্গে পড়লো, একটু নড়াচড়া করার কিংবা হাত দোলানার কোনো জায়গা পেলো না: লোকজন ভীড় করে এসে তার উপর বসে পড়লো। মাঝে মাঝে তো সে পা দুটো ছড়াতে পারলো না। ঘুম ঘুম বোধ হলে মাথাটা সে পিছনে জানালায় অথবা সম্পূর্ণ এক আগন্তুকের কাঁধে এলিয়ে দিলো । ক্ষুধা বোধ করলে বাইরের একজন চা বিক্রেতাকে ডাক দিয়ে চা খেলো। কফি পেলো না। এখানকার লোকজনকে আজব মনে হলো যারা খুব মিষ্টি জিলাপি দিনের প্রথম জিনিস-- তিতা চা দিয়ে হাপুস হুপুস গিলে খেলো: এতে সে নিশ্চিত হলো যে সে অদ্ভূত, আজব এক জগতে আছে। সত্যিকারের দক্ষিণ ভারতীয়ের মতো সে তার প্রিয় কফি খেতে ব্যাকুল হয়ে উঠলো, কিন্তু এখানে কফি পাওয়া গেলো না। এর স্বপ্ন দেখেই তাকে ক্ষান্ত হতে হলো যেমনটা তাকে জেলে থাকতে হতো। বস্তুত এটা জেল জীবনেরই বর্ধিত রূপ: অনেক আগন্তুকের সাথে গাদাগাদি করা, উপচে পড়া ভীড়ের কম্পার্টমেন্টের এই জীবন। জেলে তার যেমন লেগেছিলো তার চেয়ে এখানে বেশি অস্বস্তি বোধ হলো। সেখানে তো সে অন্তত কিছু বলতে পারতো কিংবা অন্যের মুখ থেকে কিছু শুনতে পারতো, কিন্তু এখানে মানুষের কণ্ঠে দূর্বোধ্য বকবকানি ছাড়া কিছুই নেই। কম্পার্টমেন্টে সেইসব লোকে ভরে গিয়েছিলো যারা বিড়ির ধোঁয়ায় এটি ভরে তুলেছিলো, আর ভাবনা চিন্তা ছাড়াই মোতাগুলো মেঝেতে ফেলে দিয়েছিলো। টয়লেটে তো প্রায় কখনো যাওয়া যেতো না। ট্রেন কিছুক্ষণের জন্য থামলে লাফ দিয়ে নেমে সে এ কাজ সামলে নিতো এবং ট্রেন হুইসেল দিলে আবার দৌড়ে উঠে যেতো। কোনো একদিন ট্রেনটি সাড়ে দশটা বা এগারোটায় নয়াদিল্লীতে এসে পৌঁছালো। ‘নব দিহিলি ’ বলে কম্পার্টমেন্টের লোকজন চিৎকার করে ছোটাছুটি করতে লাগলো। ভারতীকে এক নজর দেখার জন্য সে জানালা কিংবা দরজার দিকে দৌড়াতে চেষ্টা করলো। ভারতী স্টেশনে তার সাথে দেখা করবে বলে কথা দিয়ে লিখেছিলো। শ্রীরাম তার চেহারা নিয়ে লজ্জা বোধ করলো: আঙ্গুল দিয়ে চুলগুলো আঁচড়িয়ে পিছনে নিয়ে গেলো: চুলগুলো উস্কোখুস্কো ও খাড়া হয়েছিলো। সে জানতো যে সে বিশ্রী, বীভৎস ও কদাকার। তার ইচ্ছে হলো এত বছর পর ভারতী তার দিকে চোখ রাখার আগে সে যদি নিজেকে পরিচ্ছন্ন রাখতে পারতো। জানালায় গাদাগাদি করা কিছু মাথা ও কাঁধের মধ্য দিয়ে ভারতীকে সে এক নজর দেখলো, আর উৎকণ্ঠার মধ্যে লোকজনকে রূঢ়ভাবে ঠেলাঠেলি করলো। ট্রেনটি তখন থামার আগে কিছুটা চললো। ভারতীকে দাঁড়িয়ে থেকে উৎসুকভাবে জানালার দিকে এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকতে দেখলো। এক সেকেন্ডের জন্য সে তার অবয়ব দেখতে পেলো, আর এতে তার মন দমে গেলো। তার ইচ্ছা হলো ভারতীর মুখোমুখি হওয়ার দেখার আগে সে যদি তার চেহারার উন্নতি সাধন করতে পারতো। তার ইচ্ছা হলো সে যদি ভীড়ের মধ্যে গা ঢাকা দিয়ে ভারতীকে পরে দেখতে পেতো। বর্তমান এই অবস্থায় দেখলে ভারতী তার সম্পর্কে কী ভাববে সে ব্যাপারে তার অনেক সন্দেহ হলো। কিন্তু এই মরিয়া অবস্থায়ও ট্রেনের অভিজ্ঞতা থেকে সে জানতো যে সে আর কখনো পথ বের করে তার খোঁজে যেতে পারবে না। ভারতী হয়তো চিরদিনের জন্য তার কাছ থেকে হারিয়ে যেতে পারে। ট্রেন থেকে যখন সে বিছানা ও ট্রাঙ্ক নিয়ে নামলো, ভারতীর অনুসন্ধানী চোখ তখন ভীড়ের মধ্যে তাকে ঠিকই খুঁজে পেলো। ভারতী তার হাত নাড়িয়ে তার কাছে ছুটে এলো। শ্রীরামের হাত দুটো মুঠোয় ধরে বললো, ‘ওহ্, আবার তোমাকে দেখতে পেয়ে কত ভাল লাগছে!’ আর স্বতঃস্ফূর্ত সোহাগের এই সুরে শ্রীরাম নিজেকে হারিয়ে ফেললো, নিজের চেহারা ও কুশ্রীতা ভুলে গিয়ে আত্মবিশ্বাস অর্জন করলো। তার উপরে নিচে তাকিয়ে চিৎকার করে বললো, ‘তোমাকে তো উত্তর ভারতীয়ের মতো দেখাচ্ছে। পাঞ্জাবীদের মতো দেখাচ্ছে। আশা করি তুমি আমাদের ভাষা বোঝো।’ ভারতী তৎক্ষণাৎ তার দায়িত্ব নিলো। শ্রীরামের বিছানা তুলে নিয়ে বললো, ‘তুমি ট্রাঙ্কটা নাও।’ শ্রীরাম তার হাত থেকে বিছানাপত্র ছিনিয়ে নিয়ে ভারটা নিজের কাঁধে রাখলো। ভারতী বললো, ‘অবুঝ হয়ো না। মনে রেখো তোমার কিন্তু চারটা হাত নেই।’ আর ভারতী তার হাত থেকে বিছানাপত্র আবার ছিনিয়ে নিলো। শ্রীরামের বিভ্রান্তি দূর হলো। ভারতীর সান্নিধ্যে সে বাড়ীর মতো বোধ করলো। মনে হয় যেন তার সাথে মালগুদিতে সে ফিরে এসেছে। অদ্ভূত পরিপার্শ্ব, অদ্ভূত পথ ঘাট, বিল্ডিং, অতিমাত্রায় চওড়া রাস্তা, বিদেশী পুরুষ ও নারী এবং তাদের ফেলে আসা অদ্ভূত দোকানগুলোর দিকে সে লক্ষ করলো না। কোনো কিছুর দিকে খেয়ার করার সময় তার নেই। তার পূর্ণ মনোযোগ ভারতীকে কেন্দ্র করে। ভারতীকে বেশ খানিকটা কৃষ্ণকায় ও ক্লান্ত দেখালো, কিন্তু তার কেশগুচ্ছ আগের মতোই কালো ছিলো। এমন ক্লান্ত দেখালো যেন সে না খেয়ে খেয়ে অপুষ্টিতে ভুগছে। তাকে আবার দেখতে পেয়ে সে বেশ অবাক হলো। সে যা দেখলো ও অনুভব করলো তা সে কখনো বিশ্বাস করতে পারছিলো না। হয়তো সে আজব কোনো স্বপ্ন দেখছে। হয়তো সে মরে গেছে। অথবা বন্দী অবস্থায় স্বপ্ন দেখছে। এতগুলো বছর মাসের মধ্যে এই প্রথমবারের মতো তার মনটা মুক্ত ও খুশী হলো, যে মনে কোনো দ্বন্দ কিংবা কোনো দুঃখ নেই। ভবিষ্যতের কোনো লালসা নেই বা অতীতের কোনো অনুশোচনা নেই। তার জীবনে এই প্রথম সে পুরোপুরি শান্তিতে থাকলো, অস্তিত্বের সাথে গভীরভাবে সন্তুষ্ট হলো। এখন যে কেউ নিঃশ্বাস নিচ্ছে, অনুভব করছে এবং দেখছে তা সন্তুষ্টির জন্য যথেষ্ট বলে মনে হলো। ভারতী তার দিকে তাকিয়ে থেকে জিজ্ঞেস করলো, ‘তুমি কবে ছাড়া পেলে?’ শ্রীরাম তার জেল জীবনের সারাংশ এবং ভারতীকে শেষ বারের মতো দেখার পর কী কী ঘটেছিলো তার সংক্ষিপ্ত বিবরণী তুলে ধরলো। ঘোড়ার গাড়িটা সুন্দরভাবে চললো। যে চরম সহানুভূতির সাথে ভারতী শ্রীরামের গল্প শুনলো তাতে শ্রীরাম অনেক সন্তুষ্ট হলো। এতে গুরুত্বের ছোঁয়া লাগলো। কথা বলার সময় শ্রীরাম নিজের কর্মে মুগ্ধ হলো। মনে মনে জিজ্ঞেস করছিলো: ‘এসব কিছু কি আমিই না অন্য কেউ করেছে?’ চরম বীরত্ববোধে সে ভরে গেলো। ‘কখনো ভাবিনি যে এ সব ঝামেলা আমি পোহাতে পারবো। আমার খুব আগ্রহ ছিলো যে রাস্তার লোকটিÑÑ’ এভাবে শুরু করে সে নিজের গুরুত্বে ফুলে উঠলো। শ্রোতা, ভারতী তার সারা জীবনকে নতুন অর্থ ও নতুন মাত্রা উপহার দিলো। নয়াদিল্লীর এক জায়গায় কুটির কলোনিতে তারা পৌঁছালে শ্রীরাম তার সারা জীবন ধরে যে সমস্ত কাজ করেছে তা নিয়ে পুরোপুরি সন্তুষ্ট হলো। ‘এই হচ্ছে আমার বর্তমান সদরদপ্তর,’ ভারতী ব্যাখ্যা করে বললো। নিজের কুটিরে তাকে নিয়ে গেলো। ‘হ্যাঁ, এটাই আমার বাসা।’ এক কোণায় চরকা এবং অন্যদিকে দরজার প্রবেশপথ দিয়ে রশিতে ঝুলানো তার কাপড় ছিলো। ‘হাজার হলেও সে তো আমার বউ হতে যাচ্ছে, সে কারণে তার সাথে থাকতে সে কিছু মনে করছে না,’ শ্রীরাম ভাবলো। ভারতী বললো, ‘এক ঘন্টার মধ্যে তুমি তোমার “ঘর” পেয়ে যাবে, সে পর্যন্ত এখানে বিশ্রাম নিতে পারো। আরেকটা ব্লক আছে, সেখানে তুমি হাত মুখ ধুয়ে নিতে পারো। আরাম করে নাও।’ সে যখন কথা বলছিলো, তখন এক দল বাচ্চা দৌড়ে এসে কেঁদে কেঁদে বললো, ‘মই, মইÑÑ’ আর শ্রীরাম তা বুঝতে পারলো না। তারা এসে ভারতীকে ঘিরে তাকে হাত ধরে টেনে নিয়ে গেলো। ভারতী থেমে তাদেরকে তাদের ভাষায় কী যেন বললো। তখন তারা তাকে ছেড়ে চলে গেলো। ‘ওরা কারা?’ একটু ঈর্ষার ছোঁয়া নিয়ে শ্রীরাম জিজ্ঞেস করলো। ‘বাচ্চা, তাদের সম্পর্কে এটুকুই আমরা জানি,’ ভারতী বললো। ‘কোথায় থাকে ওরা?’ ‘এখন এখানে,’ ভারতী বললো, ‘ওরা শরণার্থী শিশু, ওদের সম্পর্কে আর কিছু আমরা জানি না। এক ঘন্টা নাগাদ আমি আসছি। আরাম করো।’ আর সে বাইরে গেলো। অনেকক্ষণ সে ফিরে এলো না। যে সময় নাগাদ ফিরে এলো সে সময়ের মধ্যে শ্রীরাম তার পরিপার্শ্ব অনুসন্ধান করলো। বাথরুম ও ট্যাপ বের করলো এবং হাত মুখ ধুয়ে পরিস্কার-পরিচ্ছন্ন হলো। এরপর কুটিরে ফিরে গিয়ে লম্বা সময় ধরে মাথার চুল আঁচড়িয়ে পিছনে নিয়ে গেলো এবং আয়নায় খুঁটে খুঁটে দেখলো এটা ঠিক করতে যে সে ভারতীর যোগ্য কিনা। ভারতীর দয়া তার ভেতরে আস্থার পুনরুদ্ধার ঘটিয়েছে। সে কখনো আশা করেনি যে ভারতী তাকে এত উষ্ণতা ও দয়া দিয়ে দেখবে। যে সময়গুলোতে তারা পরস্পরের কাছে ছিলো না সে সময়গুলো কোনো তফাৎ করেছে বলে মনে হলো না। মনে হচ্ছে যেন এই তো এক ঘন্টা হলো তারা বিচ্ছিন্ন ছিলো: নিঃসঙ্গতা, কামনা ও বিরক্তির সময়গুলো গত কয়েক বছরে তার জীবনকে নরক বানিয়েছিলো। এখন সেগুলো দূর হয়ে গেছে যেন সেগুলোর কোনো অস্তিত্বই ছিলো না। ভারতীর একটা শাড়ি ঝুলে থাকতে দেখলো সে, হলদে ফোটাসহ সাদা শাড়ি। এ শাড়িটা অবশ্যই হাতে তৈরি খাদি পোশাক; এর ভারে রশিটা দেবে গিয়েছিলো। সেটা টেনে নামিয়ে হাতে নিয়ে ওজন মাপলো আর ভাবলো, ‘বেচারী, তার মিহি সূতার শাড়ি পরা উচিৎ। তাকে আমি সবকিছু দেবো।’ সেটা হাতে নিয়ে ওজন করলো; ‘বিশ পাউন্ড হবে মনে হয়।’ শাড়িটা প্রসারিত করে চোখের সামনে ধরলো। ‘এটা তো ধাতব পাতের মতো। এটা পরে তার নিশ্চয়ই দম আটকে যায়। এর মধ্যে দিয়ে তো কোনো আলো যেতে দেখছি না।’ এরপর শাড়িটা ভাঁজ করে বুকে চেপে ধরলো। এতে হালকা চন্দনের সুরভি থাকায় সে আনন্দ বোধ করলো। ‘এতে তো তার শরীরের সুগন্ধ লেগে আছে,’ চোখ বন্ধ করে সে ভাবলো। সে যখন সেখানে বসলো, তখন দরজা খুলে গেলো, আর ভারতী তার সামনে এসে দাঁড়ালো। ‘আমার শাড়ি নিয়ে তুমি কী করছো?’ বিস্ময়ে ভারতী জিজ্ঞেস করলো। ‘কেউ ভাববে তুমি এটা পরার চেষ্টা করছো,’ হেসে হেসে বললো। শ্রীরাম লাল হয়ে গেলো, আর শাড়িটা দ্রুত সরিয়ে ফেললো। ‘এটা করে তুমি আমাকে ঠেকাতে চেষ্টা করো না,’ শ্রীরাম বললো, ‘একবার যখন এটা বুকে নিয়েছি।’ ‘চুপ!’ ভারতী চিৎকার করে বললো। ‘অবুঝ হওয়ার চেষ্টা করো না। মনে রাখবে আমরা সবাই এখানে খুবই গুরুগম্ভীর মানুষ। তুমি তো দেখছি পরিস্কার-পরিচ্ছন্ন হয়েছো। তোমার কোনো কাপড় ধোয়ার থাকলে আমাকে দিয়ে দিও।’ বাথরুম থেকে ফিরে আনা ছোট একটা পুঁটলি তার হাতে ধরিয়ে দিলো শ্রীরাম। ‘ভয়ংকর নোংরা হয়েছে,’ ক্ষমা চেয়ে বিড়বিড় করে বললো সে। তার হাত থেকে পুঁটলিটা ছিনিয়ে নিয়ে ভারতী বের হয়ে গেলো। শ্রীরাম ভাবলো, ‘সে তো আমার বউয়ের মতোই হয়ে গেছে, কোনো বউ যা করে সে তা-ই করছে, ভাল মেয়ে! ভগবান তাকে আশীর্বাদ করুন। সে ঘুমিয়ে গেলে কোনোভাবে যদি তার গলায় একটা মঙ্গলসূত্র বেঁধে দিতে পারি, তাহলে সব ঠিক হয়ে যাবে। এক মূহূর্তের মধ্যে ফিরে এসে ভারতী বললো, ‘সন্ধ্যায় তোমার কাপড় পাবে। এ শিবিরে সবাই নিজ নিজ কাপড় ধোবে এবং কাউকে এ কাজটা করার জন্য নিয়োগ করবে না এমনটা প্রত্যাশা করা হয়, কিন্তু তুমি তো নতুন, আর তাই ব্যতিক্রম হিসেবে তোমার কাপড় ধোয়ার জন্য আমি ধোপার ব্যবস্থা করেছি। তোমার কি ক্ষুধা পেয়েছে?’ ‘চরম,’ শ্রীরাম বললো। ‘কিছু একটা খাওয়ার জন্য কাতর হয়ে আছি।’ ‘কিছু একটা বলতে তুমি কী বোঝাতে চাচ্ছো আমি তা জানি না,’ ভারতী বললো। ‘আমাদের দক্ষিণ ভারতের সব খাবার তো তুমি আশা করতে পারো না। মাসের পর মাস চলে গেলো ওরকম কিছু খেয়ে দেখিনি। চাপাতি, শাকসবজি, দই ও ফলমূল খাওয়া তোমাকে শিখতে হবে, আর ভাত বা সম্বার চাওয়া যাবে না।’ সে শ্রীরামকে একটা কাঠের ঘরে নিয়ে গেলো; সেখানে কিছু লোক খাওয়া দাওয়া করছিলো এবং শিশুরা তাদের সামনে থালা নিয়ে বসেছিলো। শ্রীরাম ও তার জন্য পাশাপাশি দুটো বড় থালা রাখা ছিলো। ‘এভাবে স্বামী-স্ত্রী একসাথে বসে,’ ভারতীর পাশে বসতে গিয়ে শ্রীরাম ভাবলো এবং গমের চাপাতি খেতে চেষ্টা করলো। দক্ষিণ ভারতের ঝালযুক্ত খাবার, চাটনি ও শাকসবজির জন্য সে ব্যাকুল হয়ে উঠলো, কিন্তু সেই ভাবনা সে চেপে গেলো। জেল জীবনে তাকে যা দেওয়া হয়েছিলো তা-ই খাওয়া সে শিখেছে। ‘আমি এখনো আসলে জেলেই আছি,’ সে ভাবলো। সারাদিন চরম ব্যস্ত ছিলো ভারতী। অনেক কাজ করলো বলে মনে হলো। সব সময় শিশুদের সেবা যতœ করছিলো, কারো কাপড় বদল করে দিচ্ছিলো, কারো চুল আঁচড়ে দিচ্ছিলো, কোনো দলকে খেলা না হয় নাচে নিযুক্ত করছিলো, আর তাদের সাথে অনবরত কথা বলে যাচ্ছিলো; এছাড়া তার খোঁজে আসা নানাবিধ নারী পুরুষ অনেক কথা বলছিলো। তার কাজটা ছিলো পূর্ণকালীন। শিশুদেরকে স্নান করিয়ে দিলো, খাইয়ে দিলো, বিভিন্ন চালাঘরের মাদুরে ঘুম পাড়িয়ে তাদের গায়ে কম্বল মুড়িয়ে দিলো, তাদের প্রত্যেককে কী যেন বললো, আর অবশেষে তার নিজের ঘরে ফিরে এসে খাটে বসে পড়লো এবং হাতদুটো সটান করে প্রসারিত করলো। শ্রীরাম তাকে ঘন্টার পর ঘন্টা অনুসরণ করলো কিন্তু নিজের কোনো কথা তাকে শোনাতে পারলো না। শিশুদের দেখে হাসি দিতে চেষ্টা করলো এই ভেবে যে এতে ভারতী খুশি হতে পারে, কিন্তু ভারতী তাদের সাথে থাকাকালীন তার উপস্থিতি প্রায় লক্ষই করলো না। এতে শ্রীরাম ক্ষুব্ধ হলো। একটা সময় পর সে ঘুরে দাঁড়িয়ে তার কুটিরে ফিরে গেলো। কুটিরটায় রশির খাট ও মাদুর ছিলো, তবে কোনো দরজা ছিলো না। গলির মাথায় একটা গণ বাথরুম ছিলো যা সে অন্যদের সাথে ভাগাভাগি করে ব্যবহার করতো। এখানে তাকে স্থানান্তর করে আনা হলে সে রুষ্ট হয়েছিলো। এতে তার সকল আশা চূর্ণ হলো বলে মনে হলো। ‘আমার কাছ থেকে মুক্তি পেতে কি সে আমাকে এখানে রেখেছে?’ সে ভাবলো। ‘এটা কি এ কারণে যে আমি তার ফুটকিওয়ালা শাড়িটা তুলে নিয়েছিলাম বলে? সেটা না করলে সে হয়তো আমাকে একই ঘরে ঘুমোতে দিতো। আমি হয়তো তার বিশ্বাস ভঙ্গ করেছি।’ অনুশোচনায় ভাবলো সে। ‘বিশ্বাস! কে তার বিশ্বাস চায়! আমি তো শুধু তাকে চাই।’ বাতি জ্বালিয়ে বিছানায় বসে ছিলো সে। প্রবেশ পথটা অন্ধকার হয়ে এলো। কুটিরের নিচের ছাদটার জন্য গুমোট ভাবের সৃষ্টি হলো যদিও শীতে এতে জায়গাটা গরম থাকে। ভারতী শ্রীরামের ধৌত করতে দেওয়া কাপড়গুলো হাতে নিয়ে ভেতরে এলো। কুটিরে বসে থেকে শ্রীরাম এই ভয়ে আচ্ছন্ন হলো যে সে এখনো জেলের কক্ষে বন্দী হয়ে আছে। ‘আমার জেল আমার পিঠের উপর এসে সবসময় পড়ে থাকে মনে হয়,’ সে ভাবলো। যাত্রার ক্লান্তি তাকে আক্রান্ত করতে লাগলো, তীব্র ঠাণ্ডা হাওয়া, অন্ধকারময় ও নতুন পরিপার্শ্ব তাকে বিষন্ন করে তুললো, আর এতে সে অখুশি বোধ করলোÑÑ অকারণ অন্ধকার ও অখুশি অবস্থা। অভিজ্ঞতালব্ধ সুখের ক্ষণিক প্রবাহকে কাল্পনিক মনে হলো। বিছানায় কাপড়গুলো রেখে দিয়ে ভারতী বললো, ‘আরাম বোধ করছো তো?’ ‘হ্যাঁ এবং না। তুমি সাথে থাকলে খুশি লাগে, আর চলে গেলে খারাপ লাগে।’ চমকে উঠে ভারতী তার দিকে তাকালো। শ্রীরাম বলেই চললো, ‘এখানে বসবে না?’ আর তাকে খানিকটা জায়গা করে দিলো। ভারতী বসে পড়লো। শ্রীরাম তার কাছে সরে গিয়ে নিজের হাতটা তার কাঁধে ছড়িয়ে দিলো। ভারতী বললো, ‘এখনো নয়,’ আর তার হাতটা আলতো করে সরিয়ে দিলো। ‘কী অদ্ভূত মানুষ!’ সে চিৎকার করে বললো। ‘তুমি একটুও বদলে যাওনি।’ শ্রীরাম তার কাছ থেকে দূরে বসে জিজ্ঞেস করলো, ‘এখনো কি আমি অস্পৃশ্য?’ ভারতী বললো, ‘বাপুজীই শুধু সিদ্ধান্ত নিতে পারে।’ ‘তাঁর সাথে এ নিয়ে কথা বলেছো?’ ‘হ্যাঁ, কয়েকবার, কিন্তু তিনি এখনো কোনো জবাব দেননি।’ মৃদু স্বরে বলে মাথা নিচু করে রইলো সে। তাকে বশীভূত দেখালো। কিছুক্ষণ থমথমে নীরবতা বিরাজ করলো, তারপর শ্রীরাম জিজ্ঞেস করলো, ‘কেন? তিনি কি চান না আমরা বিয়ে করি?’ ‘তা না হতে পারে,’ ভারতী বললো। ‘কিন্তু এটা নিয়ে ভাবার মতো তাঁর আসলেই সময় নেই, আরো অনেক কিছু করার আছে তাঁর।’ বাপুজী যে তাদের বিয়ের বিরুদ্ধে নয় সেটা জেনে শ্রীরাম স্বস্তি পেলো, কিন্তু এতে হলো না। দম বন্ধ করে কোনো কথা না বলে সে শুনলো। তার ভয় হলো যে তার সামান্যতম কথাও সব কিছুকে ভেস্তে দিতে পারে। ফিসফিস করে কোমলতম ভাষায় কথা বলার সময় এটা। কঠোর কিছুতে পুরো গঠনটা ধ্বংস হয়ে যেতে পারে। নিজেকে নিজেই রক্ষা করতে চাইলো সে। এমন কিছু করতে চাইলো না যাতে ভারতী আতঙ্কগ্রস্ত হয়ে তার কাছ থেকে দূরে চলে যায়, এমন কিছু না যাতে হাজার মাইল অতিক্রম করা পথটা নিস্ফল হয়ে যায়। তাই সে কথা বলা থেকে বিরত থাকলো। তাকে চিৎকার করে বলতে চাইলো এটা কি শুধু এ জন্য যে ভারতী চেয়েছিলো সে ওভাবে আসুক। শ্রীরাম তাকে বলতে চাইলো যে কখনো তার দিকে দেখলে তার জন্য সে অনুতপ্ত। সে তাকে হুমকি দিতে চাইলো যে তাকে জোর করে দক্ষিণ ভারতে ধরে নিয়ে যাবে। ‘অন্য যে কোনো কিছুর চেয়ে বেশি,’ ভারতী বললো, ‘মহাত্মাীকে যে ব্যাপারটা এখন ব্যথিত করছে তা হচ্ছে নারীদের ভোগান্তি। এত গুলো নারীর সর্বনাশ হয়েছে, এত গুলো নারী তাদের সম্ভ্রম হারিয়েছে, বাড়ি হারিয়েছে, শিশু সন্তান হারিয়েছে, আর অসংখ্য নারী নিখোঁজ হয়ে আছে। তাদেরকে অপহরণ করা হয়েছে, বদমায়েশরা তাদেরকে ধর্ষণ করেছে না হয় মেরে ফেলেছে, অথবা তারা হয়তো নিজেদেরকে নিজেরাই ধ্বংস করেছে।’ এ ভাবনায় ভারতী মনে হলো ভেঙ্গে পড়ার উপক্রম হলো। শ্রীরামের মনে হলো তাকে সহানুভূতিস্বরূপ কিছু একটা বলতে হবে। ‘এ ঘটনাগুলো ঘটে কেন?’ আর তার এ প্রশ্নের চরম অসারতার জন্য সে লজ্জাবোধ করলো। ভারতী তার প্রশ্নটা খেয়াল করেনি, কিন্তু কথা বলেই চললো। ‘১৫ আগস্টে সারাদেশ যখন উল্লসিত ছিলো, আর এখানে স্বাধীনতা দিবস উৎসবে অংশগ্রহণ করতে একত্রিত হয়েছিলো, তখন জানো বাপু কোথায় ছিলেন? কলকাতায় যেখানে নতুন দাঙ্গা শুরু হয়েছিলো। বাপু বলেছিলেন যেখানে মানুষ ভুগছে সেটাই তাঁর জায়গা। তাঁর জায়গা সেটা নয় যেখানে তারা উৎসব করছে। বলেছিলেন যে দেশ যদি নারী ও শিশুদের নিরাপত্তা দিতে অপারগ হয়, তবে সেখানে বসবাস করা যায় না। বলেছিলেন তাতেও যদি তাঁর দর্শন ভাল করে বোঝা না যায় তাহলে সেটা মরে যাওয়ারই সামিল। তাঁর লক্ষে গ্রামে গ্রামে খালি পায়ে হেঁটেছেন। আমরা তাঁর পিছু পিছু গিয়েছি। বন্যা ও মাঠের মধ্য দিয়ে প্রত্যেক দিন আমরা নীরবে পাঁচ মাইল করে হেঁটেছি। তিনি পূর্ব বঙ্গের ঐসব জলাভূমি দিয়ে মাথা নিচু করে হেঁটেছেন। প্রত্যেকটা গ্রামে দু’একদিন করে থেমেছি আমরা , আর যারা যারা ঘরবাড়ি হারিয়েছে, বউ বাচ্চা হারিয়েছে তাদের সাথে তিনি কথা বলেছেন। যারা অপরাধ করেছে তাদের সাথে তিনি দয়ার সাথে কথা বলেছেনÑÑ তাদের জন্য কেঁদেছেন, আর তারা কখনো এমন কাজ না করতে শপথ করেছে। আমি নিজের চোখে দেখেছি আগ্রাসী, উচ্ছৃঙ্খল লোকগুলো অহিংসার ব্রত নিচ্ছে, প্রতিপক্ষকে রক্ষা করার ব্রতÑ জিজ্ঞেস করো না আবার তারা কোন সম্প্রদায় ছিলো: দেশের এক অঞ্চলে এক সম্প্রদায় যা করতো তা দেশের অন্য অঞ্চলে একই সম্প্রদায়ের জন্য ভোগান্তি ডেকে আনতো। নোয়াখালী, বিহার ও তারপর দিল্লীতে যা ঘটেছে তা আমি দেখেছি। কেউ কী করে বেছে নিতে পারে? মানুষ অন্য মানুষের জন্য অসম্ভব কাজ করেছে। এ সম্প্রদায় নাকি অন্য সম্প্রদায় বেশি ত্রাস সৃষ্টি করেছে সেটা আলোচনা করে কোনো লাভ নেই। শুধু মানুষ ব্যতিরেকে মুসলিম, হিন্দু বা শিখ ধর্মের ভিত্তিতে কাউকে উল্লেখ করতে বাপুজী আমাদেরকে নিষেধ করেছেন। একদিন তিনি বললেন যে যারা সহিংস কর্মকাণ্ড ঘটায় তাদের জন্য তাঁর করুণা হয়ÑÑএক গ্রামের কিছু মহিলাকে তিনি উপদেশ দিয়েছিলেন যে নিজেদের সম্ভ্রম সমর্পণ করার চেয়ে নিজেদের হাতে নিজের জীবন তাড়াতাড়ি করে নেওয়া উচিৎ...।’ ‘তুমি অনেক জায়গায় গিয়ে থাকবে,’ অন্য কিছু বলার না থাকায় শ্রীরাম বললো। ‘হ্যাঁ, প্রায় এক বছর ধরে আমি মহাত্মাজীর সাথে আছি। ঐসব জায়গায় প্রথম দিকে তিনি আমাকে নিতে অনিচ্ছুক ছিলেন, কিন্তু জেল থেকে ছাড়া পাওয়ার পর আমি বারবার তাকে বিরক্ত করি। জানি না কতগুলো গ্রাম আমি দেখেছি। জ্বলন্ত গ্রামের মধ্য দিয়ে গুরুর পিছু পিছু গিয়েছি। অবশ্য যে কোনো জায়গায় আমাদের যে কোনো কিছু হতে পারতো। এমন জায়গা খুব কম ছিলো যেখানে মহাত্মাজীর বিরুদ্ধেও উষ্মা প্রদর্শিত হয়েছিলো। যদি তিনি ফিরে না আসেন এবং তাদেরকে ছেড়ে না দেন সে জন্য তারা প্ল্যাকার্ড প্রদর্শন করে বাপুর জীবনের উপর হুমকি দিয়েছিলো । কিন্তু অন্য জায়গার চেয়ে তিনি এমন জায়গাগুলোতে বেশিদিন থাকতেন। আর শেষ পর্যন্ত তিনি তাঁর জিদ বজায় রেখেছেন।’ ‘বিপদে পড়োনি কোনো সময়?’ ‘কীসের বিপদ? লাঞ্ছিত হওয়ার? হ্যাঁ, কখনো কখনো, কিন্তু মহাত্মাজী নারীদেরকে উপদেশ দিয়েছেন তাদের সম্ভ্রম হানি হওয়ার আগে তারা যেন শেষ আশ্রয় হিসেবে নিজের জীবন নিজের হাতে নিয়ে নেয়। মহাত্মাজী যেখানে ছিলেন সেখানে কোনো ভয় বোধ ছিলো না। কিন্তু... অপ্রত্যাশিত কিছু ঘটলে নিজের জীবন শেষ করতে আমি সব সময় প্রস্তুত ছিলাম।’ ‘না, না,’ সন্ত্রস্ত হয়ে শ্রীরাম বললো। ‘ওসব জায়গায় এ ধরণের কাজ একেবারে স্বাভাবিক একটা বিষয় বলে মনে হয়। সেখানে মানুষ দেখছে ঘর পুড়ছে, শিশুরা এতিম হচ্ছে, মানুষ খুন করা হচ্ছে, আর নারীদের নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। আমার মনে হয়েছিলো আমি অন্য কোনো একটা দেশে আছি। আমার বিশেষ দায়িত্ব ছিলো শিশুদের উপর তাদের যেখানেই দেখি না কেন। তাদেরকে একসঙ্গে করে এখানে এনেছি। এখানে যে সব শিশুদেরকে দেখছো, তাদের সম্পর্কে আমরা কিছু জানি না। মৃত্যুর হাত থেকে তারা কোনোভাবে পালিয়েছে, এখানেই দৈবের উপস্থিতি লক্ষ করা গেছে। বাংলা ও বিহারের বিভিন্ন গ্রাম থেকে তারা সবাই সমবেত হয়েছে। আরো ছিলো, কিন্তু কাউকে কাউকে কলকাতাতেই ফিরে নেওয়া হয়েছে। তবে আমাদের সাথে এখন যারা আছে তাদের সম্পর্কে আমরা কিছু জানি না। তাদের বাবা-মা বেঁচে থাকলে তারা জানবে তারা এখানে আছে এবং তাদের জন্য আসবে: তা না হলে আমরাই তাদেরকে মানুষ করবো। তাদের জন্য আমরা খেলনা ও কাপড়-চোপড় সংগ্রহ করেছি। তুমি আবার জিজ্ঞেস করো না যে তারা মুসলমানের বাচ্চা নাকি হিন্দুর বাচ্চা নইলে তারা কারা। ওটা জিজ্ঞেস করে কোনো লাভ নেই; আমরা জানি না। আমরা তাদেরকে শুধু ফুল ও পাখির নামে নাম দিয়েছি। বাপুজী একবার বলেছিলো যে নামের থেকে সংখ্যাও ভাল হবে যদি নাম দিয়ে কাউকে এ ধর্মের ও ধর্মের বলে চিহ্নিত করা হয়। দেখো একটা বাচ্চাকে মালকুস নামে ডাকা হয়, এ তো মেলোডি: একটা মেয়ের নাম হচ্ছে গুলাব, সেটা হচ্ছে গোলাপ। এসব শিশুকে অবশ্যই শুধু মানুষ হিসেবে বড় করতে হবে।’ শ্রীরাম একটু কেঁপে উঠলো, আর ভারতী বললো, ‘শরণার্থীদের জন্য আমরা কিছু গরম কাপড় ও কম্বল সংগ্রহ করেছি। তার থেকে তোমাকে দিচ্ছি। এ জন্য তোমাকে আমরা শরণার্থী হিসেবে গণ্য করবো, এতে ক্ষতি নেই।’ ভারতী মৃদু হাসলো। শ্রীরাম তাকে ভয় পেলো। ভারতী এত চমকপ্রদ যে সে তার বউ হতে পারে না। ‘এখন তো বুঝছো আমি কেন আমাদের বিষয়ে মহাত্মাজীর সাথে কথা বলতে পারিনি। এটা পবিত্র কিছুকে লঙ্ঘন করার মতো ব্যাপার হতো। তা হলেও একদিন বাংলার এক গ্রামে আমি তোমার কথা তাঁর কাছে উল্লেখ করেছিলাম। তিনি কিছু একটা বলতে ধরেছিলেন, কিন্তু তখন কে যেন একজন ছুটে এসে কাঁদতে কাঁদতে বলছিলেন যে তাকে ছুরিকাহত করা হয়েছে, আর এরপর আরেক বার কলকাতায় তোমার সম্পর্কে বলছিলাম, আর তিনি জিজ্ঞেস করেছিলেন তুমি কবে জেল থেকে বের হচ্ছো; তখন শেষ রাত ছিলো। যখন কেউ ধারের কাছে থাকবে না আমাদের তেমন সুযোগের জন্য আমি অপেক্ষা করেছিলাম, আর হঠাৎ করে এ জায়গা ও জায়গার কিছু বড় বড় মানুষ, মন্ত্রী এবং অন্যরা জরুরী পরামর্শের জন্য উপস্থিত হতো। আমার আর কখনো সুযোগ মেলেনি।’ ‘তাঁর কি আমার কথা মনে থাকবে?’ ‘তিনি কখনো কাউকে ভোলেন না। আমার মনে হয়েছিলো এখনো সময় হয়নিÑÑ আগামীকাল চলো একসাথে গিয়ে বিরলা হাউসে তাঁর সাথে দেখা করি, আর সুযোগ মিললে তাকে আমরা একসঙ্গে জিজ্ঞেস করবো।’ ‘তিনি যদি না বলেন?’ কাঁপুনি দিয়ে উদ্বিগ্ন প্রেমিক জিজ্ঞেস করলো। ভারতী উঠে বললো: ‘এক মিনিটের মধ্যে তোমাকে কম্বল দিচ্ছি।’ ** পরের দিন বিকেলে বিরলা হাউসের উদ্দেশ্যে যাত্রার আগে শ্রীরাম নিজেকে পরিপাটি করলো, আয়নায় দেখলো এবং হঠাৎ করে সিদ্ধান্তে পৌঁছালো যে এ উপলক্ষে তাকে হয়তো অতি বেশি স্মার্ট দেখাচ্ছে। চুলটা একটু ভাঁজ করে রাখলো। নানাবিধ সন্দেহে তার মন গুঞ্জরিত হলো। মহাত্মার সাথে সাক্ষাৎকারের ব্যবস্থা করতে ভারতী আগেভাগেই গিয়েছিলো। শ্রীরামকে বিরলা হাউসে নিয়ে যাওয়ার জন্য সে একজন গাইড রেখে গিয়েছিলো। শ্রীরাম একটা খদ্দের শার্ট ও হাতাবিহীন গেঞ্জি পরে তার ঘাড়ে শাল জড়িয়ে নিলো, আর সন্তুষ্ট হলো যে তাকে ফুটানি মার্কা দেখাচ্ছে না। তার সবচেয়ে বড় ভয় ছিলো যে মহাত্মাজী হয়তো বলে বসবে, ‘তোমাকে বিয়ে করবে? ভারতী তোমাকে বিয়ে করবে! দূর হও, ধৃষ্ট কীট কোথাকার!’ বিরলা হাইসে ভারতী তার দায়িত্ব নিলো। সে বললো: ‘তিনি ভয়ংকর ব্যস্ত, কিন্তু কিছুক্ষণ আমাদেরকে সময় দেবেন। তিনি জানেন তাঁর সাথে আমরা জরুরীভাবে দেখা করতে চাই।’ অনেক লোক ভেতরে যাচ্ছিলো আর বাইরে আসছিলো, খাদি ও সাদা টুপি পরা লোক, ইউরোপিয়ান পোশাক পরা বিদেশি সাংবাদিক এবং মোটর গাড়ি পথ দিয়ে যাচ্ছিলো। শ্রীরাম তার পরিপার্শ্ব সম্পর্কে উদাসীন ছিলো। ভারতীকে জিজ্ঞেস করলো: ‘তিনি যদি আমাকে কিছু জিজ্ঞেস করেন, তাহলে কী বলবো?’ ‘যে কোনো কিছু বলতে পারো, তিনি কিছু মনে করবেন না যতক্ষণ পর্যন্ত তুমি সত্যি কথা বলবে।’ যে নিশ্চিন্ত মনে ভারতী জায়গাটাতে ঘোরাফেরা করলো তাতে শ্রীরাম অবাক হলো। তার মতে সে নিশ্চিত ছিলো যে ভারতী তার জন্য অতিমাত্রায় ভাল, নিশ্চিত ছিলো যে তাকে তার বউ হওয়ার প্রত্যাশা করার অধিকার তার নেই। ভারতীর সাথে কথা বলার জন্য সব শ্রেণীর মানুষ থামলো। সে ইংরেজি, তামিল, হিন্দী, উর্দু এবং আরো কত ভাষায় যে কথা বললো তা ভগবানই জানেন। নারী, পুরুষ তরুণ ও সব জাতের বৃদ্ধদের সাথে নিশ্চিন্ত মনে কথা বললো। সবাইকে সে হাসি উপহার দিলো কিংবা কথা বললো। ‘কত মানুষ তুমি চেনো!’ শ্রীরাম প্রশংসা করে বললো। আর ভারতী হাসি দিয়ে সে প্রশংসার স্বীকৃতি জানালে সে মুগ্ধ হলো। ‘হ্যাঁ, কিন্তু তাদের বেশিরভাগেরই নাম আমি জানি না,’ ভারতী বললো। তারা সংক্ষিপ্ত পথ দিয়ে গেলো। ‘কী বাড়ি!’ শ্রীরাম চিৎকার করে বললো। তাদেরকে ছোটো খাটো যান্ত্রিক বিষয়ে কথা বলতে হলো: দুজনেই একই চিন্তায় আচ্ছন্ন ছিলো: মহাত্মার সাথে আসন্ন সাক্ষাৎকার। তিনি যদি বলেন, ‘হ্যাঁ,’ তাহলে পরে তাদের কী করা উচিৎ হবে? শ্রীরামের কাছে এটা সম্পূর্ণরূপে অবিশ্বাস্য ছিলো। তার মানে তাকে আলাদা কুটিরে আলোচনা করতে হতো না, তার মানে তাকে সে স্পর্শ করতে পারতো, নিয়ে যেতে পারতো, তার মানুষটার উপর তো তার অধিকার থাকবে, আর সব সময় তার সাথে থাকতে পারতো। শ্রীরাম তাকে চত্বরে একদিকে নিয়ে গেলো। ‘একটু আসো, ভারতী,’ সে ফিসফিস করে বললো, ‘আমাদের বিয়েতে বাপু অনুমতি দিলে সঙ্গে সঙ্গে কি আমরা সেটা সেরে ফেলবো?’ ভারতী যখন ফিসফিস করে উত্তর দিলো তখন তার উষ্ণ বাতাস শ্রীরামের উপর বয়ে গেলো, ‘হ্যাঁ, নিঃসন্দেহে।’ ‘সঙ্গে সঙ্গে কীভাবে আমরা তা করতে পারি? প্রয়োজনীয় আয়োজন আমরা কী করে করবো?’ শ্রীরাম জিজ্ঞেস করলো। ‘কী আয়োজন? আমরা কি সানাই, ঢোল, ড্রাম, যৌতুক ও ভোজের আয়োজন করতে যাচ্ছি নাকি?’ ভারতী জিজ্ঞেস করলো। ‘অন্তত ফুলও তো কিনতে হবে আমাদের? এ জায়গায় ফুল কোথায় কিনতে পাবো? আমি তো কাউকে চিনি না।? কোনো কিছু জানিও না। আমার জন্য সবকিছু গ্রহণ করতে আমার বউকে কী করে বলবো? ইস! যদি দিল্লী না হয়ে মালগুদি হতো, তাহলে দেখতে কী করতাম।’ ‘ওসব নিয়ে ভেবো না। কী করতে হবে বাপু নিজেই আমাদেরকে বলবেন।’ তারা হাঁটতে হাঁটতে ছোট একটা চত্বরে এলো যেখানে এরই মধ্যে কিছু লোক বসে ছিলো। এক প্রান্তে একটা বেদী ছিলো। ‘এখানেই বাপু প্রত্যেকদিন সান্ধ্যকালীন প্রার্থনা সারেন,’ ভারতী বললো। পিছন দিয়ে প্রধান ভবনে ভারতী ঢুকলো। তারা ছোট একটা বারান্দায় পৌঁছে, সরু পথ পার হয়ে একটা জানালা থেকে ঠিক দশ গজ দূরে থামলো। এরপর চুপ থেকে জানালার মধ্য দিয়ে সে নির্দেশ করলো। ‘ঐ যে উনি!’ সেখানে তিনি নাকে চশমা রেখে, পা দুটো নিচে ভাঁজ করে রেখে বসে ছিলেন। তাঁর সাথে বসে থাকা দুজন লোকের কথা ব্যাকুল হয়ে শুনছিলেন। ‘উনি নেহেরু, আর উনি প্যাটেল,’ ভারতী ফিসফিস করে বললো। রুমে আরো কিছু লোক ছিলোÑÑ খুবই ব্যস্ত লোক। ‘ওনাদের কাজে ব্যাঘাত সৃষ্টি করা যাবে না,’ ফিসফিস করে বলে সে দেয়ালে হেলান দিয়ে সটান হয়ে রইলো। শ্রীরাম তার দৃষ্টান্ত অনুসরণ করলো। ভেতরের লোকগুলো নিচু স্বরে ফিসফিস করে কথা বলছিলো। কেউ একজন রূম থেকে বেরিয়ে এসে ভারতীকে দেখে হাসলো। ভারতী তাকে হিন্দীতে কী যেন বললো। ‘সে হচ্ছে বাপুর নাতনী, দেখতে তাঁর মতোই হয়েছে।’ ‘আমরা যে এখানে আছি তাতে তাঁরা কিছু মনে করবে না তো?’ শ্রীরাম জিজ্ঞেস করলো। ‘তাঁরা মনে হয় গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে কথা বলছে।’ ‘কিন্তু বাপু আমাকে তাঁর জন্য অপেক্ষা করে সুযোগ নিতে বলেছে। ঠিক সময়ে উঁকি মেরে জানালায় আমার মুখ দেখাবো। তিনি আমাকে ভেতরে ডাকবেন নয়তো তিনিই কিছুক্ষণের জন্য বাইরে আসবেন।’ ‘বাপুর সাথে কথা বলার এটাই একমাত্র উপায়। তিনি তো সব সময় ব্যস্ত ও লোকজন পরিবেষ্টিত থাকেন।’ ‘তাকে কতকটা দুর্বল দেখাচ্ছে,’ কিছুক্ষণ জানালার মধ্য দিয়ে উঁকি দিয়ে সাহস করে বললো। ‘হ্যাঁ, তাঁর গত উপবাসে তিনি পুরো ক্লান্ত হয়ে পড়েছেন। কখনো কখনো নড়াচড়াবিহীন, অজ্ঞান অবস্থায় ওখানে তিনি পড়ে থাকতেন।’ দুজন মেয়ে পাশ দিয়ে চলে গেলে ভারতী কথা বলা বন্ধ করলো। কেউ একজন শর্টহ্যান্ড নোটবুক ও পেনসিল নিয়ে ছুটে গেলো। সরকারি বাড়ির ইউনিফর্ম পরা এক চাকর এক গ্লাস জল নিয়ে ভেতরে গেলো। এসব দেখে শ্রীরাম গান্ধীর সাথে সাক্ষাৎ করাটা স্থগিত করতে চাইলো। ‘আজকে তাঁর কাজে ব্যাঘার সৃষ্টি করা কি ঠিক হবে? তিনি ফাঁকা নাও থাকতে পারেন।’ ‘তিনি তো সব সময় ব্যস্ত থাকেন। এভাবেই চলেন। আজকে অপেক্ষা করে তাঁর সাথে দেখা করতে তিনি আমাকে বলেছেন। আমি তো তাকে বলেছিলাম যে তুমি এখানে আছো, আর তিনি বললেন, “আজকে তাকে সাথে করে নিয়ে এসো ”। “বাপুজী, কালকে কোনো এক সময়, আজকে তো আপনি ব্যস্ত”, প্রধান মন্ত্রী এবং অন্যান্যদের সাথে তাঁর গুরুত্বপূর্ণ সম্মেলন আছে জেনে আমি বললাম। “আমি আজকেই বোঝাচ্ছি”, তিনি জোর দিয়ে বললেন। আর আমরা কোথায় অপেক্ষা করবো সেটাও তিনি বলেছেন। বলেছেন একটুখানি বাড়তি সময় পেলেই তিনি আমাদের সাথে দেখা করবেন।’ ‘জানি তোমরা ওখানে অপেক্ষা করছো, ভেতরে এসো, তোমার বন্ধুকে নিয়ে ভেতরে এসো,’ মহাত্মাজীর কণ্ঠস্বর ভেসে এলো। ‘এখন আসতে পারো, জীবনের ভয়ংকর গুরুত্বপূর্ণ সব কাজ শেষ। এসো, এসো মা।’ ‘ইনিই বাপু,’ শ্রীরামের হাত শক্ত করে ধরে ও তাকে নিয়ে যেতে যেতে ভারতী বললো। শ্রীরামের হৃৎপিণ্ড ধড়ফড় করলো। রূমে পা ফেলার ঠিক আগে ভারতী ফিসফিস করে বললো, ‘স্বাভাবিক থাকবে, আর সত্য কথা বলবে। আর বিয়ে সম্পর্কে তাকে বলবে।’ ‘হ্যাঁ, হ্যাঁ,’ শ্রীরাম ঢোক গিললো। তারা ঘরে ঢুকলো। মহাত্মা মেঝেতে বসেছিলেন। পত্রিকা থেকে দৃষ্টি উপরে নিক্ষেপ করলেন। ভারতী দু’হাতের তালু একখানে করে প্রণাম জানালো। শ্রীরাম বললো, ‘নমস্কার, ওহ, শ্রদ্ধেয় গুরু!’ মহাত্মা হাসি দিয়ে তাদের প্রণামের জবাব দিলেন। তাঁর কাছে একটা জায়গা নির্দেশ করে তিনি বললেন, ‘এসো এখানে বসো। অনেক দিন তোমার সাথে দেখা হয়নি। নিজের সম্পর্কে এখন আমাকে বলো। ভারতী, আশা করি তোমার বাচ্চাদের অবস্থা ভাল হচ্ছে: তুমি তো এখনই ত্রিশটা বাচ্চার মা হয়েছো, কী আশীর্বাদ!’ ‘জ্বী, বাপু,’ ভারতী বললো। ‘তারা সবাই ভাল আছে। একটা ছোট বাচ্চা ছিলো না, ওর ঠাণ্ডা লেগেছিলো, ঐ যে ছোট মেয়েটা আপনি যার নাম দিয়েছেন আনার।’ ‘ওহ, হ্যাঁ, ওর কথা মনে আছে, জানো আনার মানে কী, ডালিম কুঁড়ি; কী সুন্দর! শিশুদের আকারে ভগবান আমাদের কাছে নিজেকে প্রকাশ করেন। আজকে অনেক ফলমূল সংগ্রহ করেছি, তুমি তো জানো আমি যখন উপবাসে থাকি তখন কত লোক এসে ঝামেলা করে: মনে হয় তারা সব সময় ভাবে যে এর পর অবশ্যই ভাল একটা খাবার খেতে হবে! আচ্ছা, তোমার জন্য আমি ওগুলো রেখে দিয়েছি: ওগুলো নিয়ে ছোট্ট সোনামণিদের দিয়ে দাও, ওরাই ভাল খাবার খাক।’ এক কোণায় স্তুপ করে রাখা উজ্জ্বল রঙের কমলা ও আপেল দেখিয়ে তিনি বললেন। ‘জ্বী, বাপু।’ ‘আর ওদের জন্য ফুল নিতেও ভুলো না যেন।’ মহাত্মা এবার শ্রীরামের দিকে ঘুরলেন: ‘তোমার নিজের সম্পর্কে বলো এখন।’ শ্রীরাম কিছুক্ষণ ইতস্তত করলো। ‘বিশ্বে তোমার অঞ্চলে তুমি কী করছিলে?’ ‘এক সপ্তাহ আগেও তারা আমাকে জেলে বন্দী করে রেখেছিলো,’ সে বললো। ‘তোমাকে আরো আগে ছাড়েনি কেন?’ গান্ধী বললেন। ‘আমাকে সাধারণ দণ্ডে দণ্ডিত করা হয়েছিলো,’ এ ভাবনায় যে মর্মযাতনা সে বোধ করলো তার সবটুকু দিয়ে সে জবাব দিলো। ‘খুব ভাল কথা। তুমি কী করেছিলে?’ শ্রীরাম কিছুক্ষণ ইতস্তত করলো এবং ভারতীর সত্যবাদী হওয়ার উপর নিষেধাজ্ঞার কথা তার মনে পড়লো। বললো, ‘কিছু সময় আমি “ভারত ছাড়ো” প্রচার করেছিলাম, কিন্তু পরে ট্রেন উল্টে ফেলার কাজ করছিলাম আরÑÑ’ মহাত্মাজীকে গুরুগম্ভীর দেখালো। ‘তুমি তো অনেক অন্যায় কাজ করেছো। তারপর থেকে যে নিকৃষ্ট নিকৃষ্ট ঘটনা ঘটেছে সেটা ভাবলে কোনো স্বস্তি মেলে না।’ ‘ভারতী জেলে চলে গেলো, এরপর আর কেউ রইলো না যে আমাকে বলতে পারে কী করতে হতো: কেউ ছিলো না যে আমাকে সঠিক পথ দেখাতে পারতো।’ ‘চমৎকার স্বীকারোক্তি,’ হাসি দিযে মহাত্মাজী বললেন। ‘হ্যাঁ, ভুল ছিলো তার, তোমাকে ফেলে গিয়েছিলো।’ ‘না,’ শ্রীরাম বললো: ‘ভুলটা আমার ছিলো। সে যখন তার সাথে আমাকে জেলে যেতে বলেছিলো, তখন আমি যেতে অস্বীকৃতি জানিয়েছিলাম।’ ‘আসলে, তাই কি, ভারতী?’ ‘জ্বী, বাপু, সে বলেছিলো সেÑÑ’ ‘আচ্ছা, সব চাপ শেষ হলে রাজনৈতিক কর্মী হিসেবে কী কী করেছো তা আমাকে বিস্তারিত বলবে, আর তখন সিদ্ধান্ত নেবো আমাদের কী করা উচিৎ।’ তিনি হাসলেন। ‘আবার উপবাসে যাওয়ার মতো খুব গুরুত্বপূর্ণ কিছু থেকে থাকলে আমরা শুনবো। জানো উপবাস কত ভালভাবে শুদ্ধ করে তুলতে পারে?’ ‘আমাকে উপবাস করতে আদেশ করলে আমি করবো,’ শ্রীরাম বললো। ‘আশা করি এর প্রয়োজন হওয়ার মতো তুমি তেমন কিছু করোনি। এ বিষয়ে আমরা পরে আলোচনা করবো।’ ‘সিদ্ধান্ত হয়ে গেলে আমি নিজেই উপবাস থাকার জন্য তৈরি থাকবো,’ ভারতী বললো। তার মুখখানি ঝলকে উঠে লাল হলো। ‘তুমি!’ মহাত্মাজী বললেন, ‘তোমার বন্ধুর জন্য!’ ঠিক এ সময়ে হলের দূরতম কোণায় কে যেন ঘোরাফেরা করছিলো। মহাত্মা বললেন: ‘ঐ যে আমার বিবেক রক্ষক ঘড়ি ঝুলিয়ে বলছেন ওঠার সময় হয়েছে।’ হাতের পাঁচ আঙ্গুল তুলে বললেন, ‘আর পাঁচ মিনিট সময় দাও।’ দর্শনার্থীদের দিকে ফিরলেন: ‘আমি দুঃখিত যে পাঁচ মিনিটের মধ্যে তোমাদের ছেড়ে যেতে হচ্ছে। লোকজন ইতোমধ্যে প্রার্থনা মাঠে অবশ্যই সমবেত হয়ে থাকবে। ওদের কণ্ঠস্বর শুনতে পাচ্ছো না?’ সময় যে ফুরিয়ে যাচ্ছে এ চিন্তায় শ্রীরাম উদ্বিগ্ন হলো। প্রত্যেকটা মিনিট গণনাযোগ্য। এরই মধ্যে এমনকি যখন সে ভাবছিলো তখন মূল্যবান সময় হারাচ্ছিলো। আর মাত্র সাড়ে তিন মিনিট। ঘড়িটা আবার ঝুলানোর আগে তাকে অবশ্যই কথা বলতে হবে। ভারতীর দিকে পার্শ্ব দৃষ্টি নিক্ষেপ করলো এই আশায় যে সে অন্তত মূল্যবান সময়টা কাজে লাগাতে পারে। কিন্তু ভারতী তার দিকে চেয়ে রইলো যা তার কাছে নীরব আবেদনের চাহনি বলে মনে হলো। মহাত্মা মজার দৃষ্টিতে তাদের দিকে তাকিয়ে থাকলেন। শ্রীরাম হঠাৎ করে বলে বসলো, ‘বিয়ে করতে আপনার আশীর্বাদধন্য অনুমতির জন্য আমরা অপেক্ষা করছি।’ মহাত্মাজী আনন্দের সাথে একজন থেকে আরেকজনের দিকে তাকালেন। ‘তোমরা কি পরস্পরকে এত পছন্দ করো?’ শ্রীরাম ফেটে পড়লো, ‘পাঁচ বছর ধরে অন্য কিছু না ভেবে আমি অপেক্ষা করেছি।’ ‘তোমার খবর কী, ভারতী, তুমি তো কিছু বলছো না।’ ভারতী মাথা নিচু করে রইলো এবং লজ্জায় লাল হয়ে ছটফট করলো। ‘আহ্, এই তো কর্তব্যপরায়ণ বউয়ের লক্ষণ,’ মহাত্মাজী বললেন, এবং জিজ্ঞেস করলেন, ‘এই নীরবতা দিয়ে হ্যাঁ বোঝাচ্ছে?’ শ্রীরাম শ্বাসরুদ্ধকর উত্তেজনায় ভারতীর দিকে তাকালো। মহাত্মাজী ভারতীকে কিছুক্ষণ পর্যবেক্ষণ করে বললেন, ‘সেই কনে তো অশোভন হবে যে তার মনের কথা জোরে জোরে বলে! ভাল, ভাল, ভগবান তোমাদের আশীর্বাদ করুন। তা শুভ কাজটা কখন হবে, আগামীকাল?’ ‘জ্বী, আপনি যদি তেমন আশীর্বাদ করেন।’ ‘ঠিক আছে। কাল সকালে আমি প্রথমে যেটা করবো তা এই কাজ। তোমাদের আপত্তি না থাকলে আমি তোমাদের পুরোহিত হবো। আমি তো একজন খুবই অবহেলাকারী পিতা; আমি এসে কনেকে তুলে দেবো। কালকের এটাই প্রথম কাজ; অন্যান্য কাজ এর পরে। আমি ইতোমধ্যে সব ফল ও ফুল আনিয়ে রেখেছি, আর তাই মোটের উপর তোমরা বলতে পারবে না যে আমি কাজে অবহেলা করেছি।’ ঘড়িটা নিয়ে লোকটি আবার হাজির হলে মহাত্মা বললেন, ‘তোমার জন্য আমি প্রস্তুত হয়ে আছি।’ তিনি উঠে দাঁড়ালেন। শ্রীরাম ও ভারতীও উঠলো। মহাত্মা বললেন, ‘এরই মধ্যে তোমাদের কিন্তু ত্রিশটা বাচ্চার সংসার আছে। তোমরা তাদের বাবা-মা হও!’ তিনি অপেক্ষা করার রূমে গিয়ে এক মিনিট পর এলেন। ভারতী তাঁর জন্য দরজায় অপেক্ষা করলো। মেঝের দিকে তাকিয়ে তিনি ভারতীর পাশ দিয়ে চলে গেলেন। ভারতী তাকে অনুসরণ করে চললো, আর শ্রীরাম ভারতীর পিছু পিছু চললো। মহাত্মাজী হঠাৎ করে থামলেন এবং ঘুরে বললেন: ‘ভারতী, আমার কেন জানি মনে হচ্ছে কাল সকালে তোমাদের বিয়েতে আমি থাকতে পারবো না।’ ‘কেন? কেন, বাপু?’ ভারতী জিজ্ঞেস করলো। ‘জানি না।’ তাঁর কণ্ঠস্বর ক্ষীণ হয়ে এলো: ‘মনে হচ্ছে তোমাদের পুরোহিত হিসেবে বিয়ে পড়ানোর কথা দিয়ে আমি খুব হঠকারিতার কাজ করে ফেলেছি।’ ‘বাপু, আপনাকে ছাড়াÑÑ’ ‘ধেৎ,’ গান্ধী বললেন। ‘ওসব তোমাকে বলতে হবে না। আমি খুব করে ওখানে থাকতে চাই, কিন্তু জানি না। ভগবানের ইচ্ছা থাকলে আসবো। নইলে জেনো রাখো তোমাদের দুজনার উপরেই আমার আশীর্বাদ রইলো। যাই হোক, মনে রেখো, কোনো কারণেই তোমাদের বিয়ে বন্ধ রাখা যাবে না কিন্তু,’ কণ্ঠে নতুন আদেশ নিয়ে তিনি বললেন, আর ভারতী জবাব দিলো, ‘জ্বী, বাপু।’ মহাত্মা ভারতীর পিঠে হাত বুলিয়ে দিয়ে শ্রীরামের দিকে হাসি দিলেন, আর দ্রুত চললেন। তিনি তাঁর নাতনীর কাঁধে ভর দিয়ে হাঁটলেন। শ্রীরাম ও ভারতী তাঁর পিছু পিছু চললো মাথা ভর্তি পরিকল্পনা নিয়ে। মহাত্মাজী তাঁর ঘড়িটা বের করে বললেন, ‘দেরি করাকে আমি ঘৃণা করি...’ চত্বরে যখন তারা পা ফেললো, তখন ভারতী শ্রীরামকে বললো, ‘চলো আজকে প্রার্থনায় যোগ দেই। আমাদের দুজনার জন্য জায়গা আছে।’ তারা একদিকে সরে দাঁড়ালো। মহাত্মাজী বেদির কাছাকাছি এলে গোটা সমাবেশ উঠে দাঁড়ালো। এ মুহূর্তে একজন লোক ঠেলাঠেলি করে, ভারতীকে ধাক্কা দিয়ে সমাবেশের সামনে হাজির হলো, আর শ্রীরাম ক্ষেপে গিয়ে চিৎকার করে উঠলো, ‘ওভাবে ঠেলাঠেলি করছেন কেন?’ সেদিকে কান না দিয়ে লোকটি সামনে গেলো। ‘আজকে দেরি করে আসার জন্য আমি দুঃখিত,’ মহাত্মা বিড়বিড় করে বললেন। লোকটি মহাত্মার সামনে গিয়ে দাঁড়ালো এবং শ্রদ্ধাপূর্ণ প্রণামের ভঙ্গিতে দু’হাতের তালু এক করলো। মহাত্মা গান্ধীও নমস্কার জানালেন। লোকটি আবারও সামনে যাওয়ার চেষ্টা করলো। মহাত্মাজীর নাতনী বললো, ‘আপনি বসুন,’ আর তাকে ঠেলে লাইনে রাখার চেষ্টা করলো। লোকটি মেয়েটিকে প্রায় মাটিতে ফেলে দিলো, আর পকেট থেকে একটা রিভলভার বের করলো। মহাত্মা যখন বেদিতে পা রাখতে যাচ্ছিলেন, লোকটি ঠিক তখন রিভলবার তাক করে তাকে গুলি করলো। আরো দুটো গুলির আওয়াজ হলো। মহাত্মা বেদিতে ঢলে পড়লেন। কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে তিনি মারা গেলেন।
নদী বয়ে যাচ্ছিলো, তীরে বিশাল বটগাছ ও পিপুল গাছের পাতাগুলো খসখস করে উঠলো; অপেক্ষমান জনতা ক্রমশ বক বক করতে লাগলো, যা সবসময় সোডা জলের বোতলের ফট ফট শব্দে থামতো; দ্রাঘিমায় উৎপাদিত অর্ধচন্দ্রাকার শশার ফালি, লবণ মিশ্রিত লেবুর খোঁসাসহ একজন বিক্রেতার কাঠের ট্রে থেকে দ্রুত শেষ হয়ে যাচ্ছিলো, যে বিক্রেতা নরম স্বরে (মহান এক ব্যক্তির আগমনে ছাড় দিয়ে) ঘোষনা করছিলো, ‘পিপাসা মেটাতে শশা, পিপাসার জন্য খাসা।’ সে রোদ থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্য মাথার চারপাশে সবুজ তুর্কি গামছা বেঁধে নিয়েছিলো।
শ্রীরামের ভেতরটা শুকিয়ে গেলো, এবং সে ট্রে-র দিকে আকাঙ্খাভরে তাকালো। সে যদি উপরে উঠে অর্ধচন্দ্রাকার একটা ফালি কিনতে পারতো। এর ঠাণ্ডা রসে কামড় দেওয়ার ভাবনা ছিলো প্রলুব্ধকর। সে দূরে থাকায় আসনটা একবার ছেড়ে দিলে তা ফিরে পাবার যো ছিলো না। সে আরো অনেককে টাকা দিতে এবং তাদের দাঁতগুলো কীভাবে সেই ফালিতে কাজ করছিলো তা দেখছিলো। ‘মহাত্মার অপেক্ষা মানুষকে তৃষ্ণার্ত করে তোলে, ’ সে ভাবলো।
দশ মিনিট অন্তর অন্তর কে যেন গুজব ছড়াতে শুরু করলো যে মহান ব্যাক্তিটি এসে পড়েছেন। এতে জনতা আন্দোলিত হলো। এটা একটা মজা, প্রতীক্ষার বিরক্তি থেকে অব্যাহতি পাওয়ার জন্য কিছু একটা। মাইক্রোফোন ঠিককারী থেকে শুরু করে স্বেচ্ছাসেবক যে-ই মঞ্চ অতিক্রম করার সাহস দেখালো সে-ই শয়ে শয়ে হাজার হাজার কণ্ঠ থেকে নিঃসৃত হাসি-তামাশা দিয়ে অভিনন্দিত হলো। তার এক বুড়ো শিক্ষক ও বাজার রোডের এক বন্ধকী কারবারির মতো অনেক পরিচিত চরিত্রকে সাদা খদ্দের পোশাকে চেনা যাচ্ছিলো না। তারা মনে করে এ উপলক্ষের জন্য এ পোশাকই তাদের জন্য সঠিক পোশাক। ‘আজকে বাজার ফোয়ারার অনতিদূরে ঐ খদ্দের কাপড়ের দোকানটা নিশ্চয়ই রমরমা ব্যবসা করে থাকবে।’ শ্রীরাম ভাবলো। বেশ খানিকটা দূরে এক পাশে আবছাভাবে টেনে রাখা পুলিশ ভ্যানে কিছু সংখ্যক লোক নিরাপত্তা গ্রিলের ভেতর দিয়ে উঁকি দিচ্ছিলো।
গান্ধী যখন প্ল্যাটফর্মে এসে আসন গ্রহণ করলো তখন আকস্মিক এক স্থবিরতা দেখা দিলো।
‘উনি হচ্ছেন মহাদেব দেসাই, ’ কে যেন শ্রীরামের কানে কানে বললো।
‘গান্ধীজীর পিছনের লোকটি কে?’
‘উনি নাতেশ সাহেব, আমাদের পৌরসভার চেয়ারম্যান।’
তার নাম উল্লেখ করায় আরেকজন নাক সিটকালো। ‘মহাত্মাজী এলে কিছু লোক সুবিধাজনকভাবে দেশপ্রেমিক হয়ে যায়।’
‘নইলে কী করে তারা বিশাল মিছিলে আগে জায়গা পায় আর মঞ্চে বসতে পারে?’
এই কথা চলতে চলতে অ্যামপ্লিফায়ারে গর্জন শোনা গেলো, ‘শান্ত হোন, দয়া করে শান্ত হোন।’
দুই হাতের তালু একত্রিত অবস্থায় প্রণাম করে মহাত্মা গান্ধী মঞ্চে উঠে দাঁড়ালেন। বলিষ্ঠ স্লোগান শোনা গেলো, ‘মহাত্মা গান্ধীর জয় হোক!’ তখন তিনি তাঁর বাহু তুললে তৎক্ষণাৎ জনতার মধ্যে এক নীরবতা দেখা গেলো। ছন্দে ছন্দে তিনি করতালি দিয়ে বললেন: ‘আমি চাই আপনারা সবাই এই তালি কিছুক্ষণের জন্য চালিয়ে যান।’ লোকজন নিরুদ্যম হলো। আর অ্যামপ্লিফায়ারে বুম করে আওয়াজ এলো, ‘কোনো লাভ নেই। যথেষ্ট হয়নি। আপনাদের বাহুতে আমি আরো শৌর্য-বীর্য, আরো ছন্দ, আরো তেজ দেখতে চাই। ভারত মাতাকে বেঁধে ফেলার শিকল ভাঙতে যে সকল অহিংস সেনারা আগুয়ান তাঁদের ঢোলের আওয়াজের মতো তোমাদেরটা হতে হবে। আমি সেই মহান আওয়াজ শুনতে চাই। আমি সবার বাহুকে উত্তোলিত অবস্থায় হাততালি দিতে দেখতে চাই। এতে লজ্জিত হওয়ার কিছু নেই। সবাই এ কাজটি এক মনে করুন আমি তাই চাই।’ আর তখনই প্রত্যেকটা নারী, পুরুষ ও শিশু তাদের বাহু মাথার উপর তুলে হাততালি দিলো।
শ্রীরাম কিছুক্ষণের জন্য ভাবলো এই বিশালায়তন আওয়াজের মধ্যে তালি দিয়ে তার কোটা যোগ করা দরকার কিনা। সে দ্বিধাগ্রস্ত হলো।
‘আমি দেখতে পাচ্ছি ঐ কোণায় কে যেন আমাদের সাথে যোগদান করতে পুরোপুরি ইচ্ছুক নয় । চলে এসো, এই প্রস্তুতির জন্য তুমি গর্ববোধ করবে।’
আর শ্রীরামের মনে হলো সে ধরা খেয়েছে; তাই সে যোগ দিলো।
এখন দৃঢ় এক সমবেত সঙ্গীত সরল সুরে মাইক্রোফোনের কাছে এক বালিকার নেতৃত্বে আরম্ভ হলো: রঘুপতি রাঘব রাজা রাম/ পতিত পবন সীতা রাম। গানটি বাজতেই থাকলো আর তখনই থামলো যখন মহাত্মা গান্ধী বক্তৃতা শুরু করলেন। গান্ধী হিন্দিতে যা বললেন নাতেশ তা তামিল ভাষায় রূপান্তর করে শোনালেন। মহাত্মা গান্ধী শুরুতেই ব্যাখ্যা করে বললেন যে নীতিগতভাবে তিনি শুধু হিন্দিতেই কথা বলবেন। ‘আমি ইংরেজিতে ভাষণ দেবো না। ইংরেজি আমাদের শাসকদের ভাষা। এ ভাষা আমাদেরকে দাস করে রেখেছে। আমার খুব ইচ্ছে হয় আমি যদি আপনাদের মধুর ভাষা, তামিলে আপনাদের সাথে কথা বলতে পারতাম; কিন্তু হায়, এখন এ ভাষা আয়ত্ত করার মতো সময় আমার নেই। যদিও আমি আশা রাখি বিধাতা তাঁর অসীম দয়ায় আমাকে সোয়া শ বছর আয়ু প্রদান করলে, পরের বার আমি আমাদের বন্ধু নাতেশকে বিরক্ত না করে তামিল ভাষায় আপনাদের সাথে কথা বলবো।’
‘নাতেশের ভাল সার্টিফিকেট অর্জনের উপর দখল আছে, ’ কে যেন ক্ষুব্ধ স্বরে বিড়বিড় করে বললো।
‘খরগোশের সাথে দৌড়ায় আর ডালকুত্তার সাথে শিকার করে, ’ একজন স্কুল শিক্ষক বললো।
‘উনি তাদের সবার খুঁটিনাটি জানেন। মনে করবেন না যেন বৃদ্ধ ভদ্রলোক যাদের নিয়ে কাজ করছেন তাদের সম্পর্কে কিছু জানেন না।’
‘আমি তো দুই জন লোককে ওখানে কথা বলতে দেখছি, ’ গান্ধীজীর গর্জন শোনা গেলো। ‘যখন হয়তো আপনার পাশের জন কথা শোনার জন্য উদগ্রীব তখন কথা বলা ভাল জিনিস নয়, । আপনি যদি তাকে শুনতে ব্যাঘাত ঘটান, তাহলে এটা এক ধরনের হিংসা।’ আর সঙ্গে সঙ্গে ভাষ্যকাররা মাথা নিচু করে নীরব হয়ে রইলো। মানুষজন নড়তে বা কথা বলতে আর সাহস পেলো না।
মহাত্মা গান্ধী বললেন: ‘আমি আমার সম্মুখে বিশাল সৈন্যবহর দেখতে পাচ্ছি। আপনাদের প্রত্যেকেরই কোনো না কোনো ভাল দোষ-গুণ আছে। আমাদের দেশের স্বাধীনতা অর্জনের আশা করার পূর্বে নিজেদের সুশৃঙ্খল করার জন্য আপনাদের সর্বতোভাবে সচেষ্ট হতে হবে। সেনাবাহিনী সবসময় নিয়ম শৃঙ্খলা মেনে প্রশিক্ষণের মধ্যে থেকে নিজেদের যোগ্য করে রাখে। আমরা, এ দেশের নাগরিকরা, সবাই অহিংস সৈন্যবহরের সেনা, কিন্তু এমন সৈন্যবহরকেও নিজেদের যোগ্য রাখার জন্য প্রতিদিন কিছু জিনিস চর্চা করতে হয়। আমাদের রোদ তপালে চলবে না; আর চিৎকার করে “বাম” , “ডান” বললে হবে না। তবে অনুসরণ করার মতো আমাদের নিজেদেরই কৌশল আছে: তা হচ্ছে রাম ধুন; চরকায় সুতা কাটা আর পরম সত্য ও অহিংসার চর্চা করা।’
পরের দিন সান্ধ্যকালীন সভায় শ্রীরাম খুব কাছেই একটা আসন যোগাড় করলো। সে এখন এসব সমাবেশের কৌশল বুঝতে পারলো। সে যদি ইতস্তত করতো আর তাকে যদি ভীতু দেখাতো, তাহলে লোকজন তাকে একবার সামনে একবার পেছনে ঠেলতো। কিন্তু যদি তাকে এমন কারো মতো দেখাতো যে আসনটার মালিক, তাহলে সবাই একপাশে দাঁড়িয়ে তাকে যেতে দিতো। সে বড়, কালো একটা চশমা পড়েছিলো, তার মনে হলো, তাতে তাকে কর্তৃত্বপরায়ণ দেখাচ্ছিলো। লম্বা লম্বা পা ফেলে সে ভীড়ের মধ্যে ঢুকে গেলো। জায়গাটা বাঁশের বেড়া দিয়ে কয়েক ভাগে বিভক্ত ছিলো যাতে করে লোকজনকে দলে দলে বিন্যস্ত রাখা যায়। সে যে হামবড়া ভাব গ্রহণ করলো তাতে সে বিভিন্ন প্রতিবন্ধকতা পেরিয়ে মঞ্চের নিচে প্রথম সারিতে চলে গেলো। এতে করে শশা ও পানীয় বিক্রেতা যারা জনতার প্রান্তে ফেরি করছিলো তাদের থেকে সে অনেক দূরে যেতে পারলো। কিন্তু এ জায়গাটার আরেকটা সুবিধা ছিলো: বেষ্টনীর পাশে যেখানে রমণীরা জমায়েত হয়েছিলো সেখানে সে নিজেকে আবিস্কার করলো। ফুটানি ও বিলাসিতার প্রতি গান্ধীজীর যে বিতৃষ্ণা ছিলো তা জানায় সেখানকার বেশিরভাগ রমণীরেই কোনো অলংকার ছিলো না। তারপরও তারা বিচিত্র রঙের শাড়িতে আকর্ষণীয় একটা অংশ ছিলো। শ্রীরাম বেহায়ার মতো সমাবেশের দিকে এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে বসে থাকলো। কারণ সে মুহুর্তে তার প্রিয় শখ ছিলো স্ত্রী হিসেবে কোন ধররে মেয়েকে পছন্দ করবে তা নিয়ে চিন্তা-ভাবনা করা।
সে নিজেকে আকর্ষণের কেন্দ্রবিন্দু ভাবলো পাছে কোনো রমণী ঘটনাক্রমে তাকে দেখে ফেলে, । ‘ওহ্ , সে আমার চশমা দেখে মুগ্ধ হয়েছে-- সে আমাকে বড় মানুষ ভাবছে মনে হয়।’ সে গান্ধীজীর গতদিনের উপদেশের কথা স্মরণ করলো: ‘সকল নারীই আপনাদের মা-বোন। তাদের দিকে কামনার ভাবনায় তাকাবেন না। যদি আপনারা কখনো এমন ভাবনায় তাড়িত হন, তাহলে তার প্রতিকার হলো: দিনের বেলায় মাটির দিকে তাকিয়ে মাথা নিচু করে, আর রাতের বেলায় দৃষ্টি উপরে রেখে তারা দেখতে দেখতে হাঁটবেন।’ শ্রোতাবৃন্দের মধ্য থেকে একজনের প্রশ্নের উত্তরে তিনি এমন কথা বলেছিলেন। শ্রীরামের এ কথা স্মরণ করে অস্বস্তি বোধ হলো: ‘উনি সম্ভবত আমার চিন্তা-ভাবনা পড়ে ফেলবেন।’ মঞ্চের এতো কাছে বসে থাকাটা ঝুঁকিপূর্ণ কাজ মনে হলো।
যারা বাঁকাভাবে চিন্তা করে ও কাজে ব্যাঘাত ঘটায় তারা যতোই দূরে বসুক না কেন, গান্ধীকে তাদের ধরে ফেলার মতো মানুষ হিসেবে মনে হলো। যে মুহুর্তে তিনি মঞ্চে এসে পড়বেন সে মুহুর্তেই তিনি নিশ্চয়ই তাকে ধরে ফেলবেন এবং বলবেন, ‘এই যে আপনি! উঠে আসুন আর আপনার অপরাধ স্বীকার করুন। এই সমাবেশে বলুন আপনি কী ভাবছিলেন। যদি আপনার নিজের চিন্তার উপর নিয়ন্ত্রণ না থাকে, তবে মেয়েদের দিকে মোটেও তাকাবেন না।’ শ্রীরাম দৃঢ়তার সাথে যেদিকে পুরুষেরা বসেছিলো সেদিকে তাকিয়ে রইলো, । ‘খুবই নীরস ও বিরক্তিকর মুখের সমাহার; যেদিকেই ঘুরে দাঁড়াই, সেদিকেই কেবল হয় দোকানদার নয় স্কুল শিক্ষককে দেখতে পাই। ওদের দিকে তাকিয়ে জীবনের মুল্যবান সময় ব্যয় করে কী লাভ?’ খুব শীঘ্রই অচেতন মনে সে আবার নারীদের দিকে ঘুরে দাঁড়ালো, আর মনে মনে বললো, ‘এতোগুলো মা-বোন। তারা যদি তাদের সাথে আমাকে কথা বলতে দিতো। অবশ্য এই মুহুর্তে আমার মনে কোনো কুচিন্তা নেই।’
এখন মহাত্মাজী মঞ্চে আরোহণ করলেন। শ্রীরাম রমণীদের উপর থেকে তার চোখ দ্রুত সরিয়ে নিয়ে সময়োচিত ভক্তির সাথে করতালিতে অংশগ্রহন করলো। এরপর -রঘুপতি রাঘব রাজা রাম- গানে যোগদান করলো। এবার গান্ধী অহিংসার উপর কথা বললেন এবং বাস্তব জীবনে কীভাবে তার চর্চা করা যায় তা ব্যাখ্যা করলেন। ‘এটা সম্পূর্ণ সাধারণ একটা পদ্ধতি যদি এতে আপনি বিশ্বাস করেন। যদি আপনি নিজের দিকে লক্ষ্য করেন, তবে আপনি ছোট বড় সকল কাজ এবং যে কুচিন্তা আরেকজনের ব্যথার কারণ- সব এড়িয়ে চলতে পারবেন । যদি আপনি সতর্ক থাকেন, তবে এমনিতেই আপনি এটা করতে পারবেন, ’ তিনি বললেন। ‘কেউ যখন আপনার উপর অবিচার করে থাকে অথবা এমন কিছু করেছে যা আপনার কাছে খারাপ বলে মনে হচ্ছে, তখন সেই খারাপটা ধ্বংস হোক শুধু এই প্রার্থনা করুন। আপনি সেই ব্যক্তিটার জন্য বেশি বেশি স্নেহ লালন করুন, তাহলে দেখতে পাবেন যে আপনি তার মধ্যে একটা পরিবর্তন আনতে পেরেছেন। দুই হাজার বছর আগে যীশু খ্রীষ্ট একই জিনিস বোঝাতে চেয়েছিলেন যখন তিনি বলেছিলেন, “তোমার অন্য গালটি পেতে দাও।” ’ এভাবে তিনি বলেই চললেন। তাঁর কথা বোঝা শ্রীরামের পক্ষে মাঝে মাঝে অসম্ভব হয়ে দাঁড়ালো। তিনি যা বলছিলেন তার মর্মোদ্ধার করতে না পারলেও শ্রীরামকে বিমোহিত দেখাচ্ছিলো। সে বোঝার জন্য পূর্ণ মনোযোগ নিবদ্ধ করতে চেষ্টা করলো। এই প্রথমবারের মতো সে কোনো কিছু বোঝার প্রয়োজন বোধ করলো। প্রথমবার নিজেকে নিজের কাছে অসুবিধাজনক ঠেকলো। এখন পর্যন্ত তার ধারণা ছিলো বিশেষত ব্যাংক অ্যাকাউন্ট চালু করার পর, যে সে জীবনের সবকিছু বোঝে। এই প্রথমবার তার নিজের দক্ষতা ও বোধগম্যতা নিয়ে সে সন্দিহান হলো। মহাত্মাজী অস্পৃশ্যতা ও জাত নিয়ে কথা বললে শ্রীরাম চিন্তা করতে লাগলো, ‘উনি যা বলছেন তার মধ্যে অবশ্যই অনেক কিছু থেকে থাকবে। আমরা সব সময় ভাবি আমরা নিজেরাই শ্রেষ্ঠ। ঠাকুরমা কীভাবেই না আমাদের বাড়ির পেছনের উঠান ঝাড় দেওয়া খলপুকে ভয় দেখাতো!’ ঠাকুরমা এতোই গোঁড়া যে সে দশ গজের ভেতর ঐ খলপুকে আসতে দিতো না। আর অভ্যাসবশত ভয় দেখানোর স্বরে তাকে ডাকতো। খলপুর কাজে দোষ খোঁজা ও অপমানজনক মন্তব্যে যোগ দিয়ে শ্রীরামও পৈশাচিক আনন্দ লাভ করতো, যদিও তাদের মন্তব্যে সে বেচারার কখনো ন্যূনতম খেয়াল ছিলো না। ঝাড়– সজোরে চালনা করে সে শুধু তার কাজ করে যেতো, আর থামতো এইটুকু বলার জন্য, ‘অনেক আগে আপনি যে আমাকে শার্ট দেবেন বলেছিলেন সেই পুরানো শার্টটা কখন দেবেন, বাবু?।’ শ্রীরাম মঞ্চে সেই মেয়েটিকে হঠাৎ করে দেখতে পেলো, যে মেয়েটি বাজারে কয়েকদিন আগে তার মুখের উপর একটা টাকার বাক্স ঝন ঝন করে বাজিয়েছিলো। ঘরে বানানো সাদা খদ্দের শাড়ি পরিহিত ছিলো সে। শ্রীরাম লক্ষ করলো এ শাড়িতে তাকে কী চমৎকারই না মানিয়েছে। আগে তার মনে হতো খদ্দের পরাটা একটা শখের ব্যাপার, আর খেয়ালী মেয়েদেরই তা মানায়। কিন্তু এখন সে উপলব্ধি করলো এতে কতো সুন্দর লাগতে পারে। কিছুক্ষণের জন্য সে তফাৎ খুঁজতে লাগলো যে শাড়িটা পরেছে সে-ই কাপড়কে সুন্দর করে তুলেছে নাকি কাপড়টাই এমনিতে সুন্দর। কিন্তু পুরো সমস্যাটা নিয়ে ভাবনা তাকে থামাতে হলো। এসব বিমূর্ত চিন্তা-ভাবনার সময় এটা ছিলো না। ঐ তো উঁচু মঞ্চে মাইক্রোফোনের পাশে স্বপ্ন-বালিকা দাঁড়িয়ে আছে গোটা দৃশ্যকে নিজের করে নিয়ে। এমন মানুষই মহাত্মাজীর মাইক্রোফোনের পাশে দাঁড়ানোর যোগ্যতা রাখে। কী আত্মবিশ্বাস নিয়েই না সে জনতার মোকাবেলা করলো! শ্রীরাম যদি ঘোষণা করতে পারতো, ‘যে মাইক্রোফোনে মহাত্মাজী কথা বলছেন তাঁর পাশের জনকে আমি চিনি।’ সমস্যা শুধু এই যে তারা যদি ঘুরে এসে তাকে জিজ্ঞেস করতো, ‘তোমার নাম কী?’, তাহলে সে হারিয়ে গেছে বলে তার মনে হতো। এটা বলাও তো বিদঘুটে, ‘আমি জানি না। সে সেদিন বাজারে টাকা তোলার বাক্স নিয়ে ঝন ঝন করে বাজাতে বাজাতে এসেছিলো। যদি জানতাম সে কোথায় থাকে! কেউ কোনো তথ্য দিলে তার প্রতি কৃতজ্ঞ থাকতাম।’ এ সময় করতালি বেজে উঠলে সে তাতে যোগ দিলো। গান্ধীজী তাঁর হাত উঁচু করে বললেন, ‘হাততালি দিয়ে আমার প্রশংসা করাই যথেষ্ট নয়। আমি এ ব্যাপারটিকে এতো সহজভাবে মেনে নিতে প্রস্তুত নই। আমি চাই ইংরেজদের ভারত উপকূল ছাড়তে বলার কথা চিন্তা করার আগে আপনাদের মনের সত্যিকার পরিবর্তন নিশ্চিত করুন। চিৎকারকে গর্জনে পরিণত করা আপনাদের জন্য খারাপ কিছু নয়। কিন্তু এটাই যথেষ্ট নয়। আমি চাই আপনারা নিজেদের দিল-মন পরিস্কার করে নিশ্চিত হন যে সেখানে শধু ভালবাসাই থাকে, অতীতের তিক্ততার কোনো চিহ্ন নেই। তখনই কেবল আপনারা ইংরেজদের বলতে পারবেন, “দয়া করে আমাদের দেশকে আমাদেরই শাসন বা দুঃশাসন করতে দিন। এটা শুধু আমাদের ব্যাপার। আর আপনারা চাইলে বন্ধু এবং বিশিষ্ট অতিথি হিসেবে যখন খুশি ফিরে আসতে পারেন, আমাদের শাসক হিসেবে নয়।” তখন আপনারা দেখতে পাবেন জন বুল কীভাবে তার স্যূটকেস গোছাচ্ছে। তবে নিশ্চিত হোন যে আপনাদের হৃদয়ে তিক্ততা নয় ভালবাসা আছে।’ শ্রীরাম মাইক্রোফোনের পাশের স্বপ্ন-বালিকাটির দিকে তাকিয়ে মনে মনে বললো, ‘অবশ্যই এটা তিক্ততা নয়। আমি তাকে ভালবাসি।’ ‘কিন্তু, ’ মহাত্মাজী বলছিলেন, ‘আমার যদি ন্যূনতম সন্দেহ থাকে যে আপনার হৃদয় নিখাদ নয় কিংবা সেখানে তিক্ততা আছে, তাহলে আমি ইংরেজদের বরং থেকে যেতে বলবো। দুই মন্দের মধ্যে এই ভাল।’ শ্রীরাম চিন্তা করলো: ‘ওহ্ , শ্রদ্ধেয় মহাত্মাজীর আর কোনো সন্দেহ নেই যে আমার হৃদয় নিখাদ ও তিক্ততাহীন। এমন এক স্বর্গীয় সৃষ্টির জন্য আমার হৃদয়ে কীভাবে তিক্ততা থাকতে পারে?’ মেয়েটি মঞ্চের অনেক উঁচুতে ছিলো। বিকেলের রবি তার মুখাবয়বকে প্রজ্জ্বলিত করে রাখলেও তার মুখখানি অস্পষ্ট দেখাচ্ছিলো। সে বেশ কালো হয়ে থাকতে পারে। তবুও তার মুখখানি রবির কিরণোচ্ছটায় আপাতত ফর্সা দেখাচ্ছিলো। কিংবা সে হয়তো ফর্সা। যদি সে কালো হয়, তাহলে তার সাথে বিয়েতে ঠাকুরমা নিঃসন্দেহে সায় দেবে না। যাই হোক, এটা তো অসম্ভব নয় যে তারা তার আশীর্বাদ পাবে না। কেননা তার বিয়ের জন্য ঠাকুরমার পরিকল্পনা ছিলো-- কুম্বুমে বড় হওয়া তার এক ভাইয়ের খুবই ভয়ংকর, গেঁয়ো এক নাতনী যে তার টাকা পাহারা দিতো--তার সাথে বিয়ে দেওয়া। ঠাকুরমা শ্রীরামের টাকা নিয়ে যদি এতোই উদ্বিগ্ন থাকে, তবে পুরো টাকাটা নিয়ে সেই কুম্বুম বালিকাকে দেওয়াটাকে সাদরে গ্রহণ করা যায়। দুই মন্দের মধ্যে এটাই ভাল। কিন্তু সে কুম্বুম বালিকাকে বিয়ে করতে পারবে না। যে মেয়েকে কিনা পাড়া গাঁয়ের চকচকে শাড়ি পরলে আর ছপছপে তেলে আঁটসাঁট বেণী ঘাড়ে ঝুলিয়ে রাখলে কুৎসিত এক জীবের মতো লাগে। অথচ সেখানে তার খদ্দের শাড়ি পরা উচিৎ ছিলো। যে খাদি পোশাক পরবে না, তার দিকে শ্রীরাম তাকাবেই না। কেবল খাদি পোশাকই জাতিকে ধ্বংসের হাত থেকে বাঁচাচ্ছে এবং ইংরেজদের ভারত ছাড়া করছে যেমনটা শ্রদ্ধেয় সাধু মহাত্মাজী অক্লান্তভাবে ব্যাখ্যা করলেন। সে এই ভেবে বিষন্ন বোধ করলো যে এই বিংশ শতকেও কুম্বুম বালিকার মতো মানুষ আছে, যাকে সে বহু বছর আগে গ্রামে দেওয়ানি মামলায় তার কাকা কর্তৃক এক আইনজীবী নিযুক্ত করার সময় দেখেছিলো। মহামঞ্চের উপরকার মেয়েটিকে শ্রীরাম নিজে গিয়ে আশ্বস্ত করতে চাইলো যে সে সামান্যতম আপত্তি ছাড়াই তার চেহারা সুরত ও পোশাক-আশাক পুরোটাই ভাল লেগেছে। এটা তার কাছে গিয়ে বলাটা অপরিহার্য ছিলো। সমাবেশ শেষে সে সুযোগটা লুফে নিলো। মঞ্চ থেকে মহাত্মাজী নামতে শুরু করলেন। সামনের দিকটায় হুড়োহুড়ি হলো; কিছু স্বেচ্ছাসেবক মঞ্চের চারপাশের জায়গাটা রুদ্ধ না করার জন্য অনুরোধ করে জনতাকে পিছনে ঠেলে দিতে লাগলো। মহাত্মাজীকে তার চারপাশের এতো গোলমাল বিষয়ে বিস্মৃত মনে হলো। স্বেচ্ছাসেবকদের রক্ষা বেষ্টনী মধ্যে শ্রীরাম ফাঁক পেয়ে ঢুকে গেলো। সূর্যের তাপ তার ঘাড়ে এসে লাগছিলো; নদীর কিনারার বিশাল গাছগুলি জনতার হৈ হুল্লোড় ছাপিয়ে খস খস আওয়াজ করছিলো; পাখিরা নিচের এতো গোলমালে অনভ্যস্ত হওয়ায়, ডালে ডালে কিচিরমিচির করছিলো। জনতা এতো বিশাল হওয়ায় শ্রীরাম কোথায়, শহরের কোন অঞ্চলে ছিলো তা ভুলে গেছে। কিন্তু পাখির কলকাকলির জন্যই শুধু তার মনে পড়লো যে সে সরায়্যুর তীরে আছে। ‘মেয়েটি যদি মহাত্মাজীর সাথে থাকতে পারে, তাহলে আমিও সেখানে থাকতে পারি,’ জনতার ভীড় ভেঙ্গে ক্ষুব্ধ হয়ে সে বললো। সাদা টুপি পরা অনেক তরুণ স্বেচ্ছাসেবক ছিলো যারা মহাত্মাজীর সামনের পথ পরিস্কার করে দিয়েছিলো। শ্রীরামের মনে হলো যে সম্ভবত ঘৃণিত কারখানা থেকে তৈরী হাফ হাতা শার্ট ও মুল ধুতি পরে এতো স্পষ্টভাবে যদি নিজেকে আলাদা না করে রাখতো, তবে অনেক ভাল হতো। তার আশঙ্কা হলো যে কোনো মুহুর্তে কেউ তাকে দেখে ফেলতে পারে এবং বের করে দিতে পারে। যদি তারা তাকে চ্যালেঞ্জ ছুড়ে জিজ্ঞেস করে, ‘তুমি কে?’ তার মনে হলো সে সঙ্গত কোন উত্তর দিতে পারবে না অথবা বড় জোর সরস জবাব দিতে পারে, ‘আপনারা কার সাথে কথা বলছেন বলে মনে হয়? মহাত্মাজীর সাথে যে মেয়েটি দেখছেন সে আমার পরিচিত। আমি তাকে জানবো, কিন্তু আমাকে তার নাম জিজ্ঞেস করবেন না। সে একদিন বাজারে টাকা তোলার বাক্স নিয়ে এসেছিলো...’ কিন্তু এমন কোন উপলক্ষের উদ্ভব হলো না। কেউ তাকে প্রশ্ন করলো না। সে শীঘ্রই স্বেচ্ছাসেবকদের গড়া লেন দিয়ে মহাত্মজীর পিছন পিছন হাঁটা একদল লোকের সাথে মিশে গেলো। আর জনতা পাশ দিয়ে লাইন ধরে চললো। কেউ তাকে না থামালে সে চলতে থাকার সিদ্ধান্ত নিলো। যদি কেউ তাকে থামায় , তবে সে যে কোনো সময় ঘুরে বাড়ি যেতে পারে। তারা তো তাকে আর মেরে ফেলবে না। ‘মেরে ফেলা!’ এ শব্দগুচ্ছে সে আমোদিত হলো: যে ব্যক্তি ইংরেজদেরও আঘাত করতে চান না, তাঁর ধারের কাছে এমন কোনো শব্দই সঙ্গত হতে পারে না। যে কেউ আত্মবিশ্বাস রাখতে পারেন তাঁর স্বেচ্ছাসেবকরা ভাবী একজন অনুসারীকে হত্যা করুক এটা তিনি কখনোই হতে দেবেন না। শ্রীরাম এখন এমন একটা সুবিধাজনক অবস্থান খুঁজে পেলো যে অনুপ্রবেশকারী হিসেবে ঢুকে পড়ার সব ভয় তার উবে গেলো। হালকা মনে পরিচিত ভাব নিয়ে সে হাঁটতে থাকলো যাতে করে রাস্তার সারিবদ্ধ লোকজন তার দিকে আগ্রহভরে তাকায়। সে তার নাম ডাকতে শুনলো। ‘শ্রীরাম!’ তার বহু বছর আগেকার এক শিক্ষক তাকে ডাকছিলো। এমন পরিস্থিতিতেও শ্রীরাম তার শিক্ষকের ডাক থেকে সহজে রেহাই পেলো না: এটা ছিলো প্রতিবর্তী ক্রিয়া: কিছুক্ষণের জন্য ইতস্তত করলো এই ভেবে যে ডাকে সাড়া না দিয়ে পালিয়ে যাওয়াটা ভাল হবে কিনা। কিন্তু তার মন প্রায় পড়ে ফেলেছের মতো শিক্ষক তাকে আবার ডাকলেন, ‘একটু দাঁড়াও, শ্রীরাম।’ সে তার স্যারের সাথে কথা বলার জন্য থামলো। তিনি ছিলেন বৃদ্ধ, রঙিন শালে ঢাকা, আর তাকে চিবুকের হালকা দাঁড়ি সমেত দেবদূতের মতো দেখাচ্ছিলো। তিনি ঔৎসুক্যভরে শ্রীরামের কনুই শক্ত করে ধরে জিজ্ঞেস করলেন, ‘ তুমি কি ওদের সাথে যোগ দিয়েছো?’ ‘কাদের সাথে?’ ‘তাদের সাথে--’ অঙ্গুলি নির্দেশ করে শিক্ষক বললেন। শ্রীরাম কিছুক্ষণের জন্য দ্বিধাবোধ করলো এই ভেবে যে তার কী জবাব দেওয়া উচিৎ, আর বিড়বিড় করে বললো, ‘আমি বোঝাতে চাচ্ছি...’ ‘বেশ তো, খুব ভাল, ’ শিক্ষক বললেন। ‘তুমি পরীক্ষায় খারাপ নম্বর পেলেও আমি সবসময়ই জানতাম তুমি অনেক দূর যাবে, স্মার্ট বয়। তুমি তো নির্বোধ নও, তবে অলস। ভালমতো কাজ করলে তুমি যে কারো মতো সবসময় প্রথম শ্রেণীর নম্বর পেতে। কিন্তু তুমি সবসময় আলসেমি করতে; আমার মনে আছে যখন তোমাকে ইংল্যান্ডের রাজধানী কোথায় জিজ্ঞেস করা হলো তখন তুমি তোতলাচ্ছিলে। হো! হো! ’ স্মৃতি হাতরে তিনি হাসলেন। অধৈর্য্য হয়ে শ্রীরাম একটা মোচড় দিলো। শিক্ষক বললেন, ‘তোমাকে এখানে দেখতে পেয়ে আমি গর্বিত, সোনা। কংগ্রেসে যোগ দাও, দেশের জন্য কাজ করো, তুমি অনেক দূর যাবে, ভগবান তোমায় আশীর্বাদ করুক...’ ‘আমি আনন্দিত যে আপনি এভাবে চিন্তা করছেন, স্যার, ’ শ্রীরাম এ কথা বলে ছুটে যাওয়ার জন্য ঘুরে দাঁড়ালো। শিক্ষক শ্রীরামের কানের কাছে তার মুখ এনে ফিসফিস করে বললেন, ‘ওখানে ঢোকার পর মহাত্মাজী এখন কী করবেন?’ ‘কোথায়?’ গান্ধীকে অনুসরণ করলেও তিনি কোথায় যাচ্ছিলেন তা না জেনে শ্রীরাম জিজ্ঞেস করলো। ‘তাঁর কুটিরে, ’ শিক্ষক জবাব দিলেন। ‘উনি হয়তো বিশ্রাম নেবেন, ’ দৃঢ়প্রতিজ্ঞ হয়ে ছুটে যাওয়ার প্রস্তুতি নিয়ে শ্রীরাম জবাব দিলো। তিনি যদি নিজের ও দলের মধ্যে বিরাট এক ব্যবধান হতে দিতেন, তাহলে তারা তাকে স্বীকার করতো না। ছোট্ট একটা বালক ঠেলা দিয়ে সামনে এসে জিজ্ঞেস করলো, ‘আমাকে মহাত্মার অটোগ্রাফ এনে দিতে পারেন?’ ‘অবশ্যই না,’ শিক্ষকের কবজা হতে রেহাই পেতে হালকা চেষ্টা করে শ্রীরাম জবাব দিলো। শিক্ষক তার কানে ফিসফিস করে বললেন, ‘যাই ঘটুক না কেন, দেশকে ডুবিও না।’ ‘না, স্যার, কখনো না, আমি কথা দিচ্ছি, ’ বৃদ্ধ শিক্ষককে মৃদু ঠেলা দিয়ে দৃষ্টি থেকে দ্রুত অপসৃয়মান দলটির পিছনে ছুটতে ছুটতে সে উত্তর দিলো। কাঁটা ও বাঁশ দিয়ে নির্মিত একটি ছোট দরজার কাছে তারা আসলো। সে দেখলো মেয়েটি সামনে এগিয়ে দরজাটি খুলছে। যখন জনতা দেখলো তখন সে পূর্ণবেগে সামনে দৌড় দিলো। তার পদক্ষেপে একটা বাড়তি আশ্বাসের আভাস ছিলো। এখন তার মনে হলো সে কংগ্রেসের। শিক্ষক তার মাথায় নতুন এক চিন্তা ঢুকিয়ে দিয়েছিলো। সে নিজেকে একজন দলের কেউকেটা প্রায় ভাবলো। শীঘ্রই সে দলে যোগ দিয়ে মেয়েটির পাশে বসার মতো যথেষ্ট সাহস দেখালো। তার জন্য এটা গর্ব করার মতো মুহুর্ত ছিলো। সে মেয়েটির দিকে তাকালো। মেয়েটি মনে হলো তার উপস্থিতি খেয়াল করেনি। শ্রীরাম শিহরণে ঘামছিলো আর হাঁপাচ্ছিলো, কিন্তু মেয়েটির ব্যক্তিত্ব, গায়ের রঙ অথবা মুখের প্রত্যঙ্গের খুঁটিনাটি বুঝতে পারলো না। অবশ্য সে সন্তোষজনকভাবে লক্ষ করলো যে সে মাঝারি উচ্চতার হওয়ায় মেয়েটি তার চেয়ে বেশি লম্বা ছিলো না। গান্ধী তাকে কী যেন বলছিলো, আর সে তাতে মাথা নেড়ে সায় দিয়ে হাসছিলো। শ্রীরাম বুঝতে পারলো না তারা কী বলাবলি করছে, কিন্তু সহানুভূতিশীল শ্রদ্ধা থেকে সেও হাসলো। তাদের মতো যতোটা সম্ভব সে তাকাতে চাইলো, আর সেদিন কারখানার কাপড় পরে আসার জন্য নিজেকে শতবার ধিক ধিক জানালো। মহাত্মা তাঁর কুটিরে প্রবেশ করলেন। নদী তীরে বসবাসকারী নগর স্ইুপারদের ডজন খানেক কুটিরের মধ্যে এটি একটি ছিলো। শহরের সবচেয়ে খারাপ এলাকার মধ্যে হয়তো এটি একটি ছিলো, আর অতিরঞ্জিত করে একে কুটির বলা হতো। এগুলো ছিলো বাসের অনুপযোগী জীর্ণ কুঁড়েঘর; ছেঁড়া খড়, টিন ও নারিকেল ছোবড়ার টুকরো দিয়ে নির্মিত যেখানে সবাই গাদাগাদি করে থাকতো আর মোরগগুলো কক কক করে বেড়াতো এবং শিশুরা রাস্তার ধূলোয় বড় হতো। এখানে পৌরসভা থেকে হয় কোনো কাজ করা হয়নি নয় বাদ দিয়ে গেছে, যদিও পৌরসভা জীর্ণ কুটিরে বসবাসকারী মানুষগুলোকে শহরের ময়লা আবর্জনা পরিস্কার করার জন্য নিযুক্ত করেছিলো। তাদেরকে মাসে মাথাপিছু দশ টাকা পারিশ্রমিক দেওয়া হতো। আর তারা যেহেতু চার পাঁচটা পরিবারে কাজ করতো, সেহেতু প্রত্যেকে মালগুদির মানে বেশ টাকা কামাতো। তারা কুটিরে থাকতো না বললেই চলে। পৌর ভবনের চারপাশে কিংবা নিকটবর্তী সরকারি মদের দোকানে তাদের সবটুকু সময় কাটতো। এতে তাদের কামাইয়ের সবটুকু টাকা খোঁয়া যেতো। এ মানুষগুলো তাদের আয়ের দশ ভাগেরও কম টাকা নাওয়া-খাওয়ার পেছনে ব্যয় করতো। বেঁচে থাকার তাগিদে অবসর সময়ে ভিক্ষাবৃত্তির উপর সব সময় নির্ভরশীল ছিলো। গভীর রাতে মালগুদির সব আধা অন্ধকার রাস্তায় তাদের ভিক্ষা চাওয়ার চেঁচামেচি শোনা যেতো। তাদের আগমনে জ্বালাতনকারী শিশুদের নীরব করে দেওয়া হতো। এদের সম্পত্তিও নাই বললে চলে; কোনো গরু কিংবা বাছুর মারা গেলে, মৃতদেহটা দূরে ফেলে দেওয়ার জন্য এদেরকে ডাকা হতো। আর তখন নদী তীরের কলোনী উজ্জ্বল রং ধারণ করতো; কারণ মৃত পশুর মাংসে তারা ভোজ খেয়ে এর চামড়াটা বিকিয়ে টাকা কামাতো। সংস্কারপন্থীরা এতে বেশ উষ্মা ও শঙ্কা প্রকাশ করেছিলেন, কিন্তু তেমন কিছুই করেননি। এর কারণ ছিলো অস্পৃশ্য জাত হিসেবে এরা নালাপ্পা কুঞ্জের ওপারে শহবের সীমানা ছাড়িয়ে যেখানে কেউ যেতো না, সেখানে বাস করতো। আর নদীর ভাটির দিককার একটি অংশ এরা ব্যবহার করতো। মালগুদি পরিদর্শনকালে গান্ধী থাকার জন্য যে শিবিরটি নির্বাচন করেছিলেন সেই শিবিরে বসবাসকারী মানুষদের জীবনের পটভূমি এমনই ছিলো। পৌরসভার চেয়ারম্যান, নাতেশ সাহেবের কাছে এ ব্যাপারটা বজ্রপাতের মতো ছিলো, যিনি গান্ধীকে অভ্যর্থনা করার জন্য অভিজাত লাওলি এক্সটেনশনের প্রাসাদের মতো বাড়ি, নীল বাগ কয়েক সপ্তাহ ধরে প্রস্তুত করছিলেন। মহাত্মাজীর নিমন্ত্রাতা তিনি কেন একা হবেন সে ব্যাপারে তার যুক্তি অখন্ডণীয় মনে হলো: ‘এ পর্যন্ত বিল্ডিং, বাগানে দুই লাখ টাকা খরচ হয়েছে; আর শুধু চত্বরেই গেছে পচিঁশ হাজার টাকা। আমি কী জন্য এটা করেছি বলে আপনাদের মনে হয়? আমি একজন সাধারণ মানুষ, স্যার, আমার চাহিদাও খুব সাধারণ। বিলাসিতা আমি চাই না। আমি কুটিরেও থাকতে পারি, কিন্তু যে জন্য এ বাড়ি আমি এভাবে নির্মাণ করেছি তা হলো যাতে আমার জীবদ্দশায় একবার হলেও মহাত্মাজীর মতো মহান ব্যক্তিকে আমি অভ্যর্থনা জানাতে পারি। এ শহরে যখনই তিনি আসবেন, শুধু এ বাড়িতেই তিনি আরামদায়কভাবে থাকতে পারেন। গর্ব না করে একটা কথা বলি, মালগুদিতে এটাই হচ্ছে সবচেয়ে বড় ও সুসজ্জিত বাড়ি। আর আমাদের মানে মালগুদির মানুষদের একটা দায়িত্ব আছে তাকে যথাসাধ্য প্রদান করার। তা হলে ভাবুন কী করে আমরা তাকে নোংরা জায়গায় থাকতে দিতে পারি?’ তার বক্তৃতায় অভ্যর্থনা কমিটি হাততালি দিলো। জেলা প্রধান ডিসট্রিক্ট কালেকটর ও তাঁর নিচের কর্মকর্তা পুলিশের ডিসট্রিক্ট সুপারিন্টেন্ডেট পদাধিকার বলে উপস্থিত ছিলেন। ভিন্নমত পোষণকারী একটা কণ্ঠস্বর ভেসে এলো, ‘মহাত্মাজীকে সার্কিট হাউস দিলেন না কেন?’ শহরের প্রান্তে সার্কিট হাউসটি ছিলো ট্রাঙ্ক রোডে এক একর জমির উপর ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানীর পুরানো এক বিল্ডিং। অবরোধের হাত থেকে ত্রিচিনোপলিকে মুক্ত করার লক্ষে রবার্ট ক্লাইভের এখানে বিরতি নেওয়ার কথা ছিলো। এই ভবন নিয়ে মালগুদির নাগরিকরা গর্ব বোধ করতো এবং অন্য কেউ এ শহরে এলে তাকে দেখানোর সুযোগ কখনো হাতছাড়া করতো না। এ পথে আসা বিশিষ্ট পরিদর্শকবর্গ এ বাড়িতে থাকতেন। সেখানে তাদেরকে আপ্যায়ন করতে পারা গভর্নরদের জন্য সম্মানজনক বিষয় ছিলো। এই প্রত্যন্ত অঞ্চলেও তাদের আয়োজনে উজ্জ্বল, পরিচ্ছন্ন বাথরুমসহ সুযোগ-সুবিধার কোনো কমতি ছিলো না। সামনের দিকটায় কাচবিশিষ্ট বে রূমের বদৌলতে এটি গ্লাস হাউস নামেও পরিচিত ছিলো যেখান থেকে বিশিষ্ট অতিথিবৃন্দ সে যুগে রাতের বেলায় ভবনটির কাছে ঘুরে বেড়ানো বন্য প্রাণীদের দেখতে পেতো। অভ্যর্থনা কমিটির ভিন্নমত পোষণকারী কণ্ঠস্বর থেকে শোনা গেলো, ‘সার্কিট হাউস পাওয়া কি শুধু শাসক গোষ্ঠীরই অধিকার? আমাদের মহাত্মাজী কি এর যোগ্য নন?’ এই সম্মানজনক ব্রিটিশ ভবনের জিম্মাদার কালেকটর এ প্রশ্নের জবাবে দাঁড়িয়ে সেই কণ্ঠস্বরের লোকটিকে মৃদু ভৎর্সনা করলেন: ‘এই মুহুর্তে অবান্তর কথা বলা শোভন নয়: আমরা যদি সার্কিট হাউসকে অনুপযোগী বিবেচনা করে থাকি, তা এই কারণে যে গান্ধী সাহেবকে সাদরে বরণ করার জন্য এটা ঠিকঠাক করার সময় আমাদের নেই।’ মহাত্মা না বলে গান্ধী সাহেব বলাটা তার জন্য পেশাগত সম্মানের বিষয় ছিলো। কালেকটর হিসেবে তিনি যদি পুরো সভাটা শেষ না করতেন এবং সকল সদস্যকে ভারতের প্রতিরক্ষা আইনে গরাদের পিছনে না রাখতেন, তাহলে অনেকেই প্রতিবাদ জানিয়ে ওয়াক আউট করতো। কিন্তু তারা শান্তি বজায় রেখেছিলো এবং তিনি সেটা স্পষ্ট বুঝতে পেরেছিলেন। ‘গান্ধী সাহেবের আসাটা আকস্মিক সিদ্ধান্ত হওয়ায় তাঁর জন্য ভবনটি স্বাভাবিকভাবেই আমরা প্রস্তুত রাখতে পারিনি। আমি এমনটা বলতে পারি আমাদের চেয়ারম্যানের বাড়িটা এ উদ্দেশ্য সিদ্ধ করার জন্য উপযুক্ত ছিলো। এতো দয়াপরবশ হয়ে তিনি আমাদের কথা রেখেছেন এ জন্য তার কাছে আমরা অবশ্যই কৃতজ্ঞ থাকবো।’ ‘আর মহাত্মাজীর অবস্থানের জন্য আমার বাড়ি ছেড়ে আমি গ্লাস হাউসে উঠার ব্যবস্থা করছি।’ এটাই সিদ্ধান্ত মনে হলো। আর তার দলের লোকেরা জোরে করতালি দিলো। দশ-এক ভোটে সিদ্ধান্ত হলো যে মহাত্মাজী নীল বাগেই থাকবেন । এরপর চেয়ারম্যান ভারী, গুরুগম্ভীর দৃষ্টি নিয়ে সভা ত্যাগ করলেন। তিনি গান্ধীজীর সেক্রেটারিকে চিঠি লিখলেন এবং পরবর্তী সভায় গৃহীত জবাবটি পাঠ করলেন: ‘মহাত্মা গান্ধী ইচ্ছা পোষণ করেছেন যে তার থাকা-খাওয়ার ব্যাপারে বিশেষ কোনো কষ্ট স্বীকার না করা হোক, আর তিনি সেখানে সশরীরে উপস্থিত না হওয়া পর্যন্ত এ বিষয়টি বাদ থাক।’ পরিষদে চিঠির অর্থ নিয়ে বাক-বিতণ্ডা শেষে স্থির করা হলো যে চিঠির মানে ছিলো যে মহাত্মা যদিও কোনো কিছুতে প্রতিশ্র“তিবদ্ধ হতে অনিচ্ছুক ছিলেন, তবুও তিনি নীল বাগে থাকতে অস্বীকৃতি জানাবেন না। ভিন্নমত পোষণকারী কণ্ঠস্বরটি বললো, ‘তিনি যে অন্য কিছু বোঝাচ্ছেন না তা আপনারা কীভাবে জানেন?’ কিন্তু কালেকটরের মৃদু ভৎর্সনায় কণ্ঠস্বরটি নিশ্চুপ হয়ে গেলো। পরিশেষে অর্থোদ্ধার করা হলো এমন, ‘আমি মহাত্মাজীর মনকে বুঝি, যদি এটা কষ্টেরই বিষয় হয়, তবে তিনি কাউকে কষ্ট দিতে চান না।’ ‘তিনি হয়তো জানেন না এতে আমাদের আদৌ কোনো সমস্যা নেই।’ ‘বিলকুল, বিলকুল, ’ আরেক ভবিষ্যৎবক্তা বললেন। আর তারা সকলে এ ব্যাখ্যায় পুরোপুরি সন্তুষ্ট হলো। আরো একজন যিনি চেয়ারম্যানের কাছে নিজের সম্পর্কে ভাল ধারণা সৃষ্টি করতে চেয়েছিলেন, আরেকটি তোষামোদজনক তুলনা টানলেন: ‘আমরা যেন ভুলে না যাই যে মহাত্মাজী দিল্লী ও কলকাতায় বিরলা হাউসে থাকার ব্যবস্থা করেছেন। আমি নিশ্চিত করে বলতে পারি আমাদের চেয়ারম্যান প্রাসাদসম যে ভবন বানিয়েছেন সেখানে থাকতে তিনি কোনো আপত্তি জানাবেন না।’ ভিন্নমত পোষণকারী কণ্ঠে ভেসে এলো, ‘যদি আমরা তাকে ঠিকমতো বুঝে থাকি, তাহলে লিখিত আকারে জিজ্ঞেস করে তাঁর অনুমোদন নেওয়া আমাদের জন্য কি ভাল কাজ হবে না?’ এই কণ্ঠে পুরো কথাটি বিরক্তিসূচক হিস হিস শব্দ করে শেষ হতে দেওয়া হলো না। পুলিশের ডিস্ট্রিক্ট সুপারিন্টেন্ডেট ধীরে ধীরে বললেন, ‘নিরাপত্তার ব্যবস্থা করতে গেলেও যে কোনো জায়গা ঝামেলাপূর্ণ হবে।’ এই ভাবাবেগের দরুণ তাঁর উপরস্থ পদে আসীন ডিস্ট্রিক্ট কালেকটরের কাছ থেকে প্রশংসাসূচক সম্মতি লাভ করলেন। গান্ধীজী পৌঁছালে পর উৎসবপূর্ণভাবে তাকে অভ্যর্থনা জানানো হলো। মালগুদির রুই-কাতলা ও স্থানীয় অভিজাত সম্প্রদায়কে পৌরসভার চেয়ারম্যান এক এক করে পরিচয় করিয়ে দিলেন। পুলিশ জনতাকে নিয়ন্ত্রণ করতে গেলো। জনতা তখন বিরামহীনভাবে চিৎকার করছিলো, ‘মহাত্মা গান্ধীর জয় হোক।’ রেলওয়ে স্টেশনের বাইরে স্থাপত্য-অলংকারসহ জাঁকালোভাবে নির্মিত খিলান পথে যখন চেয়ারম্যান তাঁর স্বাগত ভাষণ পাঠ করলেন, তখন তাঁর কথা শোনা না যাওয়ায় তিনি হতাশ হলেন। স্থানীয় এক সাংবাদিকের সহায়তায় ভাষণটি তৈরি করতে তাকে গোটা এক সপ্তাহ ব্যয় করতে হয়েছিলো। এ ভাষণে তিনি তাঁর হয় দেশপ্রেম নয় মালগুদি দেশের জীবনে যে বিশিষ্ট স্থান অধিকার করে আছে তা যোগ করে দিয়েছিলেন। ভাষণটি মুদ্রণে যাওয়ার আগে কালেকটর কষ্ট করে একবার পড়েছিলেন এটা নিশ্চিত করতে যে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যকে অবমাননা করা, যুদ্ধের চেষ্টাকে বাধাগ্রস্ত করা, আর কোনোভাবেই সামরিক গোপনীয়তার সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করার মতো কিছু নেই । কয়েকটা জায়গায় অবশ্য তিনি কাটছাঁট করেছিলেন: যেখানে চেয়ারম্যান মালগুদিকে সুইজারল্যান্ডের সাথে তুলনা করেছিলেন (এটা বাদ দেওয়ার কারণ ছিলো তাঁর ধারণায় এতে নিরপেক্ষ রাষ্ট্র বিব্রত হতো); যেখানে মোজার ব্যবসার উল্লেখ ছিলো (কেননা তাঁর মতে এতে চোখে পড়ার মতো চেয়ারম্যানের পণ্যের বিজ্ঞাপন ছিলো এবং কোনো অবস্থাতেই তিনি চাননি শত্র“র প্লেন এসে খুঁজে বেড়াক এই ভেবে যে এটি যুদ্ধ সরঞ্জামের ছদ্মবেশধারী একটি প্রতিষ্ঠান); আর যেখানে রাজনৈতিক ক্ষেত্রে গান্ধীজীর কাজের আভাস ছিলো। সামাজিক সংস্কারক হিসেবে তাঁর চিত্রটি অক্ষুন্ন রাখা হয়েছিলো, এমনকি বর্ধিত করা হয়েছিলো; যিনিই ভাষণটি পড়লেন, তিনিই এই সিদ্ধান্তে উপনীত হলেন যে রাজনীতিই ছিলো শেষ জিনিস যাতে গান্ধীজী আগ্রহী ছিলেন। যাই হোক, অভ্যর্থনার কথা বিবেচনা করে কালেকটর গোটা বিষয়টাকে যেমন আছে তেমনই রেখে দিতে পারতেন, যেহেতু ‘মহাত্মাজীর জয় হোক’ এবং ‘পৌরসভার চেয়ারম্যান নিপাত যাক’ চিৎকারে ভাষণটি শোনা গেলো না। জনতা এতো গোলমাল করছিলো যে মহাত্মাজীকে দু’একবার প্রতিবাদ করতে হয়েছিলো। তিনি হাত উপরে তুললে, জনতা সরে গিয়ে তাঁর কথা শোনার জন্য অপেক্ষা করছিলো। তিনি শান্তভাবে বললেন, ‘এটা স্রেফ শৃঙ্খলার অভাব, যার আমি প্রশংসা করতে পারছি না। আপনাদের চেয়ারম্যান কিছু একটা পড়ছেন, আর আমি ভদ্রতাবশত তিনি যা বলছেন তা শুনতে বাধ্য। আপনাদের সবাইকে অবশ্যই শান্ত থাকতে হবে। তাকে পড়তে দিন।’ ‘না, ’ জনতা চিৎকার করে উঠলো। ‘আমরা মহাত্মাজীর কথা শুনতে চাই, চেয়ারম্যানের কথা নয়।’ ‘হ্যাঁ, ’ মহাত্মাজী জবাব দিলেন। ‘আপনারা শীঘ্রই এক ঘন্টার মধ্যে সরায্যু নদীর তীরে আমার কথা শুনবেন। এভাবেই কর্মসূচী সাজানো আছে।’ ‘কে সাজিয়েছেন?’ ‘কে সাজিয়েছেন, সেটা বড় কথা নয়। আমার এতে অনুমোদন আছে। সেভাবেই হচ্ছে। এক ঘন্টার মধ্যেই সরায্যুর চরে। আপনাদের চেয়ারম্যান তাঁর সদয় ভাষণের কোনো উত্তর ছাড়াই আমাকে অব্যাহতি দিতে সম্মত হয়েছেন। তাকে যা কিছু বলতে হয় তার সবকিছু আপনাদের শুনতে হবে, কেননা আমার খুবই ইচ্ছে হচ্ছে...’ এতে ক্ষিপ্ত জনতা কিছুটা শান্ত হলো এবং চেয়ারম্যান তাঁর ভাষণ পড়া চালিয়ে গেলেন, যদিও এমন বাক্য বিনিময়ে তাকে ভীত-সন্ত্রস্ত দেখাচ্ছিলো। কালেকটরকে অসন্তুষ্ট ও অস্থির দেখাচ্ছিলো এই বোধে যে ভিন্নমতের সদস্যটি যিনি সম্ভবত জনতার সব গোলমালের মূলে, তাকে হাজতে নেওয়া উচিৎ ছিলো। তিনি ঝুঁকে গিয়ে চেয়ারম্যানকে কানে কানে বললেন, ‘কিছু মনে করবেন না, ধীরে ধীরে পড়ে যান। তাড়াহুড়ো করে পড়ার দরকার নেই।’ কিন্তু চেয়ারম্যান মনে মনে বলতে লাগলেন, তাঁর পড়া শেষ হয় না কেন। জনতা আবার বিক্ষোভে ফেটে পড়ার আগে ভাষণটি শেষ করা নিয়ে তিনি উদ্বিগ্ন ছিলেন। তিনি শেষ করতে পারলেন না, যেহেতু তৎক্ষণাৎ জনতা বিপুল গর্জনে ফেটে পড়লো। এতে পুলিশ সুপারিন্টেন্ডেন্ট দ্রুত গিয়ে ব্যাপারটা কী তা দেখতে বাধ্য হলেন। এখন কোনো ব্যবস্থা নিতে গিলে অনেক বিবেচনা করে নিতে হবে, কেননা গান্ধী সব ধরনের পুলিশি ব্যবস্থাকে অপছন্দ করেন। স্থাপত্য-অলংকার নির্মিত খিলান পথ ও ‘গান্ধীর জয় হোক’ অনুরণনের মধ্য দিয়ে গান্ধী চেয়ারম্যানের রেখে যাওয়া বিশাল বেন্টলিতে গিয়ে চড়লেন। লোকজন সমস্ত পথের গাছে গাছে ও বাড়ির ছাদে-ছাদে বসে গান্ধীজী পথ অতিক্রম করায় করতালি দিলো। বাজার রোড থেকে শুরু করে বিভিন্ন রাস্তা পুলিশ ঘেরাও করে রেখেছিলো। তাই ছোট্ট মালগুদি স্টেশন থেকে লাওলি এক্সটেনশন পর্যন্ত পুরো পথ পরিস্কার ছিলো। সর্বত্র পুলিশ ছিলো, যদিও পুলিশের ডিস্ট্রিক্ট সুপারিন্টেন্ডেন্টের কাছে মনে হলো নিরাপত্তার ব্যবস্থা সন্তোষজনক নয়। সব দোকান-পাট বন্ধ ছিলো, আর সব স্কুল ও গোটা শহর এ ঘটনা উদযাপন করছিলো। গান্ধীজীর কথা ভেবে স্কুলের ছেলেমেয়েরা আনন্দ বোধ করছিলো। অফিসগামীরা খুশী ছিলো, এমনকি ব্যাংকও বন্ধ রাখা হয়েছিলো। তারা সবাই ঘন্টার পর ঘন্টা রোদে অপেক্ষা করে দেখলো যে গান্ধীজী বেন্টলিতে যাচ্ছেন, তাঁর সাদা কাপড় ও ফর্সা দেহে দ্যূতি ছড়াচ্ছে, আর দু’হাতের তালু এক করে নমস্কার জানাচ্ছেন। বাকিংহাম প্যালেসের গেটের অনুকরণে ঢালাই লোহা দিয়ে নির্মিত নীল বাগের গেটগুলো। তারা সেখানে পৌঁছালে সামনের আসনে বসা চেয়ারম্যান অপেক্ষা করেছিলেন তাকে জিজ্ঞেস করা হোক: ‘এ বাড়িটা কার?’ কিন্তু গান্ধীজী কোনো কিছু খেয়াল করলেন বলে মনে হলো না। ছাঁটা ঝোপের বেড়া, ফুলের চমৎকার সৌরভ ও উভয় পাশে প্রসারিত চত্বর বিশিষ্ট পথে তারা চলে গেলেন। আর গান্ধীজী অসতর্কতাবশত কোনো মন্তব্য করে ফেললে ধরে ফেলবেন এই আশায় তিনি কান খাঁড়া করে রাখলেন। কিন্তু তখনো গান্ধীজী কিছু বললেন না। তাঁর সেক্রেটারির দেওয়া কিছু কাগজপত্র দেখা নিয়ে ব্যস্ত ছিলেন। গান্ধীজী যে আদতেই গেটের মধ্যে ছিলো এ ভাবনায় চেয়ারম্যানের সর্বশরীরে আনন্দের শিহরণ বয়ে গেলো। তিনি সবকিছু সুন্দরভাবে আয়োজন করেছিলেন। কয়েক দিনের জন্য তাঁর নিজের সব জিনিস সার্কিট হাউসে পাঠিয়ে দিয়েছিলেন (এটি কালেকটর তাকে দিয়েছিলেন এই শর্তে যে তিনি এর দেয়ালগুলো চুনকালি করে এর কাঠের দরজা ও ঝাপগুলো আবার রঙ করবেন)। এই আত্মত্যাগের ভাবনায় তিনি শিহরিত হলেন। কিছু বছর আগে তিনি নিজের শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত কয়েকটি কক্ষ ত্যাগ করা এবং সার্কিট হাউসে নিজের ইচ্ছায় থাকার কথা অন্য কারো জন্য কখনো ভাবতে পারেননি। চেয়ারম্যান এখন তার সমস্ত বাড়িটা গান্ধীজীর কাছে সমর্পণ করলেন। তাঁর মাননীয় অতিথি ও দলের (সাদা খদ্দের পোশাকে নারী-পুরুষের বিবিধ সমাবেশ, যারা সামর্থ্যমতো মহাত্মাজীকে পরিচর্যা করতো এবং যেখানে সবাইকে একই রকম দেখাতো, আর যাদের নাম তিনি কখনো স্পষ্টভাবে জানেন না) হস্তক্ষেপ ছাড়া তাঁর নিজের পরিবারের জায়গা হওয়ার জন্য নিঃসন্দেহে এটি বড় জায়গা ছিলো। কিন্তু তিনি আর থাকতে চাননি; কেননা এমন একজন গণ্যমান্য ব্যক্তির সাথে একই ছাদের নিচে থাকা এবং তাঁর কাজে দেশপ্রেমমূলক উৎসর্গ বোধ থেকে একটুখানি গ্রহণ করা অসম্ভব মনে হলো। কাজেই তিনি সার্কিট হাউসে স্থানান্তরিত হওয়ার জন্য স্থির করলেন। তাঁর বাড়িতে তিনি কিছু পরিবর্তন সাধন করেছিলেন, যেমন- খদ্দের কাপড়ের পরিবর্তন করে জমকালো ছিটকাপড় লাগিয়েছিলেন, যার ফলে দরজার প্রবেশ পথ ও জানালাগুলো অলংকৃত হয়েছিলো, এবং শিকারী অভিজাত ব্যক্তি, অজানা দেবতা ও রাজাদের ছবিগুলো নামিয়ে রেখেছিলেন। এমনকি জর্জ ভী’র বিয়ের ছবি সরিয়ে সেখানে মওলানা আজাদ, জওহরলাল নেহেরু, সরোজিনী নাইডু, মতিলাল নেহেরু, সি. রাজাগোপালচারী ও অ্যানি বেসান্টের ছবি লাগিয়ে দিয়েছিলেন। তিনি তাঁর ম্যানেজারকে একটা নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে ‘আমাদের জাতীয় নেতাদের সহজলভ্য সব ছবি’ যোগাড় করতে আদেশ করেছিলেন। এ পাইকারী অর্ডার সন্তোষজনকভাবে পালন করা হলো। আর অন্য সব ছবি নামিয়ে ভূ-গর্ভস্থ কক্ষে পাঠানো হলো। গান্ধীর ভগবদ গীতায় পক্ষপাত ভালরূপে জানা থাকায় ভগবদ গীতার কৃষ্ণ অর্জুনের কথোপকথনরত একটি ছবিও তিনি সুবিবেচকের মতো সংগ্রহ করেছিলেন। নমুনা হিসেবে কয়েকটি চরকা তিনি গোবরাট ও আরো কয়েকটি জায়গায় রেখেছিলেন। এতো অতিরঞ্জনে সিনেমার কোনো শোভাকারও পরিবেশ সৃষ্টি করতে চাননি। এই ইফেক্ট আনার জন্য তিনি সারা পূর্ব রাত্রি কাজ করেছিলেন। আর নিজের জন্য একটি খদ্দেরের জিব্বা ও সাদা একটি গান্ধী টুপি, স্ত্রীর জন্য সাদা খদ্দের শাড়ি এবং ছেলের জন্য আগাগোড়া খদ্দেরও যোগাড় করেছিলেন। ছয় বছর বয়সী পুত্রের লম্বা মাথায় সাদা খদ্দেরের টুপি মানানসই করতে তিনি শহরে গাড়ি নিয়ে প্রায় একশ মাইল সন্ধান করেছিলেন এবং তাঁর শার্টের সামনে তিনরঙা পতাকা ও চরকার সূচকর্ম করে নিয়েছিলেন। প্রধান ভবনের কাছাকাছি এলে এখন তাঁর আশা ছিলো যে স্ত্রী ও পুত্র গান্ধীজীর সাথে সাক্ষাৎ করতে সঠিক পোশাক-আশাকে হাজির হবে। আশা ছিলো তাঁর স্ত্রীর কানেরই শুধু নয় পুত্রের কানেরও হীরার অলংকার খুলে রেখে আসার মতো সুবোধ স্ত্রীর থেকে থাকবে। এ ব্যাপারে তাদেরকে সাবধান করতে তিনি ভুলে গিয়েছিলেন। বাড়িটির সাজানো বারান্দায় যে মুহুর্তে গাড়িটা এসে থামলো, চেয়ারম্যান লাফ দিয়ে নেমে দরজাটি খুলে ধরে মহাত্মাজীকে নামতে সাহায্য করলেন। ‘আমার এই ক্ষুদ্র আবাসস্থলে আপনাকে স্বাগতম, মহামান্য স্যার,’ সঙ্গতভাবে কথা না বলতে পেরে তিনি বিভ্রান্ত হয়ে বললেন। মহাত্মাজী গাড়ি থেকে নেমে বাড়িটির দিকে তাকালেন। ‘এটা আপনার বাড়ি?’ তিনি জিজ্ঞেস করলেন। ‘জ্বী, স্যার, ভগবানের অসীম কৃপায় চার বছর আগে এটা আমি নির্মাণ করেছি।’ শুষ্ক কণ্ঠে চেয়ারম্যান বললেন। তিনি গান্ধীকে উপরের বারান্দায় নিয়ে গেলেন। খদ্দের মুদ্রিত কাপড়ে ঢেকে বারান্দায় তিনি একটি ডিভান রেখে দিয়েছিলেন। এর উপর গান্ধীকে বসিয়ে দিয়ে তাঁর সেক্রেটারিকে কানে কানে জিজ্ঞেস করলেন, ‘মহাত্মাজীকে কি এক গ্লাস কমলার রস দিতে পারি? কমলাগুলো মেমপিতে আমার নিজের এলাকা থেকে আনা।’ কিছু সংখ্যক পরিদর্শক ও বিভিন্ন ধরনের লোকজন আসছিলো আর যাচ্ছিলো। চেয়ারম্যানের মনে হলো যে মহাত্মাজীর উপস্থিতি বাড়ির দেয়ালগুলোকে ভূ-পাতিত করার ইফেক্ট সৃষ্টি করে গণ জায়গার রূপ দিয়েছে। কিন্তু সেখানে মহান ব্যক্তিকে রাখার জন্য এভাবেই মূল্য দিতে হলো। লোকজন চত্বরে উবু হয়ে বসেছিলো এবং চেয়ারম্যান অসহায়ভাবে দেখলেন যে পৌরসভার তদারককারী দিয়ে দেখাশুনা করা তাঁর বর্ষজীবী বাগানের ফুলগুলো কেউ কেউ ছিঁড়ছিলো। গান্ধী তাঁর দিকে ঘুরে জিজ্ঞেস করলেন: ‘আপনি কী বলছিলেন?’ তাঁর সেক্রেটারি তাকে কমলা খাওয়ার ব্যাপারে জানালো। গান্ধী বললেন: ‘হ্যাঁ, দিতে পারেন। আপনার নিজের বাগানের কমলা দেখে আমি খুশি হবো।’ চেয়ারম্যান উত্তেজনার সাথে দৌড়ে গিয়ে বড় একটা ট্রেতে একই ধরনের সোনালী কমলা আনলেন। তিনি হাঁপাচ্ছিলেন। আত্মদানে তিনি এতো দূর গিয়েছিলেন যে তাঁর পরিচারকদের কাছ থেকে স্বাভাবিক সেবা তিনি পাননি। মহাত্মাজীর সামনে তিনি ট্রেটি রেখে দিলেন। ‘মহান ব্যক্তির কাছে এ আমার ক্ষুদ্র নিবেদন: মেমপি পাহাড়ে আমার নিজের ফলেব বাগান থেকে এগুলো আনা,’ তিনি বললেন । ‘আজ সকালেই পাড়া হয়েছে।’ এরপর জিজ্ঞেস করলেন, ‘আপনাকে এক গ্লাস কমলার রস দেওয়ার সম্মান থেকে আমাকে কি বঞ্চিত করবেন?’ সারাদিন আপনার উপর কী ধকলটাই না গেছে!’ এখন কোনোকিছু খাওয়ার সময় তাঁর নয় এই ব্যাখ্যায় মহাত্মা অস্বীকৃতি জানালেন। একটা ফল নিয়ে ধীরে ধীরে আঙ্গুলের মধ্যে ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে দেখে প্রশংসা করলেন। চেয়ারম্যান এমন খুশি বোধ করলেন যেন তাকেই খুঁটে খুঁটে দেখে প্রশংসা করা হয়েছিলো। জনতার এক প্রান্তে দাঁড়িয়ে মহাত্মাজী ছোট্ট একটি ছেলেকে লক্ষ করে তাকে ইঙ্গিতে কাছে আসতে বললেন। ছেলেটি ইতস্তত করলে মহাত্মাজী হিন্দিতে বললেন, ‘আব, আব---’। এতে ছেলেটির মনে কোনো অভিঘাত সৃষ্টি না হলে তিনি দেশের এ অঞ্চলের যে দু’একটা তামিল শব্দ শিখেছিলেন, তাতে তাকে বললেন, ‘ইঙ্গে বা ’। অন্যরা ছেলেটিকে সামনে ঠেলে দিলে সে থেমে থেমে এলো। গান্ধী তাঁর ডিভানে তাকে বসতে বলে একটা কমলা দিলেন। এটা সিগন্যালের কাজ করলো। বর্তমানে ডিভানটি শিশুদের দিয়ে ভরে গেলো। ট্রেটি খালি হলে মহাত্মা চেয়ারম্যানকে জিজ্ঞেস করলেন: ‘আরো আছে?’ চেয়ারম্যান ভেতরে গিয়ে ঝুড়িতে করে আরো কিছু সরবরাহ করলেন। সবগুলো শিশু তাদের রিজার্ভ সাবাড় করে হৈ হুল্লোড় শুরু করলো, আর শীঘ্রই ঝুড়িটা আবার খালি হয়ে গেলো। ‘গাড়িতে কিছু ফুল ও মালা আছে, ’ গান্ধী তাঁর সেক্রেটারির কানে কানে বললেন। এগুলো বিভিন্ন সংস্থা তাকে সারা পথ ধরে তাঁর আসা উপলক্ষে উপহার দিয়েছিলো। গোলাপ ও জুঁই ফুলের সুরভিতে জায়গাটি ভরে গেলো। ফুলগুলো তিনি সমাবেশে আসা সকল ছোট্ট মেয়েদের মাঝে বিতরণ করলেন । উৎসবটি যে শিশুদের পার্টিতে রূপ নিচ্ছিলো তা ভেবে চেয়ারম্যান হতাশা বোধ করলেন। তাঁর আশা ছিলো যে কমলা ও ফুল পাওয়ার পর শিশুরা চলে যাবে, কিন্তু তাদেরকে তখনো সেখানে দেখতে পেলেন। ‘আমার মনে হয়, ওরা এখন আপেলের জন্য অপেক্ষা করছে!’ তিক্তভাবে ভেবে দেখলেন তিনি। গান্ধী পুরোদমে বিশ্রাম নিয়েছিলেন। তাঁর সেক্রেটারি তাকে বলছিলো: ‘পনের মিনিটের মধ্যে ---- থেকে প্রতিনিধিবর্গ এখানে হাজির হবে, আর তারপর----।’ একটা ইনগেজমেন্টের প্যাড থেকে তিনি পড়ছিলেন। চেয়ারম্যান দুঃখ প্রকাশ করলেন যে পুলিশের ডিস্ট্রিক্ট সুপারিন্টেডেন্ট ও কালেকটর উভয়কেই তাঁর বাকিংহাম প্যালেস পর্যন্ত অফিশিয়াল সৌজন্য হিসেবে শোভাযাত্রায় এসে ফিরে যেতে হয়েছিলো: তারা যদি এখন এখানে থাকতেন, তাহলে জনতাকে সামলে নিতে পারতেন। জনতা সারারাত থেকে যাওয়ার প্রস্তাব করবে কিনা এ বাস্তব দুশ্চিন্তা তাকে কিছুক্ষণের জন্য পেয়ে বসলো। কিন্তু তাঁর এ সমস্যা অপ্রত্যাশিতভাবে সমাধান হয়ে গেলো। মহাত্মাজী একটা শিশুকে অন্যদের থেকে আলাদা দাঁড়িয়ে থাকতে দেখলেন--- কালো রঙের ছোট একটি বালক যার পেটটি বেরিয়ে আছে, আর সারা শরীর জুড়ে পরিত্যক্ত, বয়স্কদের পরা, ফুঁটাসহ একটি অন্তর্বাস যা তার পায়ের গোঁড়ালি অবধি ছিলো তা ছাড়া কিছুই নেই। বাকিদের থেকে দূরে জনতার একেবারে এক প্রান্তে বালকটি দাঁড়িয়ে ছিলো। তার মুখমন্ডল কাদায় ঢাকা ছিলো; পাগুলো ছিলো নোংরা। সে তার হাতের আঙ্গুলগুলো মুখে গুঁজে দিয়ে বারান্দার চলমান দৃশ্য আগ্রহভরে দেখছিলো । বিস্ময় ও আকাঙ্খায় তার চোখ দুটো স্ফীত হয়ে ছিলো। কাছে আসতে তার সাহস হয়নি, যদিও কমলাগুলো তাকে টানছিলো। সে ভীড়ের মধ্যে একটু রাস্তা বের করার চেষ্টা করছিলো। মহাত্মার চোখ জনতার উপর দিয়ে ঘুরে এই বালকটির উপর নিবদ্ধ হলো--- তাঁর দৃষ্টি অনুসরণ করে চেয়ারম্যান হতভম্ব হলেন। তাঁর অসস্থি হতে লাগলো। মহাত্মাজী ঈশারায় ছোট্ট বালকটিকে ডাকলেন । তাঁর একজন গিয়ে বালকটিকে নিয়ে এলো। চেয়ারম্যানের রক্ত টগবগ করে উঠলো। মানুষের অবশ্যই গরীবদের পছন্দ করতে হবে, কিন্তু এমন নোংরা, অস্পৃশ্য একটা বালককে এনে কেন তাকে এতো গুরুত্বপূর্ণ করা হচ্ছে? কিছুক্ষণের জন্য তিনি মহাত্মাজীকে নিয়েই একটু বিরক্তি বোধ করলেন, কিন্তু শীঘ্রই একে পাপপূর্ণ আবেগ হিসেবে দমন করলেন। বিক্ষুব্ধহীনভাবে তাঁর চারপাশের ঘটনা পর্যবেক্ষণ করার জন্য তিনি পরিপার্শ্ব থেকে নিজেকে পর্যাপ্তভাবে বিচ্ছিন্ন করার প্রয়োজন বোধ করলেন। মহাত্মাজী ছোট পথশিশুটিকে তুলে তাঁর পাশে ডিভানে বসালেন। ‘হে প্রভু, দুনিয়ার তাবৎ ময়লা এই শিশুটার গায়ে লেপটে আছে, আর সে ঐ কাশ্মীরি বেড-কভারে তার স্থায়ী ছাপ রেখে যাচ্ছে।’ মহাত্মার আতিথেয়তা গ্রহণ করে বালকটি ডিভানে আরামেই ছিলো। সে মহাত্মার কাছ ঘেঁষে বসলো যখন তিনি জট পাকানো চুলগুলো আঙ্গুল দিয়ে ঠিক করছিলেন, আর তার সাথে ঘনিষ্ট আলাপে মত্ত হলো। চেয়ারম্যান তাদের কথার ধারা বুঝতে পারলেন না। তিনি কাছে এসে শ্রদ্ধাভরে শুনে দেখার চেষ্টা করলেন। এর যে পুরস্কার তিনি পেলেন তা ছিলো মহাত্মাজীর নিজের হাসি। বালকটি বলছিলো: ‘আমার বাবা রাস্তা ঝাঁড়– দেয়।’ ‘বড় ঝাটা দিয়ে না ছোট ঝাটা দিয়ে?’ মহাত্মা জিজ্ঞেস করলেন। বালকটি ব্যাখ্যা করলো, ‘তার ছোট বড় দুই ধরনেরই ঝাটা আছে।’ সে কমলার বিচিগুলো মুখ থেকে থু করে ফেলে দিলো। মহাত্মা যেন কার দিকে ফিরে ব্যাখ্যা করলেন: ‘তার মানে সে পৌরসভারও ঝাড়–দার আবার বাসা-বাডিতেও ময়লা-আবর্জনা পরিস্কার করে। বড় ঝাঁড়–টা পৌরসভার জন্য।’ ‘তোমার বাবা এখন কোথায়?’ ‘বাজারে কাজ করছে। কাজ শেষ হলে আমাকে বাড়ি নিয়ে যাবে।’ ‘আর তুমি এখানে কীভাবে আসতে পারলে?’ ‘রাস্তায় বসে বাবার জন্য অপেক্ষা করছিলাম আর জনতার সাথে চলে এলাম। গেট দিয়ে ঢোকার সময় কেউ আমাকে থামায়নি।’ ‘এই তো খুব চালাক ছেলে, ’ মহাত্মাজী বললেন। ‘তোমাকে দেখে আমার খুব খুশি লাগছে। কিন্তু ঐ বীচিগুলো এখানে সেখানে ফেলা তোমার ঠিক নয়, আসলে তুমি আর কখনো মোটেও এমন করে থু মারবে না। এমন করলে জায়গাটা অপরিস্কার হয়; তাতে অন্যদের সমস্যা হয়। কমলা খাওয়ার সময় অন্যরা তোমাকে যেন মোটেও না দেখে। একসাথে ছয়বার পরিস্কার করলেও জায়গাটা একদম অপরিচ্ছন্ন থাকবে। নিজের বুদ্ধিদীপ্ত মন্তব্যে তিনি সুখের হাসি হাসলেন, আর বালকটিকে বীচিগুলো দিয়ে কী করতে হবে, কীভাবে ছিলতে হবে এবং কমলার বাড়তি অংশের কী করতে হবে তা শিখিয়ে দিলেন। বালকটি আনন্দে হাসলো। আশপাশের সব লোক শ্রদ্ধাপূর্ণ মনোযোগের সহিত এসব লক্ষ করলো। তখন গান্ধী প্রশ্ন করলেন: ‘তুমি কোথায় থাকো?’ বালকটি হাত উপরের দিকে ছুঁড়ে অনেক দূর নির্দেশ করলো: ‘ঐ যে নদীর ধারে...’ ‘তুমি তোমার বাসায় আমায় যেতে দেবে?’ বালকটি ইতস্তত করে বললো, ‘এখন না--- কারণ, কারণ এতো দূরে।’ ‘ও নিয়ে তুমি চিন্তা করো না। তুমি দেখছো না, ঐ ধনী লোকটি আমাকে এখানে একটা মোটর-গাড়ি দিয়েছে। মুহুর্তের মধ্যেই আমি ওখানে যেতে পারি। মোটর গাড়িতে তোমাকেও নিয়ে যেতে পারি যদি তুমি তোমাদের বাড়িটা দেখিয়ে দাও।’ ‘ওটা তো এটার মতো বাড়ি নয়, ’ বালকটি বললো, ‘ বাঁশ না কিসের যেন তৈরী।’ ‘তাই নাকি!’ মহাত্মা বললেন। ‘তাহলে আমার আরো বেশি পছন্দ হবে।’ ওখানটায় আমি খুব সুখে থাকবো।’ যে প্রতিনিধিদল অ্যাপয়েন্টমেন্ট নিয়ে তাঁর সাথে দেখা করতে এসেছিলো তাদের সাথে তিনি অল্প সময় কথা বললেন। তারা চলে গেলে তিনি কিছু নোট করতে বললেন, কিছু নিজে লিখে রাখলেন। এরপর তাঁর কর্মচারীদের তুলে নিয়ে চেয়ারম্যানকে বললেন, ‘চলুন এই ছোট ছেলেটির বাসায় যাই। আমি নিশ্চিত আপনারও ভাল লাগবে।’ ‘এখন? ’ মহাতঙ্কে চেয়ারম্যান জিজ্ঞেস করলেন। তিনি অস্ফুট স্বরে বললেন, ‘আমাদের আগামীকাল গেলে হয় না?’ ‘না, আমি এ শিশুটিকে বাসায় নিয়ে যাবো বলে প্রস্তাব করেছি। তাকে অবশ্যই হতাশ করবো না। আমি ওর বাবাকেও দেখতে চাই, যদি পথে কোথাও তাকে দেখা যায়।’ মহাত্মাজী ছোট বালকটিকে তর্জনী এগিয়ে দিয়ে ধরতে বললেন এবং বারান্দা দিয়ে নামতে লাগলেন। চেয়ারম্যান বেদনার সাথে প্রশ্ন করলেন, ‘আপনি ভেতরে এসে আমার ক্ষুদ্র বাসাটার চারপাশ একবার দেখবেন না?’ ‘এটা কেমন হবে আমি জানি। অবশ্যই খুব জমকালো হবে। ঐ সব বিশাল বিশাল জায়গার মধ্য দিয়ে হাঁটানোর বিরক্তি থেকে আপনি আমার মতো একজন বুড়ো মানুষকে বরং রেহাই দিচ্ছেন না কেন? আমি একজন ক্লান্ত, বৃদ্ধ মানুষ। যাই হোক, এই ছোট্ট মানুষটির বাসায় আমাদের সাথে জলদি এসে পড়–ন। ভাল লেগে গেলে ওখানটায় আমাকে থাকতে দেবেন কিন্তু।’ চেয়ারম্যান অস্ফুট স্বরে বললেন, ‘আমার আশা ছিলো--- ’ কিন্তু গান্ধিজী তাকে হাসি দিয়ে একপাশে রেখে দৃপ্ত পদে যেতে যেতে বললেন: ‘আপনি চট করে আমার সাথেও আসতে পারবেন। কুটিরে এসে আপনাকে আমার সাথে থাকার দাওয়াত দিলাম।’ আর কোনোকিছু বলতে না পেরে চেয়ারম্যান শুধু জবাব দিলেন, ‘ঠিক আছে, স্যার, আসবো।’ মহাত্মার দাওয়াতের উষ্ণতায় চেয়ারম্যান হিসেবে তাঁর সমস্যাদি ও দায়িত্ব-কর্তব্যের কথা তিনি ভুলে গিয়েছিলেন। অন্য কোনো কিছু হলে তিনি ব্যাপারটা ভুলে যেতেন না যে সুইপারদের কলোনিটি শো পিস ছাড়া অন্য যে কোনোকিছু ছিলো। পরে যে পর্যন্ত না কালেকটর তাকে খুঁজে তার ত্র“টির জন্য অভিযুক্ত করে যে সে কী ভুলটাই না করেছিলো। কালেকটর বললেন, ‘আপনার কী একটুও সেন্স নেই, চেয়ারম্যান, গান্ধী সাহেবকে অন্ততপক্ষে দু’ঘন্টা দেরি করাতে পারতেন না, যে সময়ে মানুষজন ঐ ভয়ংকর জায়গাটা ঝাঁড়– দিয়ে পরিস্কার করতে পারতো? আপনিও জানেন, আমিও জানি জায়গাটা কিসের মতো!’ চেয়ারম্যান টু শব্দটি না করে সব সয়ে গেলেন। মহাত্মাজী যখন তার সাথে কথা বলছিলেন তখন তিনি সংকীর্ণ আত্মতৃপ্তির দৃষ্টি নিয়ে তাকিয়ে ছিলেন পরে যে পর্যন্ত না তাঁর স্ত্রী তাকে তাদের না নিয়ে যাওয়ার কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে আক্রমণ করলেন। স্ত্রী ক্রোধান্বিত স্বরে বললেন, ‘তুমি যেভাবে চেয়েছিলে সেভাবে ছেলেটাকে নিয়ে ওখানটায় আমি অপেক্ষা করছিলাম, আর তুমি কিনা চলে গেলে; আমাদের ডাকলেও না!’ ‘তুমি কেন বের হয়ে আসতে পারলে না?’ তিনি স্ত্রীকে নির্বোধের মতো প্রশ্ন করলেন। ‘আমি কীভাবে আসতে পারবো, যখন তুমিই বলেছিলে তোমার ডাকের জন্য আমি অবশ্যই যেন অপেক্ষা করি?’ স্ত্রী ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে বললেন, ‘আমাদের বাড়িতে মহান মানুষটি থাকা সত্ত্বেও তাঁর সামনে যাওয়ার সৌভাগ্যও আমার হলো না। আর বাচ্চাটা--- কী হতাশই না হলো!’ প্রারম্ভিক চমক কাটিয়ে উঠার পর কর্তৃপক্ষ জায়গাটির রূপান্তর সাধনের জন্য সবকিছু করলেন। সবটুকু দুর্গন্ধ রহস্যজনকভাবে মিলিয়ে গেলো; এখানে সেখানে পড়ে থাকা সব আবর্জনা ও পশুপাখির অংশ, আর ছাঁদে শুকোতে দেওয়া মাংস ও চামড়া নাই হয়ে গেলো। পৌরসভা ও অন্যান্য কর্মচারী মিলে সারা রাত পেট্রোল ল্যাম্পের সাহায্যে কাজ করলো: সেখানে আলো এমন একটা বিরল ব্যাপার ছিলো যে শিশুরা সারা রাত ল্যাম্পের চারপাশ দিয়ে নাচছিলো। গান্ধীজী এই কর্মব্যস্ততা খেয়াল করলেন, কিন্তু বদান্যতা বোধ থেকে কোনো মন্তব্য করা থেকে বিরত থাকলেন। সব কাজ শেষ হলেই তিনি কেবল বললেন, ‘এখন যে কেউ বিশ্বাস করবে যে শহরের সত্যিকারের পরিস্কারকেরা এখানে থাকে।’ কলোনির পুরুষেরা মাথার চারপাশে ধবধবে সাদা পাগড়ি বাঁধলো, আর মহিলারা তাদের সবচেয়ে ভাল শাড়িটা পরলো, তাদের ছেলেমেয়েদেরকে নদীতে টেনে নিয়ে গিয়ে চিৎকার করে কান্নাকাটি না করা পর্যন্ত ঘষেমেজে পরিস্কার করলো, আর হলুদ রঙা ক্রিসেনথিয়াম ফুল দিয়ে তাদের মাথার কেশ সজ্জিত করলো। লোকজন মারামারি বন্ধ করে মদের দোকান থেকে সাধ্যমতো দূরে থাকলো। তারপরও অল্প কয়েকজন পাকা মদখোর গোপনে মদ পান করলো। আর তাদের তৈজসপত্র ভাঙ্গার মতো কিংবা স্ত্রীদের পেটানোর মতো তাড়নাকে দমন করে রাখলো। ল্যাম্প, ল্যাম্পপোস্টের এপাশ ওপাশে বাঁধা কাঁচা আমপাতা ও গাছের ডালে সমস্ত জায়গাটি জ্বলজ্বল করে উঠলো। অনেকদিন কেউ প্রবেশ করেনি এমন একটি কুটিরে গান্ধী অবস্থান করলেন। তিনি কাউকে কুটির থেকে বিতাড়িত করতে চাননি, কিন্তু কুটিরটির অধিবাসী অন্যত্র চলে যাওয়ায় এটি অনেকদিন ধরে খালি পড়ে ছিলো-- সেটা নিশ্চিত করার পর নদীর বালুর দিকে মুখ করে থাকা এই কুটিরটিকে বাছাই করলেন। চেয়ারম্যান নিচু একটা ডিভান এনে মোটা মাদুর দিয়ে গান্ধীজীর পরিদর্শকদের বসার জন্য মেঝেটি ঢেকে দিলেন। শ্রীরাম মাদুরটির উপর সবার অলখে বসে পড়লো। গান্ধী ডিভানে বসলেন এবং তাঁর এক সেক্রেটারিকে ডিকটেট করলেন। তারা বিপুল লেখা লিখলো। মহাত্মাজী একই সাথে কয়েকটা কাজ করলেন। তিনি পরিদর্শকদের সাথে কথা বললেন। ডিকটেট করলেন। লিখলেন। প্রার্থনা করলেন। বাদাম ও দুধ দিয়ে হালকাভাবে ডিনার সেরে এখন ডিভানে গা এলিয়ে দিয়ে ঘুমিয়েও পড়লেন। তখন কে যেন বাতি নিভিয়ে দিলেন, আর লোকজন কুটির থেকে হেঁটে বাইরে চলে গেলো। শ্রীরামের এখন মনে হলো ওখানে আর বসে থাকতে পারবে না সে। কী করছিলো এমন প্রশ্ন কেউ তাকে না করলেও সে ওখানে আর থাকতে পারতো না। মেয়েটি কুটির ছেড়ে যাওয়ার প্রস্তুতি নিলে সে ভাবলো এখন তার উঠে চলে যাওয়াই ভাল; নয়তো কেউ হয়তো তাকে অপ্রীতিকর কিছু বলতে পারে। মেয়েটি গান্ধীর চরকাটি তুলে শব্দ করে এক পাশে রেখে দিলো এবং পা টিপে হেঁটে ঘর থেকে বের হলো। বের হলো তাকে প্রথমে খেয়াল না করেই। কিন্তু যে নিবদ্ধ দৃষ্টিতে শ্রীরাম তার পিছু নিলো মনে হলো তা তাকে প্রভাবিত করলো। সে শ্রীরামকে অতিক্রম করে গেলো, কিন্তু হঠাৎ থেমে ফিসফিস করে বললো: ‘এখন তোমাকে যেতে হবে, ’ আর শ্রীরাম এক লাফে কুটিরের বাইরে চলে গেলো। মেয়েটি বেশ নির্মমভাবে বললো: ‘তোমার কি জানা নেই যে বাপুজী যখন ঘুমায়, তখন তাকে রেখে আমাদের চলে যেতে হয়?’ তার জিজ্ঞেস করতে ইচ্ছে করলো, ‘বাপুজী কে?’ কিন্তু মুহুর্তের জন্য তার বুদ্ধি কাজে লাগিয়ে সে বুঝতে পারলো এটা মহাত্মাকেই বুঝিয়ে থাকবে। আর দৃঢ়প্রতিজ্ঞ মেয়েটির তাড়া খাওয়ার ঝুঁকি না নিয়ে বললো, ‘অবশ্যই, আমি জানতাম। আমি শুধু তোমার বাইরে আসা পর্যন্ত অপেক্ষা করছিলাম।’ ‘তুমি কে? আমার তো মনে হয় না তোমাকে আগে দেখেছি।’ এ প্রশ্ন তাকে জিজ্ঞেস করা হোক সে জন্য সে অনেক ক্ষণ ধরে অপেক্ষা করেছিলো। কিন্তু এখন যখন জিজ্ঞেস করলো, তখন তার মুখ দিয়ে কথা বেরোলো না। তাকে এতো বিভ্রান্ত ও গড়বড়ে ঠেকলো যে মেয়েটি তার প্রতি দয়াপরবশ হয়ে প্রশ্ন করলো, ‘তোমার নাম কী?’ সে উত্তর দিলো, ‘শ্রীরাম।’ ‘এখানে কী করছো?’ মেয়েটি জিজ্ঞেস করলো। ‘আমাকে তোমার মনে নেই? সে অবান্তরভাবে বললো। ‘তোমায় আমি দেখেছি যখন বাজারে টাকা তোলার বাক্স নিয়ে তুমি এসেছিলে সেদিন...’ ‘ওহ্ , বুঝেছি, ’ ভদ্রতাবশত মেয়েটি বললো। ‘কিন্তু অনেক লোক সেদিন আমার বাক্সে টাকা ফেলার কারণে তোমায় আমার ঠিক মনে পড়ছে না। যা হোক, আমি তোমায় জিজ্ঞেস করেছিলাম তুমি এখন এখানে কী করছ?’ ‘হয়তো আমি স্বেচ্ছাসেবকদের একজন, ’ শ্রীরাম বললো। ‘ “হয়তো ” কেন?’ মেয়েটি জিজ্ঞেস করলো। ‘কারণ আমি এখনো একজন হয়ে উঠিনি, ’ সে উত্তর দিলো। ‘যে কেউ স্বেচ্ছাসেবক হতে পারে না, ’ মেয়েটি বললো। ‘তুমি কি তা জানো না?’ সে জিজ্ঞেস করলো। ‘আমি কি তা জানি না? আমার মনে হয় আমি তো সেটা জানি, তার চেয়েও বেশি জানি।’ ‘বেশি কী জানো?’ মেয়েটি প্রশ্ন করলো। ‘জানি যে আমি যে কেউ নই, ’ সে জবাব দিলো এবং মেয়েটির সাথে ওভাবে কথা বলার মধ্যে নিজের হঠকারিতায় সে বিস্মিত হলো; মুহুর্তের মধ্যেই মেয়েটি তাকে ক্যাম্পের বাইরে বের করে দিতে পারতো। ‘তুমি গুরুত্বপূর্ণ কেউ হবে বলে আমার মনে হচ্ছে? ’ হেসে মেয়েটি জিজ্ঞেস করলো। ‘আচ্ছা, গুরুত্বপূর্ণ একজন হতে তুমি আমাকে সাহায্য করবে, আশা রাখি,’ হঠকারী ও বেপরোয়া কথায় নিজের ক্ষমতা দেখে চমকিত হয়ে শ্রীরাম বললো। মেয়েটির সাথে তার মিলবে বলে মনে হলো, কারণ এখন সে একটু বিরক্তি নিয়ে জিজ্ঞেস করলো, ‘তুমি কি এখানে দাঁড়িয়ে সারা রাত কথা বলবে?’ ‘হ্যাঁ, যদি তুমি না দেখিয়ে দাও কোথায় আমরা যেতে পারি।’ ‘জানি আমার কোথায় যাওয়া উচিৎ, ’ মেয়েটি বললো । ‘ঐ কুটিরটা দেখছো না, ’ গান্ধীর কুটির থেকে চার দরজা পেরিয়ে ছোট্ট একটা কুটির নির্দেশ করলো সে, ‘এই ক্যাম্পের সব মেয়েমানুষ ঐখানে থাকে।’ ‘কতজন থাকে?’ শ্রীরাম শুধু আলাপ চালিয়ে যাওয়ার জন্য জিজ্ঞেস করলো। তৎক্ষণাৎ মেয়েটি জবাব দিলো, ‘এখন তোমার সামনে যতজন দেখছো তার চেয়েও বেশি, ’ আর জিজ্ঞেস করলো, ‘তোমার এত আগ্রহ কেন?’ শ্রীরামের আত্মসম্মানে একটু আঘাত লাগলো, ‘তোমাকে বদমেজাজী ও রূঢ়ভাষী মেয়ে বলে মনে হচ্ছে। চ্যালেঞ্জ ছাড়া একটা প্রশ্নেরও উত্তর দিতে পারো না।’ ‘চুপ! এখানে দাঁড়িয়ে কথা বললে বাপুজী জেগে উঠবে, ’ সে বললো। ‘ঠিক আছে, তিনি যদি কারো কথায় জেগে যান, তবে সেটা তোমার কথায়, কারণ অন্য কেউ-ই কথা বলছে না।’ শ্রীরাম জবাবে বললো। ‘এখানে তুমি কী করছো সেটা জিজ্ঞেস করা এবং তোমাকে আমার পছন্দ না হলে ক্যাপ্টেনকে সেটা জানানোর অধিকার আমার আছে, ’ মেয়েটি আকস্মিকভাবে কৃর্তৃত্বপরায়ণ স্বরে বললো। ‘তুমি আমাকে পছন্দ করবে না কেন?’ সে জিজ্ঞেস করলো। ‘ঘনিষ্ঠজন ও অ্যাপয়েন্টমেন্টের লোকজন ছাড়া কারুর-ই বাপুজীর কাছে আসার অনুমতি নেই।’ ‘তাদেরকে বলবো যে আমি তোমার বন্ধু এবং তুমিই আমাকে ভেতরে নিয়ে গিয়েছিলে, ’ শ্রীরাম উত্তরে বললো। ‘তুমি কি মিথ্যা উচ্চারণ করবে?’ মেয়েটি প্রশ্ন করলো। ‘কেন নয়?’ ‘মহাত্মাজীর শিবিরে পরম সত্যবাদী ব্যতীত কেউ-ই অনুমতি প্রাপ্ত নয়। যে সব লোক এখানে আসে তাদেরকে মহাত্মাজীর কাছে যেতে হলে অবশ্যই পরম সত্যের শপথ করতে হয়।’ ‘শিবিরের সদস্য হলে আমি শপথ করবো। সে নাগাদ যা সত্যের মতো মনে হয় তা-ই বলে চালিয়ে যাবো।’ সে বললো। ‘মহাত্মা এ বিষয়ে জানতে পারলে খুবই ব্যথা পাবেন এবং তিনি তোমার সাথে এ বিষয়ে কথা বলবেন।’ শ্রীরাম আসলেই ভয় পেয়ে গেলো এবং করুণভাবে জিজ্ঞেস করলো, ‘আমি কী করেছি যে আমাকে হুমকি -ধামকি দিচ্ছো?’ এতে মেয়েটি নরম হলো এবং প্রথম বারের মতো শ্রীরাম তার স্বরে একটু কোমলতা খেয়াল করলো। ‘ওখানটায় গিয়ে অপেক্ষা করতে কি তোমার আপত্তি আছে? মহাত্মাজীর কুটিরের কাছে এভাবে আলাপ করতে থাকা আমাদের উচিৎ নয়। আমার কুটিরে গিয়ে আমি তোমার সাথে যোগ দেবো।’ মেয়েটি ঘুরে অদৃশ্য হয়ে গেলো নর্তকীর বিজলী সম গতিতে। আবার সে তার ঝন ঝন করা বাক্স বহন করতে ব্যালে নাচের দ্রুত ঘূর্ণন ব্যবহার করলো। গলি অতিক্রম করে গেলো। শ্রীরাম ধীরে ধীরে গেলো। দাঁড়িয়ে থাকতে থাকতে সে ক্লান্ত হয়ে গিয়েছিলো। নদীর কিনারায় বোলডারে বসে পায়ের বৃদ্ধাঙ্গুলি দিয়ে সে বালুতে লাথি মারছিলো এবং তার সৌভাগ্যের কথা রোমন্থন করছিলো। এ রকম কোনো কিছু সে কখনো আশা করেনি। এটা স্বপ্ন হয়ে থাকতে পারে। গতকাল সে ভাবতেও পারেনি যে এবার এসব বিষয়ে টাকা তোলার বাক্স বহনকারিণীর সাথে তার কথা হবে। সে উপলব্ধি করলো যে সে তাকে এখনো তার নাম জিজ্ঞেস করেনি। তার মনে পড়লো যে অনেক আগে তার ক্ষুধা ও পিপাসা পেয়েছিলো। ‘তারা যদি মহাত্মাজীর শিবিরে খাওয়ার মতো কিছু একটা দিতো!’ তার মনে পড়লো মহাত্মা শুধু চীনাবাদাম ও খেঁজুর খেয়েছিলো। সে আশপাশ তাকিয়ে দেখলো এই আশায় যে ওখানে এসব জিনিসের বিক্রেতা থাকবে। তালুক অফিসের ধাতব ঘন্টায় নয়টা বাজার শব্দ শোনা গেলো। এই শব্দ ইচ্ছে করে গুনে গুনে সে ভাবলো যে ঠাকুরমা এখন তার অনুপস্থিতির অর্থ কী বুঝে নেবে। ‘অস্থির হয়ে পুলিশকে জানাবে, মনে হয়!’ সংশয়ভরে সে ভাবলো। সে যদি তার শিক্ষককে বলে দিতো যে ঠাকুরমাকে যেন বলে গান্ধীজী শহর ছেড়ে না যাওয়া পর্যন্ত সে বাসায় ফিরবে না! তার মনে আরেকটা ভাবনা খেলে গেলো যে সে তো শিক্ষকের সাথে কথা বলেনি, যিনি গিয়ে হয়তো গুজব রটিয়েছেন যে গান্ধীর প্রতি তার আগ্রহ শুধু লোক দেখানো; সে আসলে মেয়েটার পেছনে ঘুর ঘুর করছে। মেয়েটার নাম কী ছিলো? বিস্ময়কর ব্যাপার যে সে এখনো তাকে নাম জিজ্ঞেস করেনি, আর যে মুহুর্তে মেয়োট ফিরে আসলো তখন তাকে বললো, ‘তোমার নাম কী?’ ‘ভারতী, ’ মেয়েটি উত্তর দিলো। ‘কেন?’ ‘স্রেফ জানার জন্য, ব্যস। তোমাকে কি বলেছি আমার নাম শ্রীরাম?’ ‘হ্যাঁ, কয়েকবার বলেছো, ’ মেয়েটি বললো। ‘বারবার শুনেছি যে তুমি শ্রীরাম।’ ‘তুমি অতিমাত্রায় রূঢ়ভাষী, ’ সে জবাবে বললো। ‘বিস্ময়ের ব্যাপার হচ্ছে ওরা এখানে তোমাকে বরদাশত করছে, যেখানে অবশ্যই শান্তি ও দয়ার চর্চা করতে হয়।’ ‘আমি তো দয়ারই চর্চা করছি, তা না হলে তোমার সাথে আমি আদৌ কথা বলতাম না। তোমার প্রতি সদয় হতে না চাইলে তো আমি ভেতরে গিয়ে ক্যাপ্টেনের অনুমতি নিয়ে সরাসরি এখানে চলে আসতাম। এ সময় মানুষজনের সাথে কথা বলতে গেলে আমাদের অবশ্যই অনুমতি নিতে হয়। প্রতিটি শিবিরে শৃঙ্খলা বলে একটা জিনিস আছে। ভেবো না যেন যে এটা মহাত্মাজীর শিবির এতে শৃঙ্খলা বলে কিছু নেই। তাঁর কাছে এ প্রশ্ন তুললে তিনিই সর্বপ্রথম তোমাকে এ ব্যাপারে বলবেন।’ ‘তুমি আমার ঠাকুরমার মতো করে কথা বলো। তিনিও তোমার মতো রূঢ়ভাষী, ’ শ্রীরাম করুণভাবে বললো। তুলনা গায়ে না লাগিয়ে মেয়েটি জিজ্ঞেস করলো, ‘তোমার মায়ের সমন্ধে কিছু বলছো না যে?’ ‘তাকে আমি কখনো দেখিনি, ঠাকুরমাই আমার বাবা-মা। তার সাথে দেখা করবে? তোমার পছন্দ হবে, তোমাদের দু’জনের মধ্যে কথা বলায় এতো মিল!’ ‘জ্বী, জ্বী, ’ মেয়েটি শান্তভাবে বললো, ‘এসব কিছু শেষ হলেই কোনো একদিন তার সাথে এসে দেখা করবো। দেখছো তো এখন কত ব্যস্ত।’ সে নরম হলো যখন সে দেখলো যে মা-হারা একজনের সাথে কথা বলছিলো, আর এটা খেয়াল করে শ্রীরামের বোধ হলো যে মাতৃহীন হওয়া ও ঠাকুরমার সেবা-শুশ্র“ষায় বড় হওয়া অনেক কাজে দিলো। পা দুটি নদীতে নাচিয়ে নাচিয়ে এবং দু’জনার মধ্যে কয়েক ফুট ব্যবধান রেখে মেয়েটি একই পদক্ষেপে বসে পড়লো। অন্ধকার তারকালোকিত রাত্রিতে নদীটি কলকল করছিলো, প্রাচীন পদক্ষেপের উপর দাঁড়িয়ে থাকা বিশাল গাছটির পাতা খস খস করছিলো ও দীর্ঘশ্বাস ফেলছিলো। অতি দূরে নালাপ্পা কুঞ্জে গরুর গাড়ি ও পথচারীরা নদী পার হচ্ছিলো। রাতের নির্জনতা ভেঙ্গে দূরবর্তী কণ্ঠস্বর ভেসে আসছিলো। মহাত্মাজীর শিবির ঘুমিয়ে ছিলো। এত শান্ত ছিলো যে শ্রীরামের ইচ্ছে করছিলো মেয়েটিকে তার বাহুতে জড়াতে, কিন্তু এ ধারণা সে দমন করলো। মেয়েটি কলহপরায়ণ ছিলো, তার ঐ তীক্ষè জিহ্বা নিয়ে সে নিশ্চয়ই ঠাকুরমার মতো হবে। তার নৈকট্য শ্রীরামের রক্তকে খোঁচা মেরে প্রবাহিত করলো। ‘কেউ ধারের কাছে নেই। সে কী করতে পারে?’ শ্রীরাম ভাবলো। ‘সে চেষ্টা করে ঠেলে আমাকে নদীতে ফেলে দিক, আর তখন জানবে সে কার মোকাবেলা করছে, ’ এবং পরের মুহুর্তেই সে নিজের স্থুল চিন্তাকে দোষারোপ করলো। ‘ওখানে মহাত্মা থাকায় এটা নিরাপদ নয়। তিনি ইতোমধ্যেই আমার চিন্তা পড়ে এদিকে এসে থাকবেন।’ তিনি একজন মহাত্মা, ঘুমিয়েই থাকুন আর জেগেই থাকুন তাঁর চারপাশে কী ঘটছে তা সম্পর্কে তিনি সজাগ। ভগবানই শুধু বলতে পারে যেখানে মেয়েদের ব্যাপার জড়িত সেখানে যার চিন্তার পরম বিশুদ্ধতা নেই তার তিনি কী করবেন। নিঃসন্দেহে এর মানে কষ্ট, কিন্তু কাউকে যদি এই শিবিরে থাকতে হয়, তাহলে মহান আত্মা থেকে উৎসারিত আদেশ তাকে মানতেই হবে। কুচিন্তার বিরুদ্ধে সংগ্রাম করে সে বললো, ‘ভারতী! ’ এতো পরিচিতভাবে ডাকায় মেয়েটি চমকে গেলো এবং তার নামের সুর মূর্ছণায় শ্রীরাম নিজেই চমকিত হলো। ‘কী সুন্দর নাম!’ সে মন্তব্য করলো। ‘আমার আনন্দ লাগছে যে তোমার এটা পছন্দ হয়েছে, ’ মেয়েটি বললো। ‘বাপুজী নিজেই নামটি দিয়েছিলেন।’ ‘ওহ্ , কী জাঁকালো!’ শ্রীরাম চিৎকার করে বললো। মেয়েটি আরো বললো, ‘জানো ১৯২০ সালের আন্দোলনে আমার বাবা মারা যান। ঠিক তখনই আমার জন্ম। বাপুজী যখন এটা জানলেন, তিনি তখন দক্ষিণ ভারতে এসেছিলেন, নিজেকে আমার ধর্মপিতা বানিয়ে নাম রাখলেন ভারতী, যার মানে--- আশা করি তুমি জানো।’ ‘হ্যাঁ, ভারত হচ্ছে ভারতমাতা, আর ভারতী হচ্ছে ভারতমাতার কন্যা, আমার মনে হয়।’ ‘ঠিক বলেছো, ’ মেয়েটি বললো, আর শ্রীরাম মেয়েটির প্রশংসাসূচক কথায় খুশী হলো। ‘মা মারা যাওয়ার পর আমাকে আসলে স্থানীয় সেবক সংঘ দত্তক হিসেবে গ্রহণ করেছিলো, আর তারপর থেকে অন্য কোনো বাসা আমি চিনি না, ’ মেয়েটি বললো। ‘তুমি কি বলতে চাও সবসময়ই তুমি এসব লোকের সাথে থাকো?’ ‘এতে অন্যায় কী আছে? মেয়েটি প্রশ্ন করলো। ‘এটা তো আমার বাসা হয়ে গেছে।’ ‘তা নয়, তোমাকে দেখে শুধু ঈর্ষা হচ্ছিলো। আমার জীবনটা নষ্ট না করে আমিও যদি তোমাদের সাথে থেকে কিছু করতে পারতাম!’ এ কথা তার মনে আবেদন সৃষ্টি করলে মেয়েটি প্রশ্ন করলো, ‘তুমি কী করতে চাও?’ ‘তুমি যা করছো ঠিক তা-ই। তুমি কী করছো?’ সে জিজ্ঞেস করলো। ‘সেবক সংঘ আমায় যা করতে বলে তা-ই করি। কখনো তারা আমায় মানুষকে সুতা কাটা শেখাতে যেতে বলে আর মহাত্মাজীর চিন্তা-চেতনা জানাতে বলে। কখনো আমায় গ্রামে ও গরীব এলাকায় পাঠায়। আমি তাদের সাথে দেখা করি, কথা বলি এবং আরো কিছু কাজ করি। মহাত্মাজীর সেবা করি।’ ‘দয়া করে তোমার সাথে আমাকেও কিছু করতে দাও, ’ সে অনুনয় জানালো। ‘আমাকে তোমার ছাত্র হিসেবে গ্রহণ করো না কেন?’ আমি ভাল কিছু করতে চাই। গরীব মানুষদের সাথে কথা বলতে চাই।’ ‘তাদেরকে কী বলবে?’ মেয়েটি নির্দয়ভাবে প্রশ্ন করলো। শ্রীরাম অস্ফুট আওয়াজ করলো। ‘তুমি যা বলে দেবে তা-ই তাদেরকে বলবো, ’ সে বললো, আর তার উৎকৃষ্ট বুদ্ধির প্রতি এই শ্রদ্ধায় মেয়েটি সন্তুষ্ট হলো। ‘হ’ম! কিন্তু কেন?’ সে জিজ্ঞেস করলো। সবটুকু সাহস একত্র করে শ্রীরাম উত্তর দিলো, ‘কারণ তোমাকে আমি পছন্দ করি, আর তোমার সাথে থাকতে পছন্দ করি।’ উচ্চস্বরে হাসি দিয়ে মেয়েটি বললো, ‘ওটাই যথেষ্ট নয়... তারা...’ সে তার পিছনের বৈরী গোষ্ঠীর বিশাল সৈন্যবহরের দিকে ইঙ্গিত করলো। ‘ওভাবে কথা বললে তার তোমাকে তাড়া করতে পারে।’ সে গোমড়া ও অখুশী হলো। নতুনভাবে উজ্জীবিত হয়ে সে এবার বললো, ‘আচ্ছা, আমিও স্বেচ্ছায় কিছু করবো।’ ‘কী?’ মেয়েটি আবার তাকে উপহাস করলো। শ্রীরাম অসহায়ভাবে, মরিয়া হয়ে মেয়েটির মুখের দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করলো, ‘তুমি কি আমাকে নিয়ে মজা করছো?’ ‘না, তুমি যা বলছো তা বোঝার চেষ্টা করছি মাত্র।’ এখন একটু বিগলিত হয়ে বললো, ‘বাপুর কাছে তোমাকে নিয়ে যাবো, তুমি যাবে?’ শ্রীরাম আতঙ্কগ্রস্ত হয়ে বললো, ‘না, না। আমি যেতে পারবো না।’ ‘তুমি তো ইতোমধ্যে সেখানেই আছো।’ শ্রীরাম যুক্তিসঙ্গত কোনো ব্যাখ্যা দিতে পারলো না এবং এখন সে নিজের হঠকারিতার ব্যাপকতা উপলব্ধি করলো। সে বললো, ‘না, না, ওনার সাথে কীভাবে কথা বলতে হবে কীভাবে ওনার কথার জবাব দিতে হবে আর ওনাকে কী বলতে হবে সেটা জানতে গেলে আমি বিমূঢ় হয়ে যাবো।’ ‘কিন্তু তুমি তো তাঁর সামনে ওখানটায় বসেছিলে যেন তাঁর চিরচেনা! মেয়েটি বললো, ‘তাঁর সবচেয়ে সেরা বন্ধুর মতো।’ মেয়েটি হাসলো এবং তাকে টিটকারী করাটা উপভোগ করলো। ‘যে কোনোভাবেই হোক তা আমি করেছিলাম, কিন্তু আর করবো না, ’ শ্রীরাম ঘোষণা দিলো, ‘তাঁর সামনে আবার গেলে তিনি আমাকে খুঁজে বের করতে পারেন।’ ভারতী হঠাৎ করে গুরুগম্ভীর হয়ে বললো, ‘তুমি যদি আমাদের সাথে কাজ করতে চাও, তবে বাপুজীর সামনাসামনি তোমাকে হতে হবে।’ শ্রীরাম নির্বাক বনে গেলো। তার হৃদয় উত্তেজনায় ধড়ফড় করলো। সে যদি উঠে এক দৌড়ে এ জায়গাটি থেকে শেষবারের মতো পালিয়ে যেতে পারতো! আর চিরদিনের জন্য এ কাজটিকে পৃষ্ঠ প্রদর্শন করতে পারতো! বেশি বেশি। তার ধৃষ্টতা ও দুঃসাহসের জন্য তাকে শাস্তি দিতে দেবতারা মনে হয় বের হয়েছে। সে কেঁদে বললো, ‘ভারতী, অন্য কোথাও তোমার সাথে দেখা করতে পারি কিনা আমায় বলো, নইলে দয়া করে আমায় যেতে দাও।’ তার ঘাম ঠাণ্ডা হয়ে আসছিলো। ‘তাঁর সাথে যখন কথা বলবো কী বলবো আমি? বোকার মতো কথা বলবো।’ ‘তুমি তো এর মধ্যেই সে রকম বলছো, ’ হাসি দমাতে না পেরে সে বললো। শ্রীরাম করুণভাবে বললো, ‘মনে হচ্ছে আমাকে জ্বালাতন করে তোমার ভাল লাগছে। আমি দুঃখিত যে এখানে এসেছিলাম।’ ‘তুমি এতো কাপুরুষ কেন? ’ ভারতী জিজ্ঞেস করলো। শ্রীরাম দৃঢ়চিত্তে বললো, ‘মহাত্মাজীর সাথে আমি কথা বলতে পারবো না। তাঁর সামনে কেমন আচরণ করতে হয় আমি জানি না।’ ‘তুমি তোমার মতো বলবে। তাহলে সব ঠিক হবে।’ ‘তাঁর প্রশ্নের সঠিক জবাব দিতে আমি পারবো না।’ ‘স্কুলের পরিদর্শকের মতো তিনি তোমাকে পরীক্ষা করে দেখবেন না। কোনো কিছু বলার না থাকলে তাঁর সাথে তোমার কথা বলতে হবে না। তুমি মুখ বন্ধ রাখলে তিনি কিছু মনে করবেন না। তুমি শুধু তোমার মতো থাকবে, যা বলতে ইচ্ছে হবে তা-ই বলো। তিনি কোনোকিছুতেই কিছু মনে করবেন না, কিন্তু কথা বলতে হলে তোমাকে সত্য কথা বলতে হবে।’ ‘সত্য কথা! সব কিছুতে!’ তাকে ভীতসন্ত্রস্ত দেখালো। ‘হ্যাঁ, সবকিছুতেই। তুমি যেমন খুশি তেমনভাবে কথা বলতে পারো, তিনি কোনো ভুল ধরবেন না, যদি সেটা সত্য কথা হয়।’ শ্রীরামকে আগের থেকে বেশি ভেঙ্গে পড়া দেখালো। এই অন্ধকার রাতে তার সামনে ভয়ংকর এক সমস্যা আছে মনে হলো। কিছুক্ষণের জন্য ভেবে চিন্তে সে বললো, ‘ভারতী, তোমার সাথে অন্য কোথাও দেখা করতে পারি কিনা আমায় বলো। নইলে আমাকে যেতে দাও।’ ভারতী সমান প্রতিজ্ঞ হয়ে জবাব দিলো, ‘আমার সাথে দেখা করতে চাইলে বাপুজীর কাছে এসো, আমার দেখা পাওয়ার একমাত্র জায়গা। অবশ্য তুমি যদি আমার সাথে দেখা করতে না চাও, চলে যাও।’ এতে সে উভয়সঙ্কটে পড়লো। ‘কোথায়? কীভাবে?’ শ্রীরাম জিজ্ঞেস করলো। ‘বাপুর কুটিরের দরজায় এসে আমার জন্য অপেক্ষা করবে, ’ ‘কবে? কোথায়?’ ‘আগামীকাল ভোর তিনটায়। তোমাকে আমি তাঁর কাছে নিয়ে যাবো।’ এই বলে সে লাফিয়ে উঠলো এবং তার কুটিরের দিকে দৌড়ে চলে গেলো। ** ঠাকুরমা থেকে থেকে ঘুমিয়েছিলেন। সন্ধ্যায় পাঁচবার তিনি ক্যানির দোকান পর্যন্ত গিয়েছিলেন কেউ শ্রীরামকে দেখেছিলো কিনা তার খোঁজ-খবর নিতে, আর সেখানে কেনাকাটা করতে আসা একটি ছেলেকে শ্রীরামের খোঁজে সর্বত্র পাঠিয়েছিলেন। অবশেষে স্কুলশিক্ষক যিনি রাস্তায় রাস্তায় ঘুরে বেড়িয়েছিলেন তিনি ঠাকুরমার বাড়ি অতিক্রম করার সময় তাকে বলেছিলেন, ‘আপনার আদরের ধন মহাত্মার শিবিরে। আমি তাকে সেখানে দেখলাম।’ ‘আহ্ ! সেখানে সে কী করছিলো?’ আতঙ্কিত হয়ে ঠাকুরমা জিজ্ঞেস করলেন। তার মতে মহাত্মা সেই ব্যক্তি ছিলেন যিনি ভয়ংকর মতবাদ প্রচার করে বেড়াতেন, যিনি অস্পৃশ্যদের মন্দিরে আনার চেষ্টা করতেন, আর যিনি মানুষজনকে পুলিশের সাথে ঝামেলায় জড়াতেন। তিনি ব্যাপারটি পছন্দ করলেন না। বিলাপ করে বললেন, ‘ওহ্ , মাস্টার, আপনি কেন তাকে ওখানে থেকে যেতে দিলেন? আপনার ওকে এনে দেওয়া উচিৎ ছিলো। এতো দেরি হয়ে গেছে অথচ সে বাসায় আসেনি। ওর পুরোনো শিক্ষক হিসেবে ওকে আপনার ছাড়িয়ে আনা উচিৎ ছিলো।’ ‘দুশ্চিন্তা করবেন না, ম্যাডাম, সে একদম নিরাপদে আছে। মহাত্মার এত কাছে যাওয়ার সুযোগ আমাদের কজনই বা পায়? আপনি অবশ্যই খুশি হবেন যে সে এত ভাল করছে! ওর মতো তরুণদের দরকার আমাদের দেশে।’ ঠাকুরমা উত্তরে বললেন, ‘আপনার মতো শিক্ষকরাই আমাদের ছেলে ও এই দেশকে নষ্ট করেছেন, ’ দ্রুম করে দরজা বন্ধ করে তিনি ভেতরে ঢুকলেন। শ্রীরাম পৌঁছে দরজায় করাঘাত করার সময় তিনি অর্ধ-ঘুমন্ত এবং সম্ভাব্য সবচেয়ে খারাপ মেজাজে ছিলেন । দরজা খুলে তাকে ভেতরে ঢুকতে দিয়ে তিনি আবার দরজা লাগিয়ে দিলেন এবং আবার ঘুমোতে যেতে যেতে বললেন, ‘ঐ গামলাটায় দই মিশিয়ে কিছু ভাত রেখেছি আর আরেকটায় দই ছাড়া। খাওয়ার পর বাতিটা নিভিয়ে দিও।’ বিছানায় শুয়ে তিনি শ্রীরামের থালাটি একপাশে রেখে দেওয়ার শব্দ ও রান্নাঘর ত্যাগ করার শব্দ শুনলেন। তখন তিনি দেয়ালের দিকে মুখ ঘুরিয়ে নিলেন এবং ঘুমানোর ভান করে থাকলেন। তার আশা ছিলো যে নাতি তার মেজাজ বুঝবে, কাছে আসবে এবং তাকে আশ্বস্ত করবে যে সে খারাপ পথে যায়নি। কিন্তু তরুণটি অন্য কাজে ব্যস্ত হলো। সে অর্ধেক মোহাবস্থায় ছিলো। ভারতীর সঙ্গ ও কথা এখনো তার মনে অনুরণিত হলো। তাকে স্পর্শ করার শিহরণ তার মনে পড়লো। তার ভাবতে ভাল লাগলো যে যখন সে খেয়াল করেনি, তখন সে তার বাহু ছুঁয়েছিলো এবং কাঁধে হাত বুলিয়েছিলো। সে ভাবলো ভারতীর ঠাট্টা শুনতে শুনতে বাকি জীবনটা তার কতটুকু ভাল লাগবে, কিন্তু তার মানে তো--- দ্বন্দটা এখানেই--- তাকে তার সামনে হাজির হতে হবে। এই দুশ্চিন্তার কাছে অন্য সব তার কাছে তুচ্ছ ঠেকলো। অন্য কোনো দিন হলে সে ঠাকুরমাকে ঘুম থেকে টেনে জেগে তুলে তাকে সারাদিনের ঘটনা বর্ণনা করতো। তিনি যদি খারাপ মেজাজেই থেকে থাকতেন, তবে সে জোর করে মেজাজ ভাল করে দিতো। সে জানতো এখন তিনি ভাল মেজাজে নেই; দরজায় পা দেওয়ার মুহুর্তেই সে টের পেয়েছিলো, কিন্তু সে তাকে ওভাবেই থাকতে দিলো; তার মনে হলো ঠাকুরমার মেজাজ ঠিক করার থেকে আরো গুরুতর সমস্যা তার আছে। সে বিছানায় গিয়ে এক ঘন্টার কম সময়ে ঘুমিয়ে পড়লো। ভারতী ভোর তিনটায় ওখানে তাকে থাকতে বলেছিলো, আর সেখানে যেতে তার লাগবে এক ঘন্টা। একটার আগেই সে জেগে উঠলো, হাত-মুখ ধুইলো এবং গোসল সেরে বিশেষ কাপড় পরে নিলো। ঠাকুরমার বিছানায় ঝুঁকে কানে কানে বললো, ‘আমাকে এখন যেতে হচ্ছে, দরজাটা লাগিয়ে দিও।’ তিনি জিজ্ঞেস করতে চেষ্টা করলেন, ‘কী! এই সময়ে, তোমার কী হয়েছে?’ কিন্তু সে আস্তে আস্তে পা ফেলে দরজা বন্ধ করে চলে গেলো। ** মহাত্মাজীর কুটিরের প্রবেশপথে এসে দম বন্ধ করে সে দাঁড়ালো। এখন কী করা উচিৎ তা স্থির করা খুবই কঠিন ছিলো। ভারতী তাকে জিজ্ঞেস করেছিলো মহাত্মার ফটকে উপস্থিত থাকতে, কিন্তু হয়তো সে তাকে বোকা বানাচ্ছিলো। তার আশঙ্কা হলো কোনো শব্দ করলেই মহাত্মা জেগে উঠে পুরো শিবিরটা তার কানের চারপাশে এনে রাখতে পারে। সে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে অনুতপ্তভাবে শিবিরটার দিকে তাকালো। রাস্তার কুকুরগুলো কোথায় যেন ঘেউ ঘেউ করছিলো। মাঝে মাঝে নদী তীরের গাছের ডালগুলি খস খস ও ক্যাঁচ ক্যাঁচ করলো। দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে অনুতপ্তভাবে সে নারীপল্লীর দিকে তাকালো। সেখানে একটা হারিকেন জ্বলছিলো, লোকজনকে জাগ্রত এবং চলা ফেরা করছে মনে হলো। সে ভাবলো, ‘হারিকেনটা জ্বলতে থাকলে কী হবে? আলো জ্বালিয়ে তারা ঘুমিয়ে থাকতে পারে। নারীরা তো ভীতুই হয়।’ নড়াচড়ার যে শব্দ সে শুনতে পেলো সেটা বিছানায় তাদের গড়াগড়ির শব্দ হতে পারে, গোলমেলে জীব! ব্যাখ্যাতীতভাবে নারীদের কথা ভেবে ভেবে সে জ্বালাতন অনুভব করছিলো, এই প্রজাতির মধ্যে ভারতীও পড়েছিলো। মহাত্মাজীর শিবিরে সে একটা আলো দেখতে পেলো। দরজা বন্ধ ছিলো। সেখানে সে নরম পদক্ষেপে চলার শব্দ শুনতে পেলো। অনেকক্ষণ আগে তালুক অফিসের ঘন্টায় রাতের শেষ প্রহরের ধ্বনি বেজেছিলো। সে প্রায় বিশ্বাসই করতে পারছিলো না সে সত্যিই ঘুমকে উৎসর্গ করেছিলো এবং অপার্থিব সময়ে ঠাণ্ডা হাওয়ায় এখানে দাঁড়িয়েছিলো। খলপুরা, যারা শহরে সবার আগে ওঠে, তারাও ঘুমিয়ে পড়েছিলো। হঠাৎ করে সে ভয় পেয়ে গেলো যে চোর কিংবা ভূত তাকে আক্রমণ করতে পারে। অথবা এত রাতে ঘুর ঘুর করছে বলে পুলিশ যদি তাকে দেখে ফেলে, তখন সে কী ব্যাখ্যা দেবে? সে ভালভাবে হয়তো বলতে পারতো না, ‘ভোর তিনটার দিকে ভারতী তাকে মহাত্মার কুটিরে অপেক্ষা করতে বলেছিলো।’ সে ঘুরে চলে যেতে চাইলো। এখানে ঘুর ঘুর না করে এবং কী করা যায় তা না ভেবে বাসা গিয়ে অন্ততপক্ষে ঠাকুরমায়ের কাছে সারাদিনের অভাব পূরণ করা যেতে পারতো। তাকে বলতে পারতো: ‘মহাত্মাকে দেখতে গিয়েছিলাম, কিন্তু ইচ্ছা পরিবর্তন করে চলে এলাম। তাকে জেনে অত সব ঝামেলায় জড়িয়ে কী হবে? তোমার কি তাই মনে হয় না, ঠাকুরমা?’ আর এতে তিনি নিশ্চয়ই পুনরিজ্জীবিত হয়ে আবার খুশি হবেন। নারীপল্লীর দিকে একটা কাতর দৃষ্টি দিয়ে সে ঘুরে দাঁড়ালো। মহাত্মার মতো বড় মানুষের এবং ভারতীর মতো উন্নাসিক মেয়ের আজব ও সন্দিগ্ধ নেক নজর পাওয়ার চেয়ে ঠাকুরমার বাস্তব সুনজর পেতে সে মনকে পুরোদমে স্থির করলো। ভগবানই জানতেন আর কে সেখানে আসবে। কিন্তু ভারতীর আকর্ষণ এত তীব্র ছিলো যে সে যেমন ভেবেছিলো জায়গাটা ছেড়ে অতো সহজে যেতে পারলো না । তাকে দেখে বিদায় জানানোর শুধু আরেকবার চেষ্টা করতে চাইলো। হয়তো সে এমন কোনো পরিস্থিতিতে আছে যাতে তাকে সাহায্য করা যায়: লোকজন তাকে তার খাটের সাথে বেধে রেখে মুখ বন্ধ করে রাখতে পারে। তার মতো সুন্দরীদের অনেক কিছুই হতে পারে। তা না হলে তো তার না আসার কোনো কারণই নেই। যাই হোক, তার মনে হলো কী হয়েছে ওখানে তা দেখার দায়িত্ব তারই হবে। সে স্বেচ্ছায় নারীপল্লীর কাছে যেতে পারে, কিন্তু এর জন্য প্রয়োজনীয় সাহসের অভাব ছিলো তার এবং পরবর্তী সর্বোৎকৃষ্ট কাজটা সে করলো: আবার হঠকারী কাজের পুনরাবৃত্তিÑ পা টিপে মহাত্মাজীর কুটিরের দিকে গেলো। তার ধারণা ছিলো সবার অগোচরে উঁকি মেরে ওখানে না অন্য কোনো খানে ভারতী নিরাপদে আছে তা দেখে চলে আসা। কিন্তু এই বিভ্রান্ত অবস্থায় তার মনে হলো না যে সে কাউকে দেখার আগে কেউ তাকে হয়তো দেখে ফেলতে পারে। আর তাই হলো। মহাত্মাজীর দরজাটি অর্ধেক খোলা ছিলো। ফাঁক দিয়ে আলো আসছিলো। মুগ্ধ পতঙ্গের মতো শ্রীরাম এর দিকে এগিয়ে গেলো। সে যদি একটু থেমে চিন্তা করতো, সে দ্বিতীয়বার হঠকারী কাজ করার মতো যোগ্য হিসেবে নিজেকে বিশ্বাস করতে পারতো না। কিন্তু অনিদ্রা ও স্নায়ুচাপের কারণে একটা বেপরোয়া ভাব তার মধ্যে এসেছিলো। একই ধরণের নির্দোষ ভারে সে গত সন্ধ্যায় এ কুটিরে এসেছিলো, এখনো আসলো। ভাঁড়ের মতো সে ভেতরে উঁকি দিয়ে দেখলো। দরজাটি অর্ধেক খোলা ছিলো; দূর থেকে সে এর প্রস্থ বেশি হিসেব করে ফেলেছিলো, কারণ মাথা ভেতরে না ঠেলে দিয়ে সে উঁকি দিতে পারেনি। ‘ওহ্ , ঐ তো সে!’ কণ্ঠস্বরে হাসি মিশিয়ে ভারতী চিৎকার করলো। ‘ভেতরে আসতে চাইলে দরজাটা খুলতে পারো, ’ সে বললো। শ্রীরামের আবার মনে হলো যে মেয়েটি তাকে নিয়ে মজা করছে। মহাত্মার উপস্থিতিকেও সে পরোয়া করছে না মনে হয়। শ্রীরামের আশা ছিলো এখানে সে অন্তত কোনো চাপা দুর্বুদ্ধি ছাড়াই কথা বলবে। তার এতো বিরক্ত লাগলো এই ভেবে যে তার কণ্ঠস্বরে সে যত ঝাঁঝ ধারণ করতে পারে তার সবটুকু দিয়ে জবাব দেবে: ‘তুমিÑÑ ওখানে তোমার জন্য আমি অপেক্ষা করছিলামÑÑÑÑ’ ‘এসো, ভেতরে এসো, ’ মহাত্মা বললেন। ‘ওখানে দাঁড়িয়ে ছিলে কেন? তুমি সরাসরি ভেতরে আসতে পারতে।’ ‘কিন্তু সে আমাকে বাইরে অপেক্ষা করতে বলেছিলো, ’ শ্রীরাম সন্তর্পণে পা ফেলে বললো। দরজা থেকে মহাত্মা যেখানটায় বসেছিলো তার দূরত্ব ছিলো দশ ফুটেরও কম, কিন্তু তার মনে হলো এটুকু আসতে তার ঘন্টার পর ঘন্টা লেগেছিলো। পা দুটো দুর্বল ও জড়িয়ে যাচ্ছিলো মনে হলো, তাকে মাতালের মতো হাঁটছিলো বলে মনে হলো। মহাত্মার ধারণায় এটা বিশেষ ধরণের বিপজ্জনক ব্যাপার, যিনি খলপুদেরও মদ খাওয়া ছেড়ে দেওয়ার জন্য বোঝাচ্ছিলেন। এক ঝলকে শ্রীরামের মনে হলো যে হঠাৎ করে ঘুরে যদি তাকে প্রশ্ন করে, ‘টোডি না হুইস্কি পান করছিলে?’ , তবে তার যুক্তিসঙ্গত একটা উত্তর প্রস্তুত করে রাখা উচিৎ। কিন্তু তার বিচার শেষ হলো যখন গান্ধী বললেন, ‘ভারতী একটু আগেই তোমার কথা বলছিলো।’ হাত দিয়ে চরকা ঘুরিয়ে নতুন একটা সুতা বের করতে করতে তিনি কথা বললেন। কোণায় বসে থাকা একজন লোক হাঁটুতে প্যাড রেখে লিখছিলো । সবসময় যেমন তেমনই মহাত্মাজী একই সাথে কয়েকটি কাজ করছিলেন। হাত দিয়ে চরকা ঘুরানোর সময়, তাঁর চোখ আরেকজন কর্তৃক তাঁর সামনে ধরে রাখা চিঠি পড়ছিলো এবং শ্রীরামকে স্বাগত বাণী দেওয়াও সম্ভব মনে করলেন। কুটিরের পিছনের দরজা দিয়ে অনেকেই আসছিলো আর যাচ্ছিলো। তাদের প্রত্যেককেই মহাত্মাজী কিছু না কিছু বললেন। তিনি শ্রীরামের দিকে তাকিয়ে বললেন: ‘বসে পড়ো, যুবক। আমার যত কাছে আসতে চাও তত কাছে এসে বসো।’ তাঁর কণ্ঠস্বরে এতখানি অকৃত্রিম দয়া ছিলো যে সব ভয় ও দ্বিধা শ্রীরামের মন থেকে হারিয়ে গেলো। চট করে উঠে পড়লো সে। মহাত্মাজীর কাছে মেঝেতে বসে মোহাবিষ্ট হয়ে সুচারুরূপে চরকা ঘুরানো দেখলো। কুটিরের ভেতরের দিকে গিয়ে ভারতী শ্রীরামের দিকে চকিত চাহনি নিক্ষেপ করলো, সে যার মানে করে নিলো, ‘মনে রেখো, বোকার মতো যেন কিছু বলো না।’ মহাত্মা বললেন, ‘এটা যাতে করতে পারি সেজন্য আজকাল আমি সাধারণত এক ঘন্টা আগেই উঠি। একটা নির্দিষ্ট পরিমাণ সুতা বানানো আমার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজ। এমনকি আমার প্রার্থনাও এর পরে করি । আমি খুব করে চাই তুমি শপথ করো যে প্রতিদিন তোমার নিজের হাত দিয়ে বানানো কাপড়ই শুধু তুমি পড়বে।’ ‘জ্বী, তাই করবো, ’ শ্রীরাম প্রতিজ্ঞা করলো। তালুক অফিসের ঘন্টায় চারটা বাজলে মহাত্মা শ্রীরামকে তাঁর সাথে বাইরে হাঁটতে বললেন। তিনি তাঁর লাঠিটা এক হাতে ধরে আরেক হাত দিয়ে ভারতীর কাঁধে ভর দিলেন এবং কুটির থেকে বেরিয়ে পড়লেন--- সাদা কাপড়ে লম্বা শরীর। কোমরে সাদা ধুতির মধ্যে তাঁর ঘড়িটা ভাঁজ করে রেখেছিলেন। এটা বের করে বললেন: ‘আধা ঘন্টা হাঁটতে হবে, আমার সাথে আসো, শ্রীরাম। আমার সাথে নির্বিঘেœ কথা বলতে পারো।’ আরো কয়েকজন যোগ দিলো। শ্রীরামের মনে হলো সে কোনো কাল্পনিক স্বপ্নের জগতের মধ্যে দিয়ে হাঁটছিলো। ভারতী ও তার মাঝে মহাত্মা ছিলেন। তাই যতবারই সে চাইলো ততবারই ভারতীর দিকে দৃষ্টি দেওয়া কঠিন কাজ হলো। তার হাস্যজ্জ্বোল মুখখানি এক নজর দেখার জন্য তাকে মাঝে মাঝে সিকি ইঞ্চি পিছনে পা ফেলতে হলো। নদী তীর ধরে তারা হাঁটলো। পূবের আকাশ গোলাপী ছিলো। গান্ধী ঘুরে তাঁর পেছনের লোকগুলির সাথে কাজের আলাপ করলেন। হঠাৎ নিজেই তিনি শ্রীরামকে বললেন: ‘তোমাদের শহরটা খুবই সুন্দর। আগে কি কখনো তা খেয়াল করেছো?’ শ্রীরাম অখুশি হয়ে হাঁপাতে লাগলো। সকালের হাওয়া তার মুখে এসে আঘাত করলো, পাখিরা কিচির মিচির করছিলো, আর শহরটা ছিলো শান্ত: সব সুপরিচিত ছিলো, কিন্তু মহাত্মা কেন তা এখনই উল্লেখ করলেন? তার কি ‘হ্যাঁ ’ বা ‘না ’ বলা উচিৎ? যদি ‘হ্যাঁ ’ বলে, তবে মিথ্যা বলা হবে যা তৎক্ষণাৎ ধরা পড়বে; যদি ‘না ’ বলে, তবে ভগবানই জানেন মহাত্মা তাকে কী ভাববে। সে আশেপাশে তাকালো। কলোনির কয়েকজন খলপু যারা এ দলে যোগ দিয়েছিলো তারা সে কী বলবে তার জন্য সাগ্রহে অপেক্ষা করছে: তারা নিশ্চয়ই তার এ দূরাবস্থা উপভোগ করছে, আর ভারতীর দিকে তাকাতে তার সাহস হলো না। মহাত্মা বললেন: ‘ভগবান সর্বত্রই আছেন। তার উপস্থিতি অনুভব করতে চাইলে এরকম একটা জায়গায় তাকে দেখতে পাবেÑ যেখানে সুন্দর নদী বইছে, সূর্য তার সব রঙ নিয়ে উদয় হচ্ছে এবং বাতাস এত বিশুদ্ধ। সুন্দর একটা সময় বা দৃশ্য বা জিনিস অনুভব করাই হচ্ছে এক ধরনের প্রার্থনা।’ শ্রদ্ধাবনত নীরবতায় শ্রীরাম শুনলো এবং আনন্দিত হলো যে এত হালকার উপর দিয়ে সে বেঁচে গেলো। গান্ধীজী সূর্য ও বাতাস সম্পর্কে সৌন্দর্যের কথা বললে তা অবাস্তব শোনালো, কিন্তু শব্দটি বাস্তব তাৎপর্য্য বহন করলো যখন সে তা ভারতীর ক্ষেত্রে ভাবলো। গান্ধী বললেন: ‘পরের বার দেখা হলে তুমি অবশ্যই তোমার সম্পর্কে আমাকে ভাল একটা বর্ণনা দেবে।’ তিনি দয়ালুর মতো করে হাসলেন, আর শ্রীরাম বললো, ‘জ্বী, বাপুজী, আমি ভিন্ন একজন মানুষ হবো।’ ‘তুমি “ভিন্ন ” বলছো কেন? তুমি যদি সম্পূর্ণরূপে নিজের হও, তাহলে তুমি ঠিক থাকবে।’ ‘আমার মনে হয় না তাতে হবে, বাপু, ’ ভারতী বললো, ‘নিজের হওয়া থেকে তার বদলে যাওয়া উচিৎ, যদি ভাল কোনো কাজে সে আসতে চায়। আমার মনে হয় ও খুব অলস। সকাল আটটায় ঘুম থেকে ওঠে, আর সারাদিনটা অলসভাবে কাটায়।’ ‘তুমি কী করে জানো?’ ক্রুদ্ধ হয়ে শ্রীরাম জিজ্ঞেস করলো। ‘অনুমান করেছি মাত্র, ’ মেয়েটি বললো। তার দায়িত্বজ্ঞানহীন কথাবার্তায় শ্রীরাম তার সাথে রাগান্বিত বোধ করলো। সবাই হেসে উঠলো। মহাত্মা বললেন: ‘এমন কথা অবশ্যই তুমি কখনো বলবে না, ভারতী, যদি না তুমি তার দায়িত্বভার নিয়ে তাকে সাহায্য করো।’ এভাবে হাঁটতে হাঁটতে শেষ পনের মিনিটে মহাত্মা কিছু বললেন না; সামনের মাটির দিকে তাকিয়ে নীরবে হাঁটলেন। মহাত্মা নীরব থাকলে পর বাকিরা আরো বেশি নীরব রইলো, তারা তাঁর সাথে তাল মিলাতে বালিতে শুধু একটার আগে আরেকটা পা ফেললো: কেউ কেউ বেশ হাঁপালো আর শব্দটা দমন করার কঠোর চেষ্টা চালালো। মহাত্মার নীরবতা ছিলো ভারী ও পরিব্যাপ্ত, আর শ্রীরাম ঢোক গিলতে অথবা কাশি দিতেও ভয় পেলো, যদিও খুব করে চাইলো গলা পরিস্কার করতে, হাঁচি দিতে, হাত দুটো ছুঁড়তে। সে সময়ে একমাত্র আওয়াজ ছিলো নদীর বয়ে যাওয়া ও পাখির কিচির মিচির। কোথায় যেন একটা গরু হাম্বা হাম্বা ডাকলো। ছ্যাবলামির অবতার ভারতীকেও মলিন মনে হলো। মহাত্মা তাঁর ঘড়িটি বের করে দ্রুত দেখে বললেন, ‘আমরা ফিরে যাবো, এইটুকুই আজ হাঁটতে পারলাম।’ শ্রীরাম জিজ্ঞেস করতে চাইলো, ‘কেন?’ কিন্তু সংযত হলো। তারা পেছনে হাঁটায় মহাত্মা ঘুরে বললেন, ‘তোমার একজন ঠাকুরমা আছে, শুনেছি, বাবা-মা নেই।’ ‘জ্বী। ঠাকুরমা, অনেক বুড়ি।’ ‘হ্যাঁ, তা অবশ্যই হবে, নইলে তাকে তুমি ঠাকুরমা বলছো কেন?’ লোকজন হেসে উঠলো, শ্রীরামও ভদ্রতাবশত সে হাসিতে যোগ দিলো। ‘এতক্ষণ ধরে যে তুমি তার কাছ থেকে দূরে আছো তিনি তোমাকে খুব মিস করছে না?’ ‘জ্বী, খুবই। তিনি আমার সাথে রাগ করে আছেন। আমি জানি না এখন কী করা যায়, ’ সামনে এগিয়ে সাহসের সাথে শ্রীরাম বললো। স্বেচ্ছায় কিছু একটা বলতে পারায় তার খুশি লাগলো, কিন্তু তার একমাত্র ভয় ছিলো যে ভারতী এর মধ্যে এসে নোংরা ও বিব্রতকর কিছু বলতে পারে। কিন্তু ভারতী শান্ত ছিলো দেখে সে খুশি হলো। মহাত্মাজী বললেন: ‘ঠাকুরমাকেও দেখাশুনা করতে হবে, তোমাকে বড় করতে তিনি অবশ্যই নিজেকে উৎসর্গ করে থাকবেন।’ ‘জ্বী, কিন্তু আমি এভাবে দূরে থাকলে তিনি অনেক ঘাবড়ে যান।’ ‘তার কাছ থেকে দূরে থাকা কি তোমার এতই প্রয়োজন?’ ‘জ্বী, বাপু, নইলে এ বিশ্বে কেমন করে আমি কিছু করতে পারবো?’ ‘তুমি ঠিক কী করতে চাও?’ এখন শ্রীরাম অসঙ্গত হলো। নানা ভাবনা ও সব বিভ্রান্তি তাকে পেয়ে বসলো এবং তাতে অনেক বেশি ধারণার সৃষ্টি হলো। সে কিছু একটা বললো, আর মহাত্মা ধৈয্যের সাথে তাকে লক্ষ করলো, অন্যরাও দম বন্ধ করে লক্ষ করলো । আত্ম-অভিব্যক্তির সংগ্রাম করার কিছুক্ষণ পরে শ্রীরাম অকাট্য বাক্য খুঁজে পেলো। অবচেতন আকাঙ্খার অবিগলিত চাপেই তার ঠোঁটে বাক্য কেঁপে উঠলে সে বললো, ‘ভারতী যেখানে আছে আমি সেখানে থাকতে চাই।’ মহাত্মা বললেন, ‘ওহ্ , তাই!’ তিনি ভারতীর পিঠে হাত বুলিয়ে বললেন, ‘তুমি কী চমৎকার বন্ধু পেয়েছো! এমন একজন নিবেদিতপ্রাণ বন্ধু পেয়ে তোমার অবশ্যই সন্তুষ্ট হওয়া উচিৎ। কতদিন ধরে তাকে চেনো?’ ভারতী ঝটপট উত্তর দিলো, ‘গতকাল থেকে। আমি ওকে তোমার কুটিরে বসে থাকতে দেখেছি। আর আমি তাকে জিজ্ঞেস করেছিলাম সে কে।’ শ্রীরাম কথার মাঝখানে বললো, ‘কিন্তু আমি তাকে আগেই চিনতাম, যদিও গতকাল মাত্র তার সাথে কথা বলেছি।’ মহাত্মা তাঁর কুটিরে চলে গিয়ে অন্যান্য কাজ করতে শুরু করলেন। অনেকে তাঁর জন্য অপেক্ষা করছিলো। যে মুহূর্তে তারা কুটিরে এসে পৌঁছালো, সে মুহূর্তেই ভারতী মহাত্মার কুটিরে অদৃশ্য হয়ে গেলো। শ্রীরাম পিছনে পড়ে রইলো এবং বাইরে অপেক্ষমান জনতার সাথে মিশে গেলো। ভারতীর অবস্থানে তার হিংসা হলো। ভারতী তাকে পরে খুঁজে বের করে বললো, ‘তুমি হয়তো এতে অনভ্যস্ত, কিন্তু বাপুজীর উপস্থিতিতে আমরা কেবল পরম সত্যটাই বলি, এর চেয়ে কম কিছু বলি না, বেশি কিছুও বলি না।’ শ্রীরাম তাকে তিরস্কার করলো: ‘এখন তিনি আমার সমন্ধে কী ভাববেন যখন তিনি জানবেন যে আমি তোমাকে যথেষ্ট আগে থেকে চিনি না আর তবুও---’ ‘আচ্ছা, কী?’ ভারতী তাকে খোঁচা মেরে বললো। ‘আর তবুও তোমার সাথে থাকতে চাই।’ ‘তো ভেতরে গিয়ে তাকে বলছো না কেন যে তুমি আজেবাজে বকছিলে এবং পূর্ব চিন্তা বা আত্ম-নিয়ন্ত্রণ না থাকায় বোকার মতো ওসব কথা বলেছো? তাকে বলতে পারলে না কেন যে তুমি দেশের সেবা করতে চাও, যে তুমি দেশপ্রেমিক, যে ইংরেজদের দেশ ছাড়া দেখার জন্য তুমি তোমার রক্ত দিতে চাও? মহাত্মার কাছে এলে এটাই তো অনেকে বলে । তাঁর কাছে এসে একই কথা বলতে আমি শত শত লোককে দেখেছি।’ ‘আর তিনি সব বিশ্বাস করেন?’ শ্রীরাম প্রশ্ন করলো। ‘হয়তো না, কিন্তু তিনি মনে করেন কাউকে অবিশ্বাস করা ঠিক নয়।’ ‘কিন্তু তুমি বলছো তার উপস্থিতিতে আমাদেরকে অবশ্যই সত্য কথা বলতে হবে।’ ‘পারলে অবশ্যই, কিন্তু না পারলে সবচেয়ে ভাল কাজ হচ্ছে চুপ করে থাকা।’ ‘আমার সাথে এত রেগে আছো কেন? অন্যের সাথে রাগ না করা কি তোমার দায়িত্বের অংশ নয়?’ শ্রীরাম করুণভাবে জিজ্ঞেস করলো। ‘আমি পরোয়া করি না, ’ ভারতী বললো, ‘মহাত্মাকেও জ্বালাতন করার জন্য এই যথেষ্ট। এখন তিনি আমাকে কী মনে করবেন যদি তিনি উপলব্ধি করেন আমি তোমার মতো ছেলেকে এ জায়গায় ঘুর ঘুর করতে উৎসাহিত করছি, যে ছেলেকে এখনো একটা গোটা দিনের জন্যও চিনি না!’ শ্রীরাম বেপরোয়া হয়ে উৎফুল্লভাবে বললো, ‘তোমাকে কতদিন ধরে চিনি তাতে কী এসে যায়? তুমি কি মনে করেছিলে আমার কথা বলার আগে তুমি কথা না বললে তাঁর কাছে আমি মিথ্যা বলতে যাচ্ছিলাম।’ এইসব ঝগড়া শেষ হলো যখন অন্য কুটির থেকে কে যেন ‘ভারতী ’ বলে ডাকলো। তাকে সেখানে ফেলে ভারতী অদৃশ্য হয়ে গেলো। ভারতীর কথায় সে একটা বুদ্ধি পেলো। তার নিজের বাদ পড়া উপলব্ধি করলো ও পরের বার মহাত্মার সাথে হাঁটলে এটি পুুষিয়ে নেওয়ার প্রস্তাব রাখলো। শ্রীরামের উৎকণ্ঠা পাছে সে ঘুমিয়ে পড়ে যখন মহাত্মা সারারাত নিজে জেগেছিলো। শিবিরে লোকদের মাঝে একজনের সাথে সে মেঝে ভাগ করে নিলো। কুটিরে শুয়ে থাকা এক ধরণের অদ্ভুত অনুভূতি ছিলো, আর তার মনে হলো সে সম্পূর্ণ নতুন এক বিশ্বের নাগরিক হচ্ছিলো। কবির লেনে তার বাড়ির আরামদায়ক কক্ষটার অভাব অনুভব করলো সে। অভাব অনুভব করলো দুটো বালিশ ও নরম তোষক এবং এর নিচের কার্পেটের; এমনকি গৃহস্থ জীবনের মানে সংযোজিত কবির সরণীর রাস্তার শোরগোল; সবকিছুর অভাব সে ব্যাপকভাবে অনুভব করলো এখন। জীবনের সম্পূর্ণ নতুন ধরণ তাকে গ্রহন করতে হলো। নিজের পছন্দে তাকে সংকীর্ণ, খড়ের চালা কুটিরে থাকতে হলো। নোংরা, কালি পড়া, দুগন্ধ সবকিছুতে লেগে আছে। মেঝেটি গোবর দিয়ে লেপে হালকা বালু দিয়ে ঢেকে দেওয়া হয়েছিলো। হাতটাকে বালিশের মতো করে মাথায় গোঁজাতে হলো । শিবিরের আরেকজন স্বেচ্ছাসেবকের সাথে জায়গাটি ভাগ করে নিতে হলো। এই মড়ামুখো গুরুগম্ভীর তরুণটি খাদী কাপড়ের হাফ প্যান্ট, অন্তর্বাস ও পুরোপুরি কামানো মাথায় সাদা টুপি পরে ছিলো। চোখে ছিলো অগ্নি-দৃষ্টি, মুখে ছিলো না হাসি। উত্তর ভারত থেকে এসেছিলো, ভাঙ্গা ভাঙ্গা ইংরেজি বলতো এবং তামিল কোন শব্দ জানতো না। এই লোকটি একটি ছোট ব্যাগে কাপড় পুরে মাথার নিচে ঠেস দিয়ে মেঝেতে সটান হয়ে ইতোমধ্যেই শুয়েছিলো। ভারতী শ্রীরামকে বললো, ‘শিবিরের চারপাশে তোমার বরং শক্তভাবে অবস্থান করাই ভাল, যদি তুমি মহাত্মাজীর সাথে থাকতে চাও। এখানে তোমার কোনো আরাম থাকবে না, মনে রেখো। এভাবে থাকার জন্য আমরা সবাই প্রশিক্ষনপ্রাপ্ত।’ নাক সিঁটকে শ্রীরাম বললো, ‘ওহ্ , কে এখানে আরাম চায়? নিজের আরামের জন্য পরোয়া করি না। তোমার কি মনে হয় আমি সেই ব্যক্তি যার জীবনে বিলাসিতা দরকার?’ এক শ্রেণীর সমাজে বিলাসিতা সামাজিক মর্যাদা প্রদান করে, আর এখানে এখন তার বিপরীত। যতই কেউ বিলাসহীনতার কথা ঘোষণা করে ততই সে দুঃখ-কষ্টের দিকে ঝোঁক দেখায়, আর তত বড় সুযোগ মেলে তার এখানে প্রবেশ করার। শিবিরে পা দিতেই শ্রীরাম তা উপলব্ধি করেছিলো। এখানে ভোগান্তি ও মর্মাঘাতের প্রচলন আছে। সবাইকে মনে হলো প্রতিবেশীর অস্বস্তিকর পরিস্থিতি চমৎকারভাবে সামলাচ্ছে। এই স্পৃহা শ্রীরামকেও ধরে বসলো, যদিও বিশদ বুঝতে ও অভ্যস্ত হতে তার সময় লাগলো। সন্ধ্যায় সভা শেষ করার পর মহাত্মা যথারীতি সাড়ে সাতটায় বিছানায় গেলেন, আর পুরো শিবিরটার জন্যই এটি হচ্ছে বিছানায় যাওয়ার সংকেত। ভারতী শ্রীরামকে খুঁজে বের করে থালাভর্তি ভাত ও ঘোল এবং একটি কমলা দিলো। আর শিশুদের কোনো এক প্রতিনিধিবর্গ মহাত্মাকে যে ফুলের তোড়া দিয়েছিলো সেখান থেকে ছোট একটি জুঁই ফুল নিয়ে তাকে প্রদান করলো। শ্রীরাম কৃতজ্ঞচিত্তে ফুলটি গ্রহণ করে গন্ধ শুঁকলো এবং জিজ্ঞেস করলো, ‘তুমি কী করে জানলে যে আমি জুঁই ফুল পছন্দ করি?’ ‘সেটা জানা কঠিন কোনো কাজ নয়, ’ এই বলে সে তৎক্ষণাৎ বিষয়টি বাদ দিলো। সে বললো, ‘গোর্পদ নামে এক স্বেচ্ছাসেবকের সাথে তোমার ঘুমানোর একটা জায়গা পেয়েছি।’ শ্রীরাম কুটিরে প্রবেশ করার সময় গোর্পদ অর্ধ-ঘুমন্ত ছিলো। ভারতী উঁকি মেরে বললো, ‘ভাই... ’ আর হিন্দিতে কিছু একটা বললো এবং ঘুরে জায়গাটি থেকে অদৃশ্য হলো। অন্যজন হালকা মাথা তুলে বললো, ‘ভেতরে এসে ঘুমাতে পারো।’ ‘মেঝেতেই শুধু?’ শ্রীরাম জিজ্ঞেস করলো। ‘অবশ্যই, অবশ্যই, ’ অন্যজন বললো। ‘কেন? ’ শ্রীরাম জিজ্ঞেস করলো। ‘কেন? কারণ মহাত্মাজী তাই বলে।’ ‘ওহ্ , ’ বিপজ্জনক ভুমিতে সে হাঁটছে এমন বোধ করে শ্রীরাম বললো। ‘নইলে মেঝেতে ঘুমানোর আমি তো কোনো কারণ দেখছি না ।’ ‘ নইলে দ্বারা কী বোঝাতে চাচ্ছো? বাদানুবাদের সহিত অন্যজন বললো। শ্রীরাম গোর্পদের পাশে শুয়ে বললো, ‘আমি সেটা বোঝাতে চাইনি।’ ‘কী বোঝাতে চাওনি?’ অন্যজন বললো। তাকে কলহপরায়ণ মনে হলো। শ্রীরামের তাকে ভয় লাগলো। এই যোদ্ধার সাথে তাকে রাখার উদ্দেশ্য কী ভারতীর? এমন কি হতে পারে যে মেয়েটি তাকে অপছন্দ করে, আর চায় সে মার খাক? যদি সে অপছন্দই করতো, তবে তাকে জুঁই ফুল দিতো না। সবাই জানে যে জুঁই ফুল দেওয়া-নেওয়া হয় শুধু পরস্পর পছন্দ করে এমন দু’জনের মধ্যে। তারপরও মেয়েটি তাকে জুঁই ফুল দিয়েছিলো এক হাতে আর আরেক হাতে এই ভয়ংকর লোকটির কাছে ঠেলে দিলো। সে ঘুমালে পরে গোর্পদ তার বুকের উপর বসে তাকে শ্বাসরোধ করার চেষ্টা করতে পারে। গোর্পদ বললো, ‘তুমি এখানে নতুন, মনে হয়? ‘হ্যাঁ, ’ শ্রীরাম বললো। ‘এ জায়গায় আমি নতুন। মহাত্মাজীর দয়ায় আমি এখানে আছি, নইলে বাড়ি গিয়ে এতক্ষণে ঘুমাতাম।’ ‘হু, ’ সজীব আলোয় পরিস্থিতি বোঝার মতো ভাব করে গোর্পদ বললো। ‘তোমাকে এখানে স্বাগতম। আমাদের সবাইকে শিবিরে সেনাদের মতো করে থাকতে হয়। আমাদের দেশ থেকে ইংরেজদের বিতাড়িত করার যুদ্ধে আমরা প্রকৃতপক্ষে সেনাই। এ কাজের জন্য আমাদের জীবন উৎসর্গ করতে আমরা প্রস্তুত। এখানে খালি মেঝেতে ঘুমাই কারণ জীবনের বেশিরভাগ সময়টাই আমাদের জেলে কাটাতে হবে, যেখানে আমাদেরকে কোনো আরামদায়ক বিছানা দেওয়া হবে না যদি না আমরা এ বা বি শ্রেণীর কয়েদী হই। এ বা বি শ্রেণীতে পড়ার মতো গুরুত্বপূর্ণ আমরা নই, আর তোমার এসব কিছুতে অভ্যস্ত হওয়াই ভাল। পুলিশের হাতে মার খাওয়া, লাঠির গুঁতা খাওয়া, জেলে টেনে-হেঁচড়ে নেওয়া এমনকি গুলি খাওয়ার জন্য সবসময় আমরা প্রস্তুত। এক পুলিশের গুলিতে আমার বাবা দশ বছর আগে মারা গেছেন।’ রাজনৈতিক স্মৃতিচারণে আরো বেশি চরম হয়ে শ্রীরাম বললো, ‘আমি জানি ভারতীর বাবাও একইভাবে মারা গেছেন, পুলিশের পিটুনিতে।’ ‘১৯২০ সালে প্রথম অসহযোগ দিনগুলো ছিলো সেটি। মাদ্রাজে সচিবালয় থেকে ইউনিয়ন জ্যাক ছিনিয়ে নিতে সত্যাগ্রহীদের প্রথম যে ব্যাচটা ছিলো তাদেরকে তার বাবা নেতৃত্ব দিয়েছিলো। পুলিশের লাঠি দিয়ে তাকে পেটানো হয়েছিলো। বুকে একটা আঘাত লাগলে তিনি মাটিতে পড়েই মরে গেলেন, কিন্তু আমার বাবাকে গুলি করেছিলো। তুমি কি জানো তাকে আসলে পুলিশের রাইফেল দিয়ে গুলি করা হয়েছিলো? জনতার মধ্যে আমিও তাকে দেখছিলাম। তিনি একটা দোকানে পিকেটিং করছিলেন যেখানে তারা টোডি ও অন্যান্য মদ বিক্রি করছিলো। তখন একদল পুলিশ এসে তাকে চলে যেতে বললো, কিন্তু তিনি যেতে চাইলেন না। জনতা ভীড় করলো, অনেক গোলমাল হলো আর শেষে পুলিশ তাকে সরাসরি গুলি করলো।’ এটা স্মরণ করে সে অশ্র“ মুছে ফেললো। ‘ইংরেজদের ভারতের বাইরে না পাঠানো পর্যন্ত আমি ক্ষান্ত হবো না, ’ তার কণ্ঠস্বর দুঃখভারাক্রান্ত হলো। ‘আমার ভাই সন্ত্রাসী হলো, আর অনেক ইংরেজ কর্মকর্তাকে গুলি করে মেরে ফেললো। কেউ তার ঠিকানা জানে না। তার সাথে আমারও যোগ দিয়ে আরো অনেক ইংরেজকে গুলি করা উচিৎ ছিলো, কিন্তু আমাদের মহাত্মা চিন্তা-ভাবনাতেও সহিংস হতে দেবেন না, ’ মনস্তাপের সাথে সে বললো। শ্রীরাম অনেকটা সহানুভূতিশীল হতে চেয়ে বললো, ‘সব ইংরেজকে গুলি করা দরকার। তারা অনেক নির্দয় হয়ে গেছে।’ ‘ওসব ব্যাপারে তোমার চিন্তাও করা ঠিক নয়, যদি তুমি সত্যিকারের একজন সত্যাগ্রহী হতে চাও, ’ অন্যজন বললো। ‘না, না, ওসব নিয়ে আসলে ভাবছি না, ’ সঙ্গে সঙ্গে শ্রীরাম নিজেকে শুধরে নিলো। ‘আমার অনেক দুঃখ লাগছিলো। কাউকে গুলি করা সম্পর্কে কথা বলা আমাদের অবশ্যই উচিৎ নয়, আর অস্ত্রই বা কোথায়? আমাদের কোনো অস্ত্র নেই। ঠাকুরমা বলতো যে বাড়িতে বাবার একটা বন্দুক ছিলো। তুমি কি জানো তিনি মেসোপটেমিয়ায় মারা যান? তাকেও সরাসরি গুলি করা হয়েছিলো।’ ‘যুদ্ধে, গত যুদ্ধে মারা যান?’ ‘হ্যাঁ, ’ শ্রীরাম বললো। ‘তাহলে অবশ্যই ইংরেজ সেনাবহিনীর একজন সৈন্য হবেন, ’ গোর্পদ তার কণ্ঠস্বরে অবজ্ঞা নিয়ে বললো। শ্রীরাম তা খেয়াল করলো, কিন্তু বিনা প্রতিবাদে মেনে নিলো। পুষিয়ে নেওয়ার ভাব নিয়ে সে বললো, ‘তারা বলে তিনি একজন বড় মাপের সৈন্য ছিলেন।’ ‘সম্ভবত, সম্ভবত, ’ অন্যজন উৎসাহদানের স্বরে বললো। শ্রীরাম একে বিচার হিসাবে মেনে নিলো। সে রাতে সে প্রচুর রাজনৈতিক জ্ঞান লাভ করলো। গোর্পদ রাত দু’টো পর্যন্ত কথা বলেই গেলো এবং পরে তারা দুজনেই নদীর উদ্দেশ্যে রওয়ানা দিলো, সেখানে হাত-পা ধৌত করলো এবং যে সময় নাগাদ শিবিরের সবাই জেগে উঠলো, সে সময় নাগাদ শ্রীরাম পরিস্কার-পরিচ্ছন্ন হয়ে ফিরে এলো, যার ফলে ভারতী বললো, ‘প্রথম দিনটা আমাদের সাথে খুব ভালভাবেই শেষ করলে।’ মনোযোগ দিয়ে গোর্পদের কথা শোনার মাধ্যমে সে অনেক রাজনৈতিক শব্দ শিখে ফেলেছিলো এবং বিব্রতকর অবস্থা ছাড়াই মহাত্মার সাথে হাঁটতে নিজেকে প্রস্তুত মনে করলো। সে মহাত্মাকে বললো, ‘জীবনে আমার সবচেয়ে বড় আকাঙ্খা হলো ভারত থেকে ইংরেজদের উচ্ছেদ করার শপথ নেওয়া।’ হাসি দিয়ে মহাত্মা তার দিকে তাকালেন এবং জিজ্ঞেস করলেন, ‘এটা কীভাবে সমাধা করার প্রস্তাব করো তুমি?’ শ্রীরাম কোনো তৈরী উত্তর খুঁজে পেলো না। সে যে অযথা কথা বলেছিলো এরকম অনেক উপলক্ষের মধ্যে এটি একটি ছিলো। অন্যপাশে ভারতীকে সে এক নজর দেখলো, তার দুষ্টামিভরা মুখখানি শ্রীরামের এমন বিভ্রান্তির আনন্দে ঝলমল করে উঠলো। তার চাহনি শ্রীরামের আত্মসম্মানে আঘাত হানলো। দম্ভভরে সে বললো, ‘আপনার আশীর্বাদ পেলে, স্যার, আমি কাজটার জন্য যথেষ্ট যোগ্য হিসাবে নিজেকে গড়ে তুলবো। যতদিন সম্ভব আমি আপনার সাথে থাকবো, আর দয়া করে আপনি যদি আমাকে পথনির্দেশ করেন, তবে আমাদের দেশ ছাড়াতে ইংরেজদের সাথে যুদ্ধ করতে আমাকে একজন যোগ্য সৈনিক হিসেবে গড়ে তুলতে পারবেন।’ মহাত্মা তার দৃঢ়সংকল্পে আনন্দের প্রতিটি চিহ্ন প্রদর্শন করলেন। তিনি কিছুক্ষণ নীরব থাকলেন যখন তারা মৃদু পায়ে বালুর উপর হাঁটছিলো, সবার উপর গভীর নীরবতা দেখা দিলো। ‘ঠিক আছে, তরুণ বন্ধু, ভগবান চাহে তো তুমি বড় কিছু করতে পারবে, তার উপর বিশ্বাস রাখলে তোমার সবকিছু ঠিক থাকবে।’ একে সৈনিক হিসেবে টিকে থাকার জন্য বেশ নীরস প্রস্তুতি মনে হলো শ্রীরামের কাছে। যদি সম্ভব হতো সে খাকি পোশাকে ও শোভাকৃত বুকে ভারতীর সামনে বুক ফুলিয়ে হেঁটে যেতো, যদিও বিশ্বে তখন শোভার আতিশায্যে অরুচি ধরেছিলো। তার ধারণা দূর করে মহাত্মা এখন নিজেই কথা বললেন: ‘এ দেশ থেকে ইংরেজদের তাড়িত করতে চাওয়ার আগে তোমাদের প্রথা থেকে সহিংসতার প্রতিটা চিহ্নকে অবশ্যই তাড়াতে হবে। মনে রেখো যে এ যুদ্ধ লাঠি ও চাকু বা বন্দুক দিয়ে হবে না, শুধু ভালবাসা দিয়ে হবে। যে পর্যন্ত তুমি নিশ্চিত না হও যে তোমার শত্র“র জন্য তোমার হৃদয়ে প্রবল ভালবাসা আছে, সে পর্যন্ত তাকে তাড়িয়ে দেওয়ার কথা চিন্তা করো না। তোমাকে ধীরে ধীরে “শত্র“” শব্দটি ভুলে যেতে হবে। তাকে অবশ্যই বন্ধু ভাবতে হবে যে তোমাকে অবশ্যই ছেড়ে যাবে। শতভাগ অহিংস সৈনিক হওয়ার জন্য তোমাকে অবশ্যই প্রশিক্ষণ নিতে হবে। তোমাকে এতো স্পর্শকাতর হতে হবে যে জবাই করা পশুর চামড়ার তৈরী স্যান্ডেল তোমার পড়া যাবে না; স্বাভাবিকভাবে মরে যাওয়া প্রাণীর চামড়া সংগ্রহ করতে না পারলে, অর্থাৎ তোমার জন্য মেরে ফেলা পশুর চামড়া পরার থেকে বরং খালি পায়ে চলা তোমাকে বেছে নিতে হবে। ’ শ্রীরাম বললো, ‘জ্বী, প্রতিজ্ঞা করছি, ’ কিন্তু বলার সময় তার চোখ দুটো মহাত্মাজীর পায়ে নিবদ্ধ হলো; তার মনে উছলে পড়া প্রশ্ন দমন করতে প্রাণপণে চেষ্টা করলো সে। মহাত্মা তার মনের চিন্তা পড়ে বললেন, ‘হ্যাঁ, এগুলো ঠিক এরকম চামড়ার তৈরী স্যান্ডেল। বর্ধে আমাদের ট্যানারিতে আমরা এটা বিশেষভাবে বানাই। আমাদের আশ্রমের কেউ অন্য কিছু পরে না।’ শ্রীরাম জিজ্ঞেস করতে চাইলো, ‘কেমন করে জানবেন কোন পশু কখন মারা যাচ্ছে, আর কেমন করে তা দেখবেন?’ কিন্তু অপদার্থের মতো প্রশ্নটি নির্দয়ভাবে সে চেপে গেলো পাছে তার আসল রূপ ধরা পড়ে। শ্রীরামকে বলা হয়েছিলো যে সে গ্রামে গ্রামে মহাত্মাজীর সাথে যেতে পারবে এই শর্তে যে বাড়ি গিয়ে ঠাকুরমার অনুমতি নিয়ে আসতে হবে। শ্রীরাম বিষয়টি আড়াল করার চেষ্টা করে বললো যে এর প্রয়োজন হবে না, সে ইঙ্গিত দিলো বাসা থেকে বের হওয়ায় অভ্যস্ত একজন স্বাধীন মানুষ সে। মহাত্মার স্মৃতি এর থেকেও ভাল ছিলো। হাসি দিয়ে তিনি বললেন, ‘আমার মনে আছে তুমি বলেছিলে যে আমাদের সাথে তুমি মিশছো সেটা দেখতে তিনি পছন্দ করতেন না।’ শ্রীরাম ভেবে বললো, ‘জ্বী, গুরু, কিন্তু কীভাবে চিরকাল আমি তার আঁচলে বাধা থাকতে পারি? এটা সম্ভব নয়।’ ‘তুমি কি একেবারে নিশ্চিত যে তুমি তোমার জীবন ধরণ পাল্টাতে চাও?’ মহাত্মা জিজ্ঞেস করলেন। ‘আমি অন্য কিছু ভাবতে পারছি না, ’ শ্রীরাম বললো। ‘এত বছর যেভাবে জীবন যাপন করেছি এখন কীভাবে সেরকম জীবন যাপন করতে পারি?’ ভারতীর দিকে সে চকিত চাহনি ফেললো যখন ভারতী মহাত্মার জন্য ভেতর থেকে কিছু চিঠি নিয়ে এলো। তার চাহনি তাকে বাক্যটি শেষ করতে দিলো না, যে বাক্যটি হতে পারতো, ‘আর আমি সবসময় চাই ভারতীর সাথে থাকতে, আমার ঠাকুরমার সাথে নয়।’ মহাত্মা বললেন, ‘যতদিন চাও তুমি আমাদের সাথে থাকবে, আর তাতে আমি খুশি হবো, কিন্তু তোমাকে অবশ্যই সর্বপ্রথমে বাড়ি গিয়ে ঠাকুরমার কাছে বলে তার আশীর্বাদ নিতে হবে । তুমি কী করতে চাও তা তাকে অকপটে জানাতে হবে, কিন্তু তাকে অবশ্যই কোনো ব্যথা দেওয়া যাবে না।’ শ্রীরাম ইতস্তত করলো। ঠাকুরমার মুখোমুখি হওয়ার ব্যাপারটিতে সে বিচলিত হয়ে উঠলো। তার সম্পর্কে চিন্তাটা ছিলো অবাস্তব ঝামেলাপূর্ণ জগতের চিন্তার মতো, যে জগতকে সে আশা করেছিলো চিরদিনের জন্য পিছনে ফেলে এসেছে। এখন তার বাস্তব জগত ছিলো ভারতী, গোর্পদ, জবাই না করে স্বাভাবিকভাবে মরে যাওয়া পশু, মহাত্মা, চরকার জগত। সব সময়ের জন্য সে এখানে থাকতে চাইলো: কবির সরণী, সেই বারান্দা, সেই দোকান ও সেইসব মানুষ যারা তাকে আট বছরের বালকের মতো মনে করতো তাদের কাছে ফিরে যাওয়া তার কাছে অসম্ভব মনে হলো। ঠাকুরমার কাছে গিয়ে তার মুখোমুখি হওয়ার জন্য তাকে জোরাজুরি না করার আবেদন জানানোর জন্য যেন সে মহাত্মার সামনে দাঁড়ালো । কিন্তু গুরু ছিলো অবিগলিত। ‘যাও তার সাথে কথা বলো। আমার মনে হয় না তোমার আকাঙ্খাকে অস্বীকার করার মতো তিনি এতটা অযৌক্তিক । তাকে বলো যে আমি তোমাকে আমার সাথে পেতে চাই। আমার সাথে পরের দুই সপ্তাহ বের হলে তুমি অনেক কিছু দেখবে ও শিখবে যা তোমার পরবর্তী জীবনে কাজে আসতে পারে। তাকে বলো যে তোমাকে যেতে দিয়ে তিনি আনন্দবোধ করবেন। তাকে আশ্বস্ত করো যে তোমাকে আমি নিরাপদে দেখাশুনা করবো।’ প্রতিটি শব্দ তাকে আতঙ্কে ভরে তুললো যখন তার মনে পড়লো সেই শব্দগুলো যেগুলো দিয়ে ঠাকুরমা মহাত্মাকে উল্লেখ করেছিলো। ঠাকুরমা কীভাবে তার প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করবেন তার সামান্যতম কোনো চিহ্ন প্রদান করতে তার সাহস হলো না। মহাত্মার জন্য তার দয়া হলো, এতো নিস্পাপ যে কেউ তার সম্পর্কে খারাপ কিছু বলার স্বপ্নও সে দেখতে পারলো না। ঠাকুরমার কথা ভেবে সে রাগান্বিত হলো, এমনই খারাপভাবে তিনি জানেন, এমনই অজ্ঞ ও গোঁড়া ব্যক্তিত্ব! কী কাজে তাকে তার অস্তিত্বকে এভাবে জটিল করে তুলতে হয়েছিলো? ইচ্ছেমতো চলতে পারলে সে ঠাকুরমাকে উপেক্ষা করতে পারতো, কিন্তু এখন তাকে মহাত্মাকে মেনে চলতে হলো। সে বললো, ‘ঠিক আছে, স্যার। আমি বাসায় গিয়ে ঠাকুরমার আশীর্বাদ আনবো। আগামীকাল সকাল সকাল ফিরে আসবো।’ পথে ছয় ছয়বার ফিরে এসে মহাত্মাকে বলার জন্য সে দৃঢ়সংকল্প হলো যে ঠাকুরমার সাথে সে দেখা করেছে। কীভাবে তিনি সত্যটা খুঁজে পাবেন? কিন্তু এ ভাবনাকে অবাস্তব হিসেবে সে বাদ দিলো, যদিও এমন পরিস্থিতিতে হয়তো তত অকাজের না। আচ্ছা যদি এমন হয় ঠাকুরমা চেঁচামেচি করা শুরু করলো, অজ্ঞান হলো অথবা আত্মহত্যার হুমকি দিলো, আর প্রতিবেশীদের জড়ো করার মতো যথেষ্ট গোলমাল করলো, যারা বাসায় এসে তাকে তালাবদ্ধ করে রেখে বাইরে যেতে দিলো না? গান্ধীজীকে বলার জন্য তার কি এ ঝুঁকি নেওয়া উচিৎ হবে যে সে একরোখা বৃদ্ধ ভদ্রমহিলাকে পরিকল্পনামাফিক দেখেছে? যৌক্তিক মানুষের মতো বলা কি বিচক্ষণ হবে না যে কাজটি হয়ে গেছে? ঠাকুরমা হয়তো অনুমান করে নেবে যে এসবের পিছনে ভারতী ছিলো এবং সে মহাত্মাজী সম্পর্কে যা বলবে তা অবিশ্বাস করবেন। অথবা তিনি যদি মহাত্মাজীর সম্পর্কে অপমানজনক কথা বলেন, তবে ধৈর্য্যসহকারে সে তার কথা শুনতে পারবে না। সে এমন কিছু করতে পারে যার জন্য সে পরে দুঃখবোধ করবে। মানস চোখে সে শক্তি ও সহিংসতা দিয়ে ঠাকুরমার কথা দমন করা দেখলো। কিন্তু তার মনে পড়লো এরকম কাজ করা ঠিক হবে না যেখানে মহাত্মা জড়িত। এটা শুনলে তিনি বিচলিত হবেন। এখন যা করার হা হচ্ছে ঘোড়ার গাড়িটা ঘুরিয়ে নিয়ে মহাত্মাকে বলা যে সে ঠাকুরমার আশীর্বাদ নিয়ে এসেছে। কিন্তু তখন , এটা মহাত্মা হওয়ায়, তিনি তার চিন্তা ধরে ফেলে তাকে ঠাকুরমার কাছে ফেরত পাঠাতে পারেন অথবা যে পর্যন্ত না তিনি আশ্বস্ত হন যে ঠাকুরমার সাথে দেখা হয়েছে সে পর্যন্ত তাঁর কর্মসূচী বাতিল করে রাখতে পারেন কিংবা এটা না হলে তিনি অনশন শুরু করতে পারেন। মহাত্মা ঠাকুরমাকে কেন এত গুরুত্ব দিচ্ছেন যখন করার মতো তাঁর এত কিছু আছে? ইংরেজদের তাড়ানোর মতো গুরুত্বপূর্ণ কাজ যখন তাঁর হাতে আছে, তখন ঠাকুরমার মতো সাধারণ বিষয় আমার হাতে ছেড়ে দেওয়া উচিৎ ছিলো। ঘোড়ার গাড়িতে চড়া অবস্থায় তার চিন্তাগুলো বিভ্রান্তিকর বিশৃঙ্খলায় ছিলো, কিন্তু শীঘ্রই ঘোড়াটি তাকে কবির সরণীতে পৌঁছে দিলো। দর কষাকষি না করে সে ভাড়া মেটালো এবং গাড়িটিকে শান্তভাবে পাঠিয়ে দিলো। সে চায়নি তার গতিবিধি প্রতিবেশীদের কাছে লক্ষণীয় হয়ে উঠুক। ঠাকুরমাকে সে অর্ধ-প্রীতিকর মেজাজে দেখতে পেলো। শ্রীরামের দীর্ঘ অনুপস্থিতি তাকে অস্থির করে তুলেছে মনে হলো। তিনি তার প্রতি সদয় হতে চেষ্টা করলেন। তার হয়তো আশঙ্কা ছিলো সে বাড়ি থেকে গটগট করে চলে যাবে যদি গতকালের মতো তার সাথে আচরন করে। তার কণ্ঠস্বর থেকে বকুনির সব রকম চিহ্ন তুলে নিয়ে তিনি এইটুকু বললেন: ‘কত দীর্ঘ সময় তুমি দূরে ছিলে, বাছা।’ তিনি শান্ত থাকার ভান করলেন। সে ঠাকুরমার জন্য কিনে আনা ক্যানভাস চেয়ারটি টেনে হল বাতির নিচে বসে পড়লো। ঠাকুরমা অস্থির হয়ে উঠলেন যেন তিনি অনেকদিন ধরে হারানো কাউকে ফিরে পেয়েছেন। এক থালা ঘি ভাজা খাবার তার সামনে রেখে তিনি বললেন, ‘এটা উকিলের বাড়ি থেকে পাঠিয়েছে: তার অষ্টম পুত্রের প্রথম জন্মদিন। মনে হয় না তারা কোনো সন্তানের জন্য কোনো কিছু মিস করে।’ এক টুকরো মুখে দিয়ে শ্রীরাম কড়মড় করে চিবালো। মাথা নেড়ে সায় দিয়ে সে বললো: ‘হ্যাঁ, খাঁটি ঘি দিয়ে তৈরী করেছে। ভালো মানুষ।’ কচকচ শব্দ করে সে চিবালো। ঠাকুরমা বললেন: ‘তোমার জন্য এটা তুলে রেখেছিলাম, আমি জানতাম এটা তোমার ভাল লাগবে। ভাবছিলাম কত সময় তুলে রাখবো। জানোই তো আমার দাঁত নেই। তুমি যখন এখানে নেই, তখন ওরকম খাবার কে চায়? সবটুকু খেয়ে ফেলো না, রাতের খাবার খেতে পারবে না।’ ‘ওহ্ , রাতের খাবার! রাতের খাবার খেয়েছি, ঠাকুরমা।’ ‘এত তাড়াতাড়ি!’ ‘হ্যাঁ, আশ্রম শিবিরে, সাধারণত সাতটার আগেই আমাদেরকে খেতে হয়। এটাই নিয়ম।’ ‘সাতটায় আবার কী ধরণের ডিনার হয়!’ হতাশ হয়ে তিনি চিৎকার করে বললেন, ‘এসো আবার খাবে, এখন তোমার আসল ডিনারের উপযুক্ত হওয়া উচিৎ।’ ‘না, ঠাকুরমা। সবকিছু খুব কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ করা হয়। চাইলেই আমরা সবকিছু করতে পারি না। সব বিষয়ে নিয়ম-কানুন আমাদের মেনে চলতে হয়। ওখানে আমরা ভাল খাবারই পেয়ে থাকি।’ ‘এর জন্য তোমাকে টাকা দিতে হয় না?’ ঠাকুরমা জিজ্ঞেস করলেন। ‘অবশ্যই না, ’ শ্রীরাম বললো। ‘তোমার কী মনে হয়, তুমি কি মনে করো মহাত্মাজী হোটেল খুলে বসে আছেন?’ ‘তাহলে তারা তোমাদের খাওয়ায় কেন?’ ‘কারণ আমরা সেখানে থাকি।’ ‘তারা কি প্রচুর গণ খাবার খাওয়ায়?’ শ্রীরামের মেজাজ এতে ঠিক থাকলো না। ঠাকুরমার এত গভীরে যাওয়ায় সে শঙ্কিত হলো। ‘আমি বললাম যারা ওখানে থাকে সবাইকে তারা খাওয়ায়, তুমি কি তা বোঝোনি?’ ‘কেন তারা তোমাদের খাওয়াবে?’ ‘কারণ আমরা হচ্ছি স্বেচ্ছাসেবক।’ ‘চমৎকার স্বেচ্ছাসেবক!’ যে কোনো মুহূর্তে গতকালের মেজাজ তার ফিরে আসতে পারে এই হুমকি দিয়ে চিৎকার করে তিনি বললেন। ‘আর তোমাদের কী খেতে দেয়?’ ‘চাপাতি, দই, ঘোল ও শাকসবজি।’ ‘আমার আনন্দ লাগছে। আমি ভয়ে ছিলাম যে তারা তোমাদের ডিম ও মুরগী খেতে বাধ্য করবে।’ শ্রীরাম আতঙ্কগ্রস্ত হলো। ‘মহাত্মাকে তুমি কী মনে করছো! জানো, জবাই করা পশুর চামড়া দিয়ে তৈরী স্যান্ডেলও তিনি পরেন না!’ ঠাকুরমাকে এক চিলতে হাসি ধরে বসলো। গাল বেয়ে অশ্র“ গড়িয়ে গেলো। ‘স্যান্ডেল পড়বে না!’ অনিয়ন্ত্রিত হাসির মধ্যে চিৎকার করে বললেন। ‘এমন কথা তো আগে কখনো শুনিনি! কীভাবে চলে তাদের? জবাই করার আগেই পশুর চামড়া ছিলে ফেলে, তাই না?’ ‘চুপ করো, ঠাকুরমা!’ মহারোষে শ্রীরাম চিৎকার করে বললো। ‘ কী দায়িত্বজ্ঞানহীন পরচর্চাকারী তুমি! তোমাকে কখনো এত খারাপ ভাবিনি!’ ঠাকুরমা এই প্রথম বারের মতো তার নাতির মধ্যে অগ্নিময় ব্যাগ্রতা খেয়াল করলেন এবং নিজেকে সামলে নিয়ে বললেন: ‘ওহ্ ! তিনি তোমার ভগবান, তাই না?’ ‘হ্যাঁ, তিনি ভগবান। আমি শুনতে চাই না তাঁর সম্পর্কে কেউ হালকাভাবে কথা বলুক।’ ‘আমার মতো অজ্ঞ ডাইনি বুড়ি আর কী জানতে পারে! আমি কি সংবাদপত্র পড়ি? বক্তৃতা শুনি? কে কী তা কি আমাকে বলা হয়েছে? ঐ গান্ধী মানুষটা সম্পর্কে কোনো কিছু আমি কী করে জানবো!’ ‘তিনি মানুষ নন; তিনি একজন মহাত্মা!’ শ্রীরাম চিৎকার করে বললো। ‘আচ্ছা, তুমি মহাত্মার সম্পর্কে কী জানো?’ ঠাকুরমা জিজ্ঞেস করলেন। শ্রীরাম অস্থির হয়ে রাগে চেয়ারে নিজেকে দোলাতে লাগলো। এ ধরণের পরিস্থিতির মোকাবেলা করার জন্য সে প্রস্তুত হয়ে আসেনি। তার অনুপস্থিতিতে বিষন্ন হয়ে থাকবেন, সে চলে যেতে চাইলে ঝামেলা করবেন এবং লঘুপণার থেকে বেশি দুঃখ ও রাগ প্রদর্শন করবেন এসব মোকাবেলা করার প্রস্তুতি নিয়েই শুধু এসেছিলো সে । কিন্তু এখানে সামান্যতম দায়িত্ববোধ বা সম্মান না দেখিয়ে তিনি পুরো হঠকারী ও ছ্যাবলার মতো আচরন করলেন। এ রকম পরিস্থিতির কথা সে আগে ভাবেনি, আর একে মোকাবেলা করার মতো তার কোনো কৌশলও ছিলো না। তার উপলব্ধি হলো ন্যায়নিষ্ঠ উষ্মা প্রদর্শন করে কোনো লাভ নেই: এতে বুড়ো ভদ্রমহিলার সুড়সুড়ি আরো বেড়ে যাবে। তার অনুমতি নিয়ে যাওয়ার সময় যখন হবে, তখন তিনি খুব বেশি অনিয়ন্ত্রিত হতে পারেন। প্রতিবেশীদের ডেকে এনে তাকে নিয়ে কৌতুক করতে পারেন। সে সিদ্ধান্ত নিলো তাকে অবশ্যই কৌশল বদলাতে হবে। হঠাৎ করে লাফিয়ে সে জিজ্ঞেস করলো: ‘ঠাকুরমা, তুমি খেয়েছো তো? এমন করে কথা বলে তোমাকে খাওয়া থেকে দূরে রাখছি!’ ‘তাতে কিছু এসে যায় না,’ প্রায় খিলখিল করে হাসার মুহূর্তে তিনি বললেন। ‘কত বছর হলো রাতে মুখ ভরে ভাত খাওয়ারÑÑÑ প্রায় বিশ বছর তো হবেই। তোমার জীবনে তুমি আমাকে রাতে খেতে দেখোনি।’ তার কণ্ঠে এত অহংকার ছিলো যে শ্রীরাম বলতে বাধ্য হলো: ‘এতে অসাধারণ কিছু নেই। না খেয়ে যে কেউ থাকতে পারে।’ সে আরো বলতে চাইলো, ‘মহাত্মা প্রায়ই একটানা এত দিন না খেয়ে থাকেন, ’ কিন্তু চেপে গেলো। বৃদ্ধ ভদ্রমহিলাকে অবশ্য কোনো কিছুর বলার প্রয়োজন হলো না। তিনি সঙ্গে সঙ্গে বললেন, ‘না! মহাত্মা গান্ধী না খেয়ে থাকলে সবাই তা নিয়ে কথা বলে।’ ‘আর তুমি শুধু রাতে না খেলে, কেউ তা খেয়াল করে না। এটাই শুধু তোমার ও গান্ধীজীর মধ্যে তফাৎ’ যে তীক্ষèভাবে সে কথা বললো তাতে তিনি অবাক হলেন। তিনি জিজ্ঞেস করলেন: ‘তুমি কি রাতে খেতে চাও?’ ‘হ্যাঁ, শুধু তোমাকে সন্তুষ্ট করার জন্য, ব্যস। আমার ক্ষুধা লাগেনি, তা তোমায় বলেছি। আর এই খাবারটা ভাল, ভাল ঘি দিয়ে বানানো। তুমি তাদেরকে এটা বলতে পারো। এর অনেকটা আমি খেয়েছি। আর আমি ক্ষুধার্ত নই।’ এই সব অপ্রত্যাশিত পরিবর্তনের পর ঠাকুরমা তার আসল মেজাজে ফিরে গেলেন। আগ্রহভরে বললেন: ‘তোমাকে অবশ্যই রাতে খেতে হবে, বাছা, ’ বিশিষ্ট পরিদর্শকের মতো তিনি যেন আবার ব্যস্ত হয়ে উঠলেন। রান্নাঘরের র্যাকের বোঝা থেকে একটা খাবার পাল্লা টেনে মেঝেতে বিছালেন, একটু জল ছিটালেন, ও ভাত রাখা ব্রোনজের পাত্রটি কাছে টেনে নিলেন এবং বসে পড়লেন যাতে করে তাকে খাবার পরিবেশন করতে পারেন ও সে আবার উঠে না যায়। ছোট প্রদীপের শিখা কাঁপছিলো। সে নীরবে খেয়ে সুপ্রাচীন কাঁসার পানপাত্র থেকে জল পান করলো; প্রাচীন ব্রোনজের পাত্রটির দিকে সে দৃষ্টি নিক্ষেপ করলো যার থেকে বছরের পর বছর ধরে তাকে খাবার পরিবেশন করা হয়েছিলো। এটা দেখে হঠাৎ সে বিষন্ন হলো। সে এই ভাবনা পীড়িত হলো যে এইসব পুরাতন সঙ্গ সে ত্যাগ করছে, আর এটা সত্যিই বিদায় উৎসব। সে এখান থেকে অজানা জীবনে যাচ্ছে। ভগবান জানেন তার কপালে কী আছে। এ সব ভেবে সে অনেকটা বিষন্ন হলো। সে জানতো তার পরিকল্পনা, অথবা মহাত্মা কিংবা ভারতীকে নিয়ে ঠাকুরমার সাথে কথা বলে কোনো লাভ ছিলো না । এসব পুরোপুরি তার বোধগম্যতার বাইরে। প্রতিবেশীকে কৃচ্ছ্বতাসাধন দিয়ে মুগ্ধ করার জন্য তিনি শুধু খাবার-দাবার, ডিনার ও রাতে উপবাস থাকা এসব বুঝতেন। তার সাথে কোনো কিছু নিয়ে কথা বলে কোনো লাভ নেই। সবচেয়ে ভাল কোনো গোলমাল না করে সকালে চলে যাওয়া। মহাত্মাজীর আদেশ মান্য করতে গিয়ে সে তার সাথে দেখা করে কথাও বলেছে। মহাত্মার সন্তুষ্ট থাকা উচিৎ এবং এটা প্রত্যাশা করা উচিৎ নয় যে সে বৃদ্ধ ভদ্রমহিলার দৃষ্টিভঙ্গিতে পরিবর্তন আনবে, যা তার আশীর্বাদ পাওয়ার জন্য যথেষ্ট। ঠাকুরমার অনেক বয়স হয়েছিলো, সম্ভবত আশি, নব্বই অথবা একশো। সে কখনো ঠিকভাবে তার বয়স নিরূপণ করতে চেষ্টা করেনি। আর তিনি নতুন বিষয় বুঝবেন না। গভীর রাতে নিজেকে আশ্বস্ত করলো যে ঠাকুরমা গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন হলে সে ঘুম থেকে উঠে প্রদীপটার পাশে একটা চিরকুট লিখে গোবরাটের উপর জল রাখা কাঁসার পাত্রটিতে রেখে যাবে। সকালে তিনি গোবরাটটিই প্রথমে তুলতে যাবেন। চশমা খুঁজে পেতে কষ্ট হলে তিনি চিরকুটটা প্রতিবেশীদের কাছে গিয়ে পড়িয়ে নেবেন। সম্ভবত তিনি প্রতিবেশীদের দ্বারা এটি পড়িয়ে নেবেন না। সবসময় তো চিৎকার করতেন: ‘শ্রীরাম, আমার চশমা, কোথায় রাখলাম এটা?’ যখনই পড়ার জন্য কোনো কিছু তার হাতে আসতো। আর কাবার্ডের দিকে গিয়ে চশমাটা এনে দেওয়া তার কর্তব্য ছিলো। এবার সে আগেভাগেই সে কর্তব্য পালন করলো। পা টিপে আলমারির দিকে গিয়ে চশমাটি নিঃশব্দে খাপমুক্ত করে হলে ফিরে গেলো। কিন্তু খাপটি খোলা রাখলো, কারণ বন্ধ করতে গেলে এটি জোরে শব্দ করতো। বিদায়ের চিঠিটার পাশে সে চশমাটা রেখে নিঃশব্দে দরজা খুলে রাতের অন্ধকারে পা বাড়ালো। ২ সে দলটির সর্বজনস্বীকৃত একজন সদস্য হয়ে গেলো, আর অনেক গ্রামে মানুষজন তাকে নিয়ে ত্রস্তব্যস্ত হওয়ায় ও সম্মান দেখানোয় সে আনন্দিত হলো। তারা তার দিকে বিস্ময়ের দৃষ্টিতে তাকালো। ভারতী ও গোর্পদের সাথে সে ত্রয়ী গঠন করলো। মহাত্মার সম্পর্কে গ্রামবাসীরা কোনো কিছু জানতে চাইলে, তারা এসে তাদের কাছে শ্রদ্ধার সাথে কথা বললো। আর এতে গোর্পদ ও ভারতীর সংস্পর্শে অর্জিত জ্ঞান কাজে লাগানোর সুযোগ সে লাভ করলো। এতে লিপ্ত থেকে এ কাজকে জানার একটা উপায় হলো। তখন পর্যন্ত গ্রামীণ জীবন সম্পর্কে তার কোনো ধারণা ছিলো না। মালগুদি শহরে ছিলো তার জন্ম ও বেড়ে ওঠা। আর এমনকি সেখানে মহাবিশ্বের সীমানা সম্পর্কে তার ধারণা ছিলো কবির সরণী, বাজার রোড, অন্য দু’একটা জায়গায় আবদ্ধ। “গ্রাম” শব্দটি শুনলেই তার মানসপটে ডাবের বাগান, সুদীর্ঘ ও বহু পদক্ষেপে বিশাল ট্যাংকের দিকে হাঁটা, কলসী কাঁখে মার্জিত পল্লী নারী এবং ট্যাংক বান্ডের ওপারে মন্দিরের মোচাকার চূড়া, প্রশস্থ বারান্দাসহ নিচু ছাদের বাড়ি এবং গলায় ঝোলানো টুং টাং আওয়াজ করা ঘন্টাধ্বনিসহ ষাঁড়, গাড়িয়ালের সব সময় গান গাওয়ার ছবি ভেসে উঠতো। এ ধারণাটি সে লাভ করেছিলো রিশাল হলে অনেকগুলো তামিল ছবি দেখার ফলে। কিন্তু এখানে সে রকম কিছু সে দেখলো না। বাস্তবতা ছিলো ভিন্ন। কিছু কিছু গ্রামে কয়েকটা কুটিরের বেশি ছিলো না। এই প্রথম বারের মতো সে আসল গ্রাম দেখলো, আর গ্রামে প্রথম দিনে মালগুদি থেকে দশ মাইল দূরে সে এত হতচকিত বোধ করলো যে সে গোপনে ভারতীকে জিজ্ঞেস করলো: ‘গ্রামটা কোথায়?’ ‘কোন গ্রাম?’ ‘কেন, যে কোনো গ্রাম, ’ সে বললো। ‘এটা কি তোমার কাছে গ্রামের মতো লাগছে না?’ ভারতী জিজ্ঞেস করলো। ‘না, ’ সে উত্তর দিলো। মহাত্মা সন্ধ্যায় বিছানায় গেলে তারা আলাপ করার সময় পেলো। ‘কী করুণ ব্যাপার, ’ ভারতী বললো, ‘যে এটা এমন। কিন্তু শেখো, যুবক, এটাই আসল গ্রাম। মিথ্যে বলছি না। আমাদের দেশে কমবেশি এরকম সাতশ হাজার গ্রাম আছে।’ ‘তুমি কী করে জানো?’ আলাপ দীর্ঘ করার জন্য শ্রীরাম জিজ্ঞেস করলো। ‘জ্ঞানী লোকদের কাছ থেকে শিখি, ’ সে বললো। ‘কত জ্ঞানী?’ শ্রীরাম জিজ্ঞেস করলো। তার ছ্যাবলামি উপেক্ষা করে ভারতী তাদের মিশন নিয়ে কথা বলতে শুরু করলো। যে গ্রামগুলো সম্প্রতি দুর্ভিক্ষ পীড়িত হয়েছে সে গ্রামগুলোতে জরিপ চালাতে তারা বের হয়েছিলো। এটা দয়াজাত মিশন ছিলো; দুর্ভিক্ষ নিয়ে প্রত্যক্ষভাবে গবেষণা করার জন্য এবং পীড়িতদের মধ্যে মনোবল ও আশা সঞ্চারের জন্য উদ্যোগ ছিলো এটি। এ যাত্রায় মহাত্মা এত বেশি গুরুত্ব দিয়েছিলেন যে তিনি অন্য সব কাজ বাতিল করেছিলেন। ইউরোপে যুদ্ধ হওয়ায় এবং সম্ভবত দূরপ্রাচ্যে তা শুরু হওয়ার উপক্রম হওয়ায়, তার প্রভাব এখানে পড়েছিলো। বোমা না মারা হলেও তারা এখনো যুদ্ধের কারণে ভুগছিলো; কেউ এ. আর. পি. অথবা কোনো যুদ্ধের পোস্টার দেখেনি, কিন্তু পথের পাশের ছোট ছোট স্টেশনগুলো পশ্চিম ইউরোপে ব্যাপক যুদ্ধ ভাণ্ডারের গুরুত্বপূর্ণ সংযোগ, রসদ যোগানো চ্যানেল হিসেবে কাজ করছিলো। স্টেশনের সংযুক্ত ছোট লাইনের মালবাহী ট্রেনগুলো দিনরাত মেমপি বনের কাঠ, এখানে উৎপাদিত ভূট্টা এবং নিজের জমিতে কাজ করে এমন সক্ষম দেহের লোকজনকে বহন করে নিয়ে যাচ্ছিলো। পরিপার্শ্ব যতই ভয়ানক হোক না কেন, শ্রীরাম ও ভারতী কিছুই খেয়াল করলো না বলে মনে হলো। পরস্পরের সঙ্গলাভে তাদের আনন্দ হলো যা পরিপার্শ্বের বিষন্ন ভাবের উপশম ঘটালো। শুদু গোর্পদকে করুণবোধে পীড়িত দেখালো। সে কম কথা বললো, আগে আগে শুতে গেলো এবং উত্তোরোত্তর মর্ম যাতনা বোধ করলো। সে বললো: ‘দেখো ইংরেজরা আমাদের দেশের কী অবস্থা করেছে: এই দুর্ভিক্ষ হচ্ছে আমাদেরকে দাস করে রাখার জন্য তাদের কারসাজি। তাদের যুদ্ধ যন্ত্র চলমান রাখার জন্য তারা বন ও মাঠ লুণ্ঠন করছে, আর এর প্রকৃত ভৃক্তভোগী হচ্ছে এই শিশুটি।’ যেকোনো পল্লী শিশু যার এ পথে আসার সম্ভাবনা আছে, যার পাঁজর দেখা যাচ্ছে, যে উলঙ্গ ও পেট ফোলা তাকে নির্দেশ করে সে বললো। ‘এসব গ্রামে কোনো খাবার নেই, ’ গভীর আবেগে চিৎকার করে বললো। ‘তাদের দেখার কেউ নেই; তাদের নিয়ে কে মাথা ঘামায়? কে এই কষ্টে তাদেরকে সাহায্য করবে? সবাই এ যুদ্ধে জড়িত। এই চাষিদের নাগালের বাইরে মুনাফাভোগীরা সব শস্য জমা করে রেখেছে। যুদ্ধ যন্ত্র তা যে কোনো মূল্যে কিনছে। এ গরীব লোকগুলোর তুলনায় প্রতিযোগী খুবই বড়।’ ‘সে আমাকে এসব বলছে কেন?’ শ্রীরাম চিন্তা করলো যখন ভারতীর সাথে একা থাকার অপেক্ষায় অধৈর্য্য হয়ে উঠছিলো। ‘এর জন্য আমি দায়ী নই।’ গোর্পদ ছিলো লৌহ মানব এবং তাদেরকে একা ছেড়ে দিতে তার উপর আস্থা রাখা যেতে পারতো। কারণ করার মতো তার অন্যকিছু ছিলো। আর সে পিঠ ফেরালে তাদের চোখাচুখি হলো, আর এইমাত্র শোনা বা দেখা সব করুণ বা খারাপ বিষয় মনে করে খিলখিল করে তারা হেসে উঠলো। গ্রাম সম্পর্কে শ্রীরামের যে ধারণা ছিলো তা কোথাও দেখতে পাওয়া গেলো না। ক্ষুধার্ত, ঝলসানো নারী-পুরুষ যাদের হাড়-হড্ডি স্পষ্ট দৃশ্যমান, খালি মাটি, শুকনো পুকুর, কাদা মাটির ভাঙ্গা দেয়ালের উপর শোচনীয়, জীর্ণ খড়ের ছাদ, গর্ত ও আলগা বালুতে ভরা রাস্তা, অনাকর্ষণীয় শুকনো মাঠÑÑ এই ছিলো গ্রাম। শ্রীরাম প্রায় বিশ্বাসই করতে পারলো না সে মালগুদি ও সভ্যতার বিশ মাইলের মধ্যে ছিলো। এখানে শুকর ও কুকুরগুলি শুকনো পয়োনালীর উপর শুয়ে আরাম করছিলো। এ অঞ্চলের সবকিছুতে শুকনো পয়োনালীর চেহারা পরিলক্ষিত হলো। শ্রীরাম ভাবলো মানুষ কীভাবে এমন জায়গায় বেঁচে থাকতে পারে। সে থেমে সবাইকে জিজ্ঞেস করতে চাইলো: ‘কতদিন ধরে আপনারা এখানে আছেন? মালগুদি বা অন্য কোনোখানে যাবেন না আপনারা? এখানেই কি চিরদিন থাকতে হবে?’ মহাত্মা তাঁর যাত্রাসূচী দিতে অস্বীকৃতি জানিয়ে এবং অপ্রত্যাশিত জায়গাগুলো পরিদর্শন করে সরকারি কর্মকর্তাদের হিসাব-নিকাশ নিস্ফল করে দিলেন। তিনি কোথায় যেতে চাচ্ছেন তা তাদেরকে জানানোর জন্য সরকারি কর্মকর্তারা ভদ্রভাবে জিজ্ঞেস করলেন। তিনি এইটুকুই বললেন: ‘যদি পারি, সব জায়গায়’ অথবা ‘আমি যদি জানতাম!’ ‘কিন্তু আমরা তো ঠিকঠাক ব্যবস্থা করতে চাই।’ ‘আমার জন্য? নিজেরা কষ্ট করবেন না। যে কোনো কুটিরে আমি ঘুমাতে পারি। অন্যরা যেখানে থাকছে সেখানে আমি থাকতে পারি। আমার মনে হয় না আমার অনেক বিলাসিতার দরকার আছে। ভাববেন না। আমরা নিজেরাই নিজেদের দেখতে পারবো। আমি এখানে মেহমান নই, মেজবান। মেহমান হিসেবে আমাদের সাথে যোগ দিচ্ছেন না কেন?’ ডিস্ট্রিক্ট কালেকটরকে তিনি বললেন। ‘ আপনার যে যে আরাম চাই তা দিয়ে আপনাকে দেখাশুনা করার অঙ্গীকার আমরা করবো ।’ তাঁর যাত্রায় কর্মকর্তাদের পুরো একটি দল তাকে অনুসরণ করে চললো। মহাত্মা গান্ধী প্রধানত পায়ে করে গ্রামগুলো ঘুরতে দেখলেন। যেখানে চাইলেন থামলেন। গ্রামের সবচেয়ে ছোট কুটিরটি সহজলভ্য হলে তিনি সেখানে সাময়িক থাকবেন অথবা মন্দিরের করিডোরে কিংবা খোলা জায়গায় থাকবেন। ঘন্টার পর ঘন্টা তাঁর লাঠিটায় ভর করে এবং এক হাত আরেকজন শিষ্যের কাঁধে রেখে তিনি নীরবে হাঁটলেন। গাছ কাটায় রত কিংবা জমি খোঁড়ায় লিপ্ত কৃষকের সাথে কথা বলতে তিনি মাঝে মাঝে থামলেন। নির্ধারিত সময়ে কোন গ্রাম দিয়ে তারা যাচ্ছে সেটা জানা শ্রীরামের কাছে অপ্রয়োজনীয় মনে হলো। সবই একই রকম, একই কর্মসূচী। গান্ধীজীর ব্যক্তিগত জীবন যেন এক জায়গায় স্থিরভাবে কেটে গেলো; অন্যরা এতে খাপ খাইয়ে নিয়েছে। তিনি গ্রামের স্থানীয় নারী-পুরুষের সাথে দেখা করে তাদের সাথে ভগবান সম্পর্কে কথা বললেন, অসুস্থদের সান্ত্বনা দিলেন ও যারা তাঁর দিক নির্দেশনা চাইলো তাদেরকে উপদেশ দিলেন। তাদের সাথে সুতা কাটা, যুদ্ধ, ব্রিটেন ও ধর্ম নিয়ে কথা বললেন। তাদের কুটিরে সাক্ষাৎ করলেন ও গ্রামের বট গাছের নিচে(এখনো কোনো গ্রাম এত খালি হয়নি যে সেখানে বটগাছ ছিলো না) তাদের সাথে কথা বললেন। লাঙ্গল চষা জমির মধ্য দিয়ে পা টেনে টেনে হাঁটলেন, নরম কাদার মধ্য দিয়ে শক্ত শিলাময় জায়গাগুলোতে চড়লেন, কিন্তু সবসময় খোশ মেজাজে এসব করলেন। আর কোনো জায়গাই তাঁর দৃষ্টি এড়ানোর মতো এত ছোট মনে হলো না। ** গান্ধীজীর যাত্রা শেষ হয়ে আসছিলো। মেমপি পাহাড়ের পাদদেশে কোপাল নামক ছোট্ট স্টেশনে তাঁর ট্রেনে উঠার কথা ছিলো। মহাত্মা চাইতেন তাঁর আগমন ও গমন গোপন থাক। আর কয়েকজন কর্মকর্তা যাদেরকে তাকে বিদায় জানানোর জন্য প্রতিনিধি হিসেবে পাঠিানো হয়েছিলো, তারা ছাড়া প্লাটফর্মে কোনো বহিরাগত ছিলো না। স্টেশনমাস্টার যিনি কাইজারের মতো গোঁফবিশিষ্ট ছোট-খাটো একজন মানুষ ও যার পরনে ছিলো ফিতাসহ সবুজ পাগড়ি এবং ধুতি, তিনি তার কুলির সাহায্যে পুরাতন বড় একটা চেয়ার টেনে প্ল্যাটফর্মে আনলেন। তিনি তার ছেলেমেয়েদেরকে পরিপাটি করে এক সারিতে ছয়জন করে রেখে শান্তভাবে প্রস্ফুটিত গোল্ড মোহুর গাছের ছায়ায় এক পাশে দাঁড় করিয়ে রাখলেন। এর মাঝে বিভিন্ন টেলিফোন বার্তা শুনে তাকে মহাত্মাজীর মেজবান হিসেবে কাজ করতে হলো। প্ল্যাটফর্মের চেয়ারে মহাত্মাজীকে বসার জন্য তিনি অনুরোধ করলেন। ‘অন্য যে কারো মতোই আমি দাঁড়িয়ে থাকতে পারি, ’ আশপাশে তাঁর অনুসারীদের দিকে তাকিয়ে মহাত্মা বললেন । অন্যদের মুখে বিষন্নতা লক্ষ করে শ্রীরাম তাকে অনুরোধ করলো, ‘বাপুজী দয়া করে বসেন।’ আর মহাত্মা বসে পড়লেন, তাঁর অনুসারীরা আশপাশে দাঁড়িয়ে থাকলো। ছোট্ট স্টেশনমাস্টার উত্তেজিত ও আন্দোলিত হলেন এবং তার চোখের পাতা দিয়ে ফোঁটায় ফোঁটায় ঘাম গড়িয়ে গেলো। রেললাইনের ওপারে রক্তিম আকাশের বিপরীতে পাহাড়ের একটি সারি দাঁড়িয়ে ছিলো। স্টেশনমাস্টার হাঁপাতে থাকলেন, আর তার ছেলেমেয়েদের কনুই দিয়ে ঠেলে ঠিকঠাক মতো আচরন করতে বললেন যদিও তারা সব সময় শক্ত হয়ে যেন কুচাওয়াজ মাঠে দাঁড়িয়ে ছিলো। মহাত্মাজী বললেন: ‘স্টেশন মাস্টারজী, আপনি কেন ওদেরকে ইচ্ছেমতো ছোটাছুটি করতে ও খেলতে দিচ্ছেন না। ওদেরকে বাধা দিচ্ছেন কেন?’ ‘আমি ওদেরকে বাধা দিচ্ছি না, স্যার। এটা ওদের অভ্যাস, ’ ছেলেমেয়েদের প্রশিক্ষণে পরিদর্শনকারীকে মুগ্ধ করার আশায় তিনি বললেন। মহাত্মা বললেন: ‘বন্ধু, আপনি বুঝি আমার সামনে ওদেরকে দিয়ে ভাল ব্যবহার করিয়ে নিচ্ছেন। তারা যদি স্বাভাবিকভাবে ছুটে বেড়াতো ও খেলতো এবং মাটিতে পড়ে থাকা ফুলগুলো তুলতো যা তারা চায়, তবে আমি সেটা আরো ভাল পছন্দ করতাম। ছেলেমেয়েরা মুক্ত ও খুশি থাকুক তাতে আমি বেশি আগ্রহী।’ রীতি মেনে মহাত্মাকে পথে উপহার দেওয়া মালা ও ফলমূলগুলো তুলে নিয়ে তিনি ছেলেমেয়েদেরকে ডেকে বিতরণ করলেন। ওদের বাবা বিচলিত হলেন, তার স্নায়ুগুলো খাড়া হলো পাছে কেউ হঠাৎ করে খারাপ ব্যবহার করে। রেললাইনের ওপারে আকাশ লাল হচ্ছিলো। তার ছোট্ট অফিসে ঘন্টাধ্বনি বাজলো। তিনি ছুটে গিয়ে মুখখানাকে মেঘাচ্ছন্ন করে আরো শিশির বিন্দুসহ বললেন: ‘সেভেন ডাউন পেরিয়াপুর ছেড়েছে। পনের মিনিটের মধ্যে এখানে পৌঁছাবে। আঠারোটা বিয়াল্লিশ বাজার সাথে সাথে।’ ট্রেনটি যদি তার কথা না রাখে সে জন্য তাকে উদ্বিগ্ন দেখালো। মহাত্মা বললেন: ‘ক্যাবিনে আপনি আপনার কাজে যেতে পারেন, আমাদের নিয়ে ভাববেন না।’ ‘আমি কি যেতে পারি? ’ তিনি বেপরোয়াভাবে জিজ্ঞেস করলেন। ‘আমাকে ভাড়াগুলো লিখতে হবে, স্যার, আর ট্রেন ধরার জন্য লাইনটা প্রস্তুত করতে হবে।’ ‘অবশ্যই, চালিয়ে যান, ’ মহাত্মা বললেন। এতগুলো সপ্তাহের মধ্যে এই প্রথম শ্রীরাম বিষন্ন ও অসুখী বোধ করলো। মহাত্মাজী ব্যতীত সাদামাটা বেঁচে থাকতে হবে সে ভাবনা তাকে শঙ্কিত করে তুললো। ভারতীর কাছে থাকলেও এ দুর্দশার উপশম হবে না মনে হলো। ট্রেন আসার শব্দ শোনা গেলে তাকে এতো বিস্মিত দেখালো যে মহাত্মাজী বললেন: ‘সুখে থাকো। ভারতী তোমাকে দেখে রাখবে।’ শ্রীরাম ভারতীর দিকে আশার দৃষ্টিতে তাকালো। মহাত্মাজী আরো বললেন: ‘মনে রেখো সে তোমার গুরু, আর তার সম্পর্কে শ্রদ্দা ও সম্মানের সাথে চিন্তা করবে। তাহলে তোমার সব ঠিক থাকবে এবং তারও সব ঠিক থাকবে।’ এ বাক্যটি হজম করতে শ্রীরামের সময় লাগলো। ট্রেনে বাস্প ভরানো হলো। মহাত্মাজী তৃতীয় শ্রেণীর একটি কামরায় প্রবেশ করলেন। গোর্পদ যে ঠাণ্ডা মাথার নির্বিকার একজন মানুষ যাকে কোনো বিদায় নাড়া দিতো না, সে শ্রীরামকে বললো: ‘এখন তুমি তো জানো তোমার কী কর্তব্য, আর কীভাবে তা করতে হবে। আপু, তুমি আমাদের নির্দেশনা পাবে। নমস্কার।’ এই বলে গান্ধীজীর কামরায় উঠে গেলো। তার দল তাকে অনুসরণ করে ভেতরে ঢুকলো। প্রথম ঘন্টা বাজলো, তারপর দ্বিতীয়টা। স্টেশনমাস্টার বেরিয়ে এসে বললেন: ‘সেভেন ডাউন সাধারণত এখানে দুই মিনিট থামে, কিন্তু আজকে আমরা এটি সাড়ে তিন মিনিট থামিয়ে রাখবো, স্যার।’ মহাত্মাজীর জানালার সামনে জড়ো হওয়া অন্য গাড়ি থেকে ভীড় করা যাত্রীদের দিকে হতাশভাবে তাকালেন। ইঞ্জিন চালু হলো। ইঞ্জিন চালক এক পাশ থেকে এবং গার্ড আরেক পাশ থেকে মহাত্মাকে দেখতে তাদের স্টেশন ত্যাগ করলেন । মহাত্মা তাদের অভিবাদন ফিরে দিয়ে জিজ্ঞেস করলেন: ‘ট্রেন কেমন করে চলবে, স্যার, এর হৃদয় ও আত্মা এখানে থাকলে?’ ইঞ্জিন চালক তার মুখে চাপা হাসি নিয়ে ফিরে গেলেন। মহাত্মা অন্য লোকদের বললেন, ‘এখন আপনাদের সবাইকে নিজ নিজ আসনে ফিরে যেতে হবে।’ জনতা ছত্রভঙ্গ হয়ে চলে গেলো এবং স্টেশনমাস্টার তার পতাকা উড়ালেন। গান্ধীজী শ্রীরামকে বললেন: ‘আমাকে প্রায়ই চিঠি লিখবে। আমিও তোমাকে মোটামুটি নিয়মিত চিঠি দেবো কথা দিচ্ছি। ভবিষ্যতে তুমি জানবে কোথায় তোমার কাজ আছে। সুতা কাটায় ওস্তাদ হও। নিরাশ হয়ো না।’ ‘জ্বী, গুরু, ’ শ্রীরাম বললো; বিদায়টা তাকে খুব নাড়া দিলো। ভারতী পরিস্কার কণ্ঠে শুধু বললো: ‘নমস্কার, বাপু।’ বাপু হাসলেন এবং হাত বের করে তার কাঁধ বুলিয়ে দিলেন। ‘তুমি অবশ্যই তোমার কর্মসূচী চালিয়ে যাবে এবং প্রায়ই আমার কাছে লিখবে।’ ‘জ্বী, অবশ্যই, বাপু।’ ‘যে কোনো ত্যাগের জন্য প্রস্তুত থেকো।’ ‘জ্বী, বাপু, ’ সাগ্রহে সে বললো। ‘কোনো কিছুতেই দুশ্চিন্তা করবে না।’ ‘জ্বী, বাপু।’ আকাশ লাল থেকে আরো লাল এবং অন্ধকার থেকে আরো অন্ধকার হলো, আর সেভেন ডাউন মহাত্মাকে ট্রিচি এবং তারপর মাদ্রাজ, বম্বে, দিল্লী এবং বাইরে বিশ্বজগতে নিয়ে চলতে লাগলো । ছোট স্টেশনটিতে রাত্রি ঘনিয়ে এলো, আর ছোট্ট স্টেশনমাস্টার গ্যাস বাতি ও সিগন্যাল জ্বালাতে অগ্রসর হলেন। ** মহাত্মার শারিরীক উপস্থিতি তার সাথে না থাকলেও শ্রীরামের এই অনুভূতি ছিলো যে তাঁর আন্দোলন চালিত হচ্ছে। এখন তার বাসা ছিলো উপত্যকার নিচে মেমপি পাহাড়ের ঢালের উপর পরিত্যক্ত মাজার। এর নিচে রাস্তা এঁকেবেঁকে গিয়ে মহাসড়কে লেগেছে যা কোপাল স্টেশন থেকে এক মাইল দূরে গিয়ে শেষ হয়েছে। সে প্রায়ই ডাক-হরকরাটিকে দেখতো যিনি তার কাঁধের ব্যাগ ও এক হাতের লাঠি দিয়ে (লাঠিটার শেষে ছোট্ট ছোট্ট ঘন্টা বাঁধা ছিলো যা তার আগমনকে এক মাইল দূর থেকেও ঘোষণা দিতো) পা টেনে টেনে হেঁটে বাঁক নির্মাণ করতেন । শ্রীরাম কোনো চিঠি আশা করতো না, কিন্তু শিলাপ্রস্তরে পা রাখা ও মেমপি পাহাড়ের উচ্চতর বাঁকে বিভিন্ন এসটেট ও গ্রামে চলে যাওয়া মূল সড়ক থেকে বিচ্যূত সংক্ষিপ্ত পথ নেওয়া পর্যন্ত সে ডাক-হরকরাকে দেখতে ভালবাসতো। মনে হলো এই জায়গাটা তার ভাগ্যে নির্ধরিত ছিলো, হাজার হাজার বছর আগে কেউ নির্মাণ করেছিলেন যিনি তখনই ভেবে থাকবেন যে শ্রীরাম পরিত্যক্ত ভবন ব্যবহার করবে। জায়গাটি ছিলো ধ্বংসাবশেষ, দেয়াল বরাবর কয়েকটা ভাস্কর্য ছিলো, রাজমিস্ত্রীর কাজ করা অংশগুলো এখানে সেখানে ধ্বংস হয়ে পড়ে আছে। আগাছায় ভরপুর অভ্যন্তরীণ এক পবিত্র স্থানে চার হাতবিশিষ্ট কোনো এক দেবতার প্রতিমূর্তি ছিলো। কিন্তু মানুষের অধিকার করার মতো সবচেয়ে আরামদায়ক ধ্বংসাবশেষ ছিলো । কেন্দ্রীয় হলে ইট দিয়ে নির্মিত রাজকীয় স্তম্ভ ছিলো; দেয়াল ছিলো ছাদবিহীন, যেখান থেকে অচেনা লতা বেয়ে নিচে গিয়েছে; একরোখা, নির্বিঘœ ভাস্কর্যের একটি ছিলো বিরাট তোরণের উপর ষাঁড় ও ময়ুরের ভাস্কর্য। এই তোরণে বিশাল বড় নব্যুক্ত কাঠের দরজা ছিলো যা সেগুলোর প্রকাণ্ড কব্জার উপর মোটেও নড়ানো যেতো না। এটা শ্রীরামের জন্য কম বড় অসুবিধা ছিলো না যেহেতু কেউ এ পথে আসতো না; যদি বা আসতো, তার তালা দিয়ে রাখার মতো কিছু ছিলো না। সে দৃষ্টির বাইরে থাকতে চাইলে ভূগর্ভস্থ কক্ষে আগাছার আবরণে চলে যেতো। ঐ দূরে ট্রেন আসা-যাওয়ার শব্দ শুনতে পারতো। গ্রাম থেকে উপরের এসটেটে গ্রামবাসীদের দলে দলে যাতায়াতকালে তাদের স্বর শুনতে পারতো। তার সম্পত্তি হিসেবে ছিলো শুধু একটা চরকা, একটা কম্বল যার উপর ঘুমাতো আর একজোড়া পাত্র, কিছু খাবার সামগ্রী ও একটা দিয়াশলাইের বাক্্র। রাতে কাজ করতে চাইলেই ছোট হারিকেনটির ফিতা সে জ্বালিয়ে নিতো। পাখির ডাকে জেগে উঠলে প্রতিদিনকার কর্তব্যসাধন নির্ধারণ করতো। ‘ওহ্ , ভগবান, কবির সরণীই অনেক ভাল, ’ সে ভাবতো। ‘পাখিগুলো এখানে এত বেশি কিচিরমিচির করে যে এগুলো কাউকে শান্তিতে ঘুমোতে দেবে না।’ এ সত্ত্বেও সে বিছানা থেকে উঠলো। কৃচ্ছত্বা সাধন ও বেশ কঠিন একটা কাজ করার প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে সে যাচেছ, কারণ নিজের চিন্তা-ভাবনা নিয়ন্ত্রণ করতে গিয়ে সে দেখলো যে সেগুলো আগের মতোই অনাকাঙ্খিত। সে ভেবেছিলো যে গোর্পদের সাথে কৃচ্ছ্বতার চর্চা করে সে হঠাৎই আলাদা হতে পারতো। মহাত্মাজী তার আত্ম-উন্নয়ন ধারণাটিকে আশীর্বাদপুষ্ট করেছে। তিনি বলেছিলেন: ‘সুতা কাটো, ভগবদ গীতা পড়ো আর সর্বদা রাম নাম জপো, তাহলে জীবনে কী করতে হবে তা তুমি জানবে।’ বদল করার জন্য একটি কাপড় নিয়ে শ্রীরাম পাহাড়ের নিচে ছোট নদীটিতে গিয়ে গোসল করলো। শীতল জলে স্নান শেষে সে এত উজ্জীবিত বোধ করলো যে সেই ধূ ধূ নির্জনে সে পুরো একাকী জোরে জোরে গান গাইলো। বারবার গাইতে লাগলো: ‘রঘুপতি রাঘব রাজা রাম, পতিত পবন সীতা রাম, ’ÑÑÑমহাত্মাজীর প্রার্থনা সঙ্গীত। গানটি গাওয়ার সময় সে তাঁর নৈকট্য লাভের ও তাঁর নির্দেশে কিছু একটা করার বোধ অনুভব করলো। তাকে এমন পবিত্রতা বোধ ধরে বসলো যে সে প্রায় নেচে উঠলো যখন নির্জনবাসে ফিরে গেলো। নদীতে ধৌত করা দুইটা কাপড় সে বয়ে নিয়ে গিয়ে মাজারটির চারপাশে সবুজ বেড়ার উপর শুকাতে দিলো। নিজের হাতে বানানো কাপড় পরে তার গর্ব হলো। ভারতী তাকে শিখিয়েছিলো তুলার সুতা কীভাবে ঢোকাতে হয়, কীভাবে চাকা ঘুরাতে হয়, আর কীভাবে সুতা কাটতে হয়। গান্ধীজী তাকে কোনো এক গ্রামে একটা চরকা দিয়ে ব্যাখা করে বলেছিলেন: ‘এটা হচ্ছে তোমার ভবিষ্যতের চাবি।’ শ্রীরাম এত শ্রদ্দাবোধ করেছিলো যে এর মানে কী তা জিজ্ঞেস করতে পারেনি। কিন্তু চাকাটি পরম শ্রদ্ধার সাথে গ্রহণ করে আক্ষরিকভাবে তার বুকের কাছে রেখেছিলো, যদিও এটি ভারী দুর্বহ যন্ত্র ছিলো। ভারতী তাকে শেখাতে চেষ্টা করেছিলো কীভাবে কোনো একটা গ্রামে অবস্থানকালে এটা ব্যবহার করতে হবে। হাত দিয়ে ঘুরানোর চেষ্টা করার সময় সে অসংখ্য ভুল করেছিলো। না ছিড়ে সে কখনোই একবারে কয়েক ইঞ্চি সুতা তৈরি করতে পারেনিÑÑ সুতার থেকে বরং একে তুলার পাকানো পশমি সুতার টুকরার মতোই অনেকটা দেখাচ্ছিলো। তার হস্তকর্ম দেখে ভারতী হাসি চেপে রাখতে পারেনি। সে মন্তব্য করেছিলো: ‘এক গজ সুতা তৈরি করতে তুমি ভারত ও মিশরের সব সুতা নষ্ট করবে।’ এরপর সে শ্রীরামের আঙ্গুলগুলো নিচে ধরে সঠিক চাপে সুতা কাটার অবস্থানে নিয়ে এসেছিলো। কিন্তু হাত সরিয়ে নিলে শ্রীরাম তার আঙ্গুলগুলোও ছেড়ে দিতো, আর তুলা পড়ে গিয়ে কোনো উদ্দেশ্যে সিদ্ধ করতো না। পুরাটা যাত্রায় সে এতে লিপ্ত ছিলো, দিনে থামার সময় তার পাঠ শুরু হতো। মহাত্মাজী প্রতিদিন খোঁজ-খবর নিতেন: ‘আচ্ছা, কতদূর?’ আর শ্রীরাম উত্তর দেওয়ার আগে ভারতী সাধারণত মাঝখানে বলতো: ‘আরো দুই ইঞ্চি বাপুজী; আজকে সব মিলিয়ে সে ছয় ইঞ্চি তৈরি করেছে, কিন্তু বিশেষভাবেই গণনা করতে হবে। সে হিসেবে এটি পাঁচ কাউন্ট সুতা হবে, সম্ভবত বাতির সলতের মতো একই পরিমাণ হবে!’ মহাত্মা বলতেন: ‘ঠিক আছে, এমন একটা সময় আসবে যখন সে শত কাউন্ট তোমায় দিতে পারবে, এত অহংকার করো না, সোনা।’ ‘আমি করছি না, ’ ভারতী বলেছিলো। ‘আমি শুধু সত্য ঘটনাটি উল্লেখ করলাম।’ ‘কতই না অহংকার তার! তুমি কি জানো কয়েক বছর আগে খাদি প্রতিযোগিতায় সে পুরস্কার পেয়েছিলো? তার সুতা প্রদর্শনীতে রাখা আছে।’ ‘সবকিছুতে সে আমার চেয়ে এক ডিগ্রী উপরে থাকে, ’ শ্রীরাম ভাবলো। ‘এর কারণ হচ্ছে সে অতিরিক্ত সমর্থন পায়। নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। এটাই তার সমস্যা। সে ভাবে তার নিজের কোনো শেষ নেই।’ ‘আমি নিশ্চিত ভারতী তোমাকে শেখাবে কীভাবে তাকে ছাড়িয়ে যেতে হবে, ’ মহাত্মা বলতেন এবং ভারতী সে অঙ্গীকার অনুযায়ী জীবন-যাপন করেছিলো। দিন রাত কোনো সময়েই সে শ্রীরামকে বিশ্রাম দিতো না। ভ্রমণ থেকে সামান্যতম ফুরসত পেলেই সে এসে বলতো, ‘এখন মহান ছাত্রের কর্মসূচী কী?’ আর শ্রীরাম চাকাটা টেনে বের করে তুলার ছোট ছোট প্যাকেট নিতো এবং ভয়ে ভয়ে কাজ শুরু করতো। ভুল করার মধ্য দিয়ে মেয়েটির মজা পাওয়াকে সে ভয় করতো। তার হালকামি ও প্রায়ই শ্রীরামকে বোকার মতো মনে করানোর জন্য সে তাকে ঘৃণা করতো। কিন্তু মরিয়া হয়ে চেষ্টা চালিয়ে যেতো। তার হাত ফসকে গেলে ভারতী হাসতো, সে অসৎ চিন্তার কবলে পড়তো যখন ভারতী তার উপর নুয়ে পড়তো , তার হাত ধরতো এবং তাকে কৌশল শিখিয়ে দিতো। চরকার আধেক ফিসফিসানি গতিতে যখন মন অবশ হয়ে যেতো তখনই শ্রীরাম পূর্ণ মনোযোগ দিতো । কম্পমান বর্ধনশীল সুতা ধরে থাকতে থাকতে তার আঙ্গুলগুলো ব্যথা করতো ও চোখ জ্বালা করতো। মহাত্মাজী চলে যাওয়ার প্রায় বারো সপ্তাহ পর অবশেষে সে বিজয়ী বেশে আবির্ভূত হলো। মালগুদি থেকে প্রায় পঞ্চাশ মাইল দূরে চরকা কাটার একটি কেন্দ্রে শিক্ষানবিশির জন্য সে থেকেছিলো। ভারতী সেখানে একদম বাসার মতো ছিলো এবং নিজেকে উঁচু মানের কাজের ওস্তাদ হিসেবে প্রমাণ করেছিলো; শ্রীরামকে হাতে-কলমে শেখানো সে ছাড়েনি যতক্ষণ পর্যন্ত না শ্রীরাম একটা ধুতি ও একটা হাফ শার্টের জন্য জট ছাড়া যথেষ্ট সুতা বানাতে পেরেছিলো। এটা ছিলো সপ্তাহের পর সপ্তাহের কাজের ফসল। আর এটাই হওয়ার কথা ছিলো। শ্রীরামের কর্ম সফলতায় ভারতী খুবই উত্তেজিত হয়েছিলো। সে পত্রিকার নিচের সাদা অংশ ছিঁড়ে সেখানে ছোট ছোট অক্ষরে লিখেছিলো: ‘অর্থাৎ শ্রী শ্রীরামকে এখন থেকে সুতা কাটার ওস্তাদ বলা যায়, আর সে যেখানেই যাক না কেন তাকে অবশ্যই সম্মান জানাতে হবে।’ মাদ্রাজে মূল ভাণ্ডার থেকে সুতা বান্ডিল ছাড়া করতে এবং বিনিময়ে একই কাউন্টের বোনা কাপড় পেতে ভারতী তাকে সাহায্য করতো । হঠাৎ করে শ্রীরামের মনে হলো যে সে যাদু জগতের একজন বাসিন্দা যেখানে আপনার যা যা প্রয়োজন তা নিজ হাত দিয়ে আপনারা তৈরি করেছিলেন। তার দুঃখ ছিলো সে এখনো একশত কাউন্ট করতে পারেনি, আর তার সুতা ছিলো কতকটা এবড়োথেবড়ো। কিন্তু ভারতী বললো: ‘ব্যবহার করার জন্য চল্লিশ কাউন্টই হচ্ছে আসল কাপড়: একশ কাউন্ট কেবল লোক দেখানো ও মুল্য বৃদ্ধির জন্য, এ নিয়ে ভেবো না।’ যেদিন সে তার খাদি কাপড়, সাধারণ একটা ধুতি ও জিব্বা (গ্রাম্য দর্জিকে দিয়ে সেই জায়গায় কেটে সেলাই করা) পেলো, সেদিন সে তার পরিধেয়(কারখানায় তৈরী) খুলে রাস্তার মাঝে জমা করে রেখে অর্ধেক বোতল কেরোসিন তার উপর ঢেলে ম্যাচের কাঠিতে করে আগুন জ্বালিয়ে দিলো; তার পুরানো কাপড়গুলো আগুনে জ্বলজ্বল করে জ্বলে পুড়ে গেলো। চরকা কেন্দ্রের কয়েকজন সদস্য আগুনের চারপাশে দাঁড়িয়ে দেখলো। গ্রামবাসীদের কেউ কেউ আগ্রভভরে দেখলো। উল্লম্ফনকারী শিখায় মোহিত হয়ে শ্রীরাম সমাবেশে ব্যাখ্যা করলো: ‘যন্ত্র দিয়ে তৈরী কাপড় আমি আর কখনো পরবো না।’ ধুতি ও জিব্বাটি ছিলো ভারী যেন নকশায় বুনানো এক টুকরো সীসা। কিন্তু তার মনে হলো এটি গর্ব করার মতো কিছু একটা ছিলো। সে অনুভব করলো সে জীবনের অস্তিত্বের নতুন স্তর প্রত্যক্ষ করছে ও সেখানে পৌঁছে গেছে। বসে পড়ে সে মহাত্মাকে লিখলো, ‘আজকে আমার পুরানো কাপড়-চোপড় পুড়ে ফেললাম। চল্লিশ কাউন্ট বানিয়েছি। ভারতী সন্তুষ্ট।’ সঙ্গে সঙ্গে মহাত্মাজী তাকে লিখে পাঠালো: ‘খুবই খুশি। চালিয়ে যাও। ভগবান আশীর্বাদ করুক।’ ** সন্ধ্যায় ভারতী পাহাড়ে উপরে উঠে আসলো। শ্রীরাম অস্থির হয়ে ছিলো: ‘এসব জায়গায় তুমি কী করে খালি পায়ে হাঁটতে পারো?’ ‘কেন পারবো না? পায়ে স্যান্ডেল নিয়ে তো আমরা জন্মাইনি। বর্ধ থেকে এখনো আমি চামড়াটি পাইনি, আর যে পর্যন্ত না পাওয়া যায় সে পর্যন্ত আমাকে সামলে নিতে হবে। কিন্তুÑÑÑ’ দীর্ঘশ্বাস ফেলে ভারতী বললো, ‘ওখানে হয়তো কেউ নেই যে আমাদের চাহিদা মেটাতে পারে। আমরা জানিও না তাদের কতজন জেলে আছে। সরকার সে তথ্য দেওয়াও বন্ধ করে দিয়েছে।’ তারা শীতল কাদার মেঝেতে বসেছিলো মাঝখানে একটা বাতি রেখে। শ্রীরাম তার মুখ অধ্যয়ন করলো, ১৯৪২ এর আগস্টের পর থেকে মহাত্মাজী কারাবরণ করায় তার মুখ আজকাল এত রেখায় ভরপুর যেন দেশের বোঝা তার পিঠে ছিলো। সর্বত্র পুলিশের পাকড়াও রাজনীতি সত্ত্বেও ইংরেজদের দেশ থেকে বিতাড়িত করতে ভারতী (শ্রীরামসহ) বিশাল জটিল যন্ত্রের একটা ছোট্ট খাঁজকাটা দাঁত হিসেবে কাজ করছে। শ্রীরাম আবার বললো: ‘তোমার খালি পায়ে হাঁটা ঠিক নয়।’ ‘কেন নয়? ভারতের তিনশ ষাট মিলিয়ন মানুষ হাঁটে খালি পায়ে।’ তার জাতীয় এ পরিসংখ্যান শ্রীরামকে বিরক্ত করলো। সে তৎক্ষণাৎ বললো: ‘তারা পারে, কিন্তু তার মানে এই নয় যে তোমারও খালি পায়ে হাঁটতে হবে। আশপাশে কোবরা সাপ থাকতে পারে, এ জায়গাটা এরকম জিনিসে ভরপুর।’ ‘বা, মনে হয় স্যান্ডেল পায়ে মাড়িয়ে গেলে কোবরা সাপ কামড়াবে না!’ ‘তুমি বেশি তর্ক করো।’ ‘বলছি তো বর্ধ থেকে স্বাভাবিক চামড়াটি আমি পাইনি, ’ ভারতী অভিযোগ করলো, আর বললো: ‘তোমাকে আমি ভয় পাই না, আর তোমার কাছে ব্যাখ্যা করতে হবে না কেন আমি এরকম বা সেরকম। কোবরা বা নির্জন রাস্তাকেও আমি ভয় পাই না । নইলে এখানে থাকতাম না।’ ‘অবশ্যই, আমাকে ভয় পাওয়ার দরকার নেই, ’ শ্রীরাম বললো। ‘তুমি শুধু আশা করো অন্যরা তোমাকে ভয় পাক।’ ‘হ্যাঁ, কারণ আমি তোমার গুরু।’ শ্রীরামের মনে হলো, ‘সমস্ত জিনিসটা একদম মিথ্যা। আমার বউ হয়ে তার আমার বাহুবন্ধনে আসা উচিৎ।’ কিছুক্ষণের জন্য সে ভাবলো, ‘কী বা তাকে স্পর্শ করতে দিচ্ছে না? ভারতী কী বা করতে পারে । এ জায়গায় তো সে সম্পূর্ণ একা। সে যদি বা চিৎকারও করে, কেউ তার চিৎকার দশ মাইলের মধ্যে শুনতে পারবে না।’ এমন ভয়ংকর সম্ভাবনায় সে পুলকিত হলো। কিন্তু এ ছিলো কেবলই স্বপ্ন। ভারতী তার মিশন ব্যাখ্যা করলো: ‘কাল মাদ্রাজের উদ্দেশ্যে যাত্রা করছি, আর কিছু দিনের জন্য তুমি আমায় দেখতে পাবে না।’ ‘কখন? কোথায় যাচ্ছো?’ ‘নির্দেশনার জন্য আমাকে তলব করা হয়েছে। পুলিশ সতর্ক প্রহরা রাখছে নিঃসন্দেহে, কিন্তু কোনো ঝামেলা ছাড়াই আমি গিয়ে আসতে পারি।’ সে চলে যেতে শুরু করলো। শ্রীরাম ভাবলো, ‘সে কেন এটা আমাকে বলতে এসেছে? বিষয়টা কী? আমার প্রতি তার ভালবাসা হিসেবে কি আমি এটা ব্যাখ্যা করতে পারি? কেউ দুই মাইল খালি পায়ে হেঁটে শুধু বলতে আসবে না পরবর্তী তিন দিন করার মতো কিছু থাকবে না। সে নিশ্চয়ই কোনো উদ্দেশ্য নিয়ে এসে থাকবে। হয়তো সে আমাকে খুব পছন্দ করে, আমার মনের কথা তার হাত ধরে শোনার জন্য অপেক্ষা করছে; আর তারপর নিজেকে আমার কাছে সঁপে দেবে।’ চিন্তা করাও আজব ব্যাপার যে সে শুধু তার ‘গুরু’, গুরুই বটে! আজব ব্যাপার যে এক সুশ্রী যুবতী এক পুরুষকে শিক্ষা দেবে! তাকে কিসে শিক্ষিত করবে? এ ভাবনায় সে মুখ টিপে হাসলো। ভারতী বললো: ‘তুমি হঠাৎ করেই খুবই ভাবুক হয়ে গেছো। কেন? ’ শ্রীরাম তার হাত স্পর্শ করলো: নিজর্ন পরিবেশ খুবই উৎসাহব্যাঞ্জক ছিলো, কিন্তু ভারতী তার হাত আলতোভাবে নিচে সরিয়ে দিয়ে মন্তব্য করলো, ‘নির্দেশনা নিয়ে ফিরে না আসা পর্যন্ত তুমি এখানে বিশ্রাম করো।’ আর ঘুরে রাস্তায় যেতে যেতে বললো, ‘বাইরে যেন তোমাকে খুব বেশি দেখা না যায়।’ শ্রীরাম বললো: ‘তোমার সাথে আমি অর্ধেকটা পথ যাবো।’ ‘প্রয়োজন নেই, ’ এই বলে ভারতী চলে গেলো। শ্রীরাম তাকে পাহাড়ের নিচ দিয়ে যেতে দেখলো। ‘কোনো একদিন কেউ একজন তাকে অপহরণ করবে; সে মনে হয় ভাবে না যে সে একজন নারী, ’ এই ভেবে সে ফিরে এলো। তার চারপাশে ধ্বংসাবশেষ নিয়ে সে গভীরভাবে ভাবলো। অনেক দূরে একটা ট্রেন এসে থেমে চলেও গেলো। ট্রেনের ছায়াময় এ.আর.পি বাতিগুলো ভূ-দৃশ্যের সাথে হামাগুড়ি দিয়ে গেলো। সে আশা করলো যে কোনো দূর্ঘটনা ছাড়াই মেয়েটি তার গ্রামে নিরাপদে পৌঁছাবে। তিন দিন পর সে নির্দেশনা নিয়ে উপস্থিত হলো, আর সে সময় থেকেই শ্রীরামের কর্মকাণ্ড নতুন মোড় নিলো। ভারতী রং তুলির একটা কৌটা এনে অস্ত্রাগার থেকে অস্ত্রবিতরণকারী প্রধানের ভাব নিয়ে তার কাছে হস্তান্তর করলো। সে বললো: ‘উপরে সবটুকু আবাদ করার জন্য তারা তোমাকে নিযুক্ত করেছে। তার মানে অনেক হাঁটতে হবে। পথে বারোটা গ্রামের মধ্যে কোনো গ্রাম বাদ দেওয়া যাবে না। গ্রামবাসীরা তোমাকে সবখানে সাহায্য করবে। মালগুদি ও আশপাশের এলাকায় আমরা কাজে থাকবো। সাবধানে থেকো, আবার কোনো এক সময় দেখা হবে। মহাত্মাজী জেলে থাকায় আমাদের নিজের মতো করে কাজ করতে হবে। তার বার্তা আমাদের সব জায়গায় পৌঁছাতে হবে।’ ১৯৪২ সালের আগস্ট প্রস্তাবে মহাত্মাজী বলেছিলেন: ‘ব্রিটেনকে ভারত ছাড়তেই হবে, ’ এ কথাটিতে মন্ত্র বা যাদুসূত্রের অমিত শক্তি ছিলো। দেশের সর্বত্র মানুষজন চিৎকার করে বললো ‘ভারত ছাড়ো ’। এর আওয়াজ শুনে স্বরাষ্ট্র সচিব অস্বস্তি বোধ করলো। ভদ্র সমাজে এটি নিষিদ্ধ কথন হলো। এ কথন উচ্চারণ করার পর মহাত্মাকে কারাগারে প্রেরণ করা হয়েছিলো; কিন্তু কথনটি নতুন জীবন নিয়ে বিকশিত হলো, আর শেষ পর্যন্ত ইংরেজদের ফেরত পাঠানোর মতো যথেষ্ট শক্তি উৎপাদন করলো। সারাদেশে কোনো খালি দেয়াল ছিলো না যেখানে এ বার্তাটি ছিলো না। কেউ ঘুরলেই দেখতো ‘ভারত ছাড়ো ’। পরের দিন শ্রীরাম তার ছোট্ট টিনের কৌটা, তুলি, ন্যকড়া ঝুলিতে করে কাঁধে নিয়ে পা টেনে টেনে হেঁটে পর্বত পথে আরোহণ করলো। পথে প্রথম গ্রামটিতে সে থেমে সবচেয়ে যুতসই দেয়ালটি নির্বাচন করলো, যা ঘটনাক্রমে নতুন একটা বাড়ির বহির্দেয়াল ছিলো, যার বারান্দায় গ্রামের শিশুরা বর্ণমালা শিখছিলো। সমস্বরে তারা বর্ণমালার বর্ণ পড়ছিলো, এতে তাদের শিক্ষক ঘটনাক্রমে ঝিমোচ্ছিলো, কিন্তু তাদের চোখ অনুসরণ করছিলো কাফেলার মধ্যে ঠক ঠক করা গরুর গাড়ি, ধূলোর মেঘে হারিয়ে যাওয়া দ্রুত ধাবমান বাস, এবং এদিক সেদিক ছুটে যাওয়া মানুষজন। দিনটি ছিলো উজ্জ্বল আর সবুজ গাছে ও ডালে এবং ঝোপের লতায় চোখ ধাঁধানো আলো ছিলো মনোমুগ্ধকর; তাদের চোখ মন বিক্ষিপ্ত হলো। আর তাই শ্রীরাম দেয়ালে লিখতে এলে তারা এক ধরণের গভীর স্বস্তির বোধ নিয়ে সটকে পড়লো। গ্রামের বয়স্করাও তাদের স্বাভাবিক কাজকর্ম ফেলে চারপাশে দাঁড়িয়ে দেখতে থাকলো। শ্রীরাম রঙে তুলিটা ডুবিয়ে সতর্কতার সাথে দেয়ালে লিখলো, ‘ভারত ছাড়ো ’। ‘ছ’ অক্ষরটি লিখতে তার ইচ্ছে হলো না। অক্ষরটিতে প্রচুর কালো কালি লাগতো। শুধু একটা অক্ষরে সবটুকু রঙ নষ্ট করে কোনো লাভ নেই। সে ভাবলো রঙ সাশ্রয়ের জন্য অক্ষরটির লেজ না লিখলে যদি চলতো। ইংল্যান্ডের মতো প্রথম শ্রেণীর অস্ত্রশস্ত্রসজ্জিত দেশের সাথে তারা যুদ্ধ চালাচ্ছে; অস্ত্র হিসেবে ছিলো শুধু এই তুলি, কালো রঙ ও খালি দেয়াল। শুধু একটা অক্ষর লিখতে গিয়ে তাদের যুদ্ধ সম্পদের অপচয় করার সামর্থ্য নেই। তার কাছে আরো সম্ভব মনে হলো যে ব্রিটেন এ অক্ষরটি ভারতে আমদানি করেছিলো যাতে করে কালো রঙের একটা জাতীয় ড্রেন থাকে। এ ভাবনায় সে এতটাই আচ্ছন্ন হলো যে সে পরিমার্জিত ‘ছ ’ লিখতে লাগলো, এর লেজের দিকটায় ন্যূনতম রঙ খরচ করে যাতে করে পড়া যায় এবং যে পর্যন্ত না কেউ খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে পড়ে, ‘ভারত ছাড়ো ’। গ্রামবাসীরা জিজ্ঞেস করলো: ‘এটা কতোদিন শুধু দেয়ালেই থাকবে, মশাই?’ ‘যতোদিন পর্যন্ত না কার্যকর হয়।’ ‘এতে কী বলা আছে, মশাই?’ ‘এতে আছে “ছাড়ো”ÑÑ মানে ইংরেজদের আমাদের দেশ ছাড়তেই হবে।’ ‘তারা ছাড়লে কী হবে, মশাই? দেশ চালাবে কে?’ ‘আমরা নিজেরাই চালাবো।’ ‘মহাত্মাজী কি আমাদের সম্রাট হবেন, মশাই?’ ‘কেন নয়?’ তাদের দিকে পিঠ রেখে অক্ষরগুলো আকারে ফেলতে ফেলতে সে বললো। সে স্কুলের শিশুদের সমস্বরে চিৎকার করে বলতে শেখালো, ‘ভারত ছাড়ো ’। তারা আনন্দের সাথে তার কথা মানলো। তাদের শিক্ষক এসে অনুযোগ করে বললো: ‘আপনি এ কী করছেন, মশাই, ওদের নষ্ট করছেন!’ ‘কীভাবে?’ ‘ওদেরকে রাষ্ট্রদ্রোহী আচরণ শিখিয়ে। পুলিশ শীঘ্রই আমাদের পিছু নেবে। আপনি কি চান আমরা জেলে পচে মরি?’ ‘জ্বী, কেন নয়? আপনার চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিরা যখন ওখানে ইতিমধ্যেই আছে।’ জনতা শিক্ষককে বিদ্রুপ করলো। ছেলেরা তাকে বিদ্রুপ করার এমন সুযোগ কাজে লাগানোর জন্য সবসময় প্রস্তুত থাকে। কিন্তু বৃদ্ধ লোকটিকে যেমন দেখালো তার চেয়ে বেশি কঠোর ছিলো। চশমা পরে তিনি শ্রীরামকে উপরে-নিচে দেখলেন। ছেলেরা চিৎকার করে উঠলো: ‘ওহ্ , মাস্টারজী চশমার ভেতর দিয়ে দেখছেন, ওহ্ !, ওহ্ !,’ তারা হাসাহাসি করলো ও চিৎকার করে বললো: ‘ছঁরঃ ওহফরধ’। শিক্ষক ভীড় ঠেলে বের হয়ে চিৎকার করে বললো: ‘সম্ভব হলে “ঃ” এর আগে “ব” যোগ করো; এদেশে আমাদের যা দরকার তা “ছঁরঃ”কর্মসূচী নয়, কিন্তু “ছঁরবঃ ওহফরধ ”। আপনি ওটা লিখছেন না কেন?’ শ্রীরাম লেখার কাজ শেষ করে ফেললো। কার কাছ থেকে যেনো একটা মই ধার করেছিলো। সে ঘুরে শিক্ষককে বললো: ‘মাস্টারজী, ওখানে দাঁড়িয়ে কথা না বলে আরো কাজের কিছু করেন। দয়া করে খেয়াল রাখুন যেন এ মইটি মালিকের কাছে ফেরত দেওয়া হয়, তার নাম ভুলে গেছি, আর দেশকে মুক্ত করতে আপনি আপনার কাজের অংশটা করে থাকবেন।’ শিক্ষক কিছুটা বিগলিত হলেন। সামনে এসে তিনি বললেন: ‘এমন নয় যে আমি আমাদের দেশকে মুক্ত দেখতে চাই না। আপনি যতটা দেশপ্রেমিক আমিও ততটা দেশপ্রেমিক, কিন্তু আপনি কি সৎভাবে চিন্তা করেন আমরা নিজেদেরকে শাসন করতে প্রস্তুত? আমরা প্রস্তুত নই। বিভ্রান্ত হবেন না। আমরা এখনো কোনো কিছুর জন্য প্রস্তুত নই। এ যুদ্ধ শেষ হোক, আর স্বরাজ প্রতিষ্ঠার জন্য যুদ্ধ করতে আপনি আমাকে প্রথমে পাবেন। দেশপ্রেম আপনার একচেটিয়া অধিকার নয়।’ ছেলেরা আশপাশে দাঁড়িয়ে চিৎকার করে স্লোগান দিলো। শ্রীরাম বললো: ‘সাবধান, ব্রিটেন ভারত ছাড়লে আপনার শিরোচ্ছেদ করা হবে। যাদের যাদের শিরোচ্ছেদ করা হবে তাদের সবার তালিকা আমাদের কাছে আছে।’ শিক্ষকের মেজাজ পুরো বিগড়ে গেলে বললেন: ‘আপনার কতো স্পর্ধা এমন কথা বলছেন! আমি দেখতে চাই না ব্রিটেন চলে যাক। হয়তো আপনার মতো লোকদের সাহায্যে হিটলার আসুক সেটা ভেবে যারা অধিকতর খুশি হবে আমি তাদের একজন নই। আপনাকে বলছি তখন আপনাকেই প্রথম গুলি করা হবে।’ জনতার কিছু অংশ শিক্ষকের এ দৃষ্টিকোণকে প্রশংসা করে বললো: ‘মাস্টারজী ঠিকই বলেছেন, সরকারকে আমরা কেন জ্বালাতন করবো?’ শ্রীরাম তাদের প্রতি ক্রোধে ক্ষেপে গিয়ে বললো: ‘আপনারা শুধু জ্বালাতনই করবেন না, সরকারকে অবশ্যই স্বীকৃতিও দেবেন না। একে আদৌ কোনো কর দিতে হবে না। আমাদের থেকে তারা দশ হাজার মাইল দূরে থাকে, আপনাদের কর তাদের কেন দিচ্ছেন?’ ‘এ রকম লোকদের ইচ্ছেমতো চলতে দেয়া ঠিক নয়: সে জন্য এখানে আমি সবসময় একটা থানা স্থাপনের জন্য বলেছি। এখানে কোনো পুলিশ যদি থাকতো, তবে এখানে এসে উনার এভাবে বক্তৃতা দেয়ার স্পর্ধা কি থাকতো?’ ‘থানা কতদূর?’ শ্রীরাম জিজ্ঞেস করলো। ‘সার্কেল স্টেশন দশ স্টোনের বেশি দূরে, ’ কেউ একজন জবাব দিলো। শ্রীরাম বললো, ‘দেখুন আপনাদের সরকার আপনাকে একটা থানাও দেয়নি! আপনাদের মাঝে এ শিক্ষকের মতো লোক আছেন বলেই কি এর প্রয়োজন নেই?’ ছেলেগুলো প্রশংসায় চিৎকার করে একতানে গাইলো, ‘ভারত ছাড়ো ’। এ ছিলো উচ্চকিত খুশির সমাবেশ। তাদের হর্ষধ্বনি ও সাধারণ গোলমেলে আচরনে রাস্তায় খড়ের বোঝা টানা এক জোড়া বলদ গরু ভয় পেয়ে গেলো। আর এতে সাধারণ বিশৃঙ্খলার সৃষ্টি হলো, লোকজন এখানে সেখানে ছুটলো এবং পরস্পরের দিকে চেঁচামেচি শুরু করলো। পশুগুলোকে রাস্তায় টেনে আনতে আনতে গাড়িয়াল তাদেরকে বিঘœতার জন্য গালিগালাজ করলো। ‘এই সব রাজনীতিবিদ, গান্ধীগোষ্ঠী কাউকে শান্তিতে থাকতে দেবে না। এখানে এসে আমাদের ঝামেলায় ফেলছেন কেন?’ শ্রীরাম বললো: ‘এই যে, গাড়ি টেনে তুলুন আর আমার কথা শুনুন। বাচ্চার মতো কথা বলবেন না। যে বিষয়ে কথা বলছেন তা বোঝার মতো যথেষ্ট বয়স হয়নি কি আপনার? আপনার বয়স কত?’ ‘গাড়িয়াল লাগাম তুলে তার পশুদের গলায় ঘন্টা টু টাং বাজাতে বাজাতে বললেন, ‘মনে হয় বিশ হবে!’ ‘বিশ! খুব সম্ভবত আপনার বয়স পঞ্চাশ।’ ‘হতে পারে, স্যার, একটু এদিক সেদিক । বিশ হবে।’ ‘ছেলেমেয়ে কতজন?’ ‘পাঁচ ছেলে, স্যার, আর একটা নাতি।’ ‘ভাই, আপনার বয়স পঞ্চাশ হবে, আর আপনাকে তাই দেখায়। দায়িত্বজ্ঞানহীন কথা বলবেন না। জানেন মহাত্মা গান্ধী জেলে আছেন?’ ‘জ্বী, স্যার।’ ‘জানেন কেন জেলে আছেন?’ লোকটি মাথা নাড়ালো। ‘যাতে করে আপনি এ দেশে স্বাধীন মানুষ হতে পারেন। এখন এ দেশে আপনি স্বাধীন নন।’ ** শ্রীরামের অপারেশনের পরিমণ্ডল হচ্ছে এখানে সেখানে বিক্ষিপ্ত পার্বত্য গ্রামে গ্রামে যেখানে কম-বেশি ঘন গাছপালা ও বনের মধ্য দিয়ে নিজে নিজে গড়ে ওঠা আঁকাবাঁকা রাস্তা পরস্পরকে সংযুক্ত করেছে। বহির্জগতের সাথে এ গ্রামগুলোর যোগাযোগ হয় ডাকপিয়নের মাধ্যমে যিনি সপ্তাহে দু’একবার ভাল ভাল কিছু গ্রামের মধ্য দিয়ে যান এবং কোপালের রেলস্টেশনে চিঠিগুলো ফেলে দেন। সমস্ত জায়গাটা জুড়ে ছড়ানো ছিটানো কয়েকটা পুলিশ ফাঁড়ি আছে। প্রতিটি ফাঁড়িতে একজন করে পাতি অফিসার ও মুষ্টিমেয় কয়েকজন লোক থাকে যারা সদর দপ্তরের সাথে যোগাযোগ রাখে টেলিফোনের মাধ্যমে। টেলিফোন লাইন মাথার উপর দিয়ে চলে গিয়ে পার্বত্য ঢালের বনানীতে প্রায়ই মিলিয়ে গেছে। কেউ এই প্রত্যন্ত সবুজ প্রান্তরের সাথে রাজনীতি কদাচিৎ সংশ্লিষ্ট করতে পারে, কিন্তু অন্য যে কোনো কিছুর মতো ব্রিটেনের সাথে যুদ্ধ করার জন্য এটি ভাল একটি সম্মুখ লাইন। সে জঙ্গলের এক অংশে গিয়ে ঢুকলো যেখানে হাতি সবলে কাঠ টানছিলো। বড় বড় গুঁড়ি কাটা হচ্ছে এবং হাতির পাল সেগুলো শুঁড়ে তুলে পেচিয়ে জঙ্গলের কেন্দ্রে অপেক্ষমান ট্রাকগুলোতে স্তুপ করে রাখছে। নিজের বার্তা নিয়েই শ্রীরাম এখানে ঢুকলো। কাজে নিমগ্নদের লক্ষ করে সে মন্তব্য করলো: ‘সবুজ কাঁচা কাঠ কেটে ফেলছেন। জানেন কোথায় যাচ্ছে এ কাঠ?’ হাতির পিঠে বসা মাহুত কাজ থামিয়ে শ্রীরামের দিকে মজার দৃষ্টিতে তাকালেন। শ্রীরাম ব্যাখ্যা করলো, ‘এগুলো জাহাজ, রাইফেল, সেতু এবং আরো কত কী নির্মানের জন্য নিয়ে যাওয়া হচ্ছে, যার সবগুলো এ বিশ্বকে ধ্বংস করার কাজে ব্যবহার করা হবে। তারা যুদ্ধে লিপ্ত হতে যাচ্ছে যে যুদ্ধ করতে আমরা বাধ্য। কারণ ব্রিটেন এতে আমাদেরকে টেনে নিচ্ছে। এ কাজে আমাদের বন উজাড় করা ঠিক হবে না। অনেক দূরে, দূরবর্তী দেশে যাচ্ছে, আর আপনি যে টাকা পাচ্ছেন তা হলো ফাঁপানো ইন্দ্রজালিক মুদ্রা যা শীঘ্রই মূল্য হারাতে যাচ্ছে। যুদ্ধের জন্য এসব উপাদান সরবরাহ করবেন না, এসব গাছ আবার জন্মাতে শতাব্দীর পর শতাব্দী লাগবে। এ কাজ ছেড়ে দিন; এটা আপনার হাতে। যে হাতে নিস্পেষিত হচ্ছেন সে হাতকে জোরদার করবেন না।’ যে কাঠ ব্যবসায়ী তাকে পর্যবেক্ষণ করছিলেন তিনি কাছে এসে অনুনয় জানালেন, ‘দয়া করে আমাদেরকে ঝামেলায় ফেলবেন না, হাজার হলেও আমরা ব্যবসায়ী। কাল আপনি যদি ভাল দামে বেশ কিছু কাঠের অর্ডার দেনÑÑÑ’ ‘সম্পদ কামানোর সময় এটা নয়। এটা স্বাধীনতা যুদ্ধে যোগদানের সময়।’ কন্ট্রাক্টর শুধু বললেন, ‘দয়া করে আমাদেরকে আমাদের মতো থাকতে দিন। এসব ঝামেলায় জড়াতে চাই না আমরা।’ কানে কানে বললেন, ‘দয়া করে আমাদের শ্রমিকদের কাজে ব্যাঘাত ঘটাবেন না।’ ‘শ্রমিক ঝামেলা পাকাতে আমি বের হইনি। এই নারকীয় উদ্দেশ্যে আপনি অবশ্যই ঐ কাঠ পাঠাবেন না। সব যুদ্ধই হচ্ছে মহাত্মাজীর অহিংসা মতের বিরুদ্ধে। মানেন কি মানেন না?’ ‘আহ্ , মহাত্মাজী। হরিজন তহবিলে পাঁচ হাজার টাকা দিয়েছিলাম। আমার বাড়িতে তাঁর একটা প্রতিকৃতি আছে, বিছানা থেকে উঠেই যার মুখ প্রথমে দেখি তা হচ্ছে তাঁর মুখ।’ ‘অহিংসা বলতে তিনি কী বুঝিয়েছেন জানেন?’ ‘হ্যাঁ, হ্যাঁ, তিনি মালগুদিতে এলে তাঁর একদিনের বক্তৃতাও আমি বাদ দেইনি।’ ‘তাহলে মনে হচ্ছে সমান সংখ্যক লয়েলিস্ট মিটিংও আপনি অবশ্যই করে থাকবেন।’ কন্ট্রাক্টর লজ্জায় মাথা নোয়ালেন। বিড়বিড় করে বললেন: ‘আসলে, কালেক্টর এসে “এটা করেন, ওটা করেন” বললে আমাদের মেনে চলতে হয়। সরকারি কর্মকর্তাদের আমরা নাখোশ করতে পারি না।’ ‘যুদ্ধ তহবিলে কতটুকু দিয়েছিলেন?’ ‘মাত্র পাঁচ হাজার। আমি খুবই নিরপেক্ষ; গভর্নমেন্ট নিজে এসে আমাদের কাছে আবেদন জানালে কী করে অস্বীকৃতি জানাই? হাজার হোক আমরা ব্যবসায়ী তো।’ লোকটি চালাকি করে শ্রীরামকে গাছের নিচে তাবুতে নিয়ে গেলো। এতে কথা শুনতে শুনতে মাহুতদের সময় নষ্ট হলো না। কাঠের গুঁড়ি গড়িয়ে নামানোর শব্দে বন অনুরণিত হলো, আর মাহুতরা ঠাট্টা-তামাশা করতে করতে হাতি চালিত করলো। বাতাসে ইউক্যালিপটাস, সবুজ পাতা ও মাহুতদের ধূমপান করা তামাকের হালকা গন্ধ ভাসছিলো। কন্ট্রাক্টর শ্রীরামকে চেয়ারে বসিয়ে চুলায় ধোঁয়া উদগীরণশীল একটি কেতলি বের করে দুই কাপ চা ঢাললেন। তাকে দেখে শ্রীরাম হতোদ্যম হলো। তিনি ছিলেন লম্বা কৃশকায় ও মাথা ছিলো পুরোটাই কামানো, পরনে ছিলো হাতে বোনা ঢিলেঢালা ফ্ল্যানেলের জ্যাকেট ও ধুতি, আর তার কোমরে গোঁজা ছিলো চামড়ার থলে ও মোড়ানো কিছু কাগজ। লোকটির গলায় চিকন স্বর্ণের চেইন ও বাম হাতে ঘড়ি দেখে ধনী মনে হলো, কিন্তু বেশি খাঁটুনির ফলে চোখ মুখ বসে গেছের মতো দেখাচ্ছিলো। শ্রীরাম বললো: ‘আপনি নিঃসন্দেহে প্রচুর টাকা কামাচ্ছেন, কিন্তু এর কোনো মূল্য নেই যদি না আপনার ÑÑইয়ার ÑÑচেতনা বিকশিত হয় ’ সে শব্দ হাতড়ে বেড়ালো। সে বলতে চাইলো, ‘জাতীয় সেবা ’ বা ‘দেশপ্রেম ’, কিন্তু এসব কথা বলতে বলতে তার আর ভাল লাগছিলো না, এসব কথায় মঞ্চের বক্তৃতার গন্ধ ছিলো। সে বললো: ‘আপনার কাছে মহাত্মা গান্ধীর ছবি থাকলে প্রার্থনা করুন যেন যুক্তিসঙ্গত চিন্তা করতে তিনি আপনাকে অনুপ্রাণিত করতে পারেন, এইটুকুই বলতে পারি।’ হঠাৎ সে উঠে পড়লো। লোকটি বললো: ‘আপনার চা খেয়ে যান।’ শ্রীরাম বললো, ‘এর দরকার নেই।’ তাবু থেকে বেরিয়ে ঝোপের ফাঁকের মধ্য দিয়ে সে দূরে চলে গেলো। সময় জ্ঞান সে হারিয়ে ফেললো। যন্ত্রের মতো কাজ করেই চললো। বনে গ্রামে ঢূকে মহাত্মাজীর বার্তা সবার কাছে পৌঁছে দিলো। যেখানেই গেলো লিখলো, ‘ভারত ছাড়ো ’। আর পরে লয়েলিস্টরা তা সংশোধন করে দিলো: ‘ছাড়ো না ’ অথবা ‘আমি ছাড়ছি ’ দিয়ে। এক জায়গায় একজন শ্রীরামকে জিজ্ঞেস করলো: ‘ এসব জায়গায় “ভারত ছাড়ো ” লিখে আপনার লাভ কী? আপনি কি চান আমরা ছেড়ে যাই?’ ‘এর মানে তা নয়।’ ‘তাহলে যাদের উদ্দেশ্যে এটা লেখা তাদের চোখে পড়ে এমন জায়গায় সেটা লিখুন।’ ‘ওরা সব জায়গায় আছে, কখনো দেখা যায় কখনো দেখা যায় না। সব জায়গায় লিখে দেওয়াই অনেক ভাল।’ ‘সময় ও রঙের অপচয়, ’ লোকটি বললো। ‘আমি আদেশ পালন করছি মাত্র, আর থেমে থেমে খুব বেশি জ্ঞানের কথা শুনতে আমি পারবো না।’ সাগর পৃষ্ঠ থেকে ৪০০০ ফুট উপরে আবাদ হয়েছিলো যেদিকে শ্রীরাম তার রঙের কৌটা ও তুলি নিয়ে গেলো। তার জন্য এটা প্রায় অর্ধেক দিনের কাজ ছিলো। এক পড়ন্ত বিকেলে সে এস্টেটে গিয়ে পৌঁছালো। এর উপর ‘ম্যাথিয়েসান এস্টেট’ লেখা চিত্রবৎ একটা গেট-পোস্ট দেখলো। আশপাশে মাইলের পর মাইল জুড়ে কোনো মানুষ দেখা যাচ্ছিলো না। শ্রীরাম কিছুক্ষণের জন্য ভাবলো: ‘এখানে কোনো বার্তা লিখে কি লাভ হবে?’ আশপাশে তাকিয়ে সে ইতস্তত বোধ করলো, কিন্তু সন্দেহটাকে অকাজের হিসেবে উড়িয়ে দিলো। গেট-পোস্টের এক অংশে চট করে ধূলি ঝেড়ে সে সুন্দর গোটা গোটা হস্তাক্ষরে লিখলো: ‘ভারত ছাড়ো ’, এবং যাওয়ার জন্য ঘুরে দাঁড়ালো। ঐ পথ দিয়ে যাওয়া এক এস্টেট শ্রমিক বার্তাটি দেখার জন্য থামলো ও জিজ্ঞেস করলো: ‘আপনি কি বোর্ড লিখছেন?’ শ্রীরাম বার্তাটির তাৎপর্য বিস্তারিত ব্যাখ্যা করলো। লোকটি কিছুক্ষণ শুনে বললো: ‘চলে যান। ঐ দরাই(ইউরোপিয়ান সাহেব) খারাপ লোক। সবসময় বন্দুক রাখে। আপনাকে গুলি করতে পারে।’ শ্রীরাম কিছুক্ষণ ইতস্তত করে ভাবলো শান্তিপূর্ণভাবে চলে যাওয়া না গুলি খাওয়া বেশি কাজের হবে। হঠাৎ তার মনে হলো এতদূরে আসার কোনো দরকার ছিলো না যদি শুধু নিরাপদে ফেরার কথা থাকতো। সমুদ্র পৃষ্ঠ থেকে ৪০০০ ফুট উপরে সে অকারণে আসেনি। দোধারী কুড়ালটা নিয়ে শ্রমিকটি সতর্কতা বাণী উচ্চারণ করে চলে গেলো। সামনে দেখা পুরাতন এক বাঙলোর দিকে সে হাঁটতে লাগলো। ‘আশা করি তার কোনো বুলডগ নেই, ’ শ্রীরাম চিন্তা করলো। কতকটা রক্তাক্তভাবে সে দৃশ্যটি আগেভাগে কল্পনা করলো। সিঁড়ির কাছে আসবে আর দরাই দোনলা বন্দুক দিয়ে শ্রীরামকে ধোঁয়া ও রক্তে মিশে দিবে। হয়তো ভারতী এতে অনুশোচনায় পুড়বে। মনে মনে বলবে: ‘সে জীবিত থাকতে আমি যদি আমার ভালবাসা আরো স্পষ্ট করে জানাতাম!’ যাই হোক, সে কেন এটা করছে? হাই কমান্ড তো তাকে বন্দুকওয়ালার কাছে গিয়ে বুক পেতে দিতে নির্দেশ দেয়নি। লাল মুখাবয়ব ও হলুদাভ লাল চুলবিশিষ্ট সাত ফুট উচ্চতার এক ব্যক্তি বারান্দার পাশে এসে তার সাথে গায়ে পড়ে আলাপ জুড়ে দিলেন। পাইপ খাচ্ছিলেন, আর ট্রাউজারের পকেটে এক হাত আরামদায়কভাবে ঢুকিয়ে রেখেছিলেন। মুহুর্তের জন্য শ্রীরাম সামনে অগ্রসর হতে একটু অনিচ্ছা বোধ করলো। ‘হ্যালো! আপনি কে হতে পারেন?’ তার পাশে নিজেকে শ্রীরামের বামন মনে হলো। উঠে গিয়ে তীক্ষè কণ্ঠে বললো: ‘আমি একটা বার্তা এনেছি।’ ‘ওহ্ , ভাল। কোত্থেকে?’ ‘মহাত্মাজীর কাছ থেকে।’ মুখ থেকে পাইপটা বের করে লোকটি বললেন: ‘ওহ্ ! কী?’ ‘মহাত্মা গান্ধীর কাছ থেকে।’ ‘তাই নাকি? তো কী সেটা?’ ‘সেটা হচ্ছে আপনাদের অবশ্যই ভারত ছাড়তে হবে।’ কিছুক্ষণের জন্য লোকটিকে অপ্রস্তুত দেখালো। কিন্তু মুহুর্তের মধ্যেই তিনি স্থৈর্য ফিরিয়ে আনলেন। বললেন: ‘আপনি ও কথা কেন বলছেন?’ ‘আমি বলছি না। আমি শুধু বার্তাটা আপনাকে দিচ্ছি।’ ‘ওহ্ ! ভেতরে এসে কিছু পান করেন, আসবেন না?’ ‘না, আমি কখনো পান করি না।’ ‘ওহ্ , হ্যাঁ, হ্যাঁ। আমি মদ বুঝাইনি, তবে আপনি যা চাও তা-ই পান করতে পারেনÑ শরবত, বা কফি বা চা।’ ‘আমার কিছুরই দরকার নেই।’ ‘আপনাকে ক্লান্ত দেখাচ্ছে, ভেতরে আসেন, আলাপ করি। বেয়ারা!’ উচ্চস্বরে বলাতে তার বেয়ারা হাজির হলো। ‘দুই গ্লাস কমলার রস, ’ তিনি অর্ডার দিলেন। ‘তাড়াতাড়ি করো।’ ‘জ্বী, স্যার, ’ বলে বেয়ারা চলে গেলো। অনেকগুলো বোতামওয়ালা সাদা একটি ইউনিফর্ম পরেছিলো চাকরটি। শ্রীরাম চিন্তা করলো, ‘যে সব ভারতীয় তার চাকর হিসেবে কাজ করে তাদের জন্য এই লোকটি বিশেষ ধরণের পোশাকও চায়’, আর ব্যাখ্যাতীত রাগ অনুভব করলো। লোকটি কিছুক্ষণ তার মুখের দিকে তাকিয়ে বললেন, ‘জলদি আসেন, বারান্দায় যাই।’ তিনি শ্রীরামকে সিঁড়ি বেয়ে বারান্দায় নিয়ে গেলেন । বারান্দাটা সুন্দর একটি ছিটকাপড়ে ঢাকা বেতের চেয়ারে সজ্জিত ছিলো। এখানে সেখানে বড় বড় পাত্রে আরো কিছু শোভাকৃত গাছের চারা ছিলো। শ্রীরাম এর সাথে নিজের পরিপার্শ্ব, হাজার হাজার বছর আগেকার নির্মিত ধ্বংসপ্রাপ্ত ভবন যেখানে সাপ বিচ্ছু ও ঘুমানোর একটি মাত্র মাদুর আছে তার সাথে তুলনা করলো। সে প্রশ্ন না করে পারলো না, ‘কীভাবে এতকিছু করলেন? জানতে পারি?’ ‘কী করেছি?’ ম্যাথিয়েসান জিজ্ঞেস করলেন। ‘এত সাজসজ্জা ও বিলাস?’ আশপাশের সবকিছু নির্দেশ করে শ্রীরাম বললো। মাথিয়েসান মৃদু হেসে বললো, ‘একে আমি বিলাসিতা বলবো না, বন্ধু।’ ‘আর এদিকে মিলিয়ন মিলিয়ন মানুষ অন্নাভাবে বাসস্থানের অভাবে আছে!’ শ্রীরাম সাধারণভাবে বললো । এই মুহূর্তে তার কাছে না থাকা ভারতীর কাছ থেকে সে পরিসংখ্যানটি পেয়েছিলো। ‘এ তো আমাদের প্রার্থনা, ’ মাথিয়েসান বললো, ‘যে তাদের সবার খাওয়ার মতো শুধু যথেষ্ট না থাকতে পারে তাদের থাকার মতো সুন্দর বাড়িও থাকতে পারেÑ আমি আশা করি তা এর থেকেও ভাল। এটা তো একটা অস্থায়ী বাড়ি।’ শ্রীরাম এ ব্যাখ্যাটিকে জাতিগত ঔদ্ধত্যের দিকে নিয়ে গেলো। ‘নিজের সমৃদ্ধি ও এ দেশের মালিক হওয়ার অনুভূতিই তাকে এরকম করে কথা বলাচ্ছে, ’ সে চিন্তা করলো, আর কণ্ঠস্বরকে তুঙ্গে তুলে চিৎকার করে বলতে চাইলো, ‘ছাড়ো, ছাড়ো, নিজেদের দেখভাল আমরা নিজেরাই করবো, বেতের আসবাবপত্র ও সেগুলোর জমকালো কাভারের জন্য আমরা পরোয়া করি না, খাবারের জন্যও আমরা পরোয়া করি না, আমরা যা পরোয়া করি তা হলোÑÑ’ কীভাবে কথাটি শেষ করতে হবে সে ব্যাপারে সে স্বচ্ছ ছিলো না। সে জোরে এইটুকুই বললো, ‘আমরা তা-ই পরোয়া করি যা মহাত্মাজী আমাদের করতে বলেন।’ ‘আর আপনাদের কী করতে উপদেশ দিয়েছেন?’ ‘আমরা চরকা কাটবো, খাদি পরবো, বিলাসহীন জীবন-যাপন করবো, আর আমরা ভারতীয়রাই ভারতকে চালাবো।’ ‘কিন্তু তা চেষ্টা করার সুযোগ আপনারা প্রত্যাখ্যান করেছেন। আপনার কি মনে হয় না যে ক্রিপের প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করে নিজেদের করুণার পাত্র করেছেন?’ শ্রীরাম কিছুক্ষণ কোনো উত্তর দিলো না। তার কাছে এটি শাস্ত্রীয় বিষয় মনে হলো যার অর্থ সে জানতো না। তার মাথায় এমন জটিল জটিল শাস্ত্রীয় বিষয় ঢুকলো না, আর তাই সে শুধু বললো, ‘মহাত্মাজী তা মনে করেন না, ’ এভাবে আলোচনা শেষ হলো। সে এলোমেলো কিছু শব্দ জানতোÑÑঅধিরাজ্যের মর্যাদা, মুসলমানদের জন্য সংরক্ষিত কোটা, আর এটা সেটা । কিন্তু পত্র-পত্রিকা থেকে সে এসব সংগ্রহ করলেও সেসব তার কাছে অপ্রাসঙ্গিক মনে হলো। শুধু যে বিষয়টা তার কাছে গুরুত্বপূর্ণ ছিলো তা হলো মহাত্মাজী মনে করেন না যে প্রস্তাবগুলোর সাথে ভারতের স্বাধীনতার বিষয়ে কোনো সম্পর্ক ছিলো। ‘এ তো শুধু লোক দেখানোর জন্য, ’ পত্রিকার একটা মন্তব্য মনে করে সে বললো। ‘আমরা ওসব চাই না। এমন প্রস্তাবে আমাদের কোনো লাভ নেই। আমরা বদান্যতা চাই না।’ শেষের এই ভাবনাটা তাকে এত বিধ্বস্ত করে তুললো যে চাকরটি ট্রেতে দুই গ্লাস কমলার রস আনার সাথে সাথেই ট্রেটি নাটকীয়ভাবে ভূপাতিত করে বলতে চাইলো, ‘এ আমি চাই না, ’ কিন্তু লম্বা ও অদৃশ্যপ্রায় এক পান-পাত্রের মধ্যে পানীয়টা ছিলো সুন্দর, সজীব ও হলুদ। আর উপরে ওঠার ক্লান্তি ও খাঁটুনিতে তার গলা শুকিয়ে গিয়েছিলো। সে ইতস্তত করলো। তাকে এক গ্লাস দিয়ে ম্যাথিয়েসান নিজেরটা তুলে নিয়ে বললেন, ‘আপনার স্বাস্থ্য ও সৌভাগ্যের জন্য।’ শ্রীরাম শুধু অস্ফুটস্বরে বলতে পারলো, ‘ধন্যবাদ’, আর গ্লাসটি এক চুমুকেই শেষ করলো। রস তার গলা দিয়ে নামার সময় তা এতো আরামদায়ক ছিলো যে তার মনে হলো কোনো অবস্থাতেই একে বাধাগ্রস্ত করতে পারলো না। দিব্যানন্দে চোখ বন্ধ করলো। রাজনীতি, ভারতী, বিবাদ, এমনকি মহাত্মাজীকেও মুহূর্তের জন্য সে ভুলে গেলো। এক সেকেন্ড মাত্র সে অনুভূতি স্থায়ী হলো। শ্রীরাম গ্লাস নামিয়ে রেখে দীর্ঘশ্বাস ফেললো। লোকটি তার গ্লাসের উপরের স্তর থেকে অদৃশ্য ক্ষুদ্র এক আস্তরণ সরিয়ে নিয়ে বললেন, ‘আরেক গ্লাস হবে নাকি?’ ‘না, ’ এই বলে শ্রীরাম চলে যাওয়ার প্রস্তুতি নিলো। লোকটি শ্রীরামের সাথে অর্ধেক পথ সঙ্গ দিলো। শ্রীরাম বললো, ‘আপনার দরজার প্রবেশপথে যে বার্তাটি আমি লিখেছি তা মুছে ফেলবেন না।’ ‘ওহ্, না, মুছবো না। এটা তো স্মৃতিচিহ্ন আর এটি গর্বভরে সংরক্ষণ করবো।’ ‘কিন্তু আপনারা কি দেশ ছেড়ে যাবেন না মানে ত্যাগ করবেন না?’ শ্রীরাম বললো। ‘আমি তা মনে করি না। আপনি কি এ দেশ ছাড়তে চান?’ ‘আমি কেন ছাড়বো? এখানে আমার জন্ম হয়েছে, ’ উষ্মাভরে শ্রীরাম বললো। ‘দূভার্গ্যজনকভাবে আমি এখানে জন্ম নেয়নি, কিন্তু আপনার থেকেও বেশি সময় ধরে আমি এখানে আছি। আপনার বয়স কত? ‘সাতাস না হয় ত্রিশ। তাতে কী এসে যায়?’ ‘ভালো কথা, আমি যখন এখানে এসেছিলাম তখন আপনার বয়সী হবো। আর এখন আমার বয়স বাষট্টি। দেখুন, এটা তো সম্ভব যে আপনি এ দেশে যতটা জড়িত আমিও ততটা জড়িত।’ ‘কিন্তু আমি তো ভারতীয়, ’ শ্রীরাম জিদ বজায় রেখে বললো। ‘আমিও তাই, ’ লোকটি বললো, ‘আর পাঁচ হাজার মাঠ শ্রমিক এবং দুইশ জন ফ্যাক্টরি ও অফিস কর্মী হিসেবে নিয়োগ দিয়েছি তা বিবেচনা করলে আমি হয়তো এদেশের মানুষের কিছুটা কাজে এসেছি।’ ‘নিজের ফায়দা লোটার জন্য আপনি তা করছেন। আপনার মনে হয় আমরা আপনার চাকর ছাড়া আর কিছু হতে পারি না, ’ আর ভাল কিছুর চিন্তা না করতে পেরে শ্রীরাম বললো এবং এরপর জিজ্ঞেস করলো, ‘আপনি কি ভয় পান না? আপনি সম্পূর্ণ একা থাকেন, ভারতীয়রা যদি আপনাকে বের করে দেয়, তবে আপনার জন্য তা নিরাপদ হবে না।’ মাথিয়েসান কিছুক্ষণের জন্য চিন্তায় পড়ে গেলেন এবং বললেন, ‘ঠিক আছে, আমার মনে হয় আমি আমার সুযোগটা নেবো, ব্যস, কিন্তু একটা ব্যাপারে আমি বেশ নিশ্চিতÑÑ কোনোকিছুকেই আমি ভয় পাই না।’ ‘এর কারণ কি এই যে মহাত্মাজী আপনার সর্বেত্তাম বন্ধু। তিনি চান এ সংগ্রাম সম্পূর্ণরূপে অহিংস উপায়ে পরিচালিত হোক।’ ‘অবশ্যই সেটাও একটা বিষয়। আচ্ছা, আপনার সাথে পরিচিত হয়ে ভাল লাগলো, ’ হাত প্রসারিত করে তিনি বললেন, ‘বিদায়।’ শ্রীরাম পথ দিয়ে নিচে চলে গেলো যার উপরে কফি গুল্ম, ঝোপ-ঝাড়, বাঁশঝাড় এবং অন্য সবকিছুর উপর দিয়ে এঁকেবেঁকে যাওয়া পেপার ভাইন, তার সাথে পাশে নর্দমা জুড়ে ঘন সবুজ ঘাসে ভরা ছিলো। তার এত ক্লান্ত লাগলো যে সে ভাবলো মখমলের চাবড়ার উপর শুয়ে সে কেন ঘুমালো না, কিন্তু তার করার মতো অন্য কাজ ছিলো। করার মতো অসংখ্য কর্তব্য তার ছিলো। ** তার পরবর্তী গন্তব্য ছিলো তিন মাইল দূরে সোলুর নামক গ্রামে। জায়গাটায় পাহাড়ের ঢালে পঞ্চাশটির মতো বাড়ি ছিলো। এর নিচে উপত্যকা ও চারণভূমি প্রসারিত হয়ে ছিলো। সাতটা বাজে শ্রীরাম সেখানে পৌঁছালো। গ্রামটি ছিলো কর্মব্যস্ত। নারী, পুরুষ ও শিশুরা দলে দলে উৎসাহজনকভাবে কথা বলতে বলতে গ্রামটির বটগাছের নিচে সমবেত হলো। গাছটিতে একটি গ্যাস লাইট ঝুলে ছিলো, আর দু’একজন লোক গ্রামটির ধনী পরিবারগুলোর একটি থেকে দুইটি লোহার চেয়ারের ব্যবস্থা করছিলো। লোহার চেয়ার দুটি আনার উদ্দেশ্য ছিলো অভ্যাগত কোনো বিশিষ্ট অতিথিদের জন্য। শ্রীরাম গ্রামটির একমাত্র দোকানে গিয়ে দু’টি কলা কিনে এক বোতল সোডা পানি দিয়ে খেয়ে ফেললো। নিজেকে সতেজ মনে হলো। দোকানদারকে জিজ্ঞেস করলো, ‘সভা কখন শুরু হবে?’ ‘খুব শীঘ্রই, আমাদেরকে বিনোদন দেয়ার জন্য তারা কাকে যেন আনতে গেছে। সুন্দর অনুষ্ঠান হবে। আপনি কি ততক্ষণ থাকবেন?’ ‘হ্যাঁ, থাকবো।’ ‘কোথা থেকে আসছেন?’ ‘অনেক দূর থেকে, ’ শ্রীরাম বললো। ‘কোথায় যাচ্ছেন?’ দোকানদার জিজ্ঞেস করলো। ‘আবার অনেক দূরে, ’ যতটা এড়িয়ে চলা সম্ভব তার চেষ্টা করে শ্রীরাম বললো। লোকটি একে চমৎকার একটা কৌতুক মনে করে হাসলো। ছাদ থেকে ঝোলা রশি এক হাতে ধরে লোকটি দাঁড়িয়েছিলো। দোকানটি ছিলো বাক্সের মতো ছোট্ট, সম্পূর্ণরূপে পুরাতন প্যাকিং কেসের তৈরী, আর মালিকের বসার জন্য চটের বস্তা দিয়ে গদি করা আসন ছিলো। রংধনুর রঙে গ্যাসীয় পানির বোতলগুলি দিয়ে তার উপরের তাকটি সজ্জিত, দোকানের সামনে কাঁচা কলার কাঁদি পেরেক দিয়ে ঝোলানো, মুখের উপর কাউকে আঘাত করছে মতো, আর কয়েকটা ছোট্ট বাক্স ও ভাজা চাল, ভাজা ছোলা, পেপারমিন্ট, সুগার ক্যানডি ইত্যাদির হালকা টিন ছিলো। লোকটি শ্রীরামের কৌতুকে এতটাই মজা পেয়েছিলো যে সে জিজ্ঞেস করলো, ‘আমার কাছে চমৎকার কিছু বিস্কুট আছে, খেয়ে দেখবেন নাকি?’ ‘ওগুলো কি ইংরেজদের?’ শ্রীরাম জিজ্ঞেস করলো। ‘ইংরেজদের সবচেয়ে ভাল বিস্কুট।’ ‘আপনি কী করে নিশ্চিত হলেন?’ ‘সেনাবাহিনীর এক বন্ধুর কাছ থেকে ওগুলো পেয়েছি। ওগুলো এখন শুধু সেনাবাহিনীদেরকেই সরবরাহ করা হয়। একেবারে বিশুদ্ধ ইংরেজ বিস্কুট, আশপাশে মাইলের পর মাইল খুঁজলেও আপনি পাবেন না। আজকাল কেউ আর ওগুলো পায় না।’ ‘আপনার কি কোনো লজ্জা নেই?’ শ্রীরাম জিজ্ঞেস করলো। ‘কেন, কেন, কী হয়েছে?’ লোকটি অবাক হয়ে বললো । আরো বললো, ‘এই যে, যা খেয়েছেন তার টাকাটা দিয়ে এখান থেকে বেরিয়ে যান। আপনি তো খাদি পরা লোক, তাই না? ওহ্ ! ওহ্ ! আমি তো খেয়ালই করিনি। আর তাই আপনি মনে করেন যা খুশি করতে পারেন, যা খুশি বলতে পারেন, আর উচ্ছৃঙ্খলের মতো আচরণ করতে পারেন।’ ‘আমার সম্পর্কে যা খুশি বলতে পারেন, কিন্তু এই পোশাক সম্পর্কে খারাপ কথা বলবেন না। এটা হচ্ছেÑÑ এটা হচ্ছেÑÑ এতই পবিত্র যে এভাবে এর সম্পর্কে কথা বলা যায় না। তার আচরণে দোকানদার ভয় পেয়ে বললো, ‘ঠিক আছে, স্যার, আমাদেরকে আমাদের মতো থাকতে দিন, আর আপনি চলে যান। এখানে বক্তৃতা দেন সেটা আমি চাই না। আপনার টাকা হয়েছে দুই আনা ছয় পয়সা... দুটা কলা দুই আনা, আর সোডা ছয় পাই। ‘এই যে নেন, ’ ছোট্ট মানিব্যাগ থেকে দুটো কয়েন ও একটা ছয় পাই বের করে তার হাতে দিয়ে বললো। ‘দেখুন, ’ লোকটি নরম হয়ে বললো, ‘কলার সময় এটা নয়, তাই ওগুলো যত সস্তা হতে পারতো ততটা সস্তা নয়।’ ‘আপনার দাম নিয়ে তো আমি কোনো সন্দেহ করছি না, কিন্তু আমি চাই আপনি এটা বুঝুন যে বিদেশি জিনিস আপনার বেচতে থাকা ঠিক নয়। ইংরেজদের বিস্কুট আপনার বিক্রি করা ঠিক নয়।’ ‘ঠিক আছে, স্যার, এরপর থেকে বর্তমান মজুদ শেষ হলে আমি সতর্ক থাকবো।’ ‘ভারতীয় হিসেবে যদি আপনার কোনো গর্ব থাকে, তবে আপনি পুরো মজুদটাই নর্দমায় ফেলে দেবেন আর একটা কাককেও তাতে ঠোকরাতে দেবেন না। বুঝেছেন?’ ‘জ্বী, স্যার, ’ গোল করে সমবেত হওয়া সতর্ক লোকজনকে পছন্দ না করে দোকানদার বললো। রাস্তার শেষ প্রান্তে দলে দলে প্রহরারত লোকজনদের নিয়ে বক্তৃতা মঞ্চ নির্মিত হচ্ছিলো। গ্রামবাসীরা খুবই খুশি ছিলো, সেখানে কিছু কিছু ভ্রাম্যমান ব্যবসাও চলছিলো। দোকানদার তার পুরানো এক শত্র“র দেখা পেলো যে তার মুখে হাসি নিয়ে জনতার এক প্রান্তে দাঁড়িয়ে তাকে বিপদে দেখতে পছন্দ করতো। যেন তাকে সন্তুষ্ট করতে দেবতারা এখানে খাদি পোশাকে এই লোকটিকে ডেকে এনেছিলো, একজন আজন্ম ঝামেলা সৃষ্টিকারী। সে শ্রীরামের কাছে আবেদন জানালো, ‘স্যার, এখন দয়া করে একটু চলে যান। আমাকে অবশ্যই দোকান বন্ধ করতে হবে।’ ‘চাইলে আপনি দোকান বন্ধ করতে পারেন, কিন্তু আমি চাই আপনি ঐ বিস্কুটগুলো নষ্ট করে ফেলুন, ’ শ্রীরাম দৃঢ়ভাবে বললো। ‘কোন বিস্কুটগুলো?’ সন্ত্রস্ত হয়ে দোকানদার জিজ্ঞেস করলো। ‘দয়া করে আমাকে আমার মতো থাকতে দিন, স্যার।’ ‘আপনি তো বললেন, আপনার কাছে ইংরেজদের বিস্কুট আছে।’ ‘আমার কাছে ইংরেজদের কোনো বিস্কুট নেই, আমি কোথায় ওগুলো পাবো? কালো বাজারেও ওগুলো পাওয়া যায় না।’ ‘ওগুলো ইংরেজদের বিস্কুট না হলেই অনেক ভাল। আপনার প্রতি আমার শ্রদ্ধা বাড়বে, কিন্তু আমি কি একটা দেখতে পারি?’ ‘আমার মোটেও কোনো বিস্কুট নেই, ’ দোকানদার অনুনয় করে বললো। জনতা উচ্চস্বরে হাসলো। কে যেন কাকে চিৎকার করে বললো, ‘এই যে এখানে ঝোলের মধ্যে রঙ, চলে আসো।’ ‘তোমার ঐ বাক্সে ওগুলো আছে, ’ শ্রীরাম টিনের বাক্সগুলোর একটি নির্দেশ করে বললো। দোকানদার সঙ্গে সঙ্গে ওটার ঢাকনি তুলে ভেতরের জিনিস দেখালো, সৌভাগ্যবশত ময়দা। ‘কিন্তু কিছুক্ষণ আগে আপনি কি বলেননি যে আপনার কাছে বিস্কুট ছিলো?’ ‘কে? আমি? আমি তো শুধু মস্করা করছিলাম। আমি গরীব দোকানদার, কীভাবে আমি বিস্কুটের কালো বাজার মূল্য পরিশোধ করে নিরাপদে রাখতে পারবো?’ ‘ওগুলো সে ভেতরে রেখেছে, স্যার। দোকানের ভেতরটা আমাদের দেখাতে বলেন, ’ রসিকদের একজন বললো। প্রতিটা মুহূর্তে পরিস্থিতি আরো জটিল হচ্ছিলো। ‘আমি এটা খেয়াল করে খুবই দুঃখিত যে বিদেশি কালো বাজারের মাল বিক্রেতা হওয়া ছাড়াও আপনি মিথ্যাবাদী। আপনার দ্বারপ্রান্তে আমার জীবন উৎসর্গ করতেও আমি প্রস্তুত আছি, যদি এতে আপনি শুধু সত্যবাদী ও দেশপ্রেমিক হয়ে থাকেন। যে পর্যন্ত না আপনি আপনার সকল মজুদ খালি করে ঐ নর্দমায় ফেলে দেবেন এবং আমার কাছে অঙ্গিকার করবেন যে আপনি কখনোই আপনার জীবনে আর মিথ্যা উচ্চারন করবেন না সে পর্যন্ত এ জায়গা ছেড়ে আমি যাবো না। আপনার দরজায় পড়ে না মরা পর্যন্ত আমি এখানে থেকে যাবো।’ ‘আমার সাথে আপনি অযথা যুদ্ধ বাধাচ্ছেন, ’ লোকটি বিলাপ করলো। ‘আমি শুধু আপনার ভেতরের মন্দটার সাথে যুদ্ধ করছি, এ হচ্ছে অহিংস যুদ্ধ।’ এক মহিলা অর্ধেক আনা মূল্যের লবণ কিনতে এলো। শ্রীরাম মাঝখান থেকে বললো, ‘দয়া করে এখানে কোনো কিছু কিনবেন না।’ মহিলাটি তাকে ছাড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টা করলে শ্রীরাম তার সামনে কর্দমাক্ত মাটিতে শুয়ে পড়লো: ‘চাইলে আপনি আমার উপর দিয়ে হেঁটে যেতে পারেন, কিন্তু আমি আপনাকে তার দোকানে কোনো কিছু কিনতে দেবো না।’ দোকানদারকে শোচনীয় দেখালো। কী খারাপ দিন! সকালে ঘুম থেকে উঠে কী খারাপ মুখই না সে দেখেছিলো! সে অনুনয় করে বললো, ‘স্যার, আপনি যা বলবেন তা-ই করবো, দয়া করে আমাকে বিপদে ফেলবেন না।’ শ্রীরাম বললো: ‘বন্ধু, আপনি ডাঁহা ভুল করছেন। আপনাকে বিপদে ফেলানোর ইচ্ছা আমার নেই। আমি শুধু আপনাকে সাহায্য করতে চাই।’ লবণ কিনতে আসা মহিলাটি বললো: ‘আমি যদি আপনার যুক্তি-তর্ক শেষ করা পর্যন্ত অপেক্ষা করি, তাহলে চুলার সস উবে যাবে,’ আর মাটিতে শুয়ে থাকা দেহটির দিকে তাকিয়ে তিনি অনুনয় জানালেন: ‘স্যার, ওখানকার দোকানটায় আমি কি লবণ কিনতে পারি?’ মাথা নিচু রেখে শ্রীরাম না হেসে পারলো না। বললো: ‘যেখানে খুশি আপনি সেখানেই লবণ কিনছেন না কেন?’ তার দৃষ্টিকোণ মহিলাটি বুঝতে না পেরে ব্যাখ্যা করলো: ‘স্যার, মাসে একবার আমি লবণ কিনি। হাজার হলেও আমরা তো গরীব মানুষ। জীবনে বিলাস করার সামর্থ্য আমাদের নেই। লবণের দাম হতোÑÑ’ এখনো উপুড় হয়ে শুয়ে থাকা শ্রীরাম তার মাথা তুলে বললো, ‘আপনার মতো মানুষদের জন্যই মহাত্মা গান্ধী যুদ্ধ করছেন। জানেন লবণ কর রদ না করা পর্যন্ত তিনি ক্ষান্ত হবেন না?’ ‘কেন, স্যার?’ নিস্পাপের মতো মহিলাটি জিজ্ঞেস করলো। ‘আপনি যে লবণ খান তার প্রতিটি চিমটির জন্য ইংরেজ সরকারকে আপনার কর দিতে হয়। সে জন্য এত দাম দিয়ে আপনাকে লবণ কিনতে হয়।’ কে যেন মাঝখান থেকে ব্যাখ্যা করে বললো: ‘আর কর উঠে গেলে এক আনায় আপনি এত লবণ পাবেন,’ হাত দিয়ে বিশাল পরিমান নির্দেশ করলো। মহিলাটি ঠিকমতো মুগ্ধ হয়ে চোখ বিস্ফারিত করে বললেন: ‘এত সস্তা হতো,’ অশ্র“পূর্ণ চোখে রশিতে ভর দিয়ে পায়ের আঙ্গুলের উপর দাঁড়ানো দোকানদারের দিকে বৈরী দৃষ্টি নিক্ষেপ করে আরো বললেন, ‘আজকাল আমাদের দোকানদারেরা সবকিছুর দাম বাড়িয়ে দিচ্ছে। তারা অনেক অর্থলোলুপ হয়েছে,’ জনতার মধ্যে সাধারণ একটা সম্মতিসূচক ধ্বনি শোনা গেলো। পায়ের আঙ্গুলে ভর করে দাঁড়িয়ে থাকা দোকনদারটি বললো, ‘আমরা কী করতে পারি, সরকার যে দাম নির্ধারণ করে দিয়েছে সে দামে আমরা লবণ বেচি।’ ‘এ সব প্রশ্নে আমরা যারা সরকারের সাথে লড়াই করছি তাদেরকে আপনি সমর্থন দিতে পারেন,’ শ্রীরাম বললো, ‘যদি আপনি অন্য কিছু করতে না পারেন। ১৯৩০ সালে ডান্ডি উপকূলে মহাত্মার অভিযান আপনার মনে আছে? ডান্ডি উপকূলে লবণ-পানি সিদ্ধ করে যে কাউকে লবণ পানি সিদ্ধ করতে সাহায্য করে তাদের নিজের লবণ তৈরি করতে গোটা দেশে তিনি তিনশ মাইল হেঁটেছিলেন ।’ দোকানদারটি শোচনীয় অবস্থারই প্রতিচ্ছবি ছিলো। নিচু স্বরে সে বললো, ‘আপনি আমাকে দিয়ে যা করাতে চান আমি তা-ই করবো, দয়া করে উঠে চলে যান। ময়লায় শুয়ে থেকে আপনার কাপড় এত নোংরা হচ্ছে।’ ‘আমার কাপড় নিয়ে ভাববেন না। সে আমি দেখবো; কাপড় আমি ধুইতে পারি।’ ‘কিন্তু স্যার, এ মাটি শক্ত হলে সহজে উঠবে না।’ দোকানদার বললো। জনতার মধ্যে কেউ একজন চিৎকার করে বললো, ‘আপনি কিসের কথা বলছেন? উনি হয়তো ভাল একজন ধোপাকে কাপড়টি দেবেন।’ ‘ধোপা খুঁজে না পেলে আপনি কাপড়টা আমার ধোপা শামাকে দিতে পারেন, যে কোনো দাগ সে তুলে ফেলবে। এমনকি উপরের এস্টেটের ইউরোপিয়ানরাও তাদের কাপড় ধোয়ার জন্য তাকে ডাকে, স্যার।’ অন্য আরেকজন তাকে কনুই দিয়ে গুঁতা মেরে বিড়বিড় করে বললো, ‘এখন ইউরোপিয়ানদের কথা উল্লেখ করো না; উনি ওদেরকে পছন্দ করেন না।’ শ্রীরামের কাছে মনে হলো যে এখানকার লোকজন তাকে মাটিতে শুয়ে থাকতে দেখতে পছন্দ করলো, আর তাকে দমিয়ে রাখার জন্য সবকিছু করছিলো। এ রকম মনে হওয়ায় সে হাতে ভর করে উঠে বসে পড়লো। নাকে ও কপালে কাদা এবং চুলে বালু লেগেছিলো। একটা গেঞ্জি ও তার আকারের দ্বিগুণ ট্রাউজার পরা একটা ছোট্ট বালক হাতে একটা ছয় পাই শক্ত করে ধরে দৌড়ে আসলো। চিৎকার করে বললো: ‘ঠাকুরদার জন্য ভাল দেখে তিন পাইয়ের তামাক গুড়া আর তিন পাইয়ের নারকেল বরফি দেন তো।’ সে সবেগে ছুটে শ্রীরামকে পেরিয়ে দোকানটিতে গিয়ে হাতে কয়েনটি ধরে রাখলো। দোকানদার কয়েনটা এক ঝটকায় চোখের নিমিষে তার হাত থেকে নিয়ে নিলো। ছোট্ট বালকটির পা ছুঁয়ে শ্রীরাম কাকুতি জানালো: ‘এ দোকানে কোনো কিছু কিনবে না।’ ‘কেন নয়?’ শ্রীরাম ব্যাখ্যা করতে লাগলো, ‘দেখো, আমাদের দেশÑÑ’ জনতার মধ্যে দুই তিনজন লোক বালকটির ঘাড় ধরে টেনে নিয়ে বললো, ‘প্রশ্ন করো কেন? তোমাকে যা করতে বলা হয়েছে তা-ই শুধু করো না কেন?’ তারা তাকে টেনে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করলো, কিন্তু ছোট একটি কাঠের রেলিং ধরে সে চিৎকার করে বললো: ‘উনি আমার টাকা নিয়েছেন। আমার টাকা, আমার টাকা।’ রাগতস্বরে লোকজন দোকানদেরকে চিৎকার করে বললো, ‘ছেলেটাকে ওর টাকা দিয়ে দাও।’ দোকানদার চিৎকার করে বললো: ‘আমি কী করে দিবো? আজ শুক্রবার, আর কয়েন ফিরে দেওয়া অশুভ হবে না? বাকি জীবনটা আমার বরবাদ হবে। টাকাটার জন্য সে যা চায় তা-ই দিতে আমি প্রস্তুত, সে চাইলে আরো একটু বেশি দেবো; কিন্তু না, টাকাটা ফেরত দিতে আমি পারবো না। বন্ধুরা, আমার উপর দয়া করো। আমার সাতটা বাচ্চা আছে।’ ছোট্ট বালকটি চিৎকার করে বললো: ‘তামাক গুড়া না নিয়ে গেলে ঠাকুরদা আমাকে মেরে ফেলবে। তার বাক্স খালি হয়েছে। আমার জন্য অপেক্ষা করছে।’ ‘ঐ দোকানে গিয়ে কিনে আনো,’ কেউ একজন বললো। বালকটি উত্তর দিলো, ‘অন্য দোকান থেকে আনলে তিনি তা ফেলে দেবেন।’ অসময়োচিত অহংকার দেখিয়ে দোকানদারটি বললো, ‘গত দশ বছর ধরে সে আমার দোকানের খদ্দের। অন্য কোনো জায়গা থেকে সে এ তামাক গুঁড়া আনতে পারে না। যে কাউকে এটা আমার চ্যালেঞ্জ।’ রেলিং আঁকড়ে ধরা বালকটি চিৎকার করে বললো, ‘আমাকে অবশ্যই তামাকের গুঁড়া পেতে হবে, নইলেÑÑ’ জনতার মধ্যে থেকে কে যেন বিড়বিড় করে অভিশাপ দিয়ে তার উপর ঝাঁপিয়ে পড়লো এবং রেলিং থেকে সরিয়ে নিয়ে গেলো। বালকটি জোরে কাঁদতে লাগলো। জনতা জোরে হাসলো। দোকানদার হতাশায় বিমর্ষ হলো। সামনের মাটির দিকে গম্ভীরভাবে এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে শ্রীরাম মূর্তির মতো ধূলায় বসলো। কেউ একজন বালকটির কানে কানে বিড়বিড় করে কথা বলে শান্ত করলো, ‘ঐ লোকটি চলে যাওয়ার পর তোমার তামাক গুঁড়া নিয়ে আসবে।’ ‘কখন যাবেন?’ বালকটি ফিসফিস করে বললো। ‘খুব তাড়াতাড়ি যাবেন। এ জায়গার মানুষ নন,’ লোকটি ফিসফিস করে বললো। ‘কিন্তু ঠাকুরদার তামাক বাক্স এক্ষুণি অবশ্যই ভরাতে হবে।’ ‘আমি এসে তোমার ঠাকুরদার সাথে কথা বলবো, চিন্তা করো না।’ শ্রীরাম বসে বসে সবকিছু শুনলো, কিন্তু কিছুই বললো না, নড়লোও না। দোকানের পাশের জনতা ধীরে ধীরে চলে গেলো যেহেতু অন্য প্রান্তে লোকজন জমায়েত হতে লাগলো। গাছে দ্বিতীয় হারিকেন লাগানো হচ্ছিলো। জনতা উপরে তাকিয়ে বললো, ‘রামু হারিকেন নিয়ে গাছে চড়ছে।’ তারা খাকি পোশাকের হাফ প্যান্ট ও খালি গায়ে ডোরাকাটা ঢিলেঢালা ফ্ল্যানেলের জ্যাকেট পরিহিত এক যুবককে নির্দেশ করলো। নিচ থেকে দেখে তার মা চিৎকার করে বললেন, ‘ও রামু, গাছের উপরে উঠিস না, কেউ ঐ ছেলেটিকে নামিয়ে আনো না, সবসময় সে গাছে চড়ে বেড়ায়।’ ‘ভাবছেন কেন, গাছে চড়লে ছেলেটার কী হবে? কেউ একজন জিজ্ঞেস করলো। ঝগড়া বেঁধে গেলো। মা সমুচিত জবাব দিলেন, ‘আপনার যদি এমন ছেলে থাকতো যে সবসময় নিজের বিপদ ডেকে আনে, তবে আপনি ওভাবে কথা বলতেন না।’ গাছের উঁচু থেকে ছেলেটি চিৎকার করে বললো, ‘আপনারা ঝগড়া করতে থাকলে আমি নিচে লাফ দিয়ে সবাইকে আতঙ্কিত করে তুলবো।’ জনতা পরিস্থিতি উপভোগ করলো। মুহূর্তের জন্য দোকানদার নিজের কষ্ট ভুলে গিয়ে গাছের উঁচুতে এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলো এবং মন্তব্য করলো, ‘ভয়ানক ছেলে তো, সবসময় বেপরোয়া সং সেজে মাকে দুশ্চিন্তায় রাখে। ওকে নিয়ে ওনার কোনো শান্তি নেই।’ ‘আচ্ছা, নিজের দেখ্ ভাল করার জন্য ওকে তো যথেষ্ট বয়সী দেখাচ্ছে।’ শ্রীরাম বললো। ‘হ্যাঁ, কিন্তু ওর মা-ই ওকে নষ্ট করেছে, সবসময় গাছে চড়ছে, বা সাঁতার কাটছে বা লোকজনকে জ্বালাতন করছে, উচ্ছৃঙ্খল,’ দোকানদার বললো। ‘আপনারাই ওকে খুব বেশি জ্বালাতন করছেন । ওকে একা থাকতে দিলে কাউকে সে বিরক্ত করবে না, ’ শ্রীরাম বললো, ‘সবাই ওকে উপদেশ দিচ্ছে আর দুশ্চিন্তাগ্রস্ত করছে।’ গাছের উঁচু থেকে এবার একটা চিৎকার আসলো, ‘হারিকেনটা বেঁধেছি। আর কে এ কাজ করতে পারতো?’ হারিকেনটা বাতাসে দুললো এবং পিছনে শিলা পাহাড়ের ঢালে চলিষ্ণু ছায়া ফেললো। জনতা তাকে দেখে ঠাট্টা-তামাশা করলো। ‘কেউ মস্করা করলে দড়ি কেটে বাতিটা আপনাদের সবার উপর ফেলে দেবো,’ সে চ্যালেঞ্জ ছুড়লো। ‘শয়তান ছেলে, ’ তার মা চিৎকার করে বললো। এ কথাবার্তা শ্রীরামের কাছে অনর্থক মনে হলো। এ জায়গার সব লক্ষহীন ছ্যাবলা লোকদের কথা চিন্তা করে সে রাগান্বিত বোধ করলো। দোকানদার যোগ করলো, ‘এ গ্রামে কোনো শান্তি নেইÑÑ ঐ দুইজন কোনো না কোনোভাবে সবাইকে সবসময় জ্বালিয়ে বেড়াচ্ছে।’ ‘আপনিও ভাল নন।’ শ্রীরাম রাগতস্বরে বললো। দেশ বাঁচার লড়াইয়ে লিপ্ত; এক ঝলকে তার মনের মধ্যে খেলে গেলো গান্ধী, তার চরকা, তার সাথে ঘন্টার পর ঘন্টা ধরে হাঁটা, নানাভাবে নিজেকে ভাবা ও মর্মাহত হওয়া, তাঁর কারাবরণ, আর যাদের জন্য এত সব, সে ধরণের লোকদের দেখে এসব কিছু তার কাছে অনর্থক মনে হলো। হঠাৎ তার খারাপ লাগলো। নিজের সব কর্মকাণ্ড তার কাছে অর্থহীন মনে হলো। কবীর সরণীর আরামদায়ক নির্জনতায় সে তো ফিরতেও পারতোÑÑ যাতে অন্তত এক বৃদ্ধা আত্মা খুশি হতো। দোকানদারটি ইংরেজদের নাকি স্ক্যান্ডিনেভিয়ানদের বিস্কুট নাকি চাইনিজদের ক্র্যাকার নাকি ফরাসি বাটার বিক্রি করলো তাতে কী এসে যায়? এটা তো বিবেকহীন বেনিয়া ও মোটা চামড়ার জনগণের মধ্যে শুধু ব্যবসার বিষয় ছিলো। কাদায় বসে থাকা, ঝামেলা পাকানো ও লড়াই করাÑ সব অযাচিত ছিলো। হঠাৎ সে সতর্ক বোধ করলো। দোকানদারকে জিজ্ঞেস করলো, ‘একটা কাগজ, কলম ও খাম দিন তো। এর জন্য টাকা দেবো।’ ‘না, স্যার,’ দোকানদার বললো, ‘এ দোকানে কাগজ ও এ রকম জিনিসের চাহিদা নেই। এখানে যারা আসে তারা সাধারণ মানুষ, তারা কোনো কিছু খাওয়ার জন্য নয় পান করার জন্য আসে।’ ‘আর যারা শুধু ইংরেজদের বিস্কুট চায়, আমার মনে হয়?’ সংশয়পূর্ণভাবে শ্রীরাম বললো। ‘ওটা ভুলে যান, স্যার। আর কখনো তা করবো না,’ দোকানদার আশ্বস্ত করলো, ‘আপনি যদি ঐ জায়গাটা থেকে উঠে আমাকে ভুলে যান।’ এ প্রশংসা ও ব্যক্তিত্বের বিশাল গুরুত্ব অর্জনে শ্রীরাম তুষ্ট হলো। খুবই সন্তোষজনক ছিলো এটি। ‘আশা করি কাগজ ও খামের ব্যাপারে আপনি মিথ্যা বলছেন না?’ সে জিজ্ঞেস করলো। ‘আপনার কাছে সম্ভবত ইংরেজদের সবচেয়ে সস্তা কাগজ ও কালি শুধু আছে?’ ‘না, স্যার, ঐ মন্দিরের দেবতার নামে শপথ করে বলছি। আমার কাছে কোনো মজুদ নেই, আর যা কিছু পবিত্র আছে তাদের নামে শপথ করে বলছি এরপর থেকে ইংরেজদের সব মাল এড়িয়ে চলবো। কোথাও কখনো কোনো বিস্কুট দেখতে পেলে তা আমি নর্দমায় ফেলে দেবো। যে ইংরেজদের বিস্কুট চাইবে, তাকে লাথি মারবো। এই গ্রামে অন্তত ইংরেজদের আর কোনো বিস্কুট থাকবে না। এর মধ্যে আমি কি স্কুলশিক্ষকের কাছে গিয়ে আপনার জন্য কাগজ-কলম নিয়ে আসতে পারি? এ জায়গাটায় তিনিই শুধু কিছু লেখেন।’ দোকানদার আরো বললো, ‘দয়া করে একটু সরুন, দোকানটা খোলা রেখে যেতে পারছি না, আশপাশে এত বেশি চোর-বদমাশ।’ শ্রীরাম বললো, ‘আপনি চলে গেলে আমি আপনার দোকান দেখে রাখবো, ’ তারপর অলুক্ষণভাবে, ‘আপনি জানেন কত ভালভাবে লোকজনদের আমি তাড়াতে পারি।’ একে মজা হিসেবে সে উপভোগ করলো। এ মজায় যোগ দেওয়াটাকে দোকানদার সর্বোত্তম মনে করলো এবং দোকানের দরজাগুলো বন্ধ করার প্রস্তুতি নিয়ে নার্ভাসভাবে হাসলো। তার স্নায়ুগুলো ছিলো আঁটসাঁট পাছে শ্রীরাম হঠাৎ তার মন বদল করে ফেলে। এ সম্ভাবনার নিরাপত্তা হিসেবে সে আরো বললো, ‘স্যার, আপনি যতই ব্যস্ত থাকুন না কেন, আপনাকে চিঠি অবশ্যই লিখতে হবে। কিছুক্ষণের মধ্যে আমি ফিরে আসবো।’ পিতলের তালাটি মেরে লাফ দিয়ে নিচে নামায় সে খুশি বোধ করলো। মুক্ত মানুষের মতো লাগলো তার। তার সারা জীবনে নিরঙ্কুশ স্বাধীনতার এই প্রথম স্বাদ ছিলো এটি। ‘স্যার, আমি ফিরে আসবো, ফিরে আসবো, স্যার,’ চাবির ঝোকা ঝিন ঝিন করে বাজিয়ে দৌড়ে যেতে যেতে সে বললো । ভুঁড়িওয়ালা লোকটিকে দৌড়াতে দেখা মজার একটা দৃশ্য ছিলো। শ্রীরাম কিছুক্ষণ তা উপভোগ করে সাবান ও চুলের তেল বিজ্ঞাপনের এনামেল প্লেটে সজ্জিত দোকানটির দরজায় হেলান দিয়ে রইলো এবং কাগজটা পেলে চিঠিতে কী কী লিখবে তা মনে মনে ঠিক করলো। মাজারের উপরে গাছের ডালে দুলে থাকা হারিকেনগুলো দেখছিলো সে, আর এর নিচে লোকজন সভার জন্য জমায়েত হলো। চিঠিটা নিয়ে তার মন ব্যস্ত ছিলো: ‘শ্রদ্ধেয় মহাত্মাজী, আমি জানি না কেন আমরা এসব মানুষদের নিয়ে ভাবি। তাদের জন্য আমরা যা কিছু করতে পারি তারা তার যোগ্য বলে মনে হয় না। তারা বিদেশি বিস্কুট খায় ও বিক্রি করে। তারা সবাই ছ্যাবলা-মনা, সবসময় তরুণ এক ছোকড়াকে বিরক্ত করছে যে গাছে চড়েছে। জানি না সে নেমে এসেছে কিনা; সে পড়ে গেলেও আমি পরোয়া করি না; সংশ্লিষ্ট সবার জন্য এটা একটা ভাল মুক্তি হবে। কীভাবে স্বরাজ লাভ করতে হবে সে সম্পর্কে তাদেরকে বলার চেয়ে বরং তাদেরকে তাদের মতো থাকতে দিলেই তারা আমাদের প্রতি কৃতার্থ থাকবে। তারা তো পরোয়াই করে না। এ মুহূর্তে তারা লয়েলিস্ট সভার আয়োজনে নিমগ্ন। আমার শ্রদ্ধেয় মহাত্মাজী, আমি যা জানতে চাচ্ছি তা হচ্ছেÑÑ’ সে ভাবলো মহাত্মাজীকে কী বলতে চাইছিলো। সমস্যাটি আসলে কী ছিলো। সমস্যাটি তার অগোচরে চলে গেলো। হঠাৎ তার মনে হলো যে সে এত বেশি ক্লান্ত ও অখুশি। ক্ষুধার্ত ছিলো ও বাড়ির জন্য মন কাঁদছিলো। বরং ভারতীর সাথে তার কবীর সরণীতে ফিরে যেতে চাইলো, আর এসব ভুলে যেতে চাইলো। যে ধকলের মধ্য দিয়ে সে গেলো তাতে কলা ও সোডা-পানি কদাচিৎ পর্যাপ্ত ছিলো। লোকটি এসে দোকান খুললে সে যদি আরো চাইতে পারতো! জড়তা তাকে এমনভাবে ঘিরে ধরলো যে নড়াচড়া না করে তার সামনের সভার কার্যবিবরণী দেখলো। তার বিবেকে সবসময় বাধলো। কিছু একটা তাকে বললো: ‘তুমি এখানে এসেছো এই সভার বিরোধিতা করার জন্য, কিন্তু এ বিষয়ে তুমি কিছুই করছো না।’ সে মনে মনে শুধু এইটুকুই বললো, ‘আমার কিছুই করার নেই। নেতার কাছ থেকে কোনো নির্দেশনা না পাওয়া পর্যন্ত সবকিছুই বাদ রাখতে চাই। নির্দেশনা ছাড়া ছুটাছুটি করে কোনো লাভ নেই।’ নিরাবেগে সে একদল লোককে জীপে করে আসতে দেখলো। অ্যামপ্লিফায়ারসহ গ্রামোফোনে ছায়াছবির কিছু গান বাজলো যার মধ্যে লোকজন সময়টা চিহ্নিত করলো। আর তারপর কেউ একজন হারমোনিয়াম নিয়ে জোরে জোরে গাইতে গাইতে আসলো। হারমোনিয়ামের আওয়াজে শ্রীরাম কান বন্ধ করলো: ‘নিকুচি করি ও যন্ত্রের,’ মনে মনে বিড়বিড় করে বললো। এর কর্কশ শব্দে তার স্নায়ুগুলো বিকারগ্রস্ত হলো। ‘আশা করি মহাত্মা গান্ধী ভারতের সম্রাট হলে এ যন্ত্র তৈরি করা বা বাজানোকে তিনি শাস্তিযোগ্য অপরাধ হিসেবে গণ্য করবেন। এটাও তো ইংরেজদের উপহার, মনে হয়।’ মনে মনে বললো। এ সঙ্গীত শেষে কেউ একজন রামায়ণ থেকে সঙ্গীত ও ধারাবর্ণনা পরিবেশন করলো। লোকজন অনুষ্ঠানটি উপভোগ করলো। ঠিক এসবের মাঝে লোহার চেয়ারে বসে থাকা দুইজন কর্মকর্তা হঠাৎ উঠে কোনো রকমে তামিল ভাষায় বক্তৃতা দিলেন। তারা যুদ্ধের গুরুত্ব ব্যাখ্যা করলেন, কীভাবে ব্রিটেন জয়লাভ করছিলো, কীভাবে ভারতের সাহায্য করা কর্তব্য ছিলো, আর কীভাবে ভেতরের ও বাইরের শত্র“ থেকে ভারতের নিজেকে রক্ষা করা উচিৎ। সাধারণ পোশাকে পুলিশ ছিলো, প্রশস্থ বেল্ট ও খাকি জামায় তাদেরকে কম সাধারণ লাগলো; পশমী-বুশ কোটে মাথায় চকচকে চুলসহ সরকারি কর্মকর্তা ছিলো; কেউ একজন সমাবেশের সকল শিশুকে টিন থেকে চকলেট বিতরণ করছিলো। শ্রীরাম মনে মনে বললো, ‘আমি এখানে আছি এটা থামানোর জন্য, কিন্তুÑÑ কিন্তুÑÑ মহাত্মাকে আগে লিখে উপদেশ নেইÑÑÑ’ আশপাশে তাকালো। প্রতিশ্র“ত চিঠির কাগজের জন্য অপেক্ষা করার অজুহাত তার ছিলো। কিন্তু সে জনতার মধ্যে দোকানদারকে দেখে ফেললো। ‘ঐ, মিথ্যাবাদী!’ শ্রীরাম মন্তব্য করলো: ‘সে হয়তো ভান করছে যে সে শিশু, চকলেট চাচ্ছে আর সেটা তার দোকানে কাল কালো বাজারি দামে বিক্রি করবে।’ ** যেন তার অলিখিত চিঠির উত্তরে সে মহাত্মাজীর কাছ থেকে বার্তা পেলো। ভারতীর উদ্দেশ্যে বার্তাটি লেখা ছিলো: ‘তোমার কাজ হওয়া চাই অন্তর্বিশ্বাসের বিষয়। তুমি যা দেখছো বা বুঝছো তার উপর এটি নির্ভর করে না। প্রতিটি কাজে তোমার বিবেকই তোমার পথপ্রদর্শক হওয়া উচিৎ। এরপর তা পরামর্শ করো, তাহলে ভুল হবে না। যা দেখছো তা দিয়ে নিজেকে চালিত করো না। তোমাকে তোমার কর্তব্য করা উচিৎ কারণ তোমার ভেতরের কণ্ঠস্বর সেটা করতে তোমায় চালিত করে, এইটুকুই থাকলো। প্রতিটি কাজে ভগবান তোমাদের আশীর্বাদ করুন।’ বার্তাটির ফলে ভারতী তাকে দেখার একটা উপলক্ষ পেলো। শ্রীরামের একদিন কোনো কাজ ছিলো না; সৈনিকদের ছুটির দিন, যেমনটা সে ভাবলো। ধ্বংসপ্রাপ্ত মন্দিরের তোরণে বসে বসে সে সেদিন কিছুই করছিলো না, কুঁড়িয়ে পাওয়া পুরাতন একটা পত্রিকা পড়ছিলো। এতে অচল সব সংবাদ ছিলোÑÑ ম্যাজিনো রেখা ও এর মতো সংবাদ ছিলো। কিন্তু তার জন্য এই যথেষ্ঠ ছিলো। চিঠি বাহক বোল্ডারের নিচ দিয়ে অনেক আগে চলে গিয়েছিলো তার ফিরতি যাত্রায়, আর সমতল ভূমিতে ফিরে গিয়েছিলো । পশ্চিম দিগন্তে সূর্য স্থির হয়ে ছিলো। শ্রীরাম তার চারাগাছের কাণ্ড দিয়ে তৈরি মাদুরটি বের করে এনে বিছিয়ে তার উপর শুয়ে পড়লো, আর পত্রিকার শুধু সব বাসি খবর পড়ায় নিমগ্ন হলো না সব কৌতুক, টুকিটাকি খবর এবং নিচের কলামে ভরে যাওয়া সিন্ডিকেটেড কার্টুনেও নিমগ্ন হলো। মহাসড়কে সে পত্রিকাটি কুঁড়িয়ে নিয়েছিলো যখন সোলুর গ্রাম থেকে অভিযান শেষে ফিরছিলো। পত্রিকাটি মহাসড়কের ওপারে উড়ে গিয়ে একটা গাছের কাণ্ডে লেগেছিলো। গাছের কাণ্ড থেকে পাতাগুলো আলগা করে নিয়ে টর্চ জ্বালিয়ে দেখেছিলো যে সেটি অদেশিয় পত্রিকা ছিলো যা প্রতিক্রিয়াশীল মতবাদ ও গান্ধীজীর নিন্দা করার জন্য সুবিদিত ছিলো। কিন্তু তারপরও তাতে রোববারের পড়ার মতো মজাদার কিছু ছিলো। কিছুক্ষণের জন্য সে বিরক্ত বোধ করলো এই ভেবে যে কেউ এমন একটা সাম্রাজ্যবাদী পত্রিকা এ অঞ্চলে ছড়িয়ে রাখতে পারে, কিন্তু সে সাবধানে ভাঁজ করে সেটি তার ব্যাগে রেখেছিলো। যখন তার মনে হলো যে ঢালের পর ঢাল জুড়ে বিশাল সেগুন গাছগুলো ও বাঁশঝাড়গুলো এবং এস্টেটের গাছগুলো তার মনটাকে নষ্ট করে দেবে, তখন সে কিছু সময় চরম বিরক্তির শিকার হয়েছিলো। সেগুলো তার স্নায়ুকে দুর্বল করায় সে প্রতিবাদে জোরে চিৎকার করতে চাইছিলো। বিরক্তি কাটাতে একবার সে নিজে নিজে জোরে কথা বলতে চেষ্টা করেছিলো । নিজেকে প্রশ্ন করেছিলো, ‘এই, তুমি এখানে কী করছো?’ আর নিজেকে বলেছিলো, ‘দেশের জন্য লড়াই করছি।’ ‘এটা কী ধরণের লড়াই? তোমাকে তো ভবঘুরের মতো দেখাচ্ছে, ইউনিফর্ম নেই, অস্ত্র নেই, আর দৃশ্যত কোনো শত্র“ নেই, কী ধরণের লড়াই এটা? মস্করা করছো নাকি?’ আর সে জোরে জোরে হাসছিলো, ‘ওহ্ , ওহ্ , ওহ্ !’ পাহাড়গুলো তার কণ্ঠের প্রতিধ্বনি না করা পর্যন্ত সে তার কণ্ঠের উচু গ্রামে কথা বলছিলো, আর নিকটবর্তী গাছে বসে থাকা দু’একটা পাখি ভয়ে উড়ে গিয়েছিলো। এই উচ্ছ্বাসে তার মন অনেকটা হালকা হয়েছিলো। এখন সে আশা করলো পত্রিকার এ পাতাটি দিয়ে বিরক্তি কাটিয়ে তুলবে। গাছের ঐ সব মগডাল ও উপত্যকা অবিরামভাবে দেখার পরিবর্তে এখানে অন্তত পড়ার মতো কিছু ছিলো। এখানে থাকাটা তার ভাগ্যে ছিলো। এর বিরুদ্ধে সে যেতে পারলো না। মাদুরে গা সটান করে সে শুয়ে পড়লো। তার কোচের পিছন দিকটায় ঠেকনা দেওয়ার জন্য সে একটা পাথরের ব্লক গড়িয়ে দিয়েছিলো। এ ব্লকটিকে দু’দিন আগে ঘাস ও আগাছায় পড়ে থাকা অবস্থায় সে পেয়েছিলো, এবং কষ্ট করে সরিয়ে নিয়েছিলো। এতে তার এক ঘন্টা লেগেছিলো। পাথরটির উপরে ক্ষয়ে যাওয়া অক্ষর ও অলঙ্কার খোদাই করা ছিলো। সে জল্পনা-কল্পনা করতে লাগলো এগুলোর তাৎপর্য্য কী হতে পারে, এগুলো গোল গোল অক্ষর ছিলো যা পরিচিত দেখাচ্ছিলো, কিন্তু পড়া গেলো না; হয়তো ইতিহাসের বইয়ে পাওয়া কোনো রাজা বা সম্রাট কিংবা অত্যাচারী কেউ হাজার হাজার বছর আগে কোনো বার্তা খোদাই করেছিলো। ইতিহাসের বইয়ে তো বদমায়েশ চরিত্র দিয়ে ভরা, শ্রীরামের মতে। সে প্রায়ই ভাবতো পড়ে এবং দুইপাশে গোঁফওয়ালা গুণ্ডাদের বিষয়ে কাউকে প্রশ্ন করে কোন্ ভাল উদ্দেশ্য সাধিত হতে পারতো? পাথরের ব্লকটিতে গা এলিয়ে দিয়ে সে ভাবলো যে সে যদি তার স্বাভাবিক পরীক্ষাগুলো অন্তত পাস করতো, তাহলে এখনকার এই জীবনে জড়িয়ে পড়ার তার কোনো দরকার হতো না। কোনো এক অফিসে ভাল স্বভাবের এক কেরানী হিসেবে আসন করে নিতে পারতো যেমনটা তার বন্ধু, প্রসন্ন করেছিলো। এইতো গতকালই সে চ্যাম্পিয়ন স্ট্রীট ফুটবলার হয়েছিলো, কিন্তু সে ইতোমধ্যেই লাগামে বন্দী হয়েছে, দিনে কয়েক ঘন্টা কোষাগার টেবিলে দাসবৃত্তি করতে হয়। পুরানো সেই পাথরটায় আরামদায়কভাবে গা এলিয়ে দিয়ে সে একটা কৌতুক পড়লো যাতে ‘একটা ছেলে’ ও ‘একটা মেয়ে’র চার লাইনের একটা সংলাপ ছিলো: ‘কখন আমি টাই চাপ দিয়ে লাগিয়ে দেবে?’ এতে মেয়েটি চটপট উত্তর দিলো: ‘ওটা নামিয়ে আনার ঠিক এক ঘন্টা পর।’ শ্রীরাম এটি বারবার পড়লো, আর বিরক্তি বোধ করলো। এর মধ্যে কৌতুকটা কী ? এর মধ্যে হাসি কোথায়? সে ভাল করে খুঁটে খুঁটে এটা দেখলো, কিন্তু এর মধ্যে কোনো অর্থ উদ্ধার করতে পারলো না। এর সাথে ছিলো দেখতে অদ্ভূত এক দম্পতি, কোমরের দিকটা মোটা। শ্রীরাম ভাবলো: ‘কেউ বলতে পারে না ইংরেজরা কোন রস উপভোগ করবে!’ কাগজটা সে দূরে রাখলো, আর এর মুড়িটা বাতাসে খস খস করে উঠলো। এখন যেন সে তার প্রিয়ার গোঁড়ালির শব্দ শুনলো, আর সেখানে সে নিচেই ছিলো। ভারতী অর্ধেক মাইল দূর থেকে রাস্তায় আসছিলো। তাকে কখনোই এত বেশি স্বাগতম জানানো হয়নি। শ্রীরাম উঠে গিয়ে উম্মত্ত আনন্দের চিৎকারে তার কাছে ছুটে গেলো। সে দেখলো ভারতী যেন দেবদূতের মতো তার বিরক্তি দূর করতে এলো। ভারতীর হাতে যথারীতি একটা ব্যাগ ছিলো, আর সে এমন আশ্বাস ও সুখ নিয়ে সদর্পে হাঁটছিলো। মোড় নেওয়ার সময় শ্রীরাম যখন তার সাথে প্রথম কথা বলেছিলো তখন ভারতী অবাক হয়েছিলো। ‘হ্যালো!’ তার কণ্ঠের উচুগ্রামে সে চিৎকার করে বললো: ‘এই তো আমার দেবী এসেছে!’ ভারতী তার পদক্ষেপ ধীর করে বললো: ‘তোমার কী হয়েছে? কেউ আমাদের দেখলে কী ভাববে!’ ‘আমাদের দেখে ভাবার মতো কে আছে?’ উদ্ধতভাবে শ্রীরাম জিজ্ঞেস করলো। ‘বিশাল এক জনতা যেন চারিদিকে ছোটাছুটি করছিলো!’ তার নিঃসঙ্গ থাকার সমস্ত বিষ অনুভব করে সে এ অভিব্যক্তি দিলো। ভারতী শ্রীরামের কণ্ঠের এই তিক্ততা ধরে ফেললো, কিন্তু সেটা বরং উপেক্ষা করতেই অধিকতর পছন্দ করলো। ‘কী চাই তোমার? সবসময় তোমার চারপাশে বড় একটা মেলা?’ হাঁটতে হাঁটতে ভারতী হালকা মনে বললো। শ্রীরাম জিজ্ঞেস করলো, ‘কোথায় যাচ্ছো? ‘তোমার সাথে দেখা করতে।’ ‘এই তো আমি!’ ‘এখানে তোমার উপস্থিতি অফিসিয়ালভাবে আমি নেবো না, কিন্তু তুমি আমার কাজের বর্ণনা শুনতে চাইলে আমি তা বলে ফিরে যাবো। তোমার জন্য চমৎকার এক সংবাদ নিয়ে এসেছি।’ ‘কী সেটা?’ তাকে অনুসরণ করে শ্রীরাম উদ্বেগের সাথে চিৎকার করে বললো। ভারতী চলতে চলতে বললো, ‘তোমার নিজের জায়গায় এসে তা শোনো।’ শ্রীরাম তার নিজের জায়গায় ভারতীকে মাদুরটি আনুষ্ঠানিকভাবে দেখিয়ে তাকে আরাম করে ব্লকটিতে গা এলিয়ে দিতে বললো। ভারতী তার কথা শুনলো। পা সটান করে পাথরটিতে সে গা এলিয়ে দিলো, আর তার শরীর যখন শ্রীরামের মধ্যে বন্য আবেগ জাগাচ্ছিলো, তখন ছোট্ট ব্যাগ থেকে চিঠিটা বের করে সে শ্রীরামকে দিলো। ‘এই নাও বাপুর কাছ থেকে তোমার চিঠি। কেমন লাগছে?’ শ্রীরাম চিঠিটা পড়ে ভাবতে থাকলো। পেঁচা ডাকছিলো, আকাশ অন্ধকার করে এসেছিলো; ঝিঁ ঝিঁ পোকা অন্ধকার ঝোঁপের মধ্যে শব্দ করছিলো। শ্রীরাম তার পাশে মাদুরে বসলো। তার পরনের খদ্দের শাড়ির নিচে বাম স্তনটি নড়তে দেখতে পেলো। মনে হলো, যে অনুভূতি ভারতী শ্রীরামের মধ্যে জাগ্রত করছিলো তা সম্পর্কে সে অসজাগ ছিলো। ভারতী বললো, ‘এর মানে কি তুমি জানো? বাপু চান এখানে থেকে তুমি তোমার কাজ করে যাও। তিনি মনে করেন এখানে তোমার কাজটা খুবই ফল দিচ্ছে এবং তোমাকে সেটা চালিয়ে যেতে হবে।’ ‘তুমি কী করে জানো যে তিনি অন্য কিছু না বুঝিয়ে এটাই বুঝিয়েছেন?’ ‘আমি জানি কারণ তিনি যা লেখেন তা পড়ে আমি বুঝতে পারি।’ ‘তিনি যা লেখেন তা আমিও পড়তে পারি, ’ অনর্থক দম্ভে শ্রীরাম বললো। ‘তাকে কি তুমি কিছু লিখেছিলে?’ ভারতী জিজ্ঞেস করলো। জেরা করাটাকে শ্রীরামের ভাল লাগলো না। ‘হয়তো লিখেছি, হয়তো বা লিখিনি,’ কণ্ঠে উষ্মা নিয়ে সে বললো। ‘রাগ করছো কেন? পরের বার আমি বাপুকে লিখবো যে তুমি খুব রাগী মানুষ।’ জবাবে শ্রীরাম তার উপর নিজেকে আকস্মিকভাবে ফেলে দিয়ে অস্ফুটভাবে বললো, ‘তুমি শুধু তাকে লিখবে যে আমরা বিয়ে করেছি।’ কোনো পূর্বপরিকল্পনা ছাড়াই এটি হলো, আর এতে ভারতী প্রায় অভিভূত হলো। শ্রীরাম তাকে মুক্ত হওয়ার সুযোগ দিলো না। পাগল হয়ে সে তাকে লৌহকঠিন বন্ধনে আবদ্ধ করলো। তার অঙ্গ-প্রতঙ্গ সে দেখতে পেলো না। সময়টা ছিলো অন্ধকার। তার মুখের কাছে শ্রীরাম ভারতীর নিঃশ্বাস অনুভব করলো যখন ভারতী বললো, ‘না, এ হয় না, শ্রীরাম।’ শ্রীরাম বিড়বিড় করে বললো, ‘হ্যাঁ, এ হয় না। এখন তোমার আমার বিয়ে কেউ ঠেকাতে পারবে না। এভাবেই দেবতারা বিয়ে করে।’ তার বাহুতে ভারতীর বেণীর ভার ভালই লাগছিলো। তার গালদুটোতে চন্দন সাবানের গন্ধ ছিলো। তার গলায় সে চুমু খেলো। তার শরীরের চন্দনের গন্ধে শ্রীরাম আনন্দ উপভোগ করছিলো। ‘তুমি মিষ্টি গন্ধী,’ শ্রীরাম বললো। ‘আমি তোমার দাস হবো। তোমার জন্য আমায় যা যা করতে বলবে আমি তা-ই করবো। পৃথিবীর সব জিনিস তোমাকে কিনে এনে দেবো।’ নির্বোধের মতো সে আচরণ করলো। তার কবজায় ভারতী কিছুক্ষণ মোচড়ালো এবং একই সাথে শ্রীরামের আদরে সাড়া দিলো বলে মনে হলো। শ্রীরাম তার মাথা ভারতীর বুকে রেখে নীরব রইলো। তার মনে হলো যে এই মুহূর্তে কোনো কথা বলা অসম্মান হবে। পুরো অন্ধকারের রাত ছিলো। গাছগুলো খসখস করছিলো, ঝিঁ ঝিঁ পোকা ও রাতের পোকামাকড় অবিরাম ডাকছিলো। তারা ও জোছনা সম্পর্কে শ্রীরাম কিছু বলতে চাইলো, কিন্তু মনে হলো মুখে কথা আটকে গিয়েছিলো। এখন শুধু যে জিনিসটায় কাজ হতো বলে মনে হলো তা ছিলো শ্রীরামের কাছে তার উষ্ণ নিঃশ্বাস ফেলানো শরীর। শ্রীরাম বিড়বিড় করে বললো: ‘আমি সবসময় এটা জানতাম। তুমি আমার বউ।’ তার কবজা থেকে হালকা মুক্ত হয়ে ভারতী বললো, ‘এখনো নয়। বাপুর অনুমোদনের জন্য আমাকে অবশ্যই অপেক্ষা করতে হবে।’ ‘কী করে তা পাবে?’ ‘কাল তার কাছে লিখবো।’ ‘তিনি যদি সায় না দেন?’ ‘তাহলে অন্য কাউকে বিয়ে করবে।’ ‘তুমি কি আমাকে পছন্দ করো না? আমাকে বলোÑÑ আমাকে বলোÑÑ’ উত্তেজিত হয়ে শ্রীরাম বললো। ভারতী শ্রীরামের দেহকম্পন অনুভব করে বললো: ‘পছন্দ না করলে আমি এখানে আসতাম না বা তোমার সাথে দেখা করতাম না।’ ‘মহাত্মাজী কি জানতো না?’ ‘না, তাঁর মন এতোই নিখাদ যে অন্যায় কিছুর কথা তিনি ভাবতেই পারেন নাÑÑ’ ‘কী অন্যায়?’ ‘এইটা অন্যায়ÑÑআমাদেরÑÑআমাদের উচিৎ ছিলো নাÑÑআমারÑÑআমারÑÑ’ ভারতী ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদলো। ‘আমি জানি না বাপু আমার সম্পর্কে এখন কী ভাববে। যা ঘটেছে তা তাকে অবশ্যই ÑÑআমাকেÑÑলিখতে হবে। শ্রীরাম তাকে কখনোই এতো মেয়েসুলভ ও অবলা হিসেবে দেখেনি। সে ক্ষণকাল সন্তুষ্টি বোধ করলো যে সে তার দর্প চূর্ণ করেছে, তার বিক্ষিপ্ততা দমন করেছে। আক্রমণাত্মকভাবে সে বললো: ‘বাপু কিছুই বলবেন না। তিনি বুঝবেন। তিনি মানুষের অনুভূতি জানেন, কাজেই চিন্তা করো না। প্রেমে অন্যায় কিছু নেই। তুমি ও আমি বিয়ে করেছি।’ ‘কবে?’ ‘প্রথম যেদিন তোমাকে দেখেছি সেদিন।’ ‘ওটাই যথেষ্ট নয়। বাপুর অনুমোদন ছাড়া আমি বিয়ে করতে পারি না।’ ইতিবাচক ও গতিশীল হলো শ্রীরাম। শপথ করলো: ‘আমরা এক্ষুণি বিয়ে করবো।’ হাত ধরে তাকে টেনে নিয়ে ভেতরের ব্যক্তিগত কক্ষে গেলো। এটা সেটা করতে ব্যস্ত হয়ে সে এখানে সেখানে ছুটলো। বাতিটা জ্বালিয়ে নাক ও হাতভাঙ্গা মূর্তিটার সামনে রাখলো, কিন্তু চোখদুটো এখনো দীপ্তি ছড়াচ্ছিলো। দৌড়ে বাইরে গিয়ে কয়েকটা পাতা ও ফুল নিয়ে সে ফিরে এলো, আর পেডেস্টালের পাদদেশে রেখে দিলো। চরকা থেকে একটা সুতা নিয়ে সে বললো, ‘এর থেকে পবিত্র মঙ্গলসূত্র তুমি আর পাবে না, এই দেবতার থেকে পবিত্র যাজকও তুমি পাবে না।’ সুতাটা তার গলায় পরিয়ে দিতে গেলে ভারতী তার কাছ থেকে নিজেকে হালকা সরিয়ে নিলো। ভারতীর কণ্ঠে আকস্মিক দৃঢ়তা ভর করে বসলো যখন সে বললো: ‘এটা জেনে রেখো, শ্রীরাম। তোমাকে যদি বিশ্বাস না করতাম, তাহলে বারবার এখানে আমি আসতাম না।’ সে কেন এমন কথা বললো শ্রীরাম তা বুঝলো না। সে হতভম্ব হলো। এরকম করে সে কথা বলছিলো কেন? হয়তো হঠাৎ তার মনে হলো যে গোর্পদ অথবা অন্য কাউকে তার বিয়ে করা উচিৎ। হ্যাঁ, এখন তার মনে ঝলকে উঠলো যে তার ও গোপর্দের মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ দৃষ্টি বিনিময় হতো। কী ধরণের মানুষকে বিয়ে করবে, ইমারি কাগজের মতো রাফ! এক চোট ঈর্ষা কিছুক্ষণ তাকে ঝাঁকিয়ে দিয়ে গেলো, আর সে বললো, ‘এই দেবতার সামনে তুমি কি শপথ করবে যে তুমি শুধু আমাকেই বিয়ে করবে।’ ‘হ্যাঁ, যদি আদৌ বিয়ে করি, আর মনে রেখো, যদি বাপু এতে সায় দেন।’ ‘বাপু! বাপু!’ এটা তাকে হতাশায় ভরিয়ে দিলো। বিলাপ করে সে বললো: ‘তিনি এত বড় যে আমাদের তিনি পরোয়া করবেন না। আমাদের বিষয় নিয়ে তাকে জ্বালাতন করো না।’ ভারতী বললো, ‘আমি বিয়ে করবো না তিনি যদি সায় না দেন। আমি তা করতে পারি না।’ ‘অন্য কাউকে বিয়ে করতে বললে, ’ শেষ মুহূর্তে ‘গোর্পদ’-এর নামটা চেপে রেখে করুণভাবে সে জিজ্ঞেস করলো। ‘আমার জন্য ছেলে খোঁজার চেয়ে বাপুর আরো ভাল কিছু করার আছে,’ দ্ব্যর্থহীন ও স্পষ্টভাবে সে জানিয়ে দিলো। শ্রীরাম কিছুক্ষণ চোখ পিটপিট করলো। উত্তেজনায় তার গলা শুকিয়ে আসছিলো। আবার সে কিছু একটা জিজ্ঞেস করতে চাইলো। কিন্তু তার এই বিভ্রান্ত অবস্থায়ও সে সচেতন ছিলো যে সে বার বার একই কথা বলছিলো। করুণভাবে চোখের পাতা ফেললো। ভাঙ্গা বাহুর দেবতাটি তাকিয়ে রইলো। এমন নিস্ফল প্রেমের জন্য সে কখনো দর কষাকষি করেনি। এর শুরু তার অনুভূত চেতনা থেকে যে পরের মুহূর্তে সে দিব্যানন্দে নিক্ষিপ্ত হবে, কিন্তু এখানে সে অচল এক দেবতার সামনে দাঁড়িয়ে ছিলো আর দুর্বোধ্য কথা শুনছিলো। মেয়েটি হয়তো তাকে বোকা মনে করবে তাদের মধ্যে এতটা ফাঁকা জায়গা রাখার জন্য। আবার তার কাছে গিয়ে ঝড় বয়ে আনার চেষ্টা করে, যা সে কিছুক্ষণ আগে করেছিলো , তা পুষিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করলো। প্রথমবার আকস্মিক ভাবাবেগের সুযোগ ছিলো তার। কিন্তু এখন তাতে কাজ হলো না। তার প্রসারিত বাহুকে ভারতী এক ঝটকায় নামিযে দিলো: ‘না। আর আমাকে স্পর্শ করবে না।’ ভারতী এমন কর্তৃত্ব নিয়ে বললো যে শ্রীরাম নিজেকে বোকার মতো বোধ করলো। ‘তুমি না চাইলে আমি তা করতে চাইনি। আমি জানি তুমি আমাকে ঘৃণা করো, ’ শিশুর মতো করে শ্রীরাম বললো। ভারতী শুধু বললো, ‘আমি কেন তোমাকে ঘৃণা করবো?’ ‘কারণ তোমাকে জ্বালাচ্ছি।’ ‘কীভাবে?’ ভারতী জিজ্ঞেস করলো। ‘বলেÑÑ আমাকে বিয়ে করতে বলে। এ তো অন্যায়, হয়তো অন্যায়।’ ‘বাপু রাজী থাকলে অন্যায় হবে না।’ সে মেনে নিলো। ‘ঠিক আছে, ’ বললো। ‘তোমার যেমন খুশিÑÑ’ ‘আমরা বিয়ে করবো, ’ ভারতী বললো, ‘ঠিক যে মুহূর্তে বাপু মত দেবেন।’ সে অনেকটা বিবেচক হলো। শ্রীরামের মনে হলো তাকে আবার জিজ্ঞেস করার সময় হলো: ‘তুমি কিÑÑ আমাকে পছন্দ করো?’ ‘হ্যাঁ, যখন তুমি খারাপ আচরণ করছো না।’ ** হতোদ্যম ও উৎকণ্ঠার দিন শুরু হলো। বেশ কিছুদিন ভারতীর দেখা পেলো না সে। সে ভাবলো তাকে চিরদিনের জন্য সে হারিয়ে ফেলেছে। এতে সে এতই অবশ হলো যে কুটিরের সামনে বসে থেকে রাতে যা যা ঘটেছিলো সেসব মনে করা ছাড়া সারা দিন সে কিছুই করলো না। তার স্বাভাবিক বক্তৃতা দেওয়া, আন্দোলন, ও বিক্ষোভ প্রদর্শন Ñ সবকিছু সে বাদ দিলো; দেশের প্রতি কর্তব্যের কথা ভাবছিলো বলে মনে হলো না। খাওয়া-দাওয়া করে সারাদিন তার গুহায় সে রইলো, ‘একটা ছেলে’ ও ‘একটা মেয়ে’ সম্পর্কে কৌতুকটা সে ইতোমধ্যে দুইশো বার পড়েছিলো। ট্রেন আসতে যেতে সে দেখলো। ডাকপিয়নকে বোল্ডারে থেমে এস্টেটের দিকে চলে যেতে দেখলো। কোণার পাথরটায় আরাম করে বসে সে অবিরাম চিন্তা করতে থাকলো। মোটের উপর একদিন ভারতী উপস্থিত হলো। দুপূর বেলা এলো। যে সে সন্ধ্যা এড়িয়েছিলো সেটা গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে হলো । মোড়ে যখনই শ্রীরাম তাকে দেখতে পেলো, তখনই আনন্দের চিৎকারে জানতে চাইলো, ‘ নিরাপদ সময় বলে এখনই আসছো নাকি? কিন্তু সে নিজেকে সংযত করলো। রাস্তার মোড়টিতে তার সাথে দেখা করার জন্য সে দৌড় দিলো। জিজ্ঞেস করলো: ‘খবর কী?’ তাদের জায়গায় না যাওয়া পর্যন্ত ভারতী কথা বললো না। বসে পাথরটাতে হেলান দিয়ে নিজের ব্যাগ থেকে ভারতী একটা চিঠি বের করলো। ক্ষুধার্তের মতো শ্রীরাম সেটা ছিনিয়ে নিয়ে দ্রুত চোখ বুলালো: ‘আশীর্বাদপ্রাপ্ত, এখনই নয়...। সব কর্মীকে জিজ্ঞেস করবো তারা বেরিয়ে আসার জন্য আন্ডারগ্রাউন্ডে আছে কিনা। আমি চাই নিকটতম থানায় তুমি আত্মসমর্পণ করো। তোমার শিষ্যকেও সাথে নিয়ে যেও। ভগবান তোমাদের দু’জনের মঙ্গল করুক।’ শ্রীরাম অবাক হলো। তাৎপর্য্য বোঝার চেষ্টা করে সে বারবার চিঠিটা পড়লো। সে ব্যাখ্যা করতে চেষ্টা করলো। তিনি বলেছেন ,‘ “এখনই নয়,” এর মানে কী?’ ‘তিনি সেটাই বোঝাতে চেয়েছেন, অন্যকিছু নয়, ’ ভারতী উত্তর দিলো। ‘বাপুজী যা বলেন তা বোঝা কখনই কঠিন নয়।’ মেয়েটির দৃঢ়তা ও স্থৈর্যে শ্রীরাম হতবাক হলো। মনে হলো তার কোনো অনুভূতিই ছিলো না। এমন উদাসীনভাবে সে এ ব্যাপারে কথা বললো। তার স্থৈর্যে শ্রীরাম আতঙ্কিত হলো। মেয়েটি হয়তো স্বস্থি বোধ করছিলো যে বাপুজী তাদের পরিকল্পনা না করে দিয়েছে। এটা তাকে খুবই মানিয়েছিলোÑÑ গোপর্দ। আর অবশ্যই অসুস্থ কল্পনায় শ্রীরামের মনে হলো মহাত্মাজীও হয়তো গোপর্দের পক্ষেই ছিলো, তার সাথে গোপর্দের মতো ভয়ানক ও ধুলিশুষ্ক কর্মীর সাথে বিয়ে হোক তা-ই তিনি বেশি চাইবেন। কিন্তু ভারতী তার সাথে সরাসরি কথা বলছে না কেন?’ ‘তুমি সরাসরি কথা বলতে পারো না?’ হঠাৎ করে শ্রীরাম তাকে জিজ্ঞেস করলো। ‘কী বলতে চাচ্ছো?’ শ্রীরামের মুখ দিয়ে জবাব বের হলো না। জিজ্ঞেস করলোা: ‘বাপু কেন চান না আমাদের বিয়ে হোক?’ ‘তিনি তো সে কথা বলেন না।’ শ্রীরাম দীর্ঘশ্বাস ফেললো: ‘আমি ভেবেছিলাম তিনি আমাদের আশীর্বাদ পাঠাবেন, কিন্তু তিনি তো শুধু আমাদের কর্মসূচী বাতিল করেছেন।’ নিজের হতাশায় সে গোটা জগতের ক্ষত অনুভব করলো, বাপুকে বাদ দিয়েও নয়। হঠাৎ সে ভারতীকে জিজ্ঞেস করলো: ‘আমাদের যে বিয়ে হয়নি তাতে তোমার হতাশ লাগছে না?’ ‘ভাবার মতো আমার অন্য অনেক কিছু আছে,’ ভারতী বললো। ‘ওহ্ !’ শ্রীরাম গুরুত্বপূর্ণভাবে বললো। ‘সেগুলো কী হতে পারে?’ ‘জেলে যাবো...।’ পুরো ব্যাপারটার তাৎপর্য্য এখন তার মনে উম্মোচিত হলো। সে চিৎকার করে বললো, ‘ভারতী, তুমি তো তা করতে পারো না, তুমি কী বলতে চাচ্ছো?’ ভারতী জবাব দিলো, ‘তোমাকেও আসতে হবে...।’ চিঠিটা খুলে সে আবার চোখ বুলালো। ‘জেলে কী নিয়ে ব্যস্ত থাকবো বাপু সে ব্যাপারেও নির্দেশনা দিয়েছেন। “তোমার নতুন কোনো ভাষা শেখার এই সুযোগ। আশা করি কোনো সাহায্য ছাড়াই তুমি তুলসী দাসের রামায়ণ পড়তে পারবে; তুমি তো হিন্দি ভাল বলতে পারো, কিন্তু তোমার সাহিত্য চর্চাও একইভাবে ভাল হবে। তোমাকে সুযোগ-সুবিধা দেওয়ার জন্য জেল সুপারিন্টেডেন্টকে বলে দেখতে পারো যদি তুমি চরকা সাথে নেওয়ার মতো বি শ্রেণীতে পড়ো। আমি শুনতে চাই যে তুমি জেলে তোমার ভাগের সুতা তৈরি করবে। মুহূর্তের জন্যও কখনো ভেবো না যে তোমার সময় নষ্ট হচ্ছে। যেখানেই তুমি এক কপি রামায়ণ ও গীতা এবং চরকা নিয়ে যাবে, সেখানেই ব্যস্ততার মধ্যে তোমার সময় কাটবে। যাহোক, তোমার স্বাস্থ্যের দিকে নজর রেখো। খুবই হালকা ব্যায়াম দরকার হতে পারে, অনুমতি থাকলে চত্বরে হেঁটে সেটা করতে পারো...। আর বি শ্রেণীতে না থাকলে অন্যদের মতো সাধারণ শ্রেণীর বন্দী হিসেবে থাকতে চাইলে সেটা তোমাকে চেয়ে নিতে হবে। তোমাকে যা যা বললাম তা তোমার শিষ্যের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য।” ’ শ্রীরাম অনুনয় করে বললো, ‘বলো না, দয়া করে বাপুকে বলো না...’ ভারতী তার দিকে বিস্ময়ে তাকালো, ‘এতগুলো মাস এক সাথে থেকে কাজ করার পর এরকম করে তুমি কথা বলতে পারলে? বাপুজী আমাদের যা করতে বলেন তা ব্যতীত কী করে আমরা অন্য কিছু করতে পারি?’ শ্রীরামের দেওয়ার মতো কোনো অকাট্য জবাব ছিলো না। সে মাথা নিচু করে রাখলো। কিছুক্ষণ মনে হলো সে ভুলে গেছে যে সে মুক্তির লড়াইয়ের একজন সৈনিক ছিলো। ভারতী দৃঢ়প্রতিজ্ঞ হয়ে বললো, ‘এর মধ্যে আমাকে সেখানে থাকা উচিৎ ছিলো। থানায় হাজিরা দিতে যাচ্ছি...’ ‘তারা তোমাকে কতদিন জেলে আটকে রাখবে?’ শ্রীরাম করুণভাবে জিজ্ঞেস করলো। ‘আমি কী করে বলতে পারি?’ ভারতী জবাবে বললো। ‘তুমিও আসছো না?’ শ্রীরাম বললো, ‘এখন নয়। আরো ভাবতে চাই। কিন্তু আমি এক্ষুণি আসবো যদি তারা আমাকে একই কারাগারে রাখে আরো ভাল হয় যদি একই কক্ষে রাখে।’ ‘তা সম্ভব হবে না, সরকার আমাদের একসঙ্গে রাখবে না, ’ ভারতী বললো। শ্রীরাম এতে রেগে গেলো। মনে হলো সমস্ত মহাবিশ্বটা তার উদ্দেশ্য পূরণে বাদ সাধতে সংগঠিত হয়েছিলো, এমনকি যে সরকার মহাত্মার সাথে বিভিন্ন বিষয়ে ভিন্ন মত পোষণ করতো সেও মনে হলো যেখানে তার এবং ভারতীর বিষয় জড়িত সেখানে একমত। সবচেয়ে খারাপ দিক ছিলো যে ভারতী নিজেই মনে হলো এ আয়োজনে আনন্দ লাভ করছিলো। শ্রীরাম এ ভেবে উম্মত্ত হয়ে বললো, ‘তোমার জন্য আমার ভালবাসাকে সবাই কেন বিরোধিতা করে?’ ভারতী তার প্রতি দয়াপরবশ হয়ে মৃদুভাবে বললো, ‘বোকা কোথাকার। তোমার মাথা পুরো নষ্ট হয়ে গেছে।’ ‘চিৎকার করে তোমার কোনো লাভ নেই, ’ ভারতী বললো। ‘আমাদের ঝগড়া করা যাবে না। কিছুক্ষণের মধ্যে আমি চলে যাবো... চারটা বাজার আগে আমাকে হাজিরা দিতে হবে। কেন্দ্রীয় বা অন্য কোনো জেলে আমাকে পাঠাতে চাইলে তাদেরকে সন্ধ্যার ট্রেন ধরার সময় অবশ্যই দিতে হবে।’ ‘তোমাকে ছাড়া আমি কী করবো?’ শ্রীরাম বিলাপ করলো। ‘সে জন্য বাপু তোমাকেও হাজিরা দিতে বলেছে।’ সে মাথা নাড়ালো। ‘বাইরে আমার অনেক কিছু করার আছে... নিজের মতো করে সত্যাগ্রহ চালিয়ে যেতে বাপু সবাইকে স্বাধীনতা দিয়েছেন। তিনি কিন্তু আমাকে বোঝাননি,’ শোকের সাথে শ্রীরাম বললো। জবাবে ভারতী চিঠিটা লুফে নিয়ে শ্রীরামের নাকের নিচে খুলে ধরলো। ‘ “তোমার শিষ্যের ক্ষেত্রেও তা প্রযোজ্য,” তিনি বলেন।’ ‘কিন্তু তার মানে তো আমি নই। এর মানে যে কেউ হতে পারে,’ শ্রীরাম বললো। ‘আমি ভাবতাম তিনি সবসময় বুঝতেন “শিষ্য” দ্বারা তিনি কাকে বুঝাতেন,’ ভারতী ভয়ানকভাবে বললো। ‘কোনটা বেছে নেবে সেটা সবসময় তোমার ব্যাপার। তোমার যা সর্বোত্তম মনে হয় তা-ই করতে পারো। যা সঠিক বলে আমার মনে হচ্ছে আমি তা-ই করতে যাচ্ছি।’ ‘তুমি কী করে জানো যে করার মতো এটাই সঠিক কাজ?’ ‘ও প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার দরকার নেই আমার,’ বিরক্ত হয়ে ভারতী বললো। ‘আমি যদি জানতাম যে বাপুজীর কথা তুমি এত হালকাভাবে নেবে, তবেÑÑÑ’ তার কথার সুরে শ্রীরাম খুবই আহত হলো। ‘ওহ্ , ভারতী, আমাকে সম্পূর্ণরূপে ভুল বুঝে আমার জ্বালা আর বাড়িয়ো না। আমি মহাত্মাকে শ্রদ্ধা করি, তুমি তো জানো আমি শ্রদ্ধা করি। আমাকে সন্দেহ করছো কেন? তিনি যা যা বলছেন তার সবই কি আমি মেনে চলিনি?... নইলে আমি এখানে পড়ে থাকতাম না। আমার বাসার আরাম ফেলে আসতাম না। আমি যা চাই তা হলো এটা নিয়ে ভাবার জন্য আরো কিছু সময়। আমি...’ সে তার সেরা দৃষ্টান্তটি উৎসাহভরে উপস্থাপন করলো। ‘আমি শুধু ঠাকুরমার কথা ভাবছি। অবশেষে জেলে যাওয়ার আগে তাকে দেখতে চাই। সে জন্য তোমাকে জিজ্ঞেস করেছিলাম কতদিন আমরা জেলে থাকবো। তিনি খুবই বৃদ্ধা, তুমি তো জানো। তাকে একবার দেখে আমি আত্মসমর্পণ করবো। তাকে দেখার সুযোগ অবশ্যই বের করতে হবে।’ এ ধারণায় মেয়েটি নরম হলো বলে মনে হলো। পাথরের গায়ে হেলান দিয়ে সে আবার ভাবলো। ঠাকুরমার জন্য তার কোমল অনুভূতির সে প্রশংসা করলো মনে হলো। ‘ঠিক আছে, শ্রীরাম। আমি দুঃখিত যে তোমাকে ভুল বুঝেছিলাম।’ শ্রীরাম তার বাহু স্পর্শ করতে চাইলো, কিন্তু তা করতে তার ভয় হলো। ভারতী নিশ্চয়ই বলবে, ‘নিরাপদ দূরত্বে থাকো, যে পর্যন্ত না,’ আর সেটা শ্রীরামের আবার বিরক্তির কারণ হবে এবং তার ফলে বাজে বকবে। ভারতী উঠে দাঁড়ালো। শ্রীরাম জিজ্ঞেস করলো, ‘তোমাকে কি অবশ্যই যেতে হবে?’ ‘হ্যাঁ, আমার দেরি হয়ে গেছে।’ শ্রীরাম বিব্রত হয়ে তার পিছু পিছু গেলো, ‘জেল শেষে আমাদের আবার যখন দেখা হবে, আর যেখানেই আমাদের দেখা হবে... তুমি আমাকে ভুলে যাবে না তো?’ ‘তোমাকে ভুলবো না, ’ ভারতী হালকাভাবে নিঃশ্বাস ধরে বললো। যখন ভারতী উঠে দাঁড়ালো, তখন শ্রীরাম তাকে তার জীবনের যে কোনো সময়ের চেয়ে বেশি ভালবাসলো, কিন্তু যে কোনো সময়ের চেয়ে সে ভয়ও বেশি পেলো। সে শুধু বললো, ‘ভারতী তুমি রাগ না করলে, তোমাকে একটা কথা জিজ্ঞেস করতে চাই। ‘কী?’ থেমে তার দিকে তাকিয়ে ভারতী বললো। শ্রীরাম ভারতীর উপরের ঠোঁটে ঘামের বিন্দু খেয়াল করলো এবং তার আঙ্গুল দিয়ে সেগুলো মুছে দিতে চাইলো। এ ভেবে নিঃসঙ্গতা তাকে পেয়ে বসলো যে রাস্তার মোড়টিতে সে আর তাকে আসতে দেখতে পাবে না। সে বাহুতে তাকে আবদ্ধ করে তার কাছ থেকে ঝটিকা বিদায় নিতে চাইলো, কিন্তু এই জিজ্ঞেস করে তাকে তুষ্ট হতে হলো, ‘এ সব শেষ হয়ে গেলে তুমি কি আমায় বিয়ে করবে, কথা দাও, যদি বাপুজী অনুমতি দেন?’ হ্যাঁ, কথা দিচ্ছি...’ তার সাথে কথা বলা বা তাকে অনুসরণ করার আগেই ভারতী এই বলে দ্রুত চলে গেলো। শ্রীরাম যেখানে ছিলো সেখানেই দাঁড়িয়ে রইলো, আর জমে থাকা অশ্র“ মুছে ফেলার জন্য ভারতীকে তার হাত চোখ পর্যন্ত তুলতে দেখলো । ৩ একদিন জগদীশ নামে একজন এমনিতে এসে নিজেকে জাতীয় কর্মী হিসেব পরিচয় দিলো। সে বললো পেশায় ফটোগ্রাফার হিসেবে মালগুদিতে কাজ করে, আর দাবি করলো ভারতে ব্রিটেনকে অচল করে দেয়ার মতো সূত্র তার জানা আছে। মালগুদিতে তার স্টুডিওর ভেতরের দিকটা দেশের জন্য তাৎক্ষণিক স্বাধীনতা অর্জনে ইচ্ছুক লোকদের জন্য সভা স্থল হিসেবে কাজ করে। জগদীশ এলো কারণ শহরের বাইরে তার গোপন জায়গার প্রয়োজন ছিলো, আর তাই সে একটা জায়গা খুঁজছিলো যেখানে সে ছোট একটা রেডিও স্থাপন করতে পারে যার মাধ্যমে সাংকেতিক বার্তাও প্রেরণ করা যেতে পারে। কষ্ট করে পাহাড় বেয়ে বেয়ে সে এলো যখন শ্রীরাম তার পাথরটায় গা এলিয়ে ছিলো। লোকটি ফিতাওয়ালা ব্যাগ নিয়ে এসেছিলো, আর খাদি পোশাক পরেছিলো। শ্রীরাম পুরানো পত্রিকাটি পড়েই যাচ্ছিলো। তার জীবন থেকে ভারতীর প্রস্থানে একটা শূন্যতা সৃষ্টি হয়েছিলো, যা পূরণ করা তার কাছে কঠিন মনে হলো। এখন কী করবে সে ব্যাপারে সে কতকটা বিভ্রান্ত বোধ করলো। ফিতাওয়ালা ব্যাগটি নামিয়ে জগদীশ শ্রীরামের পাশে বসলো এবং জিজ্ঞেস করলো, ‘তুমি শ্রীরাম?’ ‘জ্বী।’ ‘আমি জগদীশ। ভারতীকেও আমি চিনতাম। আমরা কম-বেশি একই কাজ করছি।’ শ্রীরামের আলস্যভাবকে নাড়া দেওয়ার জন্য এই যথেষ্ট ছিলো। সে উঠে বসে লোকটিকে অনেক উষ্ণতা দিয়ে ব্যাপকভাবে স্বাগতম জানালো এবং জিজ্ঞেস করলো, ‘কোথায়, কোথায় সে?’ ‘ডিটেন্টশনে আছে... আমরা জানি না কোথায়, কিন্তু আমাদের একজন ছেলের সাথে তার দেখা হয়েছিলো পুলিশের কাছে আত্মসমর্পণের ঠিক আগে আগে।’ শ্রীরাম জিজ্ঞেস করলো, ‘সে লোকটি কোথায়?’ ‘সেও পুলিশের কাছে আত্মসমর্পণ করেছে; তার আগে সে এসে আমার সাথে দেখা করেছিলো।’ শ্রীরাম একই চিন্তা-চেতনার একজনকে পেয়ে খুশি হলো, আর তৎক্ষণাৎ সে তার কানে নিজের অনুভূতি বর্ষণ করলো। ‘ভারতীকে আমি বোকা না হতে বলেছিলাম...’ ‘ও কথা বলো না। এ বিষয়ে আমরা সবাই বিচার-বিবেচনা করে নিজের মতো করে কাজ করি। যারা মহাত্মাজীর আদেশ মান্য করতে পারে না, তারাই নিজেরা যা সর্বোত্তম মনে করে তা করার মতো স্বাধীন।’ ‘তুমি একেবারে ঠিক কথা বলছো,’ সঠিক কাজে মস্ত ভুল করেছে বোধ করে শ্রীরাম চিৎকার করে বললো। লোকটি বললো, ‘এটা এমন একটা যুদ্ধ যেখানে আমরা জড়িয়ে গেছি, আমরা অস্বাভাবিক সময়ের মধ্য দিয়ে যাচ্ছি, আর আমাদের যা সবচেয়ে ভাল মনে হয় তা-ই করি।’ লোকটি ফিতাওয়ালা ব্যাগটি খুলতে লাগলো। সব সময় ক্ষুধার্ত এবং একঘেয়ে খাবার খেতে খেতে বরং ক্লান্ত শ্রীরাম শিশুর মতো আশা করলো যে এ ব্যাগ থেকে চমৎকার কিছু বের হয়ে আসবে। আশা করলো চকলেট বা ফলমূল কিংবা বিস্কুট হবে। ওহ্ , কতদিন হয়ে গেলো বেশিরভাগ রোববারে তার ঠাকুরমার বানানো সাদা সাদা সেইসব স্পর্শকাতর ভাপা পিঠা সে খায় না। সে প্রায়ই জিজ্ঞেস করতো রোববারে কেন, অন্য দিন নয় কেন। এখন ব্যাগ থেকে জগদীশ চারপাশে মোড়ক খোলা ছোট একটি বাক্স এবং ছোট একটা রেডিও বের করলো। ‘এটি তোমাকে রাখতে হবে,’ লোকটি বললো। ‘এতে বার্তা পাঠানোও যায় আবার গ্রহন করাও যায়। এতদিন আমার স্টুডিওতে এটা ছিলো... কিন্তু আজকাল পুলিশ খুবই সতর্ক হয়েছে।’ সে দেবতার মূর্তির পেছনে এটি স্থাপন করে কিছু বাঁশপাতা দিয়ে ছদ্মবেশে রাখলো। তারপর থেকে দেবতা চোখবিহীন খালি গর্ত দিয়ে জগদীশকে অনেক দেখলো। সে ছিলো ছোট-খাট মানুষ। কাঁধ ঘিরে বাদামী আবরণে মোড়া ছিলো। উস্কোখুস্কো কোঁকড়ানো ছোট ছোট চুলের ছাঁট ছিলো যা তার কান পেরিয়ে কয়েক ইঞ্চি বের হয়ে মাটির সমান্তরালে ছড়িয়ে পড়েছিলো। মাঝখানে সিঁথি করে অনেকটা তেল মাখা ছিলো যাতে করে তার খুলির উপরের দিকটা চকচক করে, আর শ্রীরাম প্রায়শই দেখতো যে তার মাথা থেকে মধ্যাহ্ন সূর্য হাজার রঙে চকচক করে উঠছে। রঙ ছিলো কৃষ্ণবর্ণ ও বিশাল নাকটি ছিলো মোটা এবং গোলাকার, কিন্তু তার মধ্যে একটা আগুন ছিলো যা তার সামনের যে কোনো কিছুকে খেয়ে ফেলতে পারতো, আর শ্রীরাম তার বিরোধিতা করতে ভয় করলো। অবিশ্বাস্য মনে হলো যে ভারতীর মতো মার্জিত তন্বী এক সৈনিক ভাল্লুকের মতো দেখতে এই ব্যক্তিত্বের সাথে কখনো কথা বলেছে। তার মধ্যে এক ধরণের আকস্মিক ঈর্ষা ভর করলো । এমন কি হতে পারতো যে ভারতী তাকে বিয়ে করার চিন্তা কখনো করেছিলো? ভগবানই জানতেন চোখের আড়ালে লোকটি নিজের সাথে কী করেছিলো। ছবি তুলে কী করে তার চলতো? মাঝে মাঝে কয়েক দিন সে আসতো না, আর এলে ব্যাখ্যা করতো, ‘বিয়ের ঋতু, আপনি তো জানেন। আরো বোকারা বিয়ে করছে, আর তারা এসে ছবি তোলে। আমি তো সব কাজে ছাড় দিতে পারি না।’ অথবা ব্যাখ্যা করতো, ‘জুঁই ফুলের ঋতু, আর এ ঋতুতে ফটোগ্রাফারদের রমরমা অবস্থা। বেণীতে জুঁই ফুল বেঁধে কত মেয়ে আসেÑÑ ফটোগ্রাফারের জন্য সমস্যাটা হচ্ছে একই সাথে মেয়ের মুখের ও পিছনের জুঁই ফুলে ঢাকা মাথার ছবি তোলা। আর এটাই তাদের দাবি। খারাপ বিষয় হলো তাদের জুঁই ফুল পাছে বালিশে ঘষা লেগে নষ্ট হয়ে যায় সেজন্য তারা সারা রাত বসে থাকে। মিনিটে তাদের দুজন করে আসে। যখন তারা স্টুডিওর অন্ধকারে থাকে, তখন তাদের রাজনীতি খুঁজে বের করে তাদেরকে আমাদের সাইক্লোস্টাইলের সার্কুলার ও সর্বশেষ সংবাদ প্রদান করি। এ কাজে স্টুডিওটা এক ধরণের সাহায্য করে। কেউ সেখানে গেলে অন্য যে কোনো জায়গার চেয়ে বেশি সাড়া দেয়। লোকজন প্রফুল্ল মনে ফটোগ্রাফারের কথায় একমত হয়ে ও সাড়া দিয়ে এবং নাপিতের মতো ফটোগ্রাফার যা বলেন তা মনোযোগ দিয়ে শুনে সাধারণত স্টুডিওতে আসে। তাদের এ বোধ আছে যে অস্পষ্টভাবে ফটোগ্রাফারকে মেনে দ্রুত তার কথা শুনতে হয় তাদের। আর জাতীয় কাজে আমি সেটা কাজে লাগাই। সেজন্য স্টুডিওটা চালু রেখেছি, যদিও মালের সঠিক সরবরাহ ছাড়া কাজটা খুবই কঠিন। দেশ স্বাধীন হলে আমার যদি ওসবের সাথে সম্পর্ক থাকে, তবে দেখবে এখনকার যারা কালোবাজারী স্পুল সেইসব ভিক্ষুকদের কী করি!’ তাদের কথা ভাবতে ভাবতে সে দাঁত কিড়মিড় করলো। মন্দিরটিকে শীঘ্রই সে দূর্গে রূপান্তরিত করলো। ব্যাখ্যা করলো: ‘জানো এ জায়গাটার সুবিধা কী? কয়েকজন পুরাতত্ত্ববিদ ব্যতীত কেউ এর অস্তিত্ব জানে না। আর বাইরে থেকে এটা দেখাও যায় না। নানা দিক থেকে আমি এটি দেখেছি। নিচের রাস্তাটি থেকেও দেখা যায় না। ভাবছি কেন কেউ একজন এখানে কোনো মন্দির নির্মাণ করলো না। আমার বিশ্বাস হাজার বছর আগে য়ড়যন্ত্রকারীদের জায়গা হিসেবে এটি অবশ্যই ব্যবহৃত হয়ে থাকবে।’ সে হাসলো। শ্রীরামও হাসলো। তাকে পছন্দ করতে শুরু করলো। ‘ভেবো না যে এ জায়গাটা সবসময়ই নিরাপদ,’ লোকটি বললো। ‘আজ হোক কাল হোক তারা এটা খুঁজে পাবে।’ ‘একটা ভূগর্ভস্ত কক্ষ আছে, ’ শ্রীরাম শুরু করলো। ‘হ্যাঁ, আমি জানি সেখানে বুড়ো বুড়ো কোবরা থাকে, যদি পুলিশের চেয়ে সেগুলো অধিকতর পছন্দ করো। কিন্তু কোনো না কোনোভাবে কোবরা ও পুলিশের মাঝামাঝি আমাদের ব্যবস্থা করতে হবে।’ ‘হ্যাঁ, হ্যাঁ, এত কিছু করার নিয়েÑÑ’ জগদীশ তাকে ছোট একটা কুঠার দিয়ে বাঁশপাতা, বড় বড় কঞ্চি কাটতে এবং সেগুলো টেনে উপরে সরাতে বললো। শ্রীরাম কাজ শুরু করে চালাতে থাকলো যতক্ষণ পর্যন্ত না তার হাতের তালুর চামড়ায় টনটন ব্যথা শুরু করলো ও চামড়া উঠে গেলো। জগদীশের নির্দেশনায় পুরাতন মন্দিরের প্রতিরক্ষা বূহ্যে চড়ে শ্রীরাম বাঁশপাতাগুলো যত্র-তত্র রাখলো। পরম উদ্যমে সে চিৎকার করছিলো। সারা দিন রোদে দাঁড়িয়ে তার মুখ ঘামে মেহগুনির মতো চিকচিক করছিলো। সে বললো, ‘এতে হলে সমস্ত পর্বতটাকে আমি ঢেকে দিতে পারি,’ শ্রীরাম ক্লান্ত ও রাগান্বিত বোধ করলো। ভাবলো, ‘এ লোকটিকে আমি আদেশ করতে দিচ্ছি কেন, সে যখন দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে নির্দেশ দেওয়া ছাড়া কিছুই করছে না? জেলে যাওয়াই মনে হয় বেশি সন্তোষজনক হতো। কিন্তু এমন ভাবনায় আলোচনা করতে জগদীশ তাকে কখনোই কোনো সুযোগ দেয়নি। সে বললো, ‘মনে রাখবে, আমরা যুদ্ধে লিপ্ত হয়েছি। মহাত্মাজী তাঁর নিজের মতো করে, আর আমরা আমাদের মতো করে। আমাদের সবার লক্ষ এক।’ ‘কিন্তু আমি ভাবতাম আমরা সবাই মহাত্মার আদেশ অনুযায়ী কাজ করছি।’ ‘করছি, আমরা তো করছি, ’ সে অস্পষ্টভাবে বললো। ‘আমিও নিবেদিত একজন অনুসারী ছিলাম। এখনো আছি, কিন্তু তিনি আমাদেরকে আর পথ নির্দেশ করছেন না। আমাদের কী করার আছে? যথাসাধ্য কাজ চালিয়ে যাওয়ার জন্য তিনি আমাদের সবাইকে অনুমতি দেন।’ ‘তবে কঠোর অহিংসভাবে,’ শ্রীরাম বললো। ‘অবশ্যই, এ ছদ্মবেশ সহিংসতা নয়। এতে কেউ আঘাত পায় না। এটা করা হয় শুধু এজন্য যে যাতে করে হস্ত-ক্ষেপ ছাড়াই আমাদের পরিকল্পনামাফিক কাজ করতে আমরা নিজেদের মতো থাকতে পারি। আমি এও চাইনা যে ঐ ডাকপিয়ন এই জায়গাটা খুব বেশি দেখুক। হাজার হলেও সে তো সাম্রাজ্যবাদী সরকারের একজন সদস্য।’ শ্রীরামের পরবর্তী কাজটি ছিলো আরো জটিল। সে দেখতে পেলো যে সে জগদীশের একজন অন্ধ দাস হয়েছে। তার উৎসাহব্যঞ্জক একটি কথায় শ্রীরামের গহীন আত্মা পর্যন্ত সন্তুষ্ট হয়। তার অবস্থান নিয়ে সে গর্ব বোধ করলো। ভাবলো অন্যান্য সহযোগীরা তার কাছ থেকে হয়তো কদাচিৎ কোনো ভাল কথা শুনেছে। দেবতার পেছনে রেডিওটা নিয়ে ও কোলে লেখার প্যাড এবং আঙ্গুলের মাঝে পেনসিল নিয়ে সারাদিন বসে বসে সে রেঙ্গুন, সিঙ্গাপুর ও জার্মানি থেকে আসা খবর ও বার্তা টুকে নিলো। এসব খবরে ছিলো ইউরোপ ও দূরপ্রাচ্যে সংঘটিত যুদ্ধের ঘন্টায় ঘন্টায় সর্বশেষ সংবাদ। গভীর রাত অবধি শ্রীরাম কাজ করলো। তিন দিন অন্তর অন্তর তার পেনসিল ফুরিয়ে যেতো। সারা জীবনে সে কখনো এত বেশি খাটেনি। এর একমাত্র পুরস্কার ছিলো জগদীশের ‘খুব ভাল! চমৎকার কাজ। আমাদের আরো সৈন্য ভারতের জাতীয় সেনাবাহিনীতে যোগ দিয়েছে, তারা শীঘ্রই ভারতের অভ্যন্তরে অভিযান চালাবে।’ বাতিটার পাশে বসে মনোযোগ সহকারে প্রতিবেদন পড়তে পড়তে আলোর দিকে দলে দলে ছুটে আসা ড্যাঁশ মাছি ও গুবরে পোকা তাড়ালো। বার্তাগুলোর উপর জগদীশ কয়েকটা দাগ দিয়ে সাইক্লোস্টাইলে মালগুদিতে তার স্টুডিও থেকে প্রেরণ করলো। রেডিওতে ভেসে এলো: ‘টোকিও থেকে প্রচারিত হচ্ছে। এখানে সুভাষ চন্দ্র বসু আছেন, আপনাদের নেতা যিনি মাইকে বিশেষ উপলক্ষে আপনাদের ভাষণ দেবেন।’ কয়েক সেকেন্ড পরে বার্তাটিতে বলা হলো, ‘আমি সুভাষ চন্দ্র বসু বলছি।’ শ্রীরাম সম্মানের সাথে উঠে বসলো। ‘কী সৌভাগ্য তাঁর কণ্ঠ শুনছি!’ এ শব্দে শ্রীরাম এ মানুষটির প্রতি শ্রদ্ধা অনুভব করলো যিনি নিজের দেশ, আরাম-আয়েশ, নিরাপত্তা বিসর্জন দিয়ে এ দেশ থেসে সে দেশ ছুটে বেড়াচ্ছেন এবং মাতৃভূমিকে স্বাধীন করার উপায় খুঁজছেন। কী দক্ষতার সাথেই না তিনি পুলিশ প্রহরা সত্ত্বেও সাধুবেশে কলকাতায় নিজের বাসা ছেড়েছিলেন! শ্রীরামের মনে হলো সে বীরের কণ্ঠ শোনার মতো অদ্ভূত ভাগ্যবান। সুভাষ চন্দ্র বসুর কণ্ঠ থেকে ভেসে এলো, ‘ভারতীয় সেনাবাহিনীর লোকেরা, দেশপ্রেমিক হন। আমাদের প্রিয় মাতৃভূমিকে মুক্ত করতে সাহায্য করুন। ভারতীয় সেনাবাহিনীতে যোগদান করা আমাদের অনেক বন্ধুই এখানে আছেন যারা আপনাদের সীমানায় আক্রমণের জন্য প্রস্তুত। আমরা প্রস্তুত। শীঘ্রই আমরা ওপারে যাবো এবং তখন আপনারা আমাদের পক্ষে যোগদান করতে পারেন। সে নাগাদ আপনাদের বন্দুক আমাদের দিকে তাক করবেন না, কিন্তু আমাদের শত্র“র হৃদপিণ্ড বরাবর করবেন।’ আর তারপর ন্যাশনাল সার্ভিসের দশ দফা কর্মসূচী প্রচারিত হলো যে ভারতীয় সেনাবাহিনীর লোকদের উদ্যোগ নেওয়া উচিৎ। শ্রীরাম গলাভাঙ্গা গতিতে লিখে ফেললো। তার মনে হলো সুভাষ চন্দ্র বসুর আদেশদানকারী উপস্থিতি যেন তার কনুইয়ে এসে নির্দেশ দিচ্ছে। শ্রদ্ধাপূর্ণ নীরবতায় সে প্যাডের কয়েকটা কাগজ লিখে ভরিয়ে ফেললো। বাতিটা পুড়ে পুড়ে যখন লাল হলো, তখন সে অতি শ্রদ্ধাপূর্ণ ভয়ে রেডিওর দিকে তাকালো। বাইরে ঝিঁ ঝিঁ পোকা ডাকছিলো, ট্রেন কোথায় যেন ঝিক ঝিক করে যাচ্ছিলো, আর বাঁশঝাড় খসখস করে উঠছিলো। রেডিওটা বেজেই চললো। এর লাল চোখে দীপ্তি ছড়ালো, আর পেডেস্টালে দেবতার গোঁড়ালিতে লাল রশ্মি নিক্ষেপ করলো। শ্রীরাম সময়টা ঠিক বুঝতে পারলো না। তার জীবনে এত লেখা সে কখনো লেখেনি। সম্প্রচারটা যে ইংরেজিতে হয়েছিলো তাতে তার ভাল একটা পরীক্ষা হলো, কারণ তার কোনো বানানই খুব বেশি ভাল ছিলো না। সুভাষ চন্দ্র বসু বলছিলেন: ‘আর এখন খুবই গুরুত্বপূর্ণ একটা বার্তার জন্য উঠে দাঁড়ান। মনোযোগী হোন।’ ভুলের কোনো সম্ভাবনা ব্যতিরেকে যে কোনো ভাবেই হোক শ্রীরাম বার্তাটি ধরতে চাইলো, কিন্তু ঠিক সেই মুহূর্তে রেডিও থেকে পাল্টা একটা শব্দ আসতে শুরু করলো। মহাবার্তাটার সাথে তাল মিলিয়ে একটা মৌমাছি যেন ভনভন করতে লাগলো। শ্রীরাম দুর্দশাগ্রস্ত বোধ করলো। আর কয়েক সেকেন্ড শব্দটা অব্যাহতভাবে চলতে থাকলে, বার্তাটি শেষ হয়ে যাবে। কান খাঁড়া করলো, কিন্তু ঐ শব্দটা তীব্রতর হচ্ছিলো। দাঁত কিড়মিড় করলো সে। বাম হাত দিয়ে রেডিওর নব ঘুরালো। শুধু মনে হলো যেন এতে রেডিওটাকে আরো জ্বালাতন করা হচ্ছিলো। কাগজ থেকে চোখ তুলে সে রেডিওর দিকে দৃষ্টি নিক্ষেপ করলো। কাচের বাইরে হালকা আলোয় আলোকিত ডায়াল বক্সে সে খুব ছোট একটা তেলাপোকা দেখতে পেলো। দেখলো এর বিবর্ণ শরীর রেডিও থেকে আসা শব্দের আঘাতে কাঁপছিলো। কাঁচের ডায়ালে এর সাদা শরীরটা পিষ্ট দেখে শ্রীরাম বিতৃষ্ণা বোধ করলো। সে দেখতে পেলো, কিন্তু নাগাল পেলো না। তার অস্বস্তি লাগলো ও রাগ হলো। চিৎকার করে বললো, ‘অভিশপ্ত জীব, তোর কত বড় সাহস যে তুই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ এই বার্তাটায় এসে হস্তক্ষেপ করিস! দূর হ।’ আঙ্গুল দিয়ে কাচে মৃদু টোকা দিলো। খুবই রাগ হলো। ‘তোর বিতৃষ্ণ ভনভন শব্দ টুকে পেনসিলটা ক্ষয়ে ফেলার জন্য কি আমি এখানে আছি!’ তার টোকায় এত রাগ ছিলো যে তাতে পোকাটি আক্রান্ত হোক আর না হোক সে আলোটা দূরে সরিয়ে নিলো, আর এতে সব শব্দ যন্ত্রটি থেকে থেমে গেলো। রেডিওটা বাজলো না। প্যাড ও পেনসিলটি একপাশে রেখে শ্রীরাম রেডিওটাতে ঝাঁকি দিলো, কিন্তু কিছুই হলো না। নবটি ঘুরিয়ে হাতের মুষ্টিতে নাড়া দিলো আর অভিশাপ দিয়ে চিৎকার করলো, কিন্তু কিছুই হলো না। করুণভাবে জিজ্ঞেস করলো, ‘আর পাঁচ মিনিট অপেক্ষা করতে পারলি না!’ এমনটা কেন হলো যখন বার্তাটার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশ প্রচারিত হচ্ছিলো? জগদীশ তার সম্পর্কে এখন কী বলবে? শ্রীরাম রেডিওটার দিকে তাকিয়ে তার চরম অসহায়ত্ব উপলব্ধি করলো। সে দেখতো যুবকেরা যেকোন যন্ত্রকে টুকরো টুকরো করে আবার সেগুলোকে একত্রে লাগাতে পারতো। সে তো একটা স্ক্রুও ঘোরানোর যোগ্য নয়। নিজের সীমাবদ্ধতাই তার কাছে প্রচুর শক্তি নিয়ে ফিরে আসলো, আর বললো, ‘আমি বোকা, আমার ঠাকুরমা বোকা করে মানুষ করেছে। বিস্ময়ের ব্যাপার যে ভারতীর মতো মেয়েও আমাকে পরোয়া করে!’ এই আত্ম-ভৎর্সনা পুরোপুরি সমর্থিত হলো যখন রাত দুইটায় জগদীশ এসে হাজির হলো। রেডিওটা বিকল হয়ে যাওয়ায় শ্রীরাম কী করবে তা-ই কিছুক্ষণ ভাবলো। এরপর বাতিটা নিভিয়ে দিয়ে লাথি দিয়ে মাদুরটা খুলে তার উপর শুয়ে পড়লো। জগদীশ এসে বাতি খোঁজার জন্য ম্যাচের কাঠি জ্বালালে শ্রীরাম জেগে উঠে উত্তেজিতভাবে চিৎকার করলো, ‘কে আপনি?’ কাঠির আলোয় আলোকিত কৃষ্ণ লোকটির ঘুমকাতর কল্পছায়া ভীতিকর ছিলো। ‘চুপ, আমি, উঠে পড়ো।’ চোখ ঘষতে ঘষতে শ্রীরাম উঠে বসলো। বাতিটা জ্বালানো হলো। পুরোপুরি জাগানোর জন্য জগদীশ তাকে হালকা ঝাঁকুনি দিলো; পাশে বসে জিজ্ঞেস করলো, ‘আজকে বিশেষ কী আছে?’ বিজয়োল্লাসে শ্রীরাম তার প্যাডটি জগদীশের কাছে তুলে ধরলো। জগদীশ উত্তেজিতভাবে চিৎকার করে তা ছিনিয়ে নিলো, ‘আহ্ , সুভাস বাবুর বার্তা! তুমি কতই সৌভাগ্যবান যে তুমি তাঁর কথা শুনতে পেয়েছো। ভাল ছেলে! ভাল ছেলে! দেশ মুক্ত ও স্বাধীন হলে তুমি মস্ত বড় হবে।’ সে এর উপর চোখ বুলিয়ে বিড়বিড় করে বললো, ‘এসব মানুষ পৃথিবীর দেবতা; যাদের কর্ম অবশ্যই পরবর্তী প্রজন্মের কাছে পুনরাবৃত্ত হবে। সুভাষ বাবুর জীবন, ত্যাগ, দেশপ্রেম, সাহসিকতা নিয়ে একটা লাবনি(বর্দিক গান) বানিয়ে এ দেশের স্কুলে স্কুলে গাওয়া বাধ্যতামূলক করে দেবো।’ সে জোরে জোরে গানের সুরে পড়তেই থাকলো, ‘ “দেশবাসী, ভারতীয় সেনাবাহিনীর বীর”ÑÑ’ , মাঝখানে তার নিজের প্রশংসাসূচক মন্তব্য ছুঁড়ে দিলো যেমন- ‘বহুত আচ্ছা!’ ‘খাঁসা কথা ’, ‘মহামানব বলছেন!’ ‘শুনুন আর শিখুন, ও ভাইসকল,’ ইত্যাদি। যতক্ষণ না সে এখানে এলো, ‘ “এখন মনোযোগ দিন। প্রথমত আপনাদের যারা ”ÑÑ’ হাতের কাগজটা উল্টিয়ে জিজ্ঞেস করলো, ‘বাকিটা কোথায়?’ ‘বাকিটা নেই, বার্তাটা এখানেই থেমে গিয়েছিলো। কেউ একজন সম্প্রচারে বিঘœ ঘটাচ্ছিলো।’ ‘তার মানে কী? চলো তো দেখি।’ রেডিওটা যেখানে ছিলো সেখানে ছুটে গিয়ে সে নবটি ঘুরালো। চালু হওয়ার কোনো চিহ্ন নেই। নাড়া দিয়ে চিৎকার করে বললো, ‘এই আশীর্বাদের রেডিওটার কী হয়েছে?’ ‘আমি কী করে বলবো? আমি কি রেডিওর ইঞ্জিনিয়ার?’ ‘এ ব্যাপারে আমার সাথে তর্ক করবে না। এতে আমরা কোথাও যেতে পারবো না। সুভাষ বাবু নিশ্চয়ই খুবই গুরুত্বপূর্ণ কিছু বলে থাকবেন, আর তুমি রেডিওটাকে শ্বাসরুদ্ধ করে বন্ধ করে ফেলেছো।’ ‘না। আপনি ভুল করছেন। নিজেই শ্বাসরুদ্ধ হয়ে বন্ধ হয়ে গেছে। ওখানটায় একটা তেলাপোকা দেখেছিলাম, সম্ভবত সেটি এ কাজ করে থাকবে।’ জগদীশ তার মুষ্টি বদ্ধ করে নীরব থাকলো। শ্রীরামের ভয় হলো সে তাকে আঘাত করবে। যদি করতো, লড়াই না করে ছেড়ে দিতো না। সে এক কোণায় তাকালো যেখানে কোবরা ও বিচ্ছুর জন্য বাঁশের লাঠি রেখেছিলো। কিছুক্ষণ ভাবলো এখনই ছুটে গিয়ে সেটা নিয়ে আসবে কিনা। লোকটি কি তাকে প্রয়োজনীয় সময়টা দেবে? অনেক্ষণ ভয়ানক নীরবতার পর লোকটি বললো, ‘আচ্ছা, চলো এ নিয়ে আর মাথা ঘামাবো না। সৈনিক হিসেবে নিশ্চিত অতীত, মনে রেখো, যা নিশ্চিত অতীত তা নিয়ে আমাদের অবশ্যই চিন্তা করা যাবে না।’ সে বললো, ‘ঐ পেনসিলটা দাও তো।’ শ্রীরাম পেনসিলটা তাকে হাতে হাতে দিলো। জগদীশ বাতিটা ঠিক করে যতœসহকারে বার্তাটি পড়লো, আর এক মিনিট চিন্তা করে বাকি কাগজটা চটপট করে লিখে ফেললো। ‘অবশ্যই আপনাদেরকে, অবশ্যই আপনাদেরকে এবং অবশ্যই আপনাদেরকে।’ অনুপ্রেরণার সাথে সে লিখলো। বার্তাটির লেখা শেষ করতে তার প্রায় এক ঘন্টা লেগে গেলো। এর উপর চোখ বুলিয়ে সন্তোষজনকভাবে মাথা নাড়ালো। শ্রীরামকে প্যাডটা দিয়ে আদেশ দিলো, ‘এখন পড়ো, যুবক, ঠিক এভাবেই তিনি চালিয়ে যেতেন যদি তেলাপোকাটা ওখানে দাঁড়িয়ে সেন্সর না করতো।’ এ বিজয়ের পর আকস্মিক এক দুঃখ তাকে আক্রমণ করলো। তাকে রেডিওর কথা মনে করে দেয়া হলো। ‘শেষ ব্যাটারি জোড়াÑ আপনি সুভাষ বাবুর সাথে ফিরতি কথা বলতে পারতেন যদি শুধু সাবধানে থাকতেন। এটা তো দ্বিমুখী রেডিও...। মনে হয় এটা আমার সাথে ফেরত নিয়ে গিয়ে ঠিক করাই ভাল হবে। সৈনিক হিসেবে আমি নষ্ট হয়ে যাওয়া দুধের জন্য কাঁদবো না।’ ‘এটা কি নষ্ট দুধ?’ শ্রীরাম ভয়ে ভয়ে জিজ্ঞেস করলো। ‘অবশ্যই তাই,’ জগদীশ হলফ করে বললো, ‘দুধ যখন নষ্ট হয়ে যায়, তখন তা পানিতে পরিণত হয়ে শক্ত হয়, জানোই তো। পড়ে যাওয়া দুধের জন্য কেঁদে কোনো লাভ নেই, ’ সে পুনরাবৃত্তি করলো। ** পরের দিন বিকেলে ট্রেনের হুইসেল বেজে ওঠার একটু পরে জগদীশ তার শার্টের নিচে লুকিয়ে এক বান্ডিল কাগজ নিয়ে হাজির হলো। এতগুলো কাগজ বহন করার উদ্দেশ্যে সে বড় একটা পকেটওয়ালা শার্ট ভেতরে ও এর উপরে আলখাল্লা ধরণের একটা শার্ট পরেছিলো, আর তার পাশে লুকানো এত সব কাগজে তাকে এত বড় দেখালো যে শ্রীরাম কখনো কখনো ভাবলো অতিরিক্ত কাগজ গুঁজে দেয়ার জন্য তার ব্যক্তিত্বের ছাপ ফেলানো মুগ্ধতা নাও থাকতে পারে। জগদীশ পরনের কাপড় হালকা করে এক বান্ডিল কাগজ বের করলো, আর আবারও শ্রীরাম যথারীতি শিশুর মতো তার কাছ থেকে কিছু চমৎকার খাদ্য প্রত্যাশা করলো। ‘চলে আসো, বসো,’ জগদীশ বললো। জগদীশ প্রথমে উপরে নিচে তাকিয়ে আশ্বস্ত হলো যে কেউ দেখছে না। নাটকীয়ভাবে সে বিশাল দরজাটি বন্ধ করতে চেষ্টা করলো যা শক্তিশালী কবজায় ক্যাঁচ করে শব্দ করলো, কিন্তু অর্ধ ইঞ্চি সামনে সরানো গেলো। শ্রীরাম টু শব্দটি না করে শুধু দেখলো। এ সব প্রস্তুতির পর সে শ্রীরামকে মাদুরের উপর তার পাসে টেনে বসালো। তার হাতে রাখা সাইক্লোস্টাইলের বার্তার একটা কাগজে চাপ দিয়ে বললো, ‘পড়ো।’ শ্রীরাম জোরে জোরে পড়লো, ‘ “ভারতীয় সেনাবাহিনীর লোকেরা ইত্যাদি, ইত্যাদি,” ’ যে সব সে আগের দিন পর্যবেক্ষণ করেছে, কিন্তু আরো কয়েকটা প্যারাগ্রাফ ধরে এটি চললো। ‘ “প্রথমত, আমাদের শত্র“ সরকারকে সহযোগিতা করবেন না। আপনাদের অস্ত্র ছাড়–ন, প্রয়োজন হলে জীবন বিসর্জন দিন। ভারতের জাতীয় সেনাবাহিনী যেদিন দিল্লীতে যেখানে আমাদের লোকেরা এখন বন্দী হয়ে আছে সেখানে অভিযান চালিয়ে লালকেল্লায় ভারতের পতাকা উড়াবে, আপনারা সেদিনের বীর হবেন।” ’ দেশের মুক্তির জন্য সেনাবাহিনীর কী করা উচিৎ সে ব্যাপারে যথার্থ নির্দেশনা এতে আরো ছিলো। শ্রীরাম লোকটির জন্য এক ধরণের গভীর শ্রদ্ধা অনুভব করলো। ‘কীভাবে তুমি বাকি বার্তাটা যোগাড় করলে?’ নিস্পাপভাবে সে জিজ্ঞেস করলো। ‘কীভাবে করেছি তা নিয়ে ভেবো না,’ জগদীশ উত্তর দিলো, ‘ইচ্ছা থাকলে উপায় হয়। এটা থাকলে সব হয়,’ কপাল ছুঁয়ে গর্বের সাথে সে বললো। ‘আমি অনায়াসেই অনুমান করতে পারতাম বাকি বার্তাটা কী হতো। এ তো কম-বেশি চিন্তা পড়ার বিষয়, ’ গর্বভরে ঘোষণা করলো সে। ‘এ মুহূর্তে আমাদের সেনাবাহিনীর জন্য চরম গুরুত্বপূর্ণ বার্তা এটি। আমাদের জন্য খুবই অপরিহার্য। আর তোমার সম্মানে তুমিই প্রথম পেলে, যদিও (কিছু মনে করো না, যা অতীত তা নিয়ে আর না ভাবি) পূর্ণ বার্তাটা তুমি পেতে না; কোনো কিছুই বাদ যায়নি, আর তাই এ নিয়ে ভেবো না। তাছাড়া বার্তাটা যাদের উদ্দেশ্যে তাদের কাছে পৌঁছে গেছে। এটা ভেবে তোমার সম্মানিত বোধ করা উচিৎ।’ শ্রীরাম কিছুটা হতভম্ব হলো। জিজ্ঞেস করলো, ‘আমার কী করা উচিৎ?’ ‘আমার কথা মনোযোগ দিয়ে শোনো । এর পঞ্চাশটা কপি আমি তোমাকে দেবো। তুমি বেলালির সৈন্য শিবিরে সেগুলো নিয়ে যাবে। বিশ্বে কী ঘটছে না ঘটছে সে ব্যাপারে সেখানকার বেচারাদের কোনো ধারণাই নেই। কারণ ইংরেজদের যুদ্ধ বিভাগের প্রচারিত গাঁজাখুড়ি গল্প ছাড়া সত্য কথা শোনার অনুমতি তাদের নেই। আমাদের ছেলেদের অবশ্যই সত্য জানতে হবে। তাদের অবশ্যই জানতে হবে যে সুভাষ বাবু কোথায় আছেন, ভারতের জাতীয় সেনাবাহিনী কোথায় অবস্থান নিয়েছে, আর এখন কী করণীয়। যেখানেই হোক না কেন সত্য প্রচার করা আমাদের দায়িত্ব। মহাত্মাজী আমাদের কি তা-ই বলেননি?’ ‘হ্যাঁ, হ্যাঁ,’ শ্রীরাম একমত হয়ে বললো। তার কাছে এ যুক্তিুর আবেদন ছিলো। ‘বাকি কপিগুলো দিয়ে তুমি কী করবে? আমাকে আরো কিছু নিয়ে যেতে দিচ্ছো না কেন?’ ‘না, শুধু পঞ্চাশটাই দিতে পারি। সব মিলিয়ে দেড়শো কপি করেছি। মনে রেখো, আজকাল কাগজের ঘাটতি দেখা দিয়েছে। লক্ষ্মী শিবিরে পঞ্চাশটা পাঠাবো, আর এক জায়গায় তৃতীয় ব্যক্তির কাছে পঞ্চাশট আমি নিজেই নিয়ে যাবো। আজ রাতেই গিয়ে তোমাকে দেয়া কাজটা শেষ করবে।’ ‘রাজী,’ শ্রীরাম বললো। বিদায়ের আগে জগদীশ বললো, ‘সব মিলিয়ে আমরা তিনজনই হয়তো এ কাজে ধরা খাবো। তবে চিন্তা করো না। আমাদের জীবন খুব গুরুত্বপূর্ণ নয়। আমাদের কাজই বেশি গুরুত্বপূর্ণ।’ ‘বাঁচি কিংবা মরি তাতে আমার কিছু যায় আসে না,’ ভারতীকে নিয়ে হতাশার কথা স্মরণ করে শ্রীরাম বললো। সব সময় অগম্য এই বালিকার সাথে কারো অস্তিত্ব টেনে এনে কী লাভ? জাতীয় এই যুদ্ধ হয়তো কখনো শেষ হবে না, আর শেষ হলেও, সে আরো কোনো কর্মকাণ্ডে জড়িত হয়ে পড়বে। সারা জীবন সে অন্য কিছুর খোঁজে ব্যস্ত ছিলো...। এ ভাবনায় শ্রীরাম এত শ্রান্ত হলো যে সবটুকু আন্তরিকতা দিয়ে তাৎক্ষণিক মৃত্যুর ঘোষণা দিলো। আরো বললো, ‘ফিরে আসতে ব্যর্থ হলে ভারতীকে নিয়ে আমি যা ভাবি তা তাকে বলবে?’ ‘তাকে নিয়ে কী ভাবো?’ মজা করে জগদীশ জিজ্ঞেস করলো। ‘ভাবি যে সে যদি আমাকে বিয়ে করতো, তবে আমি হয়তো মরতাম না বা সেরকম কিছু করতাম না।’ ‘আচ্ছা, তাকে বলবো। আমি গুলি খেলে তুমি আমার স্টুডিওর দায়িত্বভার নিতে পারো। চাইলেই এটা তোমার।’ শ্রীরাম এতই বিচলিত হলো যে সে কথা বলতে পারলো না। ‘তোমার অনেক দয়া,’ বিড়বিড় করে সে বললো। ‘তুমি কত ভাল!’ জগদীশ তার জমকালো স্কার্ফের মাথাটা মোচড়ালো, ‘কিন্তু আমার ভয় হচ্ছে রাসায়নিক পদার্থগুলো যেমন আছে তেমন অবস্থা নিয়ে এটা চালানো তোমার জন্য কঠিন হবে। যা হোক, ভাগ্য তোমার প্রতি সুপ্রসন্ন হোক।’ ** প্যাম্ফলেটগুলো সুবিধামতো আকারে লেখা হলো যাতে করে সহজেই বহন করা যায়, লুকিয়ে রাখা যায়। শ্রীরাম গামছার লম্বা একটা বহরের দুই মাথা একখানে বেঁধে সেখানে পাম্ফলেটগুলো পরিপাটি করে রেখে ছোট একটা বান্ডিল বানালো। এরপর বান্ডিলটি কোমরে বেঁধে নিয়ে এর উপর তার খাদি পোশাকটা পরে নিলো এবং এরও উপরে তার জিব্বাটা পরলো। প্যাম্ফলেটগুলো তার পেটে অস্বস্তিদায়ক চাপ ফেললো, কিন্তু সে তা সহ্য করলো। সন্ধ্যায় পাহাড়ের নিচে চলে গেলো। জগদীশ এ ব্যাপারে তাকে যথার্থ নির্দেশনা দিয়েছিলো। রাস্তায় হেঁটে হেঁটে শ্রীরাম একটা গাছের তলায় বাসের জন্য অপেক্ষা করলো। গাছটার নিচে দু’একজন গ্রামবাসীও অপেক্ষা করছিলো। অন্ধকার ছিলো তখন, আর দিগন্তের ওপারে মালগুদি শহরের দীপ্তি ছিলো। জাতিচ্যূতের মতো শ্রীরাম দীর্ঘশ্বাস ফেললো। ‘জীবনের মুখোমুখি হতে যখন যাত্রা করলাম, তখন কী হতভাগ্য সময়ই না করলাম! ঠাকুরমা!’ তাকে মনে মনে ডাকলো, ‘আমি ফিরে যেতে চাই, কিন্তু পারছি না, চিন্তা করো না। সব ঝামেলার অবশ্যই অবসান হবে। মহাত্মাজীকে যদি তারা ছেড়ে দিতো! তিনি যতদিন জেলে থাকবেন, ততদিন এই পৈশাচিক সরকারের সাথে আমরা লড়াই করবো। কত বড় স্পর্ধা তাঁর উপর হাত তোলে? তারা এটা না করলে ভারতী বাইরে থাকতো আর খুশি হতো এবং মহাত্মাজী তার বিয়েতে মত দিতেন।’ ‘এই যে? কী বলছেন, স্যার? গ্রামবাসীদের একজন তাকে কৌতুহলভরে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করলো। শ্রীরাম সতর্ক হয়ে জিজ্ঞেস করলো, ‘ওখানে কে?’ আরো কাছে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করলো, ‘আপনি কী জন্য অপেক্ষা করছেন?’ ‘বাসটা আজকে দেরি করছে,’ আলাপের সূত্র ধরে তারা বললো, আর শ্রীরাম তাতে একমত হলো, ‘অনেক আগেই তো এখানে আসার কথা ছিলো, তাই না?’ ‘লড়াই কেমন চলছে, স্যার?’ তাদের একজন জিজ্ঞেস করলো। যাকে তথ্য জানতো বলে মনে হতো তাদের যে কাউকে যে কোনো গ্রামবাসীই এ ধরণের প্রশ্ন জিজ্ঞেস করতো। শ্রীরাম হঠাৎ খুবই সতর্ক হলো। জিজ্ঞেস করলো, ‘কেন?’ অন্যজন বললো, ‘কারণ লড়াই তাড়াতাড়ি শেষ হলে, আমরা সবাই ঝামেলা থেকে রেহাই পাবো।’ ‘আমি জানি না,’ শ্রীরাম ধীরে ধীরে টেনে টেনে বললো। যার সাথে কথা হচ্ছিলো অন্ধকারে তার চেহারাটা সে ভালভাবে বুঝতে পারেনি। পুলিশের গুপ্তচর কিংবা কন্সটেবল নিজেও হতে পারেন। ‘লড়াইটা কেমন চলছে, স্যার?’ লোকটি গোঁ ধরে বললো। ‘আচ্ছা, পত্রিকায় তো এটা সেটা বলছে, আর আমি সেটুকুই জানি।’ শ্রীরাম জবাব দিলো। ‘কিন্তু কে যেন বলছে এর সবটাই মিথ্যা! আমার ভাই অনেক লোককে চেনে, আর সে বলেছিলো যে ইংরেজরা সর্বত্র পরাভূত হচ্ছে। আরো বলেছিলো যে জার্মানরা এরই মধ্যে মাদ্রাজে এসে গেছে। তারা যদি আসে, তবে মহাত্মাজীকে কি কারাগার থেকে ছাড়িয়ে আনবে?’ শ্রীরাম প্রশ্নটি অন্যদিকে নিতে চাইলো আর বললো, ‘মহাত্মা গান্ধীকে দেখেছেন?’ ‘জ্বী, স্যার, তিনি আমাদের গ্রাম দিয়ে যেতেন,’ লোকটি শুরু করলো, আর বাসের হেডলাইটদুটো অনেক দূর থেকে দৃশ্যমান হলো। লোকটি তার বোঁচকা তুলে নিয়ে রাস্তার মাঝখানে দৌড়ে গিয়ে চিৎকার করে উঠলো, ‘আমরা যদি না থামাই, তাহলে বাস থামবে না।’ এ সময়ে বাস এসে রাস্তার ঠিক মাঝখানে বেপরোয়াভাবে দাঁড়ালো । ‘আপনি তো চাপা পড়বেন!’ শ্রীরাম চিৎকার করে বললো। চালক আচমকা ব্রেক কষে রাগতস্বরে বললো, ‘কী করছেন? নিজেকে মেরে ফেলতে চান নাকি? মরার যখন এতই সাধ তখন সেনাবাহিনীতে যোগ দিয়ে মরেন?’ এত কিছু বললে পর বাস থেকে হাসি ভেসে এলো। গ্রামের লোকটি চিৎকার করে বললো, ‘আমি যেতে চাইÑÑ’ ‘দূর হয়ে যান আর ওখানে দাঁড়িয়ে কথা বলবেন না। এ গাড়িতে পিঁপড়ারও কোনো জায়গা নেই।’ ‘ওনাকে ভেতরে আসতে দিন,’ কন্ডাক্টর জোরে বললো। কারণ তার কাছে এর অর্থ ছিলো অতিরিক্ত কামাই। দিনের শেষে এমন যাত্রীকে গোনার মধ্যে রাখা হতো না। ‘মেঝেতেই বসবো,’ গ্রামের লোকটি কাকুতি করে বললো। ‘পাঁচ আনা,’ কন্ডাক্টর জোরে বললো। ‘তিন আনা,’ যাত্রীটি চিৎকার করে বললো। ‘গত সপ্তাহে আমার কাছ’ থেকে তো তিন আনা নিয়েছিলেন।’ ‘গত সপ্তাহ আর এ সপ্তাহ এক কথা নয়,’ কন্ডাক্টর চেঁচিয়ে বললো। শ্রীরাম এখন পর্যন্ত এ বিষয়ে নাক না গলিয়ে শুধু দেখে যাচ্ছিলো। হঠাৎ সে এগিয়ে এলো, ‘গত সপ্তাহে তিন আনা নিয়ে থাকলে তার কাছ থেকে তা-ই নেন।’ ‘জ্বী, স্যার,’ শ্রীরামের ব্যবহারে শ্রদ্ধা ও ভয়ে কন্ডাক্টর বললো। ‘আর আমাকে নামিয়ে দেবেন ইয়াতেÑÑ। কত?’ ‘তিন আনা, স্যার।’ ‘ভেতরে কোনো জায়গা না থাকলে আমি ফুটবোর্ডে গিয়ে দাঁড়াবো,’ শ্রীরাম বললো। কন্ডাক্টর খুঁতখুঁতে হয়ে বললো, ‘আপনি ভেতরে আসতে পারেন, স্যার। আমি জায়গা করে দেবো।’ সব যাত্রী বাস থেকে ঘাড় প্রসারিত করলো; ইঞ্জিনটা সাপের মতো হিস হিস করছিলো। ‘না, আমি ফুটবোর্ডে দাঁড়িয়ে থাকবো,’ বাস যাত্রা শুরু করলে শ্রীরাম এই বলে হ্যান্ডরেইলটা আঁকড়ে ধরলো। ‘সে হয়তো ভাবছে কর্তব্যের বাইরে বাস পরিদর্শক হিসেবে আমি এসেছি,’ শ্রীরাম শীতল হ্যান্ডরেইলটা আঁকড়ে ধরে ভাবলো। সে সময় রাতের মেদুর হাওয়া তার মুখে এসে ঝাপটা দিলো। বাসে কেউ নাক ডাকছিলো, কেউ যুদ্ধ ও এর সামগ্রিক অগ্রগতি ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ করছিলো, আবার কেউ ঈশ্বর ও অদৃষ্ট নিয়ে কথা বলছিলো, একটা শিশু কাঁদছিলো, একটা মহিলা হাই তুলছিলো, আর চালক এবং কন্ডাক্টর ব্যক্তিগত কৌতুক বিনিময় করে হো হো করে হাসছিলো। ‘নিজেদের অসৎ উপায়ে অর্জিত টাকার কথা ভেবে তারা হয়তো মজা করছে,’ শ্রীরাম ভাবলো। অত্যধিক ভারে বাসটি ঘড়ঘড় করে আওয়াজ করলো। তার আশ্কংা হলো যে বাসের নিচটা আলাদা হয়ে পড়ে যেতে পারে। দুর্ভাগ্যজনকভাবে সে বাস পরিদর্শক ছিলো না। তা সত্ত্বেও কর্তৃত্বের স্বরে সে জিজ্ঞেস করলো, ‘কন্ডাক্টর সাহেব, আপনাদের লোড নেয়ার সীমা কতো?’ কন্ডাক্টর ভদ্রভাবে জবাব দিলো, ‘স্যার, সরকার নিয়মটা বাতিল করেছে। বাসে যতজন ধরে ততজনকে আমরা নিতে পারি। এখন তো যুদ্ধের সময়, স্যার, নইলে কত বেচারা প্রধান সড়কে আটকা পড়তো।’ যাত্রীরা সম্মতিসূচক অনেক গুঞ্জন তুললো। ‘এসব বিমান হামলা ও ঝামেলার আর কী বিপদ, তার চেয়ে রাস্তায় আটকা পড়াটাই সবচেয়ে বেশি বিপদ।’ কেউ একজন সাহস করে বললো। ঘুমন্ত গ্রামগুলো পেরিয়ে বাসটি হেলে দুলে চললো। যুদ্ধের নিয়ম মাফিক আলোগুলো আবছা রাখা হয়েছিলো, আর হেডলাইটদুটো শুধু সামনে এক চিলতে ক্ষীণ আলো ফেলেছিলো। কেউ একজন গুনগুন করে গান গাচ্ছিলো; মানুষের এসব শব্দ শ্রীরামের ভাল লাগলো, যা একা জীবন-যাপন করতে করতে দুর্বল হয়ে গিয়েছিলো। মানুষের কণ্ঠসঙ্গীত সে উপভোগ করলো। বাসটির গতি কমলে শ্রীরাম একলাফে সংগ্রাম নামক এক গ্রামে নেমে পড়লো। রাত তখন এগারোটা বাজে। গোটা গ্রাম ঘুমিয়েছিলো। বাসটি দৃষ্টির আড়ালে না যাওয়া পর্যন্ত সে রাস্তায় অপেক্ষা করলো। এরপর তার মালামাল ঠিকমতো আছে কিনা তা দেখতে তার বোঁচকাটির উপর হাত বুলালো। ভেতরের পকেটে তার-কাটা যন্ত্র আর কোমরে মূল্যবান বার্তাটি ছিলো। সে যখন নিচু হলো, পেটের মধ্যে তখন একটা দলা তাকে যন্ত্রনা দিলো। ‘এই যন্ত্রনা থেকে যদি মুক্তি পেতাম, তাহলে বার্তাটি রটিয়ে দিতাম,’ সে ভাবলো। বামের রাস্তার একেবারে কিনারা দিয়ে সে হাঁটলো; কেননা দু’একটা সামরিক লরি যাচ্ছিলো, কেউ তাকে দেখুক সেটা সে চায়নি। বাঁশ ও মাটির একগুচ্ছ কুটিরে ঘেরা যেখানে আঁকাবাকা ব্যক্তিগত রাস্তা চলে গিয়েছে তার চারপাশে বিশাল কাঁটাতারের জঙ্গলের মুখোমুখি হলো সে । প্রধান প্রবেশ ফটকটি ছিলো অন্য পাশে। এ জায়গাটি সামরিক ভাণ্ডার ও প্রশিক্ষণ কেন্দ্র ছিলো, আর এখান থেকেই সারাদিন কনভয়ের ঝন ঝন শব্দে নীরবতা আন্দোলিত হতো। এখন সে কাঁটাতারের বেড়ার একটি অংশ কাটতে লাগলো। তার কাটার শব্দে জায়গাটি অনুরণিত হলো; তার ভয় হলো কেউ তাকে মেশিন গান উঁচিয়ে ধরতে পারে। টহলদার সেন্ট্রির পদধ্বনি শুনলো সে, আর নিচু হয়ে রইলো। ভাবলো, ‘হয়তো এটাই আমার শেষ মূহুর্ত। মনে হয় আমাকে নরকে পাঠানো হয়েছে?’ নরকের সব খুঁটিনাটি মনে করলো সে যা ঠাকুরমা শিশুকালে তাকে শুনিয়েছিলো, আর কাঁপতে লাগলো। ‘অচেনা সেন্ট্রির হাতে গুলি খাওয়ার কোনো মানেই হয় না,’ সে চিন্তা করলো। ‘একজন অচেনা মানুষ আরেকজন অচেনা মানুষকে গুলি করবে, এটা হাস্যকর ব্যাপার।’ এই শক্তিতে সে কাঁটাতারটি ফেলে দিলো। সামান্য একটু আঁঠা বের করে সে বসে পড়লো এবং কয়েকটা শীটের পিছনে পরিপাটি করে লাগিয়ে ভেতরের ব্যারাকের সামনে তারবাহী থাম্বাগুলিতে নোটিশগুলো সেঁটে দিলো। কাঁটাতারে তার হাতের সামনের দিকটার চামড়া উঠে গেলো। ‘রক্ত ঝরানো হয়েছে, আর জগদীশের আদেশে এটা ঝরাতে এটাই আমার চরম প্রস্তুতি।’ এরপর শীটগুলো একসঙ্গে জড়ো করে বেষ্টনীর মধ্যে নিক্ষেপ করলো। তারকালোকিত আকাশের নিচে নোটিশগুলো পতপত করতে দেখলো সে। ‘ছেলেরা বার্তাগুলো তুলে নিয়ে কাল সকালের অবসরে পড়তে পারে,’ এ ভেবে সে ফিরে গেলো। ** জগদীশ বললো, ‘তোমার চোখে অমন নি¯প্রভ, দূরবর্তী দৃষ্টি কেন, যুবক? মহান কাজে তুমি তো অনেক সেবা দাও। কিন্তু এতে তোমার হৃদয় সত্যিই নেই। জানতে পারি কেন?’ উত্তর দেওয়ার মতো শ্রীরামের কাছে নির্দিষ্ট কিছু ছিলো না। ফটোগ্রাফার হিসেবে আমার বলা উচিৎ ছিলো, “সন্তোষজনক দৃষ্টি” বা “হাস্যজ্জ্বোল দৃষ্টি,”-এর কথা। তোমার হৃদয়কে অবশ্যই তোমার কাজে জড়াতে হবে, প্রিয় যুবক, নইলে দেশকে সাহায্য করতে পারবে না। আমাদের খুব সঙ্কটকাল যাচ্ছে, যেমনটা আমাদের রাজনীতিবিদরা বলেন, আর আমাদের কিছু একটা করতে হবে। আমার তো সন্দেহ হয় তুমি কোনো এক ব্যক্তিকে ঘিরে তোমার চিন্তা-ভাবনা খুব বেশি কেন্দ্রিভূত করে রেখেছো। ঠিক বলছি?’ ‘হ্যাঁ।’ ‘ঠিক আছে, ওটা নিস্ফল কাজ, যেহেতু সরকারই মনে করে তোমাদের দুজনকে আলাদা রাখাই তোমার সর্বোত্তম স্বার্থের কাজ হবে। তুমি তো জানোও না তারা তাকে কোথায় রেখেছে।’ ‘তা সত্য,’ কাতরভাবে শ্রীরাম বললো। ‘কিন্তু আমি জানি সে কোথায়,’ জগদীশ বললো। ‘আমার নিজস্ব কিছু লোক আছে। সব জেল এখন ভরে যাওয়ায় সে আসলে নিয়মিত কোনো কারাগারে নেই। তড়িঘড়ি করে বানানো একটাতে... সে আছে। পুরানো কসাইখানা চেনো? সে ওখানে আছে, আরো কিছু বন্দিনীদের সাথে।’ ‘তুমি কী করে জানো?’ ‘সেখানকার এক প্রহরীকে আমি চিনি। সে আমাকে পছন্দ করে কারণ সে আমার পুরানো মক্কেল, আমার মজুদে তার ছবি পারিবারিক মামলা-মোকদ্দমায় তাকে সাহায্য করেছিলো। ওভাবে ইচ্ছুক থাকলে তোমার বন্ধুর সাথে দেখা করতে সে তোমাকে সাহায্য করবে।’ শ্রীরামের বুকটা ধড়ফড় করলো। যেন কোনো মৃত মানুষ জীবন ফিরে পেয়েছে, কিংবা অন্তত জীবন ফিরে পাওয়ার প্রতিশ্র“তিবদ্ধ। ‘চমৎকার একজন মানুষ সে, নিজের জীবনের ঝুঁকি নিয়ে ভারতীর সাথে দেখা করে প্রায় আধা ঘন্টা কথা বলতে সে তোমাকে সাহায্য করবে।’ ‘কখন? কখন?’ শ্রীরাম উদ্বিগ্ন হয়ে জিজ্ঞেস করলো। ‘যখন তোমার কাজ স্মার্টলি শেষ করবে। ক্রোমিয়াম আকরিকের কাজ, এ ব্যাপারে তোমার সহযোগিতা প্রয়োজন।’ ‘তুমি বলতে চাচ্ছো আমার কাজের পুরস্কার দেবে।’ ‘হ্যাঁ, ঠিক সেটাই বলতে চাচ্ছি। ভাল একটা কাজ আরেকটা কাজের দাবি রাখে।’ ‘আমার কাজে কে লাভবান হবে?’ শ্রীরাম জিজ্ঞেস করলো। ‘বেশ তো, দেশ। ইংল্যান্ডের উদ্দেশ্যে ক্রোমিয়ামের আকরিকে ভরা একটা ট্রেন এক স্টেশন থেকে ছাড়ছে। এটাকে বন্দরে পৌঁছাতে দেয়া যাবে না। পৌঁছাতে দিলে এটা আমাদের কাছে ট্রিগার এবং আরো কত কী আকারে ফিরে আসবে আমাদের জ্বালাতন করতে...। এ কাজে সাহায্য করতে তুমি ছাড়া আর কাউকে আমি ভাবতে পারছি না।’ শীঘ্রই শ্রীরামের ছবি প্রকাশ করে তার খোঁজ-খবর দেওয়ার জন্য পুরস্কার ঘোষণা করাটা পুলিশের জন্য অপরিহার্য ছিলো। ** শ্রীরামের মনে পীড়াদায়ক ভয় হলো যে জগদীশ তাকে নিয়ে আসলে কোনো মজা করতে পারে। ‘যদি মজা করে, তাহলে ভগবান তার সহায় হোক,’ মনে মনে বললো। ‘বড় পাথর দিয়ে ওর মাথার খুলি গুড়া করে ফেলবো,’ আর অসামান্য সহিংসতার স্বপ্নে সে আনন্দ উপভোগ করলো। তার মনটাকে সঙ্গে সঙ্গে পিছনে টেনে নিলো যখন উপলব্ধি করলো ভারতী কীভাবে প্রতিক্রিয়া করবে। ভারতীর চিন্তা তাকে নরম করে তুললো। মনে মনে বললো কোনো বদমায়েশের পায়ে পড়তে সে দ্বিধাবোধ করবে না যদি ভারতী তেমনটা তাকে দিয়ে করাতে চায়। তার মন রক্ষা করতে ও অনুমোদন লাভ করতে যে কোনোকিছু করা যায়। তার পুরো সত্ত্বাটা অর্থপূর্ণ হয় শুধু যখন ভারতীর বিষয়ে কিছু একটা করে। সে ভাবলো ভারতী বের হয়ে এলে আর ফটোগ্রাফারটাও সেখানে থাকলে তার কেমন আচরণ করা উচিৎ। আশা করলো তার ঈর্ষা যেন তাকে উচ্ছৃঙ্খল কোনো কাজ করতে তাড়িত না করে। যা হোক, সে আশা করলো ফটোগ্রাফার যেন নিজের চরকায় তেল দেয় আর তাকে যেমন ইচ্ছে জীবন-যাপন করতে দেয়। আশা করলো ব্রিটিশ সরকারের সাথে লড়াই যেন তাড়াতাড়ি শেষ হয়। আশা করলো ব্রিটেন যেন ভারত ছেড়ে যায় যাতে করে সে কবীর সরণীতে ফিরে গিয়ে ভারতী এবং ঠাকুরমার সাথে শান্তিতে থাকতে পারে! আহ্ , ওখানেই সমস্যা। ঠাকুরমা এতে কী করবে? সে হয়তো দিন রাত ভারতীর সাথে খ্যাঁচ খ্যাঁচ করবে এবং নিজের ভাইয়ের নাতনীর সাথে চেহারায়, যোগ্যতায়, গৃহস্থ কাজকর্মে তার তুলনা করবে। কিন্তু তার আশা ভারতী এসে ঠাকুরমাকে যেন চ্যালেঞ্জ করে যে তার সেই গ্রাম্য ভাগিনীটি পুলিশ বাহিনীর চার্জের শিকার হয়েছে কিংবা মহাত্মাজীর সাথে কথা বলেছে কিনা। তার গুহার প্রবেশ পথের পাথরটায় গা এলিয়ে দিয়ে সে নীল গাম গাছের চূড়ায় তাকালো। তার মন তখন অনিয়ন্ত্রিতভাবে ঘুরে বেড়ালো। মুহূর্তের মধ্যে জগদীশ এসে হাজির হলো। তার পাশে এসে দাঁড়িয়ে ছিলো। সে বললো, ‘খুবই অনিরাপদ, যুবক। আমি না হয়ে যদি কোনো পুলিশ হতো, তাহলে তুমি এখনো এখানে বসে বসে দিবাস্বপ্ন দেখো, গলায় সুন্দর একটা কলার বেঁধে জেলে টেনে নিয়ে যেতো।’ বেশ খানিকটা বিরক্ত হয়ে শ্রীরাম জিজ্ঞেস করলো, ‘দিবাস্বপ্নে ক্ষতিটা কী?’ ‘এমন অনেক কিছুই আছে যা ঠিক নয়। তোমাকে অবশ্যই আরো বেশি সতর্ক হতে হবে। বাইরে থেকে আমাদের গুহা হয়তো দেখা যায় না, কিন্তু এ জায়গাটা অনুসন্ধান করার কথা কেউ হয়তো ভাবতে পারে। তোমাকে হয়তো কেউ দেখেনি, কিন্তু ভেবো না যেন চিরকাল তা চলবে। ছদ্মবেশেও তোমার সব সময় নজর রাখতে হবে। সাবধান।’ ‘ঠিক আছে,’ জগদীশের আচরণে ভীত হয়ে শ্রীরাম বললো, অনেকটা সার্কাস রিঙের বাঘের মতো যা রিং মাস্টারের নির্দেশে গর্জন তুলে ঠিক জায়গায় এসে পড়ে। জগদীশ তার পাশে বসে মন্তব্য করলো, ‘আর যদি ভাবো যে পুলিশ তোমাকে তাড়া করলেই ভাল যাতে করে পুরানো কসাইখানায় তোমাকে আটকে রাখতে পারে, তাহলে তুমি ভুল করবে। তারা এ ধরণের কিছুই করবে না: সেটা শুধু মহিলাদের জন্য সংরক্ষিত।’ পুরানো কসাইখানার নাম শুনে শ্রীরাম নরম হলো। পুরানো কসাইখানা সঙ্ঘ সবার জন্য সন্তোষজনক নাও হতে পারে, কিন্তু শ্রীরামের কাছে নামটি সর্বোচ্চ খুশির অনুষঙ্গ এবং খুবই গভীর এক শান্তিবোধের উদ্রেক করলো। ‘পুরানো কসাইখানা? পুরানো কসাইখানা?’ অনেক দিন পর এই প্রথম বার বালখিল্য মনোভাব গ্রহণ করে শ্রীরাম বললো। ‘পুরানো কসাইখানা, শব্দটা খুবই পরিচিত! আমাদের সাথে এর সম্পর্ক কী?’ ‘এর গুণ হচ্ছে যে এটা পুরানো কসাইখানা এবং নতুন নয়, ’ জগদীশ বললো। ‘অনেক ছাগলই এই ভবনে ঢোকার সময় কাঁপতে থাকে, কিন্তু এতে তুমি হাসবে আর মজা করবে। জায়গাটার সব জবাই বিস্মৃত...। তবুও এটা এমন একটা জায়গা যা হৃদয়কে হানা দেয়, তাই না?’ সে বললো। শ্রীরাম পুরোপুরি খুশি বোধ করলো। তার বাকি দিনগুলো সে কসাইখানার গল্প বলে যেতো: এক ধরণের আফিম তাকে রাজনীতি, ইতিহাস, পুলিশ এবং তার নিজের নিঃসঙ্গতা সম্পর্কে ভুলিয়ে রাখলো। ‘জায়গাটা দেখতে যেতে চাইলে তোমার ভাল সত্ত্বাটার কিছু পরিবর্তন সাধন করতে হবে,’ জগদীশ বললো। ব্যাখ্যা করলো, ‘প্রথমত, পুলিশ যে ছবিটা প্রকাশ করেছে তার থেকে ভিন্ন চেহারায় তোমাকে অবশ্যই আবির্ভূত হতে হবে। কেউ পুলিশকে জানিয়ে টাকা কামাতে চাইলে তাকে সেটা করতে সাহায্য করা তোমার ঠিক হবে না। আমার তো ভয় হচ্ছে পুলিশ তোমার ছবি সর্বত্র ছাপিয়ে দিয়েছে, আর কোনো রাস্তার ছেলে তোমাকে বিদ্রুপ করতে পারে। কারো ছবি ছাপানোর খারাপ দিক এতে প্রকাশ পায়। এ ব্যাপারে আমার একটা সুবিধা আছেÑÑ আমার নিজের কোন ছবি নেই, আর তারা শুধু আমাকে বর্ণনা করেছে: অন্যদের ছবি তুলতে এত ব্যস্ত থাকায় নিজের ছবি তোলার কোনো সময় নেই। ছায়াছবির তারকার মতো তুমি তোমার প্রতিকৃতি ছড়িয়ে বেড়াচ্ছো।’ ‘হ্যাঁ, হ্যাঁ,’ কাতরভাবে শ্রীরামকে সম্মত হতে হলো। এক টাকায় চারটা দ্রুত সস্তা ফটোর কথা সে স্মরণ করলো যাতে সে ধনী হওয়ার পর কোনো এক সময় আসক্ত হয়েছিলো। প্রায়ই শ্রীরাম তার ছবিগুলো ফটোগ্রাফারের বিজ্ঞাপন বোর্ডে প্রদর্শিত হতে দেখেছিলো; আর তার বাড়ির দেয়ালগুলো নিজের ছবিতে ভরা ছিলো। তার মনে পড়লো ঠাকুরমার কথা, ‘আমাদের যুগে মানুষ দেবতা আর পূর্বপুরুষদের প্রতিকৃতি টাঙিয়ে রাখতো, আর তুমি তোমার নিজেরটা ছাড়া কিছুই রাখোনি!’ আমি ভেবে পাই না তুমি এমন করো কেন?’ ‘এর মানে কি পুলিশ কবীর সরণীতে আমাদের বাড়ি থেকে ছবিগুলো নিয়েছে?’ আকস্মিক এক ভাবনায় পীড়িত হয়ে শ্রীরাম জিজ্ঞেস করলো। ‘অবশ্যই। প্রথমে তারা এটাই করে থাকবে।’ ‘ঠাকুরমা কী বলেছিলো, ভাবছি।’ ‘তোমাকে পরের বার দেখলে তিনি আবার বলবেন। দুশ্চিন্তা করো না,’ সে জবাব দিলো। শ্রীরামকে নিবিড়ভাবে পাঠ করে সে বললো: ‘তোমার চেহারা পরিবর্তন করতে হবে। জোরালো পরিবর্তন করতে হবে। প্রথমে ছোট করে সুন্দর গোঁফ জন্মাতে হবে, শেষের দিকটায় বেঁকে গেলে ছোট্ট গোঁফে তোমাকে মোঙ্গলের মতো লাগবে। কিন্তু ওতে মন ভার করো না, তারা তোমাকে খুঁজছে, মোঙ্গলকে নয়। এরপর তুমি কি মনে করো ছবিটা পূর্ণাঙ্গ করতে তোমার ক্রপ কাট কামিয়ে ফেলতে হতে পারে?’ পুরানো চুলের গোছা ফেলে দিতে এবং বর্তমান ক্রপ কাটের চুল গজাতে যে সব মনোবেদনা সে পেয়েছিলো তা স্মরণ করে এ পরামর্শে শ্রীরামে মনে ভয় হলো। প্রথম প্রথম ঠাকুরমা এতে কান দেয়নি। তিনি নিশ্চিত ছিলেন যে এতে তার চেহারা নষ্ট হবে, কিন্তু একদিন শ্রীরাম নাপিতরা যে টেম্পল ট্যাংকে বসে মক্কেলদের চুল কাটে সেখানে চট করে গেলো। পুরানো এক নাপিতকে ফুসলিয়ে তার চুলের গোছাটা কাটিয়ে নিয়ে যন্ত্রটি কানের উপর দিয়ে চালিয়ে নিলো। আর নিজের সীলকৃত টাকার বাক্স থেকে চুরি করা পকেটের পুরোটা টাকা তার কোলে সে খালি করেছিলো। টাকা রাখার বাক্সটার ছিদ্র আরো বড় করে ঝাঁকিয়ে মুদ্রাগুলো বের করেছিলো যখন তার ঠাকুরমা রান্নাঘরে ছিলো। ঝনঝন শব্দ লুকাতে এক টুকরা কাপড় দিয়ে চেপে ধরে কাজ চালিয়েছিলো যতক্ষণ পর্যন্ত না তামার ছোট ছোট আট আনা বের হয়েছিলো। ঠাকুরমা রান্নাঘর থেকে চেঁচামেচি করেছিলো, ‘কীসের শব্দ রে?’ ‘কোন শব্দ?’, শ্রীরাম ফিরতি চিৎকার দিয়েছিলো, আর তার কাজ চালিয়ে গিয়েছিলো। ক্রপ কাটের জন্য নাপিত কত করে চাইতে পারে সে সম্পর্কে তার কোনো স্পষ্ট ধারণা ছিলো না। শ্রীরাম তা কমিয়ে ছয় আনায় এনে আরো দুই আনা অপ্রত্যাশিত খরচে দিয়েছিলো। কিন্তু ট্যাংকে বসা নাপিতটি শ্রীরামের ঘন কোঁকড়ানো চুলের গোছা ছেঁটে ফেলার জন্য এক টাকা দাবি করেছিলো। দর কষাকষি করে শ্রীরাম ছয় আনায় নামিয়ে এনেছিলো; নাপিত কাঁচির চুল কাটার তালে তালে হতাশজনক মন্তব্য অস্ফুটভাবে ছুঁড়ে দিচ্ছিলো। নাপিতের টিনের বাক্স থেকে তৈরী ছোট একটা আয়নায় শ্রীরাম নিজেকে দেখেছিলো, আর আনন্দিত হয়েছিলো। তার মনে হয়েছিলো সে কয়েক পাউন্ড চুল থেকে অব্যাহতি পেয়েছিলো। চুলগুলো ট্যাংকের পাথরের গায়ে পড়েছিলো। আর শ্রীরাম অজানা কারণে শরীরের এই বাড়তি অংশ দেখে কীভাবে কেঁপে উঠেছিলো তা স্মরণ করলো। চুলগুলো ছিলো লম্বা ও কোঁকড়ানো। সে বলেছিলো: ‘এগুলো বিক্রি করলে দশ টাকা পাবেন।’ এ পরামর্শে নাপিত ক্ষেপে গিয়ে বলেছিলো: ‘আপনি আমাকে চুলের হকার মনে করে ভুল করছেন। মুখ সামলে কথা বলুন, যুবক। আপনি না হয়ে অন্য কেউ হলে গলা কেটে ফেলতাম। দেখুন, আমি কিছু চাই না, আপনার পরনের ধুতিটা শুধু আমাকে দিয়ে দেন: এরকম পরিস্থিতিতে এটাই স্বাভাবিক রীতি।’ শ্রীরাম ভীত হয়েছিলো: ‘আর আমি কী করে বাড়ি পৌঁছাবো? ‘এ ট্যাংকে গোসল করে কেউ লক্ষ করার আগে দৌড় দেন। ও! আপনার তো আবার ধুতির নিচে টুকরা কাপড়টা নেই? সেটাই আপনার বয়সী যুবকের জন্য যথেষ্ট হবে।’ এ কথা বলে সে শ্রীরামের ধুতির এক প্রান্ত ধরে প্রায় টান দিয়েছিলো, আর শ্রীরামের তাকে বেপরোয়াভাবে ফাঁকি দিতে হয়েছিলো। ‘ওহ্ !’ বিপুল বিস্ময়ে নাপিত চিৎকার করে উঠলো। তার অনুভূতি প্রকাশ করতে মুখটাকে অদ্ভূত করেছিলো। ‘আপনি কি বলতে চাচ্ছেন আপনি ইয়া ÑÑ নিয়ে চলাফেরা করেন।’ সম্মানিত ও সৎ নাগরিকদের অন্তর্বাস ও আধুনিক প্রজন্মের অভ্যাসের প্রাণবন্ত বর্ণনা দিয়েছিলো সে। বিষয়টা কোমরের এত নিচে গিয়েছিলো যে শ্রীরাম লজ্জা পেয়েছিলো। অবশেষে মোচড় দিয়ে মুক্ত হয়ে সে দৌড়ে পালিয়েছিলো। এখন এসব কিছু তার মনে ঝলক কেটে গেলো। হাতটা মাথায় রেখে আঙ্গুল চালনা করলো এবং জগদীশকে বললো: ‘এ ক্রপ কাট আমি ফেলে দিতে পারবো না। এটা আমার ভাল লাগে।’ কীভাবে তার চেহারা পরিবর্তন করতে পারে তা ভেবে ভেবে শ্রীরাম নির্ঘুম রাত কাটালো। এমনও ভাবলো যে পর্দাপরা মহিলার মতো ছদ্মবেশ নিয়ে তার মুখ আদৌ দেখাবে না। জগদীশ তার এসব ভাবনাকে হেসে উড়িয়ে দিলো। নিজের মতো করে চেহারার বিকৃতি সাধন করতে তাকে আগ্রহী মনে হলো; যতটা সম্ভব হাস্যকর করে ডিমের মতো করে চুল কাটাতে ইচ্ছুক মনে হলো। হয়তো জগতের হাসির পাত্র করে তুলতে এবং ভারতীর সাথে শেষ সুযোগটা নষ্ট করতে চাইলো সে । ভারতী বাকি জীবন তার মুখের দিকে দ্বিতীয়বার দেখতে চাইবে না। সে ভেবে পেলো না জগদীশ যে বুদ্ধি দিলো তা করতে কেন সে অস্বীকৃতি জানালো না। এমনকি কসাইখানাও বিরাট বাস্তব কৌতুক বা মোটের উপর প্রকৃত কসাইখানা হিসেবে দেখা দিতে পারে! কিন্তু তার আশঙ্কার কোনো মূল্য ছিলো না। যে ব্যাপারটা সে ভয় করতে পারে বা অনুভব করতে পারে তা ছিলো যে জগদীশ পালাতে পারবে না, আর সে যা আদেশ করেছিলো তা কাউকে না কাউকে করতে হবে। শ্রীরামের উপরের ঠোঁটে সম্মানজনক মোঁচ গজানোর জন্য জগদীশ তিন সপ্তাহ সময় দিলো। দ্রুত বৃদ্ধির জন্য এক বোতল মালিশ নারকেল তেল সে তাকে এনে দিলো। ‘ভারতীকে দেখার আগে আমাকে কতো কী করতে হবে!’ শ্রীরাম ভাবলো। দিনের পর দিন জগদীশ শ্রীরামের গোঁফ বৃদ্ধি যাচাই করলো। প্রতিবার অনুৎসাহীভাবে সে মাথা নাড়িয়ে সায় দিলো। ‘খুব ধীরে, খুব ধীরে, অনেক বেশি ধীরে,’ সে এমনভাবে বললো যেন শ্রীরাম নিজেই এজন্য দায়ী ছিলো। মাফ চাওয়ার ভঙ্গিতে শ্রীরাম তার জিহ্বা দিয়ে ক্লিক করে শব্দ করলো। তিন সপ্তাহ সময়টা কোনোভাবেই নষ্ট হয়ে যায়নি। জগদীশ সহযোগে ও তার দক্ষ নির্দেশনায় শ্রীরাম নানা ধরনের কাজ করেছিলো যা দেশের স্বাধীনতার লড়াইয়ে সাহায্য করবে বলে তার আশা ছিলো: বিভিন্ন গ্রামে অর্ধেক ডজন কোর্টের রেকর্ডে সে আগুন ধরিয়ে দিয়েছিলো; এক জোড়া ট্রেন লাইনচ্যূত করে নানা স্কুলের কাজ অচল করেছিলো; একটা স্থুল বোমা ফাটিয়ে কৃষি গবেষণা স্টেশনের প্রধান ফটক ছিন্নভিন্ন করে এর ছাই দিয়ে বিজয়ের ইংরেজি ‘ভী ’ তৈরি করেছিলো এবং প্রতীকটার উপর লিখেছিলো ‘ভারত ছাড়ো ’। এ কর্মকাণ্ডে সে এত পাকা হয়ে উঠেছিলো যে এক ধরনের বেপরোয়া ভাব তার মধ্যে বিকশিত হয়েছিলো। পুলিশকে তার কোনো ভয় ছিলো না: তারা তার কাছে দূরবর্তী, তাত্ত্বিক শরীর, তার বিষয়ে সম্পর্কিত নয় হিসেবে মনে হয়েছিলো। সে জানতো সবসময় সে পিছলে যেতে পারবে। যেখানে তাকে পাওয়া যাবে সেখানটা বাদে তারা সর্বত্র খোঁজ করছিলো। জগদীশ বারবার বলছিলো: ‘ব্রিটেন সালাম জানিয়ে ভারত ছাড়বে যদি তার প্রশাসনের মেরুদণ্ডটা আমরা ভেঙ্গে গুড়িয়ে দেই।’ মাঝে মাঝে সে বলতো: ‘তুমি জানো ব্রিটেনের মেরুদণ্ড কোথায়?’ ‘মনে হয়, তার পিছনে?’ শ্রীরাম মজা করে বলতো। ‘জানো তার পিছনটা কোনখানে?’ ‘তার সামনের পিছনটায়, মনে হয়,’ শ্রীরাম এবারও মজা করে বলতো। সে এ সময়টাকে উপভোগ করছিলো যা তার নিঃসঙ্গ, নোংরা, মানব সঙ্গ থেকে বিচ্ছিন্ন জীবনে স্বস্তি ছিলো। তার কূটকৌশল জগদীশ ক্ষমা করে দিয়েছেলো। ব্যাখ্যা করেছিলো: ‘কসাইখানার সম্ভাবনায় তুমি এমন ধারালো কথা বলছো, তাই না?’ অনেক ধৈর্য্য নিয়ে সে ব্যাখ্যা করেছিলো, ‘ব্রিটেনের মেরুদণ্ড অবশ্যই চূর্ণ করতে হবে, আর সেটা আছে আদালত, স্কুল, অফিস, রেললাইনে যেখান থেকে সে বাঁচার শক্তি পায়।’ এমন জটিল যুক্তি শ্রীরাম সহজে বুঝতে পারেনি। সে করুণভাবে জিজ্ঞেস করেছিলো, ‘তার সামনের দিকটাও আমরা ভেঙ্গে বিচূর্ণ করছি না কেন?’ ‘কারণ সেটা অনেক দূরে, আর আমরা অতদূর যেতে পারবো না।’ জগদীশ তাকে এখানে সেখানে নিয়ে গিয়ে তার যন্ত্র ও প্রতিনিধি বানালো। উত্তেজনা ও নতুনত্ব এবং সর্বোপরি পুলিশের সাথে লুকোচুরি খেলা শ্রীরাম আদতে উপভোগ করতে শুরু করছিলো। এতে সে রোমান্টিক গুরুত্বের অনুভূতি পেলো। তার মনে হলো যে সে মহাকাব্যের কোনো চরিত্র, আর তার কর্মকাণ্ডের উপর নির্ভর করে ভবিষ্যৎ ইতিহাস। কিন্তু মাঝে মাঝে এক ধরনের সন্দেহ তার মনে হানা দেয়। জগদীশের সাথে নালায় বসে লুকিয়ে থাকাকালীন রেল স্টেশন না সরকারি ভবন থেকে আগুনের শিখা জ্বলে উঠে রাতটাকে রোশনাই হতে দেখলো। একবার সে ফিসফিস করে বললো, ‘তোমার কি মনে হয় এ আগুনে ব্রিটেন আক্রান্ত হবে?’ জগদীশ দ্ব্যর্থহীনভাবে ঘোষণা করলো, ‘চার্চিল এ সম্পর্কে ইতোমধ্যেই জানবে। এতে সে গোঙাবে। রাত জেগে বসে থাকবে। সারা দেশে দিনের প্রতিটা ঘন্টায় এটা অবশ্যই চলতেই থাকবে যতক্ষণ না পর্যন্ত ব্রিটেন আমাদেরকে বলে, “ পোটলা পুটলি বেঁধে কালই আমরা চলে যাচ্ছি, আপনাদের দেশ নিয়ে যা করতে চান তা-ই করেন”।’ পরে শ্রীরাম জিজ্ঞেস করলো, ‘ভাবছি এ সব ব্যাপারে মহাত্মাজী কী বলবে!’ ‘জানি না,’ জগদীশ জবাব দিলো। ‘এটা তার পথ নয়। কিন্তু ফল সন্তোষজনক হলে, আমি নিশ্চিত, তিনি বলবেন, “তোমরা ভালই করেছো, বাছা ”।’ শ্রীরাম সন্দিহান বোধ করলো। মাথা নাড়িয়ে বললো, ‘আমি নিশ্চিত না। শুধু ভারতীই সঠিক জানে মহাত্মাজী কী ভাববেন বা বলবেন...।’ এরপর তার ভাবনা চলে গেলো কসাইখানার দিকে। জগদীশ এ বিষয়ে কিছুটা দুর্বল হলো মনে হলো: ‘আমরা তো ইচ্ছা করে কারো মৃত্যু ঘটাইনি। কোনো জীবন যেন হারিয়ে না যায় সে ব্যাপারে আমি সবসময় সতর্ক, কিন্তু আমাদের পূর্বসতর্কতা সত্ত্বেও কিছু লোক দূর্ঘটনাক্রমে বিশৃঙ্খলায় আটকে পড়ে মারা যাচ্ছে, আমাদের কিছু করার নেই।’ ‘আমাদের সাহায্য করতে জনতা যখন একত্র হয় তখন তাদের ছত্রভঙ্গ করতে পুলিশের দ্বারা অনেক লোক গুলিবিদ্ধ হয়।’ ‘কিন্তু সেটা তো আমাদের বিষয় নয়,’ জগদীশ বললো। আরো বললো, ‘যুদ্ধে জীবন হারিয়ে যেতে বাধ্য। যা হোক, এখনকার কাজটা যে কোনো তাত্ত্বিক জল্পনার চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ। বর্ধতে মহাত্মাজীর সাথে থাকাকালে তিনি আমাকে এ দর্শন শিখিয়েছিলেন। সে যাক গে, এসব বিষয় নিয়ে খুব বেশি ভেবো না। আমাদের নিজেদের সামর্থ্য মোতাবেক আন্দোলনের জন্য কাজ করতে তিনি আমাদের বলেছেন।’ ** একদিন জগদীশ শ্রীরামের মুখাবয়ব পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে ঘোষণা করলো, ‘আমার জীবনে এ যাবৎ দেখা সবচেয়ে সন্তোষজনক গোঁফ।’ রেজর ও কাঁচি দিয়ে গোঁফের প্রান্তটা নিচের দিকে মোড় নিতে সে শ্রীরামকে সাহায্য করলো। রূপার প্রান্তবিশিষ্ট পুরানো চশমাও তৈরি করলো এবং তার নাকের উপর বসিয়ে দিলো। সে তাকে বেখাপ্পা আঁটসাঁট বোতামওয়ালা কোট এবং মাথা ঢাকার জন্য সাদা পাগড়িও সরবরাহ করলো। সকল সম্মানিত মানুষের মতো ধুতিটা দুইভাগ করে বেঁধে পরতে সে তাকে আদেশ করলো। এসবের পরে শ্রীরাম আয়নায় দেখলো, যে ছোট্ট আয়নাটি দাঁড়ি-গোফ কামানোর সময় সে ব্যবহার করতো; এতে পুরো ছবিটা দেখা যায়নি, কিন্তু তার মন্তব্য করার মতো যথেষ্ট দেখা গেলো: ‘আমাকে পাইকারি চাল ব্যবসায়ীর মতো দেখাচ্ছে।’ জগদীশ প্রশংসাসূচকভাবে মাথা নাড়িয়ে সায় দিলো এবং কণ্ঠস্বরে বেশ আনন্দ নিয়ে বললো, ‘সত্যি, সত্যি...। তোমার কপালে যদি শুধু কালো জাতের চিহ্ন দিতে পারতাম, তাহলে ছবিটা আসলেই পূর্ণাঙ্গ হতো।’ সূর্যাস্তের পর প্রায় সাতটায় শ্রীরাম যখন সাহসিকতার সাথে বের হলো তখন সে এত ভিন্ন বোধ করলো যে সে ভেবো পেলো না ভারতী কখনো তাকে স্বীকার করুক তা কেন সে প্রত্যাশা করে। এ ভাবনায় সে মিটিমিটি হাসলো, ‘ভারতী ভাবতে পারে কেন ধনী একজন চাল ব্যবসায়ী হঠাৎ করে তার সাথে দেখা করার জন্য বেছে নিয়েছে।’ তার নাকের মাঝখানে চশমার কারণে হালকা একটু ব্যথা বোধ হলো, আর চশমাটি অনবরত নিচে নেমে যাচ্ছিলো তার অস্পষ্ট, কুয়াশাচ্ছন্ন দৃষ্টি দিয়ে জ্বালাতন করে। ‘এ সব কিছু হচ্ছে ভারতী পুলিশের কাছে আত্মসমর্পণ করতে উপদেশ দিয়েছিলো তা না শোনার জন্য!’ সে ভাবলো। ছোট্ট স্টেশনে সে মালগুদি গামী ট্রেনে চড়লো। সমস্ত লোককে উপেক্ষা করলো। ‘এসব লোকের সাথে কথা বলা কোনো আত্মসম্মানওয়ালা চাল ব্যবসায়ীর কাজ না।’ এ ভেবে সে উদাসীনভাবে সহযাত্রীদের দিকে তাকিয়ে বসলো। জগদীশ নিজেকে তীক্ষèধী হিসেবে প্রমাণ করেছিলো: গোঁফটা বিশাল একটা সম্পদ ছিলো; মনে হচ্ছিলো শ্রীরাম যেন মুখের উপর মুখোশ পরেছিলো, রূপান্তরটা এতো অনবদ্য ছিলো। মালগুদি স্টেশন থেকে বাজার রোড হয়ে কসাইখানা পর্যন্ত দক্ষিনে এক ঘন্টা হাঁটার রাস্তা ছিলো। পরিচিত রাস্তা ধরে যখন সে হাঁটলো, তখন শ্রীরাম ভাবাবেগপূর্ণ ও অখুশি বোধ করলো। মনে হলো এ জগৎ যেন যুগ যুগ আগে সে ত্যাগ করেছিলো। নিঃশব্দ ও অন্ধকার দোকানগুলোর সারির ওপারে ছিলো তার ঠাকুরমার বাড়ি। জগদীশ তাকে যথাযথ নির্দেশনা দিয়েছিলো। চাল ব্যবসায়ী পুরানো কসাইখানার পূবের দেয়ালের পিছনে হাঁটু গেড়ে নিচু হলো। ভারতী ঐ কোণায় টয়লেটের দিকে এসে বড় একটা পাথরে উঠে দাঁড়াবে, যে পাথরটি সেই উদ্দেশ্যে গড়িয়ে এমন অবস্থায় রাখা হয়েছিলো, এবং নিচে তাকিয়ে তার সাথে কথা বলবে। শ্রীরাম ভেবে পাচ্ছিলো না অন্ধকারে তার গোঁফটা ভারতী দেখতে পাবে কিনা, ভাবছিলো ভারতীর হাতটা ছুঁয়ে দেখার মতো নাগাল পাবে কিনা। ধৈর্য্য সহকারে সে অপেক্ষা করলো। তালুক অফিসের ঘন্টাধ্বনিতে সকাল দুইটা বাজলো। সে ঘুম ঘুম বোধ করলো। মনে পড়লো মহাত্মা যখন মালগুদিতে এসেছিলো , তখন ভোর তিনটায় ভারতী যে তাকে দেখা করতে বলেছিলো তার কথা। ‘অন্য মানুষের ঘুম নষ্ট করতে ভালবাসে বলে মনে হচ্ছে,’ সে ভাবলো। সেখানে মাটিতে বসে পড়লো। তালুক অফিসের ঘন্টাধ্বনিতে পরের ঘন্টা বাজলো। ‘এখানে কতক্ষণ থাকতে হবে?’ সে ভাবলো। ‘কেউ আমাকে নিয়ে মজা করছে না তো?’ ক্রুদ্ধ চিন্তা তার হৃদয়ে জাগ্রত হচ্ছিলো। ‘এই যে,’ একটা কণ্ঠস্বরের চিৎকার এলো। আশান্বিত হয়ে সে উপরে তাকালো। দেয়ালের উপরে একটা মাথা আবির্ভূত হলো, কিন্তু সেটা ভারতীর মাথা ছিলো না। সেটা ছিলো একজন ওয়ার্ড বালিকার। ‘কোথায়...?’ পায়ের বুড়ো আঙ্গুলে ভর দিয়ে প্রসারিত হয়ে বললো। ‘চুপ, ভাল করে শোনেন। সে আসবে না।’ ‘সে আসবে না?’ ‘না। এটা ধরেন।’ সে একটা চিঠি ফেলে দিলো। ‘এটা পড়ে চলে যান,’ মাথাটা বললো। কাগজের টুকরাটা হাতে শক্ত করে ধরে চাল ব্যবসায়ী চলে গেলো। মাথায় হাজার জল্পনা-কল্পনা ভন ভন করছিলো। রাস্তার প্রথম বাতির নিচে সে কাগজটা খুললো। এটি ছিলো মেমো প্যাড থেকে ছেঁড়া এক টুকরা কাগজ। এর উপরে তড়িঘড়ি করে পেনসিল দিয়ে হিজিবিজি করে লেখা ছিলো: ‘আজকে তোমার সাথে দেখা করতে পারছি না। এরকম অবস্থায় দেখা করাটা খারাপ মনে হচ্ছে। বাপু সবসময় বলেছে প্রতারণামূলক কৌশল অবলম্বন করা অসম্মানজনক। জেলের মধ্যে আমাদের নিয়ম-কানুন অবশ্যই মেনে চলতে হবে, নইলে খোলাখুলিভাবে সত্যাগ্রহ দিয়ে এসব বদলে দিতে হবে যদি সম্ভব হয়। আমাকে ক্ষমা করো। আবার দেখা হবে। কিন্তু তার আগে দয়া করে তোমার ঠাকুরমার সাথে দেখা করে এসো। এক বন্দী যে এখানে এসেছিলো সে আমাকে বলেছিলো যে তিনি খুবই অসুস্থ। তাকে দেখতে জীবনের ঝুঁকি নেওয়াটা তোমার দায়িত্ব। খুব বেশি দেরি হওয়ার আগেই যাও।’ ** যখন সে কবীর সরণীর ১৪ নম্বর সিঁড়ি বেয়ে উঠলো খুব বেশি লোক তাকে চিনতে পারেনি। সে দোকানদার ক্যানিকে বাড়ি থেকে বের হয়ে আসতে দেখলো। তার পিছনের দরজাটি হালকা করে বন্ধ করছিলো সে। সে শ্রীরামকে চেনেনি। মুহূর্তের জন্য সে ভুলে গেলো যে তাকে চেনা যেতে পারে না, আর প্রায় অনিচ্ছাকৃতভাবেই ‘ক্যানি!’ বলে ডাক দিলো। তার কণ্ঠস্বরে তার রূপ ধরা পড়লো। ক্যানি থেমে হঠাৎ চিৎকার করে উঠলো, ‘ওহ্,! আমাদের ছোট মনিব এসেছে। হায়, রাম, বাড়ি আর বৃদ্ধা ভদ্রমহিলা যিনি তোমার বাবা, মা, চাচাতো বোন, সবকিছু, তাকে ছেড়ে তুমি নিজে কী করে বেড়াচ্ছো। হৃদয় বলে কি তোমার কিছু নেই? ভগবানকে ধন্যবাদ যেকোনো ভাবে হোক তুমি এসে গেছো। কিন্তু তুমি অনেক দেরি করে ফেলেছো।’ ‘কেন?’ কেন?’ শ্রীরাম চিৎকার করে বললো। ‘কী হয়েছে?’ ‘তিনি মারা গেছেন। কাল রাত দশটায় মারা গেছেন।’ শ্রীরাম দৌড়ে তাকে ছাড়িয়ে বাড়িতে ঢুকলো। ঐ তো পুরানো পরিচিত জায়গায়, পুরানো ভাল হল বাতির নিচে বৃদ্ধা ভদ্রমহিলা শুয়ে আছে। তার গা জুড়ে সাদা কাপড় টানানো। পাশের বাড়ির দুইজন মহিলা তার পাশে জেগে বসে আছে। শ্রীরাম দুঃখ ভারাক্রান্ত হলো: পরিচিত বাড়ি, পুরানো বর্ষপঞ্জি এখনো ছাদের টাইলের নিচে পড়ে আছে: যে তামার পাত্রে তিনি খাবার পানি রাখতেন তা জানালার গোবরাটে এখনো আছে। তার প্রথম টাকা দিয়ে যে ইজি চেয়ারটা ঠাকুরমার জন্য এনেছিলো সেটা এখনো সে যেখানে রেখেছিলো সেখানেই আছে। অতীত জীবনকে এক নজর দেখলো সে। বাড়িটার যে কোণায় সে থাকতো সে কোণার উপরে গেলো এবং তার বই, কলম, কাপড়-চোপড় যাচাই করে দেখলো। পুরানো টিনের ট্রাঙ্কটির ঢাকনি খুলে ভেতরে দেখলো। যেসব জিনিসের সাথে সে বড় হয়েছিলো সেসব জিনিস সেখানে নিরাপদ ও ঠিকঠাকমতো আছে। যারা রাত জেগেছিলো তারা নীরস, ঘুমভরা চোখে শ্রীরামের গতিবিধি অনুসরণ করলো। শ্রীরাম কাঁদলো। কিন্তু অশ্র“ মুছে ফেলতে পারলো না; উপলব্ধি করলো যে তার চশমাটা ছিলো তার জন্য ঝামেলার: হঠাৎ সেটা খুলে নিচে ফেলে রাখলো এই মনে করে: ‘এ জন্য জগদীশের কাছে জবাবদিহি করতে হবে। নিজের সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করছি।’ দরজার প্রবেশ পথে ক্যানি দাঁড়িয়ে শ্রদ্ধাভরে দেখছিলো। ‘ঠাকুরমাকে কতো উদ্ধত দেখাচ্ছে! এখনও!’ সে চিৎকার করে বললো। ‘মহান একজন মানুষ’ ‘আমি বিশ্বাস করতে পারছি না ঠাকুরমা মরে গেছে। তাকে ঘুমন্ত দেখাচ্ছে! তুমি কী করে জানো যে সে মরে গেছে?’ শ্রীরাম জিজ্ঞেস করলো। ক্যানি শুধু গুরুগম্ভীরভাবে হাসলো। ‘তুমি বরং তোমার সব আত্মীয়-স্বজনকে টেলিগ্রাফ করো। আমি নিশ্চিত যে অনেকেই তার মুখটা শেষবারের মতো দেখতে চাইবে।’ বৃদ্ধা ভদ্রমহিলার পাশে মেঝেতে বসে শ্রীরাম ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদলো। মহিলারা কিছুক্ষণ তার দিকে তাকালো, আর শোকাতুর নীরবতায় হারিয়ে গেলো। তাদের একজন ক্যানির দিকে ঘুরে জিজ্ঞেস করলো, ‘পৌঁছানোর মতো সে-ই কি একমাত্র আত্মীয় নাকি আরো কারো জন্য অপেক্ষা করবো আমরা?’ ক্যানি প্রশ্নটা উপেক্ষা করতে অধিকতর পছন্দ করলো। রাতটি একেবারে শান্ত ও নীরব ছিলো। রাস্তার কুকুরগুলোও ঘুমিয়ে ছিলো। নি¯প্রভ আলোর নিচে কথোপকথনরত মৃদু কণ্ঠস্বর ব্যতীত ঠাকুরমার নিজের দৃষ্টান্ত অনুসরণ করে সারা দুনিয়া ঘুমিয়ে ছিলো। শ্রীরাম হঠাৎ দাঁড়িয়ে ক্যানির কাছে গিয়ে তার বাহু দিয়ে ক্যানির কাঁধ জড়িয়ে ধরলো, আর ফিসফিস করে বললো, ‘ক্যানি, আমার খুব ক্ষুধা পেয়েছে। দোকানটা খুলে আমাকে খাওয়ার মতো কিছু দিতে পারবে? রান্নাঘরে কিছুই নেই।’ ‘কীভাবে কিছু থাকবে? তিনি এতদিন ধরে অসুস্থ ছিলেন; ঐ ভদ্রমহিলাগুলো তার জন্য দুধ ও জই মণ্ড আনছিলো।’ ‘আমার খুব ক্ষুধা পেয়েছে, ক্যানি,’ আবার শ্রীরাম করুণভাবে বললো। চাবিগুলো ঝন ঝন শব্দ করে ক্যানি বললো, ‘আমার সাথে এসো।’ তারা রাস্তা পার হলো। ক্যানি তার দোকানের দরজাটা খুলে বাতি জ্বালালো। শ্রীরাম উঁচু বেদিটাতে উঠে ভেতরে ঢুকলো এবং ভেতর থেকে আবার দরজার খিল লাগিয়ে দিলো। দোকানটা গরম ও গুমোট ছিলো। ঝোঁকায় ঝোঁকায় কলা ঝুঁলে ছিলো, আর বন রুটি ও বিস্কুটে বিভিন্ন কাচের পাত্র ভরা ছিলো। আর সবকিছু অবশ্যই আপেল গাল সমেত ইউরোপিয়ান রাণীর অধীনে ছিলো। দোকানটা ছিলো গুমোট বলে শ্রীরাম অভিযোগ করলো । ক্যানি ব্যাখ্যা করলো, ‘আমি চাইনা কেউ তোমার উপস্থিতিকে সন্দেহ করুক। যদিও তোমাকে ধরিয়ে দিয়ে পুরস্কার সংগ্রহ করাটা এই দুঃসময়ের ব্যবসা চালানোর থেকে অধিকতর ভাল ব্যাপার হিসেবে প্রমাণিত হতে পারে!’ শ্রীরাম কেমন ক্ষুধার্ত ছিলো তা সে উপলব্ধি করেনি। সে চাইলো আর যা দেখলো তা সবই খেয়ে ফেললো। ক্যানি একটা কাগজ বের করে হিসাব করলো: ‘দুই টাকা চার আনা হবে। তোমার অ্যাকাউন্ট থেকে কেটে নেবো।’ এখন শ্রীরাম আর ক্ষুধার্ত নয়। সে বললো: ‘ঠাকুরমার ব্যাপারে আমাকে বলো। তার কী হয়েছিলো?’ উত্তর দেওয়ার আগে ক্যানি কিছুক্ষণ থেমে থাকলো। ‘যদি ঠিকমতো বলতে পারি, তবে এ বাড়িতে পুলিশ এসে তোমার খোঁজ করার পর থেকে তিনি তার আসল মেজাজ হারিয়ে ফেলেছিলেন। তার সব সময় মনে হয়েছিলো যে তুমি তার সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করেছো। মহাত্মা এবং আরো অনেক কিছু সম্পর্কে তুমি সব জানতে পারো, কিন্তু তিনি যা জানতেন তা ছিলো তেমন যেমনটা লোকজন তাকে বলেছিলো যে তুমি একটা মেয়ের পিছু নিয়েছিলে। বৃদ্ধা ভদ্রমহিলা খুবই আঘাত পেয়েছিলেন। এরপর তিনি ঘরের বাইরে প্রায় বেরই হতেন না, আর পুলিশ যখন তোমার ছবি নিতে এসেছিলো, তখন তিনি খুবই ঘাবড়ে গিয়েছিলেন। তার মনে হয়েছিলো যে তিনি আর লোকের সামনে মাথা তুলে দাঁড়াতে পারবেন না। তিনি সবসময় বলতেন তুমি তার সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করেছো। পুলিশ এসে আমাকেও তোমার সম্পর্কে প্রশ্ন করেছিলো। আমি বলেছিলাম, “আপনারা শুধু আমার দোকানের সময়টা নষ্ট করছেন। তার বাড়ির বিপরীতে আমার একটা দোকান থাকার মতো দূর্ভাগ্য আছে বলে শহরের প্রত্যেকটা গুণ্ডার ব্যাপারে আমাকে জ্বালাতন করবেন না।” আর এতে তারা সন্তুষ্ট হয়েছিলো। তুমি যদি তাকে না বলে চলে না যেতে! এতে তিনি অত্যন্ত দুশ্চিন্তায় পড়েছিলেন। তিনি বলেই যাচ্ছিলেন, “ গাভীর দুধ খাইয়ে বড় করলেও ছোট্ট একটা কোবরা কী করতে পারে? এটা শুধু তা-ই করতে পারে যা সে শিখেছে। শ্রীরাম এমন তুলনায় দৃশ্যত বিরক্ত হলো। ‘সে খুবই রুক্ষ-ভাষী ছিলো, সে জন্য তাকে আদৌ কিছু না বলে আমি চলে যাওয়াটাই বেশি পছন্দ করেছিলাম। এমন অযৌক্তিক চরিত্রের সাথে কারো কথা বলার কী সুযোগ ছিলো?’ কিছুক্ষণ সে ভুলে গেলো যে সে মৃত কারো সম্পর্কে কথা বলছিলো। ‘লোকজন এসে তোমার সম্পর্কে তাকে চুল-খাড়া করা গল্প বলেছিলো। তোমার কর্মকাণ্ডে তিনি ভীত হয়েছিলেন। তোমার কী হয়েছিলো? আমি কখনোই ভাবিনি এত আগ থেকে যে ছোট মনিবকে আমি চিনতাম সে কখনো জিগোমার হতে পারে।’ পুরানো ধ্রুপদী এক ডাকাতের সাথে তুলনা করায় শ্রীরাম আহত বোধ করলো। অনেক আত্ম-করুণা নিয়ে সে বললো, ‘ঠাকুরমাকে দেখতে ইচ্ছা না করলে আমি আসতাম না।’ ‘তা সত্য, ’ ক্যানি বললো। ‘বাজার রোডের ডাক্তার তাকে প্রায়ই দেখতেন; শেষ সন্ধ্যায়ও তিনি তার নল ও সূঁচ নিয়ে সেখানে ছিলেন, আর তোমার ঠাকুরমা মারা যাওয়া পর্যন্ত ছিলেন।’ ‘সে কি সব সময় কথা বলছিলো?’ শ্রীরাম জিজ্ঞেস করলো। ‘বলেনি, কিন্তু বলে থাকতে পারে। এখন ওসব ভাবছো কেন?’ ক্যানি বললো। ‘পরবর্তীতে আমাদের কী করা উচিৎ চলো তা-ই নিয়ে ভাবি।’ ‘হ্যাঁ, কী করতে হবে?’ ‘শ্রাদ্ধ। এটা তাড়াতাড়ি সেরে ফেলো। আত্মীয়-স্বজনের জন্য অপেক্ষা করছো নাকি?’ এ রকম কঠিন ও জটিল গৃহস্থ সমস্যায় সে অনভ্যস্ত ছিলো। এগুলো নিয়ে সে গভীরভাবে চিন্তা করলো। ‘আত্মীয়-স্বজন’ বলতে তার চাচার চাচা-র কথা শুধু মনে এলো যার কালো উত্তরসূরীর সাথে তার বিয়ে হওয়ার কথা ছিলো। আর মনে পড়লো নানান জনের সমাবেশে একটা দলের কথা যারা তাদের গ্রাম থেকে মাঝে মাঝে এক বেলা বা দুই বেলা খাবারের জন্য হাজির হয়ে সব সময় জমি ও মামলা-মোকদ্দমা নিয়ে কথা বলতো। ঠাকুরমার কাছে তাদের কথাবার্তা মনোমুগ্ধকর লাগতো এবং শ্রীরামের আসা-যাওয়া খেয়াল করতে ভুলে যেতো, যখন সে সাধারণত চুরি করে নিকটবর্তী সাইকেলের দোকানে গিয়ে একটা বাইসাইকেল ভাড়া করে পেডেলে ভারসাম্য আনতে শিখতো। আবার সেই সমস্ত জনতাকে একত্র করার দায়িত্ব নেওয়ার আকস্মিক দৃশ্য শ্রীরাম কল্পনা করলো: তারা লাশের চারপাশে দাঁড়িয়ে তাদের জমি ও মামলা-মোকদ্দমা নিয়ে বিলাপ করতে পারে। এ ভাবনায় সে ভীত হলো। বললো: ‘আমি কাউকে পরোয়া করি না।’ ‘হ্যাঁ, আমি জানি। আমারও মনে হয় লাশটাকে বেশিক্ষণ রাখা তোমার ঠিক হবে না। বেশি ভাল হয় তাড়াতাড়ি শ্রাদ্ধ করে ফেলা। কিন্তু বৃদ্ধা ভদ্রমহিলা অন্তত এই তৃপ্তি পাক যে তার নাতি তার চিতায় আগুন ধরিয়েছে। এতে তার আত্মা শান্তি পেতে পারে।’ ‘এসব বিষয়ে কী করতে হয় আমি তো জানি না,’ শ্রীরাম বিলাপ করলো। ‘আমি তোমাকে সাহায্য করবো,’ ক্যানি বললো। ‘একটা বিষয়। শ্রাদ্ধ যাত্রায় আমি যেতে পারবো না,’ শ্রীরাম বললো। ‘অন্য বিষয়গুলো তুমি সামলে নিলে আমি শেষে আসতে পারবো।’ ‘পুলিশও এখন নাক গলাবে না। হাজার হলেও তারাও তো মানুষ।’ ক্যানি বললো। শ্রীরাম বাড়িতে গিয়ে তার ঠাকুরমাকে আরেকবার দেখে নিলো। যে দুজন রাত জাগছিলো তারা ঘুমিয়ে পড়েছে। হাত মেঝেতে রেখে কুঁজো অবস্থায় কোঁকড়া হয়ে লাশটির পাশে ছিলো, ‘ঠাকুরমার চেয়ে ওদেরকে বেশি মরা দেখাচ্ছে,’ শ্রীরাম ভাবলো। কোথায় যেন একটা মোরগ ডাকলো। শ্রীরাম তার পিছনের দরজাটি আলগোছে বন্ধ করে বেরিয়ে পড়লো। এদিকে ক্যানি দোকানে তালা মেরে ফিরে আসলো। ‘তার দায়িত্ব তোমার উপর,’ শ্রীরাম বললো। ‘আটটায় ওখানে থাকবে? সব কিছু সুন্দরভাবে করো। খরচ নিয়ে ভেবো না।’ ‘হ্যাঁ, আমি জানি। আমার ঋণ সব সময় ফেরত পাবো। তোমার অ্যাকাউন্টের বিস্তারিত আমি রেখে দিয়েছি। এক আনা নিয়েও তোমার সন্দেহ থাকা উচিৎ নয়। মাঝে মাঝে ডাক্তারকে যা শোধ করে আসছি তাও অ্যাকাউন্টে রেখে দিয়েছি। তুমি কি নিশ্চিত তার আত্মীয়-স্বজন পরে আমাদের সাথে রাগ করবেন না?’ ‘তারা রাগলো না খুশি হলো সেটা তুমি ভাবছো কেন? তাদের সাথে আমাদের কী সম্পর্ক? এক দল অথর্ব গেঁয়ো ভূত,’ কণ্ঠে কিছুটা অযথা তিক্ততা নিয়ে শ্রীরাম বললো। প্রায় আটটার সময় সরায্যু নদীর ওপারে শ্মশানে শ্রীরাম উপস্থিত হলো। আগের দিন যে এক জোড়া চিতা জ্বালানো হয়েছিলো তা এখনো ধিকিধিকি জ্বলছে। এখানে সেখানে বাঁশ ও লাশের কাপড়ের টুকরা ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে। একটা শ্রাদ্ধ যাত্রা নালাপা কুঞ্জ পার হচ্ছিলো। খাঁটলিটা ছিলো ফুলে সজ্জিত, আর কিছু লোক সাদা শার্ট ও আঙ্গুলে আঙটি পরে লাশটিকে কাঁধে নিয়ে যাচ্ছিলো। ‘অবশ্যই পরম আত্মীয় হবে,’ সে ভাবলো। ‘ওরা ভার বইছে। কিন্তু বেচারি ঠাকুরমাকে বয়ে নেওয়ার কেউ নেই।’ গ্রামের সেইসব আত্মীয়দের ভেবে আবার সে রাগান্বিত বোধ করলো। চরম গরম ছিলো যদিও তখনও সকাল আটটা বাজেনি। ‘এ জায়গাটা খুব গরম,’ সে ভাবলো। গরুর গাড়ি নদী পার হচ্ছিলো, গ্রামবাসীরা শহরে যাওয়ার পথে তাদের মাথায় ঝুঁড়ি নিয়ে অবিরাম বকবক করছিলো। নদীতে স্নান করতে আসা লোকদের সে লক্ষ করলো। চোখে যা যা দেখলো তা তার মনে নীরস সুর বাজালো। এখন তার মূল কাজ হলো ঠাকুরমার আগমনের জন্য অপেক্ষা করা। ওরা এতক্ষণ কথা বলছে কেন? হয়তো পুরোহিতরা লাশটা ধরেছে যাতে করে তারা শ্রাদ্ধ মন্ত্র পাঠ করার জন্য বেশি করে টাকা পায়। কিংবা পুলিশ কি শ্রাদ্ধ যাত্রা আটকাতে পারে? অদ্ভূত একটা ভয় তাকে কিছুক্ষণ পেয়ে বসলো পাছে পুলিশ অসদাচরণ সন্দেহে লাশটা ময়না তদন্তের জন্য আটকে রাখে। ঘনিষ্ট আত্মীয়-স্বজনের বয়ে আনা আরেকটা আদুরে লাশ গেট দিয়ে এখন ভেতরে এনে মাটিতে রাখা হলো। তারা আনুষ্ঠানিক অনেক কর্মকাণ্ড সারছিলো...। ঠাকুরমার চিতাও ছোট একটা বেদীতে শুকনো গোবর দিয়ে নির্মিত হচ্ছিলো: আর সব আয়োজন দেখাশুনা করছিলো ক্যানির দোকানের সহকারি যে জ্বালানি সরবরাহকারীদের সাথে দর কষাকষি করছিলো এবং শ্মশান সহযোগীদের এটা সেটা আদেশ করছিলো। তারা তার কথা প্রফুল্ল মেজাজে শুনলো। এতে শ্রীরাম অবাক হয়ে ভাবলো কেন তারা তার কথা শুনছিলো। ‘কোনো কোনো মানুষের রক্তকে সব ধরণের মানুষই সম্মান করে,’ ধনীরা তাদের হাতে লাশ নিয়ে যে আধিখ্যতা দেখাচ্ছিলো তাতে কিছুটা ঈর্ষান্বিত হয়ে শ্রীরাম ভাবলো। আগুনের গোলা হাতে ক্যানির নেতৃত্বে দুজন প্রতিবেশি, তহবিল অফিসের ম্যানেজার এবং দুজন পুরোহিতসহ চারজন ভয়ানক মানবেতর পেশাদার বাহক বাঁশের চিতায় করে ঠাকুরমাকে পৌঁছে দিলো। যাত্রায় মোলাকাত করার জন্য শ্রীরাম ছোট কাঠের দরজার প্রবেশপথে ছুটে গেলো। ক্যানি প্রথম এগিয়ে এলো। আগুনের গোলাটা শ্রীরামকে ধরতে দিয়ে সে বললো, ‘আসলে এটা বহন করা তোমারই কর্তব্য।’ শ্রীরাম দায়িত্বটা নিলো। ঠাকুরমার মুখখানি অনাবৃত হয়ে সূর্যের মুখ করে ছিলো। এটা দেখে শ্রীরাম নতুন করে দুঃখ-বেদনা অনুভব করলো। খাঁটুলিটা মাটিতে রাখা হলো। ‘শ্রীরাম, তাড়াতাড়ি নদীতে স্নান করে ভেজা কাপড়ে চলে আসো। এতটুকু বিচার-বিবেচনার অধিকার অন্তত তার আছে।’ কথাগুলো বললেন পরিবারের বৃদ্ধ পুরোহিত। শ্রীরাম অনুধাবন করলো যে সে এখনো পাইকারি চাল ব্যবসায়ীর পোশাকে আছে, আর এতে হাস্যকর বোধ করলো। শ্রীরামের যতদূর মনে পড়ে বৃদ্ধ পুরোহিত তার প্রথম জন্মদিন মহাসমারোহে উদযাপনসহ ঘরোয়া উৎসব-অনুষ্ঠানাদি পরিচালনা করতো। বৃদ্ধ লোকটি ঠাকুরমার কয়েক বছর বড়, কিন্তু চিকন হলেও উল্লেখ করার মতো বেশ বলিষ্ঠ ও সতর্ক ছিলো। চোখদুটো ছিলো সবুজাভ ও নাক ছিলো বাঁকানো, আর অনুষ্ঠানিদির টাকার প্রতি ছিলো তার লোভ । তিনি শ্রীরামকে জিজ্ঞেস করলেন, ‘তোমার কাছে কি দু’টাকার মুদ্রা হবে?’ শ্রীরাম উত্তর হাতড়াতে গেলে সদা-সতর্ক সেই ক্যানি ক্রুদ্ধ হয়ে তার উপর চড়াও হলো, ‘আপনি সেটা জিজ্ঞেস করছেন কেন? সব কিছুর জন্য আপনাকে টাকার একটা অঙ্ক দিতে আমরা চুক্তিবদ্ধ হয়নি?’ লাশের পাশে উবু হয়ে বসা পুরোহিত ঘুরে বললো, ‘কে বলেছে এর মধ্যে সে অঙ্ক আছে? এটা তো কখনোই ওর মধ্যে যেতে পারে না। এটা আলাদা হিসাব। আমাদের বড়রা আদেশ জারি করেছিলো যে নিকটতম ও প্রিয়তম মানুষের কাছ থেকে ‘প্রিয় বিদেহী ’র বুকে দু’টি রৌপ্য মুদ্রা থাকা উচিৎ। বলা হয়ে থাকে এতে পরপারে আত্মার যাত্রা সহজ হয়। শাস্ত্রে যা বলা আছে আমি শুধু তা-ই বলছি। আমাদের পূর্বপুরুষরা জানতেন আমাদের জন্য সবচেয়ে কী ভাল ছিলো, আমি মুখপাত্র মাত্র।’ ‘আর মুদ্রাগুলোর কী হয়েছে?’ তহবিল অফিসের ম্যানেজার জিজ্ঞেস করলেন। পুরোহিত প্রশ্নটি উপেক্ষা করার ভান করলেন, কিন্তু ক্যানি বললো, ‘অন্যান্য মুদ্রার মতোই সেগুলো পুরোহিতের টাকার বাক্সে গেছে।’ ‘জ্বী, গেছে। আপনারা কি প্রত্যাশা করেন যে আত্মাটা রৌপ্য বহন করে নিয়ে যাক? আপনাদের সঠিক আলোকে এটা দেখতে হবে, শুধু এর দার্শনিক অর্থটাকেই আপনাদের গ্রহণ করতে হবে। এ ধরাধাম থেকে আমরা কিছুই নিয়ে যাই না,’ এই বলে পুরোহিত সংস্কৃত একটা পংক্তি আওড়ালো। হঠাৎ করে শ্মশানের অপর প্রান্তে তার নজর গেলো যেখানে ধনী লোকগুলো তাদের শ্রাদ্ধের কাজ-কর্ম পরিচালনা করছিলো। ‘ঐ যে দেখেন। ওনারা খুবই নিবেদিত এবং শুদ্ধ। কোনো আচারকে ওরা বাদ দিচ্ছে না।’ ‘আমরাও কোনোকিছু বাদ রাখছি না,’ ক্রুদ্ধ হয়ে ক্যানি বললো। তার কথার সুরে পুরোহিত ভয় পেয়ে গেলো, আর বিড়বিড় করে বললো, ‘মনে করবেন না যেন আমি টাকার পেছনে ছুটছি: কয়েক দশক ধরে আমার চেনা এক মহান আত্মাকে সন্তুষ্ট করতে আমি শুধু এসব করছি।’ শ্রীরামের দিকে তাকিয়ে বললো, ‘এখন যাও, তাড়াতাড়ি করে স্নান করে আসো। স্নান না করলে কোনোকিছুই শুরু করা যাবে না।’ একটুখানি থেমে আবার বললেন, ‘ওখানে একজন নাপিতকে পাবে। তোমার গোঁফ ও মাথার উপরটা কামিয়ে নিতে হবে। নইলে তা নিয়মের ব্যত্যয় হবে। শাস্ত্রে বলা আছে...।’ ‘মাথাও কামাবো না গোঁফও কামাবো না,’ শ্রীরাম জোরালোভাবে বললো। ‘ঠিক আছে, ’ পুরোহিত বললো। ‘শাস্ত্রে যা বলা আছে তা বলে দেওয়া আমার কর্তব্য, আর সেটা মানবে কি কোনোভাবে সংশোধন করবে সেটা তোমার ব্যাপার। অবশ্য আধুনিক জীবনে সব নিয়ম মানা কঠিন, আর লোকজন নিয়মের সাথে খাপ খাইয়ে নেয়। এমনও লোক আছে যারা আজকাল ইউরোপিয়ান টুপি পরে তাদের শ্রাদ্ধ ক্রিয়া সাধন করে। এ ব্যাপারে কার কী করার আছে? “যা ঘটে তা মেনে চলাই জ্ঞানীর কাজ,” শাস্ত্রে বলা আছে, আর আমরা সে বিধিনিষেধের কাছে মাথা নত করি।’ শ্রীরাম এখন নদীতে স্নান সেরে ফিরলো, মাথার লেপটে যাওয়া চুলগুলো থেকে চুয়ে চুয়ে পানি ঝরছিলো এবং পরনের কাপড় শরীরের সাথে লেগে গিয়েছিলো। তারা এখন মৃতদেহটি চিতায় শুইয়ে দিলো। দূরের চিতাটি ইতোমধ্যে জ্বলছিলো এবং দলের লোকগুলি শ্মশান ত্যাগ করছিলো। ‘ওরা খুবই বাস্তববাদী,’ পুরোহিত বললো। ওরা যা করেছিলো তার সবই সে প্রশংসা করলো মনে হলো। শ্রীরাম আত্মসম্মানে আঘাত বোধ করলো, আর ক্যানি বললো, ‘অযথা কথা বলতে থাকবেন না।’ চিতা জ্বালানোর আগের আচার আরম্ভ হলো। বৃদ্ধা ভদ্রমহিলাকে গোবর জ্বালানীর উপর সোজা হয়ে শুয়ে রাখা হলো। শ্রীরামের হাতে ছোট একটা পাত্র দিয়ে পুরোহিত তাতে দুধ ঢেলে মৃত দেহটির ঠোঁটে দিতে বললো। শ্রীরাম দুধ ঢেলে কিছু মন্ত্র আওড়ালো এবং শেষে ঠাকুরমার বুকে আগুনটা ফেলে দিলো, যা আসলে জ্বালানীর নিচে ফেলেছিলো। আগুনটা ধিক ধিক করে জ্বলে পট পট শব্দ করলো। ‘এখন তার সব শেষ,’ শ্রীরাম বললো। তহবিল অফিসের ম্যানেজার হঠাৎ চিৎকার করে বললো, ‘ঐ যে দেখেন, দেখেন।’ তিনি উত্তেজিত হলেন। তিনি যেখানটা নির্দেশ করলেন তারা সেখানটায় তাকালো। ভদ্র মহিলার বাম পায়ের বড় আঙ্গুলটি নড়তে দেখা গেলো। ‘আগুনটা টেনে বের করো, আগুনটা টেনে বের করো...।’ কেউ একজন হাত ভেতরে ঠেলে দিয়ে জ্বলন্ত টুকরোটা ছিনিয়ে নিয়ে ফেলে দিলো। বৃদ্ধা মহিলার শাড়ির এক পাশ এর মধ্যে পুড়ে যাচ্ছিলো। শ্রীরাম এর উপর এক বালতি পানি নিক্ষেপ করে আগুনটা নিভিয়ে দিলো। এখন আগুন নিভে গেলে তারা চারপাশে দাঁড়িয়ে পর্যবেক্ষণ করলো। আঙ্গুলটা নড়ছিলো। ‘সে মরেনি, তাকে বের করো,’ শ্রীরাম চিৎকার করে বললো। ‘এমন কথা আমি আগে কখনো শুনিনি, আপনারা তা করতে পারেন না,’ পুরোহিত চেঁচিয়ে বললো। মনে হয় মানুষ হঠাৎ করে তাদের সব কাণ্ডজ্ঞান হারিয়ে ফেলেছে। ‘ঠাকুরমাকে আমরা জ্যান্ত পুড়িয়ে মারি আপনি সেটাই চান, তাই না? আমাদের পথ থেকে সরে দাঁড়ান, পুরোহিত,’ শ্রীরাম চিৎকার করে বললো। জ্বালানীর স্তুপটায় লাথি মেরে দেহটি তুলে আবার মাটিতে নেমে রাখলো সে। ‘আমি জানতাম কোথায় যেন একটা গরমিল ছিলো। জানতাম ঠাকুরমা মরবে না,’ শ্রীরাম বললো। তার মুখে জল ছিটিয়ে দিয়ে গলায় জোর করে কিছু দুধ দিলো এবং মুখে বাতাস করলো। পুরোহিত শোকার্ত অভিব্যক্তি নিয়ে এক পাশে দাঁড়িয়ে রইলো। ক্যানি এতই হতভম্ব হলো যে সে কথাই বলতে পারলো না বলে মনে হলো। দোকানের সহকারি চারদিকে দৌড়ে দৌড়ে আনন্দের সংবাদটা ঘোষণা করছিলো, আর মানুষ জড়ো করছিলো। তহবিল অফিসের ম্যানেজার চেঁচিয়ে বললেন, ‘চলেন আর সময় নষ্ট না করি। আমি ডাক্তার ডেকে নিয়ে আসছি।’ তিনি শহরের দিকে ছুটতে লাগলেন। ক্যানি চিৎকার করে বললো, ‘ওহ্ , আজকাল আবার কীসের ডাক্তার! তারা তো জানেও না কেউ বেঁচে আছে না মরে গেছে! আমরা সময়মতো খেয়াল না করলে... ওহ্ , কীসের ডাক্তার।’ তাদের সেবা-শুশ্রƒষায় আঙ্গুলটার নড়াচড়া ক্রমশ বিস্তার লাভ করলো। প্রথমে পায়ের সব আঙ্গুল তারপর পা, তারপর হাতের পুনরুজ্জীবিত হওয়ার লক্ষণ দেখা গেলো। বৃদ্ধা ভদ্র মহিলা একটু একটু করে জীবন ফিরে পাচ্ছিলো বলে মনে হলো। চোখদুটো এখনো বন্ধ। শ্রীরাম বিড়বিড় করে বললো, ‘ঠাকুরমা, ঠাকুরমা, চোখ খোলো। এই তো আমি এখানে।’ এ সময় সব রাজনীতি, সব বিবাদ ও যুদ্ধ, ব্রিটেন, এমনকি ভারতী- সব বিস্মৃত হলো। ‘ওঠো ঠাকুরমা, তুমি একদম ঠিক আছো।’ এখন ঠাকুরমার হৃদপিণ্ড ধুক ধুক করতে লাগলো, শ্বাস ক্রিয়া ফিরে এলো ক্ষীণভাবে। শ্রীরাম বিশাল স্বস্তির কান্না কাঁদলো। দোকান সহকারিকে ডেকে বললো, ‘আমার ঠাকুরমা মরবে না, সে মরেনি। ভগবান তাকে আশীর্বাদ করুন।’ ক্যানিকে হাত ধরে টেনে বললো, ‘ক্যানি, ঠাকুরমা বেঁচে আছে।’ এক হাতে ঠাকুরমার সেবা-শুশ্রƒষা করলো এবং আরেক হাত ক্যানির কাঁধ জড়িয়ে ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদলো। তার মুখখানি অশ্র“তে ভিজে গেলো। ক্যানি তার পিঠে হাত বুলিয়ে দিয়ে বললো, ‘না, কেঁদো না। মনে সাহস রাখো। তোমার ভেঙ্গে পড়লে তো চলবে না। তিনি চোখ খুলতে পারেন, আর তখন তাকে অবশ্যই সুখি মুখ দেখতে হবে।’ দূরে পুরানো একটা গাড়ির ঘট ঘট শব্দ শোনা গেলো। সবাই চিৎকার করলো, ‘ডাক্তারের গাড়ি।’ নড়বড়ে হুড সহ ছোট্ট গাড়িটা এখন নালাপ্পা কুঞ্জের মোড়ে বালু ও নুড়ির উপর দিয়ে শ্মশানের দক্ষিণ দরজাগামী এবড়ো থেবড়ো বালুময় পথ দিয়ে আসছে। ডাক্তার ছোট-খাট একজন মানুষ। পরনে ছিলো বড় সাদা ওভারল, আইনস্টাইনের মতো সামান্য কিছু চুলের ক্রপ কাট; ছোট একজন মানুষ যার পাশে সবাইকে টাওয়ারের মতো লাগতো। তিনি গাড়ি থেকে লাফ দিয়ে বের হয়ে তহবিল অফিসের ম্যানেজারকে অনুসরণ করলেন। ‘এ কি সত্যি, এ কি সত্যি?’ ডাক্তার সামনে ছুটে গিয়ে চিৎকার করে বললেন। হঠাৎ থেমে বললেন, ‘কেউ গিয়ে গাড়ি থেকে ঐ ব্যাগটা নিয়ে আসেন তো।’ এখন বৃদ্ধা ভদ্রমহিলার পাশে হাঁটু গেড়ে বসে তার কবজি হাতে নিয়ে নিজের ঘড়িটা টেনে বের করলেন এবং নিজের আঙ্গুলগুলো তার নাসারন্ধ্রের নিচে ধরে রেখে ক্যানিকে হেসে বললেন, ‘হ্যাঁ, তিনি তো মরেননি।’ ‘ওহ্, ডাক্তার, কেউ মরে গেছে না বেঁচে আছে তাও আপনি ঠিকঠাক বলতে পারেন না?’ ক্যানি জিজ্ঞেস করলো। ‘এখন ওসব কথা কেন? তিনি যে পরপার থেকে ফিরে এসেছেন চলেন সেজন্য আমরা খুশি থাকি।’ ডাক্তার গভীরভাবে ভাবলেন। তার অভিজ্ঞতায় এটাই এ ধরণের প্রথম ঘটনা। আগে তিনি শুধু একমুখী যান সম্পর্কে জানতেন। চিন্তাপূর্ণভাবে চিবুকে ঘষা দিলেন। ‘উনি কেমন আছেন, ডাক্তার?’ ক্যানি জিজ্ঞেস করলো। ‘ওনার নাড়ি তো ভাল। ঠিক আছেন। ওনার বিশ্রাম ও আরোগ্য লাভের প্রয়োজন।’ ব্যাগ থেকে কিছু জিনিস বের করলেন। একটা সিরিঞ্জ সূঁচ জীবাণুমুক্ত করে একটা শিশি তুলে নিলেন এবং ঠাকুরমার হাতের সামনের দিকটায় ইনজেকশন দিলেন। ঠাকুরমা সূঁচের স্পর্শে একটু নড়ে হালকা গোঙালেন। ডাক্তার তার দিকে প্রশংসাভরে তাকালেন। ‘হ্যাঁ, এ রকম খেয়ালী ঘটনা তো হয়ে থাকে। কেন বা কীভাবে হয় তা আমরা বলতে পারি না। গত রাতে তিনি বাস্তবেই মৃত ছিলেন। আমি জানি না। আত্মা, কর্ম এবং এসবে কারো বিশ্বাস স্থাপন করার জন্য এই যথেষ্ট।’ ডাক্তার তার দিকে তাকিয়ে ঠোঁট কামড়ালেন। ‘বেশ বছর আগে এক মেডিক্যাল সাময়িকীতে এ রকম একটা ঘটনা পড়েছিলাম কিন্তু কখনো ভাবিনি সেটা আমি স্বচক্ষে দেখবো।’ ঠাকুরমা একটু একটু করে পুনরূজ্জীবিত হয়ে উঠছিলেন। শ্বাস-প্রশ্বাস স্বাভাবিক হচ্ছিলো। ডাক্তার বললেন, ‘জ্ঞান পুরোপুরি ফিরে এলে তাকে এখানে রাখা ঠিক হবে না। অবশ্যই সরিয়ে নিতে হবে। তাকে বাড়ি ফিরে নিয়ে যাচ্ছেন না কেন? আমার গাড়িতে নেন।’ পুরোহিত মাঝখান থেকে বললো, ‘আপনি তা করতে বলছেন কেন? যাকে এখানে একবার বয়ে নিয়ে আসা হয়েছে সে কখনো আর শহরে যেতে পারে না। আপনি জানেন না এতে... এতে...।’ ‘কী হবে?’ ‘হবে! গোটা শহর আগুন বা প্লেগে ছাড়খাড় হয়ে যাবে। এটা খুবই অশুভ। যা খুশি করেন, কিন্তু উনি শহরে ফিরে যেতে পারেন না।’ এ দৃষ্টিকোণে অনেক সমর্থন মিললো। খবরটা শহরে ছড়িয়ে গেলো। লোকজন শ্মশানে জড়ো হতে লাগলো। যারা এলো তাদের সবাই বললো, ‘এ তো মস্ত বড় সমস্যা। ওনাকে নিয়ে আপনারা কী করতে যাচ্ছেন?’ ‘এ মত মেনে তাকে নদী তীরে ছোট পরিত্যক্ত এক ভবনে নিয়ে যাওয়া হলো, যে জায়গাটা এক সময় টোল তোলার স্টেশন ফটক হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছিলো, আর নদীটা যেহেতু শহর এবং ঠাকুরমার মাঝখানে ছিলো, সেহেতু তিনি শহরের সীমানার বাইরে ছিলেন। টোল অফিসে তাকে রেখে ডাক্তারের সেবা-শুশ্রƒষা দেয়া হলো। ক্যানি, তহবিল অফিসের ম্যানেজার, শ্রীরাম, বৃদ্ধ বাঁকা নাকওয়ালা পুরোহিত, দুজন শোকার্ত মহিলা যারা রাত জেগেছিলো তারা এবং নিজেকে ঘিরেই তার জগৎ গুঞ্জরিত হলো। পুরাতন ভবনটির বিছানায় শুয়ে তিনি খাওয়া-দাওয়া ও তাদের সেবা-শুশ্রƒষা লাভ করলেন। ডাক্তারের ছোট্ট গাড়িটা দিনে ছয়বার আসা-যাওয়া করতো এবং ক্যানি এখানকার কাজকর্ম করতে গিয়ে তার দোকানটা বস্তুত পরিত্যাগই করলো। অলৌকিক ঘটনাটি প্রত্যক্ষ করতে বিশাল জনতা হাজির হতে লাগলো। ঠাকুরমার কিছু ঘনিষ্ট আত্মীয় যারা তাকে অনেক বছর ধরে দেখেননি তারা এসে কান্নাকাটি করে বললো, ‘ওহ্, দিদি, তোমাকে দেখে যে কী ভাল লাগছে! কেউ আমাদেরকে কোনো খবর দেয়নি যে তুমি মরে গেছো।’ ‘খবর পাঠানো হয়নি কারণ পাঠানোর মতো কিছু ছিলো না।’ ‘কিন্তু কাছের কোনো আত্মীয় মারা গেলে, কি... নয়?’ ‘কিন্তু তিনি তো মারা যাননি, তো খবর পাঠানো কেন?’ ‘আপনি কী করে জানতেন যে মারা যায়নি?’ আত্মীয়রা জিজ্ঞেস করলো, আর কথোপকথন এভাবে চলতে চলতে বেশ খানিকটা বিভ্রান্তিকর মোড় নিলো। এতে শ্রীরামের ভয় হলো যে এ ভীড় ও প্রচারণা শেষ পর্যন্ত তাকে বিপদে ফেলে দেবে। নিজেকে সে এসব থেকে দূরে রাখতে চেষ্টা করলো। অনেক বেশি লোকজন পোঁছালে সে ভবনটির পেছনে চলে গেলো। অন্যদিকে ক্যানি ও অন্যরা দর্শনার্থীদের সামলে নিলো। সে দূর থেকে লোকজনকে বলাবলি করতে শুনলো, ‘ওনার সেই নাতিটা কোথায়?’ ‘ওহ্, সে দুঃসাহসী হয়তো বার্মায় আছে,’ ক্যানি বললো। কিন্তু এর কিছুতেই কোনো কাজ হলো না। সাধারণ পোশাকে এক পুলিশ পরিদর্শক ও দুজন কনস্টেবল তৃতীয় দিন বিকেলে এলো যখন শ্রীরাম তহবিল অফিসের ম্যানেজারের পাত্রে আনা খাবার ঠাকুরমাকে খাইয়ে ও নিজে খেয়ে টোল ফটকের ভবনটির পেছনে একটা গাছের ছায়ায় ঘুমাচ্ছিলো। ঠাকুরমা ও তার পরিচারিকারা শান্তিপূর্ণভাবে ঘুমাচ্ছিলো। পরিদর্শক শ্রীরামের দিকে তাকিয়ে বললো, ‘ওঠো।’ ‘কেন?’ শ্রীরাম উঠে জিজ্ঞেস করলো। ‘কী চান?’ ‘আপনাকে বন্দী করা হলো,’ পরিদর্শক বললো। ‘অনেক দিন ধরে আপনাকে খুঁজে বেড়াচ্ছি।’ ‘পুরস্কারটা কে পাবে?’ বেশ সংশয় নিয়ে শ্রীরাম জিজ্ঞেস করলো। পরিদর্শক কোনো উত্তর দিলো না। বললো, ‘যে বিশেষ উপলক্ষ আপনাকে এখানে এনেছে আমরা তা জানি, আর আমরা কোনো গোলমাল করতে চাই না যদি আপনি না করেন। সে জন্য আমাদের জীপটা ওখানটায় রেখে দিয়েছি। এতে আমার আরো কিছু লোক আছে। প্রস্তুত হলেই আপনি আমাদের সাথে আসতে পারেন। বেশি সময় নেবেন না।’ শ্রীরাম বললো, ‘জ্বী, আমাকে একটু সময় দিন।’ ‘আমার কাছে অস্ত্র আছে এবং আমি গুলি করবো যদি পালাতে চেষ্টা করেন,’ পরিদর্শক বললো। শ্রীরাম ঠাকুরমাকে এক নজর দেখতে গেলো। সে তাকে বসে থাকতে ও তার কাছে দুজনের সাথে কথা বলতে দেখলো। যে মুহূর্তে তিনি শ্রীরামকে দেখলেন সে মুহূর্তে তিনি কেঁদে ফেললেন, ‘ওহ্, বাছা, তুমি কখন ফিরে এসেছো? ওরা আমাকে বললো যে তুমি এখানে আছো, কিন্তু গোঁফসহ। তুমি কী জন্য গোঁফ রাখলে, সোনা? ওটা ফেলে দাও, ওটাসহ আমার সামনে এসো না, অন্য যে কোনো কিছু তুমি করতে পারো।’ ‘হ্যাঁ, ঠাকুরমা,’ অনুগত হয়ে সে বললো। তার বৃদ্ধ আত্মাকে পুররুজ্জীবিত হতে দেখে সে খুব খুশি হলো। কেউ সন্দেহ করতে পারলো না যে ঠাকুরমা কথা বলছিলো। তার কথায় যেন সেই আসল সুর ছিলো। তার ব্যক্তিত্ব পরপার থেকে অক্ষত অবস্থায় ফিরে এসেছে। শিয়রে বসে ঠাকুরমার হাতের বিভিন্ন জায়গায় পরশ বুলিয়ে দিলো সে। ঠাকুরমা তার দিকে নিবিড় দৃষ্টিতে তাকিয়ে বললো, ‘তুমি ছন্নছাড়া হয়ে গেছো, এ ব্যাপারে কোনো সন্দেহ নেই।’ অত্যন্ত দুঃখের সাথে মাথা নেড়ে আবার বললেন, ‘আমি জানি না কী তোমাকে ঐ লোকগুলোর সাথে মিশতে প্ররোচিত করেছে; আমি তো তোমাকে সম্মানীয় একজন মানুষ হিসেবে গড়ে তুলতে চেষ্টা করেছিলাম, কিন্তু তুমি যদি বি. এ. পরীক্ষা দিতে না গিয়ে থাকো, সেটা আমার দোষ না। এ ব্যাপারে কেউ আমাকে কোনোভাবে দোষারোপ করতে পারবে না। কিন্তু লোকে তোমার সমন্ধে যে সব বলে, তা কি সত্যি?’ শ্রীরাম চিন্তা করে ধীরে ধীরে উত্তর দিলো, ‘ তুমি যা শোনো তার একটা কথাও বিশ্বাস করো না। মনে রেখো মানুষ মিথ্যা বলে।’ খুশির হাসিতে ঠাকুরমার মুখে ভাঁজ পড়লো। ‘যত্তোসব কটূভাষী,’ তিনি চিৎকার করে বললেন। ‘যারা কটূ কথা বলে, কুচিন্তা করে, তোমার নামে কুৎসা রটায়, কিংবা তোমাকে বিপথগামী করে, কিংবা প্ররোচিত করে, তারা সবাই তোমার রাস্তা থেকে দূরে সরে যাক...।’ ঠিক সেই মুহূর্তে শ্রীরামের একটু সন্দেহ জাগলো যে বৃদ্ধা ভদ্রমহিলা ভারতীকে বোঝাতে পারে। সে তার মনোযোগ ঘোরানোর চেষ্টা করলো। ‘বেশি কথা বলো না, ঠাকুরমা, শুয়ে পড়ো।’ ‘তা কেন করবো? আমার তো কিছু হয়নি। ঐ ডাক্তারকে বিশ্বাস করো! আমার সামনে আসুক সে। তার সমন্ধে আমি যা ভাবি তা তাকে বলবো। সে তার মতো করে চললে আমাকে জ্যান্ত পুড়িয়ে মারতো!’ ঠাকুরমা গম্ভীর হাসি হাসলেন। এখন তার না দেওয়া অভিশাপগুলোর কথা মনে পড়লো যেগুলো তিনি অন্য কাউকে দিতে চেয়েছিলেন। ‘যে-ই তোমাকে দূরে সরিয়ে নিক না কেন, সে পুরুষ হোক বা নারী হোক বা যা-ই হোক, সে ধ্বংস হয়ে যাক আর নিকৃষ্টতম নরকে ভুগুক!’ অভিশাপ উচ্চারণ করার পর তিনি সুখ ও স্বস্তি বোধ করলেন। শ্রীরাম বাইরে অপেক্ষমান পুলিশের কথা ভাবলো এবং বললো, ‘উত্তেজিত হয়ো না ঠাকুরমা, তোমার বেশি কথা বলা ঠিক হবে না।’ ‘কেন হবে না? আর সেটা কে বলে?’ তিনি জিজ্ঞেস করলেন। ‘আমার যত খুশি কথা বলবো, কেউ আমাকে থামাতে পারবে না।’ এ সময় একজন পুলিশ দরজায় উঁকি মারলো। ঠাকুরমা বললেন, ‘কে?’ এত কর্তৃত্বপরায়ণ হয়ে বললেন যে পুলিশটি সঙ্গে সঙ্গে তার মাথা সরিয়ে নিলো। ‘সে কে?’ ঠাকুরমা জিজ্ঞেস করলেন। ‘কেউ আমার সাথে দেখা করতে এসেছে,’ শ্রীরাম বললো। সে ঠাকুরমার হাতে এত আলতো পরশ বুলিয়ে দিলো যে তিনি এখন ঘুম ঘুম বোধ করলেন। সে তাকে কিছু দুধ দিলো। তিনি বললেন, ‘তোমাকে দেখে আমার আনন্দ হচ্ছে। লক্ষ্মী ছেলে, মানুষ যেন তোমার পথ থেকে বিচ্যূত করতে তোমাকে প্ররোচিত করতে না পারে। আমার সাথে থাকো। আমাকে আর ছেড়ে যেও না।’ বিছানায় গা ছেড়ে শুয়ে পড়তে শ্রীরাম তাকে সাহায্য করলো, আর শীঘ্রই তিনি ঘুমিয়ে গেলেন। এরপর হেঁটে পুলিশ অফিসারের কাছে গিয়ে বললো, ‘চলেন যাই।’ ক্যানি তার পিছু পিছু জীপ পর্যন্ত গেলো। শ্রীরাম বললো, ‘ক্যানি, আমি ফিরে না আসা পর্যন্ত ঠাকুরমাকে দেখে রেখো। জানি না তারা আমাকে কতদিন আটকে রাখবে। সে কেমন থাকে না থাকে আমার সাথে দেখা করে জানাবে। আমার মনে হয় কালেক্টর তোমাকে আমাদের সাথে জেলে দেখা করতে দেবে। জানি না ঠাকুরমার ব্যাপারে তুমি কী করবে।’ সে অবনত মস্তকে কিছুক্ষণ দাঁড়ালো যেন সমস্যাটির কোনো সমাধান নেই। এরপর জীপের দিকে পা বাড়ালো। ক্যানি বললো, ‘চিন্তা করো না। তিনি তো আমাদের মায়ের মতো। আমরা তাকে দেখে রাখবো।’ ৪ কেন্দ্রীয় কারাগারে তাকে ডিটেনশনে রাখা হলো। আরো কয়েকজনের সাথে একটি কক্ষে থাকলো ও সিমেন্টের শক্ত মেঝেতে ঘুমালো। সকাল সাতটায় তারা তাকে জাগালো। এতে সে সবচেয়ে বেশি ক্ষিপ্ত হলো। মাঝে মাঝে তার ইচ্ছে হলো তারা যেন স্বপ্নমধুর অবস্থা থেকে কারাজগতের কঠোর বাস্তবতায় টেনে না নিয়ে যায়। আর তারপর তড়িৎ গতিতে ঘুম থেকে ওঠা ও ফোঁটায় ফোঁটায় পড়া ট্যাপের জলে হাত মুখ ধোয়া এবং পাবলিক টয়লেটে কাজ সারা; এ সব প্রথম প্রথম তার কাছে অস্বস্তি লাগলো। তার প্রার্থনা ছিলো অন্যরা চলে যাওয়া পর্যন্ত তারা যেন তাকে অপেক্ষা করতে দেয়, কিন্তু তা হয় না; প্রহরী তার এবং অন্যদের উপর এসে পড়ে তাদেরকে ঠেলাঠেলি করতো। শ্রীরাম এ ব্যাপারে একবার এ জগতের ঈশ্বরের নিকটবর্তী হতে চেষ্টা করলো যখন তিনি জেলখানা পরিদর্শনে এলেন। জেল সুপার সম্মানের সাথে ঈশ্বরের পিছনে ছিলো, আর অন্য সব কর্মকর্তা তাদের পিছনে পিছনে আসছিলো। ভয়ানক রকমের স্লেট রঙের ব্যারাকে ঘেরা কেন্দ্রীয় চত্বরে পরিদর্শনের জন্য শ্রীরাম একটা লাইনে অপেক্ষা করছিলো; মহামানবটি লাইনের দিকে উদ্ধত দৃষ্টি নিক্ষেপ করে অগ্রসর হচ্ছিলো। তিনি যাওয়ার সময় কারাবন্দীদের একদম স্থির থাকতে ও কোনো কথা না বলতে বা কোনো রকম নড়চড় না করতে বলা হয়েছিলো; যতক্ষণ না তাদের সাথে কথা বলা হয়েছিলো ততক্ষণ তারা কথা বলেনি। কিন্তু মহান দেবতা শ্রীরামের লাইনের কাছে এলে সে সামনে গিয়ে কথা বলার আবেগ সামলাতে পারেনি: ‘স্যার, আমার একটা অভিযোগ ও অনুরোধ আছে।’ সঙ্গে সঙ্গে কিছু লোক তাকে ধরে দূরে নিয়ে গেলো; আর কোনো কিছু না দেখার ভান করে মহামানব চলে গেলেন। তিনি চলে গেলে শ্রীরামকে জেল সুপারের অফিসে তলব করা হলো। গার্ডরা তাকে বাহু ধরে জেল সুপারের টেবিলের সামনে সোজা করে দাঁড় করিয়ে রাখলো। জেল সুপার উপরে তাকিয়ে বললেন: ‘তুমি জেলের শৃঙ্খলা ভঙ্গ করেছো এবং এ জন্য শাস্তি পাবে।’ ‘কী শাস্তি?’ শ্রীরাম জিজ্ঞেস করলো। এক ঘন্টা আগে যে লোকটি নিরীহ কুকুরছানার মতো পরিদর্শকের পিছন পিছন ছুটছিলো তিনি তার পা টেবিলে দ্রুম করে ফেলে চেঁচিয়ে উঠলেন, ‘আমার সাথে ওভাবে কথা বললে তোমাকে বরদাশত করবো না, বুঝেছো?’ শ্রীরাম ভয় পেয়ে গেলো। আশঙ্কা হলো সে উম্মত্ত হয়ে তাকে লাথি দিতে পারে: সেই এখানে হর্তকর্তা আর চাইলে মানুষ হত্যা করার অধিকার তার ছিলো। লোকজন যে রাজতন্ত্র বিলুপ্ত হওয়ার কথা বলে, কিন্তু এখানে তো নিরঙ্কুশ রাজতন্ত্র। এ জগতটা একান্তই তার ছিলো, তার কর্তৃত্বে শাসিত, আর কেউ এ ব্যাপারে কিছু বলতে পারতো না। তাই শ্রীরাম শান্তভাবে বললো, ‘জ্বী, স্যার,’ তার জীবনে এই প্রথম বারই সে শান্ত সুরে কথা বললো। জেল সুপার তার বশ্যতায় সন্তুষ্ট হয়ে জিজ্ঞেস করলেন, ‘তুমি লাইন থেকে বেরিয়ে এলে কেন? তুমি কী বলতে চেয়েছিলে?’ শ্রীরামের মনে হলো সোজা সাপ্টা কথা বলাই ভাল হবে। ‘আমি বলতে চেয়েছিলাম যে টয়লেটে আমাদের প্রাইভেসি রক্ষার জন্য কি কিছু করা যায় না।’ জেল সুপার বালখিল্যসুলভ হাসি হেসে বললেন, ‘তা তুমি ভেবেছিলে যে ঘোড়া ডিঙিয়ে ঘাস খাবে? না?’ ‘তা নয়, স্যার, কিন্তু আগে আমার এমনটা হয়নি তো, এইটুকুই,’ শ্রীরাম বললো। জেল সুপার বললেন, ‘বেশি কথা না বলে বেঁচে গেছো, বুঝলে? তার সাথে কথা বললে তোমাকে শিকল পরানো হতো। মনে রেখো, এ কারাগারে আমরা বিশৃঙ্খলা চাই না, বুঝেছো?’ ‘জ্বী, স্যার,’ এরকম ব্যবহারে পুরো ভেঙে পড়ে শ্রীরাম বললো। এতে জেল সুপার কিছুটা নরম হয়ে বললেন, ‘তোমার যা লাগে আমার কাছে চাইবে।’ ‘জ্বী, স্যার,’ শ্রীরাম দেখতে পেলো যে এটাই হচ্ছে লোকটির সাথে কথা বলার সর্বোত্তম উপায়; একমাত্র কথা যাতে তিনি ক্ষেপেননি। জেল সুপার জিজ্ঞেস করলেন, ‘তুমি কী বলেছিলে আই. জি. কে বলতে চেয়েছিলে?’ ‘আমি টয়লেটের ব্যাপার-স্যাপার নিয়ে বলতে চেয়েছিলাম,’ বারবার বলা ও প্রচারণায় বিরক্ত হয়ে সে বললো। ‘ওহ্, তাই নাকি?’ তিনি বললেন, ‘এই নাও তোমার প্রতিনিধিত্বের জবাব।’ ‘কী, স্যার?’ ‘ইতোমধ্যে টয়লেটের যেসব সুবিধা আছে তার চেয়ে বেশি তুমি পাচ্ছো না, বুঝেছো?’ ‘জ্বী, স্যার,’ প্রাণ ঠাণ্ডা করা কথাটি বললো শ্রীরাম। ‘কিন্তু জানতে পারি কেন?’ গার্ডরা তার বাহুতে চিমটি কেটে তার প্রগলভতা সম্পর্কে সজাগ করে দিলো। কিন্তু জেল সুপার তাতে কিছু মনে করলো বলে বোধ হলো না। তিনি শুধু জবাব দিলেন, ‘অন্য কোনো সময় হলে টু শব্দটি না করে তোমাকে গুলি করে মারা হতো, মনে রেখো। তুমি আমাদের অতিথি নও, বন্দী মাত্র। তুমি কোনো শ্রেণীর বন্দী নও, ভারতীয় প্রতিরক্ষা আইনের অধীনে হেফাজতে থাকা একজন মাত্র, মনে রেখো।’ ‘কিন্তু কোনো বিচার হয়নি। আমাকে কতদিন এখানে থাকতে হবে?’ ‘তোমার মতো এমন মামলায় বিচারের কোনো প্রয়োজন নেই। গোটা দুনিয়া জানে তুমি এখানে কেন আছো।’ ‘আমি তো শুধু আমার কর্তব্য করতে চেষ্টা করছিলাম,’ শ্রীরাম বললো। জেল সুপার টেবিলে লাথি মেরে বললেন, ‘এখানে রাজনীতি নিয়ে তোমাদেরকে আমি কথা বলতে দেবো না।’ ‘রাজনীতি’ শব্দটি তাকে বিঁধেছে মনে হলো। ‘জ্বী, স্যার,’ শ্রীরাম বললো, আর এতে আবারও লোকটির মেজাজ ঠাণ্ডা হলো। কিছুটা ছাড় দিয়ে তিনি বললেন, ‘তুমি গান্ধীর লোকও নও সাধারণ অপরাধীও নও, কিন্তু উভয়ের চেয়ে বেশি বিপদজনক।’ শ্রীরাম বিষয়টিতে নিজে কোনো মত প্রকাশ করতে পারলো না। ‘গান্ধী ’ শব্দটি তার মনে ভারতীর স্মৃতিকে জাগিয়ে দিলো এবং আন্তরিকভাবে কামনা করলো সে যদি তার সাথে পুলিশের কাছে আত্মসমর্পণ করতো। তারা হয়তো শ্রীরামকে সম্মানীয় রাজনৈতিক বন্দী হিসেবে বিবেচনা করতো। ‘ভারতী কোথায়? সে কি কোনোভাবে এ জেলে আছে? যদি তাই হয়, তবে তাকে কি দেখতে পারবো না? সে ভাল আছে তো?’ হাজার প্রশ্ন তার মাথায় গুঞ্জরিত হলো আর দেয়ালের দিকে এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলো। জেল সুপার বললেন, ‘আমার আনন্দ হচ্ছে যে তুমি আমার কথায় পূর্ণ মনোযোগ দিচ্ছো। কিন্তু তোমাকে এক্ষুণি বলছি এ দেয়ালগুলোর মাঝে ঝামেলা পাকিয়ে কোনো লাভ হবে না। কী চিন্তা করছো?’ হঠাৎ করে তিনি বলে বসলেন। ‘ভেবে পাচ্ছিলাম না আমাকে এখানে কতদিন আটকে রাখা হবে। এর মধ্যে কয়েক মাস হয়ে গেলো। মাসের হিসাবও ভুলে গেছি।’ ‘অযথা কোনোকিছুর হিসাব করার দরকার নেই, এতে তোমার কোনো লাভ হবে না। তোমার এখানে ততদিন থাকতে হবে যতদিন সরকার চায় তুমি এখানে থাকো, ব্যস। এখানে বিভিন্ন মেয়াদে সশ্রম কারাদণ্ডে দণ্ডিত তোমার অন্য সতীর্থদের থেকে তোমাকে খুব ভিন্নভাবে না রাখার নির্দেশ আছে আমাদের উপর। ব্যস, মামলা খতম।’ গার্ডরা দুই পা দ্রুত একখানে করে স্যালুট দিয়ে শ্রীরামকে ঘুরিয়ে নিলো। তার যাওয়ার সময় জেল সুপার তার পিছে মন্তব্য ছুঁড়ে দিলো, ‘তোমার যা চাই আমাকে বলবে।’ ‘জ্বী, স্যার।’ ‘ব্যস, মামলা খতম।’ আর গার্ডরা তাকে মার্চ করে নিয়ে চলে গেলো। এরপর দিন গেলো, সপ্তাহ গেলো, মাস গেলো একইভাবে, একদিন আরেকদিনের থেকে তেমন ভিন্ন কিছু নয়। শ্রীরাম নিজের বাড়ির মতো বোধ করতে লাগলো: তার এ অস্তিত্বের মাঝে সে ছোট খাট উত্তেজনার দিকে তাকিয়ে রইলো। জেলের পিছনে খনিতে পাথর ভাঙ্গার জন্য যখন তাকে নিয়ে যাওয়া হলো তখন সে একে পরিবর্তন হিসেবে স্বাগত জানালো: যে শিলাগুলো সে কাটলো সেগুলো তার বসার জায়গার নিচে গরম হয়ে গেলো, রোদে তার শরীর ঝলসে গেলো, যে লোহার হাতুড়ি দিয়ে সে পাথরগুলো ভাঙ্গলো সেটি তার চামড়া ছিলে নিলো, কিন্তু তবুও কাজটা তার ভাল লাগলো কারণ কড়া প্রহরার মধ্যে থাকলেও এতে সে জেলের বাইরে থাকতে পারলো। তার সাথে এক দল লোক ছিলো, নানান ধরণের অপরাধী যারা খুন থেকে শুরু করে দক্ষভাবে পকেটমারার জন্য সাজা পেয়েছিলো। তাদের বেশিরভাগই সাজার মেয়াদ শেষে কী করবে তা-ই পরিকল্পনা করছিলো, কেউ কেউ বারবার ফিরে এসে বাকি জীবনটা এখানে কাটানোর পরিকল্পনা করছিলো। এ রকম রূঢ় সঙ্গ শ্রীরামের ভাল লাগলো না। এরা নরম হাত ও নরম মাথার মানুষটাকে নিয়ে হাসাহাসি করলো। এরা কিছুতেই বুঝতে পারলো না কেন সে পুলিশের ঝামেলার ঝুঁকি নিয়েছিলো তার কারণ এই যে কেউ একজন চেয়েছিলো সে কিছু একটা করুক, এই কারণে নয় যে ট্রেন লাইনচ্যূত করার মতো দূঃসাহসিক কাজ করায় সে লাভের ভাগ পেয়েছিলো। আত্মকেন্দ্রিক রাজনৈতিক জীবনে শ্রীরামের জন্য এটা ছিলো না ঘটা নতুন এক দৃষ্টিভঙ্গি। তার মনে হলো সে নতুন প্রজাতির এক মানুষের সাথে মোকাবেলা করছিলো, দানবের মতো কথা বলছিলো, কিন্তু তারপরও মাঝে মাঝে মানবীয় গুণ দেখা যাচ্ছিলো; এরা উদ্বিগ্ন ছিলো যে অল্প খেয়ে অপুষ্টিতে ভোগা তার উচিৎ নয়; মুখে খাবার না রোচার জন্য এরা তার প্রতি দয়াপরবশ হলো: খাবারটা ছিলো পানি দিয়ে বেশ পাতলা করা ঘোল দিয়ে সিদ্ধ জোয়ারের শক্ত গোলার বানানো। (ঘোলটা সাম্প্রতিককালে যোগ করা হতো কারণ কে যেন এর জন্য আন্দোলন করেছিলো সংবাদ সম্মেলনে ও সভা-সমাবেশে, আর বাটারমিল্কের মধ্যে যা ছিলো তা সাধারণভাবে সব আন্দোলনকারীদের যান্ত্রিক প্রয়োজন মেটাতে যথেষ্ট ছিলো।) খাওয়ার সময় সেইসব ভাল ভাল বিষয়ের কথা ভাবলো যা ঠাকুরমা তার জন্য বানিয়ে দিতো এবং মনে করলো বাড়িতে ঠাকুরমাকে শেষবার দেখতে যাওয়ার সময়ও একজন প্রতিবেশির পাঠানো জিনিস তাকে কীভাবে খেতে দিয়েছিলো। মচমচে ঘিয়ের গন্ধ ভরা ভাতের কথা মনে করে সে বেদনা বোধ করলো; নিজের ভাগেরটা এলুমিনিয়ামের থালায় নিয়ে তাতে কামড় দিয়ে খাওয়ার সুর সে শুনতে পেলো। ঠিক একইভাবে কড়মড় করে খাওয়ায় তার সহবন্দীরা মন্তব্য করলো। ‘তুমি এখনো বাদাম হালুয়ার কথা ভাবো?’ হত্যার সামিল না হয়ে দণ্ডণীয় ঘাতক জিজ্ঞেস করলো। মধ্যদূপুরে খাওয়ার বিরতির সময় তারা পাশাপাশি বসেছিলো। ‘আমি যদি এ জায়গাটা কখনো ছেড়ে যাই, তবে কোণার দোকানে বাদাম হালুয়ার জন্য একশ টাকা খরচ করবো, তুমি কৃষ্ণ ভিলা চেনো, দোকানটা ছোট কিন্তু চমৎকার একটা জায়গা; পরিস্কার কলাপাতায় খাবার দেয়, থালায় নয়। জানো এখানকার ভাপা পিঠা মনে হয় যেন একেবারে হালকা করে তৈরী...।’ এ রকম তুলনায় শ্রীরাম হতবিহ্বল হলো, আর এ তুলনায় তার জুঁই, গোলাপ পাঁপড়ি, নরম মাখন ইত্যাদি উপমার কথা মনে পড়লো। আবেগে গদ গদ হয়ে শ্রীরাম বললো, ‘আর তুমি জানো সেখানে মাগনা চাটনি দেয়, পৃথিবীতে তুমি এ রকম দ্বিতীয়টি আর দেখতে পাবে না। কোণার হোটেলটা তুমি অবশ্যই চিনে থাকবে?’ ‘না,’ তার সঙ্গীটি মাথা নাড়ালো। ‘আমি এসেছি বেলারি থেকে, এ শহর আমার পরিচিত নয়।’ ‘ঐ হোটেলটা আমি চিনি,’ গার্ড তাদের কথাবার্তায় যোগ দিয়ে বললো, ‘ভাল জায়গা, কিন্তু ওখানে খুব কম যাওয়া হয়। এ জায়গা ছেড়ে বাইরে যাওয়ার খুব বেশি সুযোগ আমার নেই।’ ‘তুমি আমাদের মতোই?’ বন্দীদের একজন বললো, আর এ কৌতুকে সবাই মন ভরে হাসলো। খাবার সময়টাই সবচেয়ে ভাল। শ্রীরামের প্রতিবেশি যে একজন বড় জালিয়াত সে তাকে ফিসফিস করে বললো, ‘কাউকে বলো না যেন। আসছে বৃহস্পতিবার খাওয়া-দাওয়া করার মতো ভাল ভাল কিছু জিনিস পাচ্ছি। ওগুলো পাইলে তোমাকে কিছু দেবো।’ ‘তুমি কী পাবে?’ কৌতুহল দমাতে না পেরে শ্রীরাম জিজ্ঞেস করলো। ‘কিছু বাদাই আর কিছু সুস্বাদু মুরগী পোলাও।’ মুরগী উল্লেখ করায় শ্রীরামের বিবমিষা জাগলো। মুখটা বাঁকালো: ‘মুরগী! মুরগী! ওহ! আমি এটা সহ্য করতে পারি না! বিতৃষ্ণায় মুখ বাঁকিয়ে সে বললো। ‘ওসব জিনিস আমি খাই না!’ সে চিৎকার করে বললো। ‘পিঠাও খাই না আমি কারণ সেগুলোতে ডিম থাকে।’ জালিয়াতকারী লোকটি মজা পেলো। হাসিতে গড়িয়ে পড়লো যে পর্যন্ত না গার্ড যে এখন পর্যন্ত বন্ধুত্বপূর্ণ ছিলো সে আপত্তি জানালো: ‘থামুন, আপনারা কোথায় আছেন বলে মনে করেন!’ কেন্দ্রীয় টাওয়ারটার ছায়ায় একটা স্বাগতম ভাব ছিলো। বিকেলটা অবসন্ন হলেও উষ্ণ ছিলো। জেল সুপার তার কোয়ার্টারে বিকেলের ঘুম উপভোগ করতে করতে নাক ডাকতে থাকেন: কোনো কিছুতে আপত্তি জানানোর মতো আসলেই কেউ ছিলো না, আর এ সময়টায় শুধু কারাগারটাকে কিছুক্ষণ কারাগার মনে হলো না এবং মানবিক ও বসবাসযোগ্য পরিবেশ বিরাজ করলো; প্রহরীরা নিজেরাই বন্ধুত্বপূর্ণ ভাব সৃষ্টি করে সব ধরণের কথাবার্তা মানবিক পর্যায়ে চালিয়ে দিলো। এ সময়েই জেলের কঠোর পরিবেশ বজায় রাখা অসম্ভব ছিলো-- এ ছিলো শ্রীরামের কৈশোরে আলবার্ট মিশন স্কুলে মধ্যদূপুর কাটানোর মতো। জালিয়াতকারী লোকটি প্রহরীর কাছে আবেদন জানালো: ‘দয়া করে কিছুক্ষণ আমাদের বিরক্ত করো না। দিনের সব কাজ শেষে মানুষের কিছু বিশ্রাম দরকার হয়। দয়া করে কিছুক্ষণ আমাদেরকে আমাদের মতো থাকতে দাও।’ এরপর শ্রীরামের দিকে মনোযোগ ঘুরিয়ে বললো: ‘আমি জানি পোলাওয়ে তারা বিশুদ্ধতম ঘি ও জায়ফল পাতা এবং দারুচিনি ব্যবহার করবে। তুমি যদি এক মুঠ তুলে নাও, তবে তোমার আঙ্গুল দিয়ে ঘি ফোঁটায় ফোঁটায় পড়বে; এত গুরুপাক খাবার। বলো না যেন তুমি তা খাবে না। তোমাকে অবশ্যই এটা নিতে হবে। এতে তোমার ভাল হবে। একবার চেখে দেখলে প্রতিদিন তুমি এটা চাইবে। এই হচ্ছে এটার সবচেয়ে খারাপ দিক। প্রতিদিন তো এটা এ জায়গায় পাওয়া অসম্ভব, যদিও একবারই আমরা যা কিছু করতে পারি। আমাদের এখানকার বন্ধু এবং তার বন্ধুরা আমরা যা করি তাতে কিছু মনে করবে না। সে জানে সে তার ভাগ পাবে।’ ঘন্টাধ্বনিতে ঘন্টা বাজলো। প্রহরী লাফ দিয়ে উঠে বললো: ‘ওঠেন মার্চ করেন,’ আর জেলের পিছনের খনিতে তাদেরকে নিয়ে গেলো। রাতে শ্রীরামের কক্ষে সঙ্গী ছিলো। কম্বল দিয়ে মোড়ানো সিমেন্টের বিছানায় শোয়ার আগে তারা বসে বসে কথা বললো। করিডোরের সেন্ট্রি চিৎকার করে বললো, ‘চুপ! কথা বলবেন না।’ যে ব্যক্তিটি ঘর ভাঙচুর ও খুন করেছিলো সে একটি স্তুতি সঙ্গিত গাওয়ার দায় ভার নিয়ে অন্য সবাইকে তাতে যোগ দিতে পীড়াপীড়ি করলো। রাম, রাম, সীতা রাম, সুরে সুরে গেয়ে অন্য সবাইকে সমবেত সুরে গাইতে বললো। দার্শনিকভাবে বললো, ‘শুধু এই জিনিসটাই বাস্তব। আপনাদের অবশ্যই জানতে হবে বাস্তব কোনটি আর অবাস্তব কোনটি। আপনাদের অবশ্যই যে বিশ্বে থাকেন তার গতিপ্রকৃতি জানতে হবে। প্রভুর নাম অবিরাম জপতে হবে।’ আর সে প্রভুর নামে ভক্তিমূলক গান শুরু করলো। অন্যরা তা অনুসরণ করলো। তারা যদি থামতো, তবে সে অন্ধকারে চিৎকার করে বললো, ‘এ রুমে আমার সাথে কোন শয়তানের বাচ্চা আছে? তাকে আমি বের করে দেবো।’ শ্রীরাম জিজ্ঞেস না করে পারলো না, ‘তুমি যদি এতই ধার্মিক হয়ে থাকো, তবে বাইরে থেকে তোমার অনুসারীদের পথ দেখালে না কেন?’ ‘কারণ পুলিশ আমাকে সেটা করতে দেয়নি, ব্যস,’ সে বললো। ‘অবশ্যই, পুলিশ না থাকলে আমরা সবাই সুখি মানুষ হতাম,’ কেউ একজন বললো। এরপর তারা আবার গাইতে শুরু করলো। সেন্ট্রি এসে তাদেরকে উঁকি দিয়ে দেখলো। তারা অট্টহাসি হাসলো। সে বিড়বিড় করে কী একটা বলে চলে গেলো। অন্ধকারে নেতা বললো, ‘আমি কাউকে ভয় পাই না, কোনো জেলারকে ভয় পাই না।’ ‘কারণ তুমি অনেক অভিজ্ঞ,’ আরেকজন প্রশংসাসূচকভাবে বললো। ‘অনেক আগেই আমি ঐ চালাঘরে ঝুলতে থাকতাম, কিন্তু জজ বুঝেছিলেন যে আমি খুন করিনি, করতে চেয়েছিলাম। আমি শুধু চেয়েছিলাম ঐ হতভাগা বোকাটার হাড্ডি গুঁড়া করতে।’ ‘কোন হতভাগা বোকার কথা বলছো?’ কৌতুহল দমাতে না পেরে শ্রীরাম জিজ্ঞেস করলো। এখানকার মানুষগুলো যেন নতুন এক প্রজাতির মানুষ। এ পরিবারের সদস্য হিসেবে তাকে হয়তো বাকি জীবনটা কাটাতে হতে পারে। উত্তর এলো: ‘আমি শুধু চেয়েছিলাম সে আমাকে চাবিগুলো দিয়ে দিক যেমনটা অন্য অনেকে করেছে, কিন্তু হঠাৎ করে সে জানালায় দৌড়ে গিয়ে পুলিশের উদ্দেশ্যে চিৎকার করলো, আর আমি পালাতে গেলে সে আমার উপর লাফিয়ে পড়ে আমাকে পাকড়াও করলো। আমার কী করার ছিলো? কিছু একটা করতে হয়েছিলো। ভাবলাম তার পা ভেঙ্গে দেই-- কিন্তু সে আমাকে ঠেলা দিলো, আর তাতে কাজ হলো না। এ লোকগুলো অপ্রীতিকর, খারাপ লাগা জিনিসগুলো করতে আমাদের বাধ্য করে।’ কিছুক্ষণ স্মৃতি চর্বণ করে সে দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললো, ‘এটা করে লাভ হয়নি, তবে ম্যাজিস্ট্রেট বুঝেছিলো, আর জেল ছেড়ে গেলে আমি তার কাছে কিছু ফলমূল, কমলা, কলা, এ রকম কিছু নিয়ে যাবো। চলো সময় নষ্ট না করি।’ অন্যদের যোগ সাধন করিয়ে সে গাইতে শুরু করলো। শ্রীরাম তাদের সাথে রাজনীতি, মহাত্মাজী, অহিংসতা এবং ব্রিটিশ শাসন নিয়ে আলাপ করতে চাইলো। আলাপ করতে শুরু করলো, কিন্তু লোকটি তাকে থামিয়ে বললো, ‘কে শাসন করছে তাতে কার কী এসে যায়? আমরা তো সে জগতের নই। ঐ সব গান্ধী অনুসারীদের আমি জেলে দেখেছি, আর তারা ভাবে তারা সম্মানিত অতিথি! তুমি সাবধানে থাকলে তুমিও সেটা ভোগ করতে পারতে। তারা তোমাকে বাবুর্চি ও পকেট খরচসহ বাংলোতে রাখতো এবং পড়ার জন্য বই ও খাওয়ার জন্য শরবত দিতো।’ তার কথায় শ্রীরামের রক্ত টগবগ করে উঠলো। ‘দেশের জন্য যারা ভুগছে তাদের ব্যাপারে তুমি ওরকম করে কথা বলার স্পর্ধা কোথায় পেলে? তুমি ভুল করছো। একদম ভুল করছো।’ উঠে গিয়ে তাকে মারতে চাইলো সে, কিন্তু তার মনে পড়লো ভারতী তাকে মহাত্মাজীর অহিংস মতের প্রতি বিশ্বাসঘাতকতার কাতারে ফেলবে। হয়তো বলবে, ‘তোমার মুখ আমি আর দেখতে চাই না। এখান থেকে বের হয়ে যাও।’ আর তাই সে শুধু অস্ফুট স্বরে বললো, ‘আমাদের দেশপ্রেমিকদের ব্যাপারে ওরকম গণ্ড মূর্খের মতো কথা বলো না।’ লোকটি গর্জে উঠে বললো, ‘আমার সাথে ও সুরে কথা বলার তুমি কে?’ একটু থেমে জালিয়াতকারী লোকটি তার পাঁজরে গুঁতা দিয়ে বললো, ‘বলো তুমি এর জন্য দুঃখিত। ওকে ক্ষেপিয়ো না। সে খুব শক্তিশালী।’ কক্ষের অপর প্রান্ত থেকে ভারী পদক্ষেপে কাউকে আসতে শুনলো শ্রীরাম। লোকটি শ্রীরামের সামনে দাঁড়িয়ে গর্জে উঠলো: ‘আমি তো বলেছি যে তোমাদের রাজনৈতিক বন্দীরা সত্যিকারের কোনো বন্দী না, বুঝেছো? এ পর্যন্ত দশটা জেলে আমি ছিলাম। তাদের অনেককে আমি দেখেছি। তারা মনে করে তারা তাদের শশুর বাড়িতে থেকে দীপাবলী দেখতে এসেছে। আমি জানি কোন ব্যাপারে আমি কথা বলছি। তুমি আমায় শুধরে দিলে আমি বরদাশত করবো না, শুনছো?’ ‘তোমার সাথে আমি একমত নই, ’ শ্রীরাম স্পর্ধার সাথে বললো। ‘আমি যা করতে চাইনি তা ব্রিটিশ সরকারও আমাকে দিয়ে করাতে পারেনি!’ লোকটি অবজ্ঞা করে বললো: ‘হু, লেখাপড়ার পরিণাম এমনি হয়। তোমায় বলছি তুমি তো কোনো ধরণের আনুগত্য জানো না। মানুষের কখনো স্কুলে যাওয়া ঠিক না। এরা কথা বেশি বলে।’ ‘আমি যদি বাইরে থাকতাম, তবে মহাত্মাজীর সামনে তোমাকে সাষ্টাঙ্গে প্রণাম করাতাম, আর তোমার অপরাধ স্বীাকার করিয়ে নিতাম,’ চরম আবেগে শ্রীরাম বললো। মহাত্মার উল্লেখ করায় লোকটি হাতের তালু ঘষে বললো, ‘এখানে তাঁর নাম টেনে এনো না; সেই মহা সাধু। ‘তিনিও কারাগারে আছেন, মনে হয় তুমি তা জানো, ’ শ্রীরাম বললো। ‘থাকতে পারেন, কিন্তু তাতে তোমার কী? তোমার কি ধারণা যে এখানে থাকার কারণে তুমিও মহাত্মাজী হয়ে গেছো?’ ‘তোমার বিছানায় ফিরে যাও, ভায়া,’ শ্রীরাম আদেশ করলো। ‘কোন ব্যাপারে কথা বলছো তুমি তা জানো না।’ ‘তুমি তো নিজেকে মহাত্মার শিষ্য বলে থাকো, অথচ তুমি তাঁর কাছ থেকে ভাল কিছু পাওনি। আমাদের মাঝে আসার মতো আর কী কাজ আছে? শ্রীরাম বিতৃষ্ণায় বললো, ‘তোমার বিছানায় ফিরে যাও, ভায়া, তোমার সাথে আমি কথা বলবো না।’ দলপতি শ্রীরামকে মারার জন্য বাহুটি এক পাশ থেকে আরেক পাশ দোলালো। শ্রীরাম অন্ধকারে বাতাসের বেগ বুঝতে পারলো, আর মাথাটা নিচে নামালো। লোকটি তখন তার বিছানায় গেলো। লোকটি তার বিছানায় সটান হয়ে শুয়ে লম্বা গোলমালপূর্ণ হাই তোলার পর শুধু শ্রীরাম সুখ ও স্বস্তি বোধ করলো, হাইকে সে গানে গানে প্রলম্বিত করলো যতক্ষণ পর্যন্ত না সেন্ট্রি বারের মধ্য দিয়ে চিৎকার করে বললো, ‘চুপ! একদম চুপ। আর কোনো কথা নয়।’ ** দিনের বেলায় তাকে বিভিন্ন ধরণের কাজ করতে হলো আর কারাগারে ছন্নছাড়া যে বিভিন্ন মানুষ সে দেখলো তা তাকে বিষন্ন ভাব থেকে দূরে রাখলো। কিন্তু তার কক্ষে শেষ বন্দীটি যখন ঘুমিয়ে পড়ে নাক ডাকলো, তখন নিঃসঙ্গতা তাকে হানা দিলো এবং সে অন্তদর্শনের শিকার হলো। ভারতীর সাথে দেখা করার ও কথা বলার বাসনা তাকে পেয়ে বসলো। কোথায় সে? মারা গেছে? অন্য কারো সাথে বিয়ে হয়েছে? নাকি কারাগারে ফাঁসি হয়েছে? তার জানার কোনো উপায় ছিলো না। এ ধরণের উদ্ভাবিত বিচ্ছিনতায় সে অবাক হলোÑÑ একই গ্রহে বসবাস করেও একজন আরেকজনের কাছ থেকে পুরোপুরি বিচ্ছিন্ন। রাষ্ট্র ও তাদের পুলিশ চামচা মানুষের জন্য যে কোনো অত্যাচার উদ্ভাবন করতে পারঙ্গম মনে হয়। ভারতী হয়তো গোপর্দকে বিয়ে করে উত্তর ভারতে চলে গেছে। কত মাস বছর পার হয়ে গেলো তাদের দেখা হয় না। সময়ের হিসাব সে ভুলে গেছে। শুধু যে হিসাবটা তাদের ছিলো তা হলো সকাল, দূপুর ও রাত যার বিরতিতে খাবার সময়, একঘেয়ে ক্লান্তিকর কাজ ও তার কক্ষে মাঝে মাঝে ভয় দেখানোর মতো উত্তেজনাকর কিছু। সে ভেবে পেলো না ভারতী তাকে জিজ্ঞেস করবে কিনা, ‘তুমি কে?’ যদি সে ভারতীর সামনে হাজির হয়। এ ভাবনায় সে আচ্ছন্ন হলো যে দিন দিন তার যে এত অবনতি হচেছ তাতে ভারতী তার সাথে যে দেখা করবে সে তারও যোগ্য হবে না। সে তার পরিচয় হারাচ্ছে। দেশপ্রেমমূলক লক্ষ হারিয়েছে। ভেবে পেলো না নিজেকে রাজনৈতিক ভুক্তভোগী বলা নিশ্চিত করতে সে কী করেছে। জগদীশ না থাকলে সে সেসব কাজ করতো না যার ফিরিস্তি সে এখন কোনো ভদ্র মানুষের সামনে দিতে চায়নি। এটা যদি জগদীশ না হতো, তবে হয়তো পুলিশ তাকে ভুলে না যাওয়া পর্যন্ত ধ্বংসপ্রাপ্ত সেই মন্দিরে সে থেকে যেতো। আর তখন ভারতীর সাথে দেখা সাক্ষাৎ হওয়ার সুযোগ মিলতে পারতো। ভারতীর চিন্তা তার মধ্যে এক ধরণের অস্বস্তি জাগ্রত করলো: আন্তরিকভাবে কামনা করলো ভারতী যদি এমন আপোসহীন গোঁড়া না হতো। সে যা ভাবতো বা বলতো বা আশা করতো তা ছিলো প্যানপ্যানানি আর মেনে চলা কঠিন ছিলো। বাস্তব সব উদ্দেশ্যে শ্রীরাম এখন সেকেলে, জালিয়াত ও ঘাতকের চেয়ে ভাল কিছু নয়: তাদের জগৎ ছিলো তার জগৎ। সে কেন ভিন্নভাবে ভাববে? যত দীর্ঘ দিন সে এখানে থাকলো ততদিন ভারতীর কাছ থেকে তার সরে আসার সম্ভাবনা বাড়লো। চলে যাওয়াটা তার জন্য অপরিহার্য ছিলো। কিন্তু কীভাবে? তার মনে ঘুরপাক খেলো গল্পের বইয়ে পড়া সেইসব উখা ও হ্যাকসো ব্লেডের কথা যা জেলে চোরাচালানকৃত হলে তা দিয়ে কাজ করে লোকজন জেল থেকে বের হওয়ার রাস্তা খুঁজে নিতো। এটা নিয়ে সে যতই ভাবলো ততই অখুশি হলো। পুরো কাজটার চরম অসহায়ত্ব তাকে ভারগ্রস্ত করে তুললো। নীরব ও শান্ত হয়ে রইলো সে। পালানোর সময় সারা রাত ধরা পড়া, খুন হওয়া এবং গুলি খাওয়ার স্বপ্নে তাড়িত হলো, আর এই গুলি করার দলটি ছিলো ভারতী পরিচালিত দল। শীতল ঘামে জেগে উঠে ব্যাপক স্বস্তি পেলো যে হাজার হলেও সে বাড়ির মতো কারাগারে আছে। স্বপ্নের ভেতরও কেন ভারতী তাকে দুশ্চিন্তাগ্রস্ত করে তুলছে? অন্য অনেক স্বাভাবিক প্রিয়তমার মতো সে কেন নিজেকে আনন্দময়ী ও বশ্য করে তুলতে পারে না? ** তহবিল অফিসের ম্যানেজার তার সাথে দেখা করার জন্য বিশেষ অনুমতি প্রার্থনা করলো। সূতা বোনার চালাঘরে যখন সে কাজ করছিলো তখন তার ডাক এলো। একজন প্রহরী এসে বললো, ‘আজকে বিকেল তিনটা থেকে চারটার মধ্যে একজন দর্শনার্থীকে দেখার অনুমতি আছে আপনার।’ শ্রীরাম উত্তেজনা বোধ করলো। ‘কোন দর্শনার্থী?’ চিৎকার করে বললো সে। ‘নারী না পুরুষ?’ তার মনে অনিয়ন্ত্রিত আশা ছিলো যে দর্শনার্থী ভারতী হতে পারে। পারে কি? তাকে কী বলবে? কীভাবে তার সাথে কথা বলবে? নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে যা যা সে চেয়েছিলো তা কীভাবে তাকে বলবে? হয়তো ভারতী তাকে দেখলে টিটকারী মারবে। তার সাথে বরং দেখা না করাই ভাল। শ্রীরাম কি তাকে কথা ফেরত দিতে পারবে যে সে কারো সাথে দেখা করবে না? এ সব চিন্তা এক ঝলকে তার মনে খেলে গেলো। সে জিজ্ঞেস করলো: ‘কোন ধরণের লোক?’ কিন্তু প্রহরী বললো, ‘নিজেই দেখে আসুন। সাক্ষাৎকারটা হবে প্রধান সাহেবের কক্ষে। প্রশ্ন করে বেশি সময় নষ্ট না করলে আপনি দর্শনার্থীর সাথে কয়েক মিনিট বেশি কাটাতে পারবেন।’ শ্রীরাম প্রহরীকে নীরবে অনুসরণ করে কাজ বন্ধ করলো। তার প্রতিবেশিরা বিড়বিড় করে বললো: ‘তোমার শাশুড়ী হয়তো মিষ্টি নিয়ে তোমার সাথে দেখা করতে এসেছে!’ প্রধান সাহেবের অফিসের প্রবেশ পথে প্রহরী কিছুক্ষণ থেমে তার দিকে উপরে নিচে তাকিয়ে জ্যাকেট থেকে ময়লা ঝাড়া দিলো, আর পোশাকটা সাধারণভাবে উপরে টেনে দিলো: বিড়বিড় করে বললো: ‘মনে রাখবেন প্রধান সাহেবের সামনে কীভাবে ব্যবহার করবেন। কোনো ঝামেলা করলে তিনি আপনাকে চাবুক মারিয়ে নেবেন।’ শ্রীরাম উত্তর দিলো, ‘আমি চাবুক মারা পছন্দ করি না,’ এতে সে সরস জবাব দিলো, ‘মুখে মুখে কথা বলবেন না। আপনাকে যা বলা হয়েছে তা করলেই চলবে।’ তখনি কেবল শ্রীরাম অস্ফুটভাবে অকুণ্ঠ সমর্থন প্রদান করলো যে প্রহরী তাকে যেভাবে শিখিয়েছে সেভাবে সে আচরণ করবে। সে তহবিল অফিসের ম্যানেজারকে তার জন্য অপেক্ষা করতে দেখলো। তাকে পরিপার্শ্বের কারণে ভীত সন্ত্রস্ত দেখালো; একটা টুলে বসে পাদুটো দোলালো, আর তাদেরকে অতিক্রম করতে ভয় পেলো। প্রধান সাহেব চকিত চাহনি নিক্ষেপ করে বললেন, ‘বন্দী, আজকে একজন দর্শনার্থীর সাথে দেখা করার জন্য তোমার বিশেষ অনুমতি আছে।’ ঐ ইউনিফর্ম পরে ওখানে দাঁড়িয়ে তহবিল অফিসের ম্যানেজারের মুখোমুখি হতে শ্রীরাম লজ্জা বোধ করলো। ম্যানেজারের দিকে সে অপলক দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলো। তিনিও শ্রীরামের দিকে অপলক দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলেন। প্রধান সাহেব ব্যস্ত ছিলেন টেবিলে রাখা কাগজপত্র দেখা নিয়ে। ‘কথা বলতে পারেন,’ তিনি আদেশ করলেন। ‘চারটার পর আমি এ সাক্ষাৎকার চলতে দিতে পারি না। কিছু বলার থাকলে শুরু করেন, সময় নষ্ট করবেন না।’ নিজেকে শ্রীরামের বোকার মতো মনে হলো। ভাবলো ম্যানেজার বরফ গলিয়ে কথা শুরু করবেন। কিন্তু লোকটির কোনো কথা নেই বলে মনে হলো। কাগজপত্র দেখে আদেশ করে প্রধান সাহেব আবার পরিস্থিতি সহজ করার চেষ্টা করলেন, ‘গার্ড বাইরে অপেক্ষা করো।’ যে দুজন গার্ড শ্রীরামের উপর নজর রাখছিলো তারা স্যালূট জানিয়ে দুই পা একখানে করে বাইরে চলে গেলো। এতে সামান্য অগ্রগতি হলো, কিন্তু এখনো সাক্ষাৎকারটি পারস্পরিক দেখাদেখির বাইরে এগুলো না। এখন যে শ্রীরামকে তার সামনে দেখছে তাতে তহবিল অফিসের লোকটিকে হতভম্ব মনে হলো। তার সন্দেহ হলো বলে মনে হলো যে এই প্রাণহীন, হলুদাভ রোগাটে, ছোট চুলের ক্রপ কাটে ডোরাকাটা নিকার ও জ্যাকেট পরিহিত মানুষটি কি সে হতে পারে যার সাথে তিনি দেখা করতে এসেছেন। শ্রীরাম তার অবাক হওয়া ও ইতস্তত করা খেয়াল করে মনে মনে বললো: ‘আমার পরিচয় স্বীকার করতে ম্যানেজারেরই যখন এত অনীহা, তখন ভারতী আর কী করবে? হয়তো বলবে, “বের হয়ে যাও, বদমায়েশ। তুমি নিজেকে কী মনে করো?” ’ প্রধান সাহেব ঘড়ির দিকে তাকিয়ে চিন্তায় পড়ে গেলেন। বললেন: ‘রাজনীতি ও নিষিদ্ধ বিষয় বাদে যে কোনো কিছু নিয়ে আপনারা কথা বলতে পারেন।’ শ্রীরামের কণ্ঠ থেকে হঠাৎ বের হলো, ‘সবাই কেমন আছে, ম্যানেজার সাহেব?’ ‘খুব ভাল, খুব ভাল,’ ছোট পাদুটো দুলিয়ে এখনো তাদেরকে অতিক্রম করার ভয়ে ভীত থেকে লোকটি বললো। ‘ঠাকুরমার সম্পর্কে বলেন,’ শ্রীরাম বললো। ‘সেজন্য আমি এখানে এসেছি,’ ম্যানেজার বললো। ‘আজকে তার সাথে আমাদের যোগাযোগ হয়েছে।’ ‘যোগাযোগ! কোত্থেকে?’ ‘জানো না? তিনি তো এখন বেনারসে?’ ‘ওখানে কবে গেলো?’ ‘কাহিনীটা জানো না? শ্মশানের মামলা শেষ হলে কিছু গোঁড়া লোক বললো যে তিনি শহরে ফিরতে পারবেন না কারণ এটা অশুভ আর এতে শহরটা আক্রান্ত হতে পারে। তিনি তাদের ইচ্ছেকে সম্মান জানিয়ে কিছুদিন টোল ফটকে ছিলেন, এরপর তিনি বলেছিলেন তিনি বেনারসে যাবেন। তালাপুর ট্রেন ধরতে আমরা তাকে সাহায্য করেছিলাম।’ ‘বেনারস! বেনারসে সে কী করছে?’ ‘আরো কিছু লোক তার সাথে আছে যারা তাদের শেষ সময়গুলো সেখানে কাটাচ্ছে, বয়স্ক লোক যারা মৃত্যুর প্রতীক্ষায় আছে। উৎফুল্লভাবেই তারা মৃত্যুর জন্য অপেক্ষা করছে, আর পবিত্র গঙ্গায় শেষ আগুন ও শেষ স্নানের দিকে তাকিয়ে আছে।’ ‘আমার কথা জিজ্ঞেস করেছিলো?’ ‘ওহ্, তিনি এত ইয়ে ছিলেন ’ ম্যানেজার শুরু করলো, এ সময় প্রধান সাহেব কাগজপত্র থেকে চোখ না তুলে বললেন, ‘অনুমতি নেই। অন্য কিছু নিয়ে কথা বলুন।’ ‘কিন্তু এটা তো রাজনীতি নয়,’ শ্রীরাম শুরু করলো। ‘তর্ক করো না। অন্য কিছু নিয়ে কথা বলো,’ প্রধান সাহেব আদেশ করলেন। শ্রীরাম অসহায়ভাবে তার দিকে তাকিয়ে ম্যানেজারকে বললো: ‘তারপর কী হয়েছিলো?’ ‘বেনারসে তিনি সম্পূর্ণ ভাল আছেন। তাদের পুরো একটা রাস্তা আছে, যেসব বয়স্ক লোক মহাগঙ্গার তীরে চাকুরি থেকে অবসর নিয়েছে তারা সেখানে অন্তিম মুহূর্তের জন্য অপেক্ষা করছে। কেউ কেউ সেখানে বছরের পর বছর ধরে আছেন। শাস্ত্রে বয়স্ক লোকদের ব্যাপারে যেভাবে নির্দেশ আছে। কেউ সুখময় অন্তিম মুহূর্তের জন্য অপেক্ষা করতে পারলো না।’ তহবিল অফিসের লোকটিকে এ বিষয়ে এত আগ্রহী মনে হলো যে তিনি অনর্গল কথা বলে গেলেন, আর শ্রীরাম জিজ্ঞেস না করে পারলো না, ‘আপনিও কি ওখানে অবসর নিতে চান?’ ‘হ্যাঁ, সময় ভাল থাকতে। ভগবান যদি চান। তোমার ঠাকুরমার মতো তো সবাই ভাগ্যবান না!’ কিছুক্ষণ থেমে ভাবলেন এবং ছোট পাদুটো হালকা দোলালেন। তিনি সম্মানজনকভাবে অফিসের বাইরে স্যান্ডেল রেখে এসেছিলেন আর শ্রীরাম খেয়াল করলো তার পাদুটো কত নোংরা এবং ধুলো ময়লায় কেমন কালো হয়ে গেছে। জীর্ণ পৃথিবীতে আবার ফিরে তিনি বললেন, ‘তার বাড়ি ভাড়ার ব্যাপারে নির্দেশনা দিয়েছেন। তিনি চান টাকাটা তার কাছে পাঠানো হোক।’ ‘কেউ কি বাড়িটাতে থাকছে?’ ‘অবশ্যই, অবশ্যই। জানতে না?’ শ্রীরামকে নৈরাশ্যজনকভাবে সেকেলে মনে হলো। কোথায় কী ঘটছে না ঘটছে সে সম্পর্কে সে কিছুই জানতো না। ‘তার নির্দেশ ছিলো বাড়িটার জন্য ভাড়াটিয়া খুঁজে বের করা, আর সে মাফিক আমরা কেবল চল্লিশ টাকা ভাড়া দেওয়ার মতো একজনকে পেয়ে গেলাম। এ ভাড়াটা তারা বৃদ্ধা ভদ্রমহিলার অ্যাকাউন্টে জমা দিয়ে আসছে।’ শ্রীরামের জন্য এটা ভয়ানক ভাবনা ছিলো যে অন্য কেউ বাড়িটির দরজা বন্ধ করছে ও খুলছে। ‘কারা তারা?’ ‘এক সূতা ব্যবসায়ী।’ ‘সূতা ব্যবসায়ী! কখনো ভাবিনি যে সূতা ব্যবসায়ীর কাছে আমাদের পুরাতন বাড়িটা ছেড়ে দিতে হবে!’ বিতৃষ্ণায় সে বললো। ‘এটা তো ছেড়ে দেওয়া নয়, এক মাসের নোটিশে তারা খালি করে দেবে। এ তথ্যে শ্রীরাম অস্বস্তিতে ভরপুর হলো। ‘আমি কোথায় থাকবো?’ সে ভাবলো। ‘ভারতীকে বিয়ে করলে কোথায় রাখবো?’ এতগুলো বছর সে পুরানো বাড়িটাতে না থাকলেও এখনো তার এক ধরণের অনুভূতি আছে যে যতদিন ঠাকুরমা সেখানে ছিলো সব ঠিক ছিলো এবং ততদিন সে এটাকে নিজের বাসা ভাবতে পারতো। এ বাড়ির পিতলের গাঁথুনী, তন্বী থাম্বা, পয়োনালীর উপর বারান্দা ও ভবন সারির উপর নারিকেল গাছের জন্য সে স্মৃতিকাতর হয়ে পড়লো। ‘এটাই বিষয়,’ ম্যানেজার বললেন। ‘তিনি চেয়েছিলেন আমি যেন এ ব্যাপারটা তোমাকে বলি, আর তুমি এ টাকাটা না চাইলেÑÑ বেশ একটা অঙ্কে জমা হতো, যেমনটা তোমাকে এর মধ্যে আমি বলেছি, তিনি বলেছিলেন এ টাকাটা তাকে পাঠানো হোক। যে টাকা তিনি সাথে করে নিয়ে গিয়েছিলেন তা হয়তো শেষ হয়েছে মনে হচ্ছে। মনে হয়, এটা করা যেতে পারে।’ ‘অবশ্যই, কেন নয়?’ ‘আামি তো শুধু তার নির্দেশ পালন করছি। তিনি চান এ বিষয়ে আমি যেন তোমার ইচ্ছা জেনে নেই।’ ‘সে আপনাকে যা করতে বলে তা-ই করুন। তার আরো টাকা লাগলে আমার তহবিল থেকে নিতে দ্বিধা করবেন না। বেচারি ঠাকুরমা! আমি যদি তার বিষয়ে আরো সময় দিতে পারতাম! আমার জন্য এত করেছে। কেমন আছে সে? খুব একা লাগে নাকি তার?’ ‘মোটেও না। বেনারস থেকে আজকে একজন বন্ধু এসেছে। তিনি খুব ভাল আছেন; গঙ্গায় তিনবার স্নান করেন এবং মন্দিরে প্রার্থনা করেন, খাবার রান্না করেন, ভাল সঙ্গ লাভ করেন। অন্য রকম জীবন; এই বন্ধুটিই চিঠিটা এনেছে।’ আবার বাড়ির কথা ভেবে শ্রীরামের খারাপ লাগলো। ‘তারা হয়তো সব দেয়ালে পেরেক লাগাচ্ছে, আর আমার সব বই ও অন্যান্য জিনিসের কী অবস্থা?’ তার যা যা ছিলো তার একটা ফিরিস্তি দিলো, আর ম্যানেজার প্রাণ ঠাণ্ডা করা ভাষায় বললেন, ‘ওসব নিয়ে ভেবো না। সেগুলো নিরাপদেই রাখা আছে। শেষের রূমটায় যেটা তোমার নিজের ব্যবহারের জন্য আমরা রেখেছি।’ ‘আর কী খবর? লড়াই কেমন চলছে?’ ‘ও ব্যাপারে কথা বলো না,’ প্রধান সাহেব বললেন। ‘অন্য সবকিছু কেমন চলছে?’ লোকটি কিছু একটা বলবে বলে দাঁড়ালেন, কিন্তু শ্রীরাম মাঝখানে বললো: ‘আমি তো জানিও না এটা কোন মাস বা কোন বছর।’ ‘ওসব বিষয়ে কোনো আলাপ চলবে না,’ প্রধান সাহেব বললেন। ‘কোনো রাজনীতি নয়, কোনো লড়াই নয়।’ ** মধ্যরাতের নির্জনতায় শ্রীরাম তার কক্ষে পালানোর ফন্দি আঁটলো। পালানোর যে সকল কৌশল সে পড়েছিলো বা শুনেছিলো তা তার মনে ঘুরপাক খেলো। চোরাচালানকৃত ফাইল ও রশি অবশ্যই পুরো কাজটার প্রধান বিষয় ছিলো। দেয়াল টপকানো ও ঘুলঘুলির মধ্য দিয়ে হামাগুড়ি দিয়ে যাওয়া অপরিহার্য এক বিষয় ছিলো। মন্ট কৃস্টের দুঃসাহসিক অভিযানের কথা সে স্মৃতিচারণ করলো; এসব ছিলো খুবই মজাদার এবং তার মনকে পরিকল্পনা করতে ব্যস্ত রাখলো। পুরানো বন্দীদের জন্য প্রশংসা অকৃত্রিম হয়ে উঠলো; তার সহানুভূতি সত্যিই বাড়ছিলো। জেলার যা করতে অনুমতি দেয় তা ব্যতীত জেলের চার দেয়ালের মধ্যে কোনো কিছু করা কতই না অসম্ভব ছিলো বলে সে উপলব্ধি করলো। প্রহরীরা কর্তব্য পালন করতে ব্যক্তিগত আনন্দ লাভ করতো বলে মনে হলো, তারা দূর্নীতিগ্রস্ত না হওয়ায় তাদেরকে কোনোভাবেই প্রভাবিত করা যেতো না। তবুও লোকজন কী করে হ্যাকসো ও এরকম জিনিস ভেতরে চোরাচালান করে? হাত দিয়ে যখন সে মাটি খুঁড়তে কিংবা চাকা ঘুরাতে ব্যস্ত, তখন তার মন উখা বার ও ক্ষিপ্রগতিতে ঝুলন্ত রশিগুলো বেয়ে ওঠে পালানোর স্বপ্নে বিভোর হলো যা গল্প ও ছবির লেখকেরা খুব সুচারুরূপে বর্ণনা করেন। এ স্বপ্ন এত সমস্যাজনক হলো যে সে নিজেকে আর সামলাতে পারলো না। রাতে সিমেন্টের বিছানায় শুয়ে শুয়ে সে একটা রশি তৈরি করতে ব্যস্ত হলো যে রশি ছাদের ঘুলঘুলি পর্যন্ত যাবে। এ ছাদ দিয়ে আকাশ দেখা যায়, জ্বলজ্বল করা মুক্ত বিশ্বকে এক নজর দেখা মাত্র। তার যথেষ্ট বিকৃত প্রবোধ ছিলো যে ভারতী নিজে হয়তো পুরাতন কসাইখানার চৌহদ্দির মধ্যে একইভাবে কাতরাচ্ছে। এমন তো নয় যে ভারতীর ভোগান্তি সে দেখতে চায়নি, কিন্তু তার ভোগান্তির ধারণা শ্রীরামের মধ্যে আগ্রহবোধ সঞ্চার করলো। জেল থেকে পালাতে পারলে এ বুদ্ধিটা সে ভারতীর কাছে পাচার করবে, সে যেখানেই থাকুক না কেন যাতে করে ভারতী জেল থেকে নেমে এসে ভয়ানক দেয়ালগুলোর বাইরে তার সাথে দেখা করতে পারে এবং তার নায়ক হিসেবে শ্রীরামকে জড়িয়ে ধরতে পারে। কিন্তু যথাযথ রাষ্ট্রীয় নিয়মে তাকে গেট খুলে না দিলে জেল থেকে হেঁটে বের হতে অস্বীকৃতি জানিয়ে ভারতী তো নিজের কক্ষে ফিরে যাওয়ার জন্য পীড়াপীড়ি করতে পারে। তার শ্রমের জন্য ভারতী তাকে প্রত্যাখ্যান করতে পারে। সে তো আবার আচরণে সতর্ক নয়। বাপুজীর অনুমোদন লাগবে হয়তো। বাপুজী হয়তো প্রস্তাব- টার প্রশংসা করবে যদি প্রমাণ করা যায় যে শ্রীরামের এ কৌশলে জেল থেকে সব বন্দীকে নামিয়ে বের করা যায়; তখনই তারা এর জাতীয় তাৎপর্য্য উপলব্ধি করবে: ব্রিটিশদের কী করে হতাশায় নিমজ্জিত করা যায় যদি তাদের বোধে আনা যায় যে তাদের কারাগারগুলো কাউকে আটকে রাখতে পারে না। এতে তারা পাগল হয়ে অবশেষে সিদ্ধান্ত নিতে পারে, ‘ঠিক আছে, আমরা চলে যাচ্ছি। ভারতকে আমরা আর ধরে রাখতে পারছি না।’ এটা ছিলো বড় আকারের কপোলকল্পনা, কিন্তু এতে তো কাজ হয় না। এ উত্তেজনাই সে শুধু কল্পনা করতে পারে। তার এই বেপরোয়া ভাবের মধ্যে যখনই সুযোগ মিললো কক্ষের বুলিটার সাথে সে পরামর্শ করলো । একদিন সন্ধ্যায় সে অস্বাভাবিক রকমের বন্ধুপরায়ণ হলো, আর শ্রীরাম দ্রুত তার সিমেন্টের বিছানায় বসে পড়লো। ফিসফিস করে বললো: ‘এ নরক থেকে আমরা সবাই পালাচ্ছি না কেন?’ লোকটি সহানুভূতি সিক্ত হাত শ্রীরামের উপর রেখে বললো, ‘এ রকম বোধ হওয়া স্বাভাবিক। কিন্তু আজকাল আমার সে রকম হয় না। আমি শুধু ভজন করে ভাল থাকি। তুমিও আমাদের ভজনে অবশ্যই যোগ দেবে।’ ‘ঠিক আছে, ও বিষয়ে আমরা পরে কথা বলবো। কিন্তু এখন চলো কীভাবে পালাবো তা নিয়ে আলোচনা করি।’ ‘কীভাবে?’ লোকটি জিজ্ঞেস করলো। ‘আমাদেরকে তোমার অবশ্যই সাহায্য করতে হবে। তোমার তো অনেক অভিজ্ঞতা আছে। তুমি কি কখনো জেল থেকে পালাওনি?’ ‘হ্যাঁ, দুইবার, সেজন্য আমার সাজার এখন সাত বছর চলছে।’ ‘তোমার ধরা পড়া ঠিক হয়নি।’ ‘হুম, এসব ঘটনা তো ঘটেই, আমাদের কিছু করার নেই,’ লোকটি দার্শনিকতার সাথে বললো। পদ্ধতিটিতে আগ্রহী হয়ে শ্রীরাম জিজ্ঞেস করলো, ‘তুমি কীভাবে পালিয়েছিলে?’ ‘সহজ,’ ঘুলঘুলির দিকে তাকিযে লোকটি বললো। ‘এক কক্ষে আমরা ছয়জন ছিলাম মাত্র। কম্বলের সূতা দিয়ে রশি তৈরি করে একে অপরের কাঁধে উঠে রশি দিয়ে বাঁধলাম আর উপরে উঠে বেরিয়ে গেলাম: বেশি সময় লাগেনি। এক ঘন্টায় চলাম মাঠ পার হয়েছিলাম। আমাদেরকে কেউ আর খুঁজে পেতো না, কিন্তু আমাদের মধ্যে একজন পথিমধ্যে এক বাড়ির তালা ভেঙেছিলো আর ধরা পড়েছিলো।’ ‘আমরা কি ওরকম কিছু করে এখান থেকে বের হয়ে যেতে পারিনা?’ লোকটি ভেবে বললো, ‘আমি কেন বের হবো? বাইরে আমি কী করবো?’ ‘কিন্তু আমি বাইরে বেরোতে চাই। এ জায়গাটা আমার আর সহ্য হচ্ছে না,’ শ্রীরাম বললো। ‘এ জায়গাটা তোমার ভাল না লাগলে এখানে আসার মতো কাজ না করলেই পারতে, ব্যস,’ লোকটি বললো। ‘কোনো রকমে বেরোতে পারলেও তারা তোমাকে শীঘ্রই আবার ফেরত নিয়ে আসবে, ওসব ঝামেলা করে লাভ নেই। তুমি তো তোমার মুখ লুকাতে পারবে না। ‘দাঁড়ি রাখবো।’ ‘তখন তোমাকে কেমন দেখায় তা দেখতে তারা তোমার দাঁড়ি ছিড়ে ফেলবে। আর এতে দাঁড়িওয়ালা পবিত্র সাধুদেরকেও তোমার অসম্মান করা হবে।’ ‘কথা দিচ্ছি আমি পুলিশ থেকে দুরে থাকবো।’ লোকটি মাথা নাড়ালো। ‘স্বাধীনভাবে চলাফেরা করতে না পারলে বাইরে গিয়ে লাভ কী?’ তাকে টিটকারী মেরে এবং জেল জীবনকে যারা পছন্দ করে না তাদেরকে অবজ্ঞা করে সে আনন্দ পেলো মনে হলো । অবশেষে শ্রীরাম তার ট্রাম্প কার্ড বের করে বললো, ‘আমি পালাতে চাই কারণ যে মেয়েটাকে আমি ভালবাসি সে বাইরে আছে।’ ‘কোথায়?’ লোকটি নির্দয়ভাবে বললো। এর জবাব দিতে শ্রীরাম ভয় পেলো, কিন্তু নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করার আগেই সে গড়গড় করে বলে দিলো। ‘সেও জেলে আছে।’ ‘ওহ! ওহ!’ লোকটি মজার সাথে চিৎকার করে বললো। ‘তুমি কি বলতে চাচ্ছো পালিয়ে তার জেলে যাবে আর জেলারকে বলে বিয়ের আনুষ্ঠানিক কাজ সারবে?’ রূঢ়ভাবে বললো সে। শ্রীরাম ক্রদ্ধ হয়ে আফসোস করলো যে সে তার দেবীর কথা এই রূঢ় লোকটিকে বলেছে। ভগবান জানেন এখন সে কী ভয়ংকর কথা বলবে। নীরবে রইলো, মুখ খুলতে ভয় পেলো। আর লোকটি বললো: ‘সে মেয়েটি যদি জেলে যাওয়ার মতো মেয়ে হয়, তবে আমার কথা শোনো, তাকে তার মতো থাকতে দাও। তুমি তো তোমার সন্তানদের জেলে মানুষ করতে পারবে না। কাউকে না কাউকে তো সংসার দেখাশুনার জন্য অবশ্যই থাকতে হবে। এটা মোটেও ঠিক না যে স্বামী-স্ত্রী দুজনই জেলের ঘানি টানবে।’ ‘তোমার ক্ষেত্রে ব্যাপারটা কেমন?’ শ্রীরাম জিজ্ঞেস করলো। ‘এখানে সেখানে আমার তিনটা বউ আছে, আর আমি না থাকলে তারাই সংসার চালায়: না চালালে তাদের মধ্যে সে বোধ সঞ্চারিত করতে আমি দ্বিধাবোধ করি না। এটাই উপায়। তুমি তো আর এখানে সারা জীবন থাকছো না। শোনো, এখান থেকে বের হতে দিলে ভাল একটা মেয়ে দেখে বিয়ে করো। এই জেলের পাখি তোমার জন্য ভাল হবে না।’ ‘সে তো অপরাধী না, মহাত্মাজীর আদেশে সে জেলে গেছে।’ ‘ওহ! ওহ! ওহ!’ লোকটি মুখ বাঁকিয়ে অবজ্ঞা করলো। ‘ঐ মহান ব্যক্তিটির নাম তুমি এখানে টেনে আনছো কেন?’ শ্রীরাম বিরক্ত হলো। ভারতীর নাম কোনো না কোনোভাবে লোকটির মধ্যে নিকৃষ্ট ধারণার জন্ম দিলো। শ্রীরাম হঠাৎ দাঁড়িয়ে বিছানায় গেলো এবং বিড়বিড় করে বললো, ‘যাও, ঘুমাও গিয়ে। আর কোনো কথা না বলি।’ ‘তুমি ভয় পেয়েছো যে আমি প্রধান সাহেবকে বলে দেবো, তাই না?’ লোকটি মুখে অবজ্ঞার অভিব্যক্তি এনে বললো। ‘তুমি যদি মহা উদ্যমে আমাদের ভজনে শরীক না হও, তবে প্রধান সাহেবের কাছে তোমার কথা বলে দেবো।’ ‘আমি ভয় পাই না, ’ স্পর্ধার সাথে শ্রীরাম বললো। ‘ঠিক আছে, দেখবো, তারা তোমাকে নির্জন কক্ষে তালা দিয়ে রাখলে অবাক হয়ো না যেন। কথা বলার জন্য তখন শুধু দেয়াল থাকবে,’ লোকটি বললো। শ্রীরামের প্রতিশ্র“তিশীল নরকের পৈশাচিক আনন্দ সে পেল্ ো কিছুক্ষণ থেমে শ্রীরাম বললো, ‘আমি তো তোমার প্রতি কোনো অন্যায় করিনি। তুমি আমাকে ঘৃণা করছো কেন?’ গোমড়া মুখের ভাব ধরে লোকটি বললে, ‘যারা ভগবানে বিশ্বাস করে না তাদের জন্য আমার কোনো সহানুভূতি নেই। যারা ভগবানের নিন্দা করে তাদেরকে আমি দেখতে পারি না।’ ‘ভগবানের বিরুদ্ধে তো আমি কোনো কথা বলিনি,’ বিষয়টি যেদিকে মোড় নিচ্ছে সেদিকটা ভেবে ভেবে শ্রীরাম বললো। ‘আমি কী বলেছি?’ ‘তা আর বলবো না,’ লোকটি জবাব দিলো। ‘ভগবানকে না মানলে জেলখানায় তোমাকে চাবুক মারা হবে, মনে রেখো। এটা আমার অভিজ্ঞতা। অভিজ্ঞ কারো কাছে তোমার শোনা উচিৎ, ব্যস।’ ‘কারো কোনো উপদেশের দরকার নেই আমার,’ উদ্ধতভাবে শ্রীরাম বললো। জালিয়াতকারী লোকটি ঘুমের মধ্যে ঘুরে রাগারাগি করে বললো, ‘তোমরা কি ঘুমাবে না সারা রাত কথা বলে যাবে? এমনিতে হতচ্ছাড়া একটা জায়গা, তার উপর বাজারের চেয়েও নিকৃষ্ট হচ্ছে। যে ঘুমাতে চায় তার জন্য কোনো শান্তি নেই। তোমরা যদি এখনই কথা বন্ধ না করো, তাহলে আমি কিন্তু গার্ডকে ডাকবো।’ জবাবে বুলিটা পুরো শহরটাকে জাগিয়ে দেওয়ার মতো উচ্চস্বরে চ্যালেঞ্জিং গান ধরলো। বাইরে পায়ের ছুটাছুটির আওয়াজ হলো। শ্রীরাম সন্তর্পণে বিছানায় গেলো। গার্ড বারের মধ্য দিয়ে জিজ্ঞেস করলো: ‘এখানে কী হচ্ছে?’ ‘লোকজন বকবক করছে তো করছেই। এতে জায়গাটা বাজারের চেয়েও নিকৃষ্ট হয়েছে,’ বিছানা থেকে বুলি বললো। ** একজন বন্ধুসুলভ প্রহরী তাদেরকে বহির্বিশ্বের সংবাদ এনে দিতো: ‘মহাত্মা গান্ধী ভারতের সম্রাট হচ্ছেন,’ একদিন সে বললো। ‘এসব ব্যাপার জানে এমন একজনের কাছ থেকে আমি আজকে শুনেছি। প্রস্তাবটা নিয়ে ইংল্যান্ড থেকে কিছু লোক প্লেনে করে এসেছে।’ ‘অবোধের মতো কথা বলো না। মহাত্মা ভারতের রাজা হোক সেটা তারা কীভাবে চাইতে পারে যখন তারা তাকে কারাগারে রেখেছে এই ভয়ে যে তিনি একদিন তা হতে পারেন?’ ‘আপনি জানতেন না? মনে হয় তিনি জেলের বাইরে আছেন।’ ‘আমার বিশ্বাস হয় না।’ ‘কসম খেয়ে বলছি বাইরে আছেন। তারা তাকে অনেক আগেই ছেড়ে দিয়েছেন কারণ তিনি অসুস্থ ছিলেন আর তার স্ত্রী মারা গেছেন। যে মহিলাটা এখানে ঘাস কাটতে আসে সে আমাকে বলেছে।’ ‘ঘাস কাটা মহিলাদের সাথে লেনদেন থাকাটা নিরাপদ না। তারা তোমাকে বিপদে ফেলবে,’ এক দাগী বন্দী বললো। ‘আপনি কী করে জানেন?’ ‘জানি কারণ আমি ভুগেছি। ওরা ছলনাময়ী। তুমি কোথায় আছো সেটা জানার আগে ওরা তোমাকে ফুসলিয়ে ফেলবে। আর তখন দেখবে তোমার ঝামেলা সবখানে। জেলে এমন কাণ্ড-কারখানা ওরা পছন্দ করে না।’ ‘কিন্তু সে মহিলা তো বুড়ি যে কাউকে ফুসলাতে পারে না। সে তো ঠাকুরমা, কাজেই ভয় পাবেন না।’ ‘তাহলে ঠিক আছে। চালিয়ে যাও।’ ‘তার ছেলে সেনাবাহিনীতে আছে। নাতি বাজারে সংবাদপত্র বেচে আর তাকে বলে বাইরের জগতে কী হচ্ছে।’ বন্দীদের সবাই এবং গার্ডরাও আগ্রহভরে তাকে ঘিরে ধরে জিজ্ঞেস করলো, ‘কী হচ্ছে, কী হচ্ছে? আমাদেরকে বলো।’ ‘মনে হয় মহাত্মাকে রাজা বানাতে ইংল্যান্ড থেকে কিছু লোক এসেছে।’ আনন্দে তারা হাততালি দিলো। ‘ওহ, এটা শুনে কী যে ভাল লাগছে!’ ‘এতে তোমার এত আনন্দ কেন?’ ‘কারণ মহাত্মা আমাদের দেশের রাজা হলে তিনি কাউকে জেলে রাখতে দেবেন না। এটা তিনি পছন্দ করেন না। এর কারণ তিনি অত্যন্ত ভাল একজন মানুষ। মনে হয় তিনি এমন কথা বলেন বলে ব্রিটিশরা তাকে পছন্দ করে না।’ ‘তারা এখন তাকে পছন্দ করে, ঠিক আছে।’ এভাবে মজে যাওয়া প্রহরীটি তাকিয়ে দেখলো বন্দীরা তাদের বিভিন্ন কর্তব্য পালন করতে করতে এসব বিষয় নিয়ে নিজেদের মধ্যে আলোচনা করছে। প্রহরীর অবশ্য কারগারবিহীন রাষ্ট্রের ধারণাটা পছন্দ হয়নি। সে বললো: ‘জেলখানা না থাকলে হয়? যিনিই রাজা হোন না কেন জেলখানা সব সময়ই থাকবে।’ এটা তো সুঁড়সুঁড়ি দেওয়ার মতো কারিগরী দিক। সবচেয়ে ভাল হয় রাজনীতি বিশেষজ্ঞের সাথে তাদের পরামর্শ করা। তারা নির্দেশনার জন্য শ্রীরামের দিকে ঘুরে দাঁড়ালো। তারা যা বলছিলো শ্রীরাম সেদিকে মন না দিয়ে পাথর ভাঙছিলো। তাদের আলোচনা শুনছিলো, কিন্তু কোনো উৎসাহ দেখাতে চাইলো না। সে বললো, ‘কোনো কিছু সম্পর্কে আমি কিছু জানি না।’ তারা তাকে প্রশ্নের পর প্রশ্ন করলো: ‘একি সত্যি নাকি সত্যি না?’ ‘আমি কী করে জানবো? আমি তো তোমাদের মধ্যে আছি।’ ‘তারা কি আমাদের সবাইকে জেল থেকে মুক্তি দেবে?’ ‘সবাইকে? আমার তা মনে হয় না; তারা শুধু রাজনৈতিক বন্দীদের মুক্তি দিতে পারে।’ এ কথা শুনে প্রহরী স্বস্তি পেলো মনে হলো। ‘আহ্ , আপনি এমন কথা বলছেন। রাজনৈতিক বন্দীরা ভিন্ন। অন্য ব্লকে কেউ কেউ আছে। শুনেছি তাদের কেউ কেউ প্রতিদিন চলে যাচ্ছে। সব মিলিয়ে সেটা ভিন্ন বিষয়। কিন্তু আপনারা সবাই তো রাজনৈতিক বন্দী নন।’ তারা সবাই বললো, ‘না হলেই বা কী? আমরাও মানুষ। আমাদেরকেও কেন ভালভাবে দেখা হবে না? তুমি যা-ই বলো, মহাত্মা গান্ধী আমাদের সাহায্য করবেন। তুমি কি বলতে চাচ্ছো যে মহাত্মাজী আমাদেরকে নিয়ে ভাববেন না? তিনি তো দয়ালু ব্যক্তি।’ তাদের কৌতুহল দমানো গেলো না। দিন রাত তারা এটা নিয়ে উদ্বিগ্ন থাকলো যতক্ষণ না পর্যন্ত বন্ধুসুলভ প্রহরীটি ভাল অফিসের মাধ্যমে একটা সংবাদপত্র পড়ে বিশ্লেষণ করার জন্য চুরি করে শ্রীরামের হাতে এনে দিলো। শ্রোতাবৃন্দ তাকে ঘিরে বসে পড়লে জেলের বাইরে খনিতে গার্ড তাদের উপর নজর রাখলো, আর শ্রীরাম “ডেইলি নিউজ” এর প্রথম থেকে শেষ লাইন পর্যন্ত তাদেরকে পড়ে শোনালো। যেন তাকে বিস্তৃত ও ব্যস্ত জগতের আকস্মিক আলোচনা করতে দেওয়া হয়েছিলো। আসন্ন রাজনৈতিক পরিবর্তন, হিন্দুস্থান ও পাকিস্তান নামে ভারতের প্রস্তাবিত বিভাজন, সে প্রস্তাবে মহাত্মাজীর অনড় প্রত্যাখ্যান এবং মৃত্যু, বিপর্যয় ও বৈপ্লবিক পরিবর্তন নিয়ে অনবরত আলোচনা সম্পর্কে পড়লো সে। শ্রীরামের সবচেয়ে বড় বিজয় ছিলো ব্রিটিশরা নিশ্চিত ভারত ছাড়ছে। গর্বভরে সে বললো, ‘সব দেয়ালে আমি নিজে লিখেছিলাম “ভারত ছাড়ো” , আর তোমরা দেখো এটা কার্যকর হয়েছে।’ লোকজন তার দিকে বিস্ময়ের দৃষ্টিতে তাকালো। তাদের মাঝে সে নায়ক হয়ে গেলো। ‘তোমার সব কাজের জন্য তারা কি এখন তোমাকে কোনো পুরস্কার দেবে?’ সে পড়লো, আর দেশের সব জেলখানার রাজনৈতিক বন্দীদের মুক্তির জন্য তা ছিলো উৎসাহব্যাঞ্জক; কিন্তু এ শ্রেণীভুক্ত হওয়ার আশা সে করতে পারলো না। তাকে তো রাজনৈতিক বন্দী হিসেবে শ্রেণীভুক্ত করা হয়নি। ** প্রধান সাহেব শ্রীরামকে ডেকে পাঠালেন। তার কণ্ঠস্বর হঠাৎ করে বন্ধুত্বপূর্ণ হলো। ‘তোমার ব্যাপারে সরকারের আদেশ কী হবে তা আমি জানি না। কিন্তু এ সপ্তাহে জেল থেকে মুক্তি দেওয়ার লক্ষে কিছু নাম আমরা পেয়েছি। এটা করতে আমার আনন্দ হচ্ছে কারণ এতে আমাদের কাজের চাপ কমবে।’ তালিকাটা দেখে বললেন, ‘তোমার নাম অবশ্য এতে নেই।’ শ্রীরাম দমে গেলো। তার বোধ হতে লাগলো যে অন্য সবাই যখন বিরাট পৃথিবীতে স্বাধীনভাবে চলাফেরা করছে তখন তাকে খাঁচায় বন্দী করে রাখা হচ্ছে। অখুশী হয়ে ভাবলো যে কেউ তার সাথে বৈষম্যমূলক আচরণ করছে। জগতটা নিষ্ঠুর ও ধর্ষকামী। তার মুখাবয়বে যন্ত্রনা লক্ষ করে প্রধান সাহেব বললেন, ‘স্পষ্টতই তোমাকে রাজনৈতিক বন্দী হিসেবে শ্রেণীভুক্ত করা হয়নি। তুমি যা করেছো তা যারা যারা করেছে তারা সবাই সরকারের বিবেচনায় আছে। চাইলে তুমি অঙ্গীকারনামা দিয়ে প্রধিনিধি পাঠাতে পারো, আর আমি তা ফরওয়ার্ড করে দেবো।’ ‘কোন প্রতিনিধি আর কোন অঙ্গীকারনামা?’ শ্রীরাম জিজ্ঞেস করলো। ‘কিছু সময় পুলিশের কাছে তোমার গতিবিধি জানিয়ে একটা অঙ্গীকারনামা লিখতে হবে যে পর্যন্ত না সব কাগজপত্র নিরীক্ষণ করে তোমার শ্রেণীভুক্তির নিস্পত্তি করা হয়।’ শ্রীরাম এটা নিয়ে ভাবলো। ‘এটা কি নতুন ভারত নাকি ব্রিটিশরা এখনো এখানে আছে?’ প্রধান সাহেব উত্তর দিলেন, ‘এ ব্যাপারে তোমাকে আমি কোনো কিছু বলতে পারছি না। এটাই রাজনীতি। আমি শুধু নিয়ম মাফিক চলছি।’ মুহূর্তের মধ্যে শ্রীরামের মনে ঝলক কেটে গেলো যে যেসব কঠিন, ঝুঁকিপূর্ণ কাজ সে করেছিলো তা এই অঙ্গীকারনামার মাধ্যমে শুন্যে চলে আসবে। ভারতীর সাথে দেখা হলে সে হয়তো বলবে, ‘জেল থেকে তুমি গোপনে চলে এসেছো, তাই না? বর্ণনাতীতভাবে তুমি নিচে নেমে গেছো। আমার সামনে থেকে দূর হও।’ প্রধান সাহেবকে সে বললো: ‘না। আমি এমন কোনো অঙ্গীকারনামা দিতে পারবো না।’ ‘ঠিক আছে, শান্ত হও। ঠিক আছে, বাদ দাও।’ প্রহরীরা তার বাহু ধরে রাখলো, আর আগের চেয়ে বেশি বিষন্ন হয়ে সে ঘুরে রূমের বাইরে হেঁটে চলে গেলো। ** সবকিছুর পরেও এমন একদিন এলো যেদিন সে প্রধান সাহেবের রূম সংলগ্ন অফিসে ঢুকলো। অফিসটা ছিলো প্রশস্ত যেখানে কিছু সংখ্যক র্যাক ছিলো। তার স্বাভাবিক প্রহরীরা বেশি হৈ হুল্লোড় না করে তাকে সেখানে নিয়ে গেলো; টেবিলে বসা ইউনিফর্ম পরিহিত এক ব্যক্তির হাতে সে এক টুকরা কাগজ দিলো; তাকে ঘিরে আরো কিছু লোক সেখানে ছিলো যাদের প্রত্যেককে সে কাপড়ের বোঁচকা দিচ্ছিলো। নিজের পালা না আসা পর্যন্ত শ্রীরাম ধৈর্য্য সহকারে অপেক্ষা করলো; তার হাত থেকে লোকটি টুকরাটি নিয়ে তাকে উপরে নিচে তাকিয়ে চিৎকার করে বললো, ‘ছয় সাত নম্বর,’। এতে একজন পরিচারক মই বেয়ে উপরে ওঠে এক বোঁচকা বের করে আনলো এবং টেবিলে রাখলো। লোকটি বোঁচকাটি খুঁটে খুঁটে দেখে শ্রীরামের দিকে তাকালো, আর জিজ্ঞেস করলো, ‘এগুলো কি তোমার?’ শ্রীরাম কাপড়গুলোর দিকে তাকালো; অনেক অনেক আগে এগুলো খুলে রেখে জেলের পোশাক পরতে তাকে বাধ্য করা হয়েছিলো। দৃশ্যটি দেখে সে রোমাঞ্চিত হলো। তাদেরকে বুকের কাছে জড়িয়ে ধরে সে বললো, ‘জ্বী, এগুলো আমার।’ ‘দাঁড়াও,’ তার হাত থেকে কাপড়গুলো ছিনিয়ে নিয়ে লোকটি বললো, ‘এখানে স্বাক্ষর করো।’ তিনি হাতে একটা কাগজ ধরে রেখেছিলেন; অনেক কাগজ স্বাক্ষর করার আছে। এ ঘৃণ্য জায়গাটা থেকে বের হওয়ার আগে তাকে যেসব বাধা পার হতে হয়েছিলো তাতে সে ক্ষিপ্ত হলো। অবশেষে লোকটি সন্তুষ্ট হলেন। তাকে বোঁচকা, পুরানো আঁটসাঁট কলারের কোট, শার্ট ও ধুতি দিয়ে দিলেন, আর এগুলো পরা অবস্থায় অনেক আগে শ্মশানে তাকে গ্রেফতার করা হয়েছিলো। ‘এখন তোমার নিজের কাপড় পরে নাও। তুমি এখন আর বন্দী নও।’ সবার সামনে জেলের পোশাক খুলতে গেলো শ্রীরাম। এখানকার জীবন তাকে শক্ত করে তুলেছে। লোকটি বললেন, ‘ঐ তাকটার পিছনে গিয়ে পোশাক পরতে পারো।’ পুরানো বিবর্ণ কাগজপত্রে ভরা তাকটির পিছন থেকে শ্রীরাম যখন হাজির হলো তখন তার মনে হলো সে পুরানো অবস্থায় ফিরে গেছে। ডোরাকাটা শর্টস ও জ্যাকেটটা গুটিয়ে উপরে তুলে এক কোণায় ঠেলে দিলো সে। লোকটি বললেন, ‘তুমি মুক্ত, ছাড়া পেয়েছো।’ কোন দিকে যাবে তা ঠিক করতে না পেরে শ্রীরাম স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে রইলো। ‘এদিকে যাও, ঐ দরজা দিয়ে বাইরে যেতে পারবে,’ লোকটি বললেন। তাকে অস্পষ্ট স্যালুট দিয়ে শ্রীরাম বিড়বিড় করে বললো, ‘যাচ্ছি,’ আর দরজাটি খুললো; বাইরে ছোট একটা আঙ্গিনা ছিলো যার অপর প্রান্ত র্বা গেট দিয়ে বন্ধ ছিলো; এর সামনে এক সশস্ত্র সেন্ট্রি এলো। তাকে দেখে শ্রীরামের প্রথম প্রবৃত্তি ছিলো ফিরে যাওয়া, কিন্তু মনে মনে বললো, ‘আমি তো আর কোনো বন্দী নই,’ আর উদ্ধতভাবে হেঁটে চললো। সে কাছে এলে লোকটি দরজা খুলে দিলো। শ্রীরামের যাওয়ার সময় লোকটি বললো, ‘চলে যাচ্ছেন! খুব ভাল, ফিরে আসার চেষ্টা করবেন না যদি এ জায়গাটা আপনার ভাল না লাগে।’ ‘এটাকে আমি ঘৃণা করি,’ অনুভূতির সাথে শ্রীরাম বললো। ‘আর কোনো কারাগার দেখতে আমি চাই না।’ ‘এ চেতনাই সঠিক,’ লোকটি বললো, ‘এটাই ধরে রাখুন।’ লোকটি সব বিদায়ী বন্দীর কাছে এ সূত্র আওড়াতে স্পষ্টতই অভ্যস্ত ছিলো। এ ছিলো এক ধরণের সমাবর্তন ভাষণ। পিছনের বার গেটটি বন্ধ হয়ে গেলে শ্রীরামের প্রায় বিশ্বাসই হলো না যে সে মুক্ত। সে দুর্বল ও নাজুক, আর ব্যাখ্যাতীতভাবে অসুখী বোধ করলো। জেলে তার কক্ষ সঙ্গীরা তার চলে যাওয়ার কথা শুনে বিষন্ন ও বেদনাবিধুর হয়েছিলো তাদের স্মৃতি তাকে যন্ত্রনা দিলো। বুলিটা বলেছিলো, ‘তুমি তো স্বার্থপর ধরণের লোক, আমরা হবো কেন? মহাত্মাজীকে বলো যে আমরা বের হয়ে আসতে চাই।’ আরেক জন বলেছিলো, ‘তুমি যদি বড় মন্ত্রী বা এমন কিছু হও, আমাকে ভুলো না যেন।’ বুলিটা আরো বলেছিলো, ‘আমি ছাড়া পেলে কোনো এক রাতে তোমার বাড়িতে জোর করে ঢুকে তোমাকে সুবোধ শিখিয়ে আসবো। তোমার মতো স্বার্থপরদের আমি পছন্দ করি না।’ প্রহরীরা তার পিছনে সারিবদ্ধ হয়েছিলো বকশিশের জন্য। অল্প কিছু টাকা সে পারিশ্রমিক হিসেবে জমিয়েছিলো যা জেলের একাউন্টেট তাকে দিয়েছিলো, আর তার পুরানো প্রহরীরা তার পিছু নিয়ে বিড়বিড় করে বলছিলো, ‘এতদিন আমরা একসাথে ছিলাম। আমি চাই আপনি আমাদেরকে মনে রাখবেন।’ ‘আমার বাচ্চাটার জন্মদিন। আপনাকে মনে রাখার মতো আমাকে কিছু একটা দেন।’ ‘এ ব্লক পার হয়ে আমাদের যেতে নেই, আপনি যা চান তা-ই দেন দয়া করে।’ ‘এতগুলো মাস আমরা আপনাকে দেখাশুনা করেছি।’ দলটার প্রত্যেককে এক টাকা করে দিলো শ্রীরাম যারা তার পিছু নিয়ে কাকুতি মিনতি করছিলো, আর এতে তার উপার্জনের পঞ্চাশ ভাগ চলে গেলো। ৫ সে যেন স্বপ্নের মধ্যে হেঁটেই চললো। কোনো গার্ড তাকে অনুসরণ করছে না এবং কোথায় যেতে হবে তা বলছে না এমন অবস্থায় চলাফেরা করা তার জন্য কঠিন হয়ে দাঁড়ালো। সন্ধ্যার আলোটা তার চোখে ঝলসে উঠলো, আর বিস্তীর্ণ খোলা প্রান্তর তাকে বেদনার্ত করে তুললো। যে ভবনটা সে বছরের পর বছর দখল করেছিলো সেটার দিকে এখন দৃষ্টিপাত করার জন্য ঘুরে দাঁড়ালো। ভবনটিকে স্লেট ধুসর রঙে যথেষ্ট নিস্পাপ দেখাচ্ছিলো, কিন্তু এর ভেতরে কী অত্যাচারের জগতই না ছিলো: কেউ সেখানে কিছু করতে চাইলে করতে পারতো না, প্রকৃতির ডাকেও সাড়া দিতে হতো নিয়ম মেনে! জেলখানাটা ছিলো শহরের সীমানার বাইরে ট্রাঙ্ক রোডের শেষে। আগে সে সেখানে কখনো যায়নি; সে এতদিন ট্রিচি ট্রাঙ্ক রোডে বাস করে আসছিলো যা সে জানতো না। শহরের উদ্দেশ্যে রাস্তা দিয়ে সে হেঁটে চললো, আর ভাবলো এখন তার কোথায় যাওয়া উচিৎ। কয়েকটা বাস তাকে অতিক্রম করে চলে গেলো। তার আশা ছিলো লোকজন তাকে চিনতে পারবে না। একটা বাসে একজন পুলিশ বসেছিলো, আর শ্রীরাম সহজাতভাবে তার দৃষ্টি থেকে মুখ সরিয়ে নিলো। রাস্তার কিনারা ধরে সে হেঁটেই চললো। ‘আমি এখন স্বাধীন ভারতের মধ্য দিয়ে হাঁটছি,’ সে ভাবলো। দেশ যে স্বাধীন হয়েছে তার কী চিহ্ন আছে? আশপাশে তাকালো সে। গাছগুলো আগের মতো, রাস্তাটার মোটেও কোনো উন্নতি হয়নি, আর পুলিশ এখনো মহাসড়ক বাসের ফুটবোর্ডে চড়ে। ক্লান্ত ও ক্ষুধার্ত বোধ করলো সে। প্রহরীদের দাবি মিটিয়ে তার কাছে এখন কয়েক টাকার বেশি নেই। কামনা করলো জেল থেকে যারা বেরোয় তাদের জন্য যদি কোনো ধরণের যানবাহনের ব্যবস্থা করা হতো: এটা তো খুবই অবিবেচকের কাজ, স্বাধীন ভারতেও এর মুখোমুখি হতে হবে! সে আশা করলো কোনো একদিন তারা তাকে মন্ত্রী বানাবে, আর তখন সে একটা ক্যান্টিন খুলবে এবং জেল গেটে বন্দীদের চলে যাওয়ার জন্য স্টেশন ওয়াগন স্থাপন করবে যাতে করে যারা জেল থেকে বের হয় তার এত দিশেহারা বোধ না করে। বাজার রোডে ঢুকলে সন্ধ্যা হয়ে গেলো। কেউ তাকে খেয়াল করলো বলে মনে হলো না। এখানে সেখানে ভবনগুলোতে মাঝখানে চরকাসহ তিন রঙা পতাকা ঝুলতে দেখলো সে। দেখলো আগের চেয়ে কম যানবাহন। দোকানগুলোতে আলো জ্বালানো হয়েছিলো আর আগের মতোই ভীড় ছিলো। সে হতাশার যন্ত্রনা বোধ করলো। ভেতরে ক্ষুধায় কামড়াচ্ছে। এখনো পকেটে কিছু টাকা আছে, বলতে গেলে কপালের ঘামে কষ্টার্জিত কিছু টাকা। হাতটা পকেটে রেখে মুদ্রাগুলো ঝনঝন করে বাজালো, আর কুঠার বহন করে অভাবিত স্বপ্নের সেসব কাজ করার কথা মনে করলো। কঠিন পরিশ্রমে অর্জিত টাকাগুলোর কথা ভেবে সে এক ধরণের গর্ববোধ করলো: কেউ বলতে পারবে না সে জমির উদ্বৃত্ত অংশ খেয়ে জীবন ধারণ করেছে। ঠাকুরমাও তার এ অর্জন ও সামর্থ্যে গর্ববোধ করতে পারে। নিউ এক্সটেনশন ও বাজার রোডের যানবাহনের জংশনে গড়ে ওঠা ছোট পার্কের একটা বেঞ্চিতে সে বসে পড়লো। সেখানটায় বসলো স্পষ্টভাবে ভেবে বের করতে যে কীভাবে সবকিছু সে সামলে নেবে। হাঁটতে হাঁটতে সবকিছু ঠিক করার চেষ্টা করে লাভ নেই। দেশ তো এখন স্বাধীন, আর কেউ এসে জিজ্ঞেস করবে না অন্য কোথাও না বসে সে সেখানে কেন বসেছে। এ ভাবনায় অভ্যস্ত হওয়া কঠিন, এ ছিলো বিলাসী ভাবনা যার উপর অনেক ভাবতে হয়। কিন্তু সে বারবার চমকে উঠলো মনে হলো যখন অভ্যাসবশত ভাবলো যে নিজেকে জনগণের সামনে বেশি তুলে ধরছে, আর ভাবলো যে তাকে দ্রুত কোনো এক গোপন জায়গায় গা ঢাকা দিতে হতে পারে। ঢেঁকি শাকের এক পাত্রের পাশে সিমেন্টের বেঞ্চিতে বসে মনে মনে বললো: ‘আমি তো স্বাধীন। এখন কেউ আমার পিছু পিছু আসতে পারে না। আমার দাঁড়ি কামানো আছে নাকি নেই তা নিয়ে কেউ বিরক্ত করবে না।’ প্রথম প্রথম সে আহত হলো যে পথচারীরা তাকে খেয়াল না করে, আর যানবাহনগুলো একটু থেমে না বলেই চলে যাচ্ছে, ‘এই যে নায়ক!’ কিন্তু এতগুলো বছর সব জায়গায় তাকে তন্ন তন্ন করে খোঁজার পর এখন একা থাকার আশীর্বাদের কথা সে শীঘ্রই উপলব্ধি করলো। আরো উপলব্ধি করলো যে তার প্রথম কাজ হচ্ছে কিছু একটা খাওয়া। পার্কের বেঞ্চিতে বসার পরিবর্তে হোটেলের চেয়ারে বসে বসে সে স্পষ্টভাবে চিন্তা করতে পারবে। সেখান থেকে উঠে গিয়ে চট করে রাস্তায় নেমে পড়লো; বাল্বের আলোয় জ্বলজ্বল করা প্রথম হোটেলটা ছিলো ‘শ্রী কৃষ্ণ ভিলা ’। সেখানে উপস্থিত হলো। বেশিরভাগ টেবিলই খালি ছিলো। তখন ব্যস্ত সময় পার হয়ে গিয়েছিলো। উপরের দিকটায় মর্মর পাথর লাগানো টেবিলটায় সে বসে যা চাইলো তার জন্য কেউ এসে তাকে জিজ্ঞেস করুক সেজন্য অপেক্ষা করলো। বাইরে যাওয়ার পথে ক্যাশ বাক্সে উঁচু আসনে একজন বসেছিলো। ওয়েটার ছেলেগুলো সবাই একটা দল হয়ে নিজেদের মধ্যে গালগল্প করছিলো। ‘এরা তো পাত্তাই দিচ্ছে না, ’ শ্রীরাম মনে মনে বললো। ‘মনে হচ্ছে আমাকে নর্দমার ইঁদুরের মতো দেখাচ্ছে। এরা আমাকে তাড়িয়ে দেবে।’ আশপাশে তাকালো। একজন ওয়েটারকে সে চিনতে পারলো: আগের দিনগুলোতে সে এখানে প্রায়ই আসতো। ‘হে, মনি!’ ডাকলো সে, আর ওয়েটারটি ঘুরে দাঁড়ালো। ‘এখানে আসো,’ আদেশ করলো সে। ওয়েটারটি হাজির হলো। শ্রীরামকে চিনতে পারলো, আর চিৎকার করে বললো, ‘কেন, আপনি! এত বছর কোথায় ছিলেন, স্যার? অনেক দিন হয়ে গেলো আপনাকে দেখি না।’ ‘কাজের জন্য দূরে ছিলাম। খাওয়ার জন্য ভাল কিছু দাও আমাকে।’ ‘ভাল ’ শব্দটাতে ওয়েটারটি দুশ্চিন্তায় মুখ কুঁচকে ফেললো। ‘স্যার, এখন তো খুব ভাল কিছু নেই, চাল ও বিশুদ্ধ খাবার বর্তমানে পেতে কষ্ট হচ্ছে। আমাদের সরকার এখনো এ ব্যাপারে কিছু করছে না। জানেন ভাঁজার তেল পাওয়া কী কঠিন হয়ে দাঁড়িয়েছে? শোনেন, বেশিরভাগই হচ্ছে ভেজাল খাবার।’ দেশের পরিস্থিতি, খাদ্য ঘাটতি, যুদ্ধ পরবর্তী গোলমাল, এবং লোকজনের ভোগ করা বিভিন্ন দুঃখ-কষ্ট সম্পর্কে সে বিশদ বিবরণ শুরু করলো। এর সবটাই প্রকাশ পেলো: সমসাময়িক বিশ্ব সম্পর্কে শ্রীরাম এটাই প্রথম প্রতিবেদন পাচ্ছিলো। কিন্তু এর বেশিটা শোনার মতো ধৈর্য্য তার ছিলো না। ‘কী কী আছে?’ ওয়েটারটি তাকের দিকে তাকালো যার উপর খাবারের ট্রেগুলো প্রদর্শিত করা ছিলো, আর বলতে শুরু করলো, ‘করা সেভ, ভাদাই, আর আলু বন্দ...’ শ্রীরাম সঙ্গে সঙ্গে বললো, ‘এখান থেকে আমি কিন্তু সব দেখতে পাচ্ছি। জানতে চাচ্ছি ভেতরে টাটকা কিছু, চুলার উপর কিছু বা আরো ভাল কিছু আছে নাকি?’ নরম ও হালকা ভাপা পিঠা এবং দশাইয়ের ভাবনাটা ছিলো প্রলুব্ধকর। মনে হলো যেন পূর্ব জনমে সে এগুলোর স্বাদ নিয়েছে। যখন কথা বললো তখন একটা ভাবনায় সে জর্জরিত হলো যে সে হয়তো সাধারণ লোকের সাথে কথা চালিয়ে যেতে প্রয়োজনীয় কথা হারিয়ে ফেলেছে। হয়তো জেলের সহচরদের সাথে কথা বলার সামর্থ্যই ছিলো তার। বললো, ‘খুব ভা... কিছু দাও’ সে ‘ভাল ’ শব্দটি এড়ালো পাছে ওয়েটারটি এতে আবার বিশ্ব পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করতে শুরু করে। সে বললো, ‘ভারী কিছু , সদ্য তৈরি এমন কিছু চাই আমার, খুব ক্ষুধা লেগেছে।’ ‘ভেতরে কিছু নেই, স্যার। এখন তো বন্ধের সময়, আর রান্নাঘরই সবকিছুর আগে বন্ধ হয়। আমাদের মালিক যখন চান আমরা দশটা পর্যন্ত কাজ করি, তখন যারা আগুনের পাশে বসে তারাÑÑÑÑ’ শ্রীরাম ধৈর্য্য হারিয়ে ফেললো। দোকানের কথা শুনে বাকি সন্ধ্যাটা কাটাতে চাইলো না সে। সঙ্গে সঙ্গে বললো, ‘ঠিক আছে, ঠিক আছে, খাওয়া যায় এমন কিছু একটা নিয়ে আসো, দৌড় দাও আমার জন্য কফি, ভাল কফি নিয়ে আসো,’ আর এতে তার দুঃখবোধ হলো যে শব্দটা বলে আবার সে ডাঁহা ভুল করেছে, কারণ ওয়েটার ছেলেটি ভাল কফি বানানোর ঝামেলা সম্পর্কে কিছু একটা বলতে লাগলো: দুধ সরবরাহের সমস্যা, চিনি কেলেঙ্কারী এবং বিভিন্ন ধরনের কালো বাজারীদের অর্থলোভ। শ্রীরাম বুঝলো না কী করতে হবে। ধৈর্য্য পুরোপুরি হারিয়ে ফেললো, ‘ওসব আমাকে বলছো কেন?’ ‘কারণ ঘটনা তাই।’ ‘ঠিক আছে,’ অনুভূতিহীন হয়ে বললো সে, ‘আমার ক্ষুধা লেগেছে। আমাকে কিছু দিতে চাইলে তাড়াতাড়ি করো। এখানে দাঁড়িয়ে বকবক করলে আমি উঠে চলে যাবো।’ ‘আপনাকে কী দেবো, স্যার?’ ওয়েটারটি অফিশিয়ালি জিজ্ঞেস করলো এই প্রথম বারের মতো, আর এতে একটা ধারণার সৃষ্টি করলো যে সে দায়িত্বরত আছে। ‘দুটা মিষ্টি, একটা মশলা খাবার আর প্রচুর গরম কফি,’ শ্রীরাম আদেশ দিলো। অনেক মাসের মধ্যে এই প্রথম সে কাউকে আদেশ করতে পারলো। নিজের কণ্ঠস্বরে অবাক হলো প্রায় এই ভয়ে যে কেউ এসে তাকে বলবে তোমাকে নির্জনে আটকে রাখা হবে। কিন্তু এতে কাজ হলো। ওয়েটারটি আগ্রহ ও ক্ষিপ্রতার সাথে ছুটে গেলো। টিফিন এবং পান সুপাড়ি খাওয়ার পর সে অত্যন্ত আনন্দ বোধ করলো। তার মনে হলো সে যেন সেই সময়ে ফিরে গেছে যে সময়ে কোনো যুদ্ধ ছিলো না, কোনো ধরনের রাজনৈতিক সংগ্রাম ছিলো না। সে তো নিজেই জৌলুসপূর্ণ এমন এক বৃদ্ধা ভদ্রমহিলার নাতি যার জীবনে কোনো উদ্বেগ ছিলো না, যে পড়াশুনার স্বাধীন কক্ষে, বাজারে এবং ক্যানির দোকানের মধ্যে যাতায়াত করতো নির্ধারিত কাজকর্মের জন্য, কোনো উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা ছিলো না, সবকিছুই সহজে বলা যেতো ও পূর্বেই আঁচ করা যেতো। কবীর সরণীর দিকে সে ছুটে চললো। এরকম ঘরে ফেরাটা ছিলো দারুণ ব্যাপার। সাতটা বাজলো, কিন্তু ছেলেমেয়েরা যথারীতি রাস্তায় খেলছিলো, আর প্রত্যেকটা বাড়ির সামনের জায়গাটা ধুয়ে মুছে সাদা ময়দায় সজ্জিত করা হয়েছিলো। এসব মানুষের মতো কোনো প্রকার উদ্বেগ কিংবা বাড়তি দুঃসাহসী কর্মকাণ্ড ব্যতিরেকে সে কেন জীবন-যাপন করতে পারেনি; মনে হয় কোনো ধরণের পরিবর্তন ছাড়াই স্থির জীবনের একটা নির্জন মোহ আছে। বেশিরভাগ বাড়িতেই আলো জ্বলছিলো। চোখদুটো বিস্ফারিত করে সে রাস্তায় চললো। নিজের বাড়ির সামনে এসে থামলো। দরজার প্রবেশপথ দিয়ে তাকালো। কিছু আগন্তুক চলাফেরা করছে। সে রাগান্বিত ও প্রতারিত বোধ করলো। তার জায়গা দখল করার কী অধিকার আছে তাদের? বাতি-- সেই পুরানো বাতি যার নিচে ঠাকুরমা তাকে জীবনের এত কিছু শিখিয়েছে সেখানে অচেনা কিছু ছেলেমেয়ে হলের সামনের দিকে পরস্পরকে তাড়া করছে! ছুটে গিয়ে ছেলেমেয়েদের বলতে চাইলো: ‘তোমরা এখানে ছোটাছুটি করতে পারো না, চাইলে আমি তোমাদের ছোটাছুটি থামাতে পারি।’ এরা হয়তো দেয়ালে দেয়ালে গর্ত করছে, দরজা ও শার্সিতে দ্রুম দ্রুম শব্দ করছে, তার থাকার জন্য এখন শুধু ধ্বংসাবশেষ পড়ে আছে। ক্যানির সাথে দেখা করে কথা বলতে সে চলে গেলো। কিন্তু দোকানটা উঠে গেছে: মারিয়া তেরেসার প্রতিকৃতিটা সেখানকার পরিপার্শ্বকে উজ্জ্বল করতে আর নেই। ক্যানির জায়গাটায় জানালাবিহীন সিমেন্টের নতুন এক ভবন উঠেছে, সম্ভবত কোনো গোডাউন হবে। আবার সে ব্যথিত ও প্রতারিত বোধ করলো। রাস্তা দিয়ে হাঁটতেই থাকলো। কোনো প্রতিবেশীই তাকে লক্ষ করলো না। কয়েকজনকে তাদের বাড়িতে জানালার পাশে বসে সান্ধ্যকালীন পত্রিকা পড়তে দেখলো সেÑÑ আয়েসী মানুষ। তাদের কাছে গিয়ে কথা বলতে ইচ্ছে হলো তার, কিন্তু তারা হয়তো নানা ভুল ত্র“টির জন্য তাকে তিরস্কার করবে আর কারো সাথে কথা বলতে পারার ব্যাপারে সে দ্বিধা বোধ করলো! সে এই ভাবনায় আচ্ছন্ন হলো যে এসব মানুষের সাথে যোগাযোগের বাক্য সে হারিয়ে ফেলেছে। রাস্তাটাকে শেষবার সে যেমন দেখেছে এখনো সেটা তেমনি অপরিবর্তিত রয়েছেÑ ক্যানির দোকানটা শুধু উঠে গেছে, আর এমন কেউ নেই যার কাছে সে খোঁজ খবর নিতে পারে। হঠাৎ করে তার মনে হলো যে সে রাতে কোথাও যাওয়ার মতো জায়গা তার নেই। জেলখানায় অন্তত রাত্রিযাপনের জায়গা হিসেবে নিশ্চিত থাকা যেতো। ** ফটোগ্রাফারের প্রতিষ্ঠানটি উজ্জ্বল আলোয় আলোকিত ছিলো, আর এর আলো রাস্তায় ছড়িয়ে পড়েছিলো। এর ছাদটা ছিলো নিচু, সামনে ছিলো যথারীতি কাচ। শিশু, সুন্দরী বালিকা ও গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের নানান ধরনের বিবর্ধিত প্রতিকৃতি এখানে প্রদর্শিত করা ছিলো। সামনের যে পার্লারটায় ছোঁবড়ার কার্পেট ও ছোট একটা টুল যার উপর পাত্রে শোভা বর্ধনকারী চারাগাছ ছিলো, সেই পার্লারে কেউ নেই। কেউ সেখানটায় যে থাকে তার কোনো চিহ্নই নেই। শ্রীরাম পরের কক্ষে ঢুকলো, সেটাও খালি। তার উপস্থিতি বোঝানোর জন্য সে গলা খাঁকারি দিয়ে পা দিয়ে আওয়াজ করলো । ‘কে ওখানে?’ ডাক এলো। এটা ছিলো ফটোগ্রাফারের কণ্ঠ। শ্রীরাম উত্তর দিলো: ‘জেলের ঘুঘু।’ তার আনন্দ হলো যে সবকিছুর পরেও চেনা একজনকে পাওয়া গেলো যার সাথে সে দেখা করতে পারে। দর্শনার্থীর পরিচয় জানার চেষ্টা করতে ফটোগ্রাফার অন্দরমহল থেকে বের হয়ে এলো । সে নিশ্চয়ই আলোর কাছে কাজ করছিলো, আর তাই স্পষ্ট করে কিছু দেখতে পাচ্ছিলো না। যথেষ্ট কাছে এলে সে চিৎকার করে বললো, ‘তুমি! ছাড়া পেলে কখন? কী করুণ ব্যাপার আমি জানতাম না। ভেবে পাচ্ছিলাম না তুমি নিজে কী করেছিলে। কোথায় ছিলে? তারা আমাদেরকে বলেনি তুমি কোথায় ছিলে। যদি জানতাম তুমি আজকে বের হচ্ছো, তাহলে ফুল ও মালা দিয়ে জেল গেটে তোমার জন্য সাদর সম্ভাষণের ব্যবস্থা করতাম। সমস্যাটা হচ্ছে সবকিছু এখনো এলোমেলো হয়ে আছে। কিন্তু আমি কাউকে দোষ দেই না। আমাদের রাষ্ট্র তো এখনো নবজাতকের অবস্থায় আছে, এখনো শিশু, এখনো অনেক কিছু করতে হবে, আমাদেরকে অবশ্যই খুশি হতে হবে যে আমরা আমাদেরই শাসক, আর কোনো বিদেশি জাতি আমাদেরকে শাসন করছে না। আমাদেরকে অবশ্যই খুশি হতে হবে যে সবকিছু করা হচ্ছে এবং অন্যের দোষ ধরে সময় নষ্ট করা যাবে না।’ ‘আমাদের আনন্দ করা উচিৎ যে আমাদের নিজেদের লোকেরাই মস্ত ভুল করছে, তাই না?’ দায়িত্বজ্ঞানহীন চেতনা ফিরে এলে শ্রীরাম জিজ্ঞেস করলো। ‘ওখানে বসে থাকা নেহেরু, প্যাটেল এবং বাকিদের কথা ভাবো তো যেখানে সামনে দাম্ভিক ভাইসরয়রা ছিলেন। চার্চিল মহাত্মাজীকে কি “উলঙ্গ ফকির” বলেনি? “উলঙ্গ ফকির”ই এখন সবকিছু, এটা ভাবো তো...।’ সে উত্তেজিত হলো। ‘ভুল তো অবশ্যই হবে, সব জায়গায় ডাঁহা ভুল থাকবে, কিন্তু আমাদের অবশ্যই বেশি ভুল করা যাবে না।’ সে উম্মত্তভাবে অসঙ্গত ও খুশি হলো। ‘তুমি জেলের বাইরে থাকলে তোমার গলায় ফুলের মালা পরিয়ে স্বাধীনতা দিবসের শোভাযাত্রায় বয়ে নিয়ে যাওয়া হতো। কী করুণ ব্যাপার যে তুমি সেটা পাওনি। সেটা তো জমকালো ব্যাপার ছিলো।’ জগদীশ শ্রীরামকে বড় একটা সোফায় বসিয়ে তার কোলে বড় একটা এ্যালবাম রাখলো এবং পাশে বসে পাতা উণ্টালো। সে মন্তব্য করলো, ‘ফটোগ্রাফার হিসেবে এটা নিয়ে আমি গর্ব করি। ভবিষ্যৎ প্রজন্ম দায়িত্বে অবহেলা করার জন্য আমাকে কখনো দোষ দিতে পারবে না। আমার সাধ্যমত আমি করেছি। এখানে আমাদের সংগ্রাম ও স্বাধীনতা দিবসের সমাপনী উদযাপনের পূর্ণ ইতিহাস আছে।’ সে নিজের বিভিন্ন ছবি এ্যালবামে রেখে নিজেকে ক্ষুদ্র একজন যোদ্ধা হিসেবে উল্লেখ করেছে। শ্রীরাম যেখানে থেকে কাজ করেছিলো সেই ধ্বংসপ্রাপ্ত মন্দিরটর ছবিও ছিলো। ফটোগ্রাফার এর শিরোনাম দিয়েছে: ‘মুক্তিবাহিনীর একটি গোপন সদর দপ্তর।’ শ্রীরাম অ্যালবামটি আগাগোড়া দেখলো যেটি কার্যত স্বাধীনতা আন্দোলনের একটি দলিল ছিলো। জগদীশ জেলখানা ও সেগুলোর বহিরাঙ্গে আলোকচিত্রও সেঁটে দিয়েছে। কাঁটাতারের জটের ছবিও আছে। পুরাপুরি রোমান্টিক ছবি। কোথাও কোনো ঘাটতি ছিলো বলা যায় না। স্বাধীন ভারতের প্রধান স্থপতি ও ব্রিটিশদের তাড়ানোর ক্ষেত্রে প্রধান চালক ছিলো সে। মালগুদির সড়ক দৃশ্যেরও কিছু ছবি অন্তর্ভূক্ত আছে। প্রতিটা দরজার প্রবেশপথ ও দোকান থেকে পতাকা উড়ছিলো, জনতা গান গেয়ে যন্ত্র বাজিয়ে শোভাযাত্রায় যাচ্ছিলো। সব জায়গায় ফুল আর ফুল। জগদীশ মহাগর্বের সাথে দৃশ্যগুলো দেখলো। তার মনে হলো সে মানুষকে ভাল একটা সময় উপহার দিতে চেষ্টা করেছে এবং তাতে সফলও হয়েছে। বললো, ‘যে ঝামেলা পোহাতে হয়েছে এবং যে ঝুঁকি নিতে হয়েছে মোটের উপর তার জন্য আমি কী পাচ্ছি? তারা কি আমাকে কোনো মন্ত্রী বানাবে? কোনো সুযোগ নেই, স্যার, এ সুবিধা পাওয়ার জন্য আরো অনেকে অপেক্ষায় আছে। আমি যদি বা নির্বাচনে দাঁড়াই, আমি কে সেটা কে জানবে? সংসদীয় কমিটি কি তাদের প্রার্থী হিসেবে আমাকে নির্বাচন করবে? কোনো সুযোগ নেই, স্যার, সে কারণে আমার ক্যামেরা ও স্টুডিওতে আমার নানা কর্মকাণ্ড দ্রুত ধরে রেখেছি। কেউ এটা ছিনিয়ে নিতে পারবে না।’ তার কণ্ঠে আফসোসের সুর ছিলো, আর শ্রীরাম তা বুঝতে পারলো না। ‘এখন তুমি যেমনটা বললে, সব মিলিয়ে জাতি হিসেবে আমরা তো নবজাতক।’ শব্দটার মধ্যে বেশ প্রত্যয় উদ্দীপনা আছে, এটি বাসার মতো এবং প্রীতিকর শোনায়, কারো উদ্বিগ্ন হওয়ার দরকার নেই যে এর মানে কী বা কেন এটা উল্লেখ করা হলো। ‘সত্যি কথা, সত্যি কথা,’ ফটোগ্রাফার বললো, ‘আমার কোনো অভিযোগ নেই বা অসন্তোষ নেই। আমি যা করেছি তা চরম সন্তুষ্টির সাথে করেছি। এ ব্যাপারে আমি মোটেও উদ্বিগ্ন নই। আমি যা বলছি তা হলো আমরা যা যা করেছি সেসব রেকর্ড করতে আমি এ ছবিগুলো তুলেছি, এইটুকুই।’ দেখার মতো শয়ে শয়ে ছবি ছিলো। শ্রীরাম দ্রুত পাতা উল্টাতে লাগলো। বিরক্ত বোধ করলো। ছবিগুলো দেখতে একঘেয়ে ছিলো। আরো বেশি শোভাযাত্রা। আরো বেশি মানুষ। পতাকা। জাতীয় নেতা ও অন্যান্যদের শোভাযাত্রায় বয়ে নেওয়া ছবি এবং আরো বেশি মানুষ। পুরো ব্যাপারটায় একটা ঐক্য আছে; সে তো আর সহ্য করতে পারছে না। এ্যালবামের পাতাগুলো দ্রুত উল্টিয়ে সে শেষ পাতায় এলো যেখানে কোনো এক জনসমাবেশে জগদীশকে পতাকা উত্তোলন করতে দেখা গেলো। এ্যালবামটি ফেলে রেখে শ্রীরাম জিজ্ঞেস করলো, ‘তুমি নিজের ছবি কী করে তুললে?’ ‘আহ্ , প্রাসঙ্গিক প্রশ্ন, কেই বা ফটোগ্রাফারের ছবি তুলতে পারে? অনুমান করে বলো তো কীভাবে তোলা হয়েছে। তুমি কি কল্পনা করছো আমার পিঠে ক্যামেরা লাগিয়ে নিজেকে অনুসরণ করেছি আর ছবি তুলেছি?’ ‘হয়তো, হয়তো,’পুরো ব্যাপারটায় আগ্রহ হারিয়ে শ্রীরাম বললো। আর কোনো ছবি দেখতে বা সে সম্পর্কে কিছু শুনতে চাইলো না সে । স্বাধীনতা দিবস উদযাপনের দৃশ্য তাকে বিরক্ত করে তুললো। সে প্রায় বলেই ফেললো, ‘যদি শুধু জানতাম যে মানুষ সবকিছুকে এতটুকুতে সীমাবদ্ধ করে ফেলবে, তাহলে ঘুরে ঘুরে দেয়ালে “ছাড়ো” খোদাই করতাম না এবং এক ফটোগ্রাফারকে শুধু তার এ্যালবামের রসদ যোগাতে ট্রেন লাইনচ্যূত করতাম না।’ সে ঠিক করলো যে সে আর ছবি দেখবে না। ফটোগ্রাফার বললো, ‘আমার আরো তিনটা এ্যালবাম আছে। সেগুলোতে আমাদের সংগ্রামের আরেক পর্যায় আছে।’ তাক থেকে সেগুলো নেমে আনার চেষ্টা করলো সে। শ্রীরাম তার হাত ধরে বললো, ‘না, এখন না। আমার মাথাটা ব্যথা করছে। আর কোনো ছবি দেখবো না।’ আরো ভীড়, আরো পতাকা, আরো সমাবেশ দেখতে হবে সে সম্ভাবনায় সে সন্ত্রস্ত হয়ে উঠলো। ফটোগ্রাফার বললো: ‘ভাল ছবি মাথা ব্যথার অমোঘ প্রতিকার। এই তো সম্প্রতি আমেরিকার এক বিজ্ঞানী এ তথ্য খুঁজে বের করেছে।’ শ্রীরাম প্রতিরক্ষা হিসেবে বললো, ‘কাল আবার ওগুলো ভাল করে দেখবো।’ ‘ঠিক আছে। আমার সবচেয়ে বড় আফসোস কী তুমি জানো?’ উত্তর আঁচ করার জন্য তাকে একটু সময় দিয়ে আবার বললো, ‘আমার কোনো সিনেমার ক্যামেরা নেই। শুধু একটা যদি থাকতো, তবে তুমি যে যে দৃশ্য দেখতে পাওনি সেগুলো তোমাকে আমি দেখাতাম এমনভাবে যেন নিজের চোখের সামনে তুমি দেখছো। এটাই হচ্ছে মূল বিষয়। অন্য ফটোগ্রাফারের মতো দাম নিলে সবচেয়ে বড় ক্যামেরাটা আমার থাকতো। কিন্তু, ওহ, আমরা কেউ কেউ ঝামেলাপূর্ণ বিবেকের তাড়নায় তাড়িত!’ শ্রীরাম লোকটির সাথে হতাশ বোধ করলো: আন্ডারগ্রাউন্ড কর্মী হিসেবে তাকে এত কর্তৃত্বপরায়ণ মনে হয়েছিলো: এত যথাযথ, পরিস্কার বুদ্ধিসম্পন্ন ও উদ্দেশ্যপূর্ণ মনে হয়েছিলো। কিন্তু এখন তাকে মনে হলো অগোছালো ও বিভ্রান্তিকর এবং অস্পষ্ট চিন্তার মানুষ হিসেবে। তার প্রকৃতির সাথে শান্তিপূর্ণ পরিবেশ খাপ খায় না। শ্রীরাম কিছুক্ষণ ভেবে পেলো না কেন তার আদেশ তখন পালন করেছিলো সে । হতাশ হলো যে তার নিজের জেল জীবনে লোকটি এত কম আগ্রহ দেখালো। জিজ্ঞেস করলো, ‘পুলিশ কি তোমাকে পেয়েছিলো?’ ‘আমাকে! ওহ্, না! তারা কীভাবে পাবে? তারা তো আমার খোঁজ-খবর জানতো না। তাদেরকে পুরোপুরি এড়িয়ে চলা আমার পক্ষে সম্ভব ছিলো। তুমি চলে যাওয়ার পর আমি ঐ মন্দিরে থাকতাম; প্রথম ছবিতে তা দেখোনি? খেয়াল করোনি কীভাবে আমি সেটা চিহ্নিত করেছি?’ সে আবার এ্যালবামটা আনতে চেষ্টা করলো। শ্রীরাম তাড়াতাড়ি করে বললো, ‘হ্যাঁ, হ্যাঁ, একদম ঠিক বলেছো। খুব যোগ্য হয়েছে,’ যদিও সে স্পষ্ট করে মনে করতে পারলো না সেটা কোন ছবি ছিলো। ‘তাছাড়া,’ ফটোগ্রাফার শেষ মন্তব্য করলো, ‘আমাকে পাওয়ার মতো পুলিশ কোনো উপলক্ষ খুঁজে পায়নি। আমার ঠাকুরমা তো অসময়ে মরতে বসেনি। তোমার ঠাকুরমার ক্ষেত্রে সেটা না ঘটলে তুমিও কখনো জেলে যেতে না।’ জবাবে শ্রীরাম কিছু বললো না। এমন একটা বিষয় ছিলো যা নিয়ে সে ভাবতে চাইলো না। তার আশা ছিলো দুজনার সাধারণ কোনো বিষয়ে তারা কথা বলতে পারে, ছবি থেকে কোনো আনন্দ পেতে পারে। সে সোজাসুজি জিজ্ঞেস করলো, ‘ভারতী কোথায়? জেল থেকে বেরিয়েছে নাকি?’ ‘ওহ্ , হ্যাঁ, আমি ভেবে পাচ্ছিলাম না তার ব্যাপারে তুমি আমাকে কিছু জিজ্ঞেস করছো না কেন। ভেবেছিলাম তুমি হয়তো তাকে ভুলে গেছো!’ ‘না, কখনো না! এক মুহূর্তের জন্যও না!’ চরম আবেগে শ্রীরাম চিৎকার করে বললো। ‘তাকে দেখেছো নাকি?’ ‘অবশ্যই,’ ফটোগ্রাফার এমন সুরে বললো যার ফলে শ্রীরাম উদ্বিগ্ন ও ঈর্ষান্বিত হলো। সে যখন মানুষ হত্যাকারীদের সাথে মেলামেশা করছিলো, তখন ভারতী মনে হয় জেল থেকে বের হয়ে এসে এই ফটোগ্রাফার ও তার বন্ধুদের দ্বারা ফুলের মালা দিয়ে সাদরে গৃহীত হয়েছে, আর সম্ভবত তারা সবাই বেশ মজা করেছে। ভারতী অবশ্যই ভেবে থাকবে শ্রীরাম কেন সেখানে নেই! তার আশা ছিলো যে অন্যরা অন্তত তাকে মনে করিয়ে দেবে যে শ্রীরাম জেলে আছে। ‘তাকে কী জেলখানার গেটেই বরণ করে নিয়েছিলে?’ হঠাৎ করে সে জিজ্ঞেস করলো। ‘তা-ই করা উচিৎ ছিলো, কিন্তু তার দেখা করা অসম্ভব ছিলো। যে ব্যাচগুলো আগে ছাড়া পাওয়ার কথা ছিলো সে ছিলো সেরকম একটি ব্যাচে। আর সেই সন্ধ্যায় সঙ্গে সঙ্গে সে নোয়াখালীর ট্রেন ধরেছিলো।’ ‘নোয়াখালী; ওখানে সে কী করবে? জায়গাটা কোথায়?’ তার ভূগোল জ্ঞান খারাপ ছিলো। ভৌগোলিক প্রশ্নটি উপেক্ষা করে ফটোগ্রাফার বললো, ‘পূর্ব বঙ্গে কী হচ্ছে সে ব্যাপারে কী তুমি কিছু জানো না? হিন্দু বনাম মুসলিম। তারা পরস্পরকে হত্যা করছে। কোনোকিছুই জানো না?’ ‘না। কীভাবে জানবো?’ শ্রীরাম বললো। ‘আমাকে তো পৌরসভার পড়ার কক্ষে কিংবা গণ গ্রন্থাগারে রাখা হয়নি। তুমি যা বলছো সে ব্যাপারে কিংবা কোনো কিছুর ব্যাপারেই আমি কিছু জানি না।’ ‘সাম্প্রদায়িক দাঙ্গায় গ্রামকে গ্রাম পুড়ে ফেলা হয়েছে। হাজার হাজার লোক মরেছে, স্বজনহারা হয়েছে, সর্বস্ব খুঁইয়েছে, বিকারগ্রস্ত হয়েছে, আহত হয়েছে।’ ‘কে কী করছে, কেন করছে?’ ‘ওসব জিজ্ঞেস করো না। আমার মধ্যে সাম্প্রদায়িক চিন্তা-চেতনা নেই, আর এব্যাপারে কথা বলতেও আমি পছন্দ করি না। একজন অন্য আরেকজনকে মারছে। এইটুকুই আমি জানি। জীবন স্থবির হয়ে আছে আর মহাত্মাজী সেখানে শান্তির লক্ষে গেছেন। গ্রামে গ্রামে হাঁটছেন, লোকজনকে ছোটাছুটি করতে নিষেধ করছেন, সাহসী হতে বলছেন, এটা সেটা করতে বলছেন। সিংহ ও ভেড়াকে তিনি আসলে একই থালায় খেতে বলছেন। আর ভারতী মনে হয় ডাক পেয়েছে।’ শীতল ভয় শ্রীরামকে পেয়ে বসলো। এত ঘটনার নতুন মোড় যার জন্য সে আদৌ কোনো আশা করেনি। নোয়াখালী, কলিকাতা, বাংলা, এসবের অর্থ কী? তার কাছ থেকে দূরে সরে যাওয়ার মানে কী? ভারতী কি ইচ্ছা করেই এটা করেছে? শ্রীরাম জেল থেকে বের হওয়ার আগে ভারতী কি তার পালিয়ে যাওয়ার ক্ষতি পুষিয়ে নিলো? ‘চলে গিয়ে সে কী বোঝাতে চাইলো?’ এ প্রশ্নে ফটোগ্রাফার শুধু হাসলো। ‘সে কি জেলে এসে আমার সাথে দেখা করতে পারতো না? আমি যে জেলে আছি সেটা তো সে নিশ্চয়ই জেনে থাকবে?’ ‘কীভাবে?’ ফটোগ্রাফার জিজ্ঞেস করলো। ‘খোঁজ-খবর নিয়ে, ব্যস, এটা তো সোজা,’ অনুভূতির সাথে শ্রীরাম বললো। সে বললো, ‘হয়তো আমাকে নিয়ে তার কোনো ভাবনা নেই। হয়তো সে আমাকে একদম ভুলে গেছে!’ তার মন খারাপ দেখে জগদীশ ভাবগম্ভীর হলো। ‘ওসব নিয়ে এত মাথা ঘামিয়ো না। তুমি কি তার কথা প্রায়ই ভাবো?’ জবাবে শ্রীরাম কিছু একটা বলতে লাগলো, কিন্তু কথা খুঁজে পেলো না। কথা জড়িয়ে যাওয়ায় আর কিছু বললো না এবং ফুপিয়ে ফুপিয়ে কাঁদতে লাগলো। ফটোগ্রাফার তার পিঠে হাত বুলিয়ে দিয়ে বললো, ‘কী হয়েছে তোমার যে এখন এ ব্যাপারে এত খারাপ লাগছে?’ জবাবে শ্রীরামের বেশি কিছু বলার ছিলো না। সে শুধু ফুপিয়ে ফুপিয়ে কাঁদতে থাকলো। ফটোগ্রাফার বললো, ‘তুমি বোকা! তার সংস্পর্শে থাকার মতো তুমি কী করেছো?’ ‘তুমি কী বলতে চাচ্ছো? শৃঙ্খলিত ও বন্দী থাকা অবস্থায় আমি কী করতে পারতাম?’ ‘এখন, আমি বলতে চাচ্ছি। এ ব্যাপারে তুমি কী করতে যাচ্ছো এখন? তুমি তো এখন শৃঙ্খলিত বা বন্দী নও। এ ব্যাপারে কী করতে যাচ্ছো?’ ‘আমার কাছ থেকে সে এত দূরে, হাজার হাজার মাইল দূরে,’ শ্রীরাম বিলাপ করলো। নোয়াখালীর ভাবনাটা তাকে খুবই জ্বালালো। ‘কিন্তু ডাক বিভাগ বলে তো একটি জিনিস আছে। তোমার চিঠি বহন করতে বিশেষ কোনো দূত নিয়োগ করতে হবে না। তাকে লিখছো না কেন?’ ‘তুমি কি চিঠিটাতে ঠিকমতো ঠিকানা লিখে পাঠিয়ে দেবে?’ ‘কথা দিচ্ছি দেবো। আমাকে ওটা দাও। আমি পাঠিয়ে দেবো।’ এতে শ্রীরামের মধ্যে আশার আলো জেগে উঠলো। হঠাৎ করে সে জিজ্ঞেস করলো, ‘তার কাছে কী লিখবো?’ ‘হুম, সেটা তো আমি তোমাকে বলতে পারবো না। এসব বিষয়ে প্রত্যেকটা মানুষের নিজস্ব স্টাইল থাকে।’ এটা স্পষ্ট যে তার মন পুরো কুয়াশাচ্ছন্ন ছিলো। স্বচ্ছভাবে চিন্তা করা বা পরিকল্পনা করা তার সাধ্যের বাইরে ছিলো। জেল জীবনের ক্ষতি এখন মাত্র প্রকাশ পেলো। ফটোগ্রাফারের দয়া হলো তার প্রতি। বললো, ‘একটু বিশ্রাম নাও। চোখ বন্ধ করে বিশ্রাম নাও।’ ছোট একটা টেবিলে গিয়ে একটা কলম ও একটা কাগজ নিয়ে লিখতে শুরু করলো সে। বাইরের রাস্তায় তখন যানবাহন চলাচল থেমে গিয়েছিলো। ‘ তোমার দোকান বন্ধ করতে চাও না?’ শ্রীরাম জিজ্ঞেস করলো। ‘ও নিয়ে তুমি মাথা ঘামিয়ো না। নিজের দেখাশুনা আমি নিজেই করতে পারি। এ ধরনের লেখা লিখতে আমি খুব একটা পারঙ্গম নই। যাই হোক, চেষ্টা করছি। যদি পারো এর মধ্যে চোখ বন্ধ করে চিন্তা করা বাদ দাও।’ সে বসে বসে বিশ্বস্ততার সাথে দীর্ঘ একটা চিঠি লিখলো যার শুরু এভাবে: ‘প্রিয়তমা, Ñ এভাবে কে পালিয়ে বেড়ায়! আমিও তো জেলে থাকতে পারি। কিন্তু জেলে থাকি আর বাইরে থাকিÑÑ আমার মনে সব সময় একটাই ভাবনা, সেটা হচ্ছো তুমি। দিন রাত তোমাকে নিয়ে ভাবি, আর জেলের কোনো নিয়ম-নীতিই তোমার ভাবনা থেকে আমাকে বিরত রাখতে পারেনি। আর আজ আমি জেলের বাইরে এলাম এবং আমার ভাল বন্ধু জগদীশ (চমৎকার মানুষ, বলতে হবে) তোমার ব্যাপারে আমাকে বললো। জেলখানার বার আমাকে তোমার কাছ থেকে এতদিন দূরে রেখেছে, আর এখন এখানকার এবং সেখানকার মধ্যে মাইলের পর মাইল দূরত্ব, কিন্তু কোনো ফল নেই। এ দূরত্ব আমার কাছে কোনো দূরত্বই নয়। আমি কি এসে তোমার সাথে যোগ দিতে পারি, কারণ আটকে পড়া মাছের মতো হাঁপাতে হাঁপাতে আমি মারা যাবো যদি তোমাকে না দেখি, তোমার সাথে কথা না বলি? যত তাড়াতাড়ি সম্ভব আমাকে উত্তর দেবে।’ চিঠিটা লিখতে গিয়ে জগদীশ এমনভাবে হারিয়ে গেলো যে সে ভুলেই গেলো এতে কত সময় লাগছিলো, আর শ্রীরাম তার আসনে ঝিমোতে লাগলো এবং মৃদু নাক ডাকতে লাগলো। তার দিকে তাকিয়ে জগদীশ কিছুক্ষণ দ্বিধা বোধ করলো। পেপার ওয়েটের নিচে চিঠিটা রেখে সে কাভারিং নোট লিখলো: ‘অনুমতি মিললে এ চিঠিটা স্বাক্ষর করে সকালে প্রথমে পাঠাতে হবে, যদিও এটা তোমার হাতে কপি করা উচিৎ হবে।’ উঠে গিয়ে দোকানের সামনের দরজাটা সে বন্ধ করলো। বাতি নিভিয়ে থাকার ঘরে গেলো এবং আস্তে করে পিছনের দরজাটা বন্ধ করে দিলো। দশদিন উদ্বেগের সাথে ও মরিয়া হয়ে অপেক্ষা করার পর শ্রীরাম একটা চিঠি পেলো: ‘তোমার খবর শুনে খুশি হলাম। দিল্লীতে চলে আসো। যদি পারো নয়াদিল্লীর বিরলা হাউসে আসো। আমাদের কর্মসূচী এখনো ঠিক হয়নি। বাপুর সাথে আমরা বিহারে যাচ্ছি যেখানে সমস্যা দেখা দিয়েছে। তোমাকে অনেক কথা বলার আছে। ১৪ জানুয়ারী আমরা দিল্লীতে থাকবো। তারপর যখন খুশি এসো। তোমার সাথে দেখা হলে আমরা খুশি হবো। ভারতী ’ ** গ্রান্ড ট্রাঙ্ক এক্সপ্রেসটি শেষে নিউদিল্লী স্টেশনে এসে পৌঁছালো। ভারতীকে প্রথম নজরে দেখার জন্য শ্রীরাম জানালায় পৌঁছাতে সংগ্রাম করলো। জানালার ধারের লোকজন তাকে এর কাছে আসতে দিলো না। তাদের সাথে কথা বলেও কোনো লাভ হলো না: তারা ভিন্ন এক জগতে বাস করে বলে মনে হলো। সে তামিল ও ইংরেজিতে বললো, আর তারা হিন্দি, হিন্দুস্তানি, উর্দু বা এরকম যা কিছুই হোক না কেন তা বুঝতো। ভারতী যে হিন্দি শেখার জন্য তাকে এত পীড়াপীড়ি করেছিলো সেটার তাৎপর্য্য এখন সে উপলব্ধি করতে পারলো। ভারতীকে সন্তুষ্ট করতে সে হিন্দির প্রাথমিক কিছু বই পড়েছিলো, কিন্তু এতে সে কিছুই শেখেনি। গত ছত্রিশ ঘন্টা ধরে সে বিচ্ছিন্ন আছে। বসে বসে গভীরভাবে ভাবছে, নিজের সঙ্গ বজায় রাখার শিক্ষা সে জেল জীবন থেকে শিখেছে। তার সবচেয়ে বড় বিচার হলো যখন ট্রেন চলন্ত থাকা অবস্থায় দুজন লোক হঠাৎ করে কোথা থেকে যেন হাজির হয়ে কম্পার্টমেন্টের সব লোককে খুঁটে খুঁটে দেখলো; যখন তারা তার কাছে এলো, তখন তারা তার সামনে থেমে একটা প্রশ্ন জিজ্ঞেস করলো। অনেক কিছুর মধ্যে সে শুধু ‘সাহেব’ এবং ‘হিন্দী’ শব্দদুটো বুঝতে পারলো। তারা দেখতে ছিলো উচ্ছৃঙ্খল। ভাঙ্গা ভাঙ্গা হিন্দী, তামিল এবং ইংরেজিতে সে কিছু বললো যা তাদের মধ্যে কোনো ধারণার সৃষ্টি করলো বলে মনে হলো না। ভয়-ভীতি দেখানোর ভাব নিয়ে তারা তার কাছে এসে মুখের দিকে তাকালো; শ্রীরাম আত্মরক্ষার্থে লড়াই করার জন্য প্রস্তুত হচ্ছিলো। সে লাফিয়ে উঠলো এবং তাৎক্ষণিকভাবে যে ভাষাটা মুখে এলো সে ভাষায় জিজ্ঞেস করলো, ‘আপনারা কী বোঝাতে চাচ্ছেন, সবাই আমার দিকে এভাবে তাকিয়ে আছেন কেন?’ সে উঠলে পরে দুজনার একজন তাকে ভাল করে দেখার জন্য কানের লতি ধরে টান দিলো, শৈশবে লতিতে হওয়া ছোট গর্তটা দেখলো এবং ছেড়ে দিয়ে বিড়বিড় করে বললো, ‘হিন্দু’। আগ্রহ হারিয়ে তারা চলে গেলো। তারা চলে যাওয়ার পর কম্পার্টমেন্টে বিরাট একটা উৎকণ্ঠা দূর হয়ে গেলো। কেউ একজন ব্যাখ্যা করতে লাগলো বিভিন্ন ভাষায় এবং অনেক চেষ্টার পর শ্রীরাম বুঝলো যে অনুপ্রবেশকারীরা কম্পার্টেমেন্টে মুসলমানদের খোঁজ করছিলো: কোনো মুসলমান পাওয়া গেলে তাদেরকে চলন্ত ট্রেন থেকে ফেলে দেওয়া হতো: দেশের অন্যান্য অঞ্চলে লড়াইয়ের প্রতিধ্বনি হচ্ছিলো। যাত্রার বাকি সময়টা শ্রীরাম নীরব হয়ে রইলো। যাত্রাটা ছিলো খুবই অস্বস্তিদায়ক: সে ভেঙ্গে পড়লো, একটু নড়াচড়া করার কিংবা হাত দোলানার কোনো জায়গা পেলো না: লোকজন ভীড় করে এসে তার উপর বসে পড়লো। মাঝে মাঝে তো সে পা দুটো ছড়াতে পারলো না। ঘুম ঘুম বোধ হলে মাথাটা সে পিছনে জানালায় অথবা সম্পূর্ণ এক আগন্তুকের কাঁধে এলিয়ে দিলো । ক্ষুধা বোধ করলে বাইরের একজন চা বিক্রেতাকে ডাক দিয়ে চা খেলো। কফি পেলো না। এখানকার লোকজনকে আজব মনে হলো যারা খুব মিষ্টি জিলাপি দিনের প্রথম জিনিস-- তিতা চা দিয়ে হাপুস হুপুস গিলে খেলো: এতে সে নিশ্চিত হলো যে সে অদ্ভূত, আজব এক জগতে আছে। সত্যিকারের দক্ষিণ ভারতীয়ের মতো সে তার প্রিয় কফি খেতে ব্যাকুল হয়ে উঠলো, কিন্তু এখানে কফি পাওয়া গেলো না। এর স্বপ্ন দেখেই তাকে ক্ষান্ত হতে হলো যেমনটা তাকে জেলে থাকতে হতো। বস্তুত এটা জেল জীবনেরই বর্ধিত রূপ: অনেক আগন্তুকের সাথে গাদাগাদি করা, উপচে পড়া ভীড়ের কম্পার্টমেন্টের এই জীবন। জেলে তার যেমন লেগেছিলো তার চেয়ে এখানে বেশি অস্বস্তি বোধ হলো। সেখানে তো সে অন্তত কিছু বলতে পারতো কিংবা অন্যের মুখ থেকে কিছু শুনতে পারতো, কিন্তু এখানে মানুষের কণ্ঠে দূর্বোধ্য বকবকানি ছাড়া কিছুই নেই। কম্পার্টমেন্টে সেইসব লোকে ভরে গিয়েছিলো যারা বিড়ির ধোঁয়ায় এটি ভরে তুলেছিলো, আর ভাবনা চিন্তা ছাড়াই মোতাগুলো মেঝেতে ফেলে দিয়েছিলো। টয়লেটে তো প্রায় কখনো যাওয়া যেতো না। ট্রেন কিছুক্ষণের জন্য থামলে লাফ দিয়ে নেমে সে এ কাজ সামলে নিতো এবং ট্রেন হুইসেল দিলে আবার দৌড়ে উঠে যেতো। কোনো একদিন ট্রেনটি সাড়ে দশটা বা এগারোটায় নয়াদিল্লীতে এসে পৌঁছালো। ‘নব দিহিলি ’ বলে কম্পার্টমেন্টের লোকজন চিৎকার করে ছোটাছুটি করতে লাগলো। ভারতীকে এক নজর দেখার জন্য সে জানালা কিংবা দরজার দিকে দৌড়াতে চেষ্টা করলো। ভারতী স্টেশনে তার সাথে দেখা করবে বলে কথা দিয়ে লিখেছিলো। শ্রীরাম তার চেহারা নিয়ে লজ্জা বোধ করলো: আঙ্গুল দিয়ে চুলগুলো আঁচড়িয়ে পিছনে নিয়ে গেলো: চুলগুলো উস্কোখুস্কো ও খাড়া হয়েছিলো। সে জানতো যে সে বিশ্রী, বীভৎস ও কদাকার। তার ইচ্ছে হলো এত বছর পর ভারতী তার দিকে চোখ রাখার আগে সে যদি নিজেকে পরিচ্ছন্ন রাখতে পারতো। জানালায় গাদাগাদি করা কিছু মাথা ও কাঁধের মধ্য দিয়ে ভারতীকে সে এক নজর দেখলো, আর উৎকণ্ঠার মধ্যে লোকজনকে রূঢ়ভাবে ঠেলাঠেলি করলো। ট্রেনটি তখন থামার আগে কিছুটা চললো। ভারতীকে দাঁড়িয়ে থেকে উৎসুকভাবে জানালার দিকে এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকতে দেখলো। এক সেকেন্ডের জন্য সে তার অবয়ব দেখতে পেলো, আর এতে তার মন দমে গেলো। তার ইচ্ছা হলো ভারতীর মুখোমুখি হওয়ার দেখার আগে সে যদি তার চেহারার উন্নতি সাধন করতে পারতো। তার ইচ্ছা হলো সে যদি ভীড়ের মধ্যে গা ঢাকা দিয়ে ভারতীকে পরে দেখতে পেতো। বর্তমান এই অবস্থায় দেখলে ভারতী তার সম্পর্কে কী ভাববে সে ব্যাপারে তার অনেক সন্দেহ হলো। কিন্তু এই মরিয়া অবস্থায়ও ট্রেনের অভিজ্ঞতা থেকে সে জানতো যে সে আর কখনো পথ বের করে তার খোঁজে যেতে পারবে না। ভারতী হয়তো চিরদিনের জন্য তার কাছ থেকে হারিয়ে যেতে পারে। ট্রেন থেকে যখন সে বিছানা ও ট্রাঙ্ক নিয়ে নামলো, ভারতীর অনুসন্ধানী চোখ তখন ভীড়ের মধ্যে তাকে ঠিকই খুঁজে পেলো। ভারতী তার হাত নাড়িয়ে তার কাছে ছুটে এলো। শ্রীরামের হাত দুটো মুঠোয় ধরে বললো, ‘ওহ্, আবার তোমাকে দেখতে পেয়ে কত ভাল লাগছে!’ আর স্বতঃস্ফূর্ত সোহাগের এই সুরে শ্রীরাম নিজেকে হারিয়ে ফেললো, নিজের চেহারা ও কুশ্রীতা ভুলে গিয়ে আত্মবিশ্বাস অর্জন করলো। তার উপরে নিচে তাকিয়ে চিৎকার করে বললো, ‘তোমাকে তো উত্তর ভারতীয়ের মতো দেখাচ্ছে। পাঞ্জাবীদের মতো দেখাচ্ছে। আশা করি তুমি আমাদের ভাষা বোঝো।’ ভারতী তৎক্ষণাৎ তার দায়িত্ব নিলো। শ্রীরামের বিছানা তুলে নিয়ে বললো, ‘তুমি ট্রাঙ্কটা নাও।’ শ্রীরাম তার হাত থেকে বিছানাপত্র ছিনিয়ে নিয়ে ভারটা নিজের কাঁধে রাখলো। ভারতী বললো, ‘অবুঝ হয়ো না। মনে রেখো তোমার কিন্তু চারটা হাত নেই।’ আর ভারতী তার হাত থেকে বিছানাপত্র আবার ছিনিয়ে নিলো। শ্রীরামের বিভ্রান্তি দূর হলো। ভারতীর সান্নিধ্যে সে বাড়ীর মতো বোধ করলো। মনে হয় যেন তার সাথে মালগুদিতে সে ফিরে এসেছে। অদ্ভূত পরিপার্শ্ব, অদ্ভূত পথ ঘাট, বিল্ডিং, অতিমাত্রায় চওড়া রাস্তা, বিদেশী পুরুষ ও নারী এবং তাদের ফেলে আসা অদ্ভূত দোকানগুলোর দিকে সে লক্ষ করলো না। কোনো কিছুর দিকে খেয়ার করার সময় তার নেই। তার পূর্ণ মনোযোগ ভারতীকে কেন্দ্র করে। ভারতীকে বেশ খানিকটা কৃষ্ণকায় ও ক্লান্ত দেখালো, কিন্তু তার কেশগুচ্ছ আগের মতোই কালো ছিলো। এমন ক্লান্ত দেখালো যেন সে না খেয়ে খেয়ে অপুষ্টিতে ভুগছে। তাকে আবার দেখতে পেয়ে সে বেশ অবাক হলো। সে যা দেখলো ও অনুভব করলো তা সে কখনো বিশ্বাস করতে পারছিলো না। হয়তো সে আজব কোনো স্বপ্ন দেখছে। হয়তো সে মরে গেছে। অথবা বন্দী অবস্থায় স্বপ্ন দেখছে। এতগুলো বছর মাসের মধ্যে এই প্রথমবারের মতো তার মনটা মুক্ত ও খুশী হলো, যে মনে কোনো দ্বন্দ কিংবা কোনো দুঃখ নেই। ভবিষ্যতের কোনো লালসা নেই বা অতীতের কোনো অনুশোচনা নেই। তার জীবনে এই প্রথম সে পুরোপুরি শান্তিতে থাকলো, অস্তিত্বের সাথে গভীরভাবে সন্তুষ্ট হলো। এখন যে কেউ নিঃশ্বাস নিচ্ছে, অনুভব করছে এবং দেখছে তা সন্তুষ্টির জন্য যথেষ্ট বলে মনে হলো। ভারতী তার দিকে তাকিয়ে থেকে জিজ্ঞেস করলো, ‘তুমি কবে ছাড়া পেলে?’ শ্রীরাম তার জেল জীবনের সারাংশ এবং ভারতীকে শেষ বারের মতো দেখার পর কী কী ঘটেছিলো তার সংক্ষিপ্ত বিবরণী তুলে ধরলো। ঘোড়ার গাড়িটা সুন্দরভাবে চললো। যে চরম সহানুভূতির সাথে ভারতী শ্রীরামের গল্প শুনলো তাতে শ্রীরাম অনেক সন্তুষ্ট হলো। এতে গুরুত্বের ছোঁয়া লাগলো। কথা বলার সময় শ্রীরাম নিজের কর্মে মুগ্ধ হলো। মনে মনে জিজ্ঞেস করছিলো: ‘এসব কিছু কি আমিই না অন্য কেউ করেছে?’ চরম বীরত্ববোধে সে ভরে গেলো। ‘কখনো ভাবিনি যে এ সব ঝামেলা আমি পোহাতে পারবো। আমার খুব আগ্রহ ছিলো যে রাস্তার লোকটিÑÑ’ এভাবে শুরু করে সে নিজের গুরুত্বে ফুলে উঠলো। শ্রোতা, ভারতী তার সারা জীবনকে নতুন অর্থ ও নতুন মাত্রা উপহার দিলো। নয়াদিল্লীর এক জায়গায় কুটির কলোনিতে তারা পৌঁছালে শ্রীরাম তার সারা জীবন ধরে যে সমস্ত কাজ করেছে তা নিয়ে পুরোপুরি সন্তুষ্ট হলো। ‘এই হচ্ছে আমার বর্তমান সদরদপ্তর,’ ভারতী ব্যাখ্যা করে বললো। নিজের কুটিরে তাকে নিয়ে গেলো। ‘হ্যাঁ, এটাই আমার বাসা।’ এক কোণায় চরকা এবং অন্যদিকে দরজার প্রবেশপথ দিয়ে রশিতে ঝুলানো তার কাপড় ছিলো। ‘হাজার হলেও সে তো আমার বউ হতে যাচ্ছে, সে কারণে তার সাথে থাকতে সে কিছু মনে করছে না,’ শ্রীরাম ভাবলো। ভারতী বললো, ‘এক ঘন্টার মধ্যে তুমি তোমার “ঘর” পেয়ে যাবে, সে পর্যন্ত এখানে বিশ্রাম নিতে পারো। আরেকটা ব্লক আছে, সেখানে তুমি হাত মুখ ধুয়ে নিতে পারো। আরাম করে নাও।’ সে যখন কথা বলছিলো, তখন এক দল বাচ্চা দৌড়ে এসে কেঁদে কেঁদে বললো, ‘মই, মইÑÑ’ আর শ্রীরাম তা বুঝতে পারলো না। তারা এসে ভারতীকে ঘিরে তাকে হাত ধরে টেনে নিয়ে গেলো। ভারতী থেমে তাদেরকে তাদের ভাষায় কী যেন বললো। তখন তারা তাকে ছেড়ে চলে গেলো। ‘ওরা কারা?’ একটু ঈর্ষার ছোঁয়া নিয়ে শ্রীরাম জিজ্ঞেস করলো। ‘বাচ্চা, তাদের সম্পর্কে এটুকুই আমরা জানি,’ ভারতী বললো। ‘কোথায় থাকে ওরা?’ ‘এখন এখানে,’ ভারতী বললো, ‘ওরা শরণার্থী শিশু, ওদের সম্পর্কে আর কিছু আমরা জানি না। এক ঘন্টা নাগাদ আমি আসছি। আরাম করো।’ আর সে বাইরে গেলো। অনেকক্ষণ সে ফিরে এলো না। যে সময় নাগাদ ফিরে এলো সে সময়ের মধ্যে শ্রীরাম তার পরিপার্শ্ব অনুসন্ধান করলো। বাথরুম ও ট্যাপ বের করলো এবং হাত মুখ ধুয়ে পরিস্কার-পরিচ্ছন্ন হলো। এরপর কুটিরে ফিরে গিয়ে লম্বা সময় ধরে মাথার চুল আঁচড়িয়ে পিছনে নিয়ে গেলো এবং আয়নায় খুঁটে খুঁটে দেখলো এটা ঠিক করতে যে সে ভারতীর যোগ্য কিনা। ভারতীর দয়া তার ভেতরে আস্থার পুনরুদ্ধার ঘটিয়েছে। সে কখনো আশা করেনি যে ভারতী তাকে এত উষ্ণতা ও দয়া দিয়ে দেখবে। যে সময়গুলোতে তারা পরস্পরের কাছে ছিলো না সে সময়গুলো কোনো তফাৎ করেছে বলে মনে হলো না। মনে হচ্ছে যেন এই তো এক ঘন্টা হলো তারা বিচ্ছিন্ন ছিলো: নিঃসঙ্গতা, কামনা ও বিরক্তির সময়গুলো গত কয়েক বছরে তার জীবনকে নরক বানিয়েছিলো। এখন সেগুলো দূর হয়ে গেছে যেন সেগুলোর কোনো অস্তিত্বই ছিলো না। ভারতীর একটা শাড়ি ঝুলে থাকতে দেখলো সে, হলদে ফোটাসহ সাদা শাড়ি। এ শাড়িটা অবশ্যই হাতে তৈরি খাদি পোশাক; এর ভারে রশিটা দেবে গিয়েছিলো। সেটা টেনে নামিয়ে হাতে নিয়ে ওজন মাপলো আর ভাবলো, ‘বেচারী, তার মিহি সূতার শাড়ি পরা উচিৎ। তাকে আমি সবকিছু দেবো।’ সেটা হাতে নিয়ে ওজন করলো; ‘বিশ পাউন্ড হবে মনে হয়।’ শাড়িটা প্রসারিত করে চোখের সামনে ধরলো। ‘এটা তো ধাতব পাতের মতো। এটা পরে তার নিশ্চয়ই দম আটকে যায়। এর মধ্যে দিয়ে তো কোনো আলো যেতে দেখছি না।’ এরপর শাড়িটা ভাঁজ করে বুকে চেপে ধরলো। এতে হালকা চন্দনের সুরভি থাকায় সে আনন্দ বোধ করলো। ‘এতে তো তার শরীরের সুগন্ধ লেগে আছে,’ চোখ বন্ধ করে সে ভাবলো। সে যখন সেখানে বসলো, তখন দরজা খুলে গেলো, আর ভারতী তার সামনে এসে দাঁড়ালো। ‘আমার শাড়ি নিয়ে তুমি কী করছো?’ বিস্ময়ে ভারতী জিজ্ঞেস করলো। ‘কেউ ভাববে তুমি এটা পরার চেষ্টা করছো,’ হেসে হেসে বললো। শ্রীরাম লাল হয়ে গেলো, আর শাড়িটা দ্রুত সরিয়ে ফেললো। ‘এটা করে তুমি আমাকে ঠেকাতে চেষ্টা করো না,’ শ্রীরাম বললো, ‘একবার যখন এটা বুকে নিয়েছি।’ ‘চুপ!’ ভারতী চিৎকার করে বললো। ‘অবুঝ হওয়ার চেষ্টা করো না। মনে রাখবে আমরা সবাই এখানে খুবই গুরুগম্ভীর মানুষ। তুমি তো দেখছি পরিস্কার-পরিচ্ছন্ন হয়েছো। তোমার কোনো কাপড় ধোয়ার থাকলে আমাকে দিয়ে দিও।’ বাথরুম থেকে ফিরে আনা ছোট একটা পুঁটলি তার হাতে ধরিয়ে দিলো শ্রীরাম। ‘ভয়ংকর নোংরা হয়েছে,’ ক্ষমা চেয়ে বিড়বিড় করে বললো সে। তার হাত থেকে পুঁটলিটা ছিনিয়ে নিয়ে ভারতী বের হয়ে গেলো। শ্রীরাম ভাবলো, ‘সে তো আমার বউয়ের মতোই হয়ে গেছে, কোনো বউ যা করে সে তা-ই করছে, ভাল মেয়ে! ভগবান তাকে আশীর্বাদ করুন। সে ঘুমিয়ে গেলে কোনোভাবে যদি তার গলায় একটা মঙ্গলসূত্র বেঁধে দিতে পারি, তাহলে সব ঠিক হয়ে যাবে। এক মূহূর্তের মধ্যে ফিরে এসে ভারতী বললো, ‘সন্ধ্যায় তোমার কাপড় পাবে। এ শিবিরে সবাই নিজ নিজ কাপড় ধোবে এবং কাউকে এ কাজটা করার জন্য নিয়োগ করবে না এমনটা প্রত্যাশা করা হয়, কিন্তু তুমি তো নতুন, আর তাই ব্যতিক্রম হিসেবে তোমার কাপড় ধোয়ার জন্য আমি ধোপার ব্যবস্থা করেছি। তোমার কি ক্ষুধা পেয়েছে?’ ‘চরম,’ শ্রীরাম বললো। ‘কিছু একটা খাওয়ার জন্য কাতর হয়ে আছি।’ ‘কিছু একটা বলতে তুমি কী বোঝাতে চাচ্ছো আমি তা জানি না,’ ভারতী বললো। ‘আমাদের দক্ষিণ ভারতের সব খাবার তো তুমি আশা করতে পারো না। মাসের পর মাস চলে গেলো ওরকম কিছু খেয়ে দেখিনি। চাপাতি, শাকসবজি, দই ও ফলমূল খাওয়া তোমাকে শিখতে হবে, আর ভাত বা সম্বার চাওয়া যাবে না।’ সে শ্রীরামকে একটা কাঠের ঘরে নিয়ে গেলো; সেখানে কিছু লোক খাওয়া দাওয়া করছিলো এবং শিশুরা তাদের সামনে থালা নিয়ে বসেছিলো। শ্রীরাম ও তার জন্য পাশাপাশি দুটো বড় থালা রাখা ছিলো। ‘এভাবে স্বামী-স্ত্রী একসাথে বসে,’ ভারতীর পাশে বসতে গিয়ে শ্রীরাম ভাবলো এবং গমের চাপাতি খেতে চেষ্টা করলো। দক্ষিণ ভারতের ঝালযুক্ত খাবার, চাটনি ও শাকসবজির জন্য সে ব্যাকুল হয়ে উঠলো, কিন্তু সেই ভাবনা সে চেপে গেলো। জেল জীবনে তাকে যা দেওয়া হয়েছিলো তা-ই খাওয়া সে শিখেছে। ‘আমি এখনো আসলে জেলেই আছি,’ সে ভাবলো। সারাদিন চরম ব্যস্ত ছিলো ভারতী। অনেক কাজ করলো বলে মনে হলো। সব সময় শিশুদের সেবা যতœ করছিলো, কারো কাপড় বদল করে দিচ্ছিলো, কারো চুল আঁচড়ে দিচ্ছিলো, কোনো দলকে খেলা না হয় নাচে নিযুক্ত করছিলো, আর তাদের সাথে অনবরত কথা বলে যাচ্ছিলো; এছাড়া তার খোঁজে আসা নানাবিধ নারী পুরুষ অনেক কথা বলছিলো। তার কাজটা ছিলো পূর্ণকালীন। শিশুদেরকে স্নান করিয়ে দিলো, খাইয়ে দিলো, বিভিন্ন চালাঘরের মাদুরে ঘুম পাড়িয়ে তাদের গায়ে কম্বল মুড়িয়ে দিলো, তাদের প্রত্যেককে কী যেন বললো, আর অবশেষে তার নিজের ঘরে ফিরে এসে খাটে বসে পড়লো এবং হাতদুটো সটান করে প্রসারিত করলো। শ্রীরাম তাকে ঘন্টার পর ঘন্টা অনুসরণ করলো কিন্তু নিজের কোনো কথা তাকে শোনাতে পারলো না। শিশুদের দেখে হাসি দিতে চেষ্টা করলো এই ভেবে যে এতে ভারতী খুশি হতে পারে, কিন্তু ভারতী তাদের সাথে থাকাকালীন তার উপস্থিতি প্রায় লক্ষই করলো না। এতে শ্রীরাম ক্ষুব্ধ হলো। একটা সময় পর সে ঘুরে দাঁড়িয়ে তার কুটিরে ফিরে গেলো। কুটিরটায় রশির খাট ও মাদুর ছিলো, তবে কোনো দরজা ছিলো না। গলির মাথায় একটা গণ বাথরুম ছিলো যা সে অন্যদের সাথে ভাগাভাগি করে ব্যবহার করতো। এখানে তাকে স্থানান্তর করে আনা হলে সে রুষ্ট হয়েছিলো। এতে তার সকল আশা চূর্ণ হলো বলে মনে হলো। ‘আমার কাছ থেকে মুক্তি পেতে কি সে আমাকে এখানে রেখেছে?’ সে ভাবলো। ‘এটা কি এ কারণে যে আমি তার ফুটকিওয়ালা শাড়িটা তুলে নিয়েছিলাম বলে? সেটা না করলে সে হয়তো আমাকে একই ঘরে ঘুমোতে দিতো। আমি হয়তো তার বিশ্বাস ভঙ্গ করেছি।’ অনুশোচনায় ভাবলো সে। ‘বিশ্বাস! কে তার বিশ্বাস চায়! আমি তো শুধু তাকে চাই।’ বাতি জ্বালিয়ে বিছানায় বসে ছিলো সে। প্রবেশ পথটা অন্ধকার হয়ে এলো। কুটিরের নিচের ছাদটার জন্য গুমোট ভাবের সৃষ্টি হলো যদিও শীতে এতে জায়গাটা গরম থাকে। ভারতী শ্রীরামের ধৌত করতে দেওয়া কাপড়গুলো হাতে নিয়ে ভেতরে এলো। কুটিরে বসে থেকে শ্রীরাম এই ভয়ে আচ্ছন্ন হলো যে সে এখনো জেলের কক্ষে বন্দী হয়ে আছে। ‘আমার জেল আমার পিঠের উপর এসে সবসময় পড়ে থাকে মনে হয়,’ সে ভাবলো। যাত্রার ক্লান্তি তাকে আক্রান্ত করতে লাগলো, তীব্র ঠাণ্ডা হাওয়া, অন্ধকারময় ও নতুন পরিপার্শ্ব তাকে বিষন্ন করে তুললো, আর এতে সে অখুশি বোধ করলোÑÑ অকারণ অন্ধকার ও অখুশি অবস্থা। অভিজ্ঞতালব্ধ সুখের ক্ষণিক প্রবাহকে কাল্পনিক মনে হলো। বিছানায় কাপড়গুলো রেখে দিয়ে ভারতী বললো, ‘আরাম বোধ করছো তো?’ ‘হ্যাঁ এবং না। তুমি সাথে থাকলে খুশি লাগে, আর চলে গেলে খারাপ লাগে।’ চমকে উঠে ভারতী তার দিকে তাকালো। শ্রীরাম বলেই চললো, ‘এখানে বসবে না?’ আর তাকে খানিকটা জায়গা করে দিলো। ভারতী বসে পড়লো। শ্রীরাম তার কাছে সরে গিয়ে নিজের হাতটা তার কাঁধে ছড়িয়ে দিলো। ভারতী বললো, ‘এখনো নয়,’ আর তার হাতটা আলতো করে সরিয়ে দিলো। ‘কী অদ্ভূত মানুষ!’ সে চিৎকার করে বললো। ‘তুমি একটুও বদলে যাওনি।’ শ্রীরাম তার কাছ থেকে দূরে বসে জিজ্ঞেস করলো, ‘এখনো কি আমি অস্পৃশ্য?’ ভারতী বললো, ‘বাপুজীই শুধু সিদ্ধান্ত নিতে পারে।’ ‘তাঁর সাথে এ নিয়ে কথা বলেছো?’ ‘হ্যাঁ, কয়েকবার, কিন্তু তিনি এখনো কোনো জবাব দেননি।’ মৃদু স্বরে বলে মাথা নিচু করে রইলো সে। তাকে বশীভূত দেখালো। কিছুক্ষণ থমথমে নীরবতা বিরাজ করলো, তারপর শ্রীরাম জিজ্ঞেস করলো, ‘কেন? তিনি কি চান না আমরা বিয়ে করি?’ ‘তা না হতে পারে,’ ভারতী বললো। ‘কিন্তু এটা নিয়ে ভাবার মতো তাঁর আসলেই সময় নেই, আরো অনেক কিছু করার আছে তাঁর।’ বাপুজী যে তাদের বিয়ের বিরুদ্ধে নয় সেটা জেনে শ্রীরাম স্বস্তি পেলো, কিন্তু এতে হলো না। দম বন্ধ করে কোনো কথা না বলে সে শুনলো। তার ভয় হলো যে তার সামান্যতম কথাও সব কিছুকে ভেস্তে দিতে পারে। ফিসফিস করে কোমলতম ভাষায় কথা বলার সময় এটা। কঠোর কিছুতে পুরো গঠনটা ধ্বংস হয়ে যেতে পারে। নিজেকে নিজেই রক্ষা করতে চাইলো সে। এমন কিছু করতে চাইলো না যাতে ভারতী আতঙ্কগ্রস্ত হয়ে তার কাছ থেকে দূরে চলে যায়, এমন কিছু না যাতে হাজার মাইল অতিক্রম করা পথটা নিস্ফল হয়ে যায়। তাই সে কথা বলা থেকে বিরত থাকলো। তাকে চিৎকার করে বলতে চাইলো এটা কি শুধু এ জন্য যে ভারতী চেয়েছিলো সে ওভাবে আসুক। শ্রীরাম তাকে বলতে চাইলো যে কখনো তার দিকে দেখলে তার জন্য সে অনুতপ্ত। সে তাকে হুমকি দিতে চাইলো যে তাকে জোর করে দক্ষিণ ভারতে ধরে নিয়ে যাবে। ‘অন্য যে কোনো কিছুর চেয়ে বেশি,’ ভারতী বললো, ‘মহাত্মাীকে যে ব্যাপারটা এখন ব্যথিত করছে তা হচ্ছে নারীদের ভোগান্তি। এত গুলো নারীর সর্বনাশ হয়েছে, এত গুলো নারী তাদের সম্ভ্রম হারিয়েছে, বাড়ি হারিয়েছে, শিশু সন্তান হারিয়েছে, আর অসংখ্য নারী নিখোঁজ হয়ে আছে। তাদেরকে অপহরণ করা হয়েছে, বদমায়েশরা তাদেরকে ধর্ষণ করেছে না হয় মেরে ফেলেছে, অথবা তারা হয়তো নিজেদেরকে নিজেরাই ধ্বংস করেছে।’ এ ভাবনায় ভারতী মনে হলো ভেঙ্গে পড়ার উপক্রম হলো। শ্রীরামের মনে হলো তাকে সহানুভূতিস্বরূপ কিছু একটা বলতে হবে। ‘এ ঘটনাগুলো ঘটে কেন?’ আর তার এ প্রশ্নের চরম অসারতার জন্য সে লজ্জাবোধ করলো। ভারতী তার প্রশ্নটা খেয়াল করেনি, কিন্তু কথা বলেই চললো। ‘১৫ আগস্টে সারাদেশ যখন উল্লসিত ছিলো, আর এখানে স্বাধীনতা দিবস উৎসবে অংশগ্রহণ করতে একত্রিত হয়েছিলো, তখন জানো বাপু কোথায় ছিলেন? কলকাতায় যেখানে নতুন দাঙ্গা শুরু হয়েছিলো। বাপু বলেছিলেন যেখানে মানুষ ভুগছে সেটাই তাঁর জায়গা। তাঁর জায়গা সেটা নয় যেখানে তারা উৎসব করছে। বলেছিলেন যে দেশ যদি নারী ও শিশুদের নিরাপত্তা দিতে অপারগ হয়, তবে সেখানে বসবাস করা যায় না। বলেছিলেন তাতেও যদি তাঁর দর্শন ভাল করে বোঝা না যায় তাহলে সেটা মরে যাওয়ারই সামিল। তাঁর লক্ষে গ্রামে গ্রামে খালি পায়ে হেঁটেছেন। আমরা তাঁর পিছু পিছু গিয়েছি। বন্যা ও মাঠের মধ্য দিয়ে প্রত্যেক দিন আমরা নীরবে পাঁচ মাইল করে হেঁটেছি। তিনি পূর্ব বঙ্গের ঐসব জলাভূমি দিয়ে মাথা নিচু করে হেঁটেছেন। প্রত্যেকটা গ্রামে দু’একদিন করে থেমেছি আমরা , আর যারা যারা ঘরবাড়ি হারিয়েছে, বউ বাচ্চা হারিয়েছে তাদের সাথে তিনি কথা বলেছেন। যারা অপরাধ করেছে তাদের সাথে তিনি দয়ার সাথে কথা বলেছেনÑÑ তাদের জন্য কেঁদেছেন, আর তারা কখনো এমন কাজ না করতে শপথ করেছে। আমি নিজের চোখে দেখেছি আগ্রাসী, উচ্ছৃঙ্খল লোকগুলো অহিংসার ব্রত নিচ্ছে, প্রতিপক্ষকে রক্ষা করার ব্রতÑ জিজ্ঞেস করো না আবার তারা কোন সম্প্রদায় ছিলো: দেশের এক অঞ্চলে এক সম্প্রদায় যা করতো তা দেশের অন্য অঞ্চলে একই সম্প্রদায়ের জন্য ভোগান্তি ডেকে আনতো। নোয়াখালী, বিহার ও তারপর দিল্লীতে যা ঘটেছে তা আমি দেখেছি। কেউ কী করে বেছে নিতে পারে? মানুষ অন্য মানুষের জন্য অসম্ভব কাজ করেছে। এ সম্প্রদায় নাকি অন্য সম্প্রদায় বেশি ত্রাস সৃষ্টি করেছে সেটা আলোচনা করে কোনো লাভ নেই। শুধু মানুষ ব্যতিরেকে মুসলিম, হিন্দু বা শিখ ধর্মের ভিত্তিতে কাউকে উল্লেখ করতে বাপুজী আমাদেরকে নিষেধ করেছেন। একদিন তিনি বললেন যে যারা সহিংস কর্মকাণ্ড ঘটায় তাদের জন্য তাঁর করুণা হয়ÑÑএক গ্রামের কিছু মহিলাকে তিনি উপদেশ দিয়েছিলেন যে নিজেদের সম্ভ্রম সমর্পণ করার চেয়ে নিজেদের হাতে নিজের জীবন তাড়াতাড়ি করে নেওয়া উচিৎ...।’ ‘তুমি অনেক জায়গায় গিয়ে থাকবে,’ অন্য কিছু বলার না থাকায় শ্রীরাম বললো। ‘হ্যাঁ, প্রায় এক বছর ধরে আমি মহাত্মাজীর সাথে আছি। ঐসব জায়গায় প্রথম দিকে তিনি আমাকে নিতে অনিচ্ছুক ছিলেন, কিন্তু জেল থেকে ছাড়া পাওয়ার পর আমি বারবার তাকে বিরক্ত করি। জানি না কতগুলো গ্রাম আমি দেখেছি। জ্বলন্ত গ্রামের মধ্য দিয়ে গুরুর পিছু পিছু গিয়েছি। অবশ্য যে কোনো জায়গায় আমাদের যে কোনো কিছু হতে পারতো। এমন জায়গা খুব কম ছিলো যেখানে মহাত্মাজীর বিরুদ্ধেও উষ্মা প্রদর্শিত হয়েছিলো। যদি তিনি ফিরে না আসেন এবং তাদেরকে ছেড়ে না দেন সে জন্য তারা প্ল্যাকার্ড প্রদর্শন করে বাপুর জীবনের উপর হুমকি দিয়েছিলো । কিন্তু অন্য জায়গার চেয়ে তিনি এমন জায়গাগুলোতে বেশিদিন থাকতেন। আর শেষ পর্যন্ত তিনি তাঁর জিদ বজায় রেখেছেন।’ ‘বিপদে পড়োনি কোনো সময়?’ ‘কীসের বিপদ? লাঞ্ছিত হওয়ার? হ্যাঁ, কখনো কখনো, কিন্তু মহাত্মাজী নারীদেরকে উপদেশ দিয়েছেন তাদের সম্ভ্রম হানি হওয়ার আগে তারা যেন শেষ আশ্রয় হিসেবে নিজের জীবন নিজের হাতে নিয়ে নেয়। মহাত্মাজী যেখানে ছিলেন সেখানে কোনো ভয় বোধ ছিলো না। কিন্তু... অপ্রত্যাশিত কিছু ঘটলে নিজের জীবন শেষ করতে আমি সব সময় প্রস্তুত ছিলাম।’ ‘না, না,’ সন্ত্রস্ত হয়ে শ্রীরাম বললো। ‘ওসব জায়গায় এ ধরণের কাজ একেবারে স্বাভাবিক একটা বিষয় বলে মনে হয়। সেখানে মানুষ দেখছে ঘর পুড়ছে, শিশুরা এতিম হচ্ছে, মানুষ খুন করা হচ্ছে, আর নারীদের নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। আমার মনে হয়েছিলো আমি অন্য কোনো একটা দেশে আছি। আমার বিশেষ দায়িত্ব ছিলো শিশুদের উপর তাদের যেখানেই দেখি না কেন। তাদেরকে একসঙ্গে করে এখানে এনেছি। এখানে যে সব শিশুদেরকে দেখছো, তাদের সম্পর্কে আমরা কিছু জানি না। মৃত্যুর হাত থেকে তারা কোনোভাবে পালিয়েছে, এখানেই দৈবের উপস্থিতি লক্ষ করা গেছে। বাংলা ও বিহারের বিভিন্ন গ্রাম থেকে তারা সবাই সমবেত হয়েছে। আরো ছিলো, কিন্তু কাউকে কাউকে কলকাতাতেই ফিরে নেওয়া হয়েছে। তবে আমাদের সাথে এখন যারা আছে তাদের সম্পর্কে আমরা কিছু জানি না। তাদের বাবা-মা বেঁচে থাকলে তারা জানবে তারা এখানে আছে এবং তাদের জন্য আসবে: তা না হলে আমরাই তাদেরকে মানুষ করবো। তাদের জন্য আমরা খেলনা ও কাপড়-চোপড় সংগ্রহ করেছি। তুমি আবার জিজ্ঞেস করো না যে তারা মুসলমানের বাচ্চা নাকি হিন্দুর বাচ্চা নইলে তারা কারা। ওটা জিজ্ঞেস করে কোনো লাভ নেই; আমরা জানি না। আমরা তাদেরকে শুধু ফুল ও পাখির নামে নাম দিয়েছি। বাপুজী একবার বলেছিলো যে নামের থেকে সংখ্যাও ভাল হবে যদি নাম দিয়ে কাউকে এ ধর্মের ও ধর্মের বলে চিহ্নিত করা হয়। দেখো একটা বাচ্চাকে মালকুস নামে ডাকা হয়, এ তো মেলোডি: একটা মেয়ের নাম হচ্ছে গুলাব, সেটা হচ্ছে গোলাপ। এসব শিশুকে অবশ্যই শুধু মানুষ হিসেবে বড় করতে হবে।’ শ্রীরাম একটু কেঁপে উঠলো, আর ভারতী বললো, ‘শরণার্থীদের জন্য আমরা কিছু গরম কাপড় ও কম্বল সংগ্রহ করেছি। তার থেকে তোমাকে দিচ্ছি। এ জন্য তোমাকে আমরা শরণার্থী হিসেবে গণ্য করবো, এতে ক্ষতি নেই।’ ভারতী মৃদু হাসলো। শ্রীরাম তাকে ভয় পেলো। ভারতী এত চমকপ্রদ যে সে তার বউ হতে পারে না। ‘এখন তো বুঝছো আমি কেন আমাদের বিষয়ে মহাত্মাজীর সাথে কথা বলতে পারিনি। এটা পবিত্র কিছুকে লঙ্ঘন করার মতো ব্যাপার হতো। তা হলেও একদিন বাংলার এক গ্রামে আমি তোমার কথা তাঁর কাছে উল্লেখ করেছিলাম। তিনি কিছু একটা বলতে ধরেছিলেন, কিন্তু তখন কে যেন একজন ছুটে এসে কাঁদতে কাঁদতে বলছিলেন যে তাকে ছুরিকাহত করা হয়েছে, আর এরপর আরেক বার কলকাতায় তোমার সম্পর্কে বলছিলাম, আর তিনি জিজ্ঞেস করেছিলেন তুমি কবে জেল থেকে বের হচ্ছো; তখন শেষ রাত ছিলো। যখন কেউ ধারের কাছে থাকবে না আমাদের তেমন সুযোগের জন্য আমি অপেক্ষা করেছিলাম, আর হঠাৎ করে এ জায়গা ও জায়গার কিছু বড় বড় মানুষ, মন্ত্রী এবং অন্যরা জরুরী পরামর্শের জন্য উপস্থিত হতো। আমার আর কখনো সুযোগ মেলেনি।’ ‘তাঁর কি আমার কথা মনে থাকবে?’ ‘তিনি কখনো কাউকে ভোলেন না। আমার মনে হয়েছিলো এখনো সময় হয়নিÑÑ আগামীকাল চলো একসাথে গিয়ে বিরলা হাউসে তাঁর সাথে দেখা করি, আর সুযোগ মিললে তাকে আমরা একসঙ্গে জিজ্ঞেস করবো।’ ‘তিনি যদি না বলেন?’ কাঁপুনি দিয়ে উদ্বিগ্ন প্রেমিক জিজ্ঞেস করলো। ভারতী উঠে বললো: ‘এক মিনিটের মধ্যে তোমাকে কম্বল দিচ্ছি।’ ** পরের দিন বিকেলে বিরলা হাউসের উদ্দেশ্যে যাত্রার আগে শ্রীরাম নিজেকে পরিপাটি করলো, আয়নায় দেখলো এবং হঠাৎ করে সিদ্ধান্তে পৌঁছালো যে এ উপলক্ষে তাকে হয়তো অতি বেশি স্মার্ট দেখাচ্ছে। চুলটা একটু ভাঁজ করে রাখলো। নানাবিধ সন্দেহে তার মন গুঞ্জরিত হলো। মহাত্মার সাথে সাক্ষাৎকারের ব্যবস্থা করতে ভারতী আগেভাগেই গিয়েছিলো। শ্রীরামকে বিরলা হাউসে নিয়ে যাওয়ার জন্য সে একজন গাইড রেখে গিয়েছিলো। শ্রীরাম একটা খদ্দের শার্ট ও হাতাবিহীন গেঞ্জি পরে তার ঘাড়ে শাল জড়িয়ে নিলো, আর সন্তুষ্ট হলো যে তাকে ফুটানি মার্কা দেখাচ্ছে না। তার সবচেয়ে বড় ভয় ছিলো যে মহাত্মাজী হয়তো বলে বসবে, ‘তোমাকে বিয়ে করবে? ভারতী তোমাকে বিয়ে করবে! দূর হও, ধৃষ্ট কীট কোথাকার!’ বিরলা হাইসে ভারতী তার দায়িত্ব নিলো। সে বললো: ‘তিনি ভয়ংকর ব্যস্ত, কিন্তু কিছুক্ষণ আমাদেরকে সময় দেবেন। তিনি জানেন তাঁর সাথে আমরা জরুরীভাবে দেখা করতে চাই।’ অনেক লোক ভেতরে যাচ্ছিলো আর বাইরে আসছিলো, খাদি ও সাদা টুপি পরা লোক, ইউরোপিয়ান পোশাক পরা বিদেশি সাংবাদিক এবং মোটর গাড়ি পথ দিয়ে যাচ্ছিলো। শ্রীরাম তার পরিপার্শ্ব সম্পর্কে উদাসীন ছিলো। ভারতীকে জিজ্ঞেস করলো: ‘তিনি যদি আমাকে কিছু জিজ্ঞেস করেন, তাহলে কী বলবো?’ ‘যে কোনো কিছু বলতে পারো, তিনি কিছু মনে করবেন না যতক্ষণ পর্যন্ত তুমি সত্যি কথা বলবে।’ যে নিশ্চিন্ত মনে ভারতী জায়গাটাতে ঘোরাফেরা করলো তাতে শ্রীরাম অবাক হলো। তার মতে সে নিশ্চিত ছিলো যে ভারতী তার জন্য অতিমাত্রায় ভাল, নিশ্চিত ছিলো যে তাকে তার বউ হওয়ার প্রত্যাশা করার অধিকার তার নেই। ভারতীর সাথে কথা বলার জন্য সব শ্রেণীর মানুষ থামলো। সে ইংরেজি, তামিল, হিন্দী, উর্দু এবং আরো কত ভাষায় যে কথা বললো তা ভগবানই জানেন। নারী, পুরুষ তরুণ ও সব জাতের বৃদ্ধদের সাথে নিশ্চিন্ত মনে কথা বললো। সবাইকে সে হাসি উপহার দিলো কিংবা কথা বললো। ‘কত মানুষ তুমি চেনো!’ শ্রীরাম প্রশংসা করে বললো। আর ভারতী হাসি দিয়ে সে প্রশংসার স্বীকৃতি জানালে সে মুগ্ধ হলো। ‘হ্যাঁ, কিন্তু তাদের বেশিরভাগেরই নাম আমি জানি না,’ ভারতী বললো। তারা সংক্ষিপ্ত পথ দিয়ে গেলো। ‘কী বাড়ি!’ শ্রীরাম চিৎকার করে বললো। তাদেরকে ছোটো খাটো যান্ত্রিক বিষয়ে কথা বলতে হলো: দুজনেই একই চিন্তায় আচ্ছন্ন ছিলো: মহাত্মার সাথে আসন্ন সাক্ষাৎকার। তিনি যদি বলেন, ‘হ্যাঁ,’ তাহলে পরে তাদের কী করা উচিৎ হবে? শ্রীরামের কাছে এটা সম্পূর্ণরূপে অবিশ্বাস্য ছিলো। তার মানে তাকে আলাদা কুটিরে আলোচনা করতে হতো না, তার মানে তাকে সে স্পর্শ করতে পারতো, নিয়ে যেতে পারতো, তার মানুষটার উপর তো তার অধিকার থাকবে, আর সব সময় তার সাথে থাকতে পারতো। শ্রীরাম তাকে চত্বরে একদিকে নিয়ে গেলো। ‘একটু আসো, ভারতী,’ সে ফিসফিস করে বললো, ‘আমাদের বিয়েতে বাপু অনুমতি দিলে সঙ্গে সঙ্গে কি আমরা সেটা সেরে ফেলবো?’ ভারতী যখন ফিসফিস করে উত্তর দিলো তখন তার উষ্ণ বাতাস শ্রীরামের উপর বয়ে গেলো, ‘হ্যাঁ, নিঃসন্দেহে।’ ‘সঙ্গে সঙ্গে কীভাবে আমরা তা করতে পারি? প্রয়োজনীয় আয়োজন আমরা কী করে করবো?’ শ্রীরাম জিজ্ঞেস করলো। ‘কী আয়োজন? আমরা কি সানাই, ঢোল, ড্রাম, যৌতুক ও ভোজের আয়োজন করতে যাচ্ছি নাকি?’ ভারতী জিজ্ঞেস করলো। ‘অন্তত ফুলও তো কিনতে হবে আমাদের? এ জায়গায় ফুল কোথায় কিনতে পাবো? আমি তো কাউকে চিনি না।? কোনো কিছু জানিও না। আমার জন্য সবকিছু গ্রহণ করতে আমার বউকে কী করে বলবো? ইস! যদি দিল্লী না হয়ে মালগুদি হতো, তাহলে দেখতে কী করতাম।’ ‘ওসব নিয়ে ভেবো না। কী করতে হবে বাপু নিজেই আমাদেরকে বলবেন।’ তারা হাঁটতে হাঁটতে ছোট একটা চত্বরে এলো যেখানে এরই মধ্যে কিছু লোক বসে ছিলো। এক প্রান্তে একটা বেদী ছিলো। ‘এখানেই বাপু প্রত্যেকদিন সান্ধ্যকালীন প্রার্থনা সারেন,’ ভারতী বললো। পিছন দিয়ে প্রধান ভবনে ভারতী ঢুকলো। তারা ছোট একটা বারান্দায় পৌঁছে, সরু পথ পার হয়ে একটা জানালা থেকে ঠিক দশ গজ দূরে থামলো। এরপর চুপ থেকে জানালার মধ্য দিয়ে সে নির্দেশ করলো। ‘ঐ যে উনি!’ সেখানে তিনি নাকে চশমা রেখে, পা দুটো নিচে ভাঁজ করে রেখে বসে ছিলেন। তাঁর সাথে বসে থাকা দুজন লোকের কথা ব্যাকুল হয়ে শুনছিলেন। ‘উনি নেহেরু, আর উনি প্যাটেল,’ ভারতী ফিসফিস করে বললো। রুমে আরো কিছু লোক ছিলোÑÑ খুবই ব্যস্ত লোক। ‘ওনাদের কাজে ব্যাঘাত সৃষ্টি করা যাবে না,’ ফিসফিস করে বলে সে দেয়ালে হেলান দিয়ে সটান হয়ে রইলো। শ্রীরাম তার দৃষ্টান্ত অনুসরণ করলো। ভেতরের লোকগুলো নিচু স্বরে ফিসফিস করে কথা বলছিলো। কেউ একজন রূম থেকে বেরিয়ে এসে ভারতীকে দেখে হাসলো। ভারতী তাকে হিন্দীতে কী যেন বললো। ‘সে হচ্ছে বাপুর নাতনী, দেখতে তাঁর মতোই হয়েছে।’ ‘আমরা যে এখানে আছি তাতে তাঁরা কিছু মনে করবে না তো?’ শ্রীরাম জিজ্ঞেস করলো। ‘তাঁরা মনে হয় গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে কথা বলছে।’ ‘কিন্তু বাপু আমাকে তাঁর জন্য অপেক্ষা করে সুযোগ নিতে বলেছে। ঠিক সময়ে উঁকি মেরে জানালায় আমার মুখ দেখাবো। তিনি আমাকে ভেতরে ডাকবেন নয়তো তিনিই কিছুক্ষণের জন্য বাইরে আসবেন।’ ‘বাপুর সাথে কথা বলার এটাই একমাত্র উপায়। তিনি তো সব সময় ব্যস্ত ও লোকজন পরিবেষ্টিত থাকেন।’ ‘তাকে কতকটা দুর্বল দেখাচ্ছে,’ কিছুক্ষণ জানালার মধ্য দিয়ে উঁকি দিয়ে সাহস করে বললো। ‘হ্যাঁ, তাঁর গত উপবাসে তিনি পুরো ক্লান্ত হয়ে পড়েছেন। কখনো কখনো নড়াচড়াবিহীন, অজ্ঞান অবস্থায় ওখানে তিনি পড়ে থাকতেন।’ দুজন মেয়ে পাশ দিয়ে চলে গেলে ভারতী কথা বলা বন্ধ করলো। কেউ একজন শর্টহ্যান্ড নোটবুক ও পেনসিল নিয়ে ছুটে গেলো। সরকারি বাড়ির ইউনিফর্ম পরা এক চাকর এক গ্লাস জল নিয়ে ভেতরে গেলো। এসব দেখে শ্রীরাম গান্ধীর সাথে সাক্ষাৎ করাটা স্থগিত করতে চাইলো। ‘আজকে তাঁর কাজে ব্যাঘার সৃষ্টি করা কি ঠিক হবে? তিনি ফাঁকা নাও থাকতে পারেন।’ ‘তিনি তো সব সময় ব্যস্ত থাকেন। এভাবেই চলেন। আজকে অপেক্ষা করে তাঁর সাথে দেখা করতে তিনি আমাকে বলেছেন। আমি তো তাকে বলেছিলাম যে তুমি এখানে আছো, আর তিনি বললেন, “আজকে তাকে সাথে করে নিয়ে এসো ”। “বাপুজী, কালকে কোনো এক সময়, আজকে তো আপনি ব্যস্ত”, প্রধান মন্ত্রী এবং অন্যান্যদের সাথে তাঁর গুরুত্বপূর্ণ সম্মেলন আছে জেনে আমি বললাম। “আমি আজকেই বোঝাচ্ছি”, তিনি জোর দিয়ে বললেন। আর আমরা কোথায় অপেক্ষা করবো সেটাও তিনি বলেছেন। বলেছেন একটুখানি বাড়তি সময় পেলেই তিনি আমাদের সাথে দেখা করবেন।’ ‘জানি তোমরা ওখানে অপেক্ষা করছো, ভেতরে এসো, তোমার বন্ধুকে নিয়ে ভেতরে এসো,’ মহাত্মাজীর কণ্ঠস্বর ভেসে এলো। ‘এখন আসতে পারো, জীবনের ভয়ংকর গুরুত্বপূর্ণ সব কাজ শেষ। এসো, এসো মা।’ ‘ইনিই বাপু,’ শ্রীরামের হাত শক্ত করে ধরে ও তাকে নিয়ে যেতে যেতে ভারতী বললো। শ্রীরামের হৃৎপিণ্ড ধড়ফড় করলো। রূমে পা ফেলার ঠিক আগে ভারতী ফিসফিস করে বললো, ‘স্বাভাবিক থাকবে, আর সত্য কথা বলবে। আর বিয়ে সম্পর্কে তাকে বলবে।’ ‘হ্যাঁ, হ্যাঁ,’ শ্রীরাম ঢোক গিললো। তারা ঘরে ঢুকলো। মহাত্মা মেঝেতে বসেছিলেন। পত্রিকা থেকে দৃষ্টি উপরে নিক্ষেপ করলেন। ভারতী দু’হাতের তালু একখানে করে প্রণাম জানালো। শ্রীরাম বললো, ‘নমস্কার, ওহ, শ্রদ্ধেয় গুরু!’ মহাত্মা হাসি দিয়ে তাদের প্রণামের জবাব দিলেন। তাঁর কাছে একটা জায়গা নির্দেশ করে তিনি বললেন, ‘এসো এখানে বসো। অনেক দিন তোমার সাথে দেখা হয়নি। নিজের সম্পর্কে এখন আমাকে বলো। ভারতী, আশা করি তোমার বাচ্চাদের অবস্থা ভাল হচ্ছে: তুমি তো এখনই ত্রিশটা বাচ্চার মা হয়েছো, কী আশীর্বাদ!’ ‘জ্বী, বাপু,’ ভারতী বললো। ‘তারা সবাই ভাল আছে। একটা ছোট বাচ্চা ছিলো না, ওর ঠাণ্ডা লেগেছিলো, ঐ যে ছোট মেয়েটা আপনি যার নাম দিয়েছেন আনার।’ ‘ওহ, হ্যাঁ, ওর কথা মনে আছে, জানো আনার মানে কী, ডালিম কুঁড়ি; কী সুন্দর! শিশুদের আকারে ভগবান আমাদের কাছে নিজেকে প্রকাশ করেন। আজকে অনেক ফলমূল সংগ্রহ করেছি, তুমি তো জানো আমি যখন উপবাসে থাকি তখন কত লোক এসে ঝামেলা করে: মনে হয় তারা সব সময় ভাবে যে এর পর অবশ্যই ভাল একটা খাবার খেতে হবে! আচ্ছা, তোমার জন্য আমি ওগুলো রেখে দিয়েছি: ওগুলো নিয়ে ছোট্ট সোনামণিদের দিয়ে দাও, ওরাই ভাল খাবার খাক।’ এক কোণায় স্তুপ করে রাখা উজ্জ্বল রঙের কমলা ও আপেল দেখিয়ে তিনি বললেন। ‘জ্বী, বাপু।’ ‘আর ওদের জন্য ফুল নিতেও ভুলো না যেন।’ মহাত্মা এবার শ্রীরামের দিকে ঘুরলেন: ‘তোমার নিজের সম্পর্কে বলো এখন।’ শ্রীরাম কিছুক্ষণ ইতস্তত করলো। ‘বিশ্বে তোমার অঞ্চলে তুমি কী করছিলে?’ ‘এক সপ্তাহ আগেও তারা আমাকে জেলে বন্দী করে রেখেছিলো,’ সে বললো। ‘তোমাকে আরো আগে ছাড়েনি কেন?’ গান্ধী বললেন। ‘আমাকে সাধারণ দণ্ডে দণ্ডিত করা হয়েছিলো,’ এ ভাবনায় যে মর্মযাতনা সে বোধ করলো তার সবটুকু দিয়ে সে জবাব দিলো। ‘খুব ভাল কথা। তুমি কী করেছিলে?’ শ্রীরাম কিছুক্ষণ ইতস্তত করলো এবং ভারতীর সত্যবাদী হওয়ার উপর নিষেধাজ্ঞার কথা তার মনে পড়লো। বললো, ‘কিছু সময় আমি “ভারত ছাড়ো” প্রচার করেছিলাম, কিন্তু পরে ট্রেন উল্টে ফেলার কাজ করছিলাম আরÑÑ’ মহাত্মাজীকে গুরুগম্ভীর দেখালো। ‘তুমি তো অনেক অন্যায় কাজ করেছো। তারপর থেকে যে নিকৃষ্ট নিকৃষ্ট ঘটনা ঘটেছে সেটা ভাবলে কোনো স্বস্তি মেলে না।’ ‘ভারতী জেলে চলে গেলো, এরপর আর কেউ রইলো না যে আমাকে বলতে পারে কী করতে হতো: কেউ ছিলো না যে আমাকে সঠিক পথ দেখাতে পারতো।’ ‘চমৎকার স্বীকারোক্তি,’ হাসি দিযে মহাত্মাজী বললেন। ‘হ্যাঁ, ভুল ছিলো তার, তোমাকে ফেলে গিয়েছিলো।’ ‘না,’ শ্রীরাম বললো: ‘ভুলটা আমার ছিলো। সে যখন তার সাথে আমাকে জেলে যেতে বলেছিলো, তখন আমি যেতে অস্বীকৃতি জানিয়েছিলাম।’ ‘আসলে, তাই কি, ভারতী?’ ‘জ্বী, বাপু, সে বলেছিলো সেÑÑ’ ‘আচ্ছা, সব চাপ শেষ হলে রাজনৈতিক কর্মী হিসেবে কী কী করেছো তা আমাকে বিস্তারিত বলবে, আর তখন সিদ্ধান্ত নেবো আমাদের কী করা উচিৎ।’ তিনি হাসলেন। ‘আবার উপবাসে যাওয়ার মতো খুব গুরুত্বপূর্ণ কিছু থেকে থাকলে আমরা শুনবো। জানো উপবাস কত ভালভাবে শুদ্ধ করে তুলতে পারে?’ ‘আমাকে উপবাস করতে আদেশ করলে আমি করবো,’ শ্রীরাম বললো। ‘আশা করি এর প্রয়োজন হওয়ার মতো তুমি তেমন কিছু করোনি। এ বিষয়ে আমরা পরে আলোচনা করবো।’ ‘সিদ্ধান্ত হয়ে গেলে আমি নিজেই উপবাস থাকার জন্য তৈরি থাকবো,’ ভারতী বললো। তার মুখখানি ঝলকে উঠে লাল হলো। ‘তুমি!’ মহাত্মাজী বললেন, ‘তোমার বন্ধুর জন্য!’ ঠিক এ সময়ে হলের দূরতম কোণায় কে যেন ঘোরাফেরা করছিলো। মহাত্মা বললেন: ‘ঐ যে আমার বিবেক রক্ষক ঘড়ি ঝুলিয়ে বলছেন ওঠার সময় হয়েছে।’ হাতের পাঁচ আঙ্গুল তুলে বললেন, ‘আর পাঁচ মিনিট সময় দাও।’ দর্শনার্থীদের দিকে ফিরলেন: ‘আমি দুঃখিত যে পাঁচ মিনিটের মধ্যে তোমাদের ছেড়ে যেতে হচ্ছে। লোকজন ইতোমধ্যে প্রার্থনা মাঠে অবশ্যই সমবেত হয়ে থাকবে। ওদের কণ্ঠস্বর শুনতে পাচ্ছো না?’ সময় যে ফুরিয়ে যাচ্ছে এ চিন্তায় শ্রীরাম উদ্বিগ্ন হলো। প্রত্যেকটা মিনিট গণনাযোগ্য। এরই মধ্যে এমনকি যখন সে ভাবছিলো তখন মূল্যবান সময় হারাচ্ছিলো। আর মাত্র সাড়ে তিন মিনিট। ঘড়িটা আবার ঝুলানোর আগে তাকে অবশ্যই কথা বলতে হবে। ভারতীর দিকে পার্শ্ব দৃষ্টি নিক্ষেপ করলো এই আশায় যে সে অন্তত মূল্যবান সময়টা কাজে লাগাতে পারে। কিন্তু ভারতী তার দিকে চেয়ে রইলো যা তার কাছে নীরব আবেদনের চাহনি বলে মনে হলো। মহাত্মা মজার দৃষ্টিতে তাদের দিকে তাকিয়ে থাকলেন। শ্রীরাম হঠাৎ করে বলে বসলো, ‘বিয়ে করতে আপনার আশীর্বাদধন্য অনুমতির জন্য আমরা অপেক্ষা করছি।’ মহাত্মাজী আনন্দের সাথে একজন থেকে আরেকজনের দিকে তাকালেন। ‘তোমরা কি পরস্পরকে এত পছন্দ করো?’ শ্রীরাম ফেটে পড়লো, ‘পাঁচ বছর ধরে অন্য কিছু না ভেবে আমি অপেক্ষা করেছি।’ ‘তোমার খবর কী, ভারতী, তুমি তো কিছু বলছো না।’ ভারতী মাথা নিচু করে রইলো এবং লজ্জায় লাল হয়ে ছটফট করলো। ‘আহ্, এই তো কর্তব্যপরায়ণ বউয়ের লক্ষণ,’ মহাত্মাজী বললেন, এবং জিজ্ঞেস করলেন, ‘এই নীরবতা দিয়ে হ্যাঁ বোঝাচ্ছে?’ শ্রীরাম শ্বাসরুদ্ধকর উত্তেজনায় ভারতীর দিকে তাকালো। মহাত্মাজী ভারতীকে কিছুক্ষণ পর্যবেক্ষণ করে বললেন, ‘সেই কনে তো অশোভন হবে যে তার মনের কথা জোরে জোরে বলে! ভাল, ভাল, ভগবান তোমাদের আশীর্বাদ করুন। তা শুভ কাজটা কখন হবে, আগামীকাল?’ ‘জ্বী, আপনি যদি তেমন আশীর্বাদ করেন।’ ‘ঠিক আছে। কাল সকালে আমি প্রথমে যেটা করবো তা এই কাজ। তোমাদের আপত্তি না থাকলে আমি তোমাদের পুরোহিত হবো। আমি তো একজন খুবই অবহেলাকারী পিতা; আমি এসে কনেকে তুলে দেবো। কালকের এটাই প্রথম কাজ; অন্যান্য কাজ এর পরে। আমি ইতোমধ্যে সব ফল ও ফুল আনিয়ে রেখেছি, আর তাই মোটের উপর তোমরা বলতে পারবে না যে আমি কাজে অবহেলা করেছি।’ ঘড়িটা নিয়ে লোকটি আবার হাজির হলে মহাত্মা বললেন, ‘তোমার জন্য আমি প্রস্তুত হয়ে আছি।’ তিনি উঠে দাঁড়ালেন। শ্রীরাম ও ভারতীও উঠলো। মহাত্মা বললেন, ‘এরই মধ্যে তোমাদের কিন্তু ত্রিশটা বাচ্চার সংসার আছে। তোমরা তাদের বাবা-মা হও!’ তিনি অপেক্ষা করার রূমে গিয়ে এক মিনিট পর এলেন। ভারতী তাঁর জন্য দরজায় অপেক্ষা করলো। মেঝের দিকে তাকিয়ে তিনি ভারতীর পাশ দিয়ে চলে গেলেন। ভারতী তাকে অনুসরণ করে চললো, আর শ্রীরাম ভারতীর পিছু পিছু চললো। মহাত্মাজী হঠাৎ করে থামলেন এবং ঘুরে বললেন: ‘ভারতী, আমার কেন জানি মনে হচ্ছে কাল সকালে তোমাদের বিয়েতে আমি থাকতে পারবো না।’ ‘কেন? কেন, বাপু?’ ভারতী জিজ্ঞেস করলো। ‘জানি না।’ তাঁর কণ্ঠস্বর ক্ষীণ হয়ে এলো: ‘মনে হচ্ছে তোমাদের পুরোহিত হিসেবে বিয়ে পড়ানোর কথা দিয়ে আমি খুব হঠকারিতার কাজ করে ফেলেছি।’ ‘বাপু, আপনাকে ছাড়াÑÑ’ ‘ধেৎ,’ গান্ধী বললেন। ‘ওসব তোমাকে বলতে হবে না। আমি খুব করে ওখানে থাকতে চাই, কিন্তু জানি না। ভগবানের ইচ্ছা থাকলে আসবো। নইলে জেনো রাখো তোমাদের দুজনার উপরেই আমার আশীর্বাদ রইলো। যাই হোক, মনে রেখো, কোনো কারণেই তোমাদের বিয়ে বন্ধ রাখা যাবে না কিন্তু,’ কণ্ঠে নতুন আদেশ নিয়ে তিনি বললেন, আর ভারতী জবাব দিলো, ‘জ্বী, বাপু।’ মহাত্মা ভারতীর পিঠে হাত বুলিয়ে দিয়ে শ্রীরামের দিকে হাসি দিলেন, আর দ্রুত চললেন। তিনি তাঁর নাতনীর কাঁধে ভর দিয়ে হাঁটলেন। শ্রীরাম ও ভারতী তাঁর পিছু পিছু চললো মাথা ভর্তি পরিকল্পনা নিয়ে। মহাত্মাজী তাঁর ঘড়িটা বের করে বললেন, ‘দেরি করাকে আমি ঘৃণা করি...’ চত্বরে যখন তারা পা ফেললো, তখন ভারতী শ্রীরামকে বললো, ‘চলো আজকে প্রার্থনায় যোগ দেই। আমাদের দুজনার জন্য জায়গা আছে।’ তারা একদিকে সরে দাঁড়ালো। মহাত্মাজী বেদির কাছাকাছি এলে গোটা সমাবেশ উঠে দাঁড়ালো। এ মুহূর্তে একজন লোক ঠেলাঠেলি করে, ভারতীকে ধাক্কা দিয়ে সমাবেশের সামনে হাজির হলো, আর শ্রীরাম ক্ষেপে গিয়ে চিৎকার করে উঠলো, ‘ওভাবে ঠেলাঠেলি করছেন কেন?’ সেদিকে কান না দিয়ে লোকটি সামনে গেলো। ‘আজকে দেরি করে আসার জন্য আমি দুঃখিত,’ মহাত্মা বিড়বিড় করে বললেন। লোকটি মহাত্মার সামনে গিয়ে দাঁড়ালো এবং শ্রদ্ধাপূর্ণ প্রণামের ভঙ্গিতে দু’হাতের তালু এক করলো। মহাত্মা গান্ধীও নমস্কার জানালেন। লোকটি আবারও সামনে যাওয়ার চেষ্টা করলো। মহাত্মাজীর নাতনী বললো, ‘আপনি বসুন,’ আর তাকে ঠেলে লাইনে রাখার চেষ্টা করলো। লোকটি মেয়েটিকে প্রায় মাটিতে ফেলে দিলো, আর পকেট থেকে একটা রিভলভার বের করলো। মহাত্মা যখন বেদিতে পা রাখতে যাচ্ছিলেন, লোকটি ঠিক তখন রিভলবার তাক করে তাকে গুলি করলো। আরো দুটো গুলির আওয়াজ হলো। মহাত্মা বেদিতে ঢলে পড়লেন। কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে তিনি মারা গেলেন।
This comment has been removed by a blog administrator.
ReplyDeleteVery good written article. It will be supportive to anyone who utilizes it, including me. Keep doing what you are doing – can’r wait to read more posts. LSD for sell
ReplyDelete